ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ১৯)
সকালে টিফিন করেই ময়ূর আর অর্পিতা বেরিয়ে যাবে। গতরাতের ঘটনা মোটামুটি যেটুকু নলিনী ওদের জানিয়েছে তাতেই ওরা বুঝে গেছে ওদের আর কোন সমস্যা নেই। তপেশ ওদের পৌঁছে দিতে যাবে। সে রেডি হয়ে আসতেই অর্পিতা বলে,
-- আচ্ছা তপেশদা এই গ্রামের থেকে আমাদের বাড়িটা বেশিদূর মনেহয় না জানো?
-- তোমাদের গ্রামের নাম কী?
-- ওই তো সোনাডাঙ্গা স্টেশনে নেমে বাসে বা রিকশায় বালিয়াডাঙ্গা।
-- আরে না না বেশি দূর নয়। ভিতর থেকে রাস্তা আছে। তবে সেটা কাঁচা রাস্তা । হেঁটে যেতে হয়। তোমরা ঠিক পারবে না। তারউপর একটা বাঁশের সাঁকো আছে। ছেলেবেলায় ওই সাঁকোতে উঠবো বলে কতবার ওই গ্রামে গেছি। সাঁকোর উপর থেকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। তারপর সাঁতার কেটে পাড়ে উঠতাম। ভিজে প্যান্ট পরেই চলতো দৌরাত্ম।
কথাগুলো বলেই সে হাসতে লাগলো
- সত্যি ছেলেবেলার দিনগুলো কী যে মজার ছিল। আচ্ছা তুমি ওই গ্রামের কথা জানতে চাইলে কেন?
-- ওখানেই তো আমাদের বাড়ি। ময়ূর অবশ্য শহরে থাকে।
-- ওখানে আমার পরিচিত একজন আছেন। তিনি উকিল ছিলেন। কিন্তু একটা অদ্ভুত ঘটনা তার জীবনের উপর দিয়ে ঘটে গেছে। আমি সেদিন কলকাতা যাচ্ছিলাম। তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য ওই কাঁচা রাস্তাটাই ধরেছিলাম। দাদার সেদিন বিয়ে ছিল। ওই বিয়ের দিনেই দাদাকে কেউ গুলি করেছিল। জানি না এখন দাদা কেমন আছেন -
-- অর্পণদার বোন আমি। ওই ঘটনার পর দাদা কোমায় ছিল বেশ কিছুদিন। এখন ভালো আছে। কোর্টেও যাচ্ছে দাদা মাঝেমধ্যে।
-- আরে তুমি অর্পণদার বোন? এই দেখো কেমন পরিচয় বেরিয়ে গেলো। তাহলে তো তোমাদের বাড়িতে একদিন যেতে হয়।
-- হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। তবে নলিনীকে নিয়ে।
-- তোমরা নিশ্চিত থাকো। ওকে ছাড়া আমি আর কখনো কোথাও একা যাচ্ছি না। কলেজও তো আমাদের এক। একসাথেই যাচ্ছি আর একসাথেই ফিরছি।
তপেশের কথায় অর্পিতা আর ময়ূর একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। নলিনী তখন দরজার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার চোখে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি—যেন বহুদিন পর বুকের ভিতরের ভারটা একটু হালকা হয়েছে। মাঝে মাঝেই গতকাল রাতের কথা মনে পড়লেই সকলের মাঝেও নলিনী লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে।
অর্পিতা হঠাৎ নলিনীর হাত ধরে বলল, — কী রে, তুই কিন্তু আর পালাতে পারবি না। এবার কিন্তু আমাদের বাড়ি যেতেই হবে।
নলিনী হালকা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, — দেখি… সময় হলে যাবো।
তপেশ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, — “দেখি” না, ঠিক করেই ফেলো। আমি কিন্তু কথা দিয়ে ফেলেছি। তপেশের কথা একদম স্বাভাবিক। যেন বহুকাল ধরে নলিনীর সাথে তার সুখের দাম্পত্য।
ময়ূর একটু মজা করে বলল, — তাহলে তো ব্যাপারটা সিরিয়াস! আমরা কি তাহলে নতুন কিছু শোনার জন্য প্রস্তুত থাকবো?
তপেশ হেসে বলল, — আরে না না, এত তাড়াতাড়ি কিছু না। আগে বন্ধুত্বটা ঠিকমতো হোক। সবে তো একসাথে পথ চলা শুরু হল।
নলিনী মুখ তুলে একবার তপেশের দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই দু’জনেই আবার অন্যদিকে তাকিয়ে নিলো।
কিছুক্ষণ পর সবাই বেরিয়ে পড়লো। গ্রামের বাড়ি। তাই বড় রাস্তা থেকে অনেকটা হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে ঢোকা। তবে বাড়ি বিশাল বড়। গাছপালায় ভর্তি, বাগানের ভিতরও বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কোন শুকনো পাতা বাগানে পড়ে জঞ্জাল হয়ে নেই। সবসময় লোকজন কাজ করে চলেছে।
সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে ওরা বেরিয়ে পড়লো।চারিদিকে পাখির ডাক, দূরে মাঠে কাজ করা মানুষের আওয়াজ—সব মিলিয়ে এক শান্ত পরিবেশ।
ময়ূর বলল, — জানো তপেশদা, এত শান্ত জায়গায় থাকতে ইচ্ছে করে। শহরের ওই কোলাহল আর ভালো লাগে না।
তপেশ উত্তর দিল, — শান্তি ভালো, কিন্তু সবসময় নয়। কখনো কখনো মানুষের ভিড়ও দরকার… যেমন এখন। ভিড়ের ভিতর নিজের প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার জন্য যে অদম্য বাসনা সে অপেক্ষাও কিন্তু মন্দ নয়। এর ভিতর আলাদা একটা রোমান্টিকতা থাকে যা কোলাহলের বাইরে একান্তে প্রকাশ পায়।
এই বলে সে হালকা করে নলিনীর দিকে তাকালো। নলিনী কিছু বললো না, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। তপেশের মধ্যে নেই কোন জড়তা। সে অতি স্বাভাবিক।
রাস্তাতেই নলিনীর গাড়িটা দাঁড়ানো ছিল। ওরা গাড়ির কাছে এসে গেলো। যে যার ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে বসে পড়লো।
তপেশ সকলকে আবার আসার কথা বলল। দু'জনেই একসাথে বলে উঠলো,
-- ভীষন ভালো লেগেছে। আসবো তো নিশ্চয়ই।
— নিশ্চয়ই, খুব শিগগিরই দেখা হবে, বলল তপেশ।
অর্পিতা গাড়িতে ওঠার আগে নলিনীকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, — সুখকে আর দূরে সরিয়ে রাখিস না।
নলিনীর মনেমনে ভাবলো যে সুখের সন্ধানে এতদিন ছিলাম তাকে হাতের মুঠোই পেয়ে আর কি হারাতে চাইবো? যেকোন ভাবেই হোক তাকে নিজের করেই নিজের কাছেই রাখবো।
গাড়ি ছেড়ে দিলো।
নলিনী আর তপেশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কেউ কিছু বলছে না।
শেষে তপেশ নরম গলায় বলল, — চলো, এবার ফিরি?
নলিনী মাথা নাড়ল।
দু’জনে একসাথে হাঁটতে শুরু করলো। হঠাৎ তপেশ বলল, — একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
— কী?
— আজ রাত থেকে কিন্তু তুমি আমার ঘরেই থাকবে। শুধু রাতেই নয় এখন থেকে আমার ঘরই কিন্তু তোমার ঘর।
নলিনী থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— এ বাবা! আমার ভীষন লজ্জা করবে কিন্তু। সবাই কী ভাববে?
-- কী ভাববে? কিছুই ভাববে না। সব স্বামী,স্ত্রীরা একই ঘর শেয়ার করে। তোমার আপত্তি না থাকলেই হল।
-- জানি না। ওসব পরে ভাবলেও চলবে। এখন চলো বাড়ির ভিতরে যাই।
তপেশের চোখে একটা স্বস্তির ঝিলিক দেখা গেল।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— তাহলে আস্তে আস্তে তোমার জিনিসগুলো আমার ঘরে আসতে থাকুক।
নলিনী সরাসরি তপেশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
— হ্যাঁ… সেটা চেষ্টা করা যেতে পারে।
তপেশ বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েও হঠাৎ থেমে গিয়ে বলে,
-- চলো না একটু হেঁটে আসি।
নলিনী তাতে সম্মতি দেয়।
দু'জনে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভিতরে না ঢুকে গ্রামের কাঁচা পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো—
পিছনে রয়ে গেল অতীতের দুঃখ, আর সামনে ধীরে ধীরে খুলতে লাগলো ভালোবাসার নতুন আকাশ…
কিছুটা পথ দু'জনে চুপচাপ হেঁটে একটা বড় বকুলফুল গাছেরতলায় দাঁড়ালো। নিচুতে প্রচুর ফুল পড়ে আছে। আর চারিদিকটা বকুলফুলের গন্ধে ম ম করছে। তপেশ নলিনীকে বলল,
-- জানো ছোটবেলায় এই গাছে কত উঠেছি। আমাদের থেকে যারা সিনিয়র ছিল তারা এখানে বসে গ্রীষ্মকালে তাস খেলত। সে দিনে,রাতে - যেদিন খুব গরম পড়তো সেদিন এখানে বড়রা বসে গল্প করত, তাস খেলত। কিন্তু একটা ঘটনার পর থেকে এখানকার আড্ডাটা উঠে গেছে।
-- কী সেই ঘটনা?
-- আমাদের গ্রামেরই একদাদা একটি মেয়েকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু মেয়েটির বাড়ির থেকে সেই সম্পর্ক মেনে না নিয়ে জোর করে মেয়েটির অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেয়। সেই দাদা এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একদিন রাতের বেলা এই গাছে --
-- থাক থাক আর বলতে হবে না। চলো এখান থেকে চলে যাই। তুমি আর জায়গা পেলে না? আমায় নিয়ে এখানে আসলে।
কথাটা বলেই নলিনী তপেশের হাত ধরে রীতিমত দৌড়াতে লাগলো।
-- আরে দাঁড়াও এত ভয় কিসের? আমি আছি তো সাথে।
-- এটা ভয় নয়। এসব শুনলে আমার ওই বোকা মানুষগুলির জন্য করুণা হয়। জীবনে দুঃখ,কষ্ট থাকতেই পারে। তাইবলে অন্যের ব্যবহারের জন্য নিজেকে শেষ করে দিতে হবে? এসব যারা করে তারা আসলে জীবনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। আমি এসব মানুষদের একদম পছন্দ করি না।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। দোতলার বারান্দায় বসে বৃদ্ধ তপেশবাবু ওদের একসাথে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তিনি রাঁধুনির মুখে গতকালের কথাও জেনেছেন। তিনি মনেমনে ভাবেন এবার ঈশ্বর তাঁর কাছে আমায় নিয়ে নিলেও আমার কোন দুঃখ থাকবে না।
ক্রমশ