ওই চেহারাটাই যেন কাল হল। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, মেয়েকে নিয়ে তার গর্বের শেষ ছিল না। কিন্তু সেই গর্বই একদিন তার ভবিষ্যতের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
— “মেয়েটা বড় হয়েছে, আর দেরি না করাই ভালো…ভালো পাত্র পেয়েছি। আমি এখানেই ওর বিয়ে দেবো তোমাদের কারও কথা আমি শুনবো না।"
বাবার এই কথার পর আর কিছু বলার সাহস হয়নি মা এবং দাদাদের। আর বাবা যে কত রাগী ছিলেন সেটা তো তুই জানিস।
মনের ভেতরে তখনও ছোট্ট একটা স্বপ্ন বেঁচে ছিল—
নিজের পায়ে দাঁড়াবো, একটা চাকরি করবো, নিজের পরিচয় গড়বো।
কিন্তু সেই স্বপ্নের ওপরেই যেন পর্দা পড়ে গেল খুব তাড়াতাড়ি।
বিয়ে হয়ে গেল এক বড় সংসারে।
অনেক লোকজন, অনেক নিয়ম—আর সেই নিয়মের বেড়াজালে বন্দি হয়ে গেল আমার নতুন জীবন।
ভোরে উঠতে হবে, ঘরের কাজ, রান্না ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক একজন এক একদিন—একটা ভুল হলেই শাশুড়ির কড়া চোখ। তবে তিনি আমায় খুব পছন্দ করতেন।
স্বামী মানুষটা মন্দ ছিল না, কিন্তু সংসারের চাপে তিনিও যেন দূরে দূরেই থাকতেন।
আমার মনের কথা, আমার স্বপ্ন—কেউ শুনতে চাইত না।
এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা মাস।
এর মধ্যেই একদিন বুঝতে পারলাম—
শরীরে নতুন একটা প্রাণের স্পন্দন।
মা হতে চলেছি আমি খবরটা শুনে বাড়িতে আনন্দের ঢেউ উঠল ঠিকই,কিন্তু আমার নিজের ভেতরে মিশ্র
অনুভূতি—খুশি, ভয়, আর কোথাও যেন এক চাপা আফসোস।
— “এত তাড়াতাড়ি?”
নিজের মনেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম সেদিন
কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না।
কয়েকমাস পর আমার কোল আলো করে এলো বিজয়।
ছোট্ট বিজয়কে বুকে জড়িয়ে ধরে সে প্রথমবারের মতো অনুভব করলাম—
এই পৃথিবীতে এর চেয়ে সুখ বুঝি আর কিছুতে নেই।
মাতৃত্ব আমায় বদলে দিতে থাকে। আমি বিজয়কে নিয়ে আমার না পাওয়াগুলিকে ভুলে থাকার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু ঘুরে ফিরে তারা আমি একাকী হলেই কষ্ট দিতে থাকে। আমি আমার জীবনের এই পথটাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টায় বারবার ব্যর্থ হই। ভাববো না আর ভেবেও ভাবতে থাকি।
কিন্তু তবুও কখনো না কখনো আমার আজন্মলালিত সব স্বপ্নগুলি মাঝে মাঝেই আমায় জ্বালাতন করতো। কখনো কখনো ছোট্ট বিজয়ের হাসি, দুষ্টুমি, আধোআধো কথা কিছুক্ষণের জন্য হলেও সত্যিই আমি ভুলে যেতাম সেসব।
দিন যায়, রাত যায়—
বিজয়কে মানুষের মত মানুষ করার চিন্তা, সংসারের কাজ, আর একঘেয়ে জীবনের চক্রে আমার স্বপ্নগুলি জীবন থেকে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু তার পরেও জানিস কখনো কখনো,রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে,চুপচাপ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতাম
— “আমি কি আর কোনওদিন নিজের মতো করে বাঁচতে পারবো? এটাই কি মেয়েদের জীবন? বিয়ের পর নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটা পরিবারের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতেই হয়? তারপর নিজের সন্তানের মধ্যে সেই স্বপ্নকে দেখতে চাওয়া?
উত্তর আসত না।
সন্তান নিজের হলেও তার জীবনটা আলাদা। তার ভালোলাগা,মন্দলাগা, তার ইচ্ছা, তার স্বপ্ন সব সবকিছু আলাদা। নিজের স্বপ্নকে সন্তানের মধ্যে দেখতে চাওয়া মানে সন্তানের কাঁধে জোর করে কোন বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। যে বোঝা বইবার ক্ষমতা তার হয়ত নেই। আমার এই নিজের পায়ে না দাঁড়ানোর কষ্টটা জানিস এখনো রয়েই গেছে। আমি তো পড়াশোনাতেও খারাপ ছিলাম না। আমি বুঝতে পারি না আজও মেয়ে হওয়ার পর তাকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করার পরেই কেন পরিবারের লোকজন তার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষিত, স্বাবলম্বী একটা মেয়ে কেন একা থাকতে পারে না? বিয়েটাই কি নারী জীবনের শেষ কথা?
এতদিন ধরে জমে থাকা মনের ভিতরের কষ্ট সুস্মিতা যা কাউকে কোনদিন বলতে পারেনি শুধু নিজেই গুমরে গুমরে মরেছে প্রাণের বন্ধু লিজাকে কাছে পেয়ে সে একনাগাড়ে কথাগুলো বলে উদাস হয়ে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তার চোখ থেকে দু'ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। লিজা দেখতে পেয়ে বলল,
-- আজও এতকিছুর পরেও কেন কষ্ট পাস এসব ভেবে?
-- কিছুতেই মানতে পারি না আমি এত পড়াশুনায় ভালো হয়েও জীবনে কোন রোজগার করতে পারিনি। আমার প্রয়োজনে সবসময় অন্যের কাছে হাত পেতে টাকা নিতে হয়েছে। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা ছিল না রে!
লিজা জানতে চাইলো
-- তারপর?
বিজয় আসার পর থেকেই আমার পৃথিবীটা কিছুটা হলেও বদলে গেল। দিন-রাত শুধু ছেলেকে নিয়েই কাটে। নিজের কথা, নিজের স্বপ্ন—সব যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেল। সংসারের কাজকর্ম আগের মতোই করতে হত ওই ছোট্ট বাচ্চাকে সামলে।
এরই মাঝে আবার নতুন খবর—আমি আবার মা হতে চলেছি।
এইবার আর অবাক হইনি। শুধু মনে মনে ভেবেছি,
যাদের আমি পৃথিবীতে এনেছি, আমার জন্য না হোক, ওদের জন্য আমাকে শক্ত হতে হবে। ভুলতে হবে আমাকে আমি কী হতে চেয়েছিলাম কারণ জীবনের অনেকটা সময় চলে গেছে। নতুন করে ওদের স্বপ্নগুলোকে নিজের স্বপ্ন মনে করে এগোতে লাগলাম।
সময়ের সাথে সাথে আমার কোল জুড়ে এলো এক কন্যাসন্তান। ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমার ছোট্ট পৃথিবী যেন পূর্ণ হয়ে গেল।
কিন্তু সুখের এই ছবিটা বেশিদিন টিকল না।
মেয়েটা তখনো ভালো করে হাঁটতেও শেখেনি। ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই আমার জীবনে নেমে এলো এক ভয়ংকর ঝড়। যে ঝড়ে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেলো।
স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
কয়েকদিনের মধ্যেই সবকিছু শেষ। যা কিছু জমা ছিল সব শেষ হয়ে গেলো। একান্নবর্তী পরিবার হওয়া সত্ত্বেও কেউ বিন্দুমাত্র পাশে দাঁড়ালো না।
একদিন যে মানুষটা আমার পাশে ছিল, আমার ভবিষ্যতের ভরসা ছিল—সে চিরদিনের মতো চলে গেল।
সবকিছু যেন মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে গেল।
আমি ভিতর থেকে ভেঙে পড়তে লাগলাম। নতুন করে আবার কষ্ট পেতে শুরু করলাম কেন নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে আমি বাবার কথাই বিয়েতে রাজি হলাম? কেন আমি জীদ করে বিয়েটা ভেঙে দিতে পারলাম না?
—কিভাবে বাঁচবো, কিভাবে দুই ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে পথ চলবো ওদের লেখাপড়া শিখিয়ে কিভাবে মানুষ করবো - সাঁতার না জেনে মাঝ নদীতে নামার ফল হাতে হাতে পেলাম। আমি যেন একটু একটু করে ডুবে যেতে লাগলাম।
বিজয়ের বাবার মৃত্যুর পর বড় সংসারটা আর আগের মত রইল না।কারণ সকলেই ভাবলো আমি আমার সন্তানদের নিয়ে তাদের ঘাড়ে চেপে বসবো।
ধীরে ধীরে শুরু হল অশান্তি, হিসাব-নিকাশ, দোষারোপ। সর্বক্ষণ সকলের কথার খোটা সইতে সইতে আমি পুরোপুরি পাথর হয়ে গেলাম। প্রথমে হল হাড়ি ভাগ। তারপর একসময় সেই বাড়িটাও ভাগ হয়ে গেল।
যে বাড়িতে এতদিন একসাথে সবাই ছিলাম, সেখানে আমার আর তেমন জায়গা রইল না। কারণ আমার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলার মত কেউ ছিল না। শ্বশুরমশাই
বিজয়ের বাবা চলে যাওয়ার আগেই গত হয়েছেন। আর শাশুড়িমায়ের অন্য ছেলেদের দয়ায় বাঁচা। তিনি আমার হয়ে কথা বলতে গেলে গলাধাক্কা খাবেন। তাই তিনি থেকেও না থাকার মতই ছিলেন। তবে উনি আমায় খুব ভালোবাসতেন।
অবহেলা, উপেক্ষা—সবকিছু আমায় বুঝিয়ে দিল, এখন আমাকে নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।
দুই ছোট্ট সন্তানকে বুকে আগলে সারারাত চোখের জলে ভোর করেছি। পাশে দাঁড়িয়ে শান্তনা দেওয়ার কেউ নেই। ভায়েরা সব বিয়ে করেছে। মা, বাবা দু'জনেই চলে গেছেন। বৌদিদের সংসারে গিয়ে তাদের অশান্তি বাড়াতে চাইনি। তবে ছোড়দা মাঝে মধ্যে কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ হঠাৎ চলে আসতো। কিছু সাহায্য করে যেত। কিন্তু এভাবে ক'দিন?
ভাবতে ভাবতে যে গয়নাটুকু ছিল তাও শেষ হয়ে এলো। এভাবে চলতে লাগলে তিনটি প্রাণী না খেয়েই মারা যাবো।
ওই নিষ্পাপ শিশু দু'টির মুখের দিকে তাকালে বুক ফেটে যেত আমার। কিছু একটা করতেই হবে। শুরু করলাম ছোট ছোট কাজ—
কখনো সেলাই, কখনো বাড়ি বাড়ি টিউশন, কখনো অন্যের বাড়িতে রান্না।
দিনে পরিশ্রম, রাতে ক্লান্ত শরীর—
তবুও ওদের বাঁচিয়ে রাখতে, মানুষ করতে আমি কোন কাজকেই ছোট মনে করিনি। আমি হার মানিনি।
কারণ আমার একটাই স্বপ্ন—
"আমার ছেলে-মেয়েকে আমি যেভাবেই হোক মানুষ করবো। আমার মত জীবনে ওদের কষ্ট পেতে দেবো না।"
ক্রমশ