ভালোবাসার নীল আকাশ পর্ব (২৭)
গাড়ি থেকে সবার আগেই অনল নেমে বিজয়কে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে,
-- চিন্তা করিস না। সবই ঈশ্বরের হাতে। এবার যা হবে সব ভালো হবে। তবে এখনো বাড়িতে কিছু বলে উঠতে পারিনি।
-- আমার তো কোন চিন্তা নেই রে অনল। আমি তো জানি আমি আমার বোনকে সুপাত্রের হাতেই দান করেছি।
আনন্দি এগিয়ে এসে বলে,
-- ও দাদা, বন্ধুকে তো জড়িয়েই আছিস। বুঝতে পারছি ওই অবস্থাতেই কোন গোপন আলোচনা চলছে।
অনল বন্ধুকে ছেড়ে দিয়ে আনন্দির দিকে চোখ বড় বড় করে বলে,
-- শুরু হয়ে গেলো তোর। গাড়ির ভিতর তো বেশ কিছুক্ষণ চুপ ছিলি।
তারপর বিজয়ের দিকে ফিরে বলে,
-- বিজয় এটা আমার বোন। একটু বেশি কথা বলে। সবাই বলে ওর মাথায় ছিট আছে। কিন্তু ও জানে একথা আমি কখনো ওকে বলিনি
-- দাদা, প্রচণ্ড বাড়াবাড়ি করছিস কিন্তু
অনল, বিজয় দু'জনেই হাসতে লাগে। বিজয়ের দিকে বিনীতা তাকিয়ে পড়লে বিজয় তাকে বলে,
-- মা কাল থেকে অপেক্ষা করে বসে আছেন। যা মাসিমনিকে মায়ের কাছে নিয়ে যা। বিনীতা মাসিমনি মানে অর্পণের মামী লিজার হাত ধরে মায়ের ঘরের দিকে এগোচ্ছে আর বিনীতার মা ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন।দু'জন দু'জনকে দেখেই জড়িয়ে ধরে প্রথমেই হাউমাউ করে কান্না। সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে।
আনন্দি মনেমনে ভাবে বন্ধুর সাথে বন্ধুর দেখা হলে মানুষ আনন্দে হাসে আর এ দেখছি এঁরা কান্নাকাটি করছে।বিনীতার দিকে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বলে,
-- আচ্ছা বিনীতা আগেকার দিনের মানুষেরা কি পুরোনো দিনের বন্ধুর সাথে অনেকদিন পর দেখা হলে কান্নাকাটি করত?
-- কান্না তো মানুষ দুটো কারণে করে। একটা হচ্ছে কষ্টে, আর একটা হচ্ছে অধিক আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে। এটা হচ্ছে দ্বিতীয়টা। আগেকার দিনের বন্ধুত্ব স্বার্থহীন নিখাত ছিল। আর আমাদের মত এত বন্ধুবান্ধব ছিল না। তাই ভালোবাসাটাও ছিল একদম খাঁটি।
বিনীতা পাশ থেকে বলল,
-- ওমা তোমরা কি দু'জনে শুধু কেঁদেই যাবে? আমিও তো কতদিন পর বাড়ি আসলাম। আমার দিকে একটু তাকাও । বন্ধুকে পেয়ে আমাদের সকলকেই তো ভুলে গেলে। তারমানে বুঝতে পারছি ছোটবেলায় তোমরা দু'জনেই দু'জনের বাবা মাকে কীভাবে জ্বালিয়েছ।
বিনীতার মা সুস্মিতা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে হাসতে লাগলেন।
---সত্যিই তাই মা। লিজাকে দেখে সবকিছু ভুলে বসে আছি। আয় তোরা ভিতরে আয় সবাই। অনল কোথায়?
আনন্দির কপালে ভাঁজ। সে বলল,
-- মাসিমনি তুমি আমার দাদাকে চিনতে আগে থাকতে?
সুস্মিতা বিনীতার দিকে তাকিয়ে ফিরে আনন্দিকে বললেন,
-- ওমা ওতো বিজয়ের বন্ধু। ওকে তো আগেও দেখেছি আমি।
-- ও আচ্ছা ওই বিয়ের দিন তাই না
বয়স্ক ব্যক্তি এই বাচাল মেয়েটির হাত থেকে মুক্তি পেতে চোখের ইশারায় মেয়েকে কিছু বলে বন্ধুর হাত ধরে ঘরে যাওয়ার সময় বলেন,
-- অনল বোধকরি বিজয়ের সাথে আছে। তুই আনন্দিকে তোর ঘরে নিয়ে গিয়ে সবাই ফ্রেস হয়ে খেতে আয়। বেলা অনেক হয়েছে।
অনল বিজয়কে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। সে এটাও বলে,
-- বিনীতা এবার কলকাতায় ট্রান্সফার হয়ে চলে আসবে বলেছে। এখন কিভাবে কী করবো বলে দে তো একটু।
-- আরে মোটেই যদি বলতে না পারিস এবার রেজিস্ট্রিটা করে নে। বাড়িতে বল ওকে বিয়ে করতে চাস।
-- বিনীতাকে মা বাবার খুব পছন্দ হয়েছে। সম্ভবত মা বিয়ের কথা বলতে আসবেন এখানে।
-- ব্যস তাহলে তো হয়েই গেলো। কোন চিন্তার আর কারণ নেই।
-- হ্যাঁ আমিও সেটাই ভাবছি।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর দুই বন্ধু মিলে গল্প শুরু করলেন সেই পুরোনো দিনের স্কুল কলেজ জীবনের। লিজা তার সুখী দাম্পত্যের গল্প করতে করতে একসময় চোখের কোণে জল এনে বলল,
-- সবই আছে আমার জীবনে। কিন্তু গর্ভে ধারণ করার কোন ক্ষমতা আমার ছিল না। তবে সন্তান আমার আছে। আমি তাদের আমার সম্পূর্ণটুকুন দিয়েই নিজ সন্তানের মত মানুষ করেছি। তারা যে যার জীবনে প্রতিষ্ঠিত।
-- আচ্ছা তোর একটা ছোটবোন ছিল না?
-- হ্যাঁ। কিন্তু আজ আর নেই রে!
-- সে কী? কী হয়েছিল?
-- ডেলিভারি হতে গিয়ে চিরতরে চলে গেলো। খুব ভালো বিয়ে হয়েছিল। সজল মানে ওর স্বামী খুব ভালো ছেলে ছিল। আমি তখন লন্ডন। যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। বাড়িতে সজলের মা একা। সজল ছিল ডাক্তার। ওরা আমায় সবকিছু জানালো। আমিও তখন মা ডাক শোনার জন্য মরিয়া। ছুটে এলাম একাই।দেবদূত তখন অফিসের কাজে ভীষন ব্যস্ত। আইনের সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে এখান থেকেই একজন বয়স্ক মহিলার সারাজীবনের দায়িত্ব নিয়ে বাচ্চাদু'টিকে নিয়ে লন্ডন চলে গেলাম। মহিলাকে সঙ্গে নিলাম এই কারণেই আমার একার পক্ষে ওদের দু'জনকে নিয়ে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না।
-- এখনো আছেন সেই ভদ্রমহিলা।
-- বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। পৃথিবীতে তার আপনার বলতে কেউ ছিল না। সজল যে হাসপাতালে ছিল সেই হাসপাতালেই উনি কাজ করতেন। বাড়ি ছিল কিন্তু তিনি বাড়িতে ফিরতেন না। চব্বিশ ঘন্টা তিনি হাসপাতালে রোগীদের সাথে সময় কাটাতেন। একা থাকতে মোটেই পছন্দ করতেন না। সজল অনেক করে তাকে বুঝিয়ে আমার সাথে পাঠিয়েছিল। আস্তে আস্তে উনিই যেন আমার মা হয়ে উঠেছিলেন। মানুষ যে কত ভালো হতে পারে তা উনাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। মা মারা যাওয়ার পর ওই ভদ্রমহিলার মত আমার খাওয়া,আমার বিশ্রাম কেউ এভাবে কোনদিন ভাবেনি। দেবদূত খুব ভালো মনের মানুষ। কিন্তু সবসময় তো সে অফিস, কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। সে যে আমার খেয়াল রাখতো না তা একেবারেই নয়। কিন্তু সরলাদি ছিল সাক্ষাৎ এক মাতৃমূর্তি। আমার সংসারটা ছিল যেন তার সংসার। সবকিছু ছিল তার নখদর্পণে।তিনি অসুস্থ হওয়ার পর আমি একা পেরে উঠতাম না বলে ওখানকার একজন মেইড রেখেছিলাম। ছেলেমেয়েরা তখন বড় হয়ে গেছে। সরলাদি যে আমার নিজের কেউ ছিল না তা আজও তারা জানে না মানুষটি এতই ভালো ছিল। সরলাদিকে হারিয়ে আমি আর একবার মাতৃহারা হয়েছি। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিয়েছি
কিছুক্ষণ চুপ করে লিজা যেন অতীতে সেই সরলাদিকে মনেমনে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রণাম করলো।
-- ভদ্রমহিলা প্রকৃতপক্ষেই ভালো মানুষ ছিলেন। তা তোর ছেলেমেয়েরা এসব জানে?
-- না তাদের কোনদিন বলিনি যে আমি তাদের জন্মদাত্রী নই। আর সরলাদিও আমাদের রক্তের কেউ ছিল না। ওরা জানতো উনি ওদের বাবার বিধবা বোন। কেউ নেই বলে আমাদের কাছে থাকেন।
-- খুব ভালো করেছিস। সজল কোনদিন ওদের দেখতে যায়নি?
-- সেখানেও এক দুঃখজনক ঘটনা আছে রে। মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে সজল হার্টঅ্যাটাক করে চলে যায়। তখনও ওর মা বেঁচে। কতটা দুঃখজনক বলতো?
আসলে কী জানিস মানুষের ভাগ্যের উপরে কারও হাত নেই। ঈশ্বরের লীলা বোঝা দায়। আমরা যাই করি না কেন ,যতই ঈশ্বরকে ডাকি না কেন, তাঁকে যতই দোষারোপ করি না কেন যা আমরা ভাগ্যে নিয়ে জন্মেছি তার থেকে কিছুতেই বেরোতে পারবো না।
অনেকক্ষণ বকবক করে নিজের কথাই বলে গেলাম। তোর কথা বল এবার
-- আমার আর কী কথা। সেই বিয়ের পর থেকেই সংগ্রাম করে চলেছি। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে বড় বউ হয়ে এলাম। মায়ের ইচ্ছা ছিল না এতবড় পরিবারে বিয়ে দেওয়ার। দুই দাদারও অমত ছিল। কিন্তু বাবা কারও কথাই শুনলেন না। আর বিজয়ের বাবার বাড়ির লোকজনও যেনতেন প্রকারে আমাকে সেবাড়ির বৌ করেই ছাড়বে তাদের এত পছন্দ আমাকে। আমারও ইচ্ছা ছিল না। আমি ভেবেছিলাম এম. এ. টা কমপ্লিট করে চাকরির চেষ্টা করবো নিজের পায়ে দাঁড়াবো।
-- তোর যা সুন্দর চেহারা ছিল পছন্দ তো তোকে যেকেউ করবে।
-- ওই চেহারায় কাল হল। বাবার ইচ্ছায় বিয়ে হয়ে গেলো। তখনও মনের মধ্যে সুপ্ত বাসনা চাকরি করবো। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বিজয় পেটে এলো।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment