ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫০)
দুপুরে খেয়ে অর্পণ নিজের ঘরে বিশ্রাম নিতে চলে গেলো। অর্পিতা আর ময়ূর একই ঘরে। চারটে বাজতেই ময়ূর উঠে দাঁড়ালো -
-- আমি এখন বেরিয়ে পড়ি?
-- ওমা কেন? দাদা তো বলল তোকে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে আসবে
-- এতদিন ধরে তোদের বাড়িতে যাতায়াত করছি। হঠাৎ আজ তোর কী হল যে অর্পণদাকে বললি আমায় কিছুটা পৌঁছে দিতে ?
-- তুই কি ভাবিস আমি তোর মনের কথা টের পাইনি?
-- আমার মনের কথা নাহয় বুঝেছিস? তোর দাদার মনের কথাটা বুঝতে পারিসনি।
-- দাদা কী বলেছে তোকে?
-- এখন ছাড় এসব। আমি যাই
-- দাদার সাথে যাবি না
-- না
- কথা বলে মিটিয়ে নিতে পারতিস
-- মিটিয়ে নেওয়ার কিছু নেই। আমি তো বাচ্চা মেয়ে রাতারাতি তোর দাদার সমবয়সী হয়ে উঠতে পারবো না
অর্পিতা হাসতে হাসতে বলে,
-- এইটা বলেছে ?
-- তোর হাসি পাচ্ছে এই কথা শুনে?
-- পাবে না? কলেজ শেষ করা মেয়েকে বলছে বাচ্চা মেয়ে! ওত তবে দাদুর বয়সী। তবে দাদার চোখে তোর জন্য আমি ভালোবাসা দেখেছি।
-- সে তুই যা দেখেছিস, - দেখেছিস। আমি এবার বাড়ি যাই।
-- না যাবি না, আমি দাদাকে ঘুম থেকে তুলে দিচ্ছি
-- কেন ঝামেলা করছিস বলতো?
-- ঝামেলা তো অর্পি করছে না, ঝামেলা তো তুমি করছো। কথা তো আগেই হয়ে গেছে আমি তোমায় বাইকে কিছুটা রাস্তা ছেড়ে আসবো -
বলতে বলতে অর্পণ যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে অর্পিতার ঘরে ঢুকলো।
-- বাব্বা! এবার আমি যাই
বলেই একছুটে অর্পিতা বেরিয়ে গেলো
-- পুচকি একটা মেয়ে এত জেদ কেন? এই রোদের মধ্যে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কারণ আমার সাথে যাবে না।
-- যখন তখন এই পুচকি মেয়ে পুচকি মেয়ে বলবে নাতো?
-- বোকা কোথাকার -
অর্পণ এগিয়ে আসে ময়ূরের দিকে। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে অর্পিতা যাওয়ার সময় দরজা চেপে ভেজিয়ে দিয়ে গেছে। ময়ূর ঠাঁই দাঁড়িয়ে - অর্পণ এসে একদম ময়ূরের সামনে দাঁড়ায় এমনভাবে নিশ্বাস ছাড়লেও তার গায়ে হওয়া লাগবে।
-- বোকা মেয়ে! মুখেই সবকিছু বলে বোঝাতে হয়। বুঝতে পারছো না তোমার একটু সান্নিধ্য পেতে কালকে কতটা সময় গাড়ি চালিয়েছি, তোমাকে বাইকে করে নিয়ে যাবো বলে সপ্তাহের একটা ছুটির দিনে দুপুরে বিশ্রাম না নিয়েই কেন রেডি হয়ে গেছি? কারণ আমি জানি আমাকে কষ্ট দিতে নিজেই রোদের মধ্যে বেরিয়ে যাবে। কালকে গাড়ির মধ্যে আমার আচরণ, কথাবার্তায় কোনকিছুই বুঝতে পারোনি?
অর্পণ ময়ূরের মুখটা তুলে ধরে। ময়ূর চোখ বন্ধ করে নেয়। অর্পণের আঙুলের স্পর্শে ময়ূরের শরীরটা কেঁপে উঠল। চোখ দুটো বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে রইল সে, যেন এই মুহূর্তটা থেমে থাকুক আর কিছুক্ষণ।
অর্পণ একটু ঝুঁকে এসে নরম গলায় বলল,
-- এত কিছু বোঝো আর এটা বুঝতে পারোনি? না কি ইচ্ছে করে আমাকে কষ্ট দিতে এড়িয়ে যাচ্ছ?
ময়ূরের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন বাইরে পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কথা বেরোচ্ছে না। তার এই নিরবতাই যেন অর্পণকে আরও রোমান্টিক করে তুলছে।
--আমি তো কোনদিন স্বপ্নেও কল্পনা করিনি ময়ূর, আমার ভিতরে তোমার প্রতি ভালোবাসা জমা হচ্ছে, কোনদিন তোমায় সেই দৃষ্টিতে আমি দেখিনি। কিন্তু কী জানো যা ঘটবে তা ঘটবেই। আমি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছি। তোমার ভালোবাসা আমায় দুর্বল করে দিয়েছে।
অর্পণের গলায় চাপা স্বীকারোক্তি, কিন্তু তুমি, তুমি কি একবারও অনুভব করোনি?
ময়ূর ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চোখ ভরা জল, কিন্তু সেই জলের মধ্যেও একরাশ অভিমান আর লুকোনো সুখ। মুখে দুষ্টু হাসি
--- করেছি এবং সেটা গতকালই।
খুব আস্তে বলল সে
-- কিন্তু তোমার মুখে না শুনলে মন যেমন ভরছিল না ঠিক তেমনই বিশ্বাস করতেও ভয় হচ্ছিল
এক মুহূর্ত থেমে অর্পণ যেন নিজের ভেতরের সব দ্বিধা ভেঙে ফেলল।
-- তাহলে শোনো আমি তোমাকে ভালোবাসি, ময়ূর। ভীষন ভালোবাসি যতটা মুখে বলছি হয়ত তার চেয়েও অনেকটা বেশি।যতটা বলা যায় তার থেকেও বেশি।
কথাগুলো শোনামাত্র ময়ূরের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। এতদিনের জমে থাকা অপেক্ষা, অভিমান, না বলা অনুভূতি-সব যেন একসাথে ভেঙে পড়ল।
সে কিছু বলল না। শুধু ধীরে ধীরে মাথাটা অর্পণের বুকে ঠেকিয়ে দিল।
অর্পণ এক মুহূর্ত অবাক হয়ে থাকলেও পরের মুহূর্তেই খুব আস্তে ওকে জড়িয়ে নিল, যেন কোনো ভঙ্গুর জিনিসকে আগলে রাখছে।
বাইরে হয়তো পৃথিবী আগের মতোই চলেছে কিন্তু এই সময়টা ওরা চাইছে থমকে যাক।
ময়ূরের মাথাটা এখনও অর্পণের বুকে ঠেকানো। অর্পণের হাতটা ধীরে ধীরে ওর পিঠে নেমে এলো, খুব আলতো, খুব যত্নে, যেন স্পর্শ করতেও ভয় পাচ্ছে।
ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা। শুধু দু'জনের দ্রুত শ্বাসের শব্দ।
অর্পণ আস্তে করে বলল,
--চেষ্টা করেছি এতদিন নিজেকে আটকেছি, সেই ঘটনার পর স্থির করেই নিয়েছিলাম আর কাউকে নিজের জীবনে জড়াবো না। সারাটা জীবন একাই থাকবো। কিন্তু এই পাগলিটা আমায় একা থাকতে দিলো না
ময়ূর বুকে মাথা রেখেই বলল,কিন্তু মুখ তুলল না।
-- তাহলে তো আমি কষ্ট পেতাম
-- এই যে এই পুচকি মেয়েটার কাছে যে আমি হেরে যাবো এটা তো কল্পনাও করিনি। যত একে এভয়েড করতে চেয়েছি ততই জড়িয়ে গেছি। না দেখতে পেয়ে কষ্ট পেয়েছি কিন্তু মুখে স্বীকার করিনি পুচকিটার কাছে। পুচকিটাকে একটু ধরতে চেয়েছি, একটু কাছে বসতে চেয়েছি কিন্তু নিজেকে কঠিন করে রেখেছি -
অর্পণ হাসতে থাকে
ময়ূর এবার মুখ তুলে তাকাল। চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে হালকা হাসি—
--আর এখন?
অর্পণ একটু ঝুঁকে এলো, ওদের মাঝে দূরত্বটা প্রায় নেই বললেই চলে।
-- এখন এই যে আমার পুচকিটা আমার বুকে মুখ লুকিয়ে আছে সারাজীবন যেন এইভাবেই ভালোবাসায়, লজ্জায় আমার বুকেই মুখ লুকিয়ে থাকে।
কথা শেষ হওয়ার আগেই ময়ূরের নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। অর্পণের আঙুলগুলো ওর গালের পাশ দিয়ে চুল সরিয়ে দিল। সেই স্পর্শে ময়ূর চোখ বন্ধ করে ফেলল আবার।
অর্পণ খুব ধীরে, যেন সময়টাকে থামিয়ে দিতে চাইছে, ময়ূরের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
একটা দীর্ঘ, নরম স্পর্শ।
ময়ূরের শরীর কেঁপে উঠল। দুহাত দিয়ে অর্পণের শার্টটা শক্ত করে ধরে ফেলল সে।
-- এত রাগ করবে না আমার উপর। ভালোবেসে ফেলেছি হঠাৎ করেই তোমায়। আমাকেও তো একটু সময় দিতে হবে নিজেকে বোঝার।অর্পণের গলায় অভিমানের সুর
ময়ূর খুব আস্তে বলল,
-- রাগ তো করিনি খুব অভিমান হয়েছিল।এতদিন স্বীকার করছিলে না কেন? শুধু কি বয়সটাই বাধা দিচ্ছিল? নাকি অন্যকিছু?
অর্পণ হালকা হেসে ওর কপালে আবার ওর ঠোঁট ছুঁয়ে দিল—
-- নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করছিলাম। নিজেকে বোঝার চেষ্টা করছিলাম। পুচকিটাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম এত বয়সের পার্থক্যে আমায় বিয়ে করে সে কি সুখী হতে পারবে?
ময়ূর এবার হালকা করে ওর বুকে মুঠো মেরে বলল,
— তারপর কখন সব ঠিক হল?
অর্পণ একটু মজা করে বলল,
— পুচকিটাকে না দেখতে পেয়ে নিজেই অস্থির হয়ে উঠছিলাম। আজ না আসলে রাতেই ফোন করে খুব বকা দিতাম।
তারপর ময়ূরের চিবুক ধরে মুখটা একটু তুলে
বলল,
-- এই মুখটা না দেখে কি থাকা যায় বলো?
ময়ূরের গাল লাল হয়ে উঠল। সে চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-- তাহলে বুঝতে পারছো আমি কতদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছি
অর্পণ এবার ওর থুতনিটা আলতো করে তুলে দিল। দুজনের চোখ একসাথে আটকে গেল। মুহূর্তটা আরও গভীর হয়ে উঠল, নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে। কতক্ষণ এভাবে দু'জনে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে ছিল হয়ত নিজেরাই জানে না।
বাইরে হাওয়াটা যেন জানালার পর্দা নাড়িয়ে গেল…
আর ভিতরে দু'জনেই আলিঙ্গন বদ্ধ।
অর্পিতা অনেকক্ষণ নিজের ঘরে মোবাইলটা নিয়ে খুটখাট করছিল। আর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারলো না। সে এসে দরজায় নক করলো --।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment