ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৯)
বিয়ের আশীর্বাদের জায়গা মানেই একটা শান্ত, পবিত্র আর আনন্দে ভরা পরিবেশ—যেখানে নতুন সম্পর্কের সূচনা হয় আশীর্বাদ আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। আবার তার প্রস্তুতি যদি ঠাকুরঘরে হয়। তখন মনের মধ্যে একটা আলাদা অনুভূতি আর পবিত্রতা বিরাজ করে।
বিনীতাদের ঠাকুর ঘরটা বেশ বড়। বিনীতা খুব সুন্দর করে আগেরদিন রাতেই আলপনা দিয়ে রেখেছে।
মেঝেতে সাদা রঙের আল্পনা আঁকা তার মাঝে গোল করে বসার জায়গা রেখেছে। চারদিকে গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা ঝুলছে, বাতাসে হালকা ফুলের গন্ধ। একটা কোণায় ধূপকাঠির ধোঁয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, সঙ্গে শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনি মিলিয়ে তৈরি করছে এক পবিত্র আবহ।
সাজসজ্জা ও আয়োজনের কোন ত্রুটি সেখানে নেই।
একটা পিতলের থালায় রাখা আছে ধান, দূর্বা, হলুদ, চন্দন যেগুলো দিয়ে আশীর্বাদ করা হবে। পাশে সাজানো মিষ্টির প্লেট তাতে হরেক রকমের মিষ্টি। বিনীতা মিষ্টি খেতে কোনদিনও পছন্দ করে না। তবুও নিয়ম রক্ষার্থে তো রাখতেই হবে। আশীর্বাদের সাজানো গুছানো জায়গা দেখে সকলেই খুব খুশি। বিশেষত ইরা।
তিনি ঠাকুরঘরে প্রবেশ করে প্রথমেই জানতে চাইলেন,
-- ওমা কী সুন্দর করে সবকিছু গুছানো। কে করলো এসবকিছু।
শুনেই সুস্মিতা বেশ গর্বের সাথে বললেন,
-- সবই বিনীতা করেছে। ও খুব সুন্দর আঁকে। ছোটবেলায় আঁকার জন্য অনেক পুরস্কারও পেয়েছে। একজন টিচারের কাছে আঁকা শিখতো। একদিন তিনি কী কারণে ওকে বকা দিলেন সেই থেকে ও আর আঁকার স্কুলে যেত না। কোন প্র্যাকটিস আর করত না। আমি বিজয় বহুবার বলেও ওকে আর আঁকার স্কুলে পাঠাতে পারিনি। কাল অনেক রাত অবধি এইসব করে তারপর ঘুমিয়েছে।
একথা শুনে আনন্দি ফিসফিস করে বিনীতার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-- রাতে কী আর ঘুমিয়েছে? দাদার কথা ভাবতে ভাবতেই রাত কাটিয়ে দিয়েছে।
বিনীতা তার হাতে ছোট্ট একটা চিমটি কেটে বলে,
-- তুমিও করবে রাত কাবার কারও কথা ভাবতে ভাবতে।দাঁড়াও আগে যাই তোমাদের বাড়ি তারপর ব্যবস্থা করছি।
-- সে গুড়ে বালি। ওই পথে আমি কোনদিনও হাঁটবো না ।
-- দেখা যাক কেউ কি আর বলতে পারে কার কপালে কী লেখা আছে?
উলুর ধ্বনি আর শাখের আওয়াজ এর মধ্য দিয়ে শেষ হল বিনীতার আশীর্বাদ। মূল আশীর্বাদটা করলেন দেবদূত। মামা আশীর্বাদ করলে নাকি ভাগ্নে, ভাগ্নিরা সুখী হয় তাই ইরার ইচ্ছা অনুযায়ী সকলের আগে মামা আশীর্বাদ করেন।
তারপর একে একে বড়রা সকলেই এগিয়ে এলেন। প্রত্যেকে হাসিমুখে বিনীতার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতে লাগলেন—“সুখে থাকিস”, “ভালো থাকিস”, “সংসারটা ভরে উঠুক হাসিতে”—এইসব কথায় যেন ভরে উঠল চারপাশ।
বিনীতা শান্তভাবে বসে, দু’হাত জোড় করে সবার আশীর্বাদ নিচ্ছিল। চোখে তার লাজুক হাসি, মাঝে মাঝে চোরা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল সকলের দিকে। বিজয় একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, মুখে এক অদ্ভুত মিষ্টি তৃপ্তি—যেন এতদিনের অপেক্ষা আজ একটু একটু করে পূর্ণতা পাচ্ছে তার বোনের জীবনে। সেদিন হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তটা মাঝে মাঝে মনে হত তার সে হাতে ধরে বুঝি বোনের জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। আজ সবকিছু দেখে মনেহচ্ছে ঈশ্বর তাকে নিরাশ করেননি। তিনিই চেয়েছিলেন এই বিয়েটা হোক। একটা বিপর্যয় একটা পরিবারের উপর দিয়ে ঘটে গেছে ঠিকই কিন্তু এটাই হয়ত ভবিতব্য ছিল বিনীতার জীবনে। বিজয় আজ খুব খুশি। সকলের অলক্ষ্যে সে নিজের অজান্তেই চোখ থেকে গড়িয়ে আসা জল খুব তাড়াতাড়ি মুছে নেয় যাতে কেউ দেখতে না পায়। তাদের নিয়ে মায়ের পরিশ্রম, মায়ের কষ্ট সে নিজের চোখে দেখেছে। আজ মায়ের মুখ ভরা হাসি দেখে সে খুশিতে আত্মহারা।
আনন্দি আর লিজা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আপ্যায়নে। সবই নিজেরা তবুও সবাইকে হাসিমুখে সামলাচ্ছে তারা। বিনীতা আশীর্বাদ শেষে উঠে গেছিল মাকে কাজে সাহায্য করতে। আনন্দি হাত ধরে তাকে বসিয়ে দিয়েছে। তাকে কিছুই করতে দিচ্ছে না। বিজয় দূরে দাঁড়িয়ে আনন্দির এই কর্মতৎপরতা দেখে মনের কোন এক জায়গায় একটা ভালোলাগা কাজ করতে শুরু করেছে। মনেমনে বলেও ফেলছে, "মেয়েটা সত্যিই খুব ভালো আর মিশুকে।"
এরই মাঝে আনন্দি এসে বিনীতার কানে কানে বলল, --কেমন লাগছে বল তো বৌদি?
বিনীতা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
-- মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি। এত তাড়াতাড়ি এত সহজে সব মিটে যাবে কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। তবে এরূপ স্বপ্ন তুমিও দেখবে। ব্যবস্থা আমিই পাকা করবো।
-- হ্যাঁ ওই ভাবো বসে বসে। সেদিন কোনদিন তোমার জীবনে আসবে না। আইবুড়ো ননদের সাথেই তোমায় থাকতে হবে। তবে হ্যাঁ ননদ তোমার স্বাবলম্বী হয়েই ছাড়বে।
সকলের আশীর্বাদ শেষ হলে, পুরোহিত মশাই আবার একটু মন্ত্র পড়ে অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ ঘোষণা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আবার শোনা গেল উলুধ্বনি আর শাঁখের আওয়াজ।
আশীর্বাদ শেষে সকলে পুণরায় ড্রয়িং রুমে চলে গেলো। ঘরের মাঝে তখন আড্ডা জমে উঠেছে। বাড়িটা যেন হঠাৎ করেই এক অন্যরকম উষ্ণতায় ভরে উঠেছে একটা নতুন সম্পর্কের সূচনার উষ্ণতা।
তারপর শুরু হল খাওয়াদাওয়া। পাতে পাতে সাজানো লুচি, আলুর দম, চাটনি, মিষ্টি সবকিছু নিয়ে সবাই বসে পড়ল। হাসি-আড্ডা আর গল্পে জমে উঠল দুপুরটা।
আর এইসব কোলাহলের মাঝেই বিনীতা চুপ করে একবার চোখ বন্ধ করল—মনে মনে যেন প্রার্থনা করল,
"ঈশ্বর সবকিছু যেন ভালোভাবেই মিটে যায়। কোন রকম অসুবিধা যেন আর না হয়।"
এদিকে অনল আজ বিকেলের মধ্যেই অফিস থেকে ফিরে এসেছে। নিজেই এককাপ চা করে নিয়ে সকলের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় বসে। বেশ কয়েকবার মেসেজে বিনীতার সাথে কথা হয়েছে। সন্ধ্যায় সকলে বেরোনোর পর ফোন করবে বলে দিয়েছে। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠায় রিসিভ করতে গিয়ে দেখে কৌশিকী ফোন করেছে। মেজাজটা একদম বিগড়ে গেলো। যখনই অনল একটু একাকী বিনীতার কথা ভাবতে বসে ঠিক তখনই এই মেয়েটা ফোন করে বসে। ফোনটা ধরে "হ্যালো" বলতেই কৌশিকী বলে,
-- এতদিন তোমাদের ছেড়ে চলে এসেছি। একবারও আমার কথা মনে করে ফোন করতে পারোনি?
-- এইরূপ তো কোন কথা ছিল না যে তোমায় মাঝে মাঝে ফোন করবো?
অনলের উত্তর শুনে কৌশিকী একটু থতমত খেলো। সে আশা করেনি অনল তাকে এইভাবে উত্তর দেবে।
-- তোমার কী হয়েছে এত রুহভাবে কথা বলছো কেন?
-- না কিছুই হয়নি। আর এমন কী বললাম যে তোমার মনেহল আমি রূহভাবে উত্তর দিলাম? আসলে বাড়িতে কেউ নেই তো আমি একাই আছি। গরমে চা করতে গিয়ে মাথাটা বোধকরি বিগড়ে গেছে। হ্যাঁ বলো কেন ফোন করেছো?
-- না তেমন কোন বিশেষ দরকার নেই। আসলে আমি আগামীকাল কলকাতা আসছি। অফিসে যেতে হবে একটা কাজে। তুমি কাল অফিসে আসবে কিনা সেটাই জানার - কৌশিকীর কথা শেষ হয় না, অনলের ফোনে বিনীতার কল ঢোকে অনল বলে,
-- একটা জরুরী ফোন আসছে আমায় ফোনটা ধরতে হবে
বলেই অনল বিনীতার ফোন রিসিভ করে। কৌশিকী অনলের ব্যবহারে অবাক হয়ে ফোনটা কেটে দেয়। চুপচাপ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। অনেকক্ষণ কেটে যায় এইভাবেই। মায়ের ডাকে সম্বিৎ ফেরে। হাত দিয়ে চোখের জলটা মুছে মায়ের দিকে ফিরে জোর করে মুখে হাসি এনে জানতে চায়
-- হ্যাঁ মা বলো
-- কাল কখন বেরোবি।
--খুব ভোরে। ভেবো না মাত্র তো দু'টো দিন
-- তুই কিন্তু বলেছিস এবার কলকাতা থেকে ফিরে তোর বিয়ের ব্যাপারে মত দিবি। মনে থাকে যেন।
-- এত তাড়াহুড়ো কেন করছো মা? চাকরি করছি কে মাথার দিব্যি দিয়েছে বিয়ে করতেই হবে?
-- এটা কোন কথা হল মা? আমাদের বয়স হয়েছে। আমাদের কিছু হয়ে গেলে কে দেখবে তোকে?
-- আমাকে কাউকে দেখতে হবে না মা। কারণ আমি চাকরি করি। টাকা দিলে কাজ করে দেওয়ার লোকের অভাব হবে না। রান্না না করেও ঘরে বসে ভালোমন্দ খেতে পারবো শুধুমাত্র একটা ফোনেই। আজকের যুগে মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়ালে মা,বাবার টাকা খরচ করে নিজের দিকের ছড়ি ঘোরানোর লোক কেউ চায় না। তাই স্বাবলম্বী মেয়েরা বিয়ে করতেই চায় না।
-- কোন একটা ছেলের কথা বলেছিলি - এবার গিয়ে তার সাথে কথা বলবি। সে বিয়েতে রাজি হলে আমরা কথাবার্তা এগোব।
ক্রমশ
--