Monday, May 25, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৭)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৭)
  জন্মদিন থেকে আসার পর বেশ কিছুদিন ধরেই ময়ূর অর্পিতাদের বাড়ি যাচ্ছে না। অর্পিতা বারবার ফোন করে তাকে যেতে বলায় সে শরীর খারাপের অজুহাতে আর আসেনি। এরমাঝে একদিন অর্পিতা এসে ঘুরে গেছে ওদের বাড়ি। বারাসাত থেকে একটু ভিতরের দিকে অর্পিতাদের বাড়ি হওয়ায় বাস থেকে নেমে অটো ধরে তারপর পৌঁছাতে হয়। এই এতটা পথ জার্নি করে শুধুমাত্র অর্পণের টানেই ময়ূর ওদের বাড়িতে যাতায়াত করে। কিন্তু জন্মদিনের ঘটনার পর সে অর্পণদের বাড়ি যাওয়া একদম বন্ধ করেই দিয়েছে। ময়ূর মনেকরে অর্পণের যদি বিন্দুমাত্র তারপ্রতি কোনরকম অনুভূতি থাকে তাহলে সে অর্পিতাকে বলবে তাকে যাওয়ার কথা নতুবা সে ফোন করবেই।
 এদিকে অর্পণও একটু চুপচাপ হয়ে যায়। অফিস থেকে ফেরেও বেশ তাড়াতাড়ি। অর্পিতা একদিন জিজ্ঞাসা করেই বসলো,
-- হ্যাঁরে দাদা কী হয়েছে তোর? আমার মনেহয় তুই যেন সারাক্ষণ কী ভাবিস? একটু চুপচাপ হয়ে গেছিস, অফিস থেকে বাড়িতে বেশ তাড়াতাড়িই ফিরিস।
-- তুই কি আমার উপর গোয়েন্দাগিরি শুরু করলি নাকি? একটা কেস নিয়ে খুব টেনশনে আছি। ওটা নিয়েই ভাবি 
-- হ্যাঁ সে আমি জানি কেসটা খুব জটিল 
-- মানে তুই কীকরে জানবি আমি কোন কেসটা নিয়ে টেনশনে আছি - 
-- আরে বাবা জানি, জানি। তুই না বললেও কিছুটা আন্দাজ করতে পারি 
 অর্পণ বোনকে আর বেশি ঘাটায় না। সে উঠে গিয়ে বুকশেলফ খুলে একটা মোটা বই বের করতে করতে বলে,
-- কেসটা নিয়ে একটু স্ট্যাডি করতে হবে। তুই আর বিরক্ত করিস না
 অর্পিতা হেসে পড়ে বলে,
-- তুই যে কেসটা নিয়ে ভাবছিস ওটা ওই বইয়ের পাতায় পাবি না। ওটা নিজের মনেই ভাবতে হবে
-- কী সব উল্টোপাল্টা কথা বলিস যে। বেরো এখন এখান থেকে। এখন থেকেই চেষ্টা কর চাকরির পরীক্ষাগুলো দিতে। রেজাল্ট বেরোনোর তো সময় হয়ে গেলো। 
 হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বলে বসলো,
-- হ্যাঁরে ময়ূরের কী খবর? সেই জন্মদিনের পরে আর দেখিনি আর আসেনি?
 অর্পিতা মনেমনে বলে, "পথে এসো চাদু" তারপর দাদার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- কিছুদিন ধরে ওর শরীরটা খুব খারাপ। ফোন করেছিলাম। বলল, বাড়ি থেকে মোটেই বেরোতে পারছে না। শরীর খুব দুর্বল
 অর্পণের চোখে মুখে উদ্বিগ্নতা অর্পিতার নজর এড়ায় না -
-- কেন কী হয়েছে? ডাক্তার দেখিয়েছে? ডাক্তার কী বলেছেন?
-- তুই এত প্রশ্ন করছিস কেন? ও তো আমার বন্ধু। তোর উদ্বিগ্নতা আর প্রশ্ন শুনে মনেহচ্ছে ওর জন্য তোর খুব টেনশন হচ্ছে
 অর্পণ বুঝতে পারে এভাবে কথাগুলো বলা হয়ত ঠিক হয়নি। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-- আরে না এতদিন ধরে আমাদের বাড়িতে আসছে। আমাদের সাথে তো ওর একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অসুস্থ হয়েছে তাই জানতে চাইছি 
-- হ্যাঁ সেতো আমি বুঝতেই পেরেছি। আমায় খুলে ঠিক বলেনি ওর কী হয়েছে। দেখ তুই ফোন করে তোকে বলে কিনা - 
 অর্পণ অবাক হয়ে জানতে চায়
-- আমি ফোন করবো?
-- কেন তাতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?
 অর্পণ আর কোন কথা না বলে হাতে ধরা বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে।
 অর্পিতা বেরিয়ে যায়। এইভাবে আরও বেশ কয়েকটা দিন কেটে যায়। একদিন ধর্মতলায় একটি কাজ থেকে ফেরার পথে সে দেখে ময়ূর বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। অনেক দূর থেকে ওকে দেখতে পেয়ে একদম ওর সামনে এসে গাড়িটা দাঁড় করায়। আচমকা একটা গাড়ি সামনে দাঁড়াতে দেখে ভয়ে সে কিছুটা পিছিয়ে যায়। 
  গাড়ির কাঁচটা আস্তে করে নামিয়ে দিল সে। মুখটা কাঁচ  থেকে বের করে বলল,
-- ময়ূর, ভয় পেয়ে গেলে নাকি ?
ময়ূর একটু থমকে দাঁড়ায়। চোখ কুঁচকে ভালো করে তাকিয়ে চিনতে পারে,অর্পণ। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে ওঠে।
-- ভয় পাবো না? এভাবে হঠাৎ সামনে গাড়ি নিয়ে তুমি দাঁড়াবে, সেটা আমি বুঝবো কী করে?
তার গলায় বিরক্তি থাকলেও ভিতরে লুকিয়ে থাকা স্বস্তিটা অর্পণের চোখ এড়ায় না।
অর্পণ হালকা হেসে দরজাটা খুলে দেয়
-- ওঠো, বাড়ি যাবে তো? নামিয়ে দেব।
-- রাস্তাটা সম্পূর্ণ তোমার বাড়ির উল্টো দিক। কোন দরকার নেই। আমি বাসেই চলে যেতে পারবো
-- এত রাগের কথা। এত রাগ ভালো নয়। একটু মাথা ঠাণ্ডা করে একবার সব ভাবলেই বুঝে যাবে কেন কিসের জন্য সেদিন ওই কথাগুলো বলেছি।
-- কী বুঝবো? বয়স তোমার থেকে কম হতে পারে কিন্তু এত কম নয় যে তোমার অযৌক্তিক যুক্তি আমি বুঝতে পারিনি
-- আরে বাবা ঠিক আছে। আস্তে , এটা রাস্তা। উঠে এসো। সবাই দেখছে তো। গাড়িতে বসেই ঝগড়া করবো দু'জনে 
ময়ূর একবার চারপাশে তাকায়। ধর্মতলার ভিড়, বাসের লম্বা লাইন, হর্নের শব্দ সব মিলিয়ে যেন আরও অস্বস্তিকর লাগছে। তবুও একটু দ্বিধা নিয়ে বলে,
— না বললাম তো দরকার নেই। আমি বাসেই চলে যাব।
অর্পণের গলাটা এবার একটু গম্ভীর—
—  খুব জেদ করছো কিন্তু। এবার ঠিক বকা দেবো।এই ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা খুব সেফ না। আর আমায় তুমি চেনো না? গাড়ি থেকে নেমে জোর করে গাড়িতে তুলে নেবো কিন্ত
-- সে জোর আমার প্রতি তোমার আছে? উহু মনে হয় না
-- আচ্ছা সব কথার উত্তর আমি গাড়িতে বসেই দেবো। এবার তো ওঠো 
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে ময়ূর। তারপর ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসে। দরজা বন্ধ হতেই বাইরের কোলাহলটা যেন একটু দূরে সরে যায়।
গাড়ি চলতে শুরু করে। কয়েক মিনিট কেউ কথা বলে না। শুধু হালকা একটা সুর বাজছে গাড়ির ভেতরে।
অর্পণ সেটা বন্ধ করে দিয়ে হঠাৎ বলল—
-- এড়িয়ে যাচ্ছো আমায়? আচ্ছা আমি তো একা ওই বাড়িতে থাকি না। তোমার বন্ধুটিও তো থেকে। তাহলে সেদিনের পর আর যাওনি কেন?
প্রশ্নটা শুনে ময়ূরের হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আসে। সে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে
-- এড়িয়ে যাচ্ছি না ব্যস্ত ছিলাম। আর কেনই বা তোমায় এড়িয়ে যাবো বলো তো? তুমি তো আমার কেউ হও না। বন্ধুর দাদা। হঠাৎ তোমার এটাই মনেহল কেন যে আমি তোমার জন্যই ওই বাড়িতে যাচ্ছি না
অর্পণ একটু হেসে বলে
-- তুমি মিথ্যে বললে খুব সহজে ধরা পড়ে যাও জানো? আর তাছাড়া অর্পিতা বলল তোমার শরীর খারাপ তুমি বলছ ব্যস্ত ছিলে। আসল সত্যিটা কী?
-- আসল সত্যিটা কী তুমি জানো না? নাকি জেনেও আমার মুখ থেকে আর একবার শুনতে চাইছো? সেদিন শুনতে কি ভালো লেগেছিল?
 অর্পণ হেসে দেয়। এই মেয়েটাকে সেও যে সত্যিই ভালবাসতে শুরু করেছে সেটা সে মুখে স্বীকার না করলেও তার অন্তর জানে।
-- এত স্পষ্ট কথা বোলো বলেই তো তোমায় আমি --
অর্পণ চুপ করে যায় 
ময়ূর এবার মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। চোখে একটু অভিমান, একটু অস্বস্তি
-- কী আমায় কী? ভালোবাসো ? নাকি একদম পছন্দ করো না? কোনটা?
গাড়ির ভেতরের বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। অর্পণ স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করে ধরে। প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,
-- রেজাল্টের কিন্তু সময় হয়ে গেলো। আরও স্ট্যাডি করবে নাকি চাকরির চেষ্টা করবে?
ময়ূর চুপ। শুধু বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছে।
গাড়ি তখন শহরের ভিড় পেরিয়ে একটু ফাঁকা রাস্তায় উঠেছে
আর তাদের দুজনের মাঝের অজানা দূরত্বটা যেন ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
 -- উত্তর দিলে না? কী ভাবছো ভবিষ্যত নিয়ে?
-- আপাতত যেটা নিয়ে ভাবছি তার একটা হিল্লে না হওয়া পর্যন্ত অন্য কিছু নিয়ে ভাবলেও মন দিতে পারবো না।
-- বাব্বা রে! মেয়ে তো সাংঘাতিক! এর তো মুখে কিছুই আটকায় না দেখছি 
-- হ্যাঁ আমি এরকমই। মনে এক মুখে আর এক এরকম আমি হতে পারবো না। 
-- আচ্ছা ঠিক আছে বুঝলাম। আমায় একটা মানুষের  নাম বলো যার মন আর মুখ আলাদা কথা বলে। এটা হয় না গো। মানুয়ের যেটা মনে থাকে সেটাই মুখে প্রকাশ করে --
-- কেন অর্পণদা, তোমার তো মন যে কথা বলে মুখে তো সে কথা আসে না ?
 অর্পণের গাড়িটা হঠাৎ করেই ব্রেক কোষে দাঁড়িয়ে পড়লো - আর ময়ূর অবাক হয়ে অর্পণের দিকে তাকিয়ে

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment