-- সব শেষ হয়ে গেলো রে - --
বিজয়ের ছোটমামা ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠলেন।
বিজয়ের উদ্বিগ্নতা দেখে ওখানে উপস্থিত সকলেই বিজয়ের দিকে তাকিয়ে একটি গভীর দুঃসংবাদের অপেক্ষায়।
-- বলো মামা কী হয়েছে ?
-- কী, কী করে বলবো রে বিজু --
-- দেরি অনেক হয়ে গেছে মামা। বলতে যেমন তোমাকে হবে আমাদেরও সেটা মানতে হবে। তুমি বলো এদিকটা আমি সামলে নেবো।
কিছুদিন আগের ঘটনা
কলেজ থেকে ফেরার পথে মেয়েটি নিখোঁজ। প্রথমে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, তারপর থানা পুলিশ। বাবা, দাদার ছুটাছুটি।কোনকিছুতেই মেয়েটির সন্ধান পাওয়া যায় না।
হঠাৎ দিনকুড়ি বাদে ভোরের আলো ফোটার আগেই মেয়েটি আলুথালু বেশে উদভ্রান্তের মত নিজের বাড়ি এসে উপস্থিত। বাড়ির লোক দুয়েকদিন বিষয়টা লুকিয়ে রাখে মেয়ের নিরাপত্তার কারণে। পরে পুলিশকে জানাতে বাধ্য হয় কারণ থানায় আগেই ডাইরি করা হয়েছিল নিখোঁজ বলে। মেয়েটি মানে ময়ূরের তখনো আঠারো বছর বয়স হয়নি। সাহসী এবং নির্ভিক ময়ূর পুলিশের সামনে কোন কথা লুকায় না। অপহরণের দিনে কলেজ ক্যাপাসের ভিতর তিনটি ছেলের সাথে ঝামেলা হওয়ায় এবং ছেলেগুলির কুকথার পরিপেক্ষিতে প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ জানায়। প্রিন্সিপ্যাল তাদের ডেকে মেয়েদের সাথে দুষ্টুমি করতে নিষেধ করেন কারণ যে ছেলেটি সবচেয়ে নোংরা ভাষা ইউজ করেছিল সে হচ্ছে স্থানীয় এক নেতার ছেলে নম্বর কম পেয়েও নামকরা কলেজে ভর্তি হতে পেরেছে।
এ অপমান নেতার পুত্রটি মেনে নিতে পারেনি। তাই সেদিনই কলেজ থেকে ফেরার পথে অন্য বন্ধুদের সহয়তায় ময়ূরকে তুলে নিয়ে যায়। নিজের তিনতলা বাড়িরই দরজা জানলাবিহীন একতলার একটি পরিত্যক্ত রুমে তাকে আটক করে রাখে। চলে অকথ্য নির্যাতন। না ধ*র্ষি*তা সে হয়নি তাকে উলংগ করে মুখ, হাত,পা বেঁধে একটি খাটে ফেলে রাখা হয়েছিল।
ছেলেগুলো কোন পথ দিয়ে আসতো কোন পথ দিয়ে চলে যেত ময়ূর কিছুই বুঝতে পারতো না কারণ ঘরটির কোন্দিকেই কোন দরজা সে দেখতে পেতো না। তারা আসতো ওখানে বসে মদ খেতো তার শরীরের নানান জায়গায় হাত দিত হাসাহাসি করতো জোর করে কিছু খাওয়াতো তারপর চলে যেত। এইভাবে তাকে অর্ধমৃত করে ওখানেই উনিশদিন রেখে দেয়। কুড়িদিনের মাথায় নেতার পুত্রটি আকন্ঠ মদ গিলে আসে। ময়ূর হঠাৎ মেঝেতে আওয়াজ হওয়ায় তাকিয়ে দেখে মেঝেতে একটি ভারী কাঠের টুকরো নড়াচড়া করছে। সে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। আস্তে আস্তে কাঠের টুকরোটা সরে যায়। আর সেখান থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে আসে নেতার আদরের পুত্র সন্তানটি।
মাতাল ছেলেটি ময়ূরের হাতদুটো উঠেই প্রথমে খুলে দেয়। এই প্রথম ময়ূরের শরীরের উপর আছড়ে পড়ে সে। এতদিনের ভালোভাবে না খাওয়া ময়ূর তার নিস্তেজ শরীরের সবটুকু দিয়ে তাকে ধাক্কা মারে। মাতাল থাকায় নিজেকে সামলাতে পারে না সে গিয়ে দেওয়ালের উপর পড়ে। ময়ূর বুঝতে পারে ছেলেটি অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। সে পায়ের ও মুখের বাঁধন খুলে ফেলে।উ*লংগ অবস্থায় লজ্জা নিবারণের জন্য ঘরের এদিকওদিক খুঁজতে থাকে যদি কিছু মেলে। ঘর ভর্তি বস্তা বস্তা মাল মজুদ। এক কর্নারে সে নিজেরই চুড়িদার, কামিজটা খুঁজে পায়। খুব তাড়াতাড়ি পরে নেয় সেটি। কাঠের টুকরোটি সরিয়ে একটি সরু লোহার সিঁড়ি পায় সে। অল্প আলো জ্বলছে পুরো সিঁড়িতে। বেশ কিছু সিঁড়ি নামার পর আবার উপরে ওঠার সিঁড়ি। ময়ূর এবার সেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটাকে টেনে টেনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে একটি কাঠের দরজা এবং তারপরেই একটি লোহার গেট। কিন্তু নেতার পুত্রটি এগুলো খোলা রেখেই আজ গুদামঘরে চলে গেছিল। গেটটা খুলেই সে হতভম্ব হয়ে যায়। সাজানো গুছানো সুন্দর বড় একটি রান্নাঘর। যা দেখলে বোঝা যায় এখানে নিত্য রান্না হয়। ভাববার সময় নেই। যেভাবেই হোক এ চক্রবূহ থেকে বেরোতে হবে। রান্নাঘর পেরিয়ে দরজা খুলে ( এই দরজাটি দেওয়া ছিল) সে বাইরে আসে। রাত গভীর। কত রাত তখন ময়ূর ঠাহর করতে পারে না। দরজা খুলে বেরিয়ে জায়গাটা দেখে তার চেনা মনেহয়। সে হাঁটতে থাকে সরু বাঁধানো রাস্তা দিয়ে। দু'পাশে ফুলের বাগান অজস্র ফুল ফুটে আছে সেখানে। বেশ কিছুটা হাঁটার পর সে দেখতে পায় গুহবাড়ির বিশাল শিবমন্দির। এবার সে বুঝতে পারে নেতার এই মন্দিরের ভিতর দিয়েই চলে তার অপকর্মগুলো। গেটের কাছে এসে মন্দিরের দিকে চোখটা চলে যায়। অজান্তেই হাতটা কপালে উঠে যায় তার। কিন্তু মন্দিরের মেইন গেটে তালা বন্ধ। এবার সে কীকরে বেরোবে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গ্রীল বেয়ে উপরে উঠে লাফ দেয়।
এখান থেকে তার বাড়ি অনেকদূর। শরীরে শক্তি নেই। কিন্তু মনের জোরে সে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে থাকে। না, কোথাও বসলে চলবে না ভোরের আলো ফোটার আগেই তাকে পৌঁছাতে হবে বাড়ি। বারবার পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে কেউ আসছে কিনা। এগোতে থাকে ময়ূর। ভোরের আলো ফোটার আগেই সে বাড়ির দরজায় বেল টেপে। তাকে দেখে মা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে বুকে টেনে নেন। বাবা গম্ভীর হয়ে জানতে চান,
-- কোথায় ছিলে এতদিন?
অসহায় চোখদু'টি তুলে বাবার দিকে তাকায় ময়ূর। সঙ্গে সঙ্গে মা বলে ওঠেন,
-- কোথায় ছিল এখনই জানতে হবে ওর মুখ থেকে? ওকে দেখে তুমি বুঝতে পারছো না যদি ও ইচ্ছা করে কোথাও চলে যেত তাহলে চেহারার এই হাল হত না -- ছেঁড়া জামাকাপড় পরে রাত শেষের আগে এইভাবে চোরের মত বাড়ীতে ঢুকতো না, ওকে দেখে বুঝতে পারছো না খিতে,তৃষ্ণায়, ভয়ে ঠকঠক করে ও কাঁপছে?
ও এখন কিচ্ছু তোমায় বলতে পারবে না। আমি মা আমি ঠিক বুঝতে পারছি ওর মনের অবস্থা। আগে ও খাবে, ঘুমাবে তারপর সব বলবে।
এরপর আর কোন কথা না বলে ময়ূরের বাবা ঘরে চলে গেলেন। ময়ূরের মা অন্নপূর্ণা দেবী ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে ফুটিয়ে পুণরায় থালায় ঢেলে ঠাণ্ডা করে ময়ুরকে একগ্লাস দুধ খাইয়ে বললেন,
-- যা একটু ঘুমিয়ে নে
-- না মা আমি একটু স্নান করবো আগে। তারপর ঘুমাবো। এই ফাঁকে তুমি আমাকে দুটো রুটি করে দাও। আমার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। একগ্লাস দুধে আমার পেট ভরবে না।
অন্যপূর্ণদেবীর চোখ পুণরায় জলে ভিজে গেলো। তিনি বললেন,
-- হ্যাঁ মা আমি এক্ষুনি তোকে রুটি করে দিচ্ছি। তুই স্নান করে আয়।
ময়ূর স্নান করতে চলে গেলো। মা আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন। পিছন পিছন এসে ময়ূরের বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আটা মাখতে মাখতে অন্নপূর্ণাদেবী বললেন,
-- শোনো, এক্ষুনি পুলিশকে কিছু জানানোর দরকার নেই। দু'টোদিন যেতে দাও আগে ও স্বাভাবিক হোক। তারপর পুলিশকে জানিও। ও স্বাভাবিক হলে নিজের থেকে যখন সব বলবে তখনই আমরা জানবো এর আগে দয়া করে তুমি ওকে কোন প্রশ্ন কোরো না।
মলয়বাবু চুপ করেই থাকলেন। স্ত্রীর কোন কথার উত্তর তিনি দিলেন না। তিনি ওখানে বসেই থাকলেন। ময়ূর স্নান সেরেই চুল না আঁচড়েই রান্নাঘরে এসে খাবার টেবিলে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে খেতে বসে। ততক্ষণে মায়ের রুটি আর ফ্রিজ থেকে বের করে তরকারি গরম করা হয়ে গেছে। ময়ূর কোন কথা না বলে খাওয়া শুরু করে। মলয়বাবু এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে থাকেন। চোখ ভরা জল নিয়ে বাবার মুখের দিকে এবার তাকিয়ে পড়ে ময়ূর। বাবা নিজহাতে মেয়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলেন,
-- কাঁদিস না মা। খেয়ে গিয়ে একটু ঘুমা। তোর যখন মনে হবে তুই সব বলার মত পরিস্থিতিতে এসেছিস আমরা তখনই সব শুনবো। কিন্তু এর মাঝে তো আমরা থানাপুলিশ করে ফেলেছি তুই একটু স্বাভাবিক হলে থানায় সব জানাতে হবে। তানাহলে সেখানে আবার কথা শুনতে হবে।
-- তুমি থানায় জানিয়ে দাও যারা আমায় তুলে নিয়ে গেছিলো সেখান থেকে আমি পালিয়ে এসেছি কিন্তু পুলিশের সাথে কথা আমি দু'দিন পরে বলবো।
মেয়ের কথা শুনে "ঠিক আছে বলে" মলয়বাবু রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন
ক্রমশ