ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৬)
গাড়ি ছুটে চললো।কলকাতার ব্যস্ততা ছেড়ে চার চাকা (গাড়ি) নিয়ে একটু গ্রামের দিকে বেরিয়ে পড়ার অনুভূতিটাই আলাদা—ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল মিলিয়ে যায়, আর সামনে খুলে যায় শান্ত, সবুজ এক পৃথিবী
ভোরের শহর তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। রাস্তায় তুলনামূলক কম গাড়ি, হাওয়ায় একটু ঠান্ডা ভাব। বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে শহর ছাড়তে শুরু হল—হুগলি নদীর ওপর দিয়ে যেতে যেতে মনটাই হালকা হয়ে গেলো ওদের। শহর থেকে শহরতলি
ধীরে ধীরে উঁচু বাড়ি কমে আসে, বদলে যায় দৃশ্য। দোকানপাট, ছোট বাজার, রাস্তার ধারে চায়ের দোকান—এইসব দেখতে দেখতে গাড়ি এগোতে থাকো। মুগ্ধ হয়ে ওরা তাকিয়ে থাকে সেইসব দৃশ্য অবলোকন করতে করতে। কিন্তু অনল এবং বিনীতা সকলের মাঝেও দু'জনেই যেন বারবার চোখের ইশারায় কথা বলে চলেছে। আনন্দির চোখে বেশ কয়েকবার ধরা পড়ে গেছে তারা। অনল সামনের সিটে আর ওরা তিনজন পিছনের সিটে। অনল এমনভাবে মোবাইলটা রেখেছে মোবাইলের কাঁচের ভিতর দিয়ে সে অবিরত বিনীতাকে দেখে চলেছে। একবার আনন্দি বিনীতার কানে কানে বলেও দিয়েছে
-- কুছ কুছ হোতা হ্যায়
-- কী যা তাই বলছো। তুমি বড্ড দুষ্টু
-- সেটা আমি জানি। কিন্তু তুমি জানো না আমার থেকেও আমার দাদা ভীষন দুষ্টু।
বিনীতা একটু লজ্জা পেয়ে গেলো। কিন্তু আস্তে আস্তে আনন্দির কানে কানে বলল
-- এরকম কিছু হলে তোমার আপত্তি নেই তো
আনন্দি চোখ বড় বড় করে মামী শুনতে না পায় সেইভাবে বিনীতার কানের কাছে মুখ নিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
-- একদম না,একদম না। বাড়ির সকলেই তোমাকে খুব পছন্দ করেছেন। শুনলে না মা তো বলেই দিলেন ,তোমার মা মানে মাসিমার সাথে দেখা করতে মা খুব তাড়াতাড়িই আসবেন।
হঠাৎ করে গাড়িটা ব্রেক নিয়ে একটা ছোট ইট বিছানো রাস্তায় ঢুকে পড়ল।
সেটা দেখে অনল বলল,
-- এই রাস্তাটা ধরলেন কেন? আমরা তো বড় রাস্তা ধরেই এগোতে পারতাম।
-- আসলে দাদা এটা দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি হবে আর দু'পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে গেলে আপনাদেরও ভালো লাগবে।
একথা শুনে অনল আর কোন কথা বলল না।
গ্রামের পথে গাড়ি এগোতে লাগলো
আর একটু এগোলেই আসল সৌন্দর্য—
দুই ধারে সবুজ ধানক্ষেত
মাঝেমধ্যে পুকুর, তাতে ভেসে আছে শাপলা
গাছের ছায়ায় কাঁচা রাস্তা
মাঠে কাজ করছে কৃষক
দূরে মাটির বাড়ি, উঠোনে শুকোচ্ছে ধান
হালকা বাতাসে কাদামাটির গন্ধ—যেটা শহরে কখনও পাওয়া যায় না।
রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকান দেখতে পেয়ে আনন্দি চেঁচিয়ে উঠলো
— দাদা এখানে চা খাবো আর কিছু ছবি তুলবো।
ড্রাইভারকে বলাতে সে বলল,
একদম দোকানের সামনে তো দাঁড়ানো যাবে না। জায়গা নেই। গাড়িটা একটু এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে হবে। আবার আপনাদের এই পথটা হেঁটে আসতে হবে। তাতেই সবাই রাজি।
গাড়ি থেকে নেমে সকলে আবার এগিয়ে চলল ওই দোকানটার দিকে। সবাই গিয়ে বাঁশের তৈরি করা বেঞ্চে বসলো। আনন্দি ঠিক ক্যামেরায় অনল আর বিনীতাকে একই ফ্রেমে নিয়ে বিনীতার সামনে ছবিটা ধরে বলল
-- একদম পারফেক্ট। বেশ মানাবে।
বিনীতা হাসতে লাগলো। এই অবস্থায় কোন মেয়ের যে রাগ হয় সেটা বিনীতার মধ্যে বিন্দুমাত্র না দেখতে পেয়ে আনন্দি বিনীতার হাত ধরে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো,
-- সত্যি করে একটা কথা বলবে?
-- বলো
-- তুমি দাদাকে আগেই চিনতে না? দাদার সাথে তোমার কতদিনের আলাপ?
বিনীতা লজ্জা পেলো না,ভয় পেলো না। খুব ধীরে এবং আস্তে করে বলল
-- তোমার দাদার সাথে আমার জীবনের একটা ঘটনা হঠাৎ করেই ঘটে গেছে কয়েকমাস আগে। আমাদের বাড়ির লোক ছাড়া আর কেউ জানে না।
-- কী ঘটনা? আমায় বলা যাবে?
-- যদি তোমায় বলা না যেত তাহলে এইটুকুই কী বলতাম গো? তবে অনেক বড় ঘটনা। এখন বলতে শুরু করলে শেষ করতে পারবো না। বাড়ি গিয়ে সময় মত সব বলবো তোমায়। বাকিটা তুমি ম্যানেজ কোরো। তবে একটা অনুরোধ করবো আজ রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে যেও।
-- আচ্ছা দাদা যে বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেছিলো তুমি সেই বন্ধুর বোন তাই না? তোমার বিয়েতেই গেছিলো?
-- হ্যাঁ কিন্তু সেই বিয়েটা --
কথা শেষ হয় না অনল ডাক দেয় চা রেডি তাড়াতাড়ি আয়
-- বলেছিলাম না এখন শুরু করলে শেষ হবে না। তবে তুমি খুব ইন্টেলিজেন্ট। বাকিটা বুঝে নাও। বাড়ি গিয়ে তোমায় পুরো ঘটনাটা জানাবো।
মাটির ভাঁড়ে চা। আনন্দি খুব খুশি। কিন্তু একটু উদাসীন হয়ে গেছে। বিষয়টা খাপছাড়া শুনে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। চা খেতে খেতে সে বারবার লক্ষ্য করছে বিনীতা আর তার দাদার কার্যকলাপ।
গ্রামের লোকজনের সরল হাসি, সহজ কথা, গায়ে পড়ে তাদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া এইসব দেখে এবং শুনে এতকিছুর পরেও আনন্দির—মনটা একদম ফ্রেশ হয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও যেন একটা কাঁটা খচখচ করে বিঁধে যাচ্ছে।
তার মনে পড়ছে বিয়েবাড়ি থেকে আসার পর থেকেই দাদা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছিল। বিয়েবাড়ির গল্প শুনতে চাইলে সময়মত বলবে বলেছিল। তারপর বিষয়টা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। কী এমন ঘটেছিল সেদিন বিয়েবাড়িতে যার ফলে দাদা সেখান থেকে ফিরে একদম শান্ত হয়ে গেছিল। সেই বিয়েটা হয়নি বলছে বিনীতা। কেন হয়নি? আর বিয়েটা না হওয়ার পর যেহেতু দাদা সেই বিয়েতে গেছিলো সেই সূত্র ধরে দাদার সাথে বিনীতার পরিচয়। মাথার ভিতর নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু এখনই জানার কোন উপায় নেই। কারণ পাশেই মামী বসে যাচ্ছেন।
চা খাওয়া শেষ করে ওরা পুণরায় গাড়িতে উঠে বসে। কিন্তু এবার আনন্দি বেশ চুপচাপ। তার মাথার ভিতরে নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
অনল পিছন ফিরে আনন্দিকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বেশ জোরে বলে,
-- কিরে পাগলী? হঠাৎ চুপ হয়ে গেলি কেন? তোকে ঠিক এই চুপচাপ বসে থাকাটা মানায় নারে।
-- গভীর চিন্তায় আছি রে দাদা।
-- আনন্দির বলার ধরনে সকলেই হেসে দিলো
-- কী এমন গভীর চিন্তা করছিস তুই
মামী তার কাছে জানতে চাইলো।
-- অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করছি মামী। ঠিক মেলাতে পারছি না।
-- বেশি চেষ্টা করো না । চুপচাপ ভেবে যাও ঠিক সময় মত আমি নিজেই মিলিয়ে দেবো এই অঙ্ক।
বিনীতা খুব আস্তে করে কথাগুলো বললো আনন্দিকে
-- বিষয়টা খুব জটিল। আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল। দাদার ছবি দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা, দাদা আসার সাথে সাথেই নিজেকে আয়নায় দাঁড়িয়ে একটু গুছিয়ে নেওয়া। সর্বোপরি যে মেয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে দাদার একটা কথাতেই থাকতে রাজি হয়ে যাওয়া - সবই আমার কাছে সন্দেহজনক ছিল।
-- বাব্বা! এ মেয়ের তো সাংঘাতিক বুদ্ধি দেখছি। এ তো ভেবে ভেবে আমি বলার আগেই জাল ছিঁড়ে ফেলবে।
-- সেই থেকে আমি শুনছি তোরা দু'জনেই চুপিচুপি কিছু আলোচনা করেই চলেছিস। কোন পার্টি তোদের
অনল ঘাড় ঘুরিয়ে আনন্দির দিকে ফিরে জানতে চাইলো।
-- পার্টি পারিবারিক দাদা। কোন রঙ নেই।তবে ব্যাপারটা সিরিয়াস। তুই এত ভাবিস না। ম্যায় হুঁ না
-- তোকে কে বলল আমি কোন বিষয় নিয়ে ভাবছি
-- ভাবছিস ভাবছিস। কিন্তু প্রকাশ করছিস না
-- সে কী রে তুই তো অন্তর্যামী হয়ে গেলি রে -
এই প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে আনন্দি বলল
-- আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ দাদা?
বিনীতা উত্তর দেওয়ার আগেই অনল বলল,
-- আর বেশি দেরি নেই। এই এসে গেছি
-- তুই কীভাবে জানলি?
-- ওমা জানবো না কেন এখানে তো আমার বন্ধুর বাড়ি।
-- কিন্তু তুই তো সেই বন্ধুর বাড়িতে কোনদিন আসিসনি।
এমনভাবে আনন্দি কথাটা বলে গম্ভীর স্বরে অনল ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আনন্দির দিকে আর একবার বিনীতার দিকে তাকিয়ে চুপ করে যায় কারণ সামনেই দেখতে পায় বাড়ির গেটের কাছে বিজয় দাঁড়িয়ে।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment