ভালোবার নীল আকাশ (অষ্টম পর্ব)
প্রতিটা মুহুর্তে অনল অপেক্ষা করে আছে এই বুঝি বিনীতার ফোন আসবে। কিন্তু ভাবাই সার। অনলও চাইছে না বিজয়ের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে সে বিনীতার সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু অনলের মনের মধ্যে যে ভালোবাসার বীজ বপন হয়েছে তা আস্তে আস্তে অঙ্কুরোদগম হতে চাইছে। কিন্তু কোথায় যেন একটা বাধা এসে দাঁড়াচ্ছে সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছে না। এই বাধা কাটিয়ে সে কিছুতেই নিজের ইগো ঝেড়ে বিনীতার সাথে যোগাযোগ করতেই পারছে না। বিনীতার দিক থেকে কোন সাড়া না পেলে অনল যে এই বাধা কোনদিনও কাটিয়ে উঠতে পারবে না এটা সে ভালোভাবেই বুঝে গেছে।
পরদিন যথারীতি অফিস পৌঁছে যায় অনল। কিছুক্ষণ আগেই কৌশিকী অফিস এসেছে। অনল তাকে দেখতে পেয়েই বলে,
-- হ্যাঁ বলো কাল কেন ফোন করেছিলে?
-- আরে বলবো ,বলবো। সবে তো ঢুকলে একটু বিশ্রাম নাও।
অনল সেকথার কোন উত্তর দেয় না। নিজের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে ড্রয়ার খুলে একটা ডাসটার বের করে টেবিলটা মুছে হাত ধুতে উঠে যায়। অনল চলে যাওয়ার পর কৌশিকির পাশে বসা কলিগ তরুণ বলে,
-- হ্যাঁরে কৌশিকী, অনলকে আজ একটু অন্যরকম লাগছে না? ও তো খুব হাসিখুশি। আজ যেন একটু গম্ভীর লাগছে?
কৌশিকী হালকা হেসে বলল,
— লাগছেই তো। কাল ফোন করেছিলাম, ধরল না। আজকে এসে এমন ভাব করছে যেন কিছুই হয়নি।
কলিগটা একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
— কিছু হয়েছে নিশ্চয়ই। না হলে অনল এমন চুপচাপ থাকে নাকি! প্রেমে পড়েছে বোধকরি
কথাটা বলেই তরুণ হাসতে থাকে।
কৌশিকী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। যেন সে নিজেও বুঝতে পারছে, অনলের ভিতরে কিছু একটা বদলে গেছে। গতকাল রাতেই ফোন করে অনলের মধ্যে সেই উচ্ছ্বলতা না পেয়েই নিজের জীবনের সুখবরটা সে দিতে পারেনি।
প্রথম দিন থেকেই অনলের প্রতি অদ্ভুত একটা টান অনুভব করে কৌশিকী। সে টান যে ভালোবাসার সে কৌশিকী ভালোই বুঝতে পারছে। তাই অফিসের অন্য কাউকে খবর দেওয়ার আগে সে প্রথম ফোনটা অনলকেই করেছিল। কৌশিকিও এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কিছুটা উদাস হয়ে যায়।জানলা দিয়ে তাকায়। আজকে আকাশটা একটু যেন বেশি নীল। তার জীবনে ভালোবাসার এই নীল আকাশ কোন সুখবর বয়ে আনবে কি কোনদিন? অনল কি বুঝতে পারবে আদতেও তার নীরব এই ভালোবাসার কথা।
কৌশিককে চুপ করে যেতে দেখে তরুণ বলে ওঠে,
-- আরে তুমি কোথায় হারিয়ে গেলে? তোমার মাথার মধ্যে অন্য কিছু ঘুরছে আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু সেটা কী সেটা বুঝতে পারছি না। তুমিও কি প্রেমে পড়লে নাকি?
তরুণ বেশ জোরেই হেসে ওঠে। মুহূর্তেই এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপ করে যায়। কারণ তার এই হাসির আওয়াজে অনেকেই তার দিকে তাকিয়ে পড়ে।
কৌশিকী উত্তর দেওয়ার আগেই অনল হাত ধুয়ে ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসে ফাইল খুলে কাজ করতে লাগল। কিন্তু কাজের প্রতি তার মনোযোগ নেই বললেই চলে। চোখ ফাইলে থাকলেও মনটা যেন কোথাও দূরে— সেই দূরটা বিনীতার কাছে কিনা অনল নিজেও হয়ত তা জানে না। হঠাৎ করে জীবনের উপর থেকে যে মস্তবড় একটা ঝড় বয়ে গেছে সেই ঝড়ের তান্ডব এখনো অনলের বুকের ভিতর চলছে। একটা বিশাল ক্ষত অনলের জীবনের উপর তৈরি করে দিয়ে গেছে যে ঝড় সে ক্ষত কতদিন, কীভাবে বয়ে বেড়াতে হবে অনলকে তা সে সত্যিই জানে না। হয়ত সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যায় ঠিকই কিন্তু সেটা কত দিন,কত মাস কিংবা কত বছর?
হঠাৎ করে অনলের এই পরিবর্তনটা কৌশিকীর নজর এড়ালো না। সে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে
বলল,
— এই অনল, কাল তোমায় একটা দরকারেই ফোন করেছিলাম। উহু ঠিক দরকার নয় ; আসলে একটা খবর দিতেই ফোনটা করেছিলাম।
অনল ফাইল থেকে মুখ না তুলেই বলল
-- হ্যাঁ বলো, কী খবর দিতে ফোন করেছিলে? আমি তো এসেই জানতে চাইলাম।
-- তুমি কী কোন কারণে আজ ডিস্টার্বড?
অনল এবার ফাইল থেকে মুখ তুলে কৌশিকীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
-- না,না বলো।ঠিক আছি।
-- আমি অন্য একটা চাকরিতে জয়েন করছি।
-- মানে?
-- তুমি তো জানো আমার মা,বাবা শিলিগুড়িতে থাকেন। এখানে একটা বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকি। প্রথম থেকেই চেষ্টা ছিল স্কুল কিংবা কলেজে পড়াবো। প্রচুর পরীক্ষা দিয়েছি তারজন্য। অবশেষে শিলিগুড়ির একটা স্কুলে সুযোগ পেয়ে গেলাম।
কৌশিকী এতগুলো কথা বলল ঠিকই কিন্তু অনলের কান অব্দি সব কথা পৌঁছালো না। সে ওই শিলিগুড়িতেই আটকে রইলো। সে শুধু জানে বিনীতা শিলিগুড়িতে থাকে কিন্তু কোথায় থাকে সেটা তো জানে না।
-- অনল তুমি কি আমার কথাগুলো শুনলে? কোন উত্তর দিলে না তো?
-- খুব ভালো খবর শোনালে। তা কবে যাচ্ছ শিলিগুড়ি? যাক আমাদেরও একটা ঘোরার জায়গা হল। কোথায় চাকরি পেলে? স্কুল নাকি কলেজ?
কৌশিকী বুঝতে পারে তারমানে অনল মন দিয়ে তার কথাগুলো শোনেনি।অনলের এভাবে নির্লিপ্ত কথাবার্তা কৌশিকীর ভালো লাগলো না। তবুও কথার উত্তর দিতে হয়।সে অনলকে জানালো একটা স্কুলে সে চাকরিটা পেয়েছে। আর "কবে যাচ্ছ?" এই উত্তরটা ঠিক এভাবেই দিলো,
-- যত তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় তত তাড়াতাড়িই যাবো। কারণ এখানে কিছুই আমার নেই। না আছে বিশেষ কোন জিনিসপত্র না আছে ভালোবাসার কোন মানুষ যে আমি চলে গেলে সেই মানুষটি কষ্ট পাবে। এই ধরো কাল কিংবা পরশু।
অনল তার কথার হালকাভাবে ধরে নিয়ে উত্তর দিলো,
-- সেটা ঠিক কথা। তোমার সবাই তো শিলিগুড়িতে। খুব ভালো হল জানো। তবে আমাদের একদম ভুলে যেও না।
-- হু তোমার মানে তোমাদের কি আমার কথা মনে পড়বে?
-- মনে তো পড়বেই। তবে কি জানো -- ব্যস্ত জীবনে মানুষ হচ্ছে সময়ের দাস। আজ যা ভীষণভাবে মনে পড়ছে, ধরো কারো জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে কাল যখন অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে তখন আজকের কথাগুলো মনে করার সময়ই পাবে না। তবে এমন কিছু কিছু ঘটনা আছে যা শত চেষ্টা করেও ভুলে যাওয়া যায় না।
-- কী ধরণের ঘটনা সেগুলো?
-- এসব ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না কৌশিকী। হঠাৎ করে জীবনে এমন কিছু কিছু ঘটনা ঘটে যায় যার জন্য তুমি মোটেই প্রস্তুত ছিলে না। অথচ ঘটনাটি তোমার জীবনে ঘটলো। ইচ্ছা কিংবা আনিছাতে তুমি এমনভাবে কোন ঘটনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলে যা তোমার স্বপ্নেরও অতীত ছিল। তখন তোমার জীবনটা হয়ে যাবে ঠিক যেন শাখেরকরাত।
বুদ্ধিমতী কৌশিকী বুঝতে পারে অনলের জীবনে এমন কিছু ঘটেছে যা সে না পারছে কাউকে বলতে কিংবা না পারছে সেই সমস্যার সমাধান করতে। কিন্তু কী সেই গোপন সত্য অনলের জীবনে? কৌশিকী কি কোনদিনও সেই সত্যের সামনাসামনি হতে পারবে? অনলের জীবনের সেই সত্য রহস্যের উদঘাটন কৌশিকী কীকরে করবে? যদি না অনল নিজের থেকে কৌশিকীকে সবকিছু জানায়?
কৌশিকী অনলের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে বলে,
-- আমি বুঝতে পারছি তোমার জীবনে এমন কিছু ঘটেছে যা তুমি ভাবতে পারোনি।কিন্তু সেটা ঘটেছে। যদি তোমার মনেহয় আমায় সবকিছু খুলে বলতে পারো। একজন বন্ধু হিসাবে কিছু সাহায্য তো করতেই পারি। নিদেনপক্ষে কোন সমাধানের পথও তো বাতলে দিতে পারি?
-- আরে না,না। আমি তো কথার কথা বলেছি। এই তো বিয়েবাড়ি গেলাম আনন্দ,ফুর্তি করলাম; গতকাল ফিরেছি। আজ সোজা অফিস।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললো,
-- তোমার চাকরির খবরটা শুনে ভীষন আনন্দ পেলাম। এই, তোমার বাড়ির অ্যাড্রেস্টা দিয়ে যেও।
-- কেন? যাবে নাকি আমার বাড়িতে?
-- হু যেতে পারি তো। একদিন ঘুম থেকে সকালে উঠে দেখলে আমি হাজির।
-- তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করবো।
-- না,না ওসব ধন্য, তন্য নয়। পেট পুরে খাওয়াবে।
কথা বলতে বলতেই কৌশিকীর পাশের কলিগকে বলে,
-- তরুণ শুনেছ? আমাদের কৌশিকী এখন স্কুলের ম্যাডাম হয়েছেন।
-- তা কৌশিকী মাইনে তো স্কুলে অনেক কম এখান থেকে।
-- কী আর করা যাবে বলো? মা,বাবার একমাত্র সন্তান। তাদের আদেশ। মেয়ে বাড়ি থেকেই অফিস কিংবা স্কুলে যাতায়াত করবে।
অনল হঠাৎ বলে উঠলো,
-- অনেক গল্প হল। এবার অফিসের কাজে মন দিই।
কৌশিকী হাসতে হাসতে বলে ওঠে,
-- আমার কিন্তু মনে হচ্ছে অফিসের কাজে মন দিলেও মনটা বড়শিতে গাঁথতে পারবে না। আমি শিওর মনটা তোমার অন্য কোথাও গেঁথে আছে।
অনলের বুকটা ধক করে উঠলো। তবুও নিজেকে সংবরণ করে হেসে উঠে বলল,
-- কী যে উল্টোপাল্টা তুমি বলো -।
ক্রমশ