Sunday, May 17, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৩)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৩)
 বিজয় আস্তে করে দরজায় নক করল
-- বিনী তোরা কী ঘুমিয়ে পড়েছিস?
 ওই দাদা এসছে। আমি যা ভয় পেয়ে গেছিলাম।
-- কেন তুমি কি ভেবেছিলে আমার দাদা এসে তোমায় তার কাছে নিয়ে যাবে?
-- উফ্ তোমার মুখে কিছুই আটকায় না।
তারপর একটু গলা চড়িয়ে বলল,
-- না না ঘুমাইনি। দাঁড়া খুলছি।
 বিনীতা উঠে দরজা খোলে। বিজয়ের পিছন পিছন অনল এসে ঢোকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দি বলে ওঠে,
-- বৌদি তুমি এদিকে এসো
 অনল হঠাৎ করে বোনের মুখে বৌদি ডাক শুনে হকচকিয়ে যায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-- ওহ্ তারমানে সব শোনা হয়ে গেছে -
-- অবশ্যই। তোর মত বোকা, ভীতুর ডিম আমি জীবনে আর একটা দেখিনি। বিয়ে করে গুম মেরে গেছে
-- আমি বোকা? আমি ভীতু?
-- তাই ছাড়া কী? সাহস করে আমাকেও কথাগুলো বলতে পারিসনি 
-- কেন তুই কী ভগবান নাকি যে সব ঠিক করে দিবি?
-- ভগবান হতে যাবো কেন? কিন্তু মা, বাবাকে বুঝাতে তো আমি পারতাম। মানছি আমি তোর ছোট। আর তুই তো জানিস তোর থেকে মা বাবা আমায় একটু বেশিই ভালোবাসেন।
-- তাই নাকি?
-- কেন তুইই তো বলিস সব সময় এই কথা।
 এতক্ষণ বিজয় আর বিনীতা দুই ভাইবোনের ঝগড়া শুনছিলো। এবার বিজয় বলে,
-- মাকে একটা ফোন করে দেখি ঘুমিয়ে পড়েছেন কিনা
বিজয় ফোনটা বের করে মাকে ফোন করে। একটা রিংয়েই সুস্মিতা ফোন তুলে বলেন,
-- তোরা এখনো ঘুমাসনি।
-- তোমরা জেগে আছো?
-- হ্যাঁ তো। গল্প করছি।
-- তাহলে আমরা সবাই তোমার ঘরে আসছি।
 ওদের দিকে ফিরে বলল বিজয়
-- চলো সবাই মিলে মায়ের ঘরে যাই। আজকেই ঠিক করে ফেলি বিষয়টা।
 ওরা চারজনে মিলে সুস্মিতার ঘরের দিকে রওনা দিলো। রাত তখন প্রায় বারোটা। গ্রামের রাতের অন্ধকার ভেদ করে চারিদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ওরা মায়ের ঘরের ভিতর গিয়ে ঢুকলো। ওদের আসার কথা শুনে সুস্মিতা দরজা আগেই খোলা রেখে দিয়েছিলেন। দুই বন্ধুই খাটের উপর বসা। ওরা ঘরে গিয়ে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই লিজা বললেন,
-- বিনীতা তুমি আমার কাছে এসে বসো।
-- ও মামী আমার আদরটা কি কমে গেলো?
 আনন্দি রসিকতা করে কথাটা বলে। বিনীতা গিয়ে লিজার পাশে বসে। লিজা তার একটি হাত ধরে বলেন,
-- বলো মা এবার তুমি কী চাও? তুমি যা চাইবে যেমনভাবে চাইবে আমরা ঠিক তেমনভাবেই তোমাকে বরণ করে ঘরে তুলবো। তুমি যদি চাও আবার সব অনুষ্ঠান নতুন করে হবে তবে তাই হবে আমরা বাড়িতে পূর্বের বিয়ের কথা জানাবো না। আর যদি চাও রেজিস্ট্রি করে শুধু বৌভাত হবে তবে তাই হবে।
 বিনীতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
-- আমার কোনকিছুতেই আপত্তি নেই। আপনারা যেটা ঠিক করবেন সেটাই হবে। তবে ওর মতটা কী সেটা জেনে নিন 
-- অনলের মত? ও তো ভয়েই মুখ খোলেনি। এবার আমরা যেটা করবো সেটাই হবে। ওর কোন কথা শোনা হবে না -
 অনলের দিকে ফিরে বললেন,
-- তোর কোন মত আছে ? থাকলে বল।
-- তোমরা যেটা ভালো বুঝবে সেটাই করবে। তবে একটা কথা বলি। এই কয়েকমাস আগে বিজয়ের অনেকগুলো টাকা খরচ হল আবার নতুন করে বিয়ের তোড়জোড়ের থেকে, রেজিস্ট্রি ম্যারেজটাই ভালো। আমরা নাহয় বড় করে বৌভাতটা করে নেবো 
-- দেখ অনল খরচ নিয়ে ভাবিস না। আমার একটা মাত্র বোন। ওর সুখের জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।
 বিজয়ের কথা শুনে লিজা বললেন,
-- অনল ঠিক কথাই বলেছে। খামোখা আবার এককারী টাকা খরচ করে লাভ নেই। তোমরা একদম ভেবো না। অনলের মামা যা বলবেন আমার ননদ নন্দাই তাতে না করবেন না। আমরা রেজিস্ট্রি করেই ওকে বাড়ি নিয়ে যাবো।

ঘরের মধ্যে যেন এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এল। এতদিনের লুকোনো কথা, দোটানা, ভয়—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে।
সুস্মিতা এবার একটু গম্ভীর গলায় বললেন,
— তাহলে ঠিক রইল, রেজিস্ট্রি ম্যারেজ। তবে বৌভাতটা কিন্তু ধুমধাম করে হবে। আমাদের বৌমাকে আমি সবার সামনে গর্ব করে পরিচয় করাবো। 
আনন্দি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— আরে অবশ্যই! আমি কিন্তু নিজের হাতে বৌদিকে সাজাবো।
অনল মুচকি হেসে বলল,
— তুই সাজাবি? তাহলে তো আমার বউকে চিনতেই পারবো না!
— চুপ কর! — আনন্দি মুখ বেঁকিয়ে  বলল — এতদিন লুকিয়ে বিয়ে করে কাউকে বলে উঠতে পারিসনি , এখন আবার কথা বলার সাহস এসেছে! তোকে গুপগুপ করে ক'টা মারলেও রাগ শেষ হবে না।
ঘরের সবাই হেসে উঠল।
বিনীতা চুপচাপ বসে ছিল। তার চোখে জল, কিন্তু সেই জলে এবার কষ্ট নেই—আছে স্বস্তি, আছে নতুন জীবনের আলো। লিজা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— কাঁদছো কেন মা? সবকিছু তো এবার ঠিক হতে চলেছে। আর তো কান্নার কোন কারণ নেই।
— এটা আমার খুশির কান্না মামিমা… 
 বিনীতা ধীরে বলল — এত সহজে সব মিটে যাবে ভাবিনি। সব সময় ভেবেছি আমার জীবনটা নিয়ে বিধাতা এমন নিঠুর খেলা কেন খেললেন? আমি তো জ্ঞানত কোন অন্যায় করিনি। তবে এত কষ্ট ঈশ্বর আমার কপালে কেন লিখলেন?
বিজয় এগিয়ে এসে বোনের কাঁধে হাত রাখল,
— সবকিছু ঠিক সময়েই ঠিক হয় রে। সবকিছুর জন্য চাই সঠিক সময়। আমাদের শুধু একটাই চাওয়া
তুই খুশি থাক তোর জীবন আনন্দে ভরে উঠুক।
সুস্মিতা এবার বললেন,
— কাল সকালেই আমরা রেজিস্ট্রির দিন ঠিক করবো অফিসে একটা নোটিস পাঠাবো। এই কাজটা কালই বিজয় করবে। আমরা সকালে টিফিন করে বেরিয়ে যাবো। 
-- বিজয়, তুমি সেইভাবে গাড়ির ব্যবস্থা করবে।
-- না না তোরা দুপুরে খেয়ে বেরোবি
সুস্মিতা লিজার দিকে ফিরে কথাটা বললেন।
-- আসা খাওয়াদাওয়া এখন চলতেই থাকবে। তারপর বিনীতার দিকে ফিরে বললেন,
- তোমার ছুটি কতদিনের? ওটার উপরেই তো সবকিছু নির্ভর করছে।
-- আর এক সপ্তাহ।
-- তাহলে তো এবার কিছুই হবে না। তবে আশীর্বাদটা এই সাতদিনেই হবে।
-- তুই সবকিছু যে ঠিক করছিস অনলের মা,বাবার মতটা তো দরকার।
 সুস্মিতা লিজাকে এ কথা বলতেই লিজা হেসে পড়ে বললেন,
-- ওরে ভাইবোনের এমন সম্পর্ক কেউ কাউকে কোন কথা বললে আর একজন সে কথা না শুনে পারে না। ম্যানেজ তো করবে সব অনলের মামা। আমি তো উপলক্ষ্য মাত্র।
অনল একটু চিন্তিত গলায় বলল,
— .. কোনো সমস্যা হবে না তো?
লিজা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন,
— চিনিস না তোর মাকে? তোর মামা কিছু বললে তোর মা কোনদিন না শোনা করেছে সে কথা? তুই অনেক করেছিস এবার চুপ থাক। বিয়ে করে বৌ না নিয়েই বাড়ি চলে গেছে। গাধা একটা! মামাকে জানাতে পারিসনি ঘটনাটা? 
আনন্দি আবার মজা করে বলল,
— আচ্ছা মামী কোনদিন তোমার ভাগ্নের বুদ্ধি ছিল? ও তো সারাজীবনই -- না বাবা বলবো না। বললে আবার কান টানা খাবো।
সবাই আবার হেসে উঠল।
রাত অনেক হয়ে গেছে। কিন্তু কারোর চোখে আর ঘুম নেই। এতদিনের চাপা টেনশন কেটে গিয়ে যেন নতুন করে হালকা লাগছে।
বাইরে তখনো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক চলছে। গ্রামের নিস্তব্ধ রাতের মধ্যে একটা নতুন সম্পর্কের শুরু হলো—নিঃশব্দে, কিন্তু গভীরভাবে।
বিনীতা একবার অনলের দিকে তাকাল। অনলও তাকিয়ে আছে তার দিকেই। দু’জনে চোখে চোখে যেন অনেক কথা বলে গেলো।
-- কিরে দাদা, তুই কি এই রাতেই বৌদির সাথে একা একা একটু কথা বলতে চাস?
-- অনু, বড্ড ফাজিল হয়েছিস তুই। দাঁড়া বাড়ি চল দেখাবো তোকে মজা।
-- তুই কী আমায় মজা দেখাবি রে! মজা তো তোকে আমি দেখাবো। যতদিন না বৌদি আমাদের বাড়িতে যাচ্ছে তোকে ব্ল্যাকমেল করেই আমার জিনিসগুলো কিনে নেবো।
 সকলেই হেসে উঠলো আনন্দির কথা শুনে।
ধীরে ধীরে সবাই নিজেদের ঘরে ফিরে গেল।
 কিন্তু কারোরই সেদিন রাতে ভালো করে ঘুম হল না…

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment