ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫১)
না বিনীতা ছুটি পেলো না। একদিনের জন্য আসাই ঠিক হল। রেজিস্ট্রি করে আবার পরদিন চলে যাবে সন্ধ্যার ফ্লাইটে। সেইমত সব তোড়জোড় শুরু হল অনলদের বাড়িতেই। মামী রেজিস্ট্রির পরেই বাপেরবাড়ি ফিরবেন।
অনলদের বাড়িতে যেন হঠাৎ করেই একটা অদ্ভুত ব্যস্ততা আর মিষ্টি উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হল। সময় খুব কম, সবকিছুই গুছিয়ে, সামলে, ঠিকঠাক করতে হবে এক দিনের মধ্যেই। তাই সেই কম সময়টাই যেন সবার কাছে আরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠল।
লিজা সকাল থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ত। বারবার তালিকা মিলিয়ে দেখছেন, কী কী লাগবে, রেজিস্ট্রির জন্য কী রাখা হবে। আনন্দি কখনো ফুল আনতে দৌড়চ্ছে, কখনো আবার ঘর সাজানোর কাজে লেগে পড়ছে। তার চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও ভিতরে কোথাও একটা চাপা আনন্দ কাজ করছে।দাদার বিয়ে, তাও আবার এতটা তাড়াহুড়োর মধ্যে! ইরা তার স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই চুপচাপ সব কাজ ও অন্যের করা কাজের তদারকি করে যাচ্ছেন।
অনল কিন্তু আশ্চর্যরকম চুপচাপ। বাইরে থেকে সব কিছু সামলাচ্ছে, প্রয়োজনীয় ফোন করছে, কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা বারবার দেখে নিচ্ছে কিন্তু ভিতরের টানাপোড়েনটা কেউ বুঝতে পারছে না। মাঝে মাঝে ফোনটা হাতে নিয়ে থমকে যাচ্ছে, যেন কিছু বলতে চাইছে বিনীতাকে আবার থেমে যাচ্ছে। সে মন থেকে মানতেই পারছে না বিনীতা একদিনের জন্য এসে আবার চলে যাবে। তাই মনটা খুব খারাপ ওর। এতদিন পরে স্বপ্নটা সত্যি হতে চলেছে ঠিকই কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি যেন কাজগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বিনীতা শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা পৌঁছানোর জন্য ছোট্ট একটা ব্যাগে সব গুছিয়ে নিয়েছে। শনিবার ক্লাস করে রাতেই রওনা দেবে। সোজা চলে আসবে অনলদের বাড়িতে। এয়ারপোর্টে অনল থাকবে। ওইদিন রাতেই তার মা আর দাদা বিজয় অনলদের বাড়িতে চলে আসবেন। মনে আনন্দ থাকলেও মনটা ঠিক শান্তিতে নেই। মাত্র একটা রাত্রি। তারপরেই আবার চলে আসতে হবে। বাড়িতেও যাওয়া হবে না। ওই একটা রাত অনলদের বাড়িতেই থাকতে হবে।
নন্দিনী বেশ কয়েকবার বিনীতার কাছে এসেছে। বয়সে নন্দিনী একটু বড় হলেও দু'জনের সাথে বেশ ভাব হয়ে গেছে। তার বিয়ে ঠিক হওয়া, বিয়ের দিনের ঝামেলা সবই নন্দিনী এখন জানে। বেশ কয়েকটি মেয়ে আছে ওই বাড়িতে কিন্তু বিনীতার সাথেই নন্দিনীর ভাবটা বেশি। নন্দিনী শিক্ষিত আহামরি সুন্দরী না হলেও কেউ তাকে কুৎসিত বলবে না।
ছুটি না পাওয়ার জন্য স্কুলের ওপর একটু অভিমান, রাগ আবার এত তাড়াহুড়োর মধ্যে রেজিস্ট্রি—সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।
নন্দিনীর সাথে বসে ব্যাগটা গুছাতে গুছাতে হঠাৎ বিনীতা বলল,
-- ভাবতেই পারিনি এত তাড়াতাড়ি সব ঠিক হয়ে যাবে। খুব টেনশনে ছিলাম। কিন্তু ভগবান নিজেই বিপদে ফেলেন আবার নিজেই সব ঠিক করেন। আমার জীবনই তার প্রমাণ। না হলে এত বছর বাদে লিজা মাসীমণি আমায় দেখে মায়ের সাথে মুখের মিল পেয়ে আলাপচারিতায় ঠিক সম্পর্ক খুঁজে বের করেন? আর তিনি কিনা অনলের মামী। কী অদ্ভুত যোগাযোগ বলো তো? একদম যেন সিনেমার প্লট।
নন্দিনী মৃদু হেসে বললে,
--সব বিয়ে একরকম হয় না রে। কিন্তু ভালোবাসা ঠিক থাকলে বাকিটা আপনাআপনি ঠিক হয়ে যায়। সবই ঈশ্বরের লীলা গো। তিনি যেমন চাইবেই তেমনই হবে সবকিছু। আমরা মিছেই কেঁদে মরি। ভাগ্যে যে যা নিয়ে এসেছি তা কেউ কখনোই খণ্ডন করতে পারবো না। যদি কোনদিন সময় হয় তোমাদের বাড়িতে যাবো। আমিও কলকাতার মেয়ে। ভাগ্যের ফেরে আজ ব্যাঙ্গালোর আছি। বেঁচে আছি সম্মান নিয়ে এখনো এই মায়ের জন্য। মা বলে ডাকার মানুষটা চলে যাওয়ার পর এই মাসিমাই আমার মা হয়ে উঠেছেন।
বিনীতা নন্দিনীর জীবনের পুরো ঘটনা না জানলেও কিছু কথা জানে। তাই সে চুপ করেই নন্দিনীর কথা শুনে গেলো কিছু বলল না। তার মাথার মধ্যে এখন অনেক চিন্তা। কাল সকালে স্কুল থেকে এসেই সন্ধ্যায় ফ্লাইট। এসেই বেরিয়ে যেতে হবে। রবিবার রেজিস্ট্রি। সোমবার ভোরেই আবার ফ্লাইট। সোজা এয়ারপোর্ট থেকে স্কুল।
সে খাটের উপর থেকে উঠে আয়নায় সামনে গেলো।আয়নায় নিজের মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে একটু দুশ্চিন্তা, একটু লজ্জা আর অদ্ভুত অপেক্ষা।
নন্দিনী তাকে বলল,
-- বিনীতা তুমি আজকে একটু পার্লারে যেতে পারতে
-- আমিও যে ভাবিনি তা নয়। কিন্তু ইচ্ছা করলো না
-- আরে সেকথা বললে হয়? কাছেই একটা পার্লার আছে। এখন তো সবে সন্ধ্যা। তুমি পার্লার থেকে একবার ঘুরে এসো। আমার হাতে সময় থাকলে আমিই সাথে যেতাম। কিন্তু জানো তো সবদিকটা দেখতে হয় আমাকে। মা এখন আর পেরে ওঠেন না।
-- ঠিক বলেছো। যাই একবার পার্লারে। এত জার্নির পরে তানাহলে পরশু পেত্নীর মত লাগবে
-- আরে তোমায় দেখতে এত সুন্দর। তুমি যতই জার্নি করো না কেন একটু সাজলেই তুমি সুন্দরী
বিনীতা নন্দিনীর কথা শুনে হেসে দিলো। তারপর সামান্য রেডি হয়ে পার্লারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো।
পরদিন ছিল শনিবার। আর ওর কলকাতা যাওয়ার কথা সকলেই জানেন। সেই সুবাদে হেডমিস্টেড একটু তাড়াতাড়িই ওকে ছেড়ে দিলেন। স্কুল থেকে ফিরে এসে পুণরায় স্নান করে খেয়ে রেডি হয়ে সে বেরিয়ে গেলো এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। মনে খুশি, বুকে একটা আলাদা অনুভূতি, ভয় সব মিলিয়ে ট্যাক্সিতে বসে নানান কথা ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেলো তার গন্তব্যে।
অনল সময়ের অনেক আগেই এয়ারপোর্ট এসে হাজির। অনল এয়ারপোর্ট আসার আগেই বিনীতার মা ও দাদা তাদের বাড়িতে এসে গেলেও তারা ইচ্ছাকৃতই এয়ারপোর্ট আসেননি।
প্লেন থেকে নেমেই অনলকে দেখতে পেয়ে হাসি মুখে এগিয়ে আসে বিনীতা। বিনীতার কাছে কোনোই লাগেজ নেই শুধু কাঁধে ঝুলানো একটা মাত্র ব্যাগ। কারণ বিনীতাকে অনল ও আনন্দি আলাদা আলাদাভাবে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে সে যেন কিছুই ক্যারি না করে কারণ সব তারা কিনে রেখেছেন।
বিয়ের পর থেকে এইভাবে কোনদিন দু'জনে একান্তে কথা বলার সময় পায়নি। এই প্রথম তারা দু'জনে পাশাপাশি বসে। চুপচাপ কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অনল বলল,
-- কোন কথা নেই কেন?
-- তুমিও তো কোন কথা বলছো না
হেসে দিলো দু'জনেই
-- আসলে অনেক কথা জমে আছে কিন্তু কী বলবো, আগে কোনটা বলবো, কীভাবে শুরু করবো ভেবে পাচ্ছি না। আসলে সেদিনের সেই বিয়ের পর থেকে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কাউকে কিছুই জানাতে পারছি না, এদিকে তোমার প্রতি ওই স্বল্প সময়েই অদ্ভুত একটা মায়া পড়ে গেছে, তোমার দিক থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই - সব মিলিয়েমিশিয়ে কেমন একটা পাগল পাগল লাগতো।
-- তুমি যা যা বললে আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। দু'জনেই ভাবছিলাম "তুমি আগে ফোন করো -"
-- ঠিক তাই। কিন্তু দেখো কত সহজে সবকিছুর মীমাংসা হয়ে গেলো।
-- এই সবকিছু খুব সহজে সম্ভব হয়েছে একমাত্র লিজা মাসীমণির জন্য।
-- একদম তাই। এই, এরপর থেকে কিন্তু মাসীমণি নয় মামী বলতে হবে।
বিনীতা হেসে দেয়।
ওরা এসে পৌঁছায়। ইরা বরণডালা এনে বিনীতাকে সামান্য বরণ করেই ঘরে তোলেন আর বলেন,
-- সেদিন তো আমি জানতাম না এটাই আমার ছেলের বউ। এখন যখন জানি তাই একটু বরণ করা আরকী!
একটু বিশ্রাম। তারপর রাতে খাওয়াদাওয়া করে সবাই একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়ে কারণ পরের দিন সকাল দশটাতেই রেজিস্ট্রির সময় ঠিক করা হয়েছে। অনলদের বাড়ির সবাই আর বিনীতার মা,দাদা আপাতত এই ক'জনই। আত্মীয়স্বজন সব বৌভাতে আসবে। সেটা যে কবে হবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।
তবে সকলের ইচ্ছায় ফুলসজ্জার আয়োজন করা হয়েছে রবিবার রাতেই।
একটা নতুন সম্পর্কের শুরু, কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য একসাথে থাকা, তারপরই আবার দূরত্ব।
এই অদ্ভুত মিলন আর বিচ্ছেদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, অনল আর বিনীতা। সব বাধা,বিপত্তি কাটিয়ে আজ তারা দু'জনে এক হতে চলেছে। আশাকরি ঈশ্বর সব ভালোই করবেন এই আশাতেই আজ তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
ক্রমশ