গাড়ি স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল। গাড়িটা প্লাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরও অনল সেদিকে তাকিয়ে থাকলো। অথচ এটা কিন্তু অনলের ক্ষেত্রে হওয়া উচিত হয়নি। কারণ কালকেই মাত্র বিনীতার সাথে তার পরিচয়। আর বিয়ে নামক একটা প্রহসনের মধ্যে পড়ে যেন কোথা থেকে সব কি হয়ে গেল। এই এক রাতেই দু'টো অপরিচিত ছেলে মেয়ের জীবনে কত কিছু ঘটে গেল। কিন্তু কেউই এর জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। ছিল না কোনো পরিচয়, ছিল না কোন জানাশোনা অথচ বিয়ের সামান্য কটা মন্ত্র দু'টো মানুষকে যেন অনেকটা কাছে এনে দিয়েছে। কেউই এই বিয়েটাকে তেমন প্রাধান্য না দিলেও কেউই কিন্তু মন থেকে বিষয়টাকে তাড়াতেও পারছে না।
অনলের ফোন নম্বারটা বিনীতাকে দেওয়ার পর সে ভেবেছিল বিনীতা নিশ্চয়ই একটা কল করে তার নম্বরটা অনলকে দেবে। সে বারবার ফোনটাকে পকেট থেকে বের করে কোন মিসড কল এসেছে নাকি দেখতে থাকে। সে বাসে বসে নানান কথা ভাবতে থাকে। কী এমন আছে বিয়ের ওই মন্ত্রতে। এই মন্ত্রগুলো উচ্চারণ করার সাথে সাথে কোন জাদুবলে বিনীতার প্রতি অদ্ভুত এক টান অনুভব করছে। মানুষ বলে, জীবনে যা ঘটে তার সবটাই নাকি ভবিতব্য অর্থাৎ ঈশ্বর আগে থাকতেই সবকিছু নাকি ঠিক করে রাখেন। সত্যিই কি এটা তার জীবনে ঘটবে বলেই আজ এতদিন বাদে তার বিজয়ের সাথে দেখা হল?বন্ধুর বোনের বিয়েতে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে বিয়ে করে ফিরবে এটা যে তার স্বপ্নেরও অতীত ছিল। বিয়ে নিয়ে সব মানুষেরই কিছু স্বপ্ন থাকে অনলও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব হল? এই বিয়ের সম্পর্কে সে তার বাবা-মা বোনকে কবে জানাতে পারবে কিভাবে জানাতে পারবে সেটা ভাবতে ভাবতেই সে তার নির্দিষ্ট স্টপেজে এসে যায়।
বাবা মা উভয়েরই বয়স হয়েছে। বোনটার এখনো লেখাপড়া শেষ হয়নি। এরপর হায়ার স্টাডি, তারপর বিয়েথার একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু এর মধ্যে তার নিজের জীবনে উপর দিয়ে যে ঝড়টা বয়ে গেল তার সাথে যে আরেকটি মেয়ে জড়িত। অর্থাৎ বাবা, মা, বোন ছাড়াও তার ভাবনার আকাশে আরও একজন যুক্ত হল।সেই মেয়েটার জীবনটাকে নিয়েও তাকে এখন ভাবতে হবে। চাকরিটা পাওয়ার পর প্রচুর ভাবনার উপর কিছুটা প্রলেপ পড়েছিল। কিন্তু এখন যেন সেই ভাবনা পুণরায় দ্বিগুণ পরিমাণ বেড়ে গেলো।
বাসটা ধীরে ধীরে স্টপেজে ঢুকতেই অনল যেন হুঁশে ফিরল। কন্ডাক্টরের ডাকে চমকে উঠে নেমে পড়ল। চারপাশের চেনা রাস্তাঘাট, দোকানপাট—সবই আগের মতোই আছে, অথচ তার ভেতরের পৃথিবীটা যেন এক রাতেই বদলে গেছে।
বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই মা দরজা খুলে দিলেন।
— “এত দেরি হল রে? বিজয়ের বাড়ির অনুষ্ঠানটা খুব জমেছিল বুঝি?”
অনল এক মুহূর্ত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল, এখনই সব বলে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই গলা শুকিয়ে গেল।
— “হ্যাঁ মা, একটু কাজকর্ম ছিল… তাই দেরি।”
মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। কিন্তু অনলের চোখ এড়াল না, বাবার চশমার ফাঁক দিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টি। সে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। পকেট থেকে ফোনটা বের করল আবার। এখনও কোনো মিসড কল নেই।
হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে।
তাহলে কি বিনীতা সত্যিই এই বিয়েটাকে কেবল একটা বিপদ থেকে বাঁচার উপায় হিসেবেই দেখেছে? তার মতোই কি সেও দ্বিধায় আছে?
ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।
অজানা নম্বর।
অনলের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে রিসিভ করল।
— “হ্যালো…”
ওপাশে সামান্য নীরবতা। তারপর খুব চেনা, মৃদু কণ্ঠস্বর—
-- আমি কৌশিকী বলছি। চিনতে পারছেন?
অনল ভেবেছিল ফোনটা বিনীতা করেছে। মনটা তার খুব খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু এরূপ হওয়ার তো কোন কারণ নেই। কেন বারবার বিনীতার কথা তার মনে পড়ছে? সেতো দু'দিন আগে বিনীতাকে চিনতোই না। মানুষ বলে প্রেম প্রথম দেখাতেই হতে পারে। তবে কি সে বিনীতাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
ওপাশ থেকে পুণরায় ভেসে আসে
-- হ্যালো চিনতে পারছেন না?
অনলের সম্বিৎ ফেরে। সে বলে,
-- হ্যাঁ চিনবো না কেন? আসলে একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। আর খুব টায়ার্ড তো।
-- ও আপনি বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেছিলেন তো। ঠিক আছে আমি তবে অন্য সময় ফোন করবো।
-- না না অসুবিধা নেই। আপনি বলুন কেন ফোন করেছেন?
-- না, থাক কাল তো নিশ্চয় অফিস আসছেন। তখন তো দেখা হচ্ছে তখনই বলবো। আপনি রেষ্ট নিন।
কৌশিকী ফোনটা কেটে দিলো। অনলের মাথায় ঢুকলো না কেন কৌশিকী তাকে ফোন করলো আর কেনই বা কোনকিছু না বলেই ফোনটা কেটে দিলো।
অফিসে অনলের পাশের চেয়ারেই বসে কৌশিকী। ডানাকাটা পরি না হলেও তাকে দেখতে সুন্দর। তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে মেয়েটি খুবই স্মার্ট। প্রথম দিন থেকেই অনলের সাথে তার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে
গেছে।
ফোনটা টেবিলের উপর রেখে অনল স্নান করতে বাথরুমে ঢুকলো। সকালে বেরোনোর আগে একবার স্নান করেছে। কিন্তু ওর এই এক স্বভাব। বাড়িতে থাকলে একবার স্নান করলে যদিবা চলে ; বাইরে বেরোলে বেরোনোর আগে একবার আর বাড়িতে ফিরে একবার স্নান করতেই হবে। তানাহলে ওর নাকি গা ঘিনঘিন করে, রাতে ঘুম হয় না। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়লেও এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম নেই। স্নান করে ঘরে ঢুকে দেখে বোন আনন্দী চা নিয়ে এসে বসে আছে।
আনন্দি চা'টা দাদার হাতে দিয়ে বলল,
-- বিয়ে বাড়িতে কী হল একটু বল না দাদা?
-- সে এক ইতিহাস রে! বলবো একসময় সময় করে। এখন খুব টায়ার্ড লাগছে।
-- ঠিক আছে তাহলে তুই বিশ্রাম নে পরে শুনবো সব গল্প।
আনন্দি ভিতরে চলে যায়। অনল চা শেষ করে আবার ফোনটা নিয়ে বসে। মনেমনে ভাবে কী অদ্ভুত মেয়েটা! ফোনটা কিছুতেই করলো না। ইচ্ছা করলে সে বিজয়ের কাছ থেকে নম্বরটা নিতেই পারে কিন্তু বিনীতা যখন তাকে এড়িয়ে যেতে চাইছে এই মুহুর্তে তাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না। কিন্তু কিছুতেই অনল মন থেকে বিনীতার কথা ভুলতে পারছে না। কী এমন আছে বিয়ের ওই মন্ত্রগুলোতে? যা উচ্চারণ করলে অচেনা,অপরিচিত মানুষটি হৃদয়ের এত কাছে চলে আসে?
দুপুরে খেতে সকলের একটু দেরিই হল। অনলকে চুপচাপ বসে খেতে দেখে আনন্দি বলল,
-- দাদা বিয়ে বাড়ি থেকে আসার পর দেখছি তুই একটু চুপচাপ হয়ে গেছিস? কী হয়েছে? সব ঠিক আছে তো?
সকলে উৎসুক হয়ে অনলের দিকে তাকায়। অনল হেসে পড়ে বলে,
-- আরে না না সব ঠিক আছে। দু'দিন ধরে ঘুমটা ঠিক হয়নি তো তাই কেমন যেন একটু লাগছে। একটা লম্বা ঘুম না দেওয়া পর্যন্ত শরীরটা ঠিক হবে বলে মনে হচ্ছে না।
অনলের মা তখন বলে উঠলেন,
-- তুই খেয়ে গিয়ে তাহলে একটু ঘুমিয়ে নে। কাল থেকে তো আবার অফিস।
অনল খেয়ে ঘরে এসে আবার ফোনটা খুলে দেখে। না কোন কল নেই। বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ে। সত্যিই আগের রাতে না ঘুমানোর ফলে তার শরীর দিচ্ছিল না। একঘুমে পুরো সন্ধ্যা সাতটা বেজে যায়। ঘুম থেকে উঠে সে জানলার পাশে এসে দাঁড়াল। আকাশে অসংখ্য তারা। মনে হল, সেই বিশাল নীল আকাশের নিচে কোথাও বিনীতাও হয়তো একইভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
হয়তো এটাই ভবিতব্য।
হয়তো এটাই নতুন শুরুর প্রথম ধাপ।
কিন্তু আগামীকাল?
বাবা-মাকে কীভাবে বলবে সে?
বিনীতা কি তার পাশে থাকবে আজীবন ? নাকি সে অন্য কিছু ভাবছে? মা, বাবাকে সবকিছু জানানোর পর বিনীতা যদি তার চিন্তাধারার পরিবর্তন আনে? তখন?
অনলের জীবনের আকাশে নীলের সঙ্গে সঙ্গে ধূসর মেঘও জমতে শুরু করেছে।
আর সেই মেঘ সরিয়ে সূর্যের আলো আনতে পারবে কি তার ভালোবাসা—সেটাই এখন দেখার।
চলবে…