ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৮)
মাঝখানে একদিন বাদ দিয়ে পরের দিনই ওরা আশীর্বাদে যাবে। সেই হিসাবে লিজা তার স্বামীর সাথে বেরিয়ে বিনীতার জন্য সোনার কিছু কিনতে যাবেন। আনন্দি সাথে যাবে বৌভাতের শপিংটাও হবে। সব ঠিকঠাক করে খেয়ে লিজা সুস্মিতাকে ফোন করে ফোনটা ধরিয়ে দিলেন।
-- হ্যাঁ সব তো গতকাল শুনলাম। ভাগ্যে যা লেখা আছে তাকে তো অস্বীকার করা যায় না। যা ঘটেছে সেটা নিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা আশীর্বাদে গিয়ে সামনাসামনি কথা বলবো।
-- সেটাই ঠিক হবে দিদি। একটু সকাল সকাল চলে আসবেন।
ব্যাস এই সামান্য কথা বলে ইরা ফোন কেটে দিয়ে বৌদিকে বললেন,
-- কেনাকাটা যা করার তুমি করে নেবে ওদের সাথে। আমার বিয়ের হারটা দিয়েই আশীর্বাদ করবো। ওটা একটু পালিশ করে এনে দিলে ভালো হবে। না করলেও অসুবিধা নেই। ঘরেই একটু হলুদ জল দিয়ে ভিজিয়ে পরিষ্কার করে নিলেই হবে।8 ইল
ইরা সবকিছুই করছেন ঠিকই কিন্তু কোথাও যেন একটা শূন্যতা তার মনে বিরাজ করছে।
রাতে সকলে খেয়ে যে যার ঘরে শুতে চলে গেলো। অনল বিনীতাকে ফোন করলো,
-- এই শুনেছ মা,বাবাকে সব বলে দিয়েছি
-- এটাই ভালো হল জানো। তানাহলে মনের ভিতর একটা অশান্তি কাজ করতো সারাজীবন।
-- আনন্দিই জোর করলো মা বাবাকে জানানোর জন্য। ওটার অনেক বুদ্ধি জানো।
-- হ্যাঁ দুষ্টু বুদ্ধিটাও প্রবল।
-- বয়স অল্প তাই দুষ্টুমিতে বেশ সিদ্ধ। বাড়ির সকলের ভীষন আদরের।
-- শোনো না পরশু খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবে।
-- কেন তর সইছে না? কিন্তু আমি তো যাবো না। অফিস আছে।
-- ও তাই তো ,তুমিও কম দুষ্টু নও কিন্তু
-- দুষ্টুমির আর কী দেখলে? এরপর বুঝতে পারবে
-- এই ভালো হচ্ছে না কিন্তু। এখন রাখো ফোন। বেশি কথা বললে বেশি উল্টোপাল্টা বলতে শুরু করবে।
-- আচ্ছা আচ্ছা আর বলছি না।
এরপর ফোনটা কেটে দিয়ে অনল কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইলো। মাথার ভেতর নানা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে।
একদিকে বিনীতাকে নিজের জীবনে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে হঠাৎ করে সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যাওয়ার অদ্ভুত চাপ। তবুও কোথাও একটা শান্তি আছে—সবকিছু আর লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে না।
ওদিকে বিনীতা ফোনটা রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেললো। এতদিনের দুশ্চিন্তা, ভয়, লুকোচুরি—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু তার মনেও একটা প্রশ্ন কুরে কুরে খাচ্ছে—সবকিছু কি সত্যিই এত সহজ হবে?
পরের দিন সকাল থেকেই লিজারা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। গয়নার দোকানে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখেশুনে অবশেষে একটি সুন্দর সোনার সেট পছন্দ করলেন। আনন্দি তো একেবারে উৎসাহে টগবগ করছে। বৌদিকে এটা দাও না মামী, খুব সুন্দর লাগবে ওকে! বৌদিকে কিন্তু দারুণ দেখতে মামী।
লিজা হেসে বললেন,
-- ওকে পুরো ওর মায়ের মত দেখতে। ওর মায়ের যখন বয়স কম ছিল ঠিক ওর মতই সুন্দর দেখতে লাগতো। আর তুই তো আগে থেকেই বৌদির পক্ষ নিয়ে বসে আছিস! এই পক্ষটা সারাজীবন রেখে চলিস। খুব কষ্ট করে ওর মা ওদের মানুষ করেছেন। ভীষন সংগ্রামী জীবন সুস্মিতার। জানতাম না তো কিছুই। এবার গিয়ে সব জানলাম।
গয়না কেনা শেষ করে তারা বৌভাতের জন্য শাড়ি, কিছু প্রসাধনী, আর বাড়ির অন্যান্য জিনিসপত্রও কিনে নিলেন। আনন্দির চোখে-মুখে একরাশ আনন্দ। মনে হচ্ছে যেন নিজের বিয়ের কেনাকাটা করছে।
এদিকে ইরা বাড়িতে বসে সবকিছু গুছিয়ে রাখছেন। আলমারির ভিতর থেকে নিজের বিয়ের সেই পুরোনো হারটা বের করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এতে! একফোঁটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর বুক থেকে, সময়টা কত দ্রুত বদলে যায়। এই হারটা বিয়েতে মা বাবা দু'জনে পছন্দ করে কিনেছিলেন। গলা ভর্তি ভারী গয়না। নতুন বউ থাকাকালীন সময়ে কয়েকদিন পড়েছেন। সেই থেকেই তোলা রয়েছে। আর একটা গলার হার আছে যেটা শ্বশুরবাড়ি থেকে আশীর্বাদে দিয়েছিল। সেটা রেখেছেন তাঁর আদরের কন্যা অনুর জন্য।
পরের দিন আশীর্বাদের সকাল।
সকালে খুব ভোর থেকেই দুই বাড়িতেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। লিজারা নির্ধারিত সময়ের আগেই রওনা দিলেন। আনন্দি বারবার ঘড়ি দেখছে
মা, আর কতক্ষণ লাগবে?
-- আর একটু, ধৈর্য ধর এখুনি হয়ে যাবে। আরে বাবা একটু গুছিয়ে বেরোই। এসেই তো আবার এর ভিতর ঢুকতে হবে।
-- না ইরা আজ এসে রান্নাবান্না তোমায় কিচ্ছুটি করতে হবে না। আমরা ফিরে রেস্ট নিয়ে হোটেল থেকে খাবার আনিয়ে খাবো। তোমার দাদাকে আমার বলা হয়ে গেছে। আর অনল তো অফিসে যাচ্ছে। ও তো দুপুরে খাবে না বাড়িতে। তাহলে তুমি এতক্ষন রান্নাঘরে কী করছো?
-- তোমাদের প্ল্যানের কথা তো আমি জানি না। আমি রাতের জন্য কিছুটা কাজ এগিয়ে রেখে যাচ্ছিলাম। ঠিক আছে। আমি এখুনি রেডি হচ্ছি।
তাড়াহুড়ো করে ইরা রেডি হতে চলে এলেন। বাকিরা সব মোটামুটি রেডি। এবার বেরোনোর পালা। গাড়ি আগেই এসে গেটে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই গিয়ে একএক করে গাড়িতে বসলেন। গাড়ি ছেড়ে দিলো। ইরা দু'হাত জড়ো করে কপালে হাত ঠেকালেন।
ওদিকে বিনীতাদের বাড়িতেও সাজসজ্জা প্রায় শেষ। বিনীতা লাল-হলুদ শাড়িতে সেজে বসে আছে। মাথায় জুঁই ফুলের মালা।মুখে হালকা মেকআপ। খুব সুন্দর দেখতে লাগছে তাকে।কিন্তু চোখে তার স্পষ্ট উত্তেজনা আর লজ্জা। সুস্মিতা এসে পাশে বসে বললেন,
-- নার্ভাস লাগছে? কিছু ভাবছিস? সবই ভগবানের ইচ্ছা রে। সব কেমন অতি সহজেই হয়ে যাচ্ছে দেখেছিস?
-- কেমন যেন একটা ভয় ভয় করছে। সেদিনের ঘটনাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে।
-- জীবনের ওই পার্টটা "স্বপ্ন দেখেছি" বলে ভুলে যেতে হবে। বিপদে পড়লে আমরা সাময়িক দমে যাই ঠিকই কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। সেতো সময়ের সাথে এগিয়েই চলবে। খারাপ ঘটনাগুলি ভুলে গিয়ে নতুনভাবে সবকিছু শুরু করতে হবে
বিনীতা আস্তে করে মাথা নাড়লো।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। বিনীতা বলে উঠলো
-- মা, ওরা বোধহয় এসে গেছে! তুমি তো এবার কাউকেই বলোনি। একাএকা সব সামাল দিতে পারবে তো? আচ্ছা আশীর্বাদ হয়ে গেলে আমি তো তোমায় হেল্প করতে পারবো।
-- আরে তোকে কিছুই করতে হবে না। লিজা সামলে নেবে আমার সাথে। ও কালকে ফোনে আমায় সেই কথাই জানিয়েছে । তোকে কিছু ভাবতে হবে না।
বিজয় রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। সকলকে ভিতরে ঢুকতে বলে অনলের বাবার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে এসে সোফায় বসালো। তিনি বসেই বললেন,
-- কই আমার ঘরের লক্ষ্মী কোথায়?
বিনীতা অন্য ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সকলকে প্রণাম করলো। আনন্দি বিনীতাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল,
-- কী সুন্দর লাগছে গো তোমায় বিনীতা মানে বৌদি।
বিনীতা, বৌদি ডাকটা শুনে লজ্জা পেয়ে গেলো। ইরা তাকে ডেকে নিজের কাছে বসালেন। মুখটা ধরে বললেন,
-- ঈশ্বর চেয়েছেন তুমি আমার ঘরে যাবে। তাই তো এতকিছু জীবনে ঘটে গেলো। কোন কথা কোনদিন আর মনে করবে না। ওসব ভুলে যাবে।
ইরা বিনীতার কপালে একটা চুমু খেলেন। তারপর সুস্মিতার দিকে ফিরে বললেন,
-- আগে আমরা আশীর্বাদটা করবো। কারণ আমরা কিন্তু না খেয়ে আছি। আশীর্বাদ করে তারপর চা খাবো।
-- হ্যাঁ আমার সব গুছানো। চলুন তবে আমরা ঠাকুরঘরে বসেই আশীর্বাদটা সারি।
সকলে উঠে ঠাকুরঘরের দিকে রওনা দিলো।ঘরের ভিতর যেন এক মুহূর্তে উত্তেজনার ঢেউ বয়ে গেল। সকলে যে যার মত করে কথা বলে যাচ্ছে। যেহেতু অনল আজ নেই তাই বিজয় একটু চুপচাপ। তাকে চুপচাপ দেখে আনন্দি বলে উঠলো,
-- কিগো বিজয়দা বন্ধু আজ আসেনি বলে দেখি আমাদের সাথেও আড়ি করে কথা বলছো না।
-- কেন তুমিই তো সেদিন বললে আমরা নাকি তোমার পিছনে লাগি সব সময়। তাই ঠিক করেছি আজ থেকে আর পিছনে লাগবো না। সব সময় সামনে লাগবো। দাঁড়াও বিনীর বিয়েটা হয়ে যাক এরপর অনলকে বলবো তোমার জন্য একটা ছেলে দেখতে।
-- বয়েই গেছে আমার বিয়ে করতে। চাকরি করবো স্বাধীনভাবে সারাজীবন থাকবো। তুমি বরং একটা বিয়ে করো। দাদার বিয়েতে তো সেভাবে আনন্দ হবে না সেতো অর্ধেক বিয়ে সেরে ফেলেছে।তোমার বিয়েতে চুটিয়ে আনন্দ করবো।
বিজয় মনে মনে ভাবছে -
ক্রমশ