Friday, May 1, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ ( ১৮ পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব আঠারো)

  তপেশ পায়ের আওয়াজ পায়; ভাবে নলিনী এসেছে। খুব খুশি সহকারে পিছন না ফিরেই বলে,
-- আমি জানতাম তুমি আসবে
 খিলখিল হাসির আওয়াজে চমকে তাকিয়ে দেখে ময়ূর দাঁড়ানো। ভীষন লজ্জা পেয়ে যায়। সেটা বুঝতে পেরেই ময়ূর বলে ওঠে,
-- এই যে মশাই আপনি এঘরে নলিনীর জন্য বসে আছেন আর নলিনী তার ঘরে আপনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে।
-- বুঝলাম না
-- আর বুঝতে হবে না। এটা পরে নিন
-- কী এটা?
-- আমি চললাম আর নিজেই খুলে দেখুন ওটা কী?
 ময়ূর ছুটে বেরিয়ে গেলো। তপেশ ব্যাগটা খুলে দেখে তার ভিতর বিয়ের পাঞ্জাবীটা। ওর বুঝতে বাকি রইলো না কী হতে চলেছে। লজ্জা তো করছেই একটু বোকা বোকাও লাগছে। এই এতগুলো বছর বাদে বিয়ের পাঞ্জাবিটা ঠিক সেই আগের মতোই আছে। বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবিটা পরে নিজেকে একটু দেখে নিলো তপেশ। পুরুষেরও যে লজ্জা করে সেটা সে আজ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তবে সেটা প্রকাশ পেলে তো চলবে না। তাহলে আবার হ্যাংলা পুরুষ নাম হয়ে যাবে। 
 নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে নলিনীর ঘরের দিকে রওনা দেয়। নলিনীর দরজাটা হালকা করে ভেজানো। তপেশকে আসতে দেখে  নলিনীর ঘরে পৌঁছানোর একটু আগেই অর্পিতা আর ময়ূর বেরিয়ে চলে যায়। হালকা করে দরজা ভেজানো ছিল। তপেশ দরজা মৃদু ধাক্কা দিয়ে খুলে ভিতরে ঢোকে। নাইট ল্যাম্পের আলোতে দেখতে পায় নলিনী ফুল দিয়ে সাজানো খাটে বসে আছে। তপেশ ঘরে ঢুকে প্রথমে দরজায় ছিটকানি তুলে দেয়। পরে বড় লাইটটা জ্বালায়। লাইটটা জ্বালানোর সাথে সাথে নলিনীর বুকটা কেঁপে ওঠে। সে আরও জড়োসড়ো হয়ে পড়ে। তপেশ এসে নলিনীর কাছে বসে। 
-- সেদিনের রাতটা আমাদের দু'জনের কাছেই একটা অভিশাপ মনে হয়েছিল। কিন্তু দেখো ঈশ্বরের কী লীলা তিনি কিন্তু সেই একইভাবে সেই রাতটাকেই আমাদের জীবনে ফিরিয়ে দিলেন আশীর্বাদের হাত তুলে।
 নলিনী কথার উত্তর দেবে কী? সেতো সব কথা ভুলে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। তপেশ নলিনীর হাত ধরে। 
-- একি তোমার হাত এত কাঁপছে কেন? আরে বাবা আমি বাঘ ভালুক তো নই। এত কেন ভয় পাচ্ছ?
  তপেশের কথায় নলিনী একটু মুখ তুলে তাকায়, কিন্তু চোখ দুটোতে লজ্জা আর অজানা এক ভয় মিশে আছে।
-- ভয় পাচ্ছি না... শুধু... সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে, খুব দ্রুত সব বদলে গেল।
তপেশ হালকা হেসে বলে, -- বদল তো আসবেই নলিনী। এতদিন আমরা দূরে ছিলাম, আজ আবার একসাথে বসে আছি—এটাই তো বড় কথা। নিজেকে দাঁড় করিয়ে তোমার বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনাকে সচল করতেই একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম হয়ত সেই মুহূর্তে সেই ব্যবস্থাটা আপাতদৃষ্টিতে খারাপ মনে হলেও একদিন বাবা আর তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে আমার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব। তবে কী জানো একটা অদ্ভুত ব্যাপার - আমি কিন্তু বিয়েরদিন তোমার মুখটাও ভালো করে দেখিনি। কিন্তু আমার মনের মধ্যে সেই না দেখা মুখটা সবসময় ঘোরাফেরা করতো আর আস্তে আস্তে ওই না দেখা মেয়েটাকেই আমি ভালোবেসে ফেলেছি।
নলিনী ধীরে ধীরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। হাতটা এখনও তপেশের হাতের মধ্যে ধরা। সে একটু ইতস্তত করে বলে, 
-- এত বছর পর... তুমি কিন্তু একটুও বদলাওনি। তবে সেদিন আমিও তোমায় খুব ভালো করে দেখিনি। তবে তারপরে যতবার বাড়িতে এসেছো সামনে থেকে না দেখলেও দূর থেকেই দেখেছি।
 তপেশ হেসে বলে,
-- ওই ব্যালকনি থেকে তো
নলিনী হেসে দেয়।
-- তুমিও সেটা দেখেছো?
-- নিজের বউকে লুকিয়ে দেখার মজাই যে আলাদা এটা বুঝতে অনেক সময় চলে গেছে। আর বদলানোর কথা বলছিলে না হ্যাঁ বদলেছি। অনেকটাই বদলেছি। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি... 
-- কী?
-- তোমার জন্য যে অনুভূতিটা ছিল, সেটা কোথাও চাপা পড়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু কোনদিন কোনসময় এক সেকেন্ডের জন্যও হারিয়ে যায়নি। বরং দিনকে দিন বেড়েছে। বাড়িতে তারপর যতদিন এসেছি তোমার সাথে একটু কথা বলার জন্য, একটু পাশে বসে ঠিক এইভাবে হাতের ভিতর হাতটা রেখে গল্প করার জন্য আকুপাকু করেছি। কিন্তু সাহস পাইনি। যখনই ইচ্ছাটা প্রবল হয়েছে ঠিক তখনই চীনের প্রাচীরের মত একটা বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই রাতটা।

 নলিনী চুপ করে যায়। তার বুকের ভিতরটা যেন ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। সে একটু সাহস করে বলে, 
-- আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আমাকে ভুলেই গেছো...
-- ভুলে যাওয়া এত সহজ নাকি? কিছু সম্পর্ক সময়ের সাথে সাথে দূরে যায় ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর থেকে মুছে যায় না। বিয়ের মন্ত্রগুলোর মধ্যে কোন জাদু আছে জানো? একবার ওই মন্ত্র শোনার পর সেই অদেখা,অচেনা সঙ্গিকে কোনদিন কোন অবস্থাতেই ভুলে যাওয়া যায় না। বরং দিনকে দিন ভালোবাসায় জড়িয়ে যেতে হয়। তুমি ভুলতে পেরেছো এক মুহূর্তের জন্যও?
নলিনী এবার একটু হেসে ফেলে। সেই হাসিতে লজ্জা আছে, আবার স্বস্তিও আছে।
-- যা ঘটবে বিধাতা যা ঠিক করে রেখেছেন তা ঘটবেই। হয়ত একটু আগে নয়ত কিছু পরে। শুরু তো যেকোন সময়ই করা যায়। কী তাই না? 
তপেশ নরম গলায় বলে,
 -- কেন নয়? আমরা চাইলে আজ থেকেই সব নতুন করে আমাদের জীবন উপন্যাস লিখতে পারি।

  ঘরের নরম আলোয় দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। বাইরে হালকা বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে। সেই নিঃশব্দ মুহূর্তে যেন তাদের মধ্যে জমে থাকা বেশ কয়েক বছরের দূরত্ব ধীরে ধীরে গলে যেতে থাকে।
তপেশ আস্তে করে বলে, 
-- এতদিনের না বলা কথাগুলো... আজ বলবে?
নলিনী একটু হেসে মাথা নাড়ে,
 -- সব একদিনে বলা যায় নাকি? সময় লাগবে...
-- আমার তো আর কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। এবার একসাথে একজায়গায় থেকেই সব কাজ করবো। তোমার পড়াশুনা আর আমার চাকরি একই সাথে চলবে। বাবা সেদিন বলছিলেন এখন বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতে। আমি তো সেই মুহূর্তে বাবাকে কিছু বলতে পারিনি কিন্তু ঠিক করেই রেখেছিলাম তুমি রাজি থাকলে তাই করবো।
নলিনী হেসে দেয়। অনেক কথা জমে আছে ক'বছরে-
-- আমি তো সেই সব কথাই শুনতে চাই। 
নলিনী এবার পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সে তপেশের দিকে তাকিয়ে বলে, 
-- তাহলে ধীরে ধীরে বলবো.. না চেনা, না জানা মানুষটা আমায় ছেড়ে চলে গেলেও দিনে দিনে সে যে কীভাবে আমার সমস্ত অন্তর জুড়ে বসেছিল সেসব কথা না বললে তুমি কীভাবে বুঝবে আমি তোমায় কতটা ভালোবেসেছি?

তপেশ নলিনীকে বুকের সাথে চেপে ধরে তার চিবুক তুলে আদুরে গলায় গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
 -- শুনবো গো যতদিন লাগুক, আমি শুনবো।
ঘরের নীরবতা যেন আর ভারী লাগে না। বরং নতুন শুরুর এক মিষ্টি আবহ তৈরি হয়—যেখানে অতীতের কষ্টগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে নতুন বিশ্বাস, নতুন ভালোবাসা।
 তপেশ উঠে গিয়ে বড় লাইটটা অফ করে নাইট ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিয়ে আসে। বিয়ের পাঞ্জাবিটা খুলে নলিনীর আলনায় ঝুলিয়ে দেয়। সেদিকে তাকিয়ে নলিনীর বুকটা ধকধক করতে থাকে। দু'টি  শরীরের মিলনের সন্ধিক্ষণে দু'জনেই মাতাল হয়ে ওঠে। এতোদিনের সব দূরত্ব, অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লজ্জা সরিয়ে কখন যে তারা দু'জনে এক হয়ে গেছে তা তারা বোধকরি নিজেরাও বুঝতে পারেনি। এত লজ্জা, এতোদিনের এত সংযম এক নিমেষে কোথায় যেন উড়ে গেছে। 
 বাইরে পাখির ডাকে তাদের সম্বিৎ ফিরেছে। নলিনী লজ্জায় তখন লাল। নিজেকে তপেশের বুকের উপর আবিষ্কার করে যেই উঠতে গেছে তপেশ জোর করে আবার তাকে বুকের সাথে চেপে ধরে নলিনীর মুখটা নিজের মুখের কাছে টেনে নিয়ে ঠোঁটটা আলতো কামড়ে দিয়ে বলে,
-- সুযোগ পেলেই কিন্তু অসময়ে, অসময়ে এটা আমি করবই।
 নলিনী দুইহাতে তপেশকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে,
-- এই তুমি তো খুব দুষ্টু
তপেশ হো হো করে হাসতে হাসতে বলে,
-- এই তো সবে শুরু। তোমায় বলেছি না আমাদের ফুলশয্যার রাতটাকে প্রতি রাতে আমরা ইচ্ছে করলেই ফিরিয়ে আনতে পারি।
নলিনী আবারও তপেশকে দুই হাতে সরিয়ে দিয়ে বলে,
-- সত্যিই তুমি খুব দুষ্টু

ক্রমশ