Tuesday, May 12, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৬)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৬)

 গাড়ি ছুটে চললো।কলকাতার ব্যস্ততা ছেড়ে চার চাকা (গাড়ি) নিয়ে একটু গ্রামের দিকে বেরিয়ে পড়ার অনুভূতিটাই আলাদা—ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল মিলিয়ে যায়, আর সামনে খুলে যায় শান্ত, সবুজ এক পৃথিবী 

ভোরের শহর তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। রাস্তায় তুলনামূলক কম গাড়ি, হাওয়ায় একটু ঠান্ডা ভাব। বিদ্যাসাগর সেতু  পেরিয়ে শহর ছাড়তে শুরু হল—হুগলি নদীর ওপর দিয়ে যেতে যেতে মনটাই হালকা হয়ে গেলো ওদের। শহর থেকে শহরতলি
ধীরে ধীরে উঁচু বাড়ি কমে আসে, বদলে যায় দৃশ্য। দোকানপাট, ছোট বাজার, রাস্তার ধারে চায়ের দোকান—এইসব দেখতে দেখতে গাড়ি এগোতে থাকো। মুগ্ধ হয়ে ওরা তাকিয়ে থাকে সেইসব দৃশ্য অবলোকন করতে করতে। কিন্তু অনল এবং বিনীতা সকলের মাঝেও দু'জনেই যেন বারবার চোখের ইশারায় কথা বলে চলেছে। আনন্দির চোখে বেশ কয়েকবার ধরা পড়ে গেছে তারা। অনল সামনের সিটে আর ওরা তিনজন পিছনের সিটে। অনল এমনভাবে মোবাইলটা রেখেছে মোবাইলের কাঁচের ভিতর দিয়ে সে অবিরত বিনীতাকে দেখে চলেছে। একবার আনন্দি বিনীতার কানে কানে বলেও দিয়েছে 
-- কুছ কুছ হোতা হ্যায় 
-- কী যা তাই বলছো। তুমি বড্ড দুষ্টু
-- সেটা আমি জানি। কিন্তু তুমি জানো না আমার থেকেও আমার দাদা ভীষন দুষ্টু।
 বিনীতা একটু লজ্জা পেয়ে গেলো। কিন্তু আস্তে আস্তে আনন্দির কানে কানে বলল
-- এরকম কিছু হলে তোমার আপত্তি নেই তো
আনন্দি চোখ বড় বড় করে মামী শুনতে না পায় সেইভাবে বিনীতার কানের কাছে মুখ নিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
-- একদম না,একদম না। বাড়ির সকলেই তোমাকে খুব পছন্দ করেছেন। শুনলে না মা তো বলেই দিলেন ,তোমার মা মানে মাসিমার সাথে দেখা করতে মা খুব তাড়াতাড়িই আসবেন।
 হঠাৎ করে গাড়িটা ব্রেক নিয়ে একটা ছোট ইট বিছানো রাস্তায় ঢুকে পড়ল।
 সেটা দেখে অনল বলল,
-- এই রাস্তাটা ধরলেন কেন? আমরা তো বড় রাস্তা ধরেই এগোতে পারতাম।
-- আসলে দাদা এটা দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি হবে আর দু'পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে গেলে আপনাদেরও ভালো লাগবে।
 একথা শুনে অনল আর কোন কথা বলল না।
 গ্রামের পথে গাড়ি এগোতে লাগলো 
আর একটু এগোলেই আসল সৌন্দর্য—
দুই ধারে সবুজ ধানক্ষেত
মাঝেমধ্যে পুকুর, তাতে ভেসে আছে শাপলা
গাছের ছায়ায় কাঁচা রাস্তা
মাঠে কাজ করছে কৃষক
দূরে মাটির বাড়ি, উঠোনে শুকোচ্ছে ধান
হালকা বাতাসে কাদামাটির গন্ধ—যেটা শহরে কখনও পাওয়া যায় না।
 
রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকান দেখতে পেয়ে আনন্দি  চেঁচিয়ে উঠলো
— দাদা এখানে চা খাবো আর কিছু ছবি তুলবো।
 ড্রাইভারকে বলাতে সে বলল,
একদম দোকানের সামনে তো দাঁড়ানো যাবে না। জায়গা নেই। গাড়িটা একটু এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে হবে। আবার আপনাদের এই পথটা হেঁটে আসতে হবে। তাতেই সবাই রাজি।
 গাড়ি থেকে নেমে সকলে আবার এগিয়ে চলল ওই দোকানটার দিকে। সবাই গিয়ে বাঁশের তৈরি করা বেঞ্চে বসলো। আনন্দি ঠিক ক্যামেরায় অনল আর বিনীতাকে একই ফ্রেমে নিয়ে বিনীতার সামনে ছবিটা ধরে বলল
-- একদম পারফেক্ট। বেশ মানাবে।
বিনীতা হাসতে লাগলো। এই অবস্থায় কোন মেয়ের যে রাগ হয় সেটা বিনীতার মধ্যে বিন্দুমাত্র না দেখতে পেয়ে আনন্দি বিনীতার হাত ধরে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো,
-- সত্যি করে একটা কথা বলবে?
-- বলো
-- তুমি দাদাকে আগেই চিনতে না? দাদার সাথে তোমার কতদিনের আলাপ?
 বিনীতা লজ্জা পেলো না,ভয় পেলো না। খুব ধীরে এবং আস্তে করে বলল
-- তোমার দাদার সাথে আমার জীবনের একটা ঘটনা হঠাৎ করেই ঘটে গেছে কয়েকমাস আগে। আমাদের বাড়ির লোক ছাড়া আর কেউ জানে না।
-- কী ঘটনা? আমায় বলা যাবে?
-- যদি তোমায় বলা না যেত তাহলে এইটুকুই কী বলতাম গো? তবে অনেক বড় ঘটনা। এখন বলতে শুরু করলে শেষ করতে পারবো না। বাড়ি গিয়ে সময় মত সব বলবো তোমায়। বাকিটা তুমি ম্যানেজ কোরো। তবে একটা অনুরোধ করবো আজ রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে যেও।
-- আচ্ছা দাদা যে বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেছিলো তুমি সেই বন্ধুর বোন তাই না? তোমার বিয়েতেই গেছিলো?
-- হ্যাঁ কিন্তু সেই বিয়েটা --
 কথা শেষ হয় না অনল ডাক দেয় চা রেডি তাড়াতাড়ি আয় 
-- বলেছিলাম না এখন শুরু করলে শেষ হবে না। তবে তুমি খুব ইন্টেলিজেন্ট। বাকিটা বুঝে নাও। বাড়ি গিয়ে তোমায় পুরো ঘটনাটা জানাবো।
মাটির ভাঁড়ে চা। আনন্দি খুব খুশি। কিন্তু একটু উদাসীন হয়ে গেছে। বিষয়টা খাপছাড়া শুনে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। চা খেতে খেতে সে বারবার লক্ষ্য করছে বিনীতা আর তার দাদার কার্যকলাপ।

গ্রামের লোকজনের সরল হাসি, সহজ কথা, গায়ে পড়ে তাদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া এইসব দেখে এবং শুনে এতকিছুর পরেও আনন্দির—মনটা একদম ফ্রেশ হয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও যেন একটা কাঁটা খচখচ করে  বিঁধে যাচ্ছে।
 তার মনে পড়ছে বিয়েবাড়ি থেকে আসার পর থেকেই দাদা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছিল। বিয়েবাড়ির গল্প শুনতে চাইলে সময়মত বলবে বলেছিল। তারপর বিষয়টা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। কী এমন ঘটেছিল সেদিন বিয়েবাড়িতে যার ফলে দাদা সেখান থেকে ফিরে একদম শান্ত হয়ে গেছিল। সেই বিয়েটা হয়নি বলছে বিনীতা। কেন হয়নি? আর বিয়েটা না হওয়ার পর যেহেতু দাদা সেই বিয়েতে গেছিলো সেই সূত্র ধরে দাদার সাথে বিনীতার পরিচয়।  মাথার ভিতর নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু এখনই জানার কোন উপায় নেই। কারণ পাশেই মামী বসে যাচ্ছেন। 
 চা খাওয়া শেষ করে ওরা পুণরায় গাড়িতে উঠে বসে। কিন্তু এবার আনন্দি বেশ চুপচাপ। তার মাথার ভিতরে নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
 অনল পিছন ফিরে আনন্দিকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বেশ জোরে বলে,
-- কিরে পাগলী? হঠাৎ চুপ হয়ে গেলি কেন? তোকে ঠিক এই চুপচাপ বসে থাকাটা মানায় নারে।
-- গভীর চিন্তায় আছি রে দাদা।
-- আনন্দির বলার ধরনে সকলেই হেসে দিলো
-- কী এমন গভীর চিন্তা করছিস তুই 
মামী তার কাছে জানতে চাইলো। 
-- অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করছি মামী। ঠিক মেলাতে পারছি না।
-- বেশি চেষ্টা করো না । চুপচাপ ভেবে যাও ঠিক সময় মত আমি নিজেই মিলিয়ে দেবো এই অঙ্ক।
 বিনীতা খুব আস্তে করে কথাগুলো বললো আনন্দিকে 
-- বিষয়টা খুব জটিল। আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল। দাদার ছবি দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা, দাদা আসার সাথে সাথেই নিজেকে আয়নায় দাঁড়িয়ে একটু গুছিয়ে নেওয়া। সর্বোপরি যে মেয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে দাদার একটা কথাতেই থাকতে রাজি হয়ে যাওয়া - সবই আমার কাছে সন্দেহজনক ছিল।
-- বাব্বা! এ মেয়ের তো সাংঘাতিক বুদ্ধি দেখছি। এ তো ভেবে ভেবে আমি বলার আগেই জাল ছিঁড়ে ফেলবে।
-- সেই থেকে আমি শুনছি তোরা দু'জনেই চুপিচুপি কিছু আলোচনা করেই চলেছিস। কোন পার্টি তোদের
অনল ঘাড় ঘুরিয়ে আনন্দির দিকে ফিরে জানতে চাইলো।
-- পার্টি পারিবারিক দাদা। কোন রঙ নেই।তবে ব্যাপারটা সিরিয়াস। তুই এত ভাবিস না। ম্যায় হুঁ না
-- তোকে কে বলল আমি কোন বিষয় নিয়ে ভাবছি
-- ভাবছিস ভাবছিস। কিন্তু প্রকাশ করছিস না
-- সে কী রে তুই তো অন্তর্যামী হয়ে গেলি রে -
এই প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে আনন্দি বলল 
 -- আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ দাদা?
বিনীতা উত্তর দেওয়ার আগেই অনল বলল,
-- আর বেশি দেরি নেই। এই এসে গেছি
-- তুই কীভাবে জানলি?
-- ওমা জানবো না কেন এখানে তো আমার বন্ধুর বাড়ি।
-- কিন্তু তুই তো সেই বন্ধুর বাড়িতে কোনদিন আসিসনি।
এমনভাবে আনন্দি কথাটা বলে গম্ভীর স্বরে অনল ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আনন্দির দিকে আর একবার বিনীতার দিকে তাকিয়ে চুপ করে যায় কারণ সামনেই দেখতে পায় বাড়ির গেটের কাছে বিজয় দাঁড়িয়ে। 

ক্রমশ 

    

Monday, May 11, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৫)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৫)

 রাতে অনেক চেষ্টা করেও অনল বিনীতার সাথে দেখা করতে কিংবা কথা বলতে পারে না। বিনীতারও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনলের সাথে কোন কথা হয় না। অনল ও আনন্দির ঘর একদম পাশাপাশি। একই ছাদের তলায় শুধু মাঝখানের একটা দেওয়াল দু'টি মানুষকে কয়েক হাজার দূরত্বে নিয়ে গেছে। দু'জনেই জেগে অধিক রাত পর্যন্ত কারও চোখেই কোন ঘুম নেই কিন্তু কেউই বেরিয়ে এসে কারও সাথে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না।
  বিনীতা শুয়েছে আনন্দির কাছে। যতক্ষণ না আনন্দি ঘুমিয়েছে সে বকবক করেই চলেছে। বিনীতা হু হা করে উত্তর দিয়েছে। কোন কথাই তার মাথায় ঢোকেনি।

  রাতের নীরবতা ভেদ করে পাশে শুয়ে থাকা 
রাত যেন একটু বেশিই গভীর । চারদিক নিস্তব্ধ, অথচ সেই নীরবতার মাঝেই যেন হাজারো না বলা কথা মনের ভিতর বারবার প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে এই অন্ধকার ভেদ করে।
অনল নিজের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে, কিন্তু তার মাথার ভেতরের চিন্তার গতি যেন তার থেকেও অনেক বেশি। বারবার মনে পড়ছে বিনীতার মুখটা—সেই হরিণী চোখ, বলতে চেয়েও সেই না বলা অপ্রকাশিত কথাগুলো।
সে নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করে— “যদি ও সত্যিই কথা বলতে চাইত, তাহলে কি একবারও বেরিয়ে আসত না?”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেরই যুক্তি ভেঙে পড়ে— “না, তা  কীকরে সম্ভব? আজই এই বাড়িতে ওর প্রথম দিন। ওর ভিতর লজ্জা আর ভয় দু'টোই  তো কাজ করবে।আমিই তো যাইনি…এটা তো আমার নিজের বাড়ি। আমিই তো দরজাটা খুলিনি সেই অজানা একটা ভয় আর লজ্জা তো আছেই।"
একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছে তার ভিতরে। বলতে চেয়েও সেই না বলা কথাগুলো মনের ভিতর তোলপাড় করে উঠছে। কিংবা ভালোবাসার লড়াই! একবার মনে হচ্ছে উঠে গিয়ে দরজায় নক করে,  একসাথে গিয়ে বাড়ির সবাইকে বলে দিই ওকে আমি অগ্নি সাক্ষী করে বিয়ে করেছি আইনত ও আমার স্ত্রী। আবার পরক্ষণেই একটা অজানা ভয় তাকে আটকে দিচ্ছে— “যদি ও আমার কথার সায় না দেয়? যদি ও সবকিছু অস্বীকার করে? ওর মনের কথাটাই তো এখনো শোনা হয়নি
এই একটা প্রশ্নই যেন তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে।

  ওদিকে ঠিক পাশের ঘরে, আনন্দির পাশে শুয়ে থাকা বিনীতার অবস্থাও আলাদা কিছু নয়।
আনন্দি অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দে বোঝা যাচ্ছে যে সে স্বপ্নের জগতে চলে গেছে। কিন্তু বিনীতার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। সে চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে, ঠিক যেমনটা অনল করছে অন্য ঘরে।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়… একবার শুধু ডাকে— “অনল…”
কিন্তু ঠোঁট পর্যন্ত এসে শব্দটা থেমে যাচ্ছে। তার নিজেরই মনে প্রশ্ন জাগছে— “কেন আমি যাব? সব? ওর বাড়ি এটা ওতো আসতেই পারতো বোনের ঘরে।তখন তো কিছু কথা অন্তত বলা যেত। তা না করে নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে আছে।
তার ভিতরেও একই লড়াই—অভিমান বনাম ভালোবাসা।
  হঠাৎ তার চোখের কোণে জল জমে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে জামার  তুলে মুছে নেয় —যদিও জানে, এই মুহূর্তে তাকে দেখার মতো কেউ নেই।
সে মনে মনে বলে— “তুমি কি একবারও ভাবছো না আমার কথা, অনল?”
অথচ একই সময়ে, ঠিক পাশের ঘরে অনলও মনে মনে বলছে— “তুমি কি একবারও আমাকে বলতে পারলে না কিছু, বিনীতা?”
একই ছাদের নিচে, মাত্র একটা দেওয়ালের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছে দুটো মন। অথচ সেই দেওয়ালটাই যেন আজ সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয়ে উঠেছে।
দু’জনেই অপেক্ষা করছে—কেউ একজন এগিয়ে আসবে, কেউ একজন ভাঙবে এই নীরবতা।
কিন্তু রাত বাড়তে থাকে, আর সেই অপেক্ষাও আরও গভীর হয়।
হয়তো ভালোবাসা আছে, খুব গভীরভাবেই আছে…
কিন্তু সেই ভালোবাসার উপর জমে থাকা অভিমান আর অপ্রকাশিত কথাগুলোই আজ তাদের সবচেয়ে বড় বাধা।
ফ্যানের একঘেয়ে শব্দ, ঘড়ির কাঁটার টিকটিক, আর দুটো অস্থির হৃদস্পন্দন—এই নিয়েই কেটে যায় রাতের প্রতিটা মুহূর্ত।
ভোর আসবে… আলো ফুটবে…
কিন্তু তাদের সম্পর্কের এই অন্ধকার কি কাটবে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে তাদেরই একটুখানি সাহসে… কে আগে বলবে " মাত্র ওই একটা দিনেই খুব ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়"
একটা মাত্র ডাকে…
 মাত্র একটা শব্দ "ভালবাসি।"

  খুব ভোরেই উঠে পড়ে বিনীতা। তখন বাড়ির কেউই উঠে পারেনি। ঘরের দরজা খুলে বাইরের ফুরফুরে হওয়ায় বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। কিন্তু একি? এত সকালে বারান্দার গ্রীল কে খুললো? নাকি কাল এত গোলোগুজবের মধ্যে বাইরের গ্রীল দিতেই ভুলে গেছে বাড়ির লোক। ভাবতে ভাবতে গ্রীল পেরিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ায়। সামনে দেখতে পায় অনল আম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে। হাতে বেশ কয়েকটা আম। হয়ত রাতে বাতাসে আমগুলি পড়ে গেছে।
 বিনীতা এগিয়ে যায় অনলের দিকে। বিনীতাকে দেখে অনল বলে,
-- এত সকালে উঠে পড়লে? ঘুম আসেনি রাতে তাই না?
-- কেন? তোমার ঘুম হয়নি রাতে?
-- কীকরে ঘুম আসবে বলো তো? তুমি তো মুখফুটে কোন কথা বলছো না?
-- কী জানতে চাইছো তুমি? এতদিন সাহস করে বাড়িতে জানাতেই পারোনি কিছু? আমার কাছ থেকে কী জানতে চাও বলো? সব কথা কী মুখফুটে বলার দরকার আছে? তুমি বুঝতে পারছো না এই বিয়েটা যদি আমি মেনে না নিতাম তাহলে তোমার গতকাল "কেউ বেরোবে না আজ কোথাও " - কথাটা শুনতাম? আর আমায় দেখে ভাবছো আমি তোমার দেওয়া সিঁদুর পরিনি তাই না?
 বিনীতা এলোমেলো চুলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে  মাথাটা অনলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-- দেখো তো এখানে সিঁদুরের চিহ্ন দেখতে পাও কিনা।
 অনল বিনীতার এই স্পষ্ট কথা শুনে হেসে পড়লো। বুকে হাত দিয়ে বলে উঠে,
-- যাক বাবা নিশ্চিত হতে পারলাম। আমিও সেদিনের পর থেকে একটা মুহূর্তের জন্যও তোমার কথা মন থেকে সরাতে পারিনি। অথচ আমরা কিন্তু আগে কেউ কাউকেই চিনতাম না। খুব ভালোবেসে ফেলেছি ওই একটা দিনেই।
 বিনীতা লজ্জা পেয়ে গেলো অনলের এই সরাসরি "ভালোবেসে ফেলেছি"- কথাটা শুনে।
-- এখন কিভাবে সব ম্যানেজ করবে?
-- ম্যানেজ আর কী? সম্বন্ধ করে তোমায় আবার বিয়ে করবো 
-- সে কী 
-- হ্যাঁ গো সেটাই করবো। আগে তো আজকে তোমাদের বাড়িতে যাই। বিজয়ের সাথে কথা বলি। চিন্তা করো না আমি সব ম্যানেজ করে নেবো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
-- আর আমাদের পাড়ার লোকজন?
-- বিয়েটা তো ওখানে হবে না। এই কলকাতাতেই বিয়ে, বৌভাত সব একবাড়িতেই হবে। আজকাল এসব হয়।
-- আমি এখন ভিতরে যাই। সবাই উঠে পড়বে আর উঠে যদি সবাই দেখে আমরা দু'জনে এখানে কথা বলছি বিশেষ করে আমার ননোদিনী তাহলে আজই ও আমাদের বিয়ে দিয়ে ছাড়বে।
 অনল হো হো করে হেসে ওঠে।
-- ঠিক চিনেছ তুমি আমার বোনকে। ওর মুখে সত্যিই কিছু আটকায় না। যাও তবে এখন ভিতরে? ও একটা কথা - বিজয়কে সব জানিয়েছ?
-- হ্যাঁ গতকালই জানিয়েছি
-- কী বললো?
-- বললো তোমার প্রতি ওর বিশ্বাস আছে তুমি সবকিছু ম্যানেজ করে নিতে পারবে।

  টিফিন করে ওরা বেরোনোর জন্য প্রস্তুত। অনলের বাবা এমনিতেই খুব কম কথা বলেন। বিনীতা তাকে প্রণাম করতে গেলে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেন,
-- তোমায় আমার খুব আপন মনেহয় মা। হয়ত আগের জনমে তুমি আমার কেউ ছিলে। আবার এসো আমাদের বাড়ি।
 অনল সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবা কথাটা বলার সাথে সাথে সে বিনীতার দিকে তাকিয়ে পড়ে। বিনীতা মুচকি হেসে এগিয়ে যায় অনলের মায়ের কাছে। তাঁকে প্রণাম করলে তিনিও আশীর্বাদ করে বিনীতাকে বলেন,
-- মনেহচ্ছে তোমাদের বাড়িতে আমারও একবার যেতে হবে। দেখি কবে নাগাদ যেতে পারি। তবে মা একটা কথা বলি, বাড়ি থেকে এতদূরে থাকো। চেষ্টা করো কলকাতায় বদলী হয়ে আসার।
  অনল, আনন্দি, বিনীতা আর ওর মামী গিয়ে গাড়িতে বসলেন।
 
ক্রমশ -

Sunday, May 10, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ পর্ব (২৪)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৪)

 অনলের মাথাতে কিছুতেই আসছে না এটা কিভাবে সম্ভব হল? সত্যিই কি তবে আমরা ঈশ্বরের হাতের পুতুল? তিনি সবকিছু নির্ধারণ করেন মানুষের জীবনের? আগেকারদিনের ঠিক যেন সেই সুতো বাঁধা পুতুলের মত। এখন কিভাবে অনল এগোবে সেটাই তো বুঝতে পারছে না।
 ওদিকে আনন্দি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলে উঠলো,
-- আমি ঠিক জানতাম দাদা এসে গেলে আমাদের আর বেরোতে দেবে না। চলো বিনীতা আমরা গিয়ে চেঞ্জ করে আসি।
 অনলের মা বললেন,
-- আরে দাঁড়া তোর দাদা ফ্রেস হয়ে আসুক। সকলে মিলে চা খাই। একটু টিফিনেরও ব্যবস্থা করি।
 কথাটা শুনেই অনলের মামা দেবদূত প্রায় চিৎকার করে উঠলেন
-- ওরে আমার বয়স হয়েছে ইরা ।এত খাওয়াস না আমায়। অসুস্থ হয়ে পড়বো আমি
 একএক করে টিফিন খাওয়া সকলে নসাৎ করে দিলো। অনলের মা তখন বিনীতাকে বললেন,
-- তুমি তো দুপুরেও তেমন কিছু খাওনি এখন কিছু করি মা তোমার জন্য। আমি তো অনলের জন্য সামান্য চিড়ের পোলাও করবো তুমি একটু খাও।
-- এখন আর কিছু খাবো না মা সিমা 
 বিনীতার মুখ থেকে প্রথমে মা কথাটা বেরিয়ে গেলেও সেটা পড়ে সে ঠিক ম্যানেজ করে নেয়। ইতিমধ্যে অনল এসে ঢোকে ডাইনিংয়ে। এসেই সে বিনীতার দিকে তাকিয়ে পড়ে। দু'জনে চোখাচোখি হয়। মুহুতেই দু'জনেই চোখ সরিয়ে নেয়। অনল ঠিক বিনীতার মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসে।
  দু’জনের সামনে একই টেবিল, অথচ মাঝখানে অদৃশ্য এক দূরত্ব। চারপাশে সবাই আছে—হাসি, গল্প, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ—সবই চলছে, কিন্তু অনল আর বিনীতার কাছে যেন সব শব্দই ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট।
অনল চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু তার চোখ বারবার নিজের অজান্তেই উঠে যাচ্ছে বিনীতার দিকে। সে নিজেকে সামলাতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। এতদিনের না বলা কথা, অভিমান, অপেক্ষা—সব একসাথে বুকের মধ্যে জমাট বেঁধে আছে।
বিনীতা প্রথমে চোখ নামিয়ে রাখলেও, তারও মন যেন স্থির নেই। চায়ের কাপটা হাতে নিয়েও সে চুমুক দিতে ভুলে যাচ্ছে। তার চোখের পাতা কাঁপছে, যেন প্রতিটা মুহূর্তে নিজেকে বোঝাতে চাইছে—“না, তাকাবি না… এখন নয়…”
কিন্তু ভালোবাসা কি কখনও এত সহজে মানে?
হঠাৎই এক মুহূর্তে, যেন অজান্তেই, দু’জনের চোখ আবার মিলল।
সেই চোখাচোখিতে ছিল না কোনো কথা—
ছিল শুধুই অগণিত প্রশ্ন,
অগণিত উত্তর,
আর না বলা হাজার অনুভূতি।
অনলের চোখ যেন বলছে—
“তুমি কেন এতদিন আমায় ফোন করোনি?”
“ তুমি নিজেও তো একটা ফোন করতে পারতে? দাদা তো তোমায় নম্বর দিয়েছে…”
 তাদের এই নীরবতা দু'জনের কাছেই অনেককিছু প্রশ্ন আর উত্তর হয়ে  পৌঁছে যাচ্ছে। এতগুলো মানুষ এত কাছে থেকেও কেউ কিচ্ছুটি টের পাচ্ছে না।
অনল চা খেয়ে আস্তে করে টেবিলের উপর কাপপ্লেট রেখে হাতটা না নামিয়ে নিজের হাতটা একটু এগিয়ে রাখে—খুব সামান্য, যেন কেউ বুঝতে না পারে।
ঠিক সেই সময় বিনীতা, কিছুটা অচেতনভাবেই, নিজের কাপপ্লেটটা টেবিলে রাখে।

 দু’জনের আঙুল স্পর্শ করলো না…
কিন্তু খুব কাছে এসে থেমে গেল।
সেই সামান্য দূরত্বটাই যেন তাদের সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি—
ছোঁয়া যায়, তবুও ছোঁয়া যায় না।
আনন্দি হঠাৎই বলে উঠলো,
— কি রে, তোরা এত চুপচাপ কেন?
দু’জনেই চমকে উঠে দ্রুত নিজেদের স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
অনল হালকা হেসে বলল, 
-- পরিচয় তো সবে হল। সময় দে বন্ধুত্ব করবার।
-- কিন্তু দাদা আমার মনেহচ্ছে তোরা যেভাবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছিস যেন তোরা আগে থাকতেই একে অপরকে চিনিস
আনন্দি ফিসফিস করে অনলের কানের কাছে বলে।
 অনল চুল টেনে বোনের বলে,
-- বড্ড ফাজিল তুই। চুপচাপ বোস তো দেখি
 বিনীতা অবাক হয়ে জানতে চাইলো 
-- কী বলল ও?
— কিছু না, এমনি…
কিন্তু তার চোখ আবার একবার বিনীতার দিকে চলে গেল।
বিনীতা এবার চোখ সরাল না। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও, সে তাকিয়ে রইলো—একটু অভিমান, একটু লজ্জা, আর গভীর ভালোবাসা মেশানো সেই দৃষ্টিতে।
মনে মনে সে শুধু একটা কথাই বলল—
“ এখনো বাড়িতে কিছুই বলে উঠতে পারোনি?…”
আর অনল, সেই দৃষ্টি বুঝে নিয়েই, নিজের মনে নিঃশব্দে উত্তর দিল—
“ বলবো সব বলবো। এবার বলার সময় এসে গেছে…।বলে দিলেই তো বলা হয়ে গেলো। বেশ তো লাগছে এই মুহূর্তগুলি। আস্তে আস্তে সেই কলেজ লাইফের প্রেমের মত প্রেমটা জমুকনা! 
হঠাৎ তোমায় দেখলাম আর বিয়ে হয়ে গেলো। তার চেয়ে এইভাবে প্রেম পর্বটা জমিয়ে আমরা আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসি নাহয় -
চারপাশে তখনও গল্প, হাসি, চায়ের আড্ডা চলছে—
কিন্তু সেই মুহূর্তে, অনল আর বিনীতার জন্য পুরো পৃথিবীটা যেন থেমে গেছে,
শুধু তাদের চোখের ভাষাটাই কথা বলছে… 
 ঠিক ভালোবাসা হওয়ার সেই আগের মুহূর্ত।
 বিনীতা এবং অনল দু'জনেই একটু নিরিবিলি চাইছে যাতে কথা বলার সুযোগ পায়। কিন্তু এত লোকের ভিড়ে সে সুযোগ পাওয়া সম্ভব নয়। ভাবতে লাগলো কী করা যায়।
 হঠাৎ লোডশেডিং। মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলের উপর রাখা। মামা,মামী গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে আর ভারতবর্ষের লোডশেডিংয়ের পি*ণ্ডী চটকাতে চটকাতে ছাদে উঠে গেলেন। আনন্দি তার ঘরে গেলো ইমারজেন্সি লাইটটা আনতে। অনলের বাবা গিয়ে বসলেন বড় বারান্দায়। মা মোমবাতি জ্বালিয়ে রান্নাঘরে।
 ডাইনিংয়ে শুধুমাত্র অনল আর বিনীতা।সুযোগ পেয়েই অনল শুরু করলো খুব চাপাস্বরে -
-- আমি কিন্তু ভীষণভাবে আশা করেছিলাম আমায় ফোন করবে। এই ক'টামাসে এমন কোন দিন নেই আমি তোমার ফোনের আশা করিনি।
-- আমায় দাদা জানিয়েছিল সে তোমায় নম্বর দিয়েছে। আমিও তোমার ফোনের আশা করতাম। তারপর দেখলাম তুমি আর ফোন করলে না তখন ধরেই নিয়েছিলাম সেদিনের ঘটনাটা হয়ত হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফল তুমি কোন যোগাযোগ রাখতে চাও না বলেই হয়ত আর ফোন করলে না।
-- কাল আমি গিয়ে তোমায় পৌঁছে দেবো।
-- তা কীকরে সম্ভব? মাসীমণি তো মায়ের সাথে দেখা করতে যাবে।
-- আরে মামী আমার মাইডিয়ার। ঠিক ম্যানেজ করে নেবো। আর হ্যাঁ এবার চেষ্টা করো শিলিগুড়ি থেকে বদলি হয়ে কলকাতার দিকে আসবার।
-- এই বাড়ির কাছে
 মুখে বিনীতার দুষ্টু হাসি
-- হ্যাঁ এই বাড়ির কাছে। প্রথম বিয়েটা বাড়িতে জানাতে না পারলেও এই মেয়েটাকে আমার ভালো লেগেছে বিয়ে করতে চাই - বাড়িতে এই কথাটুকুই যথেষ্ঠ। আর একবার তোমায় বিয়ে করে নেবো। কিন্তু বদলিটা তো হতে হবে। 
অনল হাসতে থাকে মুখে হাত দিয়ে
 অনলের কথা শেষ হতেই আনন্দি তার ঘরের ইমার্জেন্সী লাইট নিয়ে চলে এলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিকও চলে এসেছে। 
-- এই দাদা তোরা এতক্ষণ কী কথা বলছিলি?
-- তাহলে তোকে জানানোর জন্য প্রথম থেকে আবার শুরু করি? 
 অনলের কথা বলার ধরণ দেখে বিনীতা হেসে ফেলে। শুরু হয়ে যায় দুই ভাইবোনের খুনসুটি। ততক্ষণে ছাদ থেকে মামা,মামীও নেমে নিচুতে এসেছেন। 
 -- মামী, কাল আমি বিনীতাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো। তোমাকে আর কষ্ট করে যেতে হবে না।
 সঙ্গে সঙ্গে মামী বলে উঠলেন
-- ওরে আমি তো আমার সইয়ের সাথে দেখা করতে যাবো। তুই পৌঁছে দিয়ে আসলে কীকরে হবে?
 -- এটা তো ভেবে দেখিনি। তাহলে সবাই এক কাজ করি আমরা সবাই মিলে একবেলা বিনীতাদের বাড়িতে খেয়েদেয়ে একটু ঘোরাঘুরি করেই কলকাতা ফিরি।
 বিনীতা চুপ করেই বসে আছে। যা বলার অনলই বলে চলেছে। সকলের মত নিয়ে ঠিক হল আগামীকাল সকালে মামী, অনল,আনন্দি আর বিনীতা টিফিন করে বেরিয়ে যাবে ফিরবে সেই সন্ধ্যায়।
 রাতে খাবার টেবিলে সবাই বসে। অনলের মা ইরাদেবী একাই সকলকে পরিবেশন করছিলেন। বিনীতা উঠে গিয়ে বলল,
-- মাসিমা আমি আপনাকে একটু হেল্প করি। সেই থেকে গরমে রান্নাবান্না করলেন।
-- না না মা তুমি একদিনের জন্য এসেছো। তুমি বোসো আমিই সকলকে পরিবেশন করছি।
-- কিছু হবে না। আমিও আপনার এক মেয়েরই মত।
 ইরাদেবী হেসে পড়লেন। আনন্দি মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
-- মা দেখো একে পছন্দ হলে ছেলের বৌ করতে পারো। কথা বলে দেখেছি কোথাও কোন প্রেমট্রেম নেই।
-- অনল পাশেই বসে খাচ্ছিল। তার কানে কিছু কথা গেছে। সেও ঝুঁকে পড়ে মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-- আমার কিন্তু কোন আপত্তি নেই 

ক্রমশ
 

Saturday, May 9, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২৩)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৩)

 বিনীতার নানান ভাবনার মাঝে হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। দেখে দাদা ফোন করেছে। ফোনটা কানে দিয়ে হ্যালো বলতেই বিজয় বলে উঠলো,
-- বেড়িয়েছিস? 
 এদিকে ফোনটা রিং হওয়ার সাথে সাথে আনন্দি বলল,
-- বিনীতা তুমি কথা বলতে লাগো আমি একটু আসছি।
 বিনীতা ফোনটা কানে চেপে ধরে জানলার কাছে গিয়ে চাপাস্বরে দাদাকে বলল,
-- না, এখনো বের হইনি। কিন্তু দাদা একটা মারত্মক ঘটনা ঘটেছে।
-- কী হয়েছে? কোন খারাপ কিছু? 
-- খারাপ কী ভালো বুঝতে পারছি না।
-- হেঁয়ালি না করে সরাসরি সব বল।
-- বলছি বলছি।
 কানে আরও বেশি করে ফোনটা চেপে ধরে খুব আস্তে করে বিনীতা তার দাদাকে জানালো
-- আরে আমি যে বাড়িটাই এসেছি সেটা অনলদের বাড়ি
-- মানে 
-- মায়ের ছেলেবেলার বন্ধু হচ্ছেন অনলের আপন মামী
-- ও মাই গড! অনলের সাথে দেখা হয়েছে? তুই কে কেউ কিছু বুঝতে পেরেছে?
-- তোর মাথাটাই গেছে। ওরা কীভাবে বুঝবে আমি এবাড়ির কে? অনল এখনো অফিস থেকেই ফেরেনি। মাসীমণি একটু পরেই আমায় নিয়ে বেরোবেন। দেখা হবে কিনা তাও জানি না।
-- আরে দেখা তো করতেই হবে। দরকার হলে আজ রাতটা ওখানেই থেকে যা। 
-- তারা থাকতে না বললে আমি কি নিজের থেকে বলবো নাকি?
-- সেও তো এককথা। এত দেখি তোর জীবনের নাটক একেবারে জমে উঠেছে। 

  তারপর বিজয় একটু হেসে বলল,
-- নাটক না, একেবারে সিনেমা চলছে তোর জীবনে! তবে শোন, মাথা ঠান্ডা রেখে সবকিছু সামলাস। আবেগে কিছু বলে ফেলিস না যেন।
বিনীতা একটু থেমে নিচু গলায় বলল,
-- দাদা, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কী করবো। হঠাৎ করে যদি অনলের সামনে পড়ে যাই… কী বলবো ওকে?
-- তোকে কিছু বলতে হবে না। তুই চুপ থাকবি। ও তোকে তো কনের সাজে দেখেছিল। দেখ তোকে চিনতে পারে কিনা। তবে আমি আমার বন্ধুকে যতদুর চিনি ও তোকে ঠিক চিনতে পারবে। ও কী বলে বাড়িতে, এখনই কিছু বলতে চায় কিনা সেসব তো আমরা কিছুই জানি না। তবে যা হবে ভালোর জন্যই হবে। হুট করে তোর অনলের সাথে বিয়ে হওয়া আর এইভাবে ওই বাড়িতে পৌঁছে যাওয়া সব বিধাতা অঙ্ক কষেই করছেন। ওর সাথে দেখা হলে তুই একদম চুপ থাকবি। শুধু দেখবি ওর আচরণ কেমন।
-- কিন্তু ও যদি না চিনতে পারে?
-- আরে পারবে পারবে। আর না চিনলেও তুই নিজেকে সামলে নিলেই হবে। আমি মাকে সবটা জানাচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে ভাবিস না। 
কথা বলতে বলতে বিনীতা জানলার বাইরে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-- জানিস দাদা, বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে… মনে হচ্ছে অনেকদিনের জমে থাকা কিছু একটা আজ সামনে আসতে চলেছে।
বিজয় একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
-- এটাই তো জীবন রে বোন !কখন কার সাথে, কীভাবে দেখা হয়ে যাবে কেউ জানে না। তবে একটা কথা মনে রাখিস—নিজেকে ছোট করে কিছু বলবি না। তুই যা, যেমন, সেটাই থাকবি।
-- হুম… আমাকে তো চিনিস। নিজেকে ছোট করে আমি আমার প্রাপ্য পেতে চাই না। তবে ওরা যদি আমায় থাকতে না বলে আমি কিন্তু নিজের থেকে এখানে থাকতে চাইবো না।
-- সেতো অবশ্যই।আর একটা কথা, অনল যদি সত্যিই তোকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে সে নিজেই এগিয়ে আসবে। তোকে জোর করে কিছু করতে হবে না। আর আমি জানি মাত্র একটা দিনেই অনল তোকে ভালোবেসে ফেলেছে। কারণ ওর সাথে আমার ফোনে কথা হয়েছে আগেই। ওর কথা শুনে আমার এটাই মনে হয়েছে। ও এগোতে পারছে না কারণ তোর দিক থেকে কোন সাড়া ও পায়নি।
বিনীতা হালকা হেসে বলল,
-- আমি জানি না দাদা কী হচ্ছে আর কী হতে চলেছে।
-- যা হবে ভালোই হবে। কিচ্ছু ভাবিস না।
-- হঠাৎ করে এখানে এসে পড়ে আর এই বাড়িটাই অনলদের বাড়ি জেনে আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। মাথাটাই কাজ করছে না।
-- তোর মুখে এসব শুনতে আমার ভালো লাগে নারে। তুই তো দুর্বল নোস ।
-- এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি যে দুর্বল হতে বাধ্য হচ্ছি।
--আচ্ছা আচ্ছা, এখন বেশি ইমোশনাল হবি না। 
  ঠিক তখনই পিছন থেকে আনন্দির গলা শোনা গেল,
-- বিনীতা, আমি রেডি। তুমি কি রেডি হয়ে গেছো?
বিনীতা তাড়াতাড়ি ফিসফিস করে বলল,
-- দাদা, পরে কথা বলবো। ওরা এসে গেছে। এবার মনেহয় বেরোতে হবে
-- ঠিক আছে, আপডেট দিতে ভুলিস না কিন্তু!
-- আচ্ছা, রাখছি।
ফোনটা কেটে দিয়ে বিনীতা একবার নিজের মুখটা আয়নায় দেখল। চোখে স্পষ্ট উত্তেজনা আর অজানা এক আশঙ্কা। নিজের মনকে শক্ত করে নিয়ে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল…
আজ হয়তো সত্যিই তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
 -- বলছিলাম কী রেডি আমি, মামী দুজনেই। কিন্তু আজকের রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে গেলে হত না?
 এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল বিনীতা।
--  হ্যাঁ সে থাকা যেতেই পারে। কিন্তু থাকলে লাভটা কী হবে?
 বিনীতা হাসতে থাকে।
-- লাভ বলতে আমরা সারাটা রাত গল্প করতে পারবো।মামিমারও একটু বিশ্রাম হবে এই আর কী?
 বিনীতারও যে থাকার ইচ্ছা সেটা তো বুঝতে দেওয়া যাবে না। তাই অভিনয়টা কিছুক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে অন্তত অনল না ফেরা পর্যন্ত।
বিনীতা ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে নিতে বলল,
-- দেখো আজ যদি আমি চলে যাই'ও তোমাদের আমার এত ভালো লেগেছে আমি আবারও আসবো তোমাদের কাছে।
 এরই মধ্যে কলিংবেল বেজে উঠলো। আনন্দি বলে উঠলো 
-- ওই দাদা এসে গেছে। এবার আর বেরোনো হবে না
-- ওমা কেন? তোমার দাদা কি মানুষকে বাড়িতে আটকে  রাখে নাকি?
-- কোন মানুষকে এখনো আটকে রাখতে দেখিনি। কিন্তু তুমি এত সুন্দরী তোমায় আটকে দিতেও পারে।
-- এই তোমার মুখে কিছুই আটকায় না কেন? এইভাবে কেউ বলে?
-- দেখো আমার মনে যা আসে আমি তাই বলে ফেলি। দেখাই যাক না দাদা তোমাদের যেতে দেয় কিনা।

  অনল মামা,মামীকে দেখেই প্রণাম করে জানতে চায়,
-- ভালো আছো তো তোমরা? কত বছর বাদে তোমাদের দেখলাম বলো তো? 
মামা ভাগ্নেকে বুকের সাথে চেপে ধরে বললেন,
-- আরে ভালো আছি বলেই তো এতদূর আসতে পারলাম। এখন বল তুই কেমন আছিস? বৌমা কবে আসবে ঘরে? এবার একদম বৌমাকে এনে তবে ফিরবো।
 অনল মৃদু হেসে দিয়ে বলে,
-- আসবে আসবে।সময় হলেই আসবে। সবকিছুর একটা সময় আছে তো। সবে মাত্র চাকরি পেয়েছি এরই মধ্যে বিয়ে নিয়ে ভাবলে চলে?
 বিনীতা রেডি হয়ে আনন্দির সাথে ড্রয়িংরুমে এসে ঢোকে। সে বিনীতার দিকে না তাকিয়েই বোনকে বলে,
-- এই ভর সন্ধ্যাবেলায় সেজেগুজে কোথায় চললি?
 কথাটা বলেই পাশে তাকিয়ে দেখে বিনীতা দাঁড়িয়ে। বিনীতার মুখের দিকে তাকিয়ে অনল পুরো থ। এ কাকে দেখছে সে? কিভাবে এখানে এলো? কার সাথে এলো?বাড়ি চিনলো কীকরে?
 অনলের অবাক করা মুখের দিকে তাকিয়েই বিনীতা নিচের দিকে চোখ নামিয়ে নিলো। কিন্তু অনলের মুখ থেকে আর একটাও কথা বের হচ্ছে না। সে বিনীতাকে দেখে একেবারে বোবা হয়ে গেছে।
 এদিকে মামা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে এবার তোমরা বেরিয়ে পড়ো। আর শোনো পৌঁছাতে যদি খুব বেশি রাত হয় আজ আর তোমরা ফিরো না। কাল সকালেই ফিরো।
 অনল বুঝতে পারছে না কারা বেরোচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কাদের রাত হলে ফিরতে নিষেধ করা হচ্ছে। সে হতভম্বের মতই বিনীতার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। বিনীতা সেই যে মাথা নিচু করেছে আর মাথা তোলেনি।
 মামা তখন বললেন,
-- হ্যাঁরে অনল তুই একটা উবের বুক করে দে তো। তোর মামীর পাল্লায় পড়ে মেয়েটার বাড়ি পৌঁছাতে কত দেরি হল। ওর মা,ভাই কত চিন্তা করছেন বলতো?
 অনল সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ঘরে যেতে যেতে বলল,
-- এই সন্ধ্যাবেলায় কেউ কোথাও যাবে না। মামীর বয়স হয়েছে। এতটা জার্নি করে এসেছেন। আবার এখন বেরোবেন। ওটা একটু গ্রামের দিকে বাড়ি। তিনজন মহিলাকে ছাড়া যাবে না।
 মামা অবাক হয়ে বলে উঠলেন,
-- ওরে তোকে তো এখনো আমি লোকেশন পাঠাইনি। তুই কীভাবে বুঝলি ওটা একটু গ্রামের ভিতর 
 অনল নিজের জিহবা নিজেই কামড়ে নিল। বিনীতা মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে পড়লো। অনল যেন মামার কথা শুনতেই পায়নি এমন ভাব দেখিয়ে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলো 

ক্রমশ 

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২২)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২২)

 সঙ্গে সঙ্গে মামী ওকে জানান
-- তুই ওকে কীকরে চিনবি রে! ও হচ্ছে আমার ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে। সেই ছোটবেলায় ওকে দেখেছি।শিলিগুড়িতে ওর সাথে দেখা। মুখটা খুব চেনা চেনা লাগছে দেখে নিজেই এগিয়ে গিয়ে এয়ারপোর্টে ওর সাথে কথা বলি। তারপর ওকে সাথে নিয়েই এখানে আসলাম। এবেলাটা ও থাকবে। বিকেলবেলা একটা গাড়ি বুক করে ওকে আমি নিজে গিয়ে পৌঁছে দেবো। আসলে ওর মায়ের সাথে দেখা করাটাই আমার মূল উদ্দেশ্য। 
আনন্দি মেয়েটির পাশে বসে জানতে চাইলো
-- আমরা সমবয়সীই হবো হয়ত। তাই তুমি করেই বলছি।
-- আমি আনন্দি তোমার নাম কী গো?
-- আমি বিনীতা। শীলীগুলি আমি টিচারি করি। বাড়ি কলকাতার কাছেই। তবে একটু গ্রামের দিকে। প্রায় তিনমাস পরে বাড়ি ফিরছি। স্কুলে দিন সাতেকের ছুটি পড়েছে। মাসিমনি কিছুতেই ছাড়লেন না। তাই আসতে বাধ্য হলাম। বাড়ি যাওয়ার জন্য মনটা আকুপাকু করছে।
-- খুব ভালো হয়েছে এখানে আসলে বলেই তো তোমার সাথে পরিচিত হতে পারলাম। তুমি আমার ঘরে চলো। মামা আর মায়ের কথা শেষ হবে না। একটু ফ্রেস হয়ে নেবে চলো।
 বিনীতা উঠে আনন্দির সাথে তার ঘরে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে একটু হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে এলো। তারপর কিছুক্ষণ একথা সেকথার পর বিনীতা উঠে গিয়ে দেওয়ালে টাঙ্গানো ওদের পরিবারের বাঁধানো ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটা ছবিতে গিয়ে চোখ আটকে গেলো। একি! কে এ? আমি এখানে কাকে দেখছি? নানা এটা কিভাবে সম্ভব? নিশ্চয়ই আমার কোন ভুল হচ্ছে। একদৃষ্টে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে বিনীতা। আনন্দি সেটা দেখতে পেয়ে বলল,
-- এই ছবিটাতে আমরা দুই ভাইবোন আর মা,বাবা। এটা আমার দাদা। এই কয়েকমাস হল দাদা চাকরি পেয়েছে। 
 ঠিক এই সময় আনন্দির মা খেতে ডাকলেন। বিনীতার মাথায় কিছুই ঢুকছে না কী হচ্ছে ওর সাথে এসব? হঠাৎ করে ও এখানে এসে উপস্থিত হল কীভাবে? সত্যিই কি আমাদের সবকিছু বিধাতার হাতে? আমাদের হাতে কিছুই নেই? এবার কি তার জীবনের জট খুলতে চলেছে? নাকি কোন অশনিসংকেত আসতে চলেছে? 
 বিনীতাকে হাত ধরে টেনে আনে আনন্দি কারণ বিনীতাকে দু'বার ডাকার পরেও সে অন্যমনস্কভাবে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। 

খাওয়ার টেবিলে বসতেই আনন্দির মা হেসে বললেন,
— এসো মা, এতক্ষণ গল্প করছিলে বুঝি? চল, আগে খাওয়া হোক, তারপর আবার গল্প করা যাবে।
 বিনীতা বুঝতে পারে উনি অনলের মা। কোথায় যেন একটা ভয় বিনীতার ভিতরে কাজ করতে লাগলো। তবুও বিনীতা মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
— হ্যাঁ আনন্দির সাথে গল্প করে খুব ভালো লাগলো।
উনি প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বললেন,
— ভালো লাগবেই তো! আনন্দির তো কথার শেষ নেই। কথা বলার লোক পেলেই বকবক করে তার মাথা খারাপ করে দেয়।
আনন্দি একটু অভিমানী গলায় বললো,
— এই যে! এসব বলবে না তুমি। ভালো মানুষেরা একটু বেশি কথা বলে। তার ভিতর কোন প্যাঁচ থাকে না।
সবাই হেসে উঠলো।
খাওয়া শুরু হতেই আনন্দি আবার বিনীতার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো,
— তোমার স্কুলটা কোথায় বললে?
— শিলিগুড়ির একটু বাইরে। ছোট্ট একটা গ্রাম, কিন্তু খুব সুন্দর। বাচ্চাগুলোও খুব মিষ্টি।
— তোমার কি বাড়ি খুব মনে পড়ছে?
বিনীতা একটু থেমে বললো,
— হ্যাঁ… খুব। আসলে এতদিন পরে ফিরছি তো… মা-কে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। জানিয়েছি মাসীমণি জোর করে নিয়ে এসেছেন। যেতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তবুও কেমন যেন লাগছে।
তার চোখের কোণে যেন হালকা জল চিকচিক করে উঠলো, কিন্তু সে সামলে নিলো।
মামী সেটা লক্ষ্য করে বললেন,
— আরে বাবা, এত মন খারাপের কী আছে? একটা বেলা এখানে থাক, বিকেলে তোকে ঠিক পৌঁছে দেবো। তোর মাকে তো আমি সেকথা বলেই দিয়েছি। কিচ্ছু হবে না।
— জানি মাসীমণি… তবুও…
আনন্দি সঙ্গে সঙ্গে হাতটা ধরে বললো,
— আচ্ছা শোনো, একদম মন খারাপ কোরো না। আমরা দুপুরে অনেক গল্প করবো, তারপর ছাদে গিয়ে আমার বাগান দেখাবো। মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা তো। ও দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
 ছবিটা দেখার পর থেকে বিনীতার বাড়ি ফেরার তাড়ার থেকেও অনল কখন আসবে, কখন তার সাথে দেখা হবে, সে বিষয়টাকে কীভাবে ম্যানেজ করবে এগুলোই ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তার মনেহচ্ছে যদি তাকে কেউ আজ এখানে থেকে যেতেও বলে সে থেকে যাবে। জীবনের সবচেয়ে জট পাকানোর বিষয়টার একটা, দুটো জট যদি খুলতে পারে।
বিনীতা একটু হেসে বললো,
— ঠিক আছে, দেখি তুমি কতটা পারো!
খাওয়া শেষ হতেই সবাই একটু বিশ্রাম নিতে গেল। আনন্দি কিন্তু ছাড়ার পাত্র নয়। সে বিনীতাকে টেনে নিয়ে নিজের ঘরে গেল।
ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে বললো,
— এবার বলো, ওই ছবিটার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলে কেন? দাদাকে চেনো নাকি? নাকি দাদাকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেলে? 
কথাটা বলেই হাহা করে হেসে উঠলো।
বিনীতা চমকে উঠলো, এ মেয়ের মুখে তো কিছুই আটকায় না। মনেমনে নিজেকে সংযত করে নিজের মনে নিজেই বলল," বিনীতা খুব সাবধান। বেফাঁস কিছু বলে ফেলে ধরা পড়ে যেও না।"
— এ বাবা! কিসব প্রশ্ন? আসলে ছবিটা খুব সুন্দর উঠেছে। ব্যাকগ্রাউন্ডটাও খুব সুন্দর। এটাই মনেহচ্ছে ছাদের ফুলের বাগান তোমার।
-- হ্যাগো ছাদে তোলা এটা। তবে শোনো আমি সাইকোলজি নিয়ে পড়ছি। মানুষের মন বুঝতে পারি। 
তাই খুব তাড়াতাড়ি মানুষ চিনতে পারি। তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা আছে ব্যাপার। কী ব্যাপার বলো তো?
বিনীতা একটু চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো,
— একজন মানুষের সাথে তোমার দাদার চেহারার খুব মিল। তাই দেখছিলাম আর কি!
আনন্দির চোখ বড় হয়ে গেলো,
— ওহ্! মানে গল্পটা ইন্টারেস্টিং!
— ইন্টারেস্টিং না… একটু জটিল।
— নামটা বলবে কে সেই মানুষটা?
বিনীতা জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। দূরে রোদের আলো পড়েছে, হালকা বাতাস বইছে। সেই দিকে তাকিয়েই আস্তে করে বললো,
— অনেকদিন আগের কথা তো নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। আরে ছাড়ো এসব আমরা অন্য কথা বলি। 

আনন্দি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো। সে বুঝতে পারলো, এই নামটা না বলার মধ্যে অনেক না বলা কথা লুকিয়ে আছে। প্রথমদিনেই বেচারাকে আর ঘাটা ঠিক হবে না।
-- আমার পেট থেকে তো কথা বের করে চলেছ। এবার নিজের কথা কিছু বলো তো -
-- আমার কথা? কী জানতে চাও বলো। আচ্ছা আমিই বলছি। আপাতত জীবনে কেউ আসেনি। আসার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ 'নো এন্ট্রি ' সাইন বোর্ড ঝুলানো আপাতত। কারণ নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে চলার ইচ্ছা একদম নেই।
-- তুমি দারুন কথা বলো।
-- থ্যাঙ্ক ইউ,থ্যাঙ্ক ইউ ।তবে কী জানো আমার মতে জীবনে বিয়েটাই শেষ কথা নয়। 
-- কথাটা সত্যি হলেও মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে পরিবারের মানুষজন ভাবে মেয়েকে বিয়ে দিতেই হবে।
 প্রতিটা মুহূর্তই বিনীতা ভাবছে আনন্দি হয়ত ওর দাদার কোন প্রসঙ্গ তুলবে কিন্তু আলোচনাটা সেদিকে টাইতেই পারছে না। হঠাৎ আনন্দি বলে উঠলো,
-- আমি তো দাদাকে বলেই দিয়েছে তোর ইচ্ছে হলে তুই বিয়ে কর, সংসার কর আমার দ্বারা ওসব হবে না। আমি আমার মা,বাবা যতদিন বাঁচবেন তাঁদের কাছেই থাকবো।
-- শুনে দাদা কী বললেন?
-- আমার দাদার জীবনে বিয়ে,সংসার,সন্তান অনেক স্বপ্ন। বিয়ে নিয়ে যে সে কত স্বপ্ন দেখে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
-- তোমার নাম তো আনন্দি । তোমার দাদার নামটা কী?
-- দাদার নাম অনল।
 বিনীতার বুকের ভিতর ধক করে উঠলো। ঈশ্বরের কী লীলা দেখো। ঈশ্বর ঠিক তাকে সঠিক জায়গায় এনে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু কীভাবে এখন অনল এসে সবটা ম্যানেজ করবে? আজই সব সে বলে দেবে নাকি? একটা আশা আর অনেকটা ভয় মিলিয়েমিশিয়ে বিনীতা অপেক্ষা করে আছে কখন অনল ফিরবে।

  বিকেলের রোদ তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেটা ভাবলেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু হঠাৎ করে এই বাড়িতে উপস্থিত হওয়াটা যেন নতুন করে কিছু শুরু করার ইঙ্গিত দিচ্ছে… হবে কি জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে কাছে পাওয়ার অবসান? সে কি সেই দিনের কথা মনে রেখেছে? দিনান্তে একবারও কি সেই বিনীতা মেয়েটার কথা তার মনে পড়ে। পাবে কি সে আজ সব প্রশ্নের উত্তর?

ক্রমশ…

Friday, May 8, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (২১ পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২১)

    আজ রবিবার। অনলের অফিস নেই, তাই বাজারে যাওয়াটা যেন তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই এই অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে। বাড়ির সামনের ছোটখাটো জিনিসপত্র বাবা কিনে নিলেও, বড় বাজারটা অনলই করে।
  বাড়ি থেকে বেরিয়েই পাড়ার ক্লাব। প্রতিদিন সকালে ক্লাবের সামনে ছোট্ট একটা বাজার বসে—কেউ মাছ নিয়ে বসেছে, কেউ সবজি, কেউ বা ডিম। ভোরের হালকা রোদ, আর তার সঙ্গে মিশে থাকা কাঁচা মাছ আর ধনেপাতার গন্ধ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম সকাল।
অনল ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে এগোয়। কিন্তু আজ তার মনটা যেন কোথাও আটকে আছে। প্রতিটা মুহূর্তে মনে পড়ছে বিনীতার কথা।
কয়েকদিন হয়ে গেল, তবুও বিনীতার কোনও ফোন নেই।
— “আমি কি ফোন করবো?”
মনে মনে প্রশ্নটা আসে।
তারপরই নিজেই নিজেকে থামিয়ে দেয়—
— “না… ও আগে করুক। আমি কেন সবসময় আগে এগোবো?”
কিন্তু কথাগুলো যতই শক্ত করে ভাবুক, মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা থেকে যাচ্ছে।
“এই অনল! কী রে, আজ এত চুপচাপ?”
পাশ থেকে ডেকে ওঠে সঞ্জয়, পাড়ারই এক ছেলে, মাছ বিক্রি করে।
অনল একটু চমকে তাকায়—
— “না রে, কিছু না… কই, কেমন আছিস?”
সঞ্জয় হেসে বলে—
— “আমি তো ভালোই আছি। তুই বল, কেমন চলছে? শুনলাম বড় অফিসার হয়ে গেছিস!”
অনল হেসে উড়িয়ে দেয়—
— “ধুর, অফিসার আবার কী! চাকরি করছি, এই যা।”
মাছ নিতে নিতে অনল হঠাৎ খেয়াল করে, পাশেই এক মেয়ে দাঁড়িয়ে। সাদা-নীল সালোয়ার, চুলটা খোলা…
এক মুহূর্তের জন্য তার বুক ধক করে ওঠে—
বিনীতা!
কিন্তু না…
ভালো করে তাকাতেই বুঝতে পারে, সে অন্য কেউ। যাকে দেখে এখন প্রথমে তাকেই যেন অনলের বিনীতা বলে মনে হয়।
নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
সবজি, মাছ কেনা শেষ করে অনল যখন বাড়ির দিকে ফিরছে, তখন তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
“বিনীতা কি সত্যিই আমার কথা ভাবছে না?”
বাড়িতে ঢুকতেই মা জিজ্ঞেস করে—
— “এত দেরি করলি কেন রে?”
— “কিছু না মা, একটু ভিড় ছিল।”
মা আর কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
অনল নিজের ঘরে এসে ব্যাগটা রেখে বিছানায় বসে পড়ে।
টেবিলের উপর মোবাইলটা পড়ে আছে।
সে একবার সেটার দিকে তাকায়…
আবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ পর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে মোবাইলটা হাতে তুলে নেয়।
স্ক্রিন আনলক করে—
বিনীতা নামটা সে এতবার বের করে দেখেছে এখন নম্বরটা যেন মুখস্থ হয়ে গেছে।
আঙুলটা কল বাটনের উপর গিয়ে থেমে যায়।
— “না… আজও না।”
সে ফোনটা আবার রেখে দেয়।
ঠিক সেই সময়—
 এইভাবেই দিন গড়িয়ে যেতে থাকে। প্রতিটা মুহূর্ত প্রতিটা ক্ষণ বিনীতা অনলের মনপ্রাণ জুড়ে থাকলেও সে কেন যেন নিজের ইগো ঝেড়ে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছে না। অনলের এই ইচ্ছের বাধা পাওয়াটাকে ঠিক ইগোও বলা যায় না। কোথাও একটা লজ্জাও কাজ করে তার ভিতর। শত হোক সে একজন পুরুষমানুষ। 
 অফিস থেকে একদিন ফিরে আসার পর মা বেশ খুশি খুশি হয়ে অনলকে বলেন,
-- হ্যাঁরে দুয়েকদিনের মধ্যেই তোর মামা,মামী আসবেন আজ ফোন করে বললেন।
সেদিনের সেই উচ্ছ্বলতা অনলের মধ্যে ছিল না। সে চা খেতে খেতে বলল,
-- তাহলে কালকে অফিস যাওয়ার আগে কি একবার বাজার যাবো?
মা খুব খুশি হয়ে বলেন,
-- তাহলে তো খুব ভালো হয় বাবা।আমি তো ভয়ে তোকে বলতেই সাহস পাচ্ছিলাম না।
-- তুমি আবার কবে থেকে আমায় ভয় পেতে শুরু করলে?
-- বাবা আজকাল তুই যা গম্ভীর থাকিস। দশটা কথা বললে একটার উত্তর দিস আর বাকি ন'টা হাওয়ায় ভেসে যায়।
-- মা, তাহলে বোধহয় আমি কানে কম শুনছি। তুমি কথা বলছো আর আমি উত্তর দিচ্ছি না তোমার বোঝা উচিত ছিল 
 এরপর হাসতে হাসতে বলে,
-- তাহলে একজন ইএনটি আমায় দেখাতেই হবে
  পরদিন একটু সকালে উঠে অনল বেশ কিছু বাজার করে মায়ের হাতে দিয়ে বলে,
-- আমার জন্য তাড়াহুড়ো করার কোন দরকার নেই। তুমি ধীরে সুস্থে সব করো।আমি নাহয় বাইরে কিছু খেয়ে নেবো। তাছাড়া এখন খেতে গেলে দেরিও হয়ে যাবে।
-- তোর অফিসের রান্না আমি কল রাতেই করে রেখেছি। সকালে উঠে শুধু ভাত করলাম। ঝট করে স্নান সেরে টেবিলে চলে আয়। সব রেডি। 
-- সে কী?
 -- আমার ছেলে না খেয়ে অফিস চলে যাবে আর আমি আমার ভাই ,ভাইবউয়ের জন্য তরিজুট করে রান্না করবো অত ভালো মানুষ আমি হয়ে পারিনি। আমার ছেলেমেয়ের ব্যাপারে আমি একটু একচোখা।
অনল মাকে জড়িয়ে ধরে মুখে একটা চুমু করে বলে,
-- সেইজন্যই তো তুমি আমার বেস্ট মা। 
 স্নানে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলতে থাকে,
-- ওকে, তবে তাই হোক। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মায়ের বাধ্য ছেলে হয়ে স্নান সেরে টেবিলে চলে আসছি।
 অনল স্নানে চলে যাওয়ার পর তার মায়ের সেলে ভাইবউয়ের ফোন আসে। দিদি আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার বাড়ি পৌঁছে যাবো। কাল তোমায় একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। দিদি, আমাদের সাথে একটি মেয়ে যাবে। ও আমার ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে। ওর সাথে হঠাৎ দেখা হল শিলিগুড়ি এসে। তোমায় গিয়ে সব বলবো। আমি বলেছি ওকে দুপুরে খেয়েদেয়ে যেতে। দিদি কোন অসুবিধা হবে নাতো?
-- আরে কিসের অসুবিধা? এমন করে বলছো যেন বিশাল এক অপরাধ করে ফেলেছ। কতদূরে আছো? আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি কখন তোমরা আসবে? সাবধানে এসো। রাখি কেমন?
 অনল তড়িঘড়ি স্নান সেরে একবারে জামাপ্যান্ট পরেই টেবিলে এসে কোনরকমে গোগ্রাসে খেতে লাগলো। মা এসে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে বললেন,
-- বৌদি বলল ওদের সাথে বৌদির ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে আসছে। চলে যাবে থাকবে না।
-- মা এখন কোন কথা শুনবো না। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। অফিস থেকে ফিরে সব শুনবো।
-- আচ্ছা আচ্ছা তুই সাবধানে যাস আসিস।
 অনল ছুটে ছুটে তার কাজগুলো সেরে দৌড়াতে দৌড়াতে বেরিয়ে গেলো। মা তার এই ছুটে বেরিয়ে যাওয়া দেখতে পেয়েই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন,
-- ও-রে এত তাড়াহুড়ো করিস না। সাবধানে চলাচল করিস। পারলে একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস। দুগ্গা দুগ্গা বলে মা হাত কপালে ঠেকালেন।
 দুপুর আড়াইটা নাগাদ বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠলো। আনন্দি বাড়িতে নেই। অনলের বাবা খেয়েদেয়ে একটু শুয়েছেন। বেলের আওয়াজ শুনেই অনলের মা দৌড়াতে দৌড়াতে দরজা খুলতে চলে এলেন। দাদা বলে কথা। ছেলেবেলার সেই কাঁচামিঠে সম্পর্কগুলো কখনোই ভোলা যায় না। বয়স বারুক, যুগযুগ ধরে দেখা না হোক ঠিক যেন হিরের আংটি ভাইবোনের সম্পর্কগুলো।
 দরজা খুলেই দাদাকে জড়িয়ে ধরা, নিচু হয়ে দাদাকে প্রণাম করা, (বৌদি সমবয়সী হওয়াতে প্রথম থেকেই প্রণাম নেন না) হাহা করে কথা বলা সে এক অন্য অনুভূতি। যাদের ভাই কিংবা দাদা নেই সত্যিই কিন্তু তারা এসব থেকে বঞ্চিত আর এর মজাটাও জানতে পারে না। 
 অনলের বাবা শ্যালকের আগমন টের পেয়ে আস্তে আস্তে উঠে এই বিশাল যজ্ঞে সামিল হলেন। ওদের সাথেই একটি বাইশ,চব্বিশ বছরের মেয়ে, দেখতে বেশ মিষ্টি ঢুকে অনলের বাবা,মাকে প্রণাম করে ওদের পিছুপিছু এসে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে থাকে চুপচাপ। দাদা আর বোনের গল্প আর চিৎকার, চেঁচামেচিতে অন্য সকলের গলার আওয়াজ শোনা যেমন যাচ্ছে না তাদের হাসাহাসিতে অন্য কেউ কথাও বলতে পারছে না। সেই ছেলেবেলায় কে কবে কাকে মেরে ফুলিয়ে দিয়েছে, বাবার কাছে নালিশ করে কে কাকে মার খাইয়েছে কিছুই বাদ যাচ্ছে না।
 অনন্দী এসেই মামা,মামীকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। পাশে অচেনা মেয়েটিকে দেখে জানতে চায়
-- উনাকে তো চিনতে পারছি না
 সঙ্গে সঙ্গেই মামী ওকে জানান --

ক্রমশ

Wednesday, May 6, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২০)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২০)

  অনলের প্রতিক্ষণে বিনীতার কথা মনে পড়ে। মাত্র কটা মাসের মধ্যে অদেখা অচেনা বিনীতাকে অনল বোধকরি খুব ভালোভাবে স্ট্যাডি করতে পেরেছে । কোন অবস্থাতেই যে বিনীতা ইগো ঝেড়ে মাথা নোয়াবে না এটা অনল খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে। এই ঘটনার উপর দু'জনের কারোরই হাত ছিল না এটা সত্যি কিন্তু ঘটনার সমাধান সূত্র বের করতে গেলে একজনকে এগিয়ে যেতেই হবে। তবে সেটা বিনীতা কিছুতেই হবে না। প্রতি মুহূর্তে অনল ভেবে চলেছে কীভাবে এর সমাধান পাওয়া যায়। সব মানুষের ভিতর সব গুন থাকে না। বিনীতা যে সবগুনের অধিকারিণী তাতো নয়। 
  অনল উদাস হয়ে জানলার দিকে তাকায়। অনলের ঘরের দক্ষিণের কোন দেওয়াল নেই।পুরোটাই জানলা। বহু পুরোনো বাড়ি। তখন বাড়িতে ইলেকট্রিক ছিল না। তাই অনলের দাদু তাঁর ছেলে অর্থাৎ অনলের বাবার জন্য দক্ষিণের ঘরটা করেছিলেন। এইভাবে যাতে গরমে কোন কষ্ট না হয়। পুরো জানলাগুলি কাঠের। প্রথমে দাদু, বাবা বড় হলে বাবা আর এখন অনল এই ঘরের মালিক। এখন সবগুলো জানলা খোলা, বন্ধ করাও একটা ঝক্কি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 রাত অনেক হয়ে গেছে। চারদিক নিস্তব্ধ। জানলার বাইরে আকাশটা ফাঁকা, কিন্তু অনলের মনটা যেন ভীষণ ভারাক্রান্ত। বারবার শুধু একটা মুখই ভেসে উঠছে—বিনীতা।
অনল বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে বলে উঠলো,
— “তুমি এত কঠিন কেন বিনীতা?”
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেই উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করে।
— “না, কঠিন নয়… তুমি আসলে নিজের জায়গায় অটল। তুমি কাউকে এত সহজে তোমার ভিতরে ঢুকতে দাও না।”
অনল চোখ বন্ধ করে। গত কয়েক মাস আগে বিয়ের দিনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো একে একে ভেসে ওঠে—বিনীতার হাসি, তার চুপ করে থাকা, বৌ সাজে  ঘর থেকে বেরিয়ে দৃঢ়তার সাথে তার কথা বলা , আবার অকারণে চুপ হয়ে যাওয়া।
— “তোমার এই ইগোটা আসলে ইগো নয়… এটা তোমার আত্মসম্মান।”
নিজের সঙ্গেই কথা বলতে থাকে অনল।
— “তুমি হয়তো ভাবছো, আগে এগিয়ে গেলে তুমি ছোট হয়ে যাবে… কিন্তু তুমি কি জানো, এই চুপ করে থাকাটাই আমাদের আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে।
— “তোমারও তো কষ্ট হচ্ছে… আমি বুঝি। কিন্তু তুমি সেটা কাউকে দেখাতে চাও না। নিজের ভেতরেই সব চাপা রাখো।”
হঠাৎ উঠে বসে অনল। যেন একটা সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।
— “না, এভাবে আর চলতে পারে না। যদি কেউ এগিয়ে না আসে, তাহলে সবকিছু এমনই ঝুলে থাকবে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলে,
— “তুমি না পারো, আমি পারি। কারণ ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে অহংকারের চেয়ে সেটা বড় হওয়া উচিত।”
অনল ফোনটা হাতে তুলে নেয়। অনেকক্ষণ ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিনীতার নামটা যেন তাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
আঙুলটা কল বাটনের উপর গিয়ে থেমে যায়। 
বিনীতার নম্বরটা না চাইতেই অনল পেয়ে গেছে বিজয়ের কাছ থেকে। সেদিনের কথার পরেই বিজয় নম্বরটা তাকে ওয়াটসঅ্যাপ করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই অনল নম্বরটা সেভ করে নিয়েছে। কিন্তু ফোন করা আর হয়ে ওঠেনি। প্রায় প্রতিদিনই সে ফোন করবে ভেবেও ফোন করে উঠতে পারে না। 
— “যদি তুমি ফোনটা না ধরো?”
মনে একটা অজানা ভয় কাজ করে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে।
— “তবুও চেষ্টা করতে হবে…”
ঠিক সেই মুহূর্তে—
ফোনটা হঠাৎ বেজে ওঠে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটা নাম—
 উফ্ আবার কৌশিকী। যখনই অনল বিনীতার ফোনের অপেক্ষায় থাকে এই কৌশিকী কেন তাকে ফোন করে বসে? নাহ্ এই মুহুর্তে আমি কিছুতেই কৌশিকীর ফোন ধরবো না।ভালোবাসার মানুষের কথা ভাবতে লাগলেও একটা সুন্দর অনুভূতি থাকে। সেই অনুভূতিকে কিছুতেই আমি নষ্ট হতে দেবো না। 
অনল কৌশিকীর ফোনটা ধরে না।

 বিছানায় শুয়ে অনল বারবার মোবাইলটা হাতে নিচ্ছে, আবার রেখে দিচ্ছে। স্ক্রিনটা নিঃশব্দ, তবুও যেন সে অপেক্ষা করছে—একটা নাম জ্বলে ওঠার জন্য।
বিনীতা।
মনে মনে বলে ওঠে,
— “তুমি কি একবারও ভাবছো না আমার কথা?”
তারপরই নিজের কথাতেই যেন থমকে যায়।
— “না… তুমি ভাবছো। কিন্তু তুমি আগে এগোবে না।”
অনল উঠে বসে। জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরের অন্ধকারে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিনীতাকে যেন আরও পরিষ্কার বুঝতে পারে।
— “তোমার এই চুপ করে থাকাটা… এটা রাগ নয়, এটা অভিমান।”
মৃদু হেসে ফেলে সে।
— “আর সেই অভিমানের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ভালোবাসা… যেটা তুমি কিছুতেই স্বীকার করতে চাও না।”
হঠাৎ একটু কষ্ট মেশানো গলায় বলে ওঠে,
— “কিন্তু আমিও তো মানুষ বিনীতা… আমিও তো চাই তুমি একবার আমায় ফোন করে কিছু বলো
ঘরের ভেতর রাতের নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে ওঠে।
অনল আবার ফোনটা হাতে নেয়। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে। আঙুলটা ধীরে ধীরে কল বাটনের দিকে এগোয়… তারপর থেমে যায়।
— “না… যদি সবকিছু আমার দিক থেকেই শুরু হয়, তাহলে তুমি কখনোই বুঝবে না আমার না থাকাটার মূল্য।”
ফোনটা আবার রেখে দেয়।
— “এইবার তুমি বোঝো…”
চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে অনল। কিন্তু ঘুম আর আসে না। দু’জনের মাঝখানে জমে ওঠা নীরবতাটা যেন আরও বড় হয়ে ওঠে।
 কৌশিকী বারবার ফোন করছে। মেয়েটা কী চায় তার কাছে? অফিস থেকে রিজাইন দিয়ে চলে গেছে প্রায় মাস দু'য়েক। এমন কিছু বন্ধুত্ব তার সাথে গড়ে ওঠেনি অনলের। তবুও কেন সে বারবার ফোন করে? কী বলতে চায় সে? সত্যি আজ অনলের মনে হচ্ছে কে যেন বলেছিলেন মেয়েদের মন বোঝা দেবতারও অসাধ্য! আজ তাকে সামনে পেলে গড় হয়ে একটা প্রণাম করতাম!
সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়, কিন্তু অনলের কাছে সবকিছু যেন অস্বাভাবিক লাগছে। ঘুম থেকে উঠেও যেন সে ফ্রেস হতে পারেনি।
 ব্রাশ করে প্রাত্যহিক কাজ সেরে মায়ের কাছে চা চাইতে গিয়ে দেখে চা একদম রেডি। মা বেশ খুশি খুশি। চা ' টা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
-- জানিস দশ বছর পর বড়দা দেশে ফিরেছেন?
-- বাহ্ এত খুব খুশির খবর
অনলের বড়মামা লন্ডনপ্রবাসী। অনেকদিন তিনি এদেশে আসেননি। মায়ের ঠিক হিসাব আছে বছর দশেক আগে একবার ফিরেছিলেন। মায়ের বাবার বাড়িতে আজ আর কেউ নেই। মায়েরা এই দুই ভাইবোন  বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়ে গেছেন শেষবার এসে মামা। মামা এসেছেন শুনেই অনলের মনের ভিতর একটা খুশির ঝলক দিয়ে উঠলো। হ্যাঁ মামা আসলে তো তাঁর শ্বশুরবাড়ি উঠবেন আর সেটা তো শিলিগুলি। বিনীতাও শিলিগুড়ি। কোথাও যেন একটা মিলনের সুর বাজছে অনলের মনের মধ্যে। সে আনন্দের সঙ্গে জানতে চাইলো 
-- মা মামাকে কি আনতে যেতে হবে?
-- ওমা! সে কেন? সবে সকালে ল্যান্ড করেছেন। হয়ত এখনো শ্বশুরবাড়ি পৌঁছেই পারেনি। তোর মামী এত তাড়াতাড়ি তাকে ছাড়বে কলকাতায়?
 যেন আগুনে জল পড়লো। অনল তখন বললো,
-- তাহলে মামা কি একা আসবেন?
-- কেন সাথে তো তোর মামীও আসেন।
 অনল যে অ্যাঙ্গেলে প্রশ্নটা জানতে চেয়েছিল উত্তরটা দিলেন মা একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে।সে আর কিছু না বলে চায়ের কাপটা নিয়ে ডাইনিংয়ে এসে বসলো।
 আনন্দি হঠাৎ এসে সেখানে বসে পড়লো।
-- হ্যাঁরে দাদা আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করছি তুই সেই যে বিয়ে বাড়িতে বেড়াতে গেলি সেখান থেকে ফেরার পর থেকে কেমন যেন একটু চুপচাপ হয়ে গেছিস। ওখানে সবকিছু ভালোভাবে মিটেছে? তুই কি কিছু লুকাচ্ছিস আমাদের কাছ থেকে?
-- তোর এরকম মনে হওয়ার কারণ কী জানতে পারি?
-- না আসলে আমি তো আমার দাদাকে ভালোভাবেই চিনি। বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই তোর ভিতর সেই আগের উচ্ছ্বলতা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু আমি কেন মা'ও সে কথাই বলছিলেন।
-- ঘটনা কিছু ঘটেছে। তবে সেগুলো বলার সময় আসেনি।
-- দেখ তাহলে। আমরা তো তোকে চিনি রে! যদি তোর কোন তাড়া না থাকে তাহলে তোর সময়মত সব জানাস।
-- জানাবো, তোকেই আগে সব জানাবো। কিন্তু আমায় একটু সময় দে। আগে ব্যাপারটা নিজে ভালোভাবে বুঝি।

ক্রমশ
 

Monday, May 4, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ১৯)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ১৯)

    সকালে টিফিন করেই ময়ূর আর অর্পিতা বেরিয়ে যাবে। গতরাতের ঘটনা মোটামুটি যেটুকু নলিনী ওদের জানিয়েছে তাতেই ওরা বুঝে গেছে ওদের আর কোন সমস্যা নেই। তপেশ ওদের পৌঁছে দিতে যাবে। সে রেডি হয়ে আসতেই অর্পিতা বলে,
-- আচ্ছা তপেশদা এই গ্রামের থেকে আমাদের বাড়িটা বেশিদূর মনেহয় না জানো? 
-- তোমাদের গ্রামের নাম কী?
-- ওই তো সোনাডাঙ্গা স্টেশনে নেমে বাসে বা রিকশায় বালিয়াডাঙ্গা।
-- আরে না না বেশি দূর নয়। ভিতর থেকে রাস্তা আছে। তবে সেটা কাঁচা রাস্তা । হেঁটে যেতে হয়। তোমরা ঠিক পারবে না। তারউপর একটা বাঁশের সাঁকো আছে। ছেলেবেলায় ওই সাঁকোতে উঠবো বলে কতবার ওই গ্রামে গেছি। সাঁকোর উপর থেকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। তারপর সাঁতার কেটে পাড়ে উঠতাম। ভিজে প্যান্ট পরেই চলতো দৌরাত্ম। 
কথাগুলো বলেই সে হাসতে লাগলো 
- সত্যি ছেলেবেলার দিনগুলো কী যে মজার ছিল। আচ্ছা তুমি ওই গ্রামের কথা জানতে চাইলে কেন?
-- ওখানেই তো আমাদের বাড়ি। ময়ূর অবশ্য শহরে থাকে।
-- ওখানে আমার পরিচিত একজন আছেন। তিনি উকিল ছিলেন। কিন্তু একটা অদ্ভুত ঘটনা তার জীবনের উপর দিয়ে ঘটে গেছে। আমি সেদিন কলকাতা যাচ্ছিলাম। তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য ওই কাঁচা রাস্তাটাই ধরেছিলাম। দাদার সেদিন বিয়ে ছিল। ওই বিয়ের দিনেই দাদাকে কেউ গুলি করেছিল। জানি না এখন দাদা কেমন আছেন - 
-- অর্পণদার বোন আমি। ওই ঘটনার পর দাদা কোমায় ছিল বেশ কিছুদিন। এখন ভালো আছে। কোর্টেও যাচ্ছে  দাদা মাঝেমধ্যে।
-- আরে তুমি অর্পণদার বোন? এই দেখো কেমন পরিচয় বেরিয়ে গেলো। তাহলে তো তোমাদের বাড়িতে একদিন যেতে হয়।
-- হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। তবে নলিনীকে নিয়ে।
-- তোমরা নিশ্চিত থাকো। ওকে ছাড়া আমি আর কখনো কোথাও একা যাচ্ছি না। কলেজও তো আমাদের এক। একসাথেই যাচ্ছি আর একসাথেই ফিরছি।
 
তপেশের কথায় অর্পিতা আর ময়ূর একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। নলিনী তখন দরজার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার চোখে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি—যেন বহুদিন পর বুকের ভিতরের ভারটা একটু হালকা হয়েছে। মাঝে মাঝেই গতকাল রাতের কথা মনে পড়লেই সকলের মাঝেও নলিনী লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে।
   অর্পিতা হঠাৎ নলিনীর হাত ধরে বলল, — কী রে, তুই কিন্তু আর পালাতে পারবি না। এবার কিন্তু আমাদের বাড়ি যেতেই হবে।
নলিনী হালকা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, — দেখি… সময় হলে যাবো।
তপেশ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, — “দেখি” না, ঠিক করেই ফেলো। আমি কিন্তু কথা দিয়ে ফেলেছি। তপেশের কথা একদম স্বাভাবিক। যেন বহুকাল ধরে নলিনীর সাথে তার সুখের দাম্পত্য। 
ময়ূর একটু মজা করে বলল, — তাহলে তো ব্যাপারটা সিরিয়াস! আমরা কি তাহলে নতুন কিছু শোনার জন্য প্রস্তুত থাকবো?
তপেশ হেসে বলল, — আরে না না, এত তাড়াতাড়ি কিছু না। আগে বন্ধুত্বটা ঠিকমতো হোক। সবে তো একসাথে পথ চলা শুরু হল।
নলিনী মুখ তুলে একবার তপেশের দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই দু’জনেই আবার অন্যদিকে তাকিয়ে নিলো।
কিছুক্ষণ পর সবাই বেরিয়ে পড়লো। গ্রামের বাড়ি। তাই বড় রাস্তা থেকে অনেকটা  হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে ঢোকা। তবে বাড়ি বিশাল বড়। গাছপালায় ভর্তি, বাগানের ভিতরও বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কোন শুকনো পাতা বাগানে পড়ে জঞ্জাল হয়ে নেই। সবসময় লোকজন কাজ করে চলেছে।
  সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে ওরা বেরিয়ে পড়লো।চারিদিকে পাখির ডাক, দূরে মাঠে কাজ করা মানুষের আওয়াজ—সব মিলিয়ে এক শান্ত পরিবেশ।
ময়ূর বলল, — জানো তপেশদা, এত শান্ত জায়গায় থাকতে ইচ্ছে করে। শহরের ওই কোলাহল আর ভালো লাগে না।
তপেশ উত্তর দিল, — শান্তি ভালো, কিন্তু সবসময় নয়। কখনো কখনো মানুষের ভিড়ও দরকার… যেমন এখন। ভিড়ের ভিতর নিজের প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার জন্য যে অদম্য বাসনা সে অপেক্ষাও কিন্তু মন্দ নয়। এর ভিতর আলাদা একটা রোমান্টিকতা থাকে যা কোলাহলের বাইরে একান্তে প্রকাশ পায়।
এই বলে সে হালকা করে নলিনীর দিকে তাকালো। নলিনী কিছু বললো না, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। তপেশের মধ্যে নেই কোন জড়তা। সে অতি স্বাভাবিক। 
রাস্তাতেই নলিনীর গাড়িটা দাঁড়ানো ছিল। ওরা গাড়ির কাছে এসে গেলো। যে যার ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে বসে পড়লো।
 তপেশ সকলকে আবার আসার কথা বলল। দু'জনেই একসাথে বলে উঠলো,
-- ভীষন ভালো লেগেছে। আসবো তো নিশ্চয়ই।
— নিশ্চয়ই, খুব শিগগিরই দেখা হবে, বলল তপেশ।
অর্পিতা গাড়িতে ওঠার আগে নলিনীকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, — সুখকে আর দূরে সরিয়ে রাখিস না।
নলিনীর মনেমনে ভাবলো  যে সুখের সন্ধানে এতদিন ছিলাম তাকে হাতের মুঠোই পেয়ে আর কি হারাতে চাইবো? যেকোন ভাবেই হোক তাকে নিজের করেই নিজের কাছেই রাখবো।

গাড়ি ছেড়ে দিলো। 
নলিনী আর তপেশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কেউ কিছু বলছে না।
শেষে তপেশ নরম গলায় বলল, — চলো, এবার ফিরি?
নলিনী মাথা নাড়ল।
দু’জনে একসাথে হাঁটতে শুরু করলো। হঠাৎ তপেশ বলল, — একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
— কী?
— আজ রাত থেকে কিন্তু তুমি আমার ঘরেই থাকবে। শুধু রাতেই নয় এখন থেকে আমার ঘরই কিন্তু তোমার ঘর।

নলিনী থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
 — এ বাবা! আমার ভীষন লজ্জা করবে কিন্তু। সবাই কী ভাববে?
-- কী ভাববে? কিছুই ভাববে না। সব স্বামী,স্ত্রীরা একই ঘর শেয়ার করে। তোমার আপত্তি না থাকলেই হল।
-- জানি না। ওসব পরে ভাবলেও চলবে। এখন চলো বাড়ির ভিতরে যাই।
তপেশের চোখে একটা স্বস্তির ঝিলিক দেখা গেল।
সে ধীরে ধীরে বলল,
 — তাহলে আস্তে আস্তে তোমার জিনিসগুলো আমার ঘরে আসতে থাকুক।
নলিনী  সরাসরি তপেশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
 — হ্যাঁ… সেটা চেষ্টা করা যেতে পারে। 
 তপেশ বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েও হঠাৎ থেমে গিয়ে বলে,
-- চলো না একটু হেঁটে আসি।
নলিনী তাতে সম্মতি দেয়।
দু'জনে  সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভিতরে না ঢুকে গ্রামের  কাঁচা পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো—
পিছনে রয়ে গেল অতীতের দুঃখ, আর সামনে ধীরে ধীরে খুলতে লাগলো ভালোবাসার নতুন আকাশ…
 কিছুটা পথ দু'জনে চুপচাপ হেঁটে একটা বড় বকুলফুল গাছেরতলায় দাঁড়ালো। নিচুতে প্রচুর ফুল পড়ে আছে। আর চারিদিকটা বকুলফুলের গন্ধে ম ম করছে। তপেশ নলিনীকে বলল,
-- জানো ছোটবেলায় এই গাছে কত উঠেছি। আমাদের থেকে যারা সিনিয়র ছিল তারা এখানে বসে গ্রীষ্মকালে তাস খেলত। সে দিনে,রাতে - যেদিন খুব গরম পড়তো সেদিন এখানে বড়রা বসে গল্প করত, তাস খেলত। কিন্তু একটা ঘটনার পর থেকে এখানকার আড্ডাটা উঠে গেছে।
-- কী সেই ঘটনা?
-- আমাদের গ্রামেরই একদাদা একটি মেয়েকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু মেয়েটির বাড়ির থেকে সেই সম্পর্ক মেনে না নিয়ে জোর করে মেয়েটির অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেয়। সেই দাদা এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একদিন রাতের বেলা এই গাছে --
-- থাক থাক আর বলতে হবে না। চলো এখান থেকে চলে যাই। তুমি আর জায়গা পেলে না? আমায় নিয়ে এখানে আসলে। 
কথাটা বলেই নলিনী তপেশের হাত ধরে রীতিমত দৌড়াতে লাগলো।
-- আরে দাঁড়াও এত ভয় কিসের? আমি আছি তো সাথে।
-- এটা ভয় নয়। এসব শুনলে আমার ওই বোকা মানুষগুলির জন্য করুণা হয়। জীবনে দুঃখ,কষ্ট থাকতেই পারে। তাইবলে অন্যের ব্যবহারের জন্য নিজেকে শেষ করে দিতে হবে? এসব যারা করে তারা আসলে জীবনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। আমি এসব মানুষদের একদম পছন্দ করি না।
 হাঁটতে হাঁটতে ওরা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। দোতলার বারান্দায় বসে বৃদ্ধ তপেশবাবু ওদের একসাথে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তিনি রাঁধুনির মুখে গতকালের কথাও জেনেছেন। তিনি মনেমনে ভাবেন এবার ঈশ্বর তাঁর কাছে আমায় নিয়ে নিলেও আমার কোন দুঃখ থাকবে না।

ক্রমশ
    

Friday, May 1, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ ( ১৮ পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব আঠারো)

  তপেশ পায়ের আওয়াজ পায়; ভাবে নলিনী এসেছে। খুব খুশি সহকারে পিছন না ফিরেই বলে,
-- আমি জানতাম তুমি আসবে
 খিলখিল হাসির আওয়াজে চমকে তাকিয়ে দেখে ময়ূর দাঁড়ানো। ভীষন লজ্জা পেয়ে যায়। সেটা বুঝতে পেরেই ময়ূর বলে ওঠে,
-- এই যে মশাই আপনি এঘরে নলিনীর জন্য বসে আছেন আর নলিনী তার ঘরে আপনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে।
-- বুঝলাম না
-- আর বুঝতে হবে না। এটা পরে নিন
-- কী এটা?
-- আমি চললাম আর নিজেই খুলে দেখুন ওটা কী?
 ময়ূর ছুটে বেরিয়ে গেলো। তপেশ ব্যাগটা খুলে দেখে তার ভিতর বিয়ের পাঞ্জাবীটা। ওর বুঝতে বাকি রইলো না কী হতে চলেছে। লজ্জা তো করছেই একটু বোকা বোকাও লাগছে। এই এতগুলো বছর বাদে বিয়ের পাঞ্জাবিটা ঠিক সেই আগের মতোই আছে। বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবিটা পরে নিজেকে একটু দেখে নিলো তপেশ। পুরুষেরও যে লজ্জা করে সেটা সে আজ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তবে সেটা প্রকাশ পেলে তো চলবে না। তাহলে আবার হ্যাংলা পুরুষ নাম হয়ে যাবে। 
 নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে নলিনীর ঘরের দিকে রওনা দেয়। নলিনীর দরজাটা হালকা করে ভেজানো। তপেশকে আসতে দেখে  নলিনীর ঘরে পৌঁছানোর একটু আগেই অর্পিতা আর ময়ূর বেরিয়ে চলে যায়। হালকা করে দরজা ভেজানো ছিল। তপেশ দরজা মৃদু ধাক্কা দিয়ে খুলে ভিতরে ঢোকে। নাইট ল্যাম্পের আলোতে দেখতে পায় নলিনী ফুল দিয়ে সাজানো খাটে বসে আছে। তপেশ ঘরে ঢুকে প্রথমে দরজায় ছিটকানি তুলে দেয়। পরে বড় লাইটটা জ্বালায়। লাইটটা জ্বালানোর সাথে সাথে নলিনীর বুকটা কেঁপে ওঠে। সে আরও জড়োসড়ো হয়ে পড়ে। তপেশ এসে নলিনীর কাছে বসে। 
-- সেদিনের রাতটা আমাদের দু'জনের কাছেই একটা অভিশাপ মনে হয়েছিল। কিন্তু দেখো ঈশ্বরের কী লীলা তিনি কিন্তু সেই একইভাবে সেই রাতটাকেই আমাদের জীবনে ফিরিয়ে দিলেন আশীর্বাদের হাত তুলে।
 নলিনী কথার উত্তর দেবে কী? সেতো সব কথা ভুলে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। তপেশ নলিনীর হাত ধরে। 
-- একি তোমার হাত এত কাঁপছে কেন? আরে বাবা আমি বাঘ ভালুক তো নই। এত কেন ভয় পাচ্ছ?
  তপেশের কথায় নলিনী একটু মুখ তুলে তাকায়, কিন্তু চোখ দুটোতে লজ্জা আর অজানা এক ভয় মিশে আছে।
-- ভয় পাচ্ছি না... শুধু... সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে, খুব দ্রুত সব বদলে গেল।
তপেশ হালকা হেসে বলে, -- বদল তো আসবেই নলিনী। এতদিন আমরা দূরে ছিলাম, আজ আবার একসাথে বসে আছি—এটাই তো বড় কথা। নিজেকে দাঁড় করিয়ে তোমার বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনাকে সচল করতেই একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম হয়ত সেই মুহূর্তে সেই ব্যবস্থাটা আপাতদৃষ্টিতে খারাপ মনে হলেও একদিন বাবা আর তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে আমার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব। তবে কী জানো একটা অদ্ভুত ব্যাপার - আমি কিন্তু বিয়েরদিন তোমার মুখটাও ভালো করে দেখিনি। কিন্তু আমার মনের মধ্যে সেই না দেখা মুখটা সবসময় ঘোরাফেরা করতো আর আস্তে আস্তে ওই না দেখা মেয়েটাকেই আমি ভালোবেসে ফেলেছি।
নলিনী ধীরে ধীরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। হাতটা এখনও তপেশের হাতের মধ্যে ধরা। সে একটু ইতস্তত করে বলে, 
-- এত বছর পর... তুমি কিন্তু একটুও বদলাওনি। তবে সেদিন আমিও তোমায় খুব ভালো করে দেখিনি। তবে তারপরে যতবার বাড়িতে এসেছো সামনে থেকে না দেখলেও দূর থেকেই দেখেছি।
 তপেশ হেসে বলে,
-- ওই ব্যালকনি থেকে তো
নলিনী হেসে দেয়।
-- তুমিও সেটা দেখেছো?
-- নিজের বউকে লুকিয়ে দেখার মজাই যে আলাদা এটা বুঝতে অনেক সময় চলে গেছে। আর বদলানোর কথা বলছিলে না হ্যাঁ বদলেছি। অনেকটাই বদলেছি। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি... 
-- কী?
-- তোমার জন্য যে অনুভূতিটা ছিল, সেটা কোথাও চাপা পড়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু কোনদিন কোনসময় এক সেকেন্ডের জন্যও হারিয়ে যায়নি। বরং দিনকে দিন বেড়েছে। বাড়িতে তারপর যতদিন এসেছি তোমার সাথে একটু কথা বলার জন্য, একটু পাশে বসে ঠিক এইভাবে হাতের ভিতর হাতটা রেখে গল্প করার জন্য আকুপাকু করেছি। কিন্তু সাহস পাইনি। যখনই ইচ্ছাটা প্রবল হয়েছে ঠিক তখনই চীনের প্রাচীরের মত একটা বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই রাতটা।

 নলিনী চুপ করে যায়। তার বুকের ভিতরটা যেন ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। সে একটু সাহস করে বলে, 
-- আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আমাকে ভুলেই গেছো...
-- ভুলে যাওয়া এত সহজ নাকি? কিছু সম্পর্ক সময়ের সাথে সাথে দূরে যায় ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর থেকে মুছে যায় না। বিয়ের মন্ত্রগুলোর মধ্যে কোন জাদু আছে জানো? একবার ওই মন্ত্র শোনার পর সেই অদেখা,অচেনা সঙ্গিকে কোনদিন কোন অবস্থাতেই ভুলে যাওয়া যায় না। বরং দিনকে দিন ভালোবাসায় জড়িয়ে যেতে হয়। তুমি ভুলতে পেরেছো এক মুহূর্তের জন্যও?
নলিনী এবার একটু হেসে ফেলে। সেই হাসিতে লজ্জা আছে, আবার স্বস্তিও আছে।
-- যা ঘটবে বিধাতা যা ঠিক করে রেখেছেন তা ঘটবেই। হয়ত একটু আগে নয়ত কিছু পরে। শুরু তো যেকোন সময়ই করা যায়। কী তাই না? 
তপেশ নরম গলায় বলে,
 -- কেন নয়? আমরা চাইলে আজ থেকেই সব নতুন করে আমাদের জীবন উপন্যাস লিখতে পারি।

  ঘরের নরম আলোয় দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। বাইরে হালকা বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে। সেই নিঃশব্দ মুহূর্তে যেন তাদের মধ্যে জমে থাকা বেশ কয়েক বছরের দূরত্ব ধীরে ধীরে গলে যেতে থাকে।
তপেশ আস্তে করে বলে, 
-- এতদিনের না বলা কথাগুলো... আজ বলবে?
নলিনী একটু হেসে মাথা নাড়ে,
 -- সব একদিনে বলা যায় নাকি? সময় লাগবে...
-- আমার তো আর কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। এবার একসাথে একজায়গায় থেকেই সব কাজ করবো। তোমার পড়াশুনা আর আমার চাকরি একই সাথে চলবে। বাবা সেদিন বলছিলেন এখন বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতে। আমি তো সেই মুহূর্তে বাবাকে কিছু বলতে পারিনি কিন্তু ঠিক করেই রেখেছিলাম তুমি রাজি থাকলে তাই করবো।
নলিনী হেসে দেয়। অনেক কথা জমে আছে ক'বছরে-
-- আমি তো সেই সব কথাই শুনতে চাই। 
নলিনী এবার পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সে তপেশের দিকে তাকিয়ে বলে, 
-- তাহলে ধীরে ধীরে বলবো.. না চেনা, না জানা মানুষটা আমায় ছেড়ে চলে গেলেও দিনে দিনে সে যে কীভাবে আমার সমস্ত অন্তর জুড়ে বসেছিল সেসব কথা না বললে তুমি কীভাবে বুঝবে আমি তোমায় কতটা ভালোবেসেছি?

তপেশ নলিনীকে বুকের সাথে চেপে ধরে তার চিবুক তুলে আদুরে গলায় গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
 -- শুনবো গো যতদিন লাগুক, আমি শুনবো।
ঘরের নীরবতা যেন আর ভারী লাগে না। বরং নতুন শুরুর এক মিষ্টি আবহ তৈরি হয়—যেখানে অতীতের কষ্টগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে নতুন বিশ্বাস, নতুন ভালোবাসা।
 তপেশ উঠে গিয়ে বড় লাইটটা অফ করে নাইট ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিয়ে আসে। বিয়ের পাঞ্জাবিটা খুলে নলিনীর আলনায় ঝুলিয়ে দেয়। সেদিকে তাকিয়ে নলিনীর বুকটা ধকধক করতে থাকে। দু'টি  শরীরের মিলনের সন্ধিক্ষণে দু'জনেই মাতাল হয়ে ওঠে। এতোদিনের সব দূরত্ব, অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লজ্জা সরিয়ে কখন যে তারা দু'জনে এক হয়ে গেছে তা তারা বোধকরি নিজেরাও বুঝতে পারেনি। এত লজ্জা, এতোদিনের এত সংযম এক নিমেষে কোথায় যেন উড়ে গেছে। 
 বাইরে পাখির ডাকে তাদের সম্বিৎ ফিরেছে। নলিনী লজ্জায় তখন লাল। নিজেকে তপেশের বুকের উপর আবিষ্কার করে যেই উঠতে গেছে তপেশ জোর করে আবার তাকে বুকের সাথে চেপে ধরে নলিনীর মুখটা নিজের মুখের কাছে টেনে নিয়ে ঠোঁটটা আলতো কামড়ে দিয়ে বলে,
-- সুযোগ পেলেই কিন্তু অসময়ে, অসময়ে এটা আমি করবই।
 নলিনী দুইহাতে তপেশকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে,
-- এই তুমি তো খুব দুষ্টু
তপেশ হো হো করে হাসতে হাসতে বলে,
-- এই তো সবে শুরু। তোমায় বলেছি না আমাদের ফুলশয্যার রাতটাকে প্রতি রাতে আমরা ইচ্ছে করলেই ফিরিয়ে আনতে পারি।
নলিনী আবারও তপেশকে দুই হাতে সরিয়ে দিয়ে বলে,
-- সত্যিই তুমি খুব দুষ্টু

ক্রমশ 

Thursday, April 30, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (১৭তম পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ (১৭ তম পর্ব)

  দোলের দিন সকাল। বাড়ির সকলেই ব্যস্ত রাধা গোবিন্দের পুজো নিয়ে। বহুদিন পর ছেলেকে পুজোর তদারকিতে সেই আগের অবস্থায় দেখে তাপসবাবু যারপর নাই খুশি। বারবার ঠাকুরের সামনে হাত জোর করে বিড়বিড় করে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলছেন না। মনপ্রাণ ঢেলে তাঁর সেবা করার ফল মনেহয় তিনি শীঘ্রই পেতে চলেছেন। খুশিতে তাঁর চোখে জল এসে যাচ্ছে। 
 পুজো শেষে একএক করে সকলে ঠাকুরের পায়ে আবির দিয়ে , প্রসাদের সাথে ঘরে তৈরি আলুর দম আর লুচি খেয়ে আবির খেলতে শুরু করলো। গ্রামের অনেক মানুষজন সেদিন ওদের বাড়িতে উপস্থিত। সকলেই তাপসবাবুর পায়ে আবির দিচ্ছে। তিনি মন্দিরের বারান্দায় বসে একেএকে সকলের কপালে একটা আবিরের টিপ পরিয়ে চলেছেন। একসময় নলিনী যখন শ্বশুরের পায়ে আবির দিতে আসে দুই বন্ধু সমেত তখন তিনি বলেন,
-- আজ আমি ছেলে আর বৌমার হাতের আবির একসাথেই নেবো। ডাকো তাকে। সে গেলো কোথায়? 
 ময়ূর, অর্পিতা তাঁর কথাই সায় দিয়ে বলল,
-- একদম ঠিক কথাই বলেছেন মেসোমশাই। এ সুযোগ আজ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। তবে আমাদের আশীর্বাদটা এখন করবেন তো?
-- সেতো নিশ্চয়। আর মা তুমি দেখো তো আমার পুত্রটি কোথায় গেলো?
 নলিনী সবই বুঝতে পারছে। সে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। তারপর আমতা আমতা করে বলল,
-- বাবা এত বড় বাড়ি আমি কোথায় খুঁজব তাকে?
-- সেতো আমি জানি না মা। তবে তোমাকেই খুঁজে আনতে হবে।
অর্পিতা, ময়ূর মুখ টিপে টিপে হাসছে তখন। তারা তাপসবাবুর পায়ে আবির দিয়ে আশীর্বাদ নিয়ে তাঁর পাশেই বসে পড়লো। নলিনী কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তাকিয়ে গুটি গুটি পায়ে তপেশের খোঁজে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। বাড়ির বাইরেটা দেখে নিয়ে সে দোতলায় উঠে সব ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দাগুলো দেখতে লাগলো। না কোথাও তপেশ নেই। অগত্যা সে ছাদে উঠে দেখে তপেশ ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে। একটু ভয়, একটু লজ্জা সব মিলিয়ে সেও ছাদের দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে তপেশের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকলেও নলিনীর উপস্থিতি তপেশ বুঝেও একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকলো। 
-- বাবা ডাকছেন?
এবার তপেশ সামনে ফিরে নলিনীকে বলে,
-- কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছি জানতে চাইবে না?
 নলিনীর বুকের ভিতর তখন কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে। যার শব্দ এত কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও তপেশ কিন্তু মোটেই টের পাচ্ছে না। নলিনী তার কথার উত্তর না দিয়ে আবারও বলে,
-- বাবা ডাকছেন
-- আমার কথার উত্তর দেবে না?
 নলিনী চোখ না তুলেই বলে,
-- এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন না মানে দাঁড়িয়ে আছো আমি কীকরে জানবো?
-- উত্তরটা আমি দিই। এর উত্তরটা তুমি জানো। কিন্তু আমি এটাও জানি তুমি এই উত্তরটা আমায় দেবে না। 
তপেশ এবার নলিনীর খুব কাছে একদম সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
-- আমি জানতাম তুমি আমায় খুঁজতে আসবে
 -- বাবা পাঠালেন ডাকতে
-- সেটাও জানতাম বাবা তোমাকেই পাঠাবেন আমায় খুঁজতে। আমি তো আমার বাবাকে চিনি। আর তিনি কী চান সেটাও জানি।
-- তুমি এসো আমি নিচুতে যাচ্ছি।
-- কিন্তু আমার যে একটা কথা ছিল।
নলিনী দাঁড়িয়ে পড়ে।
-- বলো
-- আমি কি তোমায় আবির মাখাতে পারি আজ?
-- আগে বাবার পায়ে আবির দিই তারপর নাহয় --
-- এই একাকী সুযোগটা কি তখন আমায় তুমি দেবে?
 নলিনী কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। আবির না মেখেই সে তপেশের কথা শুনেই লাল হয়ে গেছে।
এবার তপেশ তার আরও কাছে এগিয়ে এসে বলে,
-- সেই রাতের কথাগুলো ভুলে যাও। যে কারণে কথাগুলো বলেছিলাম সে কাজ শেষ হয়ে গেছে। এবার কি আমরা একসাথে চলতে পারি না? একটু অপেক্ষা করে আবার বলে,
 --নলিনী মুখ তুলে আমার দিকে তাকাও। সত্যি করে বলো তো তুমি কি আমায় ভালোবাসো না? আমি কিন্তু তোমায় খুব ভালোবেসে ফেলেছি।
 নলিনী উত্তর দেবে কী সে তখন রীতিমত কাঁপছে। তপেশ এগিয়ে এসে তার চিবুক ধরে মুখটা তুলে বলে,
-- এত লজ্জা কিসের আমাকে? আমি তো তোমার স্বামী। হ্যাঁ সেই রাতটা আমাদের চলে গেছে ঠিকই কিন্তু আমরা ইচ্ছে করলেই প্রতিটা রাতকেই সেই রাতে পরিণত করতে পারি। 
 নলিনী তপেশের মুখে এই কথা শুনে লজ্জায় চোখদুটি বন্ধ করে ফেলে। আর সেই সুযোগে তপেশ নলিনীর কপালে আলতো করে একটা চুমু দেয়।  নলিনী হেসে পড়ে তপেশকে মৃদু একটা ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে ছুটে পালিয়ে যায়। 
  সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নামছে মুখে মৃদু হাসি ওদিকে নলিনীর দেরি দেখে অর্পিতা আর ময়ূর পুরো বাড়ি তাদের খুঁজে না পেয়ে শেষ অবধি তারাও ছাদে উঠে আসছিল। ব্যাস সামনেই ওই দুইজনের সাথে ধাক্কা ।তিনজনেই সিঁড়িতে ধপাস। সবার উপরে সিঁড়িতে ছিল তপেশ। ওদের ওই অবস্থা দেখে দৌড়ে নামতে গিয়ে লক্ষ্য করে তিনজনে ওই অবস্থায় ব্যথা ভুলে হাহা হিহি করে চলেছে। তখন তপেশ দাঁড়িয়ে পড়ে গলা চড়িয়ে বলে,
-- আমি জানতাম না মেয়েরা পড়ে গেলে ব্যথা ভুলে হাহা করে হাসে।
তিনজনেই একসাথে তাকিয়ে দেখে তপেশ হাসি মুখে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। ময়ূর নলিনীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-- আমাদের আর লাগলো না কোন কাজে। নিজেরাই তোদের ফুলশয্যার খাট সাজিয়ে নিতে পারবি -- 
ওর কথা শুনে অর্পিতা বলে উঠলো,
-- এই ফাঁকা ছাদে তোরা দু'জনে কতটুকু এগোলি? নির্ঘাত ঠোঁটেই আটকে গেছিস?
 নলিনী লজ্জায় লাল হয়ে ময়ূরকে এক ধাক্কা দেয়। ততক্ষণে তপেশ ওদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
-- আরে তোমরা এবার ওঠো। এইভাবে এখানে সিঁড়িতে বসে গল্প করে যাবে নাকি? আমায় নামতে দাও।
 নলিনী লজ্জায় তপেশের দিকে আর তাকাতেই পারে না। তিনজনে কোনরকমে একটু সরে গিয়ে তপেশকে নামার জায়গা ছেড়ে দেয়। তপেশ একটিবার নলিনীর দিকে তাকিয়ে নেমে চলে যায়।
 বাবার পায়ে আবির দিয়ে ওরা নিজেরা সেদিন প্রচুর আবির খেলে। বৃদ্ধ দু'হাত ভরে ছেলে আর তার বৌমাকে আশীর্বাদ করেন। তপেশ নলিনীকে একসময় একা পেয়ে আবির দিয়ে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে,
-- কয়েক বছর আগের রাতটা আমায় আজ ফেরত দেবে ?
 নলিনী তপেশের কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করে এক ছুট। তপেশ তখন একটু জোরেই বলে,
-- আমি কিন্তু আশায় থাকবো -
নলিনী আর পিছন ফিরে তাকায় না।
 অর্পিতা আর ময়ূর ঠিক করে আজ ওদের ফুলশয্যার খাট সাজাবে। রান্নার মাসিকে গিয়ে ধরে বাজার থেকে কিছু ফুল এনে দেওয়ার জন্য। মাসি হা করে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- পুজো তো শেষ হয়ে গেলো। এখন রাতের বেলা ফুল মালা দিয়ে আবার কী হবে গো?
 অর্পিতা হাসতে হাসতে বলে,
-- তোমার ছোটবাবু আর বৌদির ফুলশয্যা হবে গো
 মাসি জিহ্বা বের করে এক কামড় দিয়ে বলে,
-- আচ্ছা,আচ্ছা ঠিক আছে। এটা হলে তো খুবই ভালো হয়। আমি ব্যবস্থা করবো খণ।
 সে সোজা গিয়ে বড়বাবুর কাছ থেকে টাকা চেয়ে বসে। তাপসবাবু জানতে চান কী হবে টাকা দিয়ে। মাসি তাঁকে জানায় আপনাকে জানানো দিদিমনিদের বারণ আছে। কিন্তু যা তারা করতে চাইছে আপনি তাতে খুশিই হবেন। তাদের উদ্দেশ্য আমারও মন্দ লাগেনি।
 তাপসবাবু কিছুটা হলেও বুঝতে পারলেন। তিনি আলমারি থেকে টাকা বের করে মাসির হাতে দিয়ে বলেন,
-- এই নে যা খুশি কর। আমার তা জেনে কী হবে? তবে আমায় আর এককাপ চা দিয়ে যা।
-- বাবু, মা শুনলে কিন্তু বকুনি খাবেন। এই একটু আগেই এককাপ খেয়েছেন।
-- আরে আজ মা আমায় কিচ্ছু বলবে না। 
বৃদ্ধের মুখে হাসি। মাসিও বুঝতে পারে বিষয়টি। সেও হেসে পড়ে বলে,
-- আচ্ছা ঠিক আছে আমি লুকিয়ে দিয়ে যাবো খন।
 বৃদ্ধ একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাধা গোবিন্দের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেন না।

 তপেশের ঘর নয় নলিনীর ঘরটাকেই ওরা বেছে নেয় ফুসজ্জার খাট সাজাতে। দু'জনে মিলে নলিনীকে গল্প, গুজবে আটকে রেখে মাসির পরামর্শে পাড়ার দু'জন যুবকের সাহায্যে ওরা খাট সাজাতে শুরু করে। রাতের খাবারটা আজ একটু তাড়াতাড়িই হয় সারাদিনের হইহুল্লোড়রে টায়ার্ড বলে সকলে একটু তাড়াতাড়িই খেয়ে নেয়। খাবার টেবিলেও সকলের গল্প, গুজবের মাঝে ময়ূর, অর্পিতা খেয়াল করে তপেশ বারবার নলিনীর দিকে আড়চোখে দেখছে। আর নলিনী তো লজ্জায় মুখই তুলতেই পারছে না তপেশের দিকে। 
 খাওয়াদাওয়ার পর এবার নলিনীকে নিয়ে তারা তার করে ঢোকে তাকে সাজাতে। আর ওদিকে বেচারা তপেশ খেয়ে ঘরে গিয়ে দরজা খোলা রেখে বউয়ের অপেক্ষায় বসে থাকে। 

ক্রমশ 

Monday, April 27, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (১৬ তম পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ (১৬ তম পর্ব)

  খাওয়া চলছে, বাবা ছেলের টুকটাক কথাও চলছে। তপেশ বলছে কম, শুনছে বেশি। বারবার আড়চোখে নলিনীকে দেখছে। নলিনীও তাই। মাঝে মাঝে দু'জনের চোখাচোখি হয়ে গেলেই তড়িঘড়ি নলিনী মুখ নামিয়ে নিচ্ছে। বৃদ্ধের চোখে কোনকিছুই এড়াচ্ছে না। তিনি ছেলে এবং ছেলের বউকে এটাই দেখাতে ব্যস্ত যে তিনি কোনকিছুই দেখছেন না; একমনে খেয়ে চলেছেন। একসময় তাপসবাবু তার বৌমাটিকে বললেন,
-- মা, আমাদের তো সব দেওয়া হয়ে গেছে। তুমি বসে পড়লে হত না?
-- তা কীকরে হয় বাবা। বাড়িতে এত লোকজন। কেউই এখনো খেতে বসেনি। ওদের না খাইয়ে আমি কীকরে খেয়ে নিই বাবা? ওরা যে সকলেই আমায় মা বলে ডাকে।
 তপেশ অবাক হয়ে নলিনীর দিকে তাকায়। মনেমনে ভাবে বাড়িতে আর যারা রয়েছে তারা সকলেই এ বাড়ির লোক নয়। দাসদাসী, ঠাকুর, মালি। এদেরকেও নলিনী নিজের লোকই ভাবে। মেয়েটা সত্যিই খুব ভালো।
 আগামীকাল দোলপুর্ণিমা। নলিনীর বন্ধুরা আসবে। দুপুরের খাওয়ার পর্ব শেষ হতেই বন্ধুদের টিফিনের ব্যবস্থা শুরু হয়ে গেলো। নলিনীর নির্দেশে রান্নার মাসি লুচির গুলি আর আলু চচ্চড়ি তৈরি রেখেছে। গরম গরম ভেজে দেবে সব। 
 ওদিকে রাধা গোবিন্দের মন্দিরে মন্দির ধোয়া মোছা, ফুল দিয়ে সাজানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। সর্বদিকেই নলিনীর সতর্ক দৃষ্টি। 
   লুচির গুলি বেলা হয়ে গেছে, আলু চচ্চড়ির গন্ধে যেন গোটা বাড়িটাই ভরে উঠেছে। উঠোনে রোদ পড়ে নরম উষ্ণতা তৈরি করেছে—ঠিক দোলের আগের দিনের মতোই একটা আলাদা আবহ। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে বন্ধুদের দেখা নেয়। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
নলিনী একবার রান্নাঘরে, একবার উঠোনে,আর একবার রাধা গোবিন্দের মন্দিরে—সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা দেখছে। কিন্তু কাজের ভিড়ের মধ্যেও তার মনটা বারবার কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছে তার। তার জীবনের সব চেয়ে কাছের মানুষটি আজ অনেক কথা বলেছে তার সাথে। এতগুলো বছরের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে বোধকরি। 

তপেশও বসে নেই। বাইরে থেকে সবকিছু দেখছে। বিশেষত মন্দিরের কাজ নিয়েই সে বেশি ব্যস্ত সেই আগের মত। সে নিজেও মনেমনে ভাবছে সবকিছুই আগের মত আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছে। বাবাকে দেখেও তার অনেকদিন পর মনেহচ্ছে তিনিও বুঝি খুব আনন্দে আছেন। জীবনের উপরের কালো মেঘ বোধকরি আস্তে আস্তে সরতে শুরু করেছে। তার মনও আজ বেশ ফুরফুরে। আজ অনেকদিন পর বাপ,ছেলের অনেক কথা হয়েছে, এখনো চলছে সেই কথা। ঠিক সেই আগের মত। কিন্তু সেই কথার ফাঁকে আড়চোখে 
আবার কখনো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে নলিনীর ব্যস্ততা দেখছে। তার চোখে যেন একটা নতুন করে চিনে নেওয়ার চেষ্টা—এই কি সেই নলিনী, যাকে সে একদিন ছেড়ে চলে গিয়েছিল মাত্র কয়েকটি কথা বলে? সে তো এটাই চেয়েছিল নিজেকে তৈরি করতে আর নলিনীর পড়াশুনাটা যাতে বন্ধ না হয়। সবাই তাকে ভুল বুঝলেও সে ঠিক তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে। হয়ত সে তার জীবনে কোন বড় চাকরি পায়নি ঠিকই কিন্তু কে বলতে পারে একদিন হয়ত ওই কলেজেই সে তার নিজের যোগ্যতায় ভালো জায়গায় পৌঁছাতে পারবে। তার ভাবনার ছেদ পড়ে বাবার কথাই।
হঠাৎ তপেশের বাবা মুচকি হেসে বললেন, 
— কী রে তপেশ, ? সেই ছোট মেয়েটি দেখেছিস সবকিছু একা হাতে কেমন সামলাচ্ছে। আরে মানুষ চিনতে আমি ভুল করিনি। আমি আমার পরিবারের জন্য যোগ্য পাত্রীর সন্ধান পেয়েছিলাম। তাই তো মাকে তার নাতবৌ দেখানোর সুযোগ হয়েছিল। সারাজীবন রাধা গোবিন্দের নিষ্ঠাভরে সেবা করেছি তার প্রতিদান আমি পেয়েছি। ঈশ্বর আমাকে আমার পরিবারের জন্য উপযুক্ত পুত্রবধূ জোগাড় করে দিয়েছেন।
তপেশ নিজেও যে সেটা বুঝতে পারছে না তা নয়। কিন্তু বাবার এই কথার জবাবে কী বলবে বুঝতে পারছে না ।কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-- আসলে বাবা তুমি নলিনীকে খুব ভালোবাসো।
বৃদ্ধ হালকা হেসে বললেন, ভালবাসি কী আর সাধে রে! ওর মত গুনি মেয়েকে না ভালোবেসে পারা যায়?আসলে কী জানিস বাবা মানুষকে চিনতে অনেক সময় লাগে রে। তুইও হয়তো  চিনতে শুরু করেছিস নয়ত একদিন ঠিক চিনতে পারবি।
তপেশ চুপ করে গেল। কথাগুলো যেন তার ভিতরে কোথাও গিয়ে লাগল। হয়ত সে নিজেও বিষয়টা বুঝতে পারছে। নলিনীকে মেনে নিতে তার তো কোন অসুবিধা নেই। শুধু সময়টা সঠিক ছিল না। সে যে পড়াশুনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। তাই সে বিয়েতে অমত করেছিল। কিন্তু ঠাকুমার নাতবৌ দেখার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়েই অসময়ে বিয়েটা করে কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে বাধ্য হয়েছিল। আজ সে তার সবটুকু দিয়েই নলিনীকে চায়। তার যে মনের কোন এক কোণে নলিনীর জন্য একটু একটু করে ভালোবাসা জমা হয়েছে সেটা যে সে ছাড়া আর কেউই জানে না। কিন্তু তার বড্ড জানতে ইচ্ছা করে নলিনীর মনেও কি তার জন্য কোন জায়গা তৈরি হয়নি? নানান ভাবনায় ডুবে যায় সে। হঠাৎ বাইরে গাড়ির আওয়াজে তার ভাবনার তাল কেটে যায়।

এই সময় দরজার বাইরে হৈচৈ শুরু হলো— — নলিনীইই! কোথায় তুই?
অর্পিতা, ময়ূর,  একসাথে এসে পড়েছে। হাসি-আড্ডায় মুহূর্তেই বাড়িটা জমে উঠল।
নলিনী ছুটে গিয়ে সবাইকে জড়িয়ে ধরল, — তোরা এলি! ভাবছিলাম আর আসবি না!
-- তোর এই ভাবনার কারণটা জানতে পারি? আমরা তো তোকে বলেছিলাম আমরা আসবোই। এখানে আসার আমাদের একটা প্রধান কারণও আছে। হাসতে হাসতে ময়ূর কথাগুলো বলল।
নলিনী জানতে চাইলো ,
-- কী কারণ রে -
কিন্তু উত্তর পেলো না। অর্পিতা, ময়ূর দু'জন দু'জনের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি হাসলো।
অর্পিতা মজা করে বলল, — দোলের আগে তোর বাড়িতে না এলে কি চলে? আর যখন আমরা সব জেনে গেছি।
ময়ূর চোখ টিপে বলল, — আর শুনেছি, আজ বাড়িতে বিশেষ অতিথিও এসেছে!
নলিনী একটু চমকে উঠে বলল, — কে বিশেষ অতিথি?
 ময়ূর হেসে দূরে দাঁড়ানো তপেশের দিকে তাকিয়ে বলল, — আরে, আমরা কি অন্ধ নাকি?
নলিনী লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
তপেশ এগিয়ে এসে নম্র গলায় বলল, — তোমরা নলিনীর খুব কাছের মানুষ, তাই না?
অর্পিতা উত্তর দিল, — হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে … চেনা লাগছে কিন্তু না চিনলেও ক্ষতি নেই। আজ থেকে আপনাকেও চিনে নেবো।
-- হ্যাঁ চেনা লাগতেই পারে। কারণ একটা আছে বৈকি। তবে এখন সেটা বলা যাবে না। তবে বলবো - সময় তো চলে যাচ্ছে না।
এই কথায় যেন একটা অন্যরকম ইঙ্গিত ছিল। ওরা সেটা বুঝল, কিন্তু কিছু বলল না।
উঠোনে সবাই বসে পড়ল। লুচি ভাজা শুরু হলো। গরম গরম লুচি আর আলু চচ্চড়ি নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি—সব মিলিয়ে পরিবেশটা একদম উৎসবমুখর হয়ে উঠল।
কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও একটা অদৃশ্য টানাপোড়েন রয়ে গেল—তপেশ আর নলিনীর মধ্যে।
হঠাৎ অর্পিতা বলল, — কাল দোল। সবাই কিন্তু রঙ খেলবো। কেউ পালাতে পারবি না!
ময়ূর হেসে বলল, — বিশেষ করে দু’জনকে আমরা ছাড়বো না!
সবাই একসাথে বলল, — কারা?
ময়ূর তাকিয়ে বলল, — নলিনী আর তপেশদা!
নলিনী একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, — আরে না না, আমি এসব—
তপেশ ধীরে গলায় বলল, — কেন? খেলতে সমস্যা কোথায়?
নলিনী অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। তপেশের চোখে আজ এক অদ্ভুত কোমলতা।
সে নলিনীর দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে আস্তে করে বলল, — কাল… আমরা একসাথে রঙ খেলব। 
নলিনীর বুকটা কেঁপে উঠল। এত সহজে, এত স্বাভাবিকভাবে তপেশ এমন কথা বলবে—সে ভাবতেই পারেনি।
নলিনী কিছু বলতে পারল না। শুধু লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। অর্পিতা আর ময়ূর যেন কিছুই দেখেনি কিছুই শোনেনি।
দূরে আকাশে তখন হালকা রঙের আভা—ঠিক যেন আসন্ন দোলের রঙের ইঙ্গিত।
কিন্তু এই রঙ কি শুধু আবিরের হবে?
না কি এতদিনের দূরত্ব, অভিমান আর না বলা ভালোবাসাও রঙে রঙিন হয়ে উঠবে? সময় সে কথা বলবে।

ক্রমশ -

Sunday, April 19, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (১৫ পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( ১৫ তম পর্ব)

  সেই ফুলশয্যার রাতের পর এতগুলো বছর বাদে আজ পুণরায় তপেশের সাথে কথা। তপেশ একবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু নলিনীর বুকের ভিতরে যে ঝড় বয়ে চলেছে তার বিন্দুমাত্র তপেশ টের পাচ্ছে কি? নলিনী চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়লো। পুণরায় তপেশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে তার প্রশ্নের উত্তর দিলো কম্পিত কণ্ঠ
-- আমি ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজে পড়ি
-- ওই কলেজেই তো  
 কথা বলতে বলতে নলিনীর দিকে তাকিয়ে দেখে সে কথাটি বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। দরজার দিকে তাকিয়ে তপেশ দেখে নলিনীর চলে যাওয়ার প্রমাণ দিচ্ছে দরজার পর্দা হেলেদুলে।
 আজ দু'মাস তপেশ ওই কলেজেই লাইব্রেরিয়ান পদে রয়েছে। কিন্তু নলিনীকে সে কোনদিন দেখেনি কিংবা হয়ত দেখেছে চিনতে পারেনি। শুভদৃষ্টিতে সেভাবে কেউ কাউকেই দেখেনি। ফুলশয্যার রাতে আবছা আলোয় যে মেয়েটির সাথে সে কথা বলেছিল তার দিকে তাকিয়েও সে সেদিন দেখেনি। তাই মুখোমুখি হলেও সে হয়ত নলিনীকে চিনতে পারেনি। নলিনীও ঠিক তাই। অজান্তেই তপেশের মন বলে ওঠে, "ঠাকুমা যে বলতেন জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে সবই ভবিতব্য।" এটাই হয়ত ঠিক। ঈশ্বর বোধহয় এইভাবেই তাদের বিয়েটা কপালে লিখেছিলেন। যা তার জীবনে ঘটেছে সবই কপালের লিখন ছাড়া আর কিছুই নয়।
 অনেকদিন পর আজ বাবা, ছেলে একই সাথে ডাইনিংয়ে খেতে বসেছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাপসবাবু এখন তার নিজের ঘরেই খান। অনেকদিন পর আজ তাঁর মন খুব প্রফুল্ল। তিনি বুঝতে পারছেন এবার তাঁর মনের আশা পূরণ হতে চলেছে। ছেলের হাবভাব দেখে বাবা হিসাবে হয়ত তিনি তার মন সঠিক পড়তে পারছেন। সকালেও তিনি মাসিকে বিনা কারণেই ঘরে দেখে এটা ওটা করিয়ে আটকে রেখেছিলেন। তাকে পাঠিয়েই পর্দার বাইরে থেকে তাদের কথোপকথন শুনতে না পারলেও তারা যে কথা বলছে সে খবর তার বিশ্বস্ত গৃহ কর্মচারীটি এনে দিয়েছে। তাই আজ তিনি বেশ খোশমেজাজেই আছেন। ছেলের পছন্দসই বাজার করিয়েছেন। আজ কী কী রান্না হবে তাও তিনি তার বৌমারুপি কন্যাটিকে জানিয়ে দিয়েছেন। পরিশেষে তিনি বৌমাকে বলেছেন
-- আজ আমি ডাইনিংয়ে খেতে যাবো মা। 
-- কিন্তু বাবা
-- কোন কিন্তু না। ছেলেকে একদম বুড়ো করে রেখে দিয়েছো। সব সময় শাসনে আছি। আজ আমার এই কথাটা তুমি রাখো মা। তোমার সেবাযত্ন নিয়ে আমি তো ভালোই আছি এখন। ক'টাদিন  বাড়ির ভিতর এদিকওদিক করলে আমার শরীরের কোন ক্ষতি হবে না।
-- ঠিক আছে। আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাবো তবে।
-- যদিও আমি একাই যেতে পারবো তবুও তুমি যখন বলছো তাই হবে।
 দুপুরে মাসিকে খাবার রেডি করতে বলে নলিনী আসে তার শ্বশুরকে নিয়ে যেতে। একটু আগেই মাসি খাবার খেতে ছোটবাবুকে ডেকে গেছে। তাপসবাবু ঘরে বসে সেটা জানতে পেরে নিজে খেতে যাওয়ার জন্য দরজার কাছে দাঁড়িয়ে - ভাবখানা এমন তিনি কারও সাহায্য ছাড়াই একাই চললেন খেতে। তপেশ তার ঘর থেকে বেরিয়ে বাবাকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে এসে তাঁকে ধরে বলে,
-- আরে তুমি একা কোথায় যাচ্ছ?
-- কেন আমি দুপুরে খাবো না
-- তুমি তো ঘরে খাও। এইভাবে এগোতে গেলে তুমি তো পড়ে যাবে বাবা।
-- মোটেই পড়বো না। মা আমাকে ছোট খোকাটি পেয়েছে। যেন টলোমলো পায়ে হাঁটি।( বৃদ্ধ মনেমনে হাসছেন কথাগুলো বলে। কারণ এসবই তাঁর অভিনয় চলছে। ছেলের সাথে আগের মত ফ্রী হওয়ার জন্য)
 তপেশ বাবাকে ধরে এগোতে থাকে। আর বৃদ্ধ বলেই চলেছেন, 
-- আমাকে ধরার কোন দরকার নেই, আমি একাই যেতে পারবো। মা আমাকে একটু বেশি শাসনে রেখেছে তাই আমি ঘরে খেতাম, এখন থেকে আমি আমি ডাইনিংয়ে গিয়েই খাবো, আমি এখনো এত বুড়ো হইনি --
-- কে বলেছে আপনাকে বুড়ো ? আপনি আমার যুবক ছেলে -
 
বলতে বলতে নলিনী এসে তাপসবাবুকে ধরে ফেললো। তার মুখে হালকা হাসি, কিন্তু চোখের কোণে অদ্ভুত এক টান— যেন ভিতরে কোথাও জমে থাকা আবেগকে আড়াল তো  করছেই একটা ভালোলাগাও কাজ করছে বাবা, ছেলেকে একসাথে দেখে।
-- আপনি একদম ঠিক বলছেন বাবা, আপনি একা একাই যেতে পারবেন। তবুও আমরা আছি তো, একটু নাহয় আমরা আপনাকে ধরে নিয়ে গেলাম। তাতে আমাদেরও ভালো লাগবে যে! এটুকু করতে দেবেন না?
 তাপসবাবু মুচকি হেসে বললেন,
 -- আহা, আদর না পেলে কি আর বাঁচা যায় নাকি? তবে বেশি আদর করলে কিন্তু আমি সত্যিই বুড়ো হয়ে যাবো।

  তপেশ হেসে উঠলো। বহুদিন পর এই হাসি— নির্ভেজাল, স্বতঃস্ফূর্ত! নলিনী এক ঝলক তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এই মানুষটাই কি সেই মানুষ, যার সাথে তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত, অসম্পূর্ণ একটা সম্পর্ক জড়িয়ে আছে?
তিনজনে ধীরে ধীরে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো।
মাসি গরম ভাত, ডাল, আলু-পোস্ত, মাছের ঝোল, চিংড়ির মালাইকারি সাথে আবার কচি পাঠার পেঁয়াজ রসুন ছাড়া শুধুমাত্র লবঙ্গ,গোলমরিচ আর আদা দিয়ে পাতলা ঝোল সব সাজিয়ে রেখেছে। তাপসবাবু বসেই বললেন,
 -- আজ তো দেখি রাজকীয় আয়োজন!
নলিনী হেসে বললো, -- আপনার জন্যই তো বাবা। আপনার কথামত সব বাজার করা হয়েছে আজ। বৃদ্ধ একটু হোঁচট খেলেন। কারণ তিনি তো আজ ছেলের পছন্দসই বাজারের ফর্দ করে দিয়েছিলেন। তপেশ বাবার দিকে একটু আড়চোখে দেখে 
 চুপচাপ বসে খেতে শুরু করলো বাপ, ছেলের চোখাচোখি হল। 
 কিন্তু হঠাৎই তার চোখ পড়লো নলিনীর দিকে। সে খুব স্বাভাবিকভাবে সবার থালায় খাবার পরিবেশন করছে— কিন্তু তার হাতের হালকা কাঁপুনি তপেশের চোখ এড়ালো না।
-- তুমি ঠিক আছো? — হঠাৎই প্রশ্নটা করে ফেললো তপেশ।
নলিনী একটু থমকে গেল। তারপর দ্রুত সামলে নিয়ে বললো, -- হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি। কেন?
-- না, এমনিই… মনে হলো—
 বৃদ্ধ ছেলে আর বৌমার এই সাধারণ কথা শুনেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু তাদের মোটেই বুঝতে দিলেন না বিষয়টা।
কথাটা শেষ করলো না তপেশ। কিন্তু তার চোখে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল।
তাপসবাবু দু’জনের দিকে তাকিয়ে সবটাই লক্ষ্য করছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞ চোখ এড়ালো না এই অস্বস্তি, এই অদ্ভুত টানাপোড়েন।
খাওয়ার মাঝেই তিনি হঠাৎ বললেন, -- তপেশ, তোমার কলেজ কতদিন ছুটি? মানে আমি বলতে চাইছি তুমি কতদিন বাড়িতে আছো? ছুটি শেষ হলেই আবার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি এখান থেকেই কলেজ করবে ভাবছো?
  সত্যি বলতে তপেশ তো এই ব্যাপারে কিছুই ভাবেনি। তাই সে চুপ করেই থাকলো। বৃদ্ধ তখন বললেন,
-- আমরা তোমাকে কিছু না বললেও তুমি নিশ্চয়ই শুনেছ আমার মা এখন কলকাতায় কলেজে পড়ছে। যদিও রোজ যেতে পারে না। কিন্তু তাতে কী মায়ের আমার রেজাল্ট মন্দ নয়। ওই যে কলেজটার নাম --
 তপেশ বলে উঠলো,
-- ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজ
-- ওহ তুমি জানো দেখছি - তা তুমি কোন কলেজে আছো?
-- আমিও ওই কলেজেই আছি
 নলিনী খাসির মাংসের ঝোলটা বাটিতে তুলছিল। তপেশের কথা শুনে তার হাত ফোসকে কিছুটা ঝোল টেবিলে পড়ে গেলো। বাবা, ছেলে দুজনেই দেখলেন কিন্তু সেই বিষয়ে কোন কথা না বলে তাদের আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন।
-- মা আমার এখান থেকেই যাতায়াত করে। একটু তো কষ্ট হয় বৈকি। কিন্তু তবুও বাড়িতে থাকার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে কী বলো? তোমার বিশেষ কোন অসুবিধা না হলে তুমিও বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতে পারো। গাড়ি তো আছেই।
 কিছুটা সময় নিয়ে তপেশ মুখ নিচু করে খেতে খেতে বাবাকে জানালো,
-- এই বিষয়ে এখনো কিছু ভাবিনি। তবে এখন মনেহচ্ছে ভাবতে হবে। 
 শেষ কথাটা একটু আস্তেই বলে সে। কথাটা বৃদ্ধের কান অবধি না পৌঁছালেও নলিনী ঠিক শুনতে পায়। সে তার স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ে। তপেশও ওই সময় নলিনীর দিকে তাকিয়েই কথাটা বলে। দু'জনে চোখাচোখি হতেই লজ্জায় নলিনী মুখটা নিচু করে নেয় আর তপেশ একটা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে চোখটা নামিয়ে নেয়।
 বয়সের ভারে বৃদ্ধের শ্রবণশক্তি সামান্য কমলেও ছানি অপারেশনের পর দৃষ্টিশক্তি হয়েছে প্রখর। সবকিছুই দেখে তিনি মনেমনে ভাবতে থাকেন "তবে কি আমার আর আমার বৌমা রুপি মেয়ের জীবনে দেখা স্বপ্নগুলি বাস্তব হতে চলেছে? মৃত্যুর আগে কি আমি আমার ছেলের জীবনটা গুছিয়ে দিয়ে যেতে পারবো? ঈশ্বর কি সে সুখ আমার কপালে লিখেছেন? এই বৃদ্ধ বয়সে সবচেয়ে দামী সিদ্ধান্তটা নিতে আমি যে কোন ভুল করিনি তা কি দেখে যেতে পারবো?"

ক্রমশ 

8

Tuesday, April 14, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ ( ১৪ তম পর্ব)

 ভালোবাসার নীল আকাশ ( ১৪ তম পর্ব)

 বহুদিন ধরেই অর্পিতা আর ময়ূর নলিনীর বাড়িতে আসবে আসবে করছে। কিন্তু তপেশ যেদিন বাড়িতে আসে যেহেতু নলিনী এই সম্পর্কে কিছুই জানতো না আর সেদিনই ওরা ঠিক করেছে দোলের আগেরদিন ওরা নলিনীর শ্বশুরবাড়িতে আসবে আর দোলের দিন রাতে করে ওদের কলকাতা পৌঁছে দেবে নলিনীর ড্রাইভার। কিন্তু তপেশ এসে যাওয়াতে নলিনী এখন কী করবে বুঝতে না পেরে সকালবেলা টিফিন নিয়ে শ্বশুরের করে ঢুকে বলে,
-- বাবা, তোমায় বলেছিলাম না আমার দু'জন বন্ধু আসবে দোলের আগেরদিন। ওরা বহুদিন ধরেই আসতে চাইছে। মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের পুজো হবে বলে ওইদিন ঠিক করেছিলাম -
-- এত কিন্তু কিন্তু করছো কেন মা? হ্যাঁ আসবে। ভালো তো আমিও চাই তুমি এভাবেই হাসি আনন্দে থাকো। অসুবিধা তো কিছু নেই।
-- না, মানে আমি তো জানতাম না তোমার ছেলে ওইদিন বাড়ি আসবে তাই -
-- তাতে কী? ভালোই তো হল। 
 বৃদ্ধ মনেমনে কী ভেবে ভালো হল বললেন নলিনী তার কিছুই ঠাওর করতে না পেরে চুপ করেই থাকলো। 

নলিনী কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শ্বশুরের কথার ভেতরে যেন অন্য কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে—এমনটাই মনে হচ্ছিল তার। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর গলায় বলল,
— ঠিক আছে বাবা, তাহলে আমি ওদের আসার সব ব্যবস্থা করে নিচ্ছি।
— হ্যাঁ মা, করো। আর শোনো, তপেশেরও তো ওদের সঙ্গে আলাপ হওয়া দরকার, তাই না? কারা তোমার বন্ধু, কাদের সাথে তুমি এখন উঠাবসা করছো সবকিছুই তো এখন তার জানার সময় এসেছে। আমার মনেহচ্ছে আমার প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে এবার।বৃদ্ধের গলায় যেন এক অদ্ভুত শান্ত হাসি।

নলিনীর বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। তপেশ আর অর্পিতা-ময়ূরের মুখোমুখি হওয়া—এই ব্যাপারটা সে কোনোভাবেই সহজভাবে নিতে পারছে না। সব বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলেও কিছু কথা তো গোপন থেকেই যায় যা একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু মুখে কিছু না বলে সেখান থেকে বেরিয়ে এল।

নিজের ঘরে এসে দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করতেই সে মোবাইলটা তুলে নিল। অর্পিতাকে ফোন করতেই ওপার থেকে খুশির গলা ভেসে এল,
— কিরে! অবশেষে ফোন করলি? আমরা কিন্তু রেডি হয়ে আছি।
নলিনী একটু থেমে বলল,
— তোদের আসা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই… কিন্তু একটা ব্যাপার হয়েছে।
— কী হয়েছে? তোর গলাটা এমন কেন? — অর্পিতার গলায় উদ্বেগ স্পষ্ট।
— তপেশ হঠাৎ করে বাড়ি এসেছে। আর দোলের সময় ও বাড়িতেই থাকবে।
কিছুক্ষণের জন্য ওপারটা নিস্তব্ধ। তারপর পুণরায় অর্পিতার গলা শোনা গেল,
— তপেশ? মানে… তোর স্বামী? ভালোই তো। পরিচয়টা হয়ে যাবে। তুই তো কোন কথাই তার সাথে এইকটা বছরে বলিসনি। এবার কথা হবে আর তাছাড়া আরও অনেককিছুই হতে পারে কী তাই তো?
 অর্পিতা প্রচণ্ড হাসতে থাকে। 
-- এই এই একদম বাজে বকবি না বলে দিচ্ছি। আমি কিন্তু তোদের সব বলেছি ওর আর আমার সম্পর্কের কথা।
-- আরে দাঁড়া আগে আমাদের আসতে দে তোদের বাড়িতে। তারপর দেখি কী করা যায়। আবার হাসতে থাকে অর্পিতা।
নলিনী দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ফেলে বলল,
— দেখ মানুষের ভাগ্যকে অস্বীকার করা যায় না। কপালে যা আছে তাই হবে। তাই বলে ওর কাছে আমি মাথা নত করতে পারবো না কারণ তাহলে আমার শ্বশুরমশাইকেই ছোট করা হবে। সেটা আমি পারবো না কিছুতেই।
অর্পিতা একটু ভেবে বলল,
— তাহলে কি আমরা আসবো না?
—আরে না! তোদের আমার বাড়িতে আসার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই রে। তোরা আসবি, থাকবি আর জমিয়ে আমরা দোল খেলবো।
-- এই খাওয়ার কথা বললি নাতো
দু'জনেই জোরে হাসতে থাকে। এরপর 
 নলিনী যেন একটু বেশি জোরেই বলে ফেলল। 
 — তোরা আসবি। এতদিন পর…  একটা ডেট ফাইনাল করেছি আমরা। আর বাবা বলেছেন তোদের আসতেই হবে। আমরা খুব মজা করবো। তাড়াতাড়ি চলে আসবি কিন্তু।
ওপাশে অর্পিতা ধীর স্বরে বলল,
— ঠিক আছে, আমরা আসব। একদম ভাবিস না। আমরা দু'জনে ব্যাগ গুছিয়ে একদম রেডি। 

  নলিনী জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। বসন্তের হাওয়ায় গাছের পাতা নড়ছে, কিন্তু তার মনের ভিতরটা যেন অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে।
মনেমনে ভাবতে থাকে এতদিন পর এবার তপেশ বাড়ি ফেরার পর সেও লক্ষ্য করছে তার সম্পর্কে যেন একটু বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে, সে নিজেও বুঝতে পারছে না কী হতে চলেছে… । তবে অর্পিতার কথাটা খুব মনেহচ্ছে। সে বলেছে সবকিছুর একটা শেষ আছে। দেখিস তপেশদা এবার ঠিক তার মনের কথাটা তোকে জানাবে আর এবারই সব ঠিক হয়ে যাবে। কখনো কখনো মুখোমুখি হওয়াটাই দরকার হয়। তারজন্য উভয়কেই একটু সাহস যেমন দেখাতে হয় ঠিক তেমনই একটু মাথাও নোয়াতে হয়। একপক্ষের ইচ্ছায় কিছুই হয় না। এটা ভালোবাসা বস্। এখানে সবকিছুই চলে আর কোনকিছুতেই দোষ দেখলে হয় না। 
 সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে নলিনী ঘুমিয়ে পড়ে। আর ওদিকে তপেশ তার ঘর লাগোয়া লম্বা বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে ভাবতে থাকে নলিনী নিজের থেকে হয়ত কোনদিনও তাকে মেনে নিতে পারবে না কারণ সে সম্পূর্ণভাবেই এই ব্যাপারে বাবার উপর নির্ভরশীল। সেতো শুধু একটু সময় চেয়েছিল নিজেকে তৈরি করার। এখন সে মোটামুটি একটা চাকরি তো পেয়েছে। বাবার এই বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী সে হলেও সে কখনোই চায়নি বাবার উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাতে। বাবা বিষয়টা বুঝতে পারেননি বলেই হয়ত তাকে ভুল বুঝেছেন। কিন্তু এখন তো কোন সমস্যা নেই। তবে নলিনীর দিক থেকে কোন সাড়া না পেলে সে নিজের থেকে কোন কথা তাকে বলতেও পারছে না। কিন্তু কোথায় বাঁধছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। ঘরে,বাইরে সব জায়গায় সকলের মুখে নলিনীর প্রশংসা। শুনতেও খুব ভালো লাগছে তপেশের। তাহলে কি সে বিয়ের মাত্র ক'টি মন্ত্র পড়ার কারণেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছে? কী আছে ওই মন্ত্রে? তপেশ ভাবতে থাকে ওর মনের মধ্যে নলিনী জন্য যে ঝড় উঠেছে নলিনীর মনেও কি তারজন্য কোন জায়গা তৈরি হয়েছে? সে কি একবারের জন্যও তার কথা ভাবছে? নাকি ফুলশয্যার রাতের সেইসব কথা ধরে বসে আছে? যেভাবেই হোক নলিনীর সাথে কথা বলতেই হবে।
   ভোরে উঠে সেদিন তপেশ নিজের বারান্দাতেই বসে ছিল। রান্নাঘরে কাজের মাসি চা করে যখন কাপে ঢালতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে বড়বাবুর ডাকে তাকে তাপসবাবুর ঘরের দিকে ছুটতে হল। অগত্যা নলিনী চা কাপে ঢেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থেকে তাকে দেখতে না পেয়ে নিজেই চা নিয়ে তপেশের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। বুকটা যদিও কাঁপছে তবুও চা'টা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে এই আশঙ্কায় তার ঘরের কাছে এসে পর্দা সরিয়ে দেখে তপেশ ঘরে নেই। এগিয়ে যায় বারান্দার দিকে। দেখে ইজি চেয়ারটাতে বসে আনমনেভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তপেশের সামনে চা'টা রেখেই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ তপেশের কথাই দাঁড়িয়ে পড়ে। বুকের ভিতর তখন নলিনীর সমুদ্রের গর্জন চলছে যা সেই একমাত্র শুনতে পাচ্ছে।
-- কথা ছিল
নলিনী দাঁড়িয়ে পড়ে।
-- তোমার আমাকে কিছু বলার নেই?
নলিনী কিছুটা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-- বাবার এখন বয়স হয়েছে। মাঝে মাঝেই শরীর খারাপ করে। কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া এই বিশাল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী আপনি । সবকিছু বুঝে নিতে হবে তো তিনি থাকতে থাকতে। আমি পরের বাড়ির মেয়ে। আর কতদিন এসব রক্ষা করে চলবো?
 তপেশ নলিনীর এই কথাই একটুও অবাক হয় না। তারমত বুদ্ধিমতী মেয়ের কাছ থেকে এরকমই সে আশা করেছিল। বরং না হলেই হয়ত সে অবাক হত।
-- প্রথমেই তোমায় একটা কথা বলি। আমায় আপনি বলবে না। আপনি বললে অনেক দূরের মনেহয়। আমি কি সত্যিই তোমার দূরের কেউ?
 নলিনী কাঁপতে থাকে। কোন উত্তর দেয় না। তপেশ আবার বলে,
-- হ্যাঁ আমার পড়াশুনা তো শেষ। ছোটখাটো একটা চাকরিও পেয়েছি। আশাকরি এরপরে আরও ভালো কিছু পেয়ে যাবো। এখন তো ছুটি পড়লেই বাড়িতে আসবো। কোন অসুবিধা হবে না আর। কিন্তু আমি বলছিলাম --
চুপ করে যায় তপেশ। নলিনী উৎসুক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তপেশ কথাটা ঘুরিয়ে দিয়ে বলে,
— শুনলাম তোমার বন্ধুরা আসছে?
— হ্যাঁ… ।
— ভালো। আমিও তো চিনে নেবো, তাই না? — তপেশের চোখে যেন কৌতূহলের সঙ্গে অন্য কিছু ঝলক দিল।
নলিনী হালকা হাসার চেষ্টা করল,
— নিশ্চয়ই।
তপেশ কাপটা নামিয়ে রেখে বলল,
— নলিনী, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বলো।
— তুমি কি সত্যিই খুশি এখানে?
প্রশ্নটা শুনে নলিনী থমকে গেল। এতদিনের জমে থাকা প্রশ্ন যেন হঠাৎ করেই সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,
— খুশি থাকার চেষ্টা করি। বাবা আমায় খুব ভালোবাসেন। তাঁর একমাত্র সন্তান তাঁর কাছে থাকে না। তাই বোধহয় আমায় এভাবেই আঁকড়ে ধরেছেন।
তপেশ গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল,
— চেষ্টা আর সত্যি—দু'টো কিন্তু আলাদা জিনিস। তবে আমি তো কিছুদিন সময় চেয়েছিলাম মাত্র। এখন তো সব কিছুই ঠিক হয়ে যেতে পারে ।তাই না?
নলিনী আর কিছু বলতে পারল না। বাতাসটা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎ করেই তপেশ জানতে চাইলো,
-- আচ্ছা তুমি কোন কলেজে পড়ো?

ক্রমশ
    

Sunday, April 12, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (১৩ তম পর্ব)

 ভালোবাসার নীল আকাশ (১৩ পর্ব)

   সময় বসে থাকে না। সে তার নিয়ম মেনেই এগিয়ে চলে। ময়ূরের সূত্র ধরে অর্পিতাও এখন নলিনীর বন্ধু। সময় যেমন এগিয়ে চলেছে সম্পর্কের বন্ধনগুলিও আস্তে আস্তে মজবুত হয়ে উঠছে। ওরা তিনজনে একই কলেজে ভর্তি হল। তাপসবাবু তার জমির কিছুটা বিক্রি করে নলিনীর জন্য এক গাড়ি কিনে বসলেন। গ্রামের লোকেরা মুখ টিপে হাসাহাসি, টোন-টিটকারি যে তার কানে আসেনি তা কিন্তু নয়। কারণ সেই যে ছেলে ঠাকুমার কাজ শেষে বেরিয়েছে তারপর আর আসেনি। কিন্তু মাসের শেষে ছেলের বরাদ্দ টাকা তাপসবাবু ঠিক পাঠিয়ে দেন। বাবার খবরাখবরও তপেশ রাখে ফোনের মাধ্যমেই। কিন্তু নলিনী সম্পর্কে কোন কথা বাবার কাছে  জিজ্ঞাসা করতে সে সাহস পায় না। 
 গ্রামে থেকেও যে লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হওয়া যায় সেটাই যেন তাপসবাবু নলিনীকে দিয়ে তার ছেলেকে দেখিয়ে দিতে চান। 
 নলিনী দু' একবার বাপেরবাড়িতে গেলেও সে দিনই ফিরে এসেছে তার বাবা একা থাকবেন বলে। তাপসবাবুও এখন যেন নলিনী ছাড়া অসহায়! পড়াশুনার মধ্যেই নলিনী জমিজমা, বিষয়সম্পত্তি এমনকি সংসারের সবকিছুতেই সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে। শুধু শ্বশুর,বৌমা নয় এখন তারা বাপমেয়ের থেকেও দু'জন দু'জনের কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছেন। দু'জনের মনের কষ্টের দিকটা পরস্পর গোপন রেখেই চলেন।
 কোন কাজেই নলিনীর কোন না নেই। সবকিছুতেই সে যেন সিদ্ধহস্ত। সে সংসার,পড়াশুনা, বিষয় সম্পত্তি এমন কী পাঁচ সাতটা কাজের লোক থাকার পরেও শ্বশুরের সেবাযত্ন সব কিছুই তার নজর এড়ায় না। বয়স জনিত কারণে অনেক সময় জমিজমা সংক্রান্ত কোন ঝামেলায় নলিনী তাপসবাবুকে আর জড়ায় না নিজেই সমস্যার সমাধান করে থাকে। সবকিছু সত্ত্বেও বৃদ্ধের কোথাও যেন একটা কষ্ট কাজ করে তা নলিনী তাঁর মুখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারে। একমাত্র সন্তান ছেড়ে থাকার যে যন্ত্রণা তা  মাঝে মাঝে তাঁর মুখে ফুটে ওঠে। 
 কলেজে নিয়মিত যাতায়াত করতে না পারলেও বছর বছর পরীক্ষার রেজাল্ট তার মন্দ নয়। আসলে ছেলেবেলা থেকেই নলিনী ছিল খুব মেধাবী। কোন প্রাইভেট শিক্ষক কোনদিন তার পরিবার তার জন্য রাখতে পারেননি। সে যেটুকু পড়াশুনা করেছে নিজের চেষ্টায় আর মেধার গুনে। 
  খুব সুন্দরী সে না হলেও চেহারা তার মন্দ নয়। অভাবের মধ্যে মানুষ হওয়ার ফলে চেহারার লালিত্য সেভাবে ছিল না। ভালো থাকা,খাওয়া আর পরার দৌলতে এখন সে রীতিমত রূপসী। নিজের ব্যক্তিত্ব আর পুরুষের কুনজর থেকে নিজেকে রক্ষা করার সমস্ত গুন তার মধ্যে আছে। 
  সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে জীবন ঠিক এগিয়ে যায়। আগে তপেশ মাঝে মধ্যে বাড়ি আসলেও বিয়ের পর থেকে মোটামুটি আসা বন্ধ করেছে বলাই ভালো।
    একদিন কলেজ থেকে ফিরে এসে জানতে পারে তপেস এসেছে। নিজের অজান্তেই বুকের ভিতর একটা ধাক্কা খায়। কলেজ থেকে বাড়িতে ফিরেই বাবার সাথে আগে দেখা করা তার নিত্য দিনের অভ্যাস। ঘরে ঢুকতে গিয়ে ঘরের বাইরে জুতো দেখে নলিনী বুঝতে পারে তপেশ এই ঘরেই আছে। সে ঘরে না ঢুকে বাইরে থেকেই তার শ্বশুরকে জানায় সে বাড়ি ফিরেছে। তপেশ বুঝতে পারে না নলিনী কোথায় গেছিলো কিন্তু তার মনের ভিতর প্রশ্নটা থেকেই যায়। 
  রান্নার মাসিকে দিয়ে তপেশের টিফিন জলখাবার সে বাবার ঘরেই পৌঁছে দেয়। তপেশ বাবার ঘরে টিফিন সেরে অনেকক্ষণ বসে থাকে। মামুলী দু'একটি কথা ছাড়া আর কোন কথা বাবার সাথে তার হয় না। নলিনী সম্পর্কে কোন কথা জিজ্ঞাসা করার সাহস তার নেই।সে নিজেই সে পথ বন্ধ করেছে।আর তাপসবাবুও এ বিষয়ে কোন কথা তোলেন না। একসময় তপেশ উঠে নিজের ঘরে চলে যায়। উঠে চলে যাওয়ার আগে বাবাকে বলে,
-- তোমাকে একটা খবর দিতে এসেছি। আমি একটা চাকরি পেয়েছি কলেজে লাইব্রেরিয়ান পদে। এখন থেকে তোমার আমাকে টাকা না পাঠালেও চলবে।
 তাপসবাবু কোন উত্তর করেন না তপেশ তার ঘরে চলে যায়। তাপসবাবুর বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। মনেমনে বলতে থাকেন " যার কোটি টাকার উপরে সম্পত্তি সে সামান্য কয়েক হাজার টাকার জন্য এমন লক্ষ্মী প্রতিমার মত মেয়েটিকে বুঝতেই চাইলো না।
ঘরে এসে তপেশ স্নান করে ফ্রেশ হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে একটু বাইরে ঘোরার উদ্দেশ্য নিয়ে। রাস্তার মোড়ে এসে চায়ের দোকানে জটলা দেখে সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়।
 অনেকদিন পর তপেশকে দেখে পরিচিতরা নানান কথা জিজ্ঞাসা করতে থাকে। সে হাসি মুখেই সকলের কথার উত্তর দিতে থাকে। হঠাৎ তার ছেলেবেলার বন্ধু বলে বসলো,
-- বউকে নিয়ে যখন সংসার করবি না তখন বিয়ে করলি কেন?
 প্রথমটাই তপেশ কিছুটা ধাক্কা খায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-- নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বাবার টাকায় বউ নিয়ে সংসার করার মনোবৃত্তি হয়নি তাই। সকলের মানসিকতা তো সমান নয়। আর তোদের কে বললো? আমি সংসার করতে চাই না? আমাদের তো কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আমরা তো দিব্বি আছি। এখন চাকরি পেয়ে গেছি। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। সবকিছুই এখন অন্যখাতে বইতে শুরু করবে। তোদের মত ভাবতে পারিনি। তাই এতদিন চুপচাপ ছিলাম।
 বন্ধুটি আর কোন কথা বলার সুযোগ পেলো না। কারণ তপেশের কথা শেষ হতে না হতেই একজন বয়স্ক ব্যক্তি বলে উঠলেন,
-- সবাইকে কি তোমার মত ভাবো? নিজে তো কিছুই করো না। বিয়ে করে বসে আছো। শুনছি তোমার বউ নাকি পোয়াতি। সবটাই তো বাপের ঘাড়ে। বয়স তো কম হল না। এবার নিজে কিছু চেষ্টা করো। বসে বসে খেলে রাজকোষও শূন্য হয়ে যায়। আর শোনো হে আমাদের তপেশের বউ রূপেগুনে মা সরস্বতী। একহাতে কেমন সবদিক সামলে শ্বশুরের সেবাযত্ন করে লেখাপড়াটা চালিয়ে যাচ্ছে। 
 তপেশ এখানেই শোনে তার বউ কলকাতা শহরে পড়াশুনা করতে রোজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা জার্নি করে। তার বাবা একটা গাড়িও কিনে দিয়েছেন তার যাতায়াতের সুবিধার্থে। অবাক হয়ে শোনে সকলের মুখে নলিনীর প্রশংসা। ঘন্টা দু'য়েক সময় কোথা দিয়ে কেটে গেলো বুঝতেই পারলো না। কিন্তু মনের মধ্যে তার এখন অনেক প্রশ্ন। নলিনী কলকাতা কোন কলেজে পড়ে, কী পড়ে, কেমন করে এত পরিশ্রমের পরেও বাড়িতে এসে সংসারের খুঁটিনাটি সব ব্যাপারে নজর রাখে? জমিজমা ,হিসাবনিকাশ কিভাবে সামলায়? 
কিন্তু কে দেবে তার এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর? 
 বাড়িতে ফিরতে তার প্রায় দশটা বেজে যায়। গেট থেকেই সে লক্ষ্য করে ব্যালকনিতে অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি। তার একটুও বুঝতে অসুবিধা হয় না এটা নলিনীই। বুকটার ভিতর হঠাৎ করেই তার কেঁপে ওঠে। কাছে বসিয়ে নলিনীর মুখ থেকে তার সমস্ত ঘটনাগুলি জানতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কোথায় যেন একটা বাধা এসে দাঁড়ায় তার সামনে। এক একবার ভাবে সে কী নিজের ভালো চাইতে নলিনীর সাথে ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছে? নলিনীকে মেনে নিয়ে তার জীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিলো? নিজেকে নিজেই আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কিন্তু সঠিকবেঠিক বুঝতে পারে না। 
 তপেশকে গেট খুলতে দেখেই নলিনী সেখান থেকে সরে আসে। রান্নাঘরে গিয়ে তপেশের খাবার রেডি করতে থাকে। তপেশ উপরে উঠে দেখে বাবার ঘর অন্ধকার। তারমানে বাবা খেয়ে শুয়ে পড়েছেন। নলিনীর ঘরে উঁকি দেয়। কোথাও তাকে দেখতে পায় না। এবার নিজের ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিংয়ে গিয়ে ঢোকে ডিনার করতে। গিয়ে দেখে রান্নার মাসি খাবার গুছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তপেশ কোন কথা না বলে  খেতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর সে জানতে চায় মাসির কাছে,
- বাড়ির সকলের খাওয়া হয়ে গেছে?
-- হ্যাঁ সকলের খাওয়া হয়ে গেছে। শুধু বৌদিমনি আর আমি বাকি 
-- এত রাত হয়ে গেছে তোমরা এখনো খাওনি কেন?
-- ওমা সে কী কথা! তুমি না ফিরতেই বৌদিমনি খেয়ে নেবে? বাড়ির একটা প্রাণীর খাওয়া না হলে বৌদিমনি খায় না। তাই আমিও বসে থাকি। দু'জনে একসাথেই গল্প করতে করতে রাতের খাবারটা খাই। আর যেদিন কলেজ থাকে না সেদিন দুপুরেও একসাথে খাই। কলেজ থাকলে তো তাকে আগেই খেতে হয়।
 তপেশ চুপ করে আরও কিছু শোনার অপেক্ষায় ছিলো। হঠাৎ রান্নাঘর থেকে নলিনী মাসিকে বললো,
-- মাসি এত কথা কেন বলছো? অনেক রাত হল ওনাকে খেতে দাও। খেতে খেতে কথা বলতে গেলে খেতে দেরি হবে।
-- ছোটবাবুই তো জানতে চাইছে। 
 কথাটা বলেই মাসি চুপ করে গেলো। নলিনী রান্নাঘরের দরজার আড়াল থেকে লক্ষ্য করলো তপেশের দু'টো  চোখ রান্নাঘরের দরজার দিকেই। সে নিজেকে আরও কিছুটা আড়াল করে নিলো।

ক্রমশ :