Tuesday, May 19, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৪)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৪)
 আগে থাকতেই বিজয় একটা গাড়ি বুক করে রেখেছিল। সকাল আটটার সময় গাড়ি এসে হাজির। সবাই রেডি বেরোবার জন্য। অনল একটু সুযোগ পেয়ে বিনীতাকে বলল,
-- আর কিছুদিনের অপেক্ষা। তারপরেই তোমায় আমার কাছে নিয়ে যাবো। তুমি শুধু একটু তাড়াতাড়ি ট্রান্সফারের চেষ্টাটা করো।
-- আর রোজ ফোনটা কে করবে?
-- সেটা নাহয় এখন থেকে আমিই করবো।
 বিনীতা হেসে দিলো। দূর থেকে আনন্দি ওদের দেখতে পেয়ে দৌড়ে ওদের কাছে এসে দাঁড়ালো। তারপর খুব গম্ভীর স্বরে বললো,
-- একটু বেখেয়াল হয়েছি কী সেই সুযোগ দু'জনেই নিয়ে নিয়েছে। কিছুই তো করতে পারলি না এতদিনে। এখন বেশ দু'জনে সুযোগের সদ্ব্যবহার করছিস?
-- উফ্ অনু তোর জন্য কি আমি একটু আমার বউয়ের সাথে কথাও বলতে পারবো না।
_ না এখন পারবি না। আগে আমরা সব ব্যবস্থা করি তারপর পারবি।
   আনন্দির কথা শুনে অনল আর বিনীতা হেসে ওঠে। পরিবেশটা হালকা হয়ে যায়। বিনীতা একটু লজ্জা পেয়ে মুখটা নিচু করে ফেলে, আর অনল মজা করে বলে ওঠে,
— দেখছো তো, নিজের বোনই এখন পাহারা দিচ্ছে!
বিজয় তখন গাড়ির দরজা খুলে বলে,
— আচ্ছা আচ্ছা, অনেক গল্প হয়েছে। এবার সবাই ওঠো, না হলে দেরি হয়ে যাবে।
সবাই একে একে গাড়িতে উঠে বসে। হঠাৎ মামী বললেন,
-- যাহ খুব ভুল হয়ে গেছে। আমায় একটু নামতে হবে।
 সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে মামীর দিকে তাকালো। জানলার পাশেই বসেছিলেন তিনি দ্রুত নেমে পড়লেন।
 বিনীতা গাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে। তিনি তার গলার থেকে চেনটা খুলে বিনীতার গলায় পরিয়ে দিতে দিতে বললেন,
-- ধুমধাম করার আগেই আমি নিজের মত করে তোমায় আশীর্বাদ করে গেলাম। সাবধানে থেকো আর খুব তাড়াতাড়ি ট্রান্সফার নিয়ে কলকাতার দিকে চলে এসো।
  বিনীতা নিচু হয়ে মামীকে প্রণাম করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। গাড়ি ছেড়ে দিলো।
বাইরে সকালের আলো, রাস্তার ধারে দোকানপাট খুলছে, মানুষজন তাদের দিনের কাজ শুরু করছে—সবকিছু যেন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু গাড়ির ভেতরে সবার মনেই একটা অদ্ভুত টান। কিছু যেন তারা ফেলে যাচ্ছে।
-- কিছু ভাবিস না দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই যদি আগেই সবকিছু আমাদের জানাতিস তাহলে আরও আগেই এসব ঝামেলা মিটে যেত। দুশ্চিন্তায়, দুর্ভাবনায় তোদের দু'জনের দিন কাটাতে হত না। দেখবি বাবা 
 সবকিছু  ভালোয় ভালোয় হবে। এতদিন পর আর কোনো ঝামেলা যাতে না হয় সেই ভাবেই এগোবো আমরা।
আনন্দি বিজ্ঞের মত বলে ওঠে
— কিছু হবে না মামী। আমরা সবাই একসাথে আছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।
-- হ্যাঁ তুই যখন বলছিস তখন সব ঠিক হবে। সারাজীবনের জ্ঞানদিদি
-- দাদা ভালো হবে না বলছি। আমায় রাগাস না। তাহলে কিন্তু বৌ পাবি না
আনন্দির কথা শুনে অনল আর লিজা দু'জনেই হেসে ফেলেন।
গাড়ি এগিয়ে চলে। যে যার মত করে সমস্যার সমাধানের পথ ভেবে চলেছে। তবে সকলের মনটা বেশ ফুরফুরে। অনল অনেককিছুই ভেবে চলেছে। মনে পড়ছে তার বিয়ের দিনের সব ঘটনা। সবকিছু যে এত তাড়াতাড়ি এমনভাবে সমাধান হতে পারে তা সে কল্পনাতেও আনেনি। আসলে বিধাতা যখন বিপদে ফেলেন তিনিই আবার সবকিছুর সমাধানের পথও খুঁজে দেন। 
 গাড়ি এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ালো। অনল ড্রাইভারকে টাকা দিতে গিয়ে জানতে পারলো বিজয় পেমেন্ট দিয়েই পাঠিয়েছে। কথাটা শুনে লিজা হেসে দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। 
 ইরা ওদের দেখতে পেয়েই কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,
-- ফিরলে কেন বৌদি? বন্ধুর বাড়িতেই থেকে যেতে পারতে তো। ছোটবেলার বন্ধু বলে কথা! আমরা তো তোমার অনেক দূরের --
 লিজা ননদিনীকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
-- ওরে বাবা কত রাগ হয়েছে আমার ননদিনীর। ঠিক আছে তোমার কাছে নাহয় আরও কয়েকটা দিন বেশি থেকে যাবো। আপাতত স্নান করে আগে ফ্রেস হই। অনেক কথা আছে তোমাদের সাথে আমার। খেতে খেতে সব বলবো। 
-- ঠিক আছে ঠিক আছে। যাও আগে একটু বিশ্রাম নাও তারপর স্নানে যেও। দাদা ঘরেই আছে।
 লিজা তাদের জন্য বরাদ্দ ঘরটাতে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন। দেবদূত সেটা দেখতে পেয়ে বললেন,
-- আরে ফিরেই ঘরের দরজা বন্ধ করছো কেন?
-- কিছু কথা আছে। আপাতত তোমাকে আগে সেই কথাগুলো শুনতে হবে।
-- সে ঠিক আছে। কিন্তু এই বয়সে দু'জনে দরজা বন্ধ করে থাকলে বাচ্চা দু'টো কী ভাববে?
-- কিচ্ছু ভাববে না। ওরা সব জানে। 
-- তাহলে তো ব্যাপার গুরুতর। কী হয়েছে?
-- অবস্থার চাপে পড়ে অনল বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে কয়েকমাস আগে।
-- সে কী? বাড়ির কেউ তো জানে না।এখন উপায়?
-- উপায় বের করার জন্য তো তুমি আছো। মেয়েটাকে চেনো। আমার বন্ধুর মেয়ে বিনীতা।
-- এ্যা 
-- হ্যাঁ 
-- আরে ঘটনাটা খুলে বলো। সে অনেক কথা। সংক্ষেপে যেটা সেটা হচ্ছে বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেছিলো, সেদিনই কিছু দুষ্কৃতীর হাতে বর বাড়ি থেকে গাড়িতে ওঠার সময় গুলিবিদ্ধ হয়। তারপর 
-- মারা গেছে -
-- সেই মুহূর্তে সকলে সেটাই মনে করেছিল কিন্তু কয়েকমাস কোমায় থেকে এখন পুরোপুরি সুস্থ। ঘটনাটা খুবই দুঃখজনক হলেও কিন্তু সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। ওই বিয়ের আসরে অনলের বন্ধু অনেক জোরাজুরি করে তার বোনের সাথে অনলের বিয়ে দেয়। কিন্তু অনল সাথে করে বৌ বাড়িতে নিয়ে আসতে সাহস পায় না
-- সেটাই তো স্বাভাবিক 
-- যাহোক এখন এই বিয়েটাকে স্বীকৃতি দিতে হবে কীভাবে কী করবে সেটা বসে বসে ভাবো আমি স্নান সেরে আসি। খাবার টেবিলেই সব আলোচনা হবে কিন্তু আজ এবং এখনই।
-- হ্যাঁ আমাকে অথৈ সমুদ্রে ফেলে দিয়ে উনি চললেন স্নানে। যাও তাড়াতাড়ি স্নান সেরে আসো টেনশনে আমার প্রচন্ড খিদে পেয়ে গেলো।
-- আরে তুমি হচ্ছ আমার মুস্কিল আসান। জানো মেয়েটি খুবই ভালো। আমি কিন্তু তাকে আমার গলার চেন দিয়ে আশীর্বাদ করে এসেছি।
-- বাহ্ চমৎকার। গলার চেন তোমার দিয়েছো কিন্তু আমার গলার উপরে তো ইরা খাঁড়া ধরে দাঁড়িয়ে পড়বে।
-- আরে না, তোমার বোন, ভগ্নিপতি তুমি যা বলবে তাই শুনবে। শুধু কীভাবে এগোবে সেটা ভাবো।

  খাবার টেবিলে সবাই হাজির। হঠাৎ দেবদূত বললেন,
-- হ্যাঁরে ইরা ছেলেটার তো এবার বিয়ে দেওয়া দরকার। আমরা থাকতে থাকতে মেয়ে দেখা শুরু করলে হয় না। 
-- হ্যাঁ দাদা আমরাও যে ভাবছি না সেটা নয়। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যে মেয়ে কোথায় পাই বলতো?
 অনল আর আনন্দি পাশাপাশি চেয়ারে। অনল মাথা নিচু করে খেয়ে চলেছে। আনন্দি চেয়ারের নিচু থেকে দাদার হাঁটুতে এক চিমটি কাটে। অনল "আঃ" করে চিৎকার করে ওঠে। সকলে অনলের দিকে তাকিয়ে পড়লে আনন্দি বলে,
-- আহা তোমরা আলোচনা চালিয়ে যাও। আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম দাদা সব শুনতে পাচ্ছে কিনা।
--- একটা সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছে চুপচাপ বসে খা। 
 ইরা আনন্দির উদ্দেশ্যে কথাগুলি বলে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- আমার না ওই বিনীতা মেয়েটাকে খুব ভালো লেগেছে। খুব শান্ত, ধীর,স্থির। কিন্তু এখনকার মেয়ে তো কোথায় নিজে পছন্দ করে বসে আছে তার ঠিক নেই।
 অনলের বাবা ছাড়া বাকি যারা টেবিলে ছিলেন সকলের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠলো। অনল ভিসুম খেলো। সঙ্গে সঙ্গে আনন্দি জলের পাত্র এগিয়ে দিয়ে বলল,
-- নে জলটা খেয়ে নে। 
অনল চোখ বড় বড় করে বোনের দিকে তাকিয়ে জলের গ্লাস থেকে কিছুটা জল খেয়ে উঠে গেলো। কারণ তার খাওয়া শেষ হয়ে গেছিল।
 মামী ডেকে বললেন,
-- অনল উঠে যাচ্ছিস কেন? তোর বিয়ের কথা হচ্ছে তোর থাকাটাও তো দরকার।
-- আমি থেকে কী করবো মামী? তোমরা যা বলবে সেটাই আমি করবো।
-- হ্যাঁ হ্যাঁ জানি তো তুই খুবই বাধ্য ছেলে মা,বাবার
 আনন্দির কথা শুনে এবার মামী বললেন,
-- তুই একটু চুপ কর অনু। দাদার বিয়েটা দিয়েই আমরা এবার যাবো। চুপচাপ খেয়ে উঠে যা।
-- এ বাবা কেন? আমি তোমাদের সব আলোচনা শুনবো।
-- ঠিক আছে শুধু শুনবি কিন্তু। একটাও কথা বলতে পারবি না।
 ইরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন -

ক্রমশ

Sunday, May 17, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৩)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৩)
 বিজয় আস্তে করে দরজায় নক করল
-- বিনী তোরা কী ঘুমিয়ে পড়েছিস?
 ওই দাদা এসছে। আমি যা ভয় পেয়ে গেছিলাম।
-- কেন তুমি কি ভেবেছিলে আমার দাদা এসে তোমায় তার কাছে নিয়ে যাবে?
-- উফ্ তোমার মুখে কিছুই আটকায় না।
তারপর একটু গলা চড়িয়ে বলল,
-- না না ঘুমাইনি। দাঁড়া খুলছি।
 বিনীতা উঠে দরজা খোলে। বিজয়ের পিছন পিছন অনল এসে ঢোকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দি বলে ওঠে,
-- বৌদি তুমি এদিকে এসো
 অনল হঠাৎ করে বোনের মুখে বৌদি ডাক শুনে হকচকিয়ে যায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-- ওহ্ তারমানে সব শোনা হয়ে গেছে -
-- অবশ্যই। তোর মত বোকা, ভীতুর ডিম আমি জীবনে আর একটা দেখিনি। বিয়ে করে গুম মেরে গেছে
-- আমি বোকা? আমি ভীতু?
-- তাই ছাড়া কী? সাহস করে আমাকেও কথাগুলো বলতে পারিসনি 
-- কেন তুই কী ভগবান নাকি যে সব ঠিক করে দিবি?
-- ভগবান হতে যাবো কেন? কিন্তু মা, বাবাকে বুঝাতে তো আমি পারতাম। মানছি আমি তোর ছোট। আর তুই তো জানিস তোর থেকে মা বাবা আমায় একটু বেশিই ভালোবাসেন।
-- তাই নাকি?
-- কেন তুইই তো বলিস সব সময় এই কথা।
 এতক্ষণ বিজয় আর বিনীতা দুই ভাইবোনের ঝগড়া শুনছিলো। এবার বিজয় বলে,
-- মাকে একটা ফোন করে দেখি ঘুমিয়ে পড়েছেন কিনা
বিজয় ফোনটা বের করে মাকে ফোন করে। একটা রিংয়েই সুস্মিতা ফোন তুলে বলেন,
-- তোরা এখনো ঘুমাসনি।
-- তোমরা জেগে আছো?
-- হ্যাঁ তো। গল্প করছি।
-- তাহলে আমরা সবাই তোমার ঘরে আসছি।
 ওদের দিকে ফিরে বলল বিজয়
-- চলো সবাই মিলে মায়ের ঘরে যাই। আজকেই ঠিক করে ফেলি বিষয়টা।
 ওরা চারজনে মিলে সুস্মিতার ঘরের দিকে রওনা দিলো। রাত তখন প্রায় বারোটা। গ্রামের রাতের অন্ধকার ভেদ করে চারিদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ওরা মায়ের ঘরের ভিতর গিয়ে ঢুকলো। ওদের আসার কথা শুনে সুস্মিতা দরজা আগেই খোলা রেখে দিয়েছিলেন। দুই বন্ধুই খাটের উপর বসা। ওরা ঘরে গিয়ে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই লিজা বললেন,
-- বিনীতা তুমি আমার কাছে এসে বসো।
-- ও মামী আমার আদরটা কি কমে গেলো?
 আনন্দি রসিকতা করে কথাটা বলে। বিনীতা গিয়ে লিজার পাশে বসে। লিজা তার একটি হাত ধরে বলেন,
-- বলো মা এবার তুমি কী চাও? তুমি যা চাইবে যেমনভাবে চাইবে আমরা ঠিক তেমনভাবেই তোমাকে বরণ করে ঘরে তুলবো। তুমি যদি চাও আবার সব অনুষ্ঠান নতুন করে হবে তবে তাই হবে আমরা বাড়িতে পূর্বের বিয়ের কথা জানাবো না। আর যদি চাও রেজিস্ট্রি করে শুধু বৌভাত হবে তবে তাই হবে।
 বিনীতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
-- আমার কোনকিছুতেই আপত্তি নেই। আপনারা যেটা ঠিক করবেন সেটাই হবে। তবে ওর মতটা কী সেটা জেনে নিন 
-- অনলের মত? ও তো ভয়েই মুখ খোলেনি। এবার আমরা যেটা করবো সেটাই হবে। ওর কোন কথা শোনা হবে না -
 অনলের দিকে ফিরে বললেন,
-- তোর কোন মত আছে ? থাকলে বল।
-- তোমরা যেটা ভালো বুঝবে সেটাই করবে। তবে একটা কথা বলি। এই কয়েকমাস আগে বিজয়ের অনেকগুলো টাকা খরচ হল আবার নতুন করে বিয়ের তোড়জোড়ের থেকে, রেজিস্ট্রি ম্যারেজটাই ভালো। আমরা নাহয় বড় করে বৌভাতটা করে নেবো 
-- দেখ অনল খরচ নিয়ে ভাবিস না। আমার একটা মাত্র বোন। ওর সুখের জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।
 বিজয়ের কথা শুনে লিজা বললেন,
-- অনল ঠিক কথাই বলেছে। খামোখা আবার এককারী টাকা খরচ করে লাভ নেই। তোমরা একদম ভেবো না। অনলের মামা যা বলবেন আমার ননদ নন্দাই তাতে না করবেন না। আমরা রেজিস্ট্রি করেই ওকে বাড়ি নিয়ে যাবো।

ঘরের মধ্যে যেন এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এল। এতদিনের লুকোনো কথা, দোটানা, ভয়—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে।
সুস্মিতা এবার একটু গম্ভীর গলায় বললেন,
— তাহলে ঠিক রইল, রেজিস্ট্রি ম্যারেজ। তবে বৌভাতটা কিন্তু ধুমধাম করে হবে। আমাদের বৌমাকে আমি সবার সামনে গর্ব করে পরিচয় করাবো। 
আনন্দি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— আরে অবশ্যই! আমি কিন্তু নিজের হাতে বৌদিকে সাজাবো।
অনল মুচকি হেসে বলল,
— তুই সাজাবি? তাহলে তো আমার বউকে চিনতেই পারবো না!
— চুপ কর! — আনন্দি মুখ বেঁকিয়ে  বলল — এতদিন লুকিয়ে বিয়ে করে কাউকে বলে উঠতে পারিসনি , এখন আবার কথা বলার সাহস এসেছে! তোকে গুপগুপ করে ক'টা মারলেও রাগ শেষ হবে না।
ঘরের সবাই হেসে উঠল।
বিনীতা চুপচাপ বসে ছিল। তার চোখে জল, কিন্তু সেই জলে এবার কষ্ট নেই—আছে স্বস্তি, আছে নতুন জীবনের আলো। লিজা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— কাঁদছো কেন মা? সবকিছু তো এবার ঠিক হতে চলেছে। আর তো কান্নার কোন কারণ নেই।
— এটা আমার খুশির কান্না মামিমা… 
 বিনীতা ধীরে বলল — এত সহজে সব মিটে যাবে ভাবিনি। সব সময় ভেবেছি আমার জীবনটা নিয়ে বিধাতা এমন নিঠুর খেলা কেন খেললেন? আমি তো জ্ঞানত কোন অন্যায় করিনি। তবে এত কষ্ট ঈশ্বর আমার কপালে কেন লিখলেন?
বিজয় এগিয়ে এসে বোনের কাঁধে হাত রাখল,
— সবকিছু ঠিক সময়েই ঠিক হয় রে। সবকিছুর জন্য চাই সঠিক সময়। আমাদের শুধু একটাই চাওয়া
তুই খুশি থাক তোর জীবন আনন্দে ভরে উঠুক।
সুস্মিতা এবার বললেন,
— কাল সকালেই আমরা রেজিস্ট্রির দিন ঠিক করবো অফিসে একটা নোটিস পাঠাবো। এই কাজটা কালই বিজয় করবে। আমরা সকালে টিফিন করে বেরিয়ে যাবো। 
-- বিজয়, তুমি সেইভাবে গাড়ির ব্যবস্থা করবে।
-- না না তোরা দুপুরে খেয়ে বেরোবি
সুস্মিতা লিজার দিকে ফিরে কথাটা বললেন।
-- আসা খাওয়াদাওয়া এখন চলতেই থাকবে। তারপর বিনীতার দিকে ফিরে বললেন,
- তোমার ছুটি কতদিনের? ওটার উপরেই তো সবকিছু নির্ভর করছে।
-- আর এক সপ্তাহ।
-- তাহলে তো এবার কিছুই হবে না। তবে আশীর্বাদটা এই সাতদিনেই হবে।
-- তুই সবকিছু যে ঠিক করছিস অনলের মা,বাবার মতটা তো দরকার।
 সুস্মিতা লিজাকে এ কথা বলতেই লিজা হেসে পড়ে বললেন,
-- ওরে ভাইবোনের এমন সম্পর্ক কেউ কাউকে কোন কথা বললে আর একজন সে কথা না শুনে পারে না। ম্যানেজ তো করবে সব অনলের মামা। আমি তো উপলক্ষ্য মাত্র।
অনল একটু চিন্তিত গলায় বলল,
— .. কোনো সমস্যা হবে না তো?
লিজা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন,
— চিনিস না তোর মাকে? তোর মামা কিছু বললে তোর মা কোনদিন না শোনা করেছে সে কথা? তুই অনেক করেছিস এবার চুপ থাক। বিয়ে করে বৌ না নিয়েই বাড়ি চলে গেছে। গাধা একটা! মামাকে জানাতে পারিসনি ঘটনাটা? 
আনন্দি আবার মজা করে বলল,
— আচ্ছা মামী কোনদিন তোমার ভাগ্নের বুদ্ধি ছিল? ও তো সারাজীবনই -- না বাবা বলবো না। বললে আবার কান টানা খাবো।
সবাই আবার হেসে উঠল।
রাত অনেক হয়ে গেছে। কিন্তু কারোর চোখে আর ঘুম নেই। এতদিনের চাপা টেনশন কেটে গিয়ে যেন নতুন করে হালকা লাগছে।
বাইরে তখনো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক চলছে। গ্রামের নিস্তব্ধ রাতের মধ্যে একটা নতুন সম্পর্কের শুরু হলো—নিঃশব্দে, কিন্তু গভীরভাবে।
বিনীতা একবার অনলের দিকে তাকাল। অনলও তাকিয়ে আছে তার দিকেই। দু’জনে চোখে চোখে যেন অনেক কথা বলে গেলো।
-- কিরে দাদা, তুই কি এই রাতেই বৌদির সাথে একা একা একটু কথা বলতে চাস?
-- অনু, বড্ড ফাজিল হয়েছিস তুই। দাঁড়া বাড়ি চল দেখাবো তোকে মজা।
-- তুই কী আমায় মজা দেখাবি রে! মজা তো তোকে আমি দেখাবো। যতদিন না বৌদি আমাদের বাড়িতে যাচ্ছে তোকে ব্ল্যাকমেল করেই আমার জিনিসগুলো কিনে নেবো।
 সকলেই হেসে উঠলো আনন্দির কথা শুনে।
ধীরে ধীরে সবাই নিজেদের ঘরে ফিরে গেল।
 কিন্তু কারোরই সেদিন রাতে ভালো করে ঘুম হল না…

ক্রমশ

ভালোবাসার নীল আকাশ পর্ব (৩২)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩২)

 রাত তখন প্রায় দশটা। সুস্মিতার রান্নাঘরে সকলের খাওয়াদাওয়ার পরেও কিছু কাজ ছিল। সেগুলো সারতে আরও খানিকটা সময় চলে গেলো। লিজা সেখানে দাঁড়িয়ে সুস্মিতাকে সাহায্য করছিলেন। কিন্তু সুস্মিতার অনুরোধে তিনি ঘরে চলে যান।সুস্মিতা কাজ সেরে ঘরে এসে দেখেন লিজা ফোনে স্বামীর সাথে কথা বলছেন। শেষ কথাদু'টি  তার কানে গেলো। 
-- হ্যাঁ সুস্মিতা আর তার ছেলে যদি রাজি থাকে তাহলে আমরা মেয়েটিকে আপন করেই নেবো। আমি আসি এসে কথা বলছি।
 সুস্মিতা ঘরে ঢুকলে লিজা ফোনটা কেটে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসেন।
-- তোর কাজ শেষ হল? আমরা এসে তোর খাটুনি আরও বাড়িয়ে দিলাম
-- কী বলছিস রে! কত বছর বাদে দু'জনে মনপ্রাণ খুলে কথা বললাম বলতো?
-- সেটা তো নিশ্চয়। তবে তোর পরিশ্রমটাও তো ভাবতে হবে।
 খাটে বসতে বসতে বললেন
-- তোকে কিছু ভাবতে হবে না। এই বয়সে এসে আবার যে তোর সাথে দেখা হবে সেটাই কোনদিন ভাবিনি রে! সবই ঈশ্বরের লীলা।
-- এই শোন না তোর মেয়েটাকে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে। অনলকে তো তুই দেখলি। খুব ভালো ছেলে রে! তুই রাজি থাকলে আমার ননদ, নন্দাইয়ের সাথে কথা বলতে পারি।
 সুস্মিতা অবাক হয়ে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। একটু আগে বলা কথাটাই মনেমনে আর একবার বললেন "প্রভু সত্যিই তোমার লীলা বোঝা দায়।"
-- কী রে কিছু বললি না তো। আমার ছেলেটার বিয়ে না হলে আমি বিনীতাকে আমার ঘরের লক্ষ্মী করে নিয়ে যেতাম। সেটা যখন হবার নয় তখন --
-- তোকে কাল বলেছিলাম না বিনীতার জীবনের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। আগে সেই ঘটনাটা শোন। তারপর এই কথার পরিষ্কার তুই নিজেই পেয়ে যাবি।
-- হ্যাঁ বলেছিলি তো। বলতো কী হয়েছিল ওর জীবনে? মেয়েটা কিন্তু খুবই লক্ষ্মীমন্ত। তার জীবনে এমন কী ঘটেছে যার জন্য তুই সরাসরি হ্যাঁ বলতে পারছিস না।
-- তবে শোন -
 আমরা কলকাতায় একটা বিয়ে বাড়িতে যাই। বিনীতার তখন এম. এস সি কমপ্লিট। চাকরির চেষ্টা করছে। চাকরি না পেয়ে বিয়েতে রাজি নয়। আমি আমার জীবন দিয়ে বুঝেছি মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো কতটা প্রয়োজন। আমিও তখন মেয়ের বিয়ে দিতে প্রস্তুত নই। ওই বিয়ে বাড়িতে বারাসাতের একটু ভিতরের দিক থেকে একটি পরিবার আসে। তারা সকলেই বিনীতাকে দেখে পছন্দ করে। ছেলেটি খুব বড় উকিল। তারও একটি বোন আছে। বিয়েবাড়িতে পরিচয় হওয়াতে অনেক কথাবার্তা গল্পগুজব হয়। হঠাৎ একদিন ভদ্রমহিলা মানে ওই ছেলেটির মা ফোন করেন এবং তার ছেলের সাথে বিনীতার বিয়ের কথা বলেন। 
-- তারপর 
-- বলছি দাঁড়া। একনাগাড়ে কথা বলে হাঁফিয়ে গেছি।
 লিজা জলের বোতলটা তার দিকে এগিয়ে দেন। সুস্মিতা একটু জল খেয়ে আবার শুরু করেন
-- আমি সরাসরি বলি মেয়ে চাকরি না পাওয়া অবধি বিয়েতে রাজি নয়।
-- শুনে কী বললেন তিনি?
-- আমাদের কোন আপত্তি নেই। ততদিন আমরা অপেক্ষা করবো। ব্যাস এরপর মাঝে মাঝেই ভদ্রমহিলা ফোন করতেন। কথাবার্তা বলতাম। আমি কিন্তু তলে তলে বিনীতার বিয়ের গয়নাগাটি সব তৈরি করে ফেলেছিলাম কারণ ওই নাছোড়বান্দা মহিলা এই মেয়েই তার ছেলের বউ করবেন এই মনোভাব ব্যক্ত করার পর। বিনীতার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসলো। আমি ফোন করে জানালাম। একমাস হাতে সময় ছিল। উনি বললেন, "এই একমাসের মধ্যেই বিয়ে দেবো। বিয়ের পরে বিনীতা চাকরিতে জয়েন করবে।"
 মাঝে মাঝে আমাদের মনের অবস্থা এমন হয় আমরা কিছু না বুঝেই কাজ করে ফেলি। আমি তো মোটামুটি রেডি ছিলাম। বিজয়ও বলল "মা এত করে যখন বলছেন তখন বিয়েটা দিতে রাজি হয়ে যাও। বিয়ের পরেই নাহয় চাকরিতে জয়েন করবে। অসুবিধা কিছু হবে না।" মত দিয়ে দিলাম। 
 সুস্মিতা চুপ করে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার শুরু করলেন,
-- বিয়েরদিন ঠিক সময়েই ছেলের বাড়ি থেকে হলুদ এলো। বিনীতার গায়েও হলুদ হয়ে গেলো। বাড়িতে আত্মীয়, বন্ধুস্বজন গিজগিজ করছে। ছোড়দা বর আনতে গেছিলেন। লগ্ন পেরিয়ে যাচ্ছে। ভীষন চিন্তায় আমি আর বিজয়। ঠিক এই সময়ে ছোড়দা ফোন করে জানালেন -- 
 সুস্মিতা ঠকঠক করে কাঁপছেন চুপ করে বসে। লিজা তার হাতটা ধরলেন মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললেন,
-- কী হল তোর? এত কাঁপছিস কেন? 
 সুস্মিতা বোতল খুলে বেশ খানিকটা জল খেলেন। তারপর আরও কিছুটা সময় নিয়ে বললেন,
-- আসলে কী জানিস সেদিনের ওই সময়টার কথা মনে পড়লে আজও আমি শিউরে উঠি। 
-- কেন এমন কী হয়েছিল যা ভাবলেই তোর এত আতঙ্ক হয়।
-- বর যখন গাড়িতে উঠতে যাবে ঠিক তখনই একদম সামনে থেকে অর্পণকে গুলি করে পালিয়ে যায় 
-- ওমা সেকী? কেন কী করেছিল সে?
-- সে একটা কেস লড়বে একটি মেয়েকে কথা দিয়েছিল। কেসটি ছিল কিডন্যাপিং কেস। এই কেসের সাথে জড়িত ছিল একজন নেতার ছেলে। বারবার ফোনে অর্পণকে নিষেধ করেছিল নেতার লোকজন কেসটা না নিতে। কিন্তু অর্পণ ছিল ভীষন সাহসী একটি ছেলে। সে কারও জন্য কোন কথাতেই পাত্তা না দিয়ে মেয়েটিকে কথা দিয়েছিল কেসটি সে লড়বে। ওই মেয়েটি ছিল তার বোনের বন্ধু। মেয়েটিও ছিল অসীম সাহস। যখন কেউ এই কেসটি নিতে রাজি হচ্ছে না তখন সে তার মা বাবার অমতে অর্পণের কাছে এসে কেসটি নিতে অনুরোধ করে। আমরা এসব কথা অনেক পরে জেনেছি।
-- তারপর কী হল বল। কিন্তু তার আগে বল ছেলেটি বেঁচে আছে না মারা গেছে।
-- প্রথমে তো আমরা শুনেছিলাম স্পট ডেথ। কিন্তু পরে জেনেছিলাম কোমায় চলে গেছে। আরও পরে জেনেছি এখন সে ভালো আছে কোর্টে যাচ্ছে। কিন্তু এই ঘটনার পর ওই কেসটি আর যে কোন কারণেই হোক সে আর করেনি কিংবা যায় হোক না কেন আমরা ঠিক জানি না।
-- ওকে বেশ। তারপর বিনীতার কী হল বল।
-- বিজয় তো তখন পুরো পাগল। নিজের মাথার চুল নিজেই ছিঁড়ছে। আমায় সমানে বলে যাচ্ছে "আমি আছি তো তোমায় কিছু ভাবতে হবে না। আমি বিনীকে লগ্নভ্রস্থা কিছুতেই হতে দেবো না। এই লগ্নেই আমি ওর বিয়ে দেবো ভালো ছেলে দেখে।"
 কিন্তু বিয়ে বাড়িতে ভালো ছেলের খোঁজ কোথায়? কিছুদিন আগেই অনলের সাথে ওর দেখা হয় বিয়ের বাজার করতে গিয়ে একটা মলে। ও অনলকে বিয়েরদিন সকলেই আসতে বলে। সেইমত অনল বিয়ের দিন সকালেই আসে। ওই খবর জানার পর অনল গিয়ে বিজয়কে অনুরোধ করে বিনীতাকে বিয়ে করার জন্য।
অনল তো আকাশ থেকে পড়ে 
এইটুকুন শুনেই লিজা নড়েচড়ে বসে বলেন,
-- ভেরি ইন্টারেস্টিং
-- এখন তোর কাছে এটা মনেহচ্ছে। তখন মা ছেলের পাগলা গারদে দেওয়ার পরিস্থিতি চলে এসেছিল। যাহোক - অনল তো কিছুতেই রাজি নয়। স্বাভাবিক সেটা। বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসে বৌ নিয়ে বাড়িতে কীভাবে ফিরবো? তাছাড়া একটা ছেলে কিংবা মেয়ের জীবনে বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকে। তারপর বিজয় তাকে অনেক করে বোঝালো। শেষমেষ সে রাজি হল।
 লিজা বুকে হাত দিয়ে বুকভরে নিশ্বাস নিয়ে বললেন,
-- বাব্বা ! আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিলাম। এখন যেন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। 
-- সত্যি লিজা তুই না সেই আগের মতই থেকে গেলি। বড় হতে হতে যে বুড়ি হয়ে গেলি তাও তোর স্বভাব গেলো না।
-- কে বুড়ি? আমি এখনো সেই সুইট সিক্সটিন।
জোর হাসি দু'জনের
-- শেষটা শোন।অনল রাজি তো হল কিন্তু শর্ত রাখলো সে বৌ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে না। মা, বাবার মত না নিয়ে সে কিছুতেই বিনীতাকে সাথে করে নিয়ে যেতে পারবে না।
-- বয়েই গেলো ও নিয়ে গেলো না। বিনীতার শ্বশুর, শাশুড়িরা নিয়ে যাবে ওকে ওর বাড়িতে। আমি শুধু ভাবছি কী অদ্ভুত সবকিছু। শিলিগুড়িতে বিনীতাকে দেখে তোর মেয়ে বলে চিনতে পারা অথচ ওকে আমি আগে কখনোই দেখিনি শুধু তোর মুখের সাথে মিল,কোন কারন ছাড়া ওকে ওই বাড়িতে নিয়ে যাওয়া , এখানে আসা -- সব সবকিছু কিন্তু ওই উপরওয়ালার লিখন -

ক্রমশ

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩১)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩১)

  বিনীতার গলা ধরে আসে। চোখের কোণে জল। হাত দিয়ে জলটা মুছে নেয়। আনন্দি হা করে তার মুখের দিকে তাকানো। এত হাসিখুশি মেয়েটার জীবনে কী এমন ঘটেছিল যে কথা মনে করতে গেলে গলা ধরে আসছে, চোখের থেকে জল ঝরছে।
বিনীতা আবার শুরু করে ঠিক সেই মুহূর্তে মামা ফোন করে জানান " কিছু দুষ্কৃতকারী বর গাড়িতে ওঠার সময় একদম সামনের থেকে গুলি করে বাইকে উঠে পালিয়ে গেছে। সকলেই। ভেবেছিল স্পট ডেড। কিন্তু কয়েকমাস কোমায় থেকে সে এখন সুস্থ আছে ঈশ্বরের আশীর্বাদে।"
-- অ্যা সেকি! সেখানে তো প্রচুর লোক ছিল কেউ তাদের ধরতে পারেনি?
-- ঘটনার আকস্মিকতায় সকলে হতভম্ব হয়ে যায়। ঘটনাটা ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। যখন সকলের সম্বিৎ ফেরে অপরাধী নাগালের বাইরে।
 বিনীতা চুপ করে যায়। আনন্দিও চুপ করে বসে। কারও মুখে কোন কথা নেই। শুধু রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকে মত দু'জনেরই চোখের সামনে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুটা সময় এভাবেই কেটে যায়। 
এরপর আনন্দি জানতে চায় 
-- তারপর
 একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বিনীতা বলতে শুরু করে,
-- দাদার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়েছে। মা সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছেন।
-- আর তুমি?
-- আমি নির্বাক, স্থবির!
 অনেক ভেবে দাদা ঠিক করে এই মুহূর্তে যদি আমার বিয়ে দিতে না পারে তাহলে আমি লগ্নভ্রস্থা হবো। কিন্তু উপযুক্ত পাত্র কোথায়?
শেষমেষ গিয়ে তোমার দাদা অনলকে বলে আমায় বিয়ে করতে।
অনল কিছুতেই রাজি হয় না। সে তার জায়গায় দাঁড়িয়ে যা বলে তার কোনটাকেই অস্বীকার করা যায় না। সে সবেমাত্র চাকরি পেয়েছে, মা,বাবার তার বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন, তার নিজের স্বপ্ন, তার একটা ছোট বোন আছে তার হায়ার স্টাডি, বিয়ে -- সব মিলিয়ে মিশিয়ে সে এই বিয়েটা করতে অপারগ। দাদা তখন কী করবে কিছুই বুঝতে না পেরে তোমার দাদাকে বলে,
-- যেহেতু বাড়িতে আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী রয়েছে তাই বিয়েটা হোক শুধুমাত্র লোক দেখানো।
-- তুমি কিছু বললে না তোমার দাদা এই কথা বলার পর
-- হ্যাঁ বলেছিলাম তবে তোমার দাদা রাজি হওয়ার পর।
-- দাদা কোন শর্ত রেখেছিল?
-- হ্যাঁ রেখেছিল। বলেছিল এইমুহূর্তে সে আমায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবে না।
-- সারাজীবনই ওই বুদ্ধি নিয়েই চললো 
আনন্দির মুখ থেকে খুব আস্তে কথাগুলি বেরিয়ে যায়
-- কিছু বললে?
-- না না কিছু বলিনি। তুমি বলো তারপর কী হল
-- আমি তোমার দাদাকে ডেকে শুধু বলেছিলাম তার ইচ্ছা না থাকলে সে যেন কারও কথাই প্ররোচিত হয়ে বিয়ে করতে রাজি না হয়। আর সত্যিই যদি বিয়েটা হয় তাহলে সে না চাইলে আমি কোনদিন আমার অধিকার দাবি করবো না। সেই শর্তেই বিয়েটা হয়। আমি কোনদিনও তাকে ফোন করিনি সেও করেনি। 
-- তাহলে দাদা বিয়ে করে তোমায় এখানে রেখে চলে গেলো?
-- বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান সব মেনেই সিঁদুর দান হলো। 
সুতরাং আমার দিক থেকে আমি এই বিয়েটা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারলাম না। তোমার দাদার মঙ্গলার্থে আজও সকলের অলক্ষ্যে আমি সিঁদুর পরি। কিন্তু আমি সেইভাবেই নিজেকে তৈরি করে নিয়েছিলাম তোমার দাদা নিজের থেকে এগিয়ে না আসলে আমি কোনদিনও তোমার দাদাকে ফোন কিংবা তার সামনে দাঁড়াবো না।
-- তারপর দেখা আমাদের বাড়িতে?
-- হ্যাঁ। বিয়ের দু'দিন আগে আমি চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট হাতে পাই শিলিগুড়ি পোস্টিং। বিয়ের পর এমনিতেই আমাকে সেখানে চলে যেতে হত। যেহেতু তোমার দাদা আমায় সঙ্গে নিতে চায়নি আমার দাদা ঠিক করলেন শুধুমাত্র সকলকে বোঝাতে ওইদিন একসাথেই আমরা বাড়ি থেকে বের হবো আমরা যাবো শিলিগুড়ি আর তোমার দাদা একাই যাবে বাড়ি। তাতে সকলে অন্তত ভাববে আমি শ্বশুরবাড়ি গেলাম। সেইমত সেদিন বেরোনো হল।
-- কতকিছু ঘটে গেছে তোমাদের জীবনের উপর দিয়ে। সেইজন্যই দাদা বাড়িতে ফিরে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছিলো। আমি অনেকবার বিয়েবাড়ির গল্প শুনতে চেয়েছি। বলবে বলবে বলেও কিছু বলেনি। 

  আনন্দি ধীরে ধীরে বিনীতার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে চাপা গলায় বলল,
— বিনীতা এখন অবশ্য তোমার নাম ধরে আমার ডাকা ঠিক নয়। তুমি আমার বৌদি … তুমি এতদিন একা একা এসব সহ্য করেছো?
বিনীতা হালকা হেসে মাথা নাড়ল,
— এই মুহূর্তে আমায় বৌদি বলে ডেকো না। আগে তোমাদের বাড়ির সকলে জানুক আমায় মেনে নিক তারপর নাহয় ডেকো। আর কী জানো আমি একা তো ছিলামই। তবে নিজের সিদ্ধান্তে ছিলাম, তাই অভিযোগ করারও অধিকার ছিল না। সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। বিশ্বাস ছিল ঈশ্বরের উপর। 
আনন্দির চোখে জল এসে গেল,
— কিন্তু দাদা? দাদা কি একবারও… একবারও তোমার খোঁজ নেয়নি?
বিনীতা একটু চুপ করে থেকে বলল,
— হয়তো নিয়েছিল… নিজের মতো করে আমার দাদার কাছ থেকে। তবে সরাসরি নয়। 
— মানে?
— মানে মাঝে মধ্যেই আমার দাদার সাথে কথা হত ফোনে। তখন আমায় নিয়েই আলোচনা বেশি করতো তোমার দাদা। কিন্তু আমায় কোনদিন ফোন করেনি সে। যদিও আমিও কোনদিন ফোন করিনি তাকে।
আনন্দি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল,
— দাদা এমন! বাইরে থেকে যতটা কঠিন, ভিতরে ততটাই নরম…
বিনীতা মৃদু হেসে বলল,
— আমি কথা বলেই বুঝতে পেরেছিলাম ও খারাপ মানুষ নয়। তাই তো … (একটু থেমে)  সেদিন তোমাদের বাড়িতে ওর ছবি দেখে যখন বুঝতে পারি এটা আমার শ্বশুরবাড়ি আর তোমার দাদা ফিরে যখন বলল, "আজ কেউ কোথাও যাবে না -" তখনই বুঝেছিলাম ও কী চায়।
 আর তাই তো কোন কথা না বলেই থেকে গেছিলাম সেদিন রাতে।
-- তারপর কথা হয়েছিল দাদার সাথে আমাদের বাড়িতে?
-- না সেদিন রাতে হয়নি কিন্তু পরদিন ভোরে হয়েছিল।
-- এখন তোমরা কী চাইছো? আমি বাড়িতে বলবো? 
-- বুঝতে পারছি নাগো 
— কতদিন আর অপেক্ষা করবে ?
— কিছু তো একটা করতে হবে এবার?
ঘরের মধ্যে আবার কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। বাইরে হালকা বাতাসে জানলার পর্দা দুলছে।
আনন্দি হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— আচ্ছা নতুন করে তোমাদের আবার বিয়ের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?বাড়িতে গিয়ে বললাম তোমাকে দাদার পছন্দ। মা,বাবাও তোমাকে পছন্দ করেছেন। বিয়েটাও আবার হল আমরাও বেশ আনন্দ করলাম।
বিনীতা হেসে দিয়ে বলল,
— দাদা আর বোনের বুদ্ধি তো দেখছি একই
-- কেন দাদাও এই কথা বলেছে বুঝি?
-- হ্যাঁ গো ।
 বিনীতা হাসতে থাকে।
-- এখন বুঝতে পারছি দাদার পরিবর্তনের কারণ
-- কিসের পরিবর্তন?
—  আগে দাদা খুব হাসিখুশি ছিল, বাড়ির সবাইকে নিয়ে থাকত। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে… কেমন যেন নিজের মধ্যে ঢুকে গেছে। কারো সাথে তেমন কথা বলে না, নিজের রুমেই বেশি থাকে।
বিনীতার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল, কিন্তু মনটা বলল 'ও তাহলে সত্যিই আমায় ভালোবেসে ফেলেছে।'
— আমার জন্য?
আনন্দি মাথা নিচু করে বলল,
— হয়তো… অথবা নিজের অপরাধবোধে।
— অপরাধবোধ কেন?
— কারণ দাদা জানে, তোমার সাথে যা হয়েছে সেটা অন্যায়। সে তোমার প্রাপ্য সম্মান, ভালোবাসা—কিছুই দিতে পারেনি।
বিনীতার চোখ আবার ভিজে উঠল,
— কিন্তু সেটা তো ওর দোষ ছিল না আনন্দি…
— দোষ না থাকলেও, মনে তো লাগে 
একটু থেমে আনন্দি হঠাৎ দৃঢ় গলায় বলল,
— আমি সব ঠিক করে দেব।
বিনীতা অবাক হয়ে বলল,
— কী করে সব ঠিক করবে?
— তোমাদের দু'জনের এই দূরত্ব। আর না! এতদিন যা হয়েছে হয়েছে এবার আমি আমার বৌদিকে বাড়ি নিয়ে যাবো।
বিনীতা হালকা হেসে বলল,
— সবকিছু কি এত সহজ?
আনন্দি  দৃঢ়ভাবে বলল,
— সহজ না হলেও, অসম্ভব না।
— আমি দাদার বোন, আর তুমি… (হালকা হেসে) তুমি তো আমার বৌদি।
বিনীতা চুপ করে রইল। তার চোখে যেন অনেকদিন পর একফোঁটা আশার আলো জ্বলে উঠল।
ঠিক তখনই বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আনন্দি ফিসফিস করে বলল,
— মনে হচ্ছে কেউ এসেছে…
বিনীতা হঠাৎ একটু অস্থির হয়ে উঠল,
— না না… আমি এখন আর কারও সাথে এই বিষয়ে কথা বলতে পারবো  না…
আনন্দি তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— পালিয়ে আর কতদিন থাকবে গো?
পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে দরজার সামনে এসে থামল…

ক্রমশ…

Saturday, May 16, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩০)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩০)

 বিনীতা মাকে রান্নায় সাহায্য করতে রান্নাঘরে ঢুকে টুকটাক কথা বলতে শুরু করে ওই বাড়ি সম্পর্কে। মায়ের কথামত বিনীতা গিয়ে বিজয়কে ডেকে আনে। তিনজনে মিলে ঠিক করেন বিনীতা যেমন আলাদাভাবে আনন্দিকে সব জানাবে আবার তার মা আলাদাভাবেই বন্ধু লিজাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলবেন। আনন্দি এবং লিজা দু'জনের মতামতের ভিত্তিতে আগামীকাল যাওয়ার আগে তারা এই ব্যাপারে কতটা সাহায্য করতে পারবে সেটা সকলের সামনে সুস্মিতা জানতে চাইবেন। আর রাতেই বিজয় প্ল্যানের কথা জানাবে অনলকে। তার মতামতই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
 বিজয় হঠাৎ কথার মাঝেই বলল,
— “অনলকে আজই সব বলব। দেরি করলে জিনিসগুলো জটিল হয়ে যাবে।”
সুস্মিতা মাথা নেড়ে বললেন,
— “ঠিক বলেছিস। ওর মতামতটা খুব দরকার। ও কী ভাবছে এই বিষয়টা নিয়ে সেটা ওর কাছ থেকেই পরিষ্কার করে জানতে হবে। এখনই যদি ও বাড়িতে সব বলে বিনীতাকে নিয়ে যেতে চায় আমরা সেটাও যেমন মেনে নেবো আবার নতুন করে যদি সবকিছুর এরেজমেন্ট করতে চায় আমাদের সেটাতেও কোন আপত্তি থাকবে না। ওর ভাবনা ছাড়া এই ব্যাপারে এগোনো ঠিক হবে না।”
-- অনল খুব ভালো ছেলে মা। আমি ওকে ছেলেবেলা থেকেই চিনি। আমাদের কোন সিদ্ধান্তেই ও না বলবে না। তবে যা করবো ওর কাছে জেনে ওর মত নিয়েই করবো। ভেবো না সব ঠিক হয়ে যাবে।
  
  রাতে খাওয়ার টেবিলে সবাই গল্পগুজবে মশগুল। বাইরে হালকা হাওয়া বইছে, জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পর্দাগুলোকে দুলিয়ে দিচ্ছে। এমন একটা শান্ত পরিবেশ যে যেমন পারছে তার পিছনে লেগে চলেছে। মাঝে মাঝে বিজয় আনন্দির পিছনেও লাগছে। আর তা শুনেই আনন্দি দাদাকেই দোষারোপ বেশি করছে। 
-- দাদা একদম ভালো হচ্ছে না কিন্তু। তুই তোর মত তোর বন্ধুকেও আমার পিছনে লেলিয়ে দিয়েছিস?
-- মানুষকে মানুষের পিছনে কীভাবে লেলিয়ে দেয় আমায় একটু বুঝিয়ে বলবে আনন্দি?
কথাটা বিজয় বলেই মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো।

 আনন্দি একটু চোখ কুঁচকে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— খুব ভালো করেই বোঝো বিজয়দা! সবসময় আমার সাথে মজা করার জন্যই আমার পিছনে তোমরা সবাই মিলে লেগে পড়ো 
বিজয় হেসে গ্লাসে জল নাড়াতে নাড়াতে বলল,
— “ওমা! তাই নাকি? জীবনটাই তো আমাদের মাত্র ক'টাদিনের। যে কটাদিন বাঁচবো হেসে,খেলে পিছনে লেগেই নাহয় বাঁচি। দুঃখ, কষ্ট তো আমাদের জীবনে লেগেই আছে। সবাই একসাথে হলে সেগুলোকে ভুলে গিয়ে নাহয় একটু মজা করি। অবশ্য তোমার এতে আপত্তি থাকলে আমি আর কিছু বলছি না।
-- বিজয় কথাগুলো ভারী ভারী হয়ে যাচ্ছে। খাবার টেবিলে ভারী কথা কিন্তু একদম বেমানান।
অনল বিজয়ের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে।
    এই কথায় টেবিলে হালকা হাসির রোল ওঠে। আনন্দি মুখটা গম্ভীর করে নিলেও ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকোতে পারল না।
বিনীতা চুপচাপ বসে সব দেখছিল। তার চোখ বারবার আনন্দি আর বিজয়ের কথোপকথনের দিকে চলে যাচ্ছিল। এই স্বাভাবিক, হাসিখুশি পরিবেশটা যেন তার মনে একটু সাহস জোগাচ্ছিল—রাতে কঠিন কথাগুলো বলার জন্য।
সুস্মিতা হালকা গলায় বললেন,
— আচ্ছা তোরা এত হাসাহাসি করছিস, কিন্তু কালকের কথা ভেবেছিস কেউ?
মুহূর্তের মধ্যে টেবিলটা একটু চুপ হয়ে গেল।
বিজয় গম্ভীর হয়ে বলল,
— ভাবছি তো মা। আমি খাওয়া শেষ করেই অনলকে সাথে নিয়ে ঘুমাতে যাবো আর কাল সকালে উঠবো। এর আর ভাবাভাবির কী আছে
 কথাটা বলে মায়ের দিকে চোখের ইশারায় আর কিছু বলতে নিষেধ করে। মা'ও ঠিক বুঝে ফেলেন ছেলে তার কী কথা বলতে চাইছে।
আনন্দি একটু চমকে তাকাল,
—  মানে?
বিনীতা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এক অদ্ভুত দোলাচল—ভয় আর আশার মিশ্রণ।
বিজয় শান্ত গলায় বলল,
— যেটা তোর মাথায় ঢুকবে না তার কোন মানে, অর্থ কোনোটাই নেই।
 সেও বোনের দিকে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো এই প্রসঙ্গ নিয়ে এখানে না আলোচনা করাই ভালো। আমরা যেভাবে ঘটনাটা আলাদা আলাদা বলবো ঠিক করেছি সেটাই ঠিক হবে।
 লিজা এদের কথার কোন অর্থই খুঁজে পারছেন না। তিনি চুপচাপ খেয়ে চলেছেন।

আনন্দি এবার আর কিছু বলল না। সে শুধু বিনীতার দিকে তাকাল। দু’জনের চোখে চোখ পড়তেই যেন বিনীতার মনেপড়ে গেলো এই মেয়েটাকে কীভাবে সে কথাগুলো বলবে? কিভাবে সে নেবে? আদতেও কী এই বিয়েটা সে মেনে নিয়ে মা, বাবাকে বুঝিয়ে বলতে পারবে?
  হাজারটা প্রশ্ন একসাথে তার মনে ভেসে উঠল। কিন্তু উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। সে নিজেও জানে না তার মনে ভেসে উঠা প্রশ্নগুলির উত্তর। 
 মানুষের জীবনে এমন সময় মাঝে মাঝে আসে মুহূর্তেই যেখানে জন্ম নেয় হাজার হাজার প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর দাদা সেখানে কেউ থাকে না। উত্তর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকতে হয়। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাবে টিকটিক করে ঠিক এইভাবেই আসবে একদিন প্রকৃত সময় আর তখনই সেসব প্রশ্নের উত্তর আসবে। শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা!

খাওয়া শেষ হতেই বিজয় উঠে বারান্দায় চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সেখানে অনলও পৌঁছে গেলো।
-- কিরে বিজয় কী ভাবছিস এত?
-- একটা মীমাংসায় তো আসতে হবে।
-- বল কিভাবে এগোতে চাস?
-- আমরা তিনজনে কথা বলে ঠিক করেছি আমরা আনন্দি আর মাসিমনিকে আলাদা আলাদা ভাবে সব জানাবো। ওরা কী বলেন সেটা জেনে তারপর এগোবো।আজ রাতেই মা মাসিমনিকে আর বিনীতা আনন্দিকে জানাবে। আমি আনন্দির সাথে কথা বলে বুঝেছি ও যথেষ্ঠ ইন্টেলিজেন্ট। ওর মতামতটাও দরকার।
-- আমার কোনটাতেই কোন আপত্তি নেই রে।

 রাতে আনন্দি আর বিনীতা পাশাপাশি শুয়ে। বিনীতা চুপচাপ একদম, যেন ঠিক করে নিচ্ছে—কীভাবে শুরু করবে।
-- কিগো কী যেন বলবে বলেছিলে? আমার তো মনেহচ্ছে কথাটা ভীষন গুরুত্বপূর্ণ। শুরু করো শুনি তোমার গোপন কথা।
-- গোপন কথা নয় গো। আমার জীবনের এক ঝড়ের কথা। কিন্তু কীভাবে শুরু করবো সেটাই ভাবছি। 
 একটু চুপ থেকে বিনীতা আবার শুরু করে,
-- তুমি ঠিকই বুঝেছো আমি তোমার দাদাকে ওই আমার বিয়ের দিনই প্রথম দেখি। যখন পরিচয় হয় তখন সে শুধুমাত্র আমার দাদার ছেলেবেলার একজন বন্ধু। তোমার দাদা সেদিন সকালে আসে আমায় একটা গিফট দেয় আর তখন আমার দাদা পরিচয় করে দেয় তার ছেলেবেলার বন্ধুর সাথে। ব্যাস ওইটুকুন। আসল ঘটনা শুরু হয় তারপর -
-- কিগো চুপ করে গেলে কেন? কী এমন সেই ঘটনা? যা বলতে তুমি এত দ্বিধাবোধ করছো?
-- বিয়েবাড়ির হৈ চৈ এর মধ্যে আমার গায়েহলুদ হয়ে গেলো। ছোটমামা আর তার এক বন্ধু বেরোলেন বর আনতে। পার্লার থেকে লোক এসে আমায় কণে সাজে সাজিয়ে দিলো। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে তখনও মামা বর নিয়ে আসেন না। মা, দাদা প্রচণ্ড টেনশনে আছেন। ঠাকুরমশাই বারবার তাগাদা দিচ্ছেন । 
বিনীতা আবারও চুপ। সে জানলার দিকে তাকিয়ে --
এবার আর আনন্দি তাকে কোন তাগাদা দিলো না কথা শুরু করবার জন্য। সেও চুপ করে বিনীতার দিকে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ পর বিনীতা আবার শুরু করলো -
-- তখন আমার ভিতরেও একটা ভয় কাজ করছে। তবে সেই মুহূর্তে নিজেকে নিজেই শান্তনা দিয়ে চলেছি " যাই হয়ে যাক না কেন আমি ভেঙে পড়বো না। তখন চাকরির জয়েনিং লেটার পেয়ে গেছি। চাকরিটা হয়েছে শিলিগুড়ির এক স্কুলে। মনে একটা আশঙ্কা থাকলেও মুখে সেটা প্রকাশ ছিল না। আবার কিছুক্ষণ নীরবতা-

আনন্দি তার হাতটা ধরে বলল,
— যে ঘটনা ঘটে গেছে তা বলতে এত দ্বিধা কেন বিনীতা। তুমি সবটা বলো। আমরা আছি তো নিশ্চয় কিছু হেল্প করতে পারবো।
বিনীতা চোখ নামিয়ে নিল। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে… তারপর খুব ধীরে বলতে শুরু করল— কিন্তু তার গলাটা কেঁপে উঠল। বিয়েবাড়ির সর্বত্র যখন মৃদু গুজন আর তখনও পর্যন্ত বর না আসার একটা মারত্মক টেনশন সকলের মধ্যে, সেই মুহূর্তে আমার ছোটমামার একটা ফোনে সবকিছু হঠাৎ আসা কালবৈশাখীর মত তছনচ হয়ে গেলো - পূর্ব পরিকল্পিত কাজ আর ভাবনা একমুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে গেলো।

ক্রমশ

Friday, May 15, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৯)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৯)

 আমার জিদ, আমার পরিশ্রম, ছোট কাজ হলেও করবো কিন্তু মাথা উঁচু করে বাঁচবো এই ছিল আমার সংকল্প।
 বছরের পর বছর কেটে গেল।অভাব ছিল, কষ্ট ছিল, কিন্তু হাল ছাড়িনি  কোনদিন। সময় তো বসে থাকে না সে তার নিজের নিয়ম মেনেই চলে। আমিও আমার বাচ্চাদু'টির মুখ চেয়ে কোন পরিশ্রম আর কষ্টকেই কষ্ট মনে করিনি। আজ আমার সেই ছোট্ট বিজয়  বড় হয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে। বিজয় চাকরি পাওয়ার পর রান্নার বাড়িগুলি ছেড়ে দিয়েছি। শরীর আর নিতে পারছিল না। সংসারের হালও ফিরেছে।মেয়েটাও পড়াশোনা করে নিজের স্বপ্ন পূরণে স্কুলে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু ওর জীবনে একটা হঠাৎ করেই অঘটন ঘটে যায়।
-- সে কী ? কী সেই অঘটন
-- বলবো সব বলবো তোকে। কেউ নেই ওই ছেলেমেয়ে দু'টো ছাড়া আমার জীবন উপন্যাস শোনার জন্য। আজ এতগুলো বছর বাদে তোকে কাছে পেয়ে আমার কষ্টের কথার ঝর্ণার মুখ যেন খুলে গেছে। এতদিন পরে সব কথা বলতে পেরে যেন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি। বিকেল হয়ে এলো। চা জলখাবার করি। বলছি কী আজকের রাতটা থেকে যা। কাল খাওয়াদাওয়া করে যাস। কারোর সাথে তো এখনো কোন কথাই হয়নি। 
-- দাঁড়া অনলকে বলছি। ও কী বলে দেখি।

  সুস্মিতা উঠে গেলেন চায়ের ব্যবস্থা করতে। তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে।বাইরে হালকা হাওয়া বইছে। আনন্দি বকবক করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিনিতা ভাবলো ভালো এই সুযোগ। এখন দাদার ঘরে গিয়ে অনলের সাথে একটু কথা বলা যায়। সে বিনীতার পাশ থেকে আস্তে করে উঠে চলে গেলো। যাওয়ার সময় দেখলো মা রান্নাঘরে চা জলখাবার নিয়ে ব্যস্ত। মাসীমণি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। 
 ত্রিশ বছর বাদে দুই বন্ধুর সাক্ষাৎ। কত পুরোনো কথা কত নতুন কথা জমে আছে দু'জনের মনে। এই স্বল্প সময়ে বলে উঠা কিছুতেই সম্ভব নয়। ওদের ডিস্টার্ব না করাই ভালো। মা মাসিমনিকে পেয়ে এতটাই ব্যস্ত যে আমার সাথেও কথা বলার সময় পাচ্ছেন না। অবশ্য সে সুযোগও আসেনি এখনো। খাবার টেবিলে যা দু'টো  একটা কথা হয়েছে যা সকলের সামনে বলা যায়। মা ঠিক রাতের অপেক্ষায় আছেন আর যেভাবেই হোক না কেন মাসীমণিকে ঠিক রাজি করাবেন আজ থেকে যাওয়ার জন্য।
 বিনীতা এসে দাদার ঘরের সামনে দাঁড়ায়। দরজা ভেজানো। দরজায় নক করে জানতে চায়
-- দাদা, আসবো?
-- হ্যাঁ আয়। কবে থেকে তুই আমার ঘরে ঢোকার আগে অনুমতি নেওয়া শুরু করলি?
-- এই যে এই মুহূর্ত থেকে
 সবাই হেসে দেয়।
 বিজয় খাটে শুয়ে ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
-- আমার একটা ফোন করার দরকার ছিল। অনলকে রেখে সেই থেকে বেরোতেই পারছি না। তাহলে তুই একটু ওকে সঙ্গ দে আমি ফোনটা করেই চলে আসছি।
 অনল এবং বিনীতা দু'জনেই বুঝতে পারে বিজয় ওদের কথা বলার সুযোগ দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
 আস্তে করে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে গেলো। বিনীতা দাঁড়িয়ে আছে দেখে অনল বলল,
-- আরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসে বসো
-- হ্যাঁ বসছি।
 বিনীতা গিয়ে খাটের এককোণে বসে। অনল ওর দিকে তাকিয়ে হেসে পড়ে  বলে,
-- তোমায় দেখে মনেহচ্ছে এই বাড়িটা আমার আর তুমি এখানে ঘুরতে এসেছো 
-- তা কী করবো আমি? আনন্দি যা ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে ওর সামনে গুটিয়ে না থাকলে ও ঠিক ধরে ফেলবে। এই যে এসেছি আমি সে সুযোগ পেয়েছি ও একটু ঘুমিয়ে পড়েছে বলে।
-- তা ঠিক। বোনটা আমার খুব বুদ্ধিমতী। তুমি ওকে ঘটনাটা বলে দাও
-- সে কী এইভাবে বলা ঠিক হবে না
-- তাহলে কীভাবে বলবে?
-- মা, দাদার সাথে কথা বলে কিছু একটা ঠিক তো করতেই হবে
-- বলছো?
-- মানে?
-- না, আমার মনেহচ্ছে তুমি বোধকরি আমায় ছেড়ে আর থাকতে পারছো না
 অনল মিটিমিটি হাসছে
-- আমার তো মনেহচ্ছে কেসটা উল্টো
-- একটা কথা বলবো
-- বলো
-- তোমার হাতটা একটু ধরতে দেবে?
-- কেন হাত ধরে কী হবে? চিমটি কাটবে?
 অনল হো হো করে হাসতে থাকে।
-- জানো তোমার সাথে এই ঘটনা ঘটার পর আমি বুঝেছি ভাগ্যকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। আমরা ঈশ্বরের হাতের পুতুল মাত্র। দেখো আমরা দু'জন দু'জনকে চিনতাম না, জানতাম না। কোনদিন দেখাও হয়নি। বিজয়ের সাথে হঠাৎ করেই একদিন দেখা ,নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আমার আসা। এইটুকু ঠিক ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে বিজয়ের সুন্দরী ছোটবোন যে আমার বউ হবে এটা কিন্তু বুঝতে পারিনি। 
-- আসলেই আমাদের জীবনে আমরা পরিকল্পনা করি এক আর হয় আর এক।কারণ বিধাতা তো আগে থাকতেই সব ঠিক করেই রেখেছেন। সেখানে আমাদের ভাবনা-চিন্তা কেন কাজে আসবে?
-- মনেহচ্ছে আজকের রাতটা এখানেই থাকতে হবে। দুই মাসীমণি যা গল্প শুরু করেছেন তাতে একবেলায় শেষ হবে বলে মনেহয় না।
-- ওই মা সকলকে ডাকছেন চা খেতে। চলো এবার বেরোই। আনন্দি এখনো মনেহয় ওঠেনি। বাবা ভীষন দুষ্টু তোমার বোনটা।
-- আরে বোনের কানে একটু আমাদের সম্পর্কটা বলে দাও। দেখবে মা বাবাকে ওই ম্যানেজ করে ফেলেছে।
 অনল হা হা করে হাসতে হাসতে হাসতে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।
 সন্ধ্যায় সব একজায়গায় বসে চা আর তেলেভাজা খেতে খেতে ঠিক হয় আজ রাতে ফেরা হচ্ছে না সে কথাই বাড়িতে জানিয়ে দেওয়া হল।
 একসময় সুস্মিতা অনলকে একা পেয়ে খুব আস্তে করে বললেন,
-- বাবা এবার তো আর জামাই যত্ন হল না। সেভাবে কথাও বলতে পারছি না। সবকিছু ঠিক হয়ে গেলে তখন জামাই যত্নটা করবো। 
অনল একগাল হেসে বলল
-- বাবা এই যত্নের পরেও যত্ন আছে? আর সেটাকে জামাই যত্ন বলে?
-- কই আর যত্ন করতে পারছি বাবা। মনেহচ্ছে সবকিছুই আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। বৃথাই আমরা চিন্তা করি। সবই সেই তাঁর হাতে। আমাদের চিন্তা, চোখের জল ,ঈশ্বরের কাছে চাওয়া কিছুই কাজে আসে না। কারণ তিনি যা করবেন তা আগে থাকতেই তিনি লিখে রেখেছেন।
-- আমিও এই কথাটাই আপনার মেয়েকে বলছিলাম -
 কথা শেষ হয় না দেখে আনন্দি এদিকেই আসছে। তাকে দেখেই অনল বলে উঠলো,
-- কিরে পাগলী, বাড়ি ফিরবি না আজ?
 আনন্দি দাদার কাছে এসে দাদার একটা হাত ধরে আদুরে গলায় বলল,
-- দাদা বাড়িতে জানিয়ে দে না আজ রাতে আর বাড়ি ফিরছি না আমরা। 
-- কেন রে ভালো লেগেছে জায়গাটা?
-- আরে ঘুমিয়েই তো অর্ধেক সময় চলে গেলো। কিছু দেখা হল না, কারও সাথে কথা হল না --
-- মাকে জানিয়ে দিয়েছি অনেক আগেই
 সুস্মিতা ওদের কথার মাঝখানেই বললেন,
-- আমি রাতের রান্নার জোগাড়ে যাই।তোমরা কথা বল
-- আচ্ছা আপনারা কি বাঙাল?
-- হ্যাঁ কিন্তু কেন বলো তো 
-- ওই যে আপনি বললেন না -" জোগাড়ে যাই" ওটা 
মা'ও বলেন। মা বলেন খুলনা জেলার মানুষের ভাষা এটা।
-- তোমার মা খুলনা জেলার মানুষ? আমরাও তো তাই। দেখো আবার কোন সম্পর্ক বেরিয়ে যায়।
 বলেই হাসতে লাগেন।
 রাতে অনেক চেষ্টা করেও অনল কিংবা বিনীতা আর সুযোগ পায় না একান্তে কথা বলার। আনন্দি একেবারে আঠার মত লেগে আছে বিনীতার সাথে।
-- কিগো তুমি না বলেছিলে কী ঘটনা জানাবে তার তো কোন লক্ষণ দেখতে পারছি না
-- বলবো বলবো আজই বলবো সব। বলেছি যখন তখন না বললে কি ছাড়বে তুমি?
-- হেসো না, কিছু তো একটা আছে তোমার আর দাদার সাথে। মাথা ঘামিয়ে, চোখ কান খোলা রেখেও কিছুই বুঝতে পারছি না আসল ঘটনাটা কী?
-- ঘটনা একটু ঘোরালো। না বললে ঠিক বুঝবে না। রাতে শুয়ে আজ বলবো। তুমি গিয়ে আমার ঘরে বস আমি মাকে একটু রান্নায় সাহায্য করি। 
-- ওককে ম্যাম
 ওরা দু'জনেই  হেসে যে যার কাজে চলে যায় - বিনীতা গিয়ে মায়ের কাছে রান্নাঘরে ঢোকে আর আনন্দি যায় বিনীতার ঘরে।

ক্রমশ 

Thursday, May 14, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৮)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৮)

ওই চেহারাটাই যেন কাল হল। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, মেয়েকে নিয়ে তার গর্বের শেষ ছিল না। কিন্তু সেই গর্বই একদিন তার ভবিষ্যতের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
— “মেয়েটা বড় হয়েছে, আর দেরি না করাই ভালো…ভালো পাত্র পেয়েছি। আমি এখানেই ওর বিয়ে দেবো তোমাদের কারও কথা আমি শুনবো না।"
বাবার এই কথার পর আর কিছু বলার সাহস হয়নি মা এবং দাদাদের। আর বাবা যে কত রাগী ছিলেন সেটা তো তুই জানিস।

মনের ভেতরে তখনও ছোট্ট একটা স্বপ্ন বেঁচে ছিল—
নিজের পায়ে দাঁড়াবো, একটা চাকরি করবো, নিজের পরিচয় গড়বো।
কিন্তু সেই স্বপ্নের ওপরেই যেন পর্দা পড়ে গেল খুব তাড়াতাড়ি।
বিয়ে হয়ে গেল এক বড় সংসারে।
অনেক লোকজন, অনেক নিয়ম—আর সেই নিয়মের বেড়াজালে বন্দি হয়ে গেল আমার নতুন জীবন।

  ভোরে উঠতে হবে, ঘরের কাজ, রান্না ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক একজন এক একদিন—একটা ভুল হলেই শাশুড়ির কড়া চোখ। তবে তিনি আমায় খুব পছন্দ করতেন।
স্বামী মানুষটা মন্দ ছিল না, কিন্তু সংসারের চাপে তিনিও যেন দূরে দূরেই থাকতেন।
আমার মনের কথা, আমার স্বপ্ন—কেউ শুনতে চাইত না।
এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা মাস।
এর মধ্যেই একদিন বুঝতে পারলাম—
 শরীরে নতুন একটা প্রাণের স্পন্দন।
মা হতে চলেছি আমি খবরটা শুনে বাড়িতে আনন্দের ঢেউ উঠল ঠিকই,কিন্তু আমার নিজের ভেতরে মিশ্র
অনুভূতি—খুশি, ভয়, আর কোথাও যেন এক চাপা আফসোস।
— “এত তাড়াতাড়ি?”
নিজের মনেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম সেদিন
কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না।
 কয়েকমাস পর আমার কোল আলো করে এলো বিজয়।
ছোট্ট বিজয়কে বুকে জড়িয়ে ধরে সে প্রথমবারের মতো অনুভব করলাম—
এই পৃথিবীতে এর চেয়ে সুখ বুঝি আর কিছুতে নেই। 
মাতৃত্ব আমায় বদলে দিতে থাকে। আমি বিজয়কে নিয়ে আমার না পাওয়াগুলিকে ভুলে থাকার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু ঘুরে ফিরে তারা আমি একাকী হলেই কষ্ট দিতে থাকে। আমি আমার জীবনের এই পথটাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টায় বারবার ব্যর্থ হই। ভাববো না আর ভেবেও ভাবতে থাকি। 
  কিন্তু তবুও কখনো না কখনো আমার আজন্মলালিত সব স্বপ্নগুলি মাঝে মাঝেই আমায় জ্বালাতন করতো। কখনো কখনো ছোট্ট বিজয়ের হাসি, দুষ্টুমি, আধোআধো কথা কিছুক্ষণের জন্য হলেও সত্যিই আমি ভুলে যেতাম সেসব।
দিন যায়, রাত যায়—
বিজয়কে মানুষের মত মানুষ করার চিন্তা, সংসারের কাজ, আর একঘেয়ে জীবনের চক্রে আমার স্বপ্নগুলি জীবন থেকে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু তার পরেও জানিস কখনো কখনো,রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে,চুপচাপ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতাম
— “আমি কি আর কোনওদিন নিজের মতো করে বাঁচতে পারবো? এটাই কি মেয়েদের জীবন? বিয়ের পর নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটা পরিবারের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতেই হয়? তারপর নিজের সন্তানের মধ্যে সেই স্বপ্নকে দেখতে চাওয়া?
উত্তর আসত না।
 সন্তান নিজের হলেও তার জীবনটা আলাদা। তার ভালোলাগা,মন্দলাগা, তার ইচ্ছা, তার স্বপ্ন সব সবকিছু আলাদা। নিজের স্বপ্নকে সন্তানের মধ্যে দেখতে চাওয়া মানে সন্তানের কাঁধে জোর করে কোন বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। যে বোঝা বইবার ক্ষমতা তার হয়ত নেই। আমার এই নিজের পায়ে না দাঁড়ানোর কষ্টটা জানিস এখনো রয়েই গেছে। আমি তো পড়াশোনাতেও খারাপ ছিলাম না। আমি বুঝতে পারি না আজও মেয়ে হওয়ার পর তাকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করার পরেই কেন পরিবারের লোকজন তার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষিত, স্বাবলম্বী একটা মেয়ে কেন একা থাকতে পারে না? বিয়েটাই কি নারী জীবনের শেষ কথা? 
  এতদিন ধরে জমে থাকা মনের ভিতরের কষ্ট সুস্মিতা যা কাউকে কোনদিন বলতে পারেনি শুধু নিজেই গুমরে গুমরে মরেছে প্রাণের বন্ধু লিজাকে কাছে পেয়ে সে একনাগাড়ে কথাগুলো বলে উদাস হয়ে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তার চোখ থেকে দু'ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। লিজা দেখতে পেয়ে বলল,
-- আজও এতকিছুর পরেও কেন কষ্ট পাস এসব ভেবে?
-- কিছুতেই মানতে পারি না আমি এত পড়াশুনায় ভালো হয়েও জীবনে কোন রোজগার করতে পারিনি। আমার প্রয়োজনে সবসময় অন্যের কাছে হাত পেতে টাকা নিতে হয়েছে। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা ছিল না রে!
 লিজা জানতে চাইলো 
-- তারপর?
    বিজয় আসার পর থেকেই আমার পৃথিবীটা কিছুটা হলেও বদলে গেল। দিন-রাত শুধু ছেলেকে নিয়েই কাটে। নিজের কথা, নিজের স্বপ্ন—সব যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেল। সংসারের কাজকর্ম আগের মতোই করতে হত ওই ছোট্ট বাচ্চাকে সামলে।
এরই মাঝে আবার নতুন খবর—আমি আবার মা হতে চলেছি।
এইবার আর অবাক হইনি। শুধু মনে মনে ভেবেছি, 
 যাদের আমি পৃথিবীতে এনেছি, আমার জন্য না হোক, ওদের জন্য আমাকে শক্ত হতে হবে। ভুলতে হবে আমাকে আমি কী হতে চেয়েছিলাম কারণ জীবনের অনেকটা সময় চলে গেছে। নতুন করে ওদের স্বপ্নগুলোকে নিজের স্বপ্ন মনে করে এগোতে লাগলাম।

সময়ের সাথে সাথে আমার কোল জুড়ে এলো এক কন্যাসন্তান। ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমার ছোট্ট পৃথিবী যেন পূর্ণ হয়ে গেল।
কিন্তু সুখের এই ছবিটা বেশিদিন টিকল না।

মেয়েটা তখনো ভালো করে হাঁটতেও শেখেনি। ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই আমার জীবনে নেমে এলো এক ভয়ংকর ঝড়। যে ঝড়ে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেলো।
স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
কয়েকদিনের মধ্যেই সবকিছু শেষ। যা কিছু জমা ছিল সব শেষ হয়ে গেলো। একান্নবর্তী পরিবার হওয়া সত্ত্বেও কেউ বিন্দুমাত্র পাশে দাঁড়ালো না। 
একদিন যে মানুষটা আমার পাশে ছিল, আমার ভবিষ্যতের ভরসা ছিল—সে চিরদিনের মতো চলে গেল।
সবকিছু যেন মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে গেল।
 আমি ভিতর থেকে ভেঙে পড়তে লাগলাম। নতুন করে আবার কষ্ট পেতে শুরু করলাম কেন নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে আমি বাবার কথাই বিয়েতে রাজি হলাম? কেন আমি জীদ করে বিয়েটা ভেঙে দিতে পারলাম না?

—কিভাবে বাঁচবো, কিভাবে দুই ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে পথ চলবো ওদের লেখাপড়া শিখিয়ে কিভাবে মানুষ করবো - সাঁতার না জেনে মাঝ নদীতে নামার ফল হাতে হাতে পেলাম। আমি যেন একটু একটু করে ডুবে যেতে লাগলাম।
বিজয়ের বাবার মৃত্যুর পর বড় সংসারটা আর আগের মত রইল না।কারণ সকলেই ভাবলো আমি আমার সন্তানদের নিয়ে তাদের ঘাড়ে চেপে বসবো। 
ধীরে ধীরে শুরু হল অশান্তি, হিসাব-নিকাশ, দোষারোপ। সর্বক্ষণ সকলের কথার খোটা সইতে সইতে আমি পুরোপুরি পাথর হয়ে গেলাম। প্রথমে হল হাড়ি ভাগ। তারপর একসময় সেই বাড়িটাও ভাগ হয়ে গেল।
যে বাড়িতে এতদিন একসাথে সবাই ছিলাম, সেখানে আমার আর তেমন জায়গা রইল না। কারণ আমার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলার মত কেউ ছিল না। শ্বশুরমশাই
বিজয়ের বাবা চলে যাওয়ার আগেই গত হয়েছেন। আর শাশুড়িমায়ের অন্য ছেলেদের দয়ায় বাঁচা। তিনি আমার হয়ে কথা বলতে গেলে গলাধাক্কা খাবেন। তাই তিনি থেকেও না থাকার মতই ছিলেন। তবে উনি আমায় খুব ভালোবাসতেন। 
অবহেলা, উপেক্ষা—সবকিছু আমায় বুঝিয়ে দিল, এখন আমাকে নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।
দুই ছোট্ট সন্তানকে বুকে আগলে সারারাত চোখের জলে ভোর করেছি। পাশে দাঁড়িয়ে শান্তনা দেওয়ার কেউ নেই। ভায়েরা সব বিয়ে করেছে। মা, বাবা দু'জনেই চলে গেছেন। বৌদিদের সংসারে গিয়ে তাদের অশান্তি বাড়াতে চাইনি। তবে ছোড়দা মাঝে মধ্যে কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ হঠাৎ চলে আসতো। কিছু সাহায্য করে যেত। কিন্তু এভাবে ক'দিন?
  ভাবতে ভাবতে যে গয়নাটুকু ছিল তাও শেষ হয়ে এলো। এভাবে চলতে লাগলে তিনটি প্রাণী না খেয়েই মারা যাবো। 
ওই নিষ্পাপ শিশু দু'টির মুখের দিকে তাকালে বুক ফেটে যেত আমার। কিছু একটা করতেই হবে। শুরু করলাম ছোট ছোট কাজ—
কখনো সেলাই, কখনো বাড়ি বাড়ি টিউশন, কখনো অন্যের বাড়িতে রান্না।
দিনে পরিশ্রম, রাতে ক্লান্ত শরীর—
তবুও ওদের বাঁচিয়ে রাখতে, মানুষ করতে আমি কোন কাজকেই ছোট মনে করিনি। আমি হার মানিনি।
কারণ আমার একটাই স্বপ্ন—
"আমার ছেলে-মেয়েকে আমি যেভাবেই হোক মানুষ করবো। আমার মত জীবনে ওদের কষ্ট পেতে দেবো না।"

ক্রমশ 

Tuesday, May 12, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৭)

 ভালোবাসার নীল আকাশ পর্ব (২৭)

 গাড়ি থেকে সবার আগেই অনল নেমে বিজয়কে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে,
-- চিন্তা করিস না। সবই ঈশ্বরের হাতে। এবার যা হবে সব ভালো হবে। তবে এখনো বাড়িতে কিছু বলে উঠতে পারিনি।
 -- আমার তো কোন চিন্তা নেই রে অনল। আমি তো জানি আমি আমার বোনকে সুপাত্রের হাতেই দান করেছি।
 আনন্দি এগিয়ে এসে বলে,
-- ও দাদা, বন্ধুকে তো জড়িয়েই আছিস। বুঝতে পারছি ওই অবস্থাতেই কোন গোপন আলোচনা চলছে।
 অনল বন্ধুকে ছেড়ে দিয়ে আনন্দির দিকে চোখ বড় বড় করে বলে,
-- শুরু হয়ে গেলো তোর। গাড়ির ভিতর তো বেশ কিছুক্ষণ চুপ ছিলি।
 তারপর বিজয়ের দিকে ফিরে বলে,
-- বিজয় এটা আমার বোন। একটু বেশি কথা বলে। সবাই বলে ওর মাথায় ছিট আছে। কিন্তু ও জানে একথা আমি কখনো ওকে বলিনি
-- দাদা, প্রচণ্ড বাড়াবাড়ি করছিস কিন্তু
 অনল, বিজয় দু'জনেই হাসতে লাগে। বিজয়ের দিকে বিনীতা তাকিয়ে পড়লে বিজয় তাকে বলে,
-- মা কাল থেকে অপেক্ষা করে বসে আছেন। যা মাসিমনিকে মায়ের কাছে নিয়ে যা। বিনীতা মাসিমনি মানে অর্পণের মামী লিজার হাত ধরে মায়ের ঘরের দিকে এগোচ্ছে আর বিনীতার মা ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন।দু'জন দু'জনকে দেখেই জড়িয়ে ধরে প্রথমেই হাউমাউ করে কান্না। সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে। 
 আনন্দি মনেমনে ভাবে বন্ধুর সাথে বন্ধুর দেখা হলে মানুষ আনন্দে হাসে আর এ দেখছি এঁরা কান্নাকাটি করছে।বিনীতার দিকে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বলে,
-- আচ্ছা বিনীতা আগেকার দিনের মানুষেরা কি পুরোনো দিনের বন্ধুর সাথে অনেকদিন পর দেখা হলে কান্নাকাটি করত?
-- কান্না তো মানুষ দুটো কারণে করে। একটা হচ্ছে কষ্টে, আর একটা হচ্ছে অধিক আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে। এটা হচ্ছে দ্বিতীয়টা। আগেকার দিনের বন্ধুত্ব স্বার্থহীন নিখাত ছিল। আর আমাদের মত এত বন্ধুবান্ধব ছিল না। তাই ভালোবাসাটাও ছিল একদম খাঁটি।
  বিনীতা পাশ থেকে বলল,
-- ওমা তোমরা কি দু'জনে শুধু কেঁদেই যাবে? আমিও তো কতদিন পর বাড়ি আসলাম। আমার দিকে একটু তাকাও । বন্ধুকে পেয়ে আমাদের সকলকেই তো ভুলে গেলে। তারমানে বুঝতে পারছি ছোটবেলায় তোমরা দু'জনেই দু'জনের  বাবা মাকে কীভাবে জ্বালিয়েছ।
 বিনীতার মা সুস্মিতা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে হাসতে লাগলেন। 
---সত্যিই তাই মা। লিজাকে দেখে সবকিছু ভুলে বসে আছি। আয় তোরা ভিতরে আয় সবাই। অনল কোথায়?
 আনন্দির কপালে ভাঁজ। সে বলল,
-- মাসিমনি তুমি আমার দাদাকে চিনতে আগে থাকতে?
সুস্মিতা বিনীতার দিকে তাকিয়ে ফিরে আনন্দিকে বললেন,
-- ওমা ওতো বিজয়ের বন্ধু। ওকে তো আগেও দেখেছি আমি। 
-- ও আচ্ছা ওই বিয়ের দিন তাই না
 বয়স্ক ব্যক্তি এই বাচাল মেয়েটির হাত থেকে মুক্তি পেতে চোখের ইশারায় মেয়েকে কিছু বলে বন্ধুর হাত ধরে ঘরে যাওয়ার সময় বলেন,
-- অনল বোধকরি বিজয়ের সাথে আছে। তুই আনন্দিকে তোর ঘরে নিয়ে গিয়ে সবাই ফ্রেস হয়ে খেতে আয়। বেলা অনেক হয়েছে।
 অনল বিজয়কে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। সে এটাও বলে,
-- বিনীতা এবার কলকাতায় ট্রান্সফার হয়ে চলে আসবে বলেছে। এখন কিভাবে কী করবো বলে দে তো একটু।
-- আরে মোটেই যদি বলতে না পারিস এবার রেজিস্ট্রিটা করে নে। বাড়িতে বল ওকে বিয়ে করতে চাস।
-- বিনীতাকে মা বাবার খুব পছন্দ হয়েছে। সম্ভবত মা বিয়ের কথা বলতে আসবেন এখানে।
-- ব্যস তাহলে তো হয়েই গেলো। কোন চিন্তার আর কারণ নেই।
-- হ্যাঁ আমিও সেটাই ভাবছি।
 
 দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর দুই বন্ধু মিলে গল্প শুরু করলেন সেই পুরোনো দিনের স্কুল কলেজ জীবনের। লিজা তার সুখী দাম্পত্যের গল্প করতে করতে একসময় চোখের কোণে জল এনে  বলল,
-- সবই আছে আমার জীবনে। কিন্তু গর্ভে ধারণ করার কোন ক্ষমতা আমার ছিল না। তবে সন্তান আমার আছে। আমি তাদের আমার সম্পূর্ণটুকুন দিয়েই নিজ সন্তানের মত মানুষ করেছি। তারা যে যার জীবনে প্রতিষ্ঠিত। 
-- আচ্ছা তোর একটা ছোটবোন ছিল না?
-- হ্যাঁ। কিন্তু আজ আর নেই রে! 
-- সে কী? কী হয়েছিল?
-- ডেলিভারি হতে গিয়ে চিরতরে চলে গেলো। খুব ভালো বিয়ে হয়েছিল। সজল মানে ওর স্বামী খুব ভালো ছেলে ছিল। আমি তখন লন্ডন। যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। বাড়িতে সজলের মা একা। সজল ছিল ডাক্তার। ওরা আমায় সবকিছু জানালো। আমিও তখন মা ডাক শোনার জন্য মরিয়া। ছুটে এলাম একাই।দেবদূত তখন অফিসের কাজে ভীষন ব্যস্ত। আইনের সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে এখান থেকেই একজন বয়স্ক মহিলার সারাজীবনের দায়িত্ব নিয়ে বাচ্চাদু'টিকে নিয়ে লন্ডন চলে গেলাম। মহিলাকে সঙ্গে নিলাম এই কারণেই আমার একার পক্ষে ওদের দু'জনকে নিয়ে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না। 
-- এখনো আছেন সেই ভদ্রমহিলা।
-- বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। পৃথিবীতে তার আপনার বলতে কেউ ছিল না। সজল যে হাসপাতালে ছিল সেই হাসপাতালেই উনি কাজ করতেন। বাড়ি ছিল কিন্তু তিনি বাড়িতে ফিরতেন না। চব্বিশ ঘন্টা তিনি হাসপাতালে রোগীদের সাথে সময় কাটাতেন। একা থাকতে মোটেই পছন্দ করতেন না। সজল অনেক করে তাকে বুঝিয়ে আমার সাথে পাঠিয়েছিল। আস্তে আস্তে উনিই যেন আমার মা হয়ে উঠেছিলেন। মানুষ যে কত ভালো হতে পারে তা উনাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। মা মারা যাওয়ার পর ওই ভদ্রমহিলার মত আমার খাওয়া,আমার বিশ্রাম কেউ এভাবে কোনদিন ভাবেনি। দেবদূত খুব ভালো মনের মানুষ। কিন্তু সবসময় তো সে অফিস, কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। সে যে আমার খেয়াল রাখতো না তা একেবারেই নয়। কিন্তু সরলাদি ছিল সাক্ষাৎ এক মাতৃমূর্তি। আমার সংসারটা ছিল যেন তার সংসার। সবকিছু ছিল তার নখদর্পণে।তিনি অসুস্থ হওয়ার পর আমি একা পেরে উঠতাম না বলে ওখানকার একজন মেইড রেখেছিলাম। ছেলেমেয়েরা তখন বড় হয়ে গেছে। সরলাদি যে আমার নিজের কেউ ছিল না তা আজও তারা জানে না মানুষটি এতই ভালো ছিল। সরলাদিকে হারিয়ে আমি আর একবার মাতৃহারা হয়েছি। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিয়েছি
 কিছুক্ষণ চুপ করে লিজা যেন অতীতে সেই সরলাদিকে মনেমনে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রণাম করলো।
-- ভদ্রমহিলা প্রকৃতপক্ষেই ভালো মানুষ ছিলেন। তা তোর ছেলেমেয়েরা এসব জানে? 
-- না তাদের কোনদিন বলিনি যে আমি তাদের জন্মদাত্রী নই। আর সরলাদিও আমাদের রক্তের কেউ ছিল না। ওরা জানতো উনি ওদের বাবার বিধবা বোন। কেউ নেই বলে আমাদের কাছে থাকেন।
-- খুব ভালো করেছিস। সজল কোনদিন ওদের দেখতে যায়নি?
-- সেখানেও এক দুঃখজনক ঘটনা আছে রে। মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে সজল হার্টঅ্যাটাক করে চলে যায়। তখনও ওর মা বেঁচে। কতটা দুঃখজনক বলতো?
আসলে কী জানিস মানুষের ভাগ্যের উপরে কারও হাত নেই। ঈশ্বরের লীলা বোঝা দায়। আমরা যাই করি না কেন ,যতই ঈশ্বরকে ডাকি না কেন, তাঁকে যতই দোষারোপ করি না কেন যা আমরা ভাগ্যে নিয়ে জন্মেছি তার থেকে কিছুতেই বেরোতে পারবো না। 
 অনেকক্ষণ বকবক করে নিজের কথাই বলে গেলাম। তোর কথা বল এবার
 -- আমার আর কী কথা। সেই বিয়ের পর থেকেই সংগ্রাম করে চলেছি। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে বড় বউ হয়ে এলাম। মায়ের ইচ্ছা ছিল না এতবড় পরিবারে বিয়ে দেওয়ার। দুই দাদারও অমত ছিল। কিন্তু বাবা কারও কথাই শুনলেন না। আর বিজয়ের বাবার বাড়ির লোকজনও যেনতেন প্রকারে আমাকে সেবাড়ির বৌ করেই ছাড়বে তাদের এত পছন্দ আমাকে। আমারও ইচ্ছা ছিল না। আমি ভেবেছিলাম এম. এ. টা কমপ্লিট করে চাকরির চেষ্টা করবো নিজের পায়ে দাঁড়াবো।
-- তোর যা সুন্দর চেহারা ছিল পছন্দ তো তোকে যেকেউ করবে।
-- ওই চেহারায় কাল হল। বাবার ইচ্ছায় বিয়ে হয়ে গেলো। তখনও মনের মধ্যে সুপ্ত বাসনা চাকরি করবো। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বিজয় পেটে এলো।

ক্রমশ 


ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৬)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৬)

 গাড়ি ছুটে চললো।কলকাতার ব্যস্ততা ছেড়ে চার চাকা (গাড়ি) নিয়ে একটু গ্রামের দিকে বেরিয়ে পড়ার অনুভূতিটাই আলাদা—ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল মিলিয়ে যায়, আর সামনে খুলে যায় শান্ত, সবুজ এক পৃথিবী 

ভোরের শহর তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। রাস্তায় তুলনামূলক কম গাড়ি, হাওয়ায় একটু ঠান্ডা ভাব। বিদ্যাসাগর সেতু  পেরিয়ে শহর ছাড়তে শুরু হল—হুগলি নদীর ওপর দিয়ে যেতে যেতে মনটাই হালকা হয়ে গেলো ওদের। শহর থেকে শহরতলি
ধীরে ধীরে উঁচু বাড়ি কমে আসে, বদলে যায় দৃশ্য। দোকানপাট, ছোট বাজার, রাস্তার ধারে চায়ের দোকান—এইসব দেখতে দেখতে গাড়ি এগোতে থাকো। মুগ্ধ হয়ে ওরা তাকিয়ে থাকে সেইসব দৃশ্য অবলোকন করতে করতে। কিন্তু অনল এবং বিনীতা সকলের মাঝেও দু'জনেই যেন বারবার চোখের ইশারায় কথা বলে চলেছে। আনন্দির চোখে বেশ কয়েকবার ধরা পড়ে গেছে তারা। অনল সামনের সিটে আর ওরা তিনজন পিছনের সিটে। অনল এমনভাবে মোবাইলটা রেখেছে মোবাইলের কাঁচের ভিতর দিয়ে সে অবিরত বিনীতাকে দেখে চলেছে। একবার আনন্দি বিনীতার কানে কানে বলেও দিয়েছে 
-- কুছ কুছ হোতা হ্যায় 
-- কী যা তাই বলছো। তুমি বড্ড দুষ্টু
-- সেটা আমি জানি। কিন্তু তুমি জানো না আমার থেকেও আমার দাদা ভীষন দুষ্টু।
 বিনীতা একটু লজ্জা পেয়ে গেলো। কিন্তু আস্তে আস্তে আনন্দির কানে কানে বলল
-- এরকম কিছু হলে তোমার আপত্তি নেই তো
আনন্দি চোখ বড় বড় করে মামী শুনতে না পায় সেইভাবে বিনীতার কানের কাছে মুখ নিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
-- একদম না,একদম না। বাড়ির সকলেই তোমাকে খুব পছন্দ করেছেন। শুনলে না মা তো বলেই দিলেন ,তোমার মা মানে মাসিমার সাথে দেখা করতে মা খুব তাড়াতাড়িই আসবেন।
 হঠাৎ করে গাড়িটা ব্রেক নিয়ে একটা ছোট ইট বিছানো রাস্তায় ঢুকে পড়ল।
 সেটা দেখে অনল বলল,
-- এই রাস্তাটা ধরলেন কেন? আমরা তো বড় রাস্তা ধরেই এগোতে পারতাম।
-- আসলে দাদা এটা দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি হবে আর দু'পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে গেলে আপনাদেরও ভালো লাগবে।
 একথা শুনে অনল আর কোন কথা বলল না।
 গ্রামের পথে গাড়ি এগোতে লাগলো 
আর একটু এগোলেই আসল সৌন্দর্য—
দুই ধারে সবুজ ধানক্ষেত
মাঝেমধ্যে পুকুর, তাতে ভেসে আছে শাপলা
গাছের ছায়ায় কাঁচা রাস্তা
মাঠে কাজ করছে কৃষক
দূরে মাটির বাড়ি, উঠোনে শুকোচ্ছে ধান
হালকা বাতাসে কাদামাটির গন্ধ—যেটা শহরে কখনও পাওয়া যায় না।
 
রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকান দেখতে পেয়ে আনন্দি  চেঁচিয়ে উঠলো
— দাদা এখানে চা খাবো আর কিছু ছবি তুলবো।
 ড্রাইভারকে বলাতে সে বলল,
একদম দোকানের সামনে তো দাঁড়ানো যাবে না। জায়গা নেই। গাড়িটা একটু এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে হবে। আবার আপনাদের এই পথটা হেঁটে আসতে হবে। তাতেই সবাই রাজি।
 গাড়ি থেকে নেমে সকলে আবার এগিয়ে চলল ওই দোকানটার দিকে। সবাই গিয়ে বাঁশের তৈরি করা বেঞ্চে বসলো। আনন্দি ঠিক ক্যামেরায় অনল আর বিনীতাকে একই ফ্রেমে নিয়ে বিনীতার সামনে ছবিটা ধরে বলল
-- একদম পারফেক্ট। বেশ মানাবে।
বিনীতা হাসতে লাগলো। এই অবস্থায় কোন মেয়ের যে রাগ হয় সেটা বিনীতার মধ্যে বিন্দুমাত্র না দেখতে পেয়ে আনন্দি বিনীতার হাত ধরে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো,
-- সত্যি করে একটা কথা বলবে?
-- বলো
-- তুমি দাদাকে আগেই চিনতে না? দাদার সাথে তোমার কতদিনের আলাপ?
 বিনীতা লজ্জা পেলো না,ভয় পেলো না। খুব ধীরে এবং আস্তে করে বলল
-- তোমার দাদার সাথে আমার জীবনের একটা ঘটনা হঠাৎ করেই ঘটে গেছে কয়েকমাস আগে। আমাদের বাড়ির লোক ছাড়া আর কেউ জানে না।
-- কী ঘটনা? আমায় বলা যাবে?
-- যদি তোমায় বলা না যেত তাহলে এইটুকুই কী বলতাম গো? তবে অনেক বড় ঘটনা। এখন বলতে শুরু করলে শেষ করতে পারবো না। বাড়ি গিয়ে সময় মত সব বলবো তোমায়। বাকিটা তুমি ম্যানেজ কোরো। তবে একটা অনুরোধ করবো আজ রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে যেও।
-- আচ্ছা দাদা যে বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেছিলো তুমি সেই বন্ধুর বোন তাই না? তোমার বিয়েতেই গেছিলো?
-- হ্যাঁ কিন্তু সেই বিয়েটা --
 কথা শেষ হয় না অনল ডাক দেয় চা রেডি তাড়াতাড়ি আয় 
-- বলেছিলাম না এখন শুরু করলে শেষ হবে না। তবে তুমি খুব ইন্টেলিজেন্ট। বাকিটা বুঝে নাও। বাড়ি গিয়ে তোমায় পুরো ঘটনাটা জানাবো।
মাটির ভাঁড়ে চা। আনন্দি খুব খুশি। কিন্তু একটু উদাসীন হয়ে গেছে। বিষয়টা খাপছাড়া শুনে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। চা খেতে খেতে সে বারবার লক্ষ্য করছে বিনীতা আর তার দাদার কার্যকলাপ।

গ্রামের লোকজনের সরল হাসি, সহজ কথা, গায়ে পড়ে তাদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া এইসব দেখে এবং শুনে এতকিছুর পরেও আনন্দির—মনটা একদম ফ্রেশ হয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও যেন একটা কাঁটা খচখচ করে  বিঁধে যাচ্ছে।
 তার মনে পড়ছে বিয়েবাড়ি থেকে আসার পর থেকেই দাদা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছিল। বিয়েবাড়ির গল্প শুনতে চাইলে সময়মত বলবে বলেছিল। তারপর বিষয়টা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। কী এমন ঘটেছিল সেদিন বিয়েবাড়িতে যার ফলে দাদা সেখান থেকে ফিরে একদম শান্ত হয়ে গেছিল। সেই বিয়েটা হয়নি বলছে বিনীতা। কেন হয়নি? আর বিয়েটা না হওয়ার পর যেহেতু দাদা সেই বিয়েতে গেছিলো সেই সূত্র ধরে দাদার সাথে বিনীতার পরিচয়।  মাথার ভিতর নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু এখনই জানার কোন উপায় নেই। কারণ পাশেই মামী বসে যাচ্ছেন। 
 চা খাওয়া শেষ করে ওরা পুণরায় গাড়িতে উঠে বসে। কিন্তু এবার আনন্দি বেশ চুপচাপ। তার মাথার ভিতরে নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
 অনল পিছন ফিরে আনন্দিকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বেশ জোরে বলে,
-- কিরে পাগলী? হঠাৎ চুপ হয়ে গেলি কেন? তোকে ঠিক এই চুপচাপ বসে থাকাটা মানায় নারে।
-- গভীর চিন্তায় আছি রে দাদা।
-- আনন্দির বলার ধরনে সকলেই হেসে দিলো
-- কী এমন গভীর চিন্তা করছিস তুই 
মামী তার কাছে জানতে চাইলো। 
-- অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করছি মামী। ঠিক মেলাতে পারছি না।
-- বেশি চেষ্টা করো না । চুপচাপ ভেবে যাও ঠিক সময় মত আমি নিজেই মিলিয়ে দেবো এই অঙ্ক।
 বিনীতা খুব আস্তে করে কথাগুলো বললো আনন্দিকে 
-- বিষয়টা খুব জটিল। আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল। দাদার ছবি দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা, দাদা আসার সাথে সাথেই নিজেকে আয়নায় দাঁড়িয়ে একটু গুছিয়ে নেওয়া। সর্বোপরি যে মেয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে দাদার একটা কথাতেই থাকতে রাজি হয়ে যাওয়া - সবই আমার কাছে সন্দেহজনক ছিল।
-- বাব্বা! এ মেয়ের তো সাংঘাতিক বুদ্ধি দেখছি। এ তো ভেবে ভেবে আমি বলার আগেই জাল ছিঁড়ে ফেলবে।
-- সেই থেকে আমি শুনছি তোরা দু'জনেই চুপিচুপি কিছু আলোচনা করেই চলেছিস। কোন পার্টি তোদের
অনল ঘাড় ঘুরিয়ে আনন্দির দিকে ফিরে জানতে চাইলো।
-- পার্টি পারিবারিক দাদা। কোন রঙ নেই।তবে ব্যাপারটা সিরিয়াস। তুই এত ভাবিস না। ম্যায় হুঁ না
-- তোকে কে বলল আমি কোন বিষয় নিয়ে ভাবছি
-- ভাবছিস ভাবছিস। কিন্তু প্রকাশ করছিস না
-- সে কী রে তুই তো অন্তর্যামী হয়ে গেলি রে -
এই প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে আনন্দি বলল 
 -- আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ দাদা?
বিনীতা উত্তর দেওয়ার আগেই অনল বলল,
-- আর বেশি দেরি নেই। এই এসে গেছি
-- তুই কীভাবে জানলি?
-- ওমা জানবো না কেন এখানে তো আমার বন্ধুর বাড়ি।
-- কিন্তু তুই তো সেই বন্ধুর বাড়িতে কোনদিন আসিসনি।
এমনভাবে আনন্দি কথাটা বলে গম্ভীর স্বরে অনল ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আনন্দির দিকে আর একবার বিনীতার দিকে তাকিয়ে চুপ করে যায় কারণ সামনেই দেখতে পায় বাড়ির গেটের কাছে বিজয় দাঁড়িয়ে। 

ক্রমশ 

    

Monday, May 11, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৫)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৫)

 রাতে অনেক চেষ্টা করেও অনল বিনীতার সাথে দেখা করতে কিংবা কথা বলতে পারে না। বিনীতারও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনলের সাথে কোন কথা হয় না। অনল ও আনন্দির ঘর একদম পাশাপাশি। একই ছাদের তলায় শুধু মাঝখানের একটা দেওয়াল দু'টি মানুষকে কয়েক হাজার দূরত্বে নিয়ে গেছে। দু'জনেই জেগে অধিক রাত পর্যন্ত কারও চোখেই কোন ঘুম নেই কিন্তু কেউই বেরিয়ে এসে কারও সাথে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না।
  বিনীতা শুয়েছে আনন্দির কাছে। যতক্ষণ না আনন্দি ঘুমিয়েছে সে বকবক করেই চলেছে। বিনীতা হু হা করে উত্তর দিয়েছে। কোন কথাই তার মাথায় ঢোকেনি।

  রাতের নীরবতা ভেদ করে পাশে শুয়ে থাকা 
রাত যেন একটু বেশিই গভীর । চারদিক নিস্তব্ধ, অথচ সেই নীরবতার মাঝেই যেন হাজারো না বলা কথা মনের ভিতর বারবার প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে এই অন্ধকার ভেদ করে।
অনল নিজের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে, কিন্তু তার মাথার ভেতরের চিন্তার গতি যেন তার থেকেও অনেক বেশি। বারবার মনে পড়ছে বিনীতার মুখটা—সেই হরিণী চোখ, বলতে চেয়েও সেই না বলা অপ্রকাশিত কথাগুলো।
সে নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করে— “যদি ও সত্যিই কথা বলতে চাইত, তাহলে কি একবারও বেরিয়ে আসত না?”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেরই যুক্তি ভেঙে পড়ে— “না, তা  কীকরে সম্ভব? আজই এই বাড়িতে ওর প্রথম দিন। ওর ভিতর লজ্জা আর ভয় দু'টোই  তো কাজ করবে।আমিই তো যাইনি…এটা তো আমার নিজের বাড়ি। আমিই তো দরজাটা খুলিনি সেই অজানা একটা ভয় আর লজ্জা তো আছেই।"
একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছে তার ভিতরে। বলতে চেয়েও সেই না বলা কথাগুলো মনের ভিতর তোলপাড় করে উঠছে। কিংবা ভালোবাসার লড়াই! একবার মনে হচ্ছে উঠে গিয়ে দরজায় নক করে,  একসাথে গিয়ে বাড়ির সবাইকে বলে দিই ওকে আমি অগ্নি সাক্ষী করে বিয়ে করেছি আইনত ও আমার স্ত্রী। আবার পরক্ষণেই একটা অজানা ভয় তাকে আটকে দিচ্ছে— “যদি ও আমার কথার সায় না দেয়? যদি ও সবকিছু অস্বীকার করে? ওর মনের কথাটাই তো এখনো শোনা হয়নি
এই একটা প্রশ্নই যেন তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে।

  ওদিকে ঠিক পাশের ঘরে, আনন্দির পাশে শুয়ে থাকা বিনীতার অবস্থাও আলাদা কিছু নয়।
আনন্দি অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দে বোঝা যাচ্ছে যে সে স্বপ্নের জগতে চলে গেছে। কিন্তু বিনীতার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। সে চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে, ঠিক যেমনটা অনল করছে অন্য ঘরে।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়… একবার শুধু ডাকে— “অনল…”
কিন্তু ঠোঁট পর্যন্ত এসে শব্দটা থেমে যাচ্ছে। তার নিজেরই মনে প্রশ্ন জাগছে— “কেন আমি যাব? সব? ওর বাড়ি এটা ওতো আসতেই পারতো বোনের ঘরে।তখন তো কিছু কথা অন্তত বলা যেত। তা না করে নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে আছে।
তার ভিতরেও একই লড়াই—অভিমান বনাম ভালোবাসা।
  হঠাৎ তার চোখের কোণে জল জমে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে জামার  তুলে মুছে নেয় —যদিও জানে, এই মুহূর্তে তাকে দেখার মতো কেউ নেই।
সে মনে মনে বলে— “তুমি কি একবারও ভাবছো না আমার কথা, অনল?”
অথচ একই সময়ে, ঠিক পাশের ঘরে অনলও মনে মনে বলছে— “তুমি কি একবারও আমাকে বলতে পারলে না কিছু, বিনীতা?”
একই ছাদের নিচে, মাত্র একটা দেওয়ালের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছে দুটো মন। অথচ সেই দেওয়ালটাই যেন আজ সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয়ে উঠেছে।
দু’জনেই অপেক্ষা করছে—কেউ একজন এগিয়ে আসবে, কেউ একজন ভাঙবে এই নীরবতা।
কিন্তু রাত বাড়তে থাকে, আর সেই অপেক্ষাও আরও গভীর হয়।
হয়তো ভালোবাসা আছে, খুব গভীরভাবেই আছে…
কিন্তু সেই ভালোবাসার উপর জমে থাকা অভিমান আর অপ্রকাশিত কথাগুলোই আজ তাদের সবচেয়ে বড় বাধা।
ফ্যানের একঘেয়ে শব্দ, ঘড়ির কাঁটার টিকটিক, আর দুটো অস্থির হৃদস্পন্দন—এই নিয়েই কেটে যায় রাতের প্রতিটা মুহূর্ত।
ভোর আসবে… আলো ফুটবে…
কিন্তু তাদের সম্পর্কের এই অন্ধকার কি কাটবে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে তাদেরই একটুখানি সাহসে… কে আগে বলবে " মাত্র ওই একটা দিনেই খুব ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়"
একটা মাত্র ডাকে…
 মাত্র একটা শব্দ "ভালবাসি।"

  খুব ভোরেই উঠে পড়ে বিনীতা। তখন বাড়ির কেউই উঠে পারেনি। ঘরের দরজা খুলে বাইরের ফুরফুরে হওয়ায় বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। কিন্তু একি? এত সকালে বারান্দার গ্রীল কে খুললো? নাকি কাল এত গোলোগুজবের মধ্যে বাইরের গ্রীল দিতেই ভুলে গেছে বাড়ির লোক। ভাবতে ভাবতে গ্রীল পেরিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ায়। সামনে দেখতে পায় অনল আম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে। হাতে বেশ কয়েকটা আম। হয়ত রাতে বাতাসে আমগুলি পড়ে গেছে।
 বিনীতা এগিয়ে যায় অনলের দিকে। বিনীতাকে দেখে অনল বলে,
-- এত সকালে উঠে পড়লে? ঘুম আসেনি রাতে তাই না?
-- কেন? তোমার ঘুম হয়নি রাতে?
-- কীকরে ঘুম আসবে বলো তো? তুমি তো মুখফুটে কোন কথা বলছো না?
-- কী জানতে চাইছো তুমি? এতদিন সাহস করে বাড়িতে জানাতেই পারোনি কিছু? আমার কাছ থেকে কী জানতে চাও বলো? সব কথা কী মুখফুটে বলার দরকার আছে? তুমি বুঝতে পারছো না এই বিয়েটা যদি আমি মেনে না নিতাম তাহলে তোমার গতকাল "কেউ বেরোবে না আজ কোথাও " - কথাটা শুনতাম? আর আমায় দেখে ভাবছো আমি তোমার দেওয়া সিঁদুর পরিনি তাই না?
 বিনীতা এলোমেলো চুলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে  মাথাটা অনলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-- দেখো তো এখানে সিঁদুরের চিহ্ন দেখতে পাও কিনা।
 অনল বিনীতার এই স্পষ্ট কথা শুনে হেসে পড়লো। বুকে হাত দিয়ে বলে উঠে,
-- যাক বাবা নিশ্চিত হতে পারলাম। আমিও সেদিনের পর থেকে একটা মুহূর্তের জন্যও তোমার কথা মন থেকে সরাতে পারিনি। অথচ আমরা কিন্তু আগে কেউ কাউকেই চিনতাম না। খুব ভালোবেসে ফেলেছি ওই একটা দিনেই।
 বিনীতা লজ্জা পেয়ে গেলো অনলের এই সরাসরি "ভালোবেসে ফেলেছি"- কথাটা শুনে।
-- এখন কিভাবে সব ম্যানেজ করবে?
-- ম্যানেজ আর কী? সম্বন্ধ করে তোমায় আবার বিয়ে করবো 
-- সে কী 
-- হ্যাঁ গো সেটাই করবো। আগে তো আজকে তোমাদের বাড়িতে যাই। বিজয়ের সাথে কথা বলি। চিন্তা করো না আমি সব ম্যানেজ করে নেবো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
-- আর আমাদের পাড়ার লোকজন?
-- বিয়েটা তো ওখানে হবে না। এই কলকাতাতেই বিয়ে, বৌভাত সব একবাড়িতেই হবে। আজকাল এসব হয়।
-- আমি এখন ভিতরে যাই। সবাই উঠে পড়বে আর উঠে যদি সবাই দেখে আমরা দু'জনে এখানে কথা বলছি বিশেষ করে আমার ননোদিনী তাহলে আজই ও আমাদের বিয়ে দিয়ে ছাড়বে।
 অনল হো হো করে হেসে ওঠে।
-- ঠিক চিনেছ তুমি আমার বোনকে। ওর মুখে সত্যিই কিছু আটকায় না। যাও তবে এখন ভিতরে? ও একটা কথা - বিজয়কে সব জানিয়েছ?
-- হ্যাঁ গতকালই জানিয়েছি
-- কী বললো?
-- বললো তোমার প্রতি ওর বিশ্বাস আছে তুমি সবকিছু ম্যানেজ করে নিতে পারবে।

  টিফিন করে ওরা বেরোনোর জন্য প্রস্তুত। অনলের বাবা এমনিতেই খুব কম কথা বলেন। বিনীতা তাকে প্রণাম করতে গেলে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেন,
-- তোমায় আমার খুব আপন মনেহয় মা। হয়ত আগের জনমে তুমি আমার কেউ ছিলে। আবার এসো আমাদের বাড়ি।
 অনল সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবা কথাটা বলার সাথে সাথে সে বিনীতার দিকে তাকিয়ে পড়ে। বিনীতা মুচকি হেসে এগিয়ে যায় অনলের মায়ের কাছে। তাঁকে প্রণাম করলে তিনিও আশীর্বাদ করে বিনীতাকে বলেন,
-- মনেহচ্ছে তোমাদের বাড়িতে আমারও একবার যেতে হবে। দেখি কবে নাগাদ যেতে পারি। তবে মা একটা কথা বলি, বাড়ি থেকে এতদূরে থাকো। চেষ্টা করো কলকাতায় বদলী হয়ে আসার।
  অনল, আনন্দি, বিনীতা আর ওর মামী গিয়ে গাড়িতে বসলেন।
 
ক্রমশ -

Sunday, May 10, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ পর্ব (২৪)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৪)

 অনলের মাথাতে কিছুতেই আসছে না এটা কিভাবে সম্ভব হল? সত্যিই কি তবে আমরা ঈশ্বরের হাতের পুতুল? তিনি সবকিছু নির্ধারণ করেন মানুষের জীবনের? আগেকারদিনের ঠিক যেন সেই সুতো বাঁধা পুতুলের মত। এখন কিভাবে অনল এগোবে সেটাই তো বুঝতে পারছে না।
 ওদিকে আনন্দি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলে উঠলো,
-- আমি ঠিক জানতাম দাদা এসে গেলে আমাদের আর বেরোতে দেবে না। চলো বিনীতা আমরা গিয়ে চেঞ্জ করে আসি।
 অনলের মা বললেন,
-- আরে দাঁড়া তোর দাদা ফ্রেস হয়ে আসুক। সকলে মিলে চা খাই। একটু টিফিনেরও ব্যবস্থা করি।
 কথাটা শুনেই অনলের মামা দেবদূত প্রায় চিৎকার করে উঠলেন
-- ওরে আমার বয়স হয়েছে ইরা ।এত খাওয়াস না আমায়। অসুস্থ হয়ে পড়বো আমি
 একএক করে টিফিন খাওয়া সকলে নসাৎ করে দিলো। অনলের মা তখন বিনীতাকে বললেন,
-- তুমি তো দুপুরেও তেমন কিছু খাওনি এখন কিছু করি মা তোমার জন্য। আমি তো অনলের জন্য সামান্য চিড়ের পোলাও করবো তুমি একটু খাও।
-- এখন আর কিছু খাবো না মা সিমা 
 বিনীতার মুখ থেকে প্রথমে মা কথাটা বেরিয়ে গেলেও সেটা পড়ে সে ঠিক ম্যানেজ করে নেয়। ইতিমধ্যে অনল এসে ঢোকে ডাইনিংয়ে। এসেই সে বিনীতার দিকে তাকিয়ে পড়ে। দু'জনে চোখাচোখি হয়। মুহুতেই দু'জনেই চোখ সরিয়ে নেয়। অনল ঠিক বিনীতার মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসে।
  দু’জনের সামনে একই টেবিল, অথচ মাঝখানে অদৃশ্য এক দূরত্ব। চারপাশে সবাই আছে—হাসি, গল্প, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ—সবই চলছে, কিন্তু অনল আর বিনীতার কাছে যেন সব শব্দই ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট।
অনল চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু তার চোখ বারবার নিজের অজান্তেই উঠে যাচ্ছে বিনীতার দিকে। সে নিজেকে সামলাতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। এতদিনের না বলা কথা, অভিমান, অপেক্ষা—সব একসাথে বুকের মধ্যে জমাট বেঁধে আছে।
বিনীতা প্রথমে চোখ নামিয়ে রাখলেও, তারও মন যেন স্থির নেই। চায়ের কাপটা হাতে নিয়েও সে চুমুক দিতে ভুলে যাচ্ছে। তার চোখের পাতা কাঁপছে, যেন প্রতিটা মুহূর্তে নিজেকে বোঝাতে চাইছে—“না, তাকাবি না… এখন নয়…”
কিন্তু ভালোবাসা কি কখনও এত সহজে মানে?
হঠাৎই এক মুহূর্তে, যেন অজান্তেই, দু’জনের চোখ আবার মিলল।
সেই চোখাচোখিতে ছিল না কোনো কথা—
ছিল শুধুই অগণিত প্রশ্ন,
অগণিত উত্তর,
আর না বলা হাজার অনুভূতি।
অনলের চোখ যেন বলছে—
“তুমি কেন এতদিন আমায় ফোন করোনি?”
“ তুমি নিজেও তো একটা ফোন করতে পারতে? দাদা তো তোমায় নম্বর দিয়েছে…”
 তাদের এই নীরবতা দু'জনের কাছেই অনেককিছু প্রশ্ন আর উত্তর হয়ে  পৌঁছে যাচ্ছে। এতগুলো মানুষ এত কাছে থেকেও কেউ কিচ্ছুটি টের পাচ্ছে না।
অনল চা খেয়ে আস্তে করে টেবিলের উপর কাপপ্লেট রেখে হাতটা না নামিয়ে নিজের হাতটা একটু এগিয়ে রাখে—খুব সামান্য, যেন কেউ বুঝতে না পারে।
ঠিক সেই সময় বিনীতা, কিছুটা অচেতনভাবেই, নিজের কাপপ্লেটটা টেবিলে রাখে।

 দু’জনের আঙুল স্পর্শ করলো না…
কিন্তু খুব কাছে এসে থেমে গেল।
সেই সামান্য দূরত্বটাই যেন তাদের সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি—
ছোঁয়া যায়, তবুও ছোঁয়া যায় না।
আনন্দি হঠাৎই বলে উঠলো,
— কি রে, তোরা এত চুপচাপ কেন?
দু’জনেই চমকে উঠে দ্রুত নিজেদের স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
অনল হালকা হেসে বলল, 
-- পরিচয় তো সবে হল। সময় দে বন্ধুত্ব করবার।
-- কিন্তু দাদা আমার মনেহচ্ছে তোরা যেভাবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছিস যেন তোরা আগে থাকতেই একে অপরকে চিনিস
আনন্দি ফিসফিস করে অনলের কানের কাছে বলে।
 অনল চুল টেনে বোনের বলে,
-- বড্ড ফাজিল তুই। চুপচাপ বোস তো দেখি
 বিনীতা অবাক হয়ে জানতে চাইলো 
-- কী বলল ও?
— কিছু না, এমনি…
কিন্তু তার চোখ আবার একবার বিনীতার দিকে চলে গেল।
বিনীতা এবার চোখ সরাল না। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও, সে তাকিয়ে রইলো—একটু অভিমান, একটু লজ্জা, আর গভীর ভালোবাসা মেশানো সেই দৃষ্টিতে।
মনে মনে সে শুধু একটা কথাই বলল—
“ এখনো বাড়িতে কিছুই বলে উঠতে পারোনি?…”
আর অনল, সেই দৃষ্টি বুঝে নিয়েই, নিজের মনে নিঃশব্দে উত্তর দিল—
“ বলবো সব বলবো। এবার বলার সময় এসে গেছে…।বলে দিলেই তো বলা হয়ে গেলো। বেশ তো লাগছে এই মুহূর্তগুলি। আস্তে আস্তে সেই কলেজ লাইফের প্রেমের মত প্রেমটা জমুকনা! 
হঠাৎ তোমায় দেখলাম আর বিয়ে হয়ে গেলো। তার চেয়ে এইভাবে প্রেম পর্বটা জমিয়ে আমরা আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসি নাহয় -
চারপাশে তখনও গল্প, হাসি, চায়ের আড্ডা চলছে—
কিন্তু সেই মুহূর্তে, অনল আর বিনীতার জন্য পুরো পৃথিবীটা যেন থেমে গেছে,
শুধু তাদের চোখের ভাষাটাই কথা বলছে… 
 ঠিক ভালোবাসা হওয়ার সেই আগের মুহূর্ত।
 বিনীতা এবং অনল দু'জনেই একটু নিরিবিলি চাইছে যাতে কথা বলার সুযোগ পায়। কিন্তু এত লোকের ভিড়ে সে সুযোগ পাওয়া সম্ভব নয়। ভাবতে লাগলো কী করা যায়।
 হঠাৎ লোডশেডিং। মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলের উপর রাখা। মামা,মামী গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে আর ভারতবর্ষের লোডশেডিংয়ের পি*ণ্ডী চটকাতে চটকাতে ছাদে উঠে গেলেন। আনন্দি তার ঘরে গেলো ইমারজেন্সি লাইটটা আনতে। অনলের বাবা গিয়ে বসলেন বড় বারান্দায়। মা মোমবাতি জ্বালিয়ে রান্নাঘরে।
 ডাইনিংয়ে শুধুমাত্র অনল আর বিনীতা।সুযোগ পেয়েই অনল শুরু করলো খুব চাপাস্বরে -
-- আমি কিন্তু ভীষণভাবে আশা করেছিলাম আমায় ফোন করবে। এই ক'টামাসে এমন কোন দিন নেই আমি তোমার ফোনের আশা করিনি।
-- আমায় দাদা জানিয়েছিল সে তোমায় নম্বর দিয়েছে। আমিও তোমার ফোনের আশা করতাম। তারপর দেখলাম তুমি আর ফোন করলে না তখন ধরেই নিয়েছিলাম সেদিনের ঘটনাটা হয়ত হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফল তুমি কোন যোগাযোগ রাখতে চাও না বলেই হয়ত আর ফোন করলে না।
-- কাল আমি গিয়ে তোমায় পৌঁছে দেবো।
-- তা কীকরে সম্ভব? মাসীমণি তো মায়ের সাথে দেখা করতে যাবে।
-- আরে মামী আমার মাইডিয়ার। ঠিক ম্যানেজ করে নেবো। আর হ্যাঁ এবার চেষ্টা করো শিলিগুড়ি থেকে বদলি হয়ে কলকাতার দিকে আসবার।
-- এই বাড়ির কাছে
 মুখে বিনীতার দুষ্টু হাসি
-- হ্যাঁ এই বাড়ির কাছে। প্রথম বিয়েটা বাড়িতে জানাতে না পারলেও এই মেয়েটাকে আমার ভালো লেগেছে বিয়ে করতে চাই - বাড়িতে এই কথাটুকুই যথেষ্ঠ। আর একবার তোমায় বিয়ে করে নেবো। কিন্তু বদলিটা তো হতে হবে। 
অনল হাসতে থাকে মুখে হাত দিয়ে
 অনলের কথা শেষ হতেই আনন্দি তার ঘরের ইমার্জেন্সী লাইট নিয়ে চলে এলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিকও চলে এসেছে। 
-- এই দাদা তোরা এতক্ষণ কী কথা বলছিলি?
-- তাহলে তোকে জানানোর জন্য প্রথম থেকে আবার শুরু করি? 
 অনলের কথা বলার ধরণ দেখে বিনীতা হেসে ফেলে। শুরু হয়ে যায় দুই ভাইবোনের খুনসুটি। ততক্ষণে ছাদ থেকে মামা,মামীও নেমে নিচুতে এসেছেন। 
 -- মামী, কাল আমি বিনীতাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো। তোমাকে আর কষ্ট করে যেতে হবে না।
 সঙ্গে সঙ্গে মামী বলে উঠলেন
-- ওরে আমি তো আমার সইয়ের সাথে দেখা করতে যাবো। তুই পৌঁছে দিয়ে আসলে কীকরে হবে?
 -- এটা তো ভেবে দেখিনি। তাহলে সবাই এক কাজ করি আমরা সবাই মিলে একবেলা বিনীতাদের বাড়িতে খেয়েদেয়ে একটু ঘোরাঘুরি করেই কলকাতা ফিরি।
 বিনীতা চুপ করেই বসে আছে। যা বলার অনলই বলে চলেছে। সকলের মত নিয়ে ঠিক হল আগামীকাল সকালে মামী, অনল,আনন্দি আর বিনীতা টিফিন করে বেরিয়ে যাবে ফিরবে সেই সন্ধ্যায়।
 রাতে খাবার টেবিলে সবাই বসে। অনলের মা ইরাদেবী একাই সকলকে পরিবেশন করছিলেন। বিনীতা উঠে গিয়ে বলল,
-- মাসিমা আমি আপনাকে একটু হেল্প করি। সেই থেকে গরমে রান্নাবান্না করলেন।
-- না না মা তুমি একদিনের জন্য এসেছো। তুমি বোসো আমিই সকলকে পরিবেশন করছি।
-- কিছু হবে না। আমিও আপনার এক মেয়েরই মত।
 ইরাদেবী হেসে পড়লেন। আনন্দি মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
-- মা দেখো একে পছন্দ হলে ছেলের বৌ করতে পারো। কথা বলে দেখেছি কোথাও কোন প্রেমট্রেম নেই।
-- অনল পাশেই বসে খাচ্ছিল। তার কানে কিছু কথা গেছে। সেও ঝুঁকে পড়ে মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-- আমার কিন্তু কোন আপত্তি নেই 

ক্রমশ
 

Saturday, May 9, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২৩)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৩)

 বিনীতার নানান ভাবনার মাঝে হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। দেখে দাদা ফোন করেছে। ফোনটা কানে দিয়ে হ্যালো বলতেই বিজয় বলে উঠলো,
-- বেড়িয়েছিস? 
 এদিকে ফোনটা রিং হওয়ার সাথে সাথে আনন্দি বলল,
-- বিনীতা তুমি কথা বলতে লাগো আমি একটু আসছি।
 বিনীতা ফোনটা কানে চেপে ধরে জানলার কাছে গিয়ে চাপাস্বরে দাদাকে বলল,
-- না, এখনো বের হইনি। কিন্তু দাদা একটা মারত্মক ঘটনা ঘটেছে।
-- কী হয়েছে? কোন খারাপ কিছু? 
-- খারাপ কী ভালো বুঝতে পারছি না।
-- হেঁয়ালি না করে সরাসরি সব বল।
-- বলছি বলছি।
 কানে আরও বেশি করে ফোনটা চেপে ধরে খুব আস্তে করে বিনীতা তার দাদাকে জানালো
-- আরে আমি যে বাড়িটাই এসেছি সেটা অনলদের বাড়ি
-- মানে 
-- মায়ের ছেলেবেলার বন্ধু হচ্ছেন অনলের আপন মামী
-- ও মাই গড! অনলের সাথে দেখা হয়েছে? তুই কে কেউ কিছু বুঝতে পেরেছে?
-- তোর মাথাটাই গেছে। ওরা কীভাবে বুঝবে আমি এবাড়ির কে? অনল এখনো অফিস থেকেই ফেরেনি। মাসীমণি একটু পরেই আমায় নিয়ে বেরোবেন। দেখা হবে কিনা তাও জানি না।
-- আরে দেখা তো করতেই হবে। দরকার হলে আজ রাতটা ওখানেই থেকে যা। 
-- তারা থাকতে না বললে আমি কি নিজের থেকে বলবো নাকি?
-- সেও তো এককথা। এত দেখি তোর জীবনের নাটক একেবারে জমে উঠেছে। 

  তারপর বিজয় একটু হেসে বলল,
-- নাটক না, একেবারে সিনেমা চলছে তোর জীবনে! তবে শোন, মাথা ঠান্ডা রেখে সবকিছু সামলাস। আবেগে কিছু বলে ফেলিস না যেন।
বিনীতা একটু থেমে নিচু গলায় বলল,
-- দাদা, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কী করবো। হঠাৎ করে যদি অনলের সামনে পড়ে যাই… কী বলবো ওকে?
-- তোকে কিছু বলতে হবে না। তুই চুপ থাকবি। ও তোকে তো কনের সাজে দেখেছিল। দেখ তোকে চিনতে পারে কিনা। তবে আমি আমার বন্ধুকে যতদুর চিনি ও তোকে ঠিক চিনতে পারবে। ও কী বলে বাড়িতে, এখনই কিছু বলতে চায় কিনা সেসব তো আমরা কিছুই জানি না। তবে যা হবে ভালোর জন্যই হবে। হুট করে তোর অনলের সাথে বিয়ে হওয়া আর এইভাবে ওই বাড়িতে পৌঁছে যাওয়া সব বিধাতা অঙ্ক কষেই করছেন। ওর সাথে দেখা হলে তুই একদম চুপ থাকবি। শুধু দেখবি ওর আচরণ কেমন।
-- কিন্তু ও যদি না চিনতে পারে?
-- আরে পারবে পারবে। আর না চিনলেও তুই নিজেকে সামলে নিলেই হবে। আমি মাকে সবটা জানাচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে ভাবিস না। 
কথা বলতে বলতে বিনীতা জানলার বাইরে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-- জানিস দাদা, বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে… মনে হচ্ছে অনেকদিনের জমে থাকা কিছু একটা আজ সামনে আসতে চলেছে।
বিজয় একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
-- এটাই তো জীবন রে বোন !কখন কার সাথে, কীভাবে দেখা হয়ে যাবে কেউ জানে না। তবে একটা কথা মনে রাখিস—নিজেকে ছোট করে কিছু বলবি না। তুই যা, যেমন, সেটাই থাকবি।
-- হুম… আমাকে তো চিনিস। নিজেকে ছোট করে আমি আমার প্রাপ্য পেতে চাই না। তবে ওরা যদি আমায় থাকতে না বলে আমি কিন্তু নিজের থেকে এখানে থাকতে চাইবো না।
-- সেতো অবশ্যই।আর একটা কথা, অনল যদি সত্যিই তোকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে সে নিজেই এগিয়ে আসবে। তোকে জোর করে কিছু করতে হবে না। আর আমি জানি মাত্র একটা দিনেই অনল তোকে ভালোবেসে ফেলেছে। কারণ ওর সাথে আমার ফোনে কথা হয়েছে আগেই। ওর কথা শুনে আমার এটাই মনে হয়েছে। ও এগোতে পারছে না কারণ তোর দিক থেকে কোন সাড়া ও পায়নি।
বিনীতা হালকা হেসে বলল,
-- আমি জানি না দাদা কী হচ্ছে আর কী হতে চলেছে।
-- যা হবে ভালোই হবে। কিচ্ছু ভাবিস না।
-- হঠাৎ করে এখানে এসে পড়ে আর এই বাড়িটাই অনলদের বাড়ি জেনে আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। মাথাটাই কাজ করছে না।
-- তোর মুখে এসব শুনতে আমার ভালো লাগে নারে। তুই তো দুর্বল নোস ।
-- এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি যে দুর্বল হতে বাধ্য হচ্ছি।
--আচ্ছা আচ্ছা, এখন বেশি ইমোশনাল হবি না। 
  ঠিক তখনই পিছন থেকে আনন্দির গলা শোনা গেল,
-- বিনীতা, আমি রেডি। তুমি কি রেডি হয়ে গেছো?
বিনীতা তাড়াতাড়ি ফিসফিস করে বলল,
-- দাদা, পরে কথা বলবো। ওরা এসে গেছে। এবার মনেহয় বেরোতে হবে
-- ঠিক আছে, আপডেট দিতে ভুলিস না কিন্তু!
-- আচ্ছা, রাখছি।
ফোনটা কেটে দিয়ে বিনীতা একবার নিজের মুখটা আয়নায় দেখল। চোখে স্পষ্ট উত্তেজনা আর অজানা এক আশঙ্কা। নিজের মনকে শক্ত করে নিয়ে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল…
আজ হয়তো সত্যিই তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
 -- বলছিলাম কী রেডি আমি, মামী দুজনেই। কিন্তু আজকের রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে গেলে হত না?
 এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল বিনীতা।
--  হ্যাঁ সে থাকা যেতেই পারে। কিন্তু থাকলে লাভটা কী হবে?
 বিনীতা হাসতে থাকে।
-- লাভ বলতে আমরা সারাটা রাত গল্প করতে পারবো।মামিমারও একটু বিশ্রাম হবে এই আর কী?
 বিনীতারও যে থাকার ইচ্ছা সেটা তো বুঝতে দেওয়া যাবে না। তাই অভিনয়টা কিছুক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে অন্তত অনল না ফেরা পর্যন্ত।
বিনীতা ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে নিতে বলল,
-- দেখো আজ যদি আমি চলে যাই'ও তোমাদের আমার এত ভালো লেগেছে আমি আবারও আসবো তোমাদের কাছে।
 এরই মধ্যে কলিংবেল বেজে উঠলো। আনন্দি বলে উঠলো 
-- ওই দাদা এসে গেছে। এবার আর বেরোনো হবে না
-- ওমা কেন? তোমার দাদা কি মানুষকে বাড়িতে আটকে  রাখে নাকি?
-- কোন মানুষকে এখনো আটকে রাখতে দেখিনি। কিন্তু তুমি এত সুন্দরী তোমায় আটকে দিতেও পারে।
-- এই তোমার মুখে কিছুই আটকায় না কেন? এইভাবে কেউ বলে?
-- দেখো আমার মনে যা আসে আমি তাই বলে ফেলি। দেখাই যাক না দাদা তোমাদের যেতে দেয় কিনা।

  অনল মামা,মামীকে দেখেই প্রণাম করে জানতে চায়,
-- ভালো আছো তো তোমরা? কত বছর বাদে তোমাদের দেখলাম বলো তো? 
মামা ভাগ্নেকে বুকের সাথে চেপে ধরে বললেন,
-- আরে ভালো আছি বলেই তো এতদূর আসতে পারলাম। এখন বল তুই কেমন আছিস? বৌমা কবে আসবে ঘরে? এবার একদম বৌমাকে এনে তবে ফিরবো।
 অনল মৃদু হেসে দিয়ে বলে,
-- আসবে আসবে।সময় হলেই আসবে। সবকিছুর একটা সময় আছে তো। সবে মাত্র চাকরি পেয়েছি এরই মধ্যে বিয়ে নিয়ে ভাবলে চলে?
 বিনীতা রেডি হয়ে আনন্দির সাথে ড্রয়িংরুমে এসে ঢোকে। সে বিনীতার দিকে না তাকিয়েই বোনকে বলে,
-- এই ভর সন্ধ্যাবেলায় সেজেগুজে কোথায় চললি?
 কথাটা বলেই পাশে তাকিয়ে দেখে বিনীতা দাঁড়িয়ে। বিনীতার মুখের দিকে তাকিয়ে অনল পুরো থ। এ কাকে দেখছে সে? কিভাবে এখানে এলো? কার সাথে এলো?বাড়ি চিনলো কীকরে?
 অনলের অবাক করা মুখের দিকে তাকিয়েই বিনীতা নিচের দিকে চোখ নামিয়ে নিলো। কিন্তু অনলের মুখ থেকে আর একটাও কথা বের হচ্ছে না। সে বিনীতাকে দেখে একেবারে বোবা হয়ে গেছে।
 এদিকে মামা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে এবার তোমরা বেরিয়ে পড়ো। আর শোনো পৌঁছাতে যদি খুব বেশি রাত হয় আজ আর তোমরা ফিরো না। কাল সকালেই ফিরো।
 অনল বুঝতে পারছে না কারা বেরোচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কাদের রাত হলে ফিরতে নিষেধ করা হচ্ছে। সে হতভম্বের মতই বিনীতার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। বিনীতা সেই যে মাথা নিচু করেছে আর মাথা তোলেনি।
 মামা তখন বললেন,
-- হ্যাঁরে অনল তুই একটা উবের বুক করে দে তো। তোর মামীর পাল্লায় পড়ে মেয়েটার বাড়ি পৌঁছাতে কত দেরি হল। ওর মা,ভাই কত চিন্তা করছেন বলতো?
 অনল সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ঘরে যেতে যেতে বলল,
-- এই সন্ধ্যাবেলায় কেউ কোথাও যাবে না। মামীর বয়স হয়েছে। এতটা জার্নি করে এসেছেন। আবার এখন বেরোবেন। ওটা একটু গ্রামের দিকে বাড়ি। তিনজন মহিলাকে ছাড়া যাবে না।
 মামা অবাক হয়ে বলে উঠলেন,
-- ওরে তোকে তো এখনো আমি লোকেশন পাঠাইনি। তুই কীভাবে বুঝলি ওটা একটু গ্রামের ভিতর 
 অনল নিজের জিহবা নিজেই কামড়ে নিল। বিনীতা মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে পড়লো। অনল যেন মামার কথা শুনতেই পায়নি এমন ভাব দেখিয়ে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলো 

ক্রমশ 

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২২)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২২)

 সঙ্গে সঙ্গে মামী ওকে জানান
-- তুই ওকে কীকরে চিনবি রে! ও হচ্ছে আমার ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে। সেই ছোটবেলায় ওকে দেখেছি।শিলিগুড়িতে ওর সাথে দেখা। মুখটা খুব চেনা চেনা লাগছে দেখে নিজেই এগিয়ে গিয়ে এয়ারপোর্টে ওর সাথে কথা বলি। তারপর ওকে সাথে নিয়েই এখানে আসলাম। এবেলাটা ও থাকবে। বিকেলবেলা একটা গাড়ি বুক করে ওকে আমি নিজে গিয়ে পৌঁছে দেবো। আসলে ওর মায়ের সাথে দেখা করাটাই আমার মূল উদ্দেশ্য। 
আনন্দি মেয়েটির পাশে বসে জানতে চাইলো
-- আমরা সমবয়সীই হবো হয়ত। তাই তুমি করেই বলছি।
-- আমি আনন্দি তোমার নাম কী গো?
-- আমি বিনীতা। শীলীগুলি আমি টিচারি করি। বাড়ি কলকাতার কাছেই। তবে একটু গ্রামের দিকে। প্রায় তিনমাস পরে বাড়ি ফিরছি। স্কুলে দিন সাতেকের ছুটি পড়েছে। মাসিমনি কিছুতেই ছাড়লেন না। তাই আসতে বাধ্য হলাম। বাড়ি যাওয়ার জন্য মনটা আকুপাকু করছে।
-- খুব ভালো হয়েছে এখানে আসলে বলেই তো তোমার সাথে পরিচিত হতে পারলাম। তুমি আমার ঘরে চলো। মামা আর মায়ের কথা শেষ হবে না। একটু ফ্রেস হয়ে নেবে চলো।
 বিনীতা উঠে আনন্দির সাথে তার ঘরে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে একটু হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে এলো। তারপর কিছুক্ষণ একথা সেকথার পর বিনীতা উঠে গিয়ে দেওয়ালে টাঙ্গানো ওদের পরিবারের বাঁধানো ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটা ছবিতে গিয়ে চোখ আটকে গেলো। একি! কে এ? আমি এখানে কাকে দেখছি? নানা এটা কিভাবে সম্ভব? নিশ্চয়ই আমার কোন ভুল হচ্ছে। একদৃষ্টে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে বিনীতা। আনন্দি সেটা দেখতে পেয়ে বলল,
-- এই ছবিটাতে আমরা দুই ভাইবোন আর মা,বাবা। এটা আমার দাদা। এই কয়েকমাস হল দাদা চাকরি পেয়েছে। 
 ঠিক এই সময় আনন্দির মা খেতে ডাকলেন। বিনীতার মাথায় কিছুই ঢুকছে না কী হচ্ছে ওর সাথে এসব? হঠাৎ করে ও এখানে এসে উপস্থিত হল কীভাবে? সত্যিই কি আমাদের সবকিছু বিধাতার হাতে? আমাদের হাতে কিছুই নেই? এবার কি তার জীবনের জট খুলতে চলেছে? নাকি কোন অশনিসংকেত আসতে চলেছে? 
 বিনীতাকে হাত ধরে টেনে আনে আনন্দি কারণ বিনীতাকে দু'বার ডাকার পরেও সে অন্যমনস্কভাবে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। 

খাওয়ার টেবিলে বসতেই আনন্দির মা হেসে বললেন,
— এসো মা, এতক্ষণ গল্প করছিলে বুঝি? চল, আগে খাওয়া হোক, তারপর আবার গল্প করা যাবে।
 বিনীতা বুঝতে পারে উনি অনলের মা। কোথায় যেন একটা ভয় বিনীতার ভিতরে কাজ করতে লাগলো। তবুও বিনীতা মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
— হ্যাঁ আনন্দির সাথে গল্প করে খুব ভালো লাগলো।
উনি প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বললেন,
— ভালো লাগবেই তো! আনন্দির তো কথার শেষ নেই। কথা বলার লোক পেলেই বকবক করে তার মাথা খারাপ করে দেয়।
আনন্দি একটু অভিমানী গলায় বললো,
— এই যে! এসব বলবে না তুমি। ভালো মানুষেরা একটু বেশি কথা বলে। তার ভিতর কোন প্যাঁচ থাকে না।
সবাই হেসে উঠলো।
খাওয়া শুরু হতেই আনন্দি আবার বিনীতার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো,
— তোমার স্কুলটা কোথায় বললে?
— শিলিগুড়ির একটু বাইরে। ছোট্ট একটা গ্রাম, কিন্তু খুব সুন্দর। বাচ্চাগুলোও খুব মিষ্টি।
— তোমার কি বাড়ি খুব মনে পড়ছে?
বিনীতা একটু থেমে বললো,
— হ্যাঁ… খুব। আসলে এতদিন পরে ফিরছি তো… মা-কে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। জানিয়েছি মাসীমণি জোর করে নিয়ে এসেছেন। যেতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তবুও কেমন যেন লাগছে।
তার চোখের কোণে যেন হালকা জল চিকচিক করে উঠলো, কিন্তু সে সামলে নিলো।
মামী সেটা লক্ষ্য করে বললেন,
— আরে বাবা, এত মন খারাপের কী আছে? একটা বেলা এখানে থাক, বিকেলে তোকে ঠিক পৌঁছে দেবো। তোর মাকে তো আমি সেকথা বলেই দিয়েছি। কিচ্ছু হবে না।
— জানি মাসীমণি… তবুও…
আনন্দি সঙ্গে সঙ্গে হাতটা ধরে বললো,
— আচ্ছা শোনো, একদম মন খারাপ কোরো না। আমরা দুপুরে অনেক গল্প করবো, তারপর ছাদে গিয়ে আমার বাগান দেখাবো। মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা তো। ও দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
 ছবিটা দেখার পর থেকে বিনীতার বাড়ি ফেরার তাড়ার থেকেও অনল কখন আসবে, কখন তার সাথে দেখা হবে, সে বিষয়টাকে কীভাবে ম্যানেজ করবে এগুলোই ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তার মনেহচ্ছে যদি তাকে কেউ আজ এখানে থেকে যেতেও বলে সে থেকে যাবে। জীবনের সবচেয়ে জট পাকানোর বিষয়টার একটা, দুটো জট যদি খুলতে পারে।
বিনীতা একটু হেসে বললো,
— ঠিক আছে, দেখি তুমি কতটা পারো!
খাওয়া শেষ হতেই সবাই একটু বিশ্রাম নিতে গেল। আনন্দি কিন্তু ছাড়ার পাত্র নয়। সে বিনীতাকে টেনে নিয়ে নিজের ঘরে গেল।
ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে বললো,
— এবার বলো, ওই ছবিটার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলে কেন? দাদাকে চেনো নাকি? নাকি দাদাকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেলে? 
কথাটা বলেই হাহা করে হেসে উঠলো।
বিনীতা চমকে উঠলো, এ মেয়ের মুখে তো কিছুই আটকায় না। মনেমনে নিজেকে সংযত করে নিজের মনে নিজেই বলল," বিনীতা খুব সাবধান। বেফাঁস কিছু বলে ফেলে ধরা পড়ে যেও না।"
— এ বাবা! কিসব প্রশ্ন? আসলে ছবিটা খুব সুন্দর উঠেছে। ব্যাকগ্রাউন্ডটাও খুব সুন্দর। এটাই মনেহচ্ছে ছাদের ফুলের বাগান তোমার।
-- হ্যাগো ছাদে তোলা এটা। তবে শোনো আমি সাইকোলজি নিয়ে পড়ছি। মানুষের মন বুঝতে পারি। 
তাই খুব তাড়াতাড়ি মানুষ চিনতে পারি। তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা আছে ব্যাপার। কী ব্যাপার বলো তো?
বিনীতা একটু চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো,
— একজন মানুষের সাথে তোমার দাদার চেহারার খুব মিল। তাই দেখছিলাম আর কি!
আনন্দির চোখ বড় হয়ে গেলো,
— ওহ্! মানে গল্পটা ইন্টারেস্টিং!
— ইন্টারেস্টিং না… একটু জটিল।
— নামটা বলবে কে সেই মানুষটা?
বিনীতা জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। দূরে রোদের আলো পড়েছে, হালকা বাতাস বইছে। সেই দিকে তাকিয়েই আস্তে করে বললো,
— অনেকদিন আগের কথা তো নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। আরে ছাড়ো এসব আমরা অন্য কথা বলি। 

আনন্দি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো। সে বুঝতে পারলো, এই নামটা না বলার মধ্যে অনেক না বলা কথা লুকিয়ে আছে। প্রথমদিনেই বেচারাকে আর ঘাটা ঠিক হবে না।
-- আমার পেট থেকে তো কথা বের করে চলেছ। এবার নিজের কথা কিছু বলো তো -
-- আমার কথা? কী জানতে চাও বলো। আচ্ছা আমিই বলছি। আপাতত জীবনে কেউ আসেনি। আসার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ 'নো এন্ট্রি ' সাইন বোর্ড ঝুলানো আপাতত। কারণ নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে চলার ইচ্ছা একদম নেই।
-- তুমি দারুন কথা বলো।
-- থ্যাঙ্ক ইউ,থ্যাঙ্ক ইউ ।তবে কী জানো আমার মতে জীবনে বিয়েটাই শেষ কথা নয়। 
-- কথাটা সত্যি হলেও মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে পরিবারের মানুষজন ভাবে মেয়েকে বিয়ে দিতেই হবে।
 প্রতিটা মুহূর্তই বিনীতা ভাবছে আনন্দি হয়ত ওর দাদার কোন প্রসঙ্গ তুলবে কিন্তু আলোচনাটা সেদিকে টাইতেই পারছে না। হঠাৎ আনন্দি বলে উঠলো,
-- আমি তো দাদাকে বলেই দিয়েছে তোর ইচ্ছে হলে তুই বিয়ে কর, সংসার কর আমার দ্বারা ওসব হবে না। আমি আমার মা,বাবা যতদিন বাঁচবেন তাঁদের কাছেই থাকবো।
-- শুনে দাদা কী বললেন?
-- আমার দাদার জীবনে বিয়ে,সংসার,সন্তান অনেক স্বপ্ন। বিয়ে নিয়ে যে সে কত স্বপ্ন দেখে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
-- তোমার নাম তো আনন্দি । তোমার দাদার নামটা কী?
-- দাদার নাম অনল।
 বিনীতার বুকের ভিতর ধক করে উঠলো। ঈশ্বরের কী লীলা দেখো। ঈশ্বর ঠিক তাকে সঠিক জায়গায় এনে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু কীভাবে এখন অনল এসে সবটা ম্যানেজ করবে? আজই সব সে বলে দেবে নাকি? একটা আশা আর অনেকটা ভয় মিলিয়েমিশিয়ে বিনীতা অপেক্ষা করে আছে কখন অনল ফিরবে।

  বিকেলের রোদ তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেটা ভাবলেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু হঠাৎ করে এই বাড়িতে উপস্থিত হওয়াটা যেন নতুন করে কিছু শুরু করার ইঙ্গিত দিচ্ছে… হবে কি জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে কাছে পাওয়ার অবসান? সে কি সেই দিনের কথা মনে রেখেছে? দিনান্তে একবারও কি সেই বিনীতা মেয়েটার কথা তার মনে পড়ে। পাবে কি সে আজ সব প্রশ্নের উত্তর?

ক্রমশ…

Friday, May 8, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (২১ পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২১)

    আজ রবিবার। অনলের অফিস নেই, তাই বাজারে যাওয়াটা যেন তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই এই অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে। বাড়ির সামনের ছোটখাটো জিনিসপত্র বাবা কিনে নিলেও, বড় বাজারটা অনলই করে।
  বাড়ি থেকে বেরিয়েই পাড়ার ক্লাব। প্রতিদিন সকালে ক্লাবের সামনে ছোট্ট একটা বাজার বসে—কেউ মাছ নিয়ে বসেছে, কেউ সবজি, কেউ বা ডিম। ভোরের হালকা রোদ, আর তার সঙ্গে মিশে থাকা কাঁচা মাছ আর ধনেপাতার গন্ধ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম সকাল।
অনল ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে এগোয়। কিন্তু আজ তার মনটা যেন কোথাও আটকে আছে। প্রতিটা মুহূর্তে মনে পড়ছে বিনীতার কথা।
কয়েকদিন হয়ে গেল, তবুও বিনীতার কোনও ফোন নেই।
— “আমি কি ফোন করবো?”
মনে মনে প্রশ্নটা আসে।
তারপরই নিজেই নিজেকে থামিয়ে দেয়—
— “না… ও আগে করুক। আমি কেন সবসময় আগে এগোবো?”
কিন্তু কথাগুলো যতই শক্ত করে ভাবুক, মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা থেকে যাচ্ছে।
“এই অনল! কী রে, আজ এত চুপচাপ?”
পাশ থেকে ডেকে ওঠে সঞ্জয়, পাড়ারই এক ছেলে, মাছ বিক্রি করে।
অনল একটু চমকে তাকায়—
— “না রে, কিছু না… কই, কেমন আছিস?”
সঞ্জয় হেসে বলে—
— “আমি তো ভালোই আছি। তুই বল, কেমন চলছে? শুনলাম বড় অফিসার হয়ে গেছিস!”
অনল হেসে উড়িয়ে দেয়—
— “ধুর, অফিসার আবার কী! চাকরি করছি, এই যা।”
মাছ নিতে নিতে অনল হঠাৎ খেয়াল করে, পাশেই এক মেয়ে দাঁড়িয়ে। সাদা-নীল সালোয়ার, চুলটা খোলা…
এক মুহূর্তের জন্য তার বুক ধক করে ওঠে—
বিনীতা!
কিন্তু না…
ভালো করে তাকাতেই বুঝতে পারে, সে অন্য কেউ। যাকে দেখে এখন প্রথমে তাকেই যেন অনলের বিনীতা বলে মনে হয়।
নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
সবজি, মাছ কেনা শেষ করে অনল যখন বাড়ির দিকে ফিরছে, তখন তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
“বিনীতা কি সত্যিই আমার কথা ভাবছে না?”
বাড়িতে ঢুকতেই মা জিজ্ঞেস করে—
— “এত দেরি করলি কেন রে?”
— “কিছু না মা, একটু ভিড় ছিল।”
মা আর কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
অনল নিজের ঘরে এসে ব্যাগটা রেখে বিছানায় বসে পড়ে।
টেবিলের উপর মোবাইলটা পড়ে আছে।
সে একবার সেটার দিকে তাকায়…
আবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ পর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে মোবাইলটা হাতে তুলে নেয়।
স্ক্রিন আনলক করে—
বিনীতা নামটা সে এতবার বের করে দেখেছে এখন নম্বরটা যেন মুখস্থ হয়ে গেছে।
আঙুলটা কল বাটনের উপর গিয়ে থেমে যায়।
— “না… আজও না।”
সে ফোনটা আবার রেখে দেয়।
ঠিক সেই সময়—
 এইভাবেই দিন গড়িয়ে যেতে থাকে। প্রতিটা মুহূর্ত প্রতিটা ক্ষণ বিনীতা অনলের মনপ্রাণ জুড়ে থাকলেও সে কেন যেন নিজের ইগো ঝেড়ে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছে না। অনলের এই ইচ্ছের বাধা পাওয়াটাকে ঠিক ইগোও বলা যায় না। কোথাও একটা লজ্জাও কাজ করে তার ভিতর। শত হোক সে একজন পুরুষমানুষ। 
 অফিস থেকে একদিন ফিরে আসার পর মা বেশ খুশি খুশি হয়ে অনলকে বলেন,
-- হ্যাঁরে দুয়েকদিনের মধ্যেই তোর মামা,মামী আসবেন আজ ফোন করে বললেন।
সেদিনের সেই উচ্ছ্বলতা অনলের মধ্যে ছিল না। সে চা খেতে খেতে বলল,
-- তাহলে কালকে অফিস যাওয়ার আগে কি একবার বাজার যাবো?
মা খুব খুশি হয়ে বলেন,
-- তাহলে তো খুব ভালো হয় বাবা।আমি তো ভয়ে তোকে বলতেই সাহস পাচ্ছিলাম না।
-- তুমি আবার কবে থেকে আমায় ভয় পেতে শুরু করলে?
-- বাবা আজকাল তুই যা গম্ভীর থাকিস। দশটা কথা বললে একটার উত্তর দিস আর বাকি ন'টা হাওয়ায় ভেসে যায়।
-- মা, তাহলে বোধহয় আমি কানে কম শুনছি। তুমি কথা বলছো আর আমি উত্তর দিচ্ছি না তোমার বোঝা উচিত ছিল 
 এরপর হাসতে হাসতে বলে,
-- তাহলে একজন ইএনটি আমায় দেখাতেই হবে
  পরদিন একটু সকালে উঠে অনল বেশ কিছু বাজার করে মায়ের হাতে দিয়ে বলে,
-- আমার জন্য তাড়াহুড়ো করার কোন দরকার নেই। তুমি ধীরে সুস্থে সব করো।আমি নাহয় বাইরে কিছু খেয়ে নেবো। তাছাড়া এখন খেতে গেলে দেরিও হয়ে যাবে।
-- তোর অফিসের রান্না আমি কল রাতেই করে রেখেছি। সকালে উঠে শুধু ভাত করলাম। ঝট করে স্নান সেরে টেবিলে চলে আয়। সব রেডি। 
-- সে কী?
 -- আমার ছেলে না খেয়ে অফিস চলে যাবে আর আমি আমার ভাই ,ভাইবউয়ের জন্য তরিজুট করে রান্না করবো অত ভালো মানুষ আমি হয়ে পারিনি। আমার ছেলেমেয়ের ব্যাপারে আমি একটু একচোখা।
অনল মাকে জড়িয়ে ধরে মুখে একটা চুমু করে বলে,
-- সেইজন্যই তো তুমি আমার বেস্ট মা। 
 স্নানে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলতে থাকে,
-- ওকে, তবে তাই হোক। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মায়ের বাধ্য ছেলে হয়ে স্নান সেরে টেবিলে চলে আসছি।
 অনল স্নানে চলে যাওয়ার পর তার মায়ের সেলে ভাইবউয়ের ফোন আসে। দিদি আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার বাড়ি পৌঁছে যাবো। কাল তোমায় একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। দিদি, আমাদের সাথে একটি মেয়ে যাবে। ও আমার ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে। ওর সাথে হঠাৎ দেখা হল শিলিগুড়ি এসে। তোমায় গিয়ে সব বলবো। আমি বলেছি ওকে দুপুরে খেয়েদেয়ে যেতে। দিদি কোন অসুবিধা হবে নাতো?
-- আরে কিসের অসুবিধা? এমন করে বলছো যেন বিশাল এক অপরাধ করে ফেলেছ। কতদূরে আছো? আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি কখন তোমরা আসবে? সাবধানে এসো। রাখি কেমন?
 অনল তড়িঘড়ি স্নান সেরে একবারে জামাপ্যান্ট পরেই টেবিলে এসে কোনরকমে গোগ্রাসে খেতে লাগলো। মা এসে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে বললেন,
-- বৌদি বলল ওদের সাথে বৌদির ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে আসছে। চলে যাবে থাকবে না।
-- মা এখন কোন কথা শুনবো না। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। অফিস থেকে ফিরে সব শুনবো।
-- আচ্ছা আচ্ছা তুই সাবধানে যাস আসিস।
 অনল ছুটে ছুটে তার কাজগুলো সেরে দৌড়াতে দৌড়াতে বেরিয়ে গেলো। মা তার এই ছুটে বেরিয়ে যাওয়া দেখতে পেয়েই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন,
-- ও-রে এত তাড়াহুড়ো করিস না। সাবধানে চলাচল করিস। পারলে একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস। দুগ্গা দুগ্গা বলে মা হাত কপালে ঠেকালেন।
 দুপুর আড়াইটা নাগাদ বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠলো। আনন্দি বাড়িতে নেই। অনলের বাবা খেয়েদেয়ে একটু শুয়েছেন। বেলের আওয়াজ শুনেই অনলের মা দৌড়াতে দৌড়াতে দরজা খুলতে চলে এলেন। দাদা বলে কথা। ছেলেবেলার সেই কাঁচামিঠে সম্পর্কগুলো কখনোই ভোলা যায় না। বয়স বারুক, যুগযুগ ধরে দেখা না হোক ঠিক যেন হিরের আংটি ভাইবোনের সম্পর্কগুলো।
 দরজা খুলেই দাদাকে জড়িয়ে ধরা, নিচু হয়ে দাদাকে প্রণাম করা, (বৌদি সমবয়সী হওয়াতে প্রথম থেকেই প্রণাম নেন না) হাহা করে কথা বলা সে এক অন্য অনুভূতি। যাদের ভাই কিংবা দাদা নেই সত্যিই কিন্তু তারা এসব থেকে বঞ্চিত আর এর মজাটাও জানতে পারে না। 
 অনলের বাবা শ্যালকের আগমন টের পেয়ে আস্তে আস্তে উঠে এই বিশাল যজ্ঞে সামিল হলেন। ওদের সাথেই একটি বাইশ,চব্বিশ বছরের মেয়ে, দেখতে বেশ মিষ্টি ঢুকে অনলের বাবা,মাকে প্রণাম করে ওদের পিছুপিছু এসে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে থাকে চুপচাপ। দাদা আর বোনের গল্প আর চিৎকার, চেঁচামেচিতে অন্য সকলের গলার আওয়াজ শোনা যেমন যাচ্ছে না তাদের হাসাহাসিতে অন্য কেউ কথাও বলতে পারছে না। সেই ছেলেবেলায় কে কবে কাকে মেরে ফুলিয়ে দিয়েছে, বাবার কাছে নালিশ করে কে কাকে মার খাইয়েছে কিছুই বাদ যাচ্ছে না।
 অনন্দী এসেই মামা,মামীকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। পাশে অচেনা মেয়েটিকে দেখে জানতে চায়
-- উনাকে তো চিনতে পারছি না
 সঙ্গে সঙ্গেই মামী ওকে জানান --

ক্রমশ

Wednesday, May 6, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২০)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২০)

  অনলের প্রতিক্ষণে বিনীতার কথা মনে পড়ে। মাত্র কটা মাসের মধ্যে অদেখা অচেনা বিনীতাকে অনল বোধকরি খুব ভালোভাবে স্ট্যাডি করতে পেরেছে । কোন অবস্থাতেই যে বিনীতা ইগো ঝেড়ে মাথা নোয়াবে না এটা অনল খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে। এই ঘটনার উপর দু'জনের কারোরই হাত ছিল না এটা সত্যি কিন্তু ঘটনার সমাধান সূত্র বের করতে গেলে একজনকে এগিয়ে যেতেই হবে। তবে সেটা বিনীতা কিছুতেই হবে না। প্রতি মুহূর্তে অনল ভেবে চলেছে কীভাবে এর সমাধান পাওয়া যায়। সব মানুষের ভিতর সব গুন থাকে না। বিনীতা যে সবগুনের অধিকারিণী তাতো নয়। 
  অনল উদাস হয়ে জানলার দিকে তাকায়। অনলের ঘরের দক্ষিণের কোন দেওয়াল নেই।পুরোটাই জানলা। বহু পুরোনো বাড়ি। তখন বাড়িতে ইলেকট্রিক ছিল না। তাই অনলের দাদু তাঁর ছেলে অর্থাৎ অনলের বাবার জন্য দক্ষিণের ঘরটা করেছিলেন। এইভাবে যাতে গরমে কোন কষ্ট না হয়। পুরো জানলাগুলি কাঠের। প্রথমে দাদু, বাবা বড় হলে বাবা আর এখন অনল এই ঘরের মালিক। এখন সবগুলো জানলা খোলা, বন্ধ করাও একটা ঝক্কি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 রাত অনেক হয়ে গেছে। চারদিক নিস্তব্ধ। জানলার বাইরে আকাশটা ফাঁকা, কিন্তু অনলের মনটা যেন ভীষণ ভারাক্রান্ত। বারবার শুধু একটা মুখই ভেসে উঠছে—বিনীতা।
অনল বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে বলে উঠলো,
— “তুমি এত কঠিন কেন বিনীতা?”
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেই উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করে।
— “না, কঠিন নয়… তুমি আসলে নিজের জায়গায় অটল। তুমি কাউকে এত সহজে তোমার ভিতরে ঢুকতে দাও না।”
অনল চোখ বন্ধ করে। গত কয়েক মাস আগে বিয়ের দিনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো একে একে ভেসে ওঠে—বিনীতার হাসি, তার চুপ করে থাকা, বৌ সাজে  ঘর থেকে বেরিয়ে দৃঢ়তার সাথে তার কথা বলা , আবার অকারণে চুপ হয়ে যাওয়া।
— “তোমার এই ইগোটা আসলে ইগো নয়… এটা তোমার আত্মসম্মান।”
নিজের সঙ্গেই কথা বলতে থাকে অনল।
— “তুমি হয়তো ভাবছো, আগে এগিয়ে গেলে তুমি ছোট হয়ে যাবে… কিন্তু তুমি কি জানো, এই চুপ করে থাকাটাই আমাদের আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে।
— “তোমারও তো কষ্ট হচ্ছে… আমি বুঝি। কিন্তু তুমি সেটা কাউকে দেখাতে চাও না। নিজের ভেতরেই সব চাপা রাখো।”
হঠাৎ উঠে বসে অনল। যেন একটা সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।
— “না, এভাবে আর চলতে পারে না। যদি কেউ এগিয়ে না আসে, তাহলে সবকিছু এমনই ঝুলে থাকবে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলে,
— “তুমি না পারো, আমি পারি। কারণ ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে অহংকারের চেয়ে সেটা বড় হওয়া উচিত।”
অনল ফোনটা হাতে তুলে নেয়। অনেকক্ষণ ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিনীতার নামটা যেন তাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
আঙুলটা কল বাটনের উপর গিয়ে থেমে যায়। 
বিনীতার নম্বরটা না চাইতেই অনল পেয়ে গেছে বিজয়ের কাছ থেকে। সেদিনের কথার পরেই বিজয় নম্বরটা তাকে ওয়াটসঅ্যাপ করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই অনল নম্বরটা সেভ করে নিয়েছে। কিন্তু ফোন করা আর হয়ে ওঠেনি। প্রায় প্রতিদিনই সে ফোন করবে ভেবেও ফোন করে উঠতে পারে না। 
— “যদি তুমি ফোনটা না ধরো?”
মনে একটা অজানা ভয় কাজ করে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে।
— “তবুও চেষ্টা করতে হবে…”
ঠিক সেই মুহূর্তে—
ফোনটা হঠাৎ বেজে ওঠে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটা নাম—
 উফ্ আবার কৌশিকী। যখনই অনল বিনীতার ফোনের অপেক্ষায় থাকে এই কৌশিকী কেন তাকে ফোন করে বসে? নাহ্ এই মুহুর্তে আমি কিছুতেই কৌশিকীর ফোন ধরবো না।ভালোবাসার মানুষের কথা ভাবতে লাগলেও একটা সুন্দর অনুভূতি থাকে। সেই অনুভূতিকে কিছুতেই আমি নষ্ট হতে দেবো না। 
অনল কৌশিকীর ফোনটা ধরে না।

 বিছানায় শুয়ে অনল বারবার মোবাইলটা হাতে নিচ্ছে, আবার রেখে দিচ্ছে। স্ক্রিনটা নিঃশব্দ, তবুও যেন সে অপেক্ষা করছে—একটা নাম জ্বলে ওঠার জন্য।
বিনীতা।
মনে মনে বলে ওঠে,
— “তুমি কি একবারও ভাবছো না আমার কথা?”
তারপরই নিজের কথাতেই যেন থমকে যায়।
— “না… তুমি ভাবছো। কিন্তু তুমি আগে এগোবে না।”
অনল উঠে বসে। জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরের অন্ধকারে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিনীতাকে যেন আরও পরিষ্কার বুঝতে পারে।
— “তোমার এই চুপ করে থাকাটা… এটা রাগ নয়, এটা অভিমান।”
মৃদু হেসে ফেলে সে।
— “আর সেই অভিমানের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ভালোবাসা… যেটা তুমি কিছুতেই স্বীকার করতে চাও না।”
হঠাৎ একটু কষ্ট মেশানো গলায় বলে ওঠে,
— “কিন্তু আমিও তো মানুষ বিনীতা… আমিও তো চাই তুমি একবার আমায় ফোন করে কিছু বলো
ঘরের ভেতর রাতের নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে ওঠে।
অনল আবার ফোনটা হাতে নেয়। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে। আঙুলটা ধীরে ধীরে কল বাটনের দিকে এগোয়… তারপর থেমে যায়।
— “না… যদি সবকিছু আমার দিক থেকেই শুরু হয়, তাহলে তুমি কখনোই বুঝবে না আমার না থাকাটার মূল্য।”
ফোনটা আবার রেখে দেয়।
— “এইবার তুমি বোঝো…”
চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে অনল। কিন্তু ঘুম আর আসে না। দু’জনের মাঝখানে জমে ওঠা নীরবতাটা যেন আরও বড় হয়ে ওঠে।
 কৌশিকী বারবার ফোন করছে। মেয়েটা কী চায় তার কাছে? অফিস থেকে রিজাইন দিয়ে চলে গেছে প্রায় মাস দু'য়েক। এমন কিছু বন্ধুত্ব তার সাথে গড়ে ওঠেনি অনলের। তবুও কেন সে বারবার ফোন করে? কী বলতে চায় সে? সত্যি আজ অনলের মনে হচ্ছে কে যেন বলেছিলেন মেয়েদের মন বোঝা দেবতারও অসাধ্য! আজ তাকে সামনে পেলে গড় হয়ে একটা প্রণাম করতাম!
সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়, কিন্তু অনলের কাছে সবকিছু যেন অস্বাভাবিক লাগছে। ঘুম থেকে উঠেও যেন সে ফ্রেস হতে পারেনি।
 ব্রাশ করে প্রাত্যহিক কাজ সেরে মায়ের কাছে চা চাইতে গিয়ে দেখে চা একদম রেডি। মা বেশ খুশি খুশি। চা ' টা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
-- জানিস দশ বছর পর বড়দা দেশে ফিরেছেন?
-- বাহ্ এত খুব খুশির খবর
অনলের বড়মামা লন্ডনপ্রবাসী। অনেকদিন তিনি এদেশে আসেননি। মায়ের ঠিক হিসাব আছে বছর দশেক আগে একবার ফিরেছিলেন। মায়ের বাবার বাড়িতে আজ আর কেউ নেই। মায়েরা এই দুই ভাইবোন  বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়ে গেছেন শেষবার এসে মামা। মামা এসেছেন শুনেই অনলের মনের ভিতর একটা খুশির ঝলক দিয়ে উঠলো। হ্যাঁ মামা আসলে তো তাঁর শ্বশুরবাড়ি উঠবেন আর সেটা তো শিলিগুলি। বিনীতাও শিলিগুড়ি। কোথাও যেন একটা মিলনের সুর বাজছে অনলের মনের মধ্যে। সে আনন্দের সঙ্গে জানতে চাইলো 
-- মা মামাকে কি আনতে যেতে হবে?
-- ওমা! সে কেন? সবে সকালে ল্যান্ড করেছেন। হয়ত এখনো শ্বশুরবাড়ি পৌঁছেই পারেনি। তোর মামী এত তাড়াতাড়ি তাকে ছাড়বে কলকাতায়?
 যেন আগুনে জল পড়লো। অনল তখন বললো,
-- তাহলে মামা কি একা আসবেন?
-- কেন সাথে তো তোর মামীও আসেন।
 অনল যে অ্যাঙ্গেলে প্রশ্নটা জানতে চেয়েছিল উত্তরটা দিলেন মা একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে।সে আর কিছু না বলে চায়ের কাপটা নিয়ে ডাইনিংয়ে এসে বসলো।
 আনন্দি হঠাৎ এসে সেখানে বসে পড়লো।
-- হ্যাঁরে দাদা আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করছি তুই সেই যে বিয়ে বাড়িতে বেড়াতে গেলি সেখান থেকে ফেরার পর থেকে কেমন যেন একটু চুপচাপ হয়ে গেছিস। ওখানে সবকিছু ভালোভাবে মিটেছে? তুই কি কিছু লুকাচ্ছিস আমাদের কাছ থেকে?
-- তোর এরকম মনে হওয়ার কারণ কী জানতে পারি?
-- না আসলে আমি তো আমার দাদাকে ভালোভাবেই চিনি। বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই তোর ভিতর সেই আগের উচ্ছ্বলতা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু আমি কেন মা'ও সে কথাই বলছিলেন।
-- ঘটনা কিছু ঘটেছে। তবে সেগুলো বলার সময় আসেনি।
-- দেখ তাহলে। আমরা তো তোকে চিনি রে! যদি তোর কোন তাড়া না থাকে তাহলে তোর সময়মত সব জানাস।
-- জানাবো, তোকেই আগে সব জানাবো। কিন্তু আমায় একটু সময় দে। আগে ব্যাপারটা নিজে ভালোভাবে বুঝি।

ক্রমশ