ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৪)
অনল এয়ারপোর্ট থেকেই অফিসে চলে যায়। কিন্তু সে একটা কথা কিছুতেই মাথাতে আনতে পারছে না কৌশিকী তার সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সব সময় কথা বলতো। সেদিন ফোন করার পর থেকেই ওর ভিতর সেই স্বতস্ফূর্ততা আর নেই কেন? খুব বেশি খারাপ ব্যবহার করে ফেললো কি?
অনল একটা কথা মোটেই ভেবে পায় না যখন সে বিনীতার ফোনের জন্য অধীর আগ্রহে থাকে ঠিক তখনই কৌশিকী তাকে ফোন করে বসে। এটা একবার নয় বারবার হয়েছে? কিন্তু কেন?
অনলের মনের ভেতর যেন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব চলছে। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি অফিসে এলেও কাজের প্রতি মন বসছে না। ফাইল খুলে বসে আছে, কিন্তু চোখ ফাইলে আটকে থাকলেও মন তার সেখানে নেই—যেন কোনো একটা উত্তর সে খুঁজছে, যা সে নিজেই জানে না।
কৌশিকী…
মেয়েটা তো এমন ছিল না। সবসময় প্রাণখোলা, স্বতঃস্ফূর্ত—হাসতে হাসতে কথা বলতো, ছোটখাটো বিষয়গুলো শেয়ার করতো। অথচ সেদিন ফোন করার পর থেকেই যেন কোথাও একটা বদল। কথাগুলো ঠিকই বলছে, কিন্তু আগের মতো সেই উষ্ণতা নেই, সেই সহজত্ব নেই। যেন মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল উঠে গেছে।
অনল নিজের মনেই প্রশ্ন করে—
"সহজ সরল মেয়েটার প্রতি খুব খারাপ আচরণ করে ফেললাম সেদিন? ও কি আমার আচরণে মনে খুব কষ্ট পেয়েছে? আর তাছাড়া ও ওর জীবনে আমায় এত গুরুত্বই বা দিচ্ছে কেন? আমি তো শুধুমাত্র ওর জীবনে অফিসের একজন কলিগ মাত্র।"
কিন্তু যতই ভাবছে, ততই জটিল লাগছে। কারণ স্পষ্ট কোনো উত্তর সে পাচ্ছে না। তবুও কোথাও একটা খচখচানি থেকে যাচ্ছে—হয়তো কথার ভঙ্গিতে, হয়তো অবচেতন কোনো অবহেলায় সে কৌশিকীকে আঘাত করে ফেলেছে।
আর একটা বিষয় তাকে আরও বেশি ভাবাচ্ছে।
এটা কাকতালীয় নাকি অন্য কিছু?
যখনই সে বিনীতার ফোনের জন্য অপেক্ষা করে—অধীর হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই কৌশিকীর ফোন আসে। একবার নয়, বারবার এমন হয়েছে। যেন কৌশিকী অদৃশ্যভাবে তার মনের অবস্থাটা বুঝে ফেলে!
এটা কি শুধুই কাকতালীয়? বিনীতা তার জীবনে সম্পূর্ণটুকু দখল করে বসে আছে। কিন্তু কৌশিকী তো শুধুমাত্র তার অফিসের একজন কলিগ মাত্র। অতি সাধারণ আর পাঁচটা কলিগের সাথে ঠিক যেমন সম্পর্ক কৌশিকীর সাথেও ঠিক তাই। এর বাইরে আর কিছুই নয়।
আচ্ছা… কৌশিকী কী তাকে অন্যভাবে ভাবতে শুরু করেছে?
না না তা কী করে সম্ভব? এটা কিছুতেই হতে পারে না। কিন্তু সেটাই যদি সত্যি হয়? নিজেকে সামলে নিয়ে আবার ভাবে - দূর আর হলেও বা কী? তার দিক থেকে কোন সাড়া তো সে দেয়নি। তার তো বিয়েই হয়ে গেছে বিনীতার সাথে। শুধু প্রচারটা বাকি।
এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই অনল একটু অস্বস্তি বোধ করে। কারণ তার নিজের মন তো পরিষ্কার—সে বিনীতার অপেক্ষায় থাকে, তার কণ্ঠ শুনতে চায়। কিন্তু কৌশিকীর উপস্থিতি যেন বারবার সেই জায়গাটায় এসে পড়ছে, যেখানে সে তাকে রাখতে চায়নি কিংবা কখনো সেসব সে স্বপ্নেও ভাবেনি।
প্রতিবার বিনা কারণে কৌশিকীর ফোন যেন প্রমাণ করে সে কিছু বলতে চেয়েছিল তাকে যা সে বলে উঠতে পারেনি। কিন্তু সে তো কখনোই কৌশিকীর সাথে সেরূপ ভাবে মেশেনি তার প্রতি অনুরক্তের কোন ইঙ্গিত সে দেয়নি? যা কিছু তাকে নিয়ে কৌশিকী ভেবেছে সে একাই ভেবেছে।
যাকগে যাক। অন্যে তাকে নিয়ে কী ভাবছে তাই নিয়ে এত মাথাব্যথা না করলেও চলবে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার এই অন্যরকম আচরণটা অনলও ঠিক মেনে নিতে পারছে না। তাকে একভাবে দেখে অভ্যস্ত। হঠাৎ করেই তার ভিতরের এই পরিবর্তনটা মেনে নিতে একটু কষ্টই হচ্ছে তার। তবে কি তার এই আচরণের পেছনে লুকিয়ে আছে না-বলা কোনো অভিমান, কোনো প্রত্যাশা।
অনল শেষমেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
অনল নিজের মনেই নিজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় এই ব্যাপারে সে কোনদিনও তাকে কোন প্রশ্ন করবে না। তবে এটাও ভাবে তার সাথে আর দেখা হওয়ার সম্ভবনাও নেই বললেই চলে।
বিনীতা পৌঁছে অনলকে ফোন করে জানিয়ে দেয়। আগামীকাল থেকেই তার স্কুল। একথাও জানাতে ভোলে না কৌশিকীর সাথে অনেক গল্প হয়েছে তার। তাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেছে। বিয়েতে স্কুল ছুটি থাকলে যাবে বলেছে ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা। অনল শুধু চুপচাপ বিনীতার কথা শুনে গেছে।
স্কুলে জয়েন করার পর থেকেই বিনীতা চেষ্টা শুরু করেছে ট্রান্সফারের। কিন্তু কোন জায়গা থেকেই আশাব্যাঞ্জক কোন কথা সে শুনতে পায়নি। রোজই দু থেকে তিনবার অনলের সাথে তার কথা হয় ওই একই কথা প্রতিবারই আলোচনা হয় দু'জনের মধ্যে আর সেটা হল ট্রান্সফার। উপর মহল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় অন্তত একবছর না হলে কোন বদলি নয়। সকলেরই মাথায় হাত। এখন উপায়?
এরই মাঝে রেজিস্ট্রির দিন এসে যায়। সেখানেও ছুটির সমস্যা। সমস্যা যেন অনল, বিনীতার জীবনে একেবারে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে আছে। রেজিস্ট্রির দিনটা ঠিক করা হয় রবিবার। শনিবার যেহেতু হাফ ডে সেদিন ক্লাস করে সে রওনা দেবে রবিবার রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়ার পর রাতেই আবার শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। এই ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
সেইভাবেই সবকিছু রেডি হতে থাকে।
কৌশিকী বাড়িতে ফেরার পর থেকে মা অনেকবার করে জানতে চেয়েছেন,
-- কিরে তুই যে বলেছিলি কলকাতা থেকে ফিরে এসে আমাকে জানাবি বিয়ের কথা, ছেলেটির সাথে তোর কথা হয়েছে?
কৌশিকী মায়ের কথা শুনে হো হো করে হেসে দিয়ে বলে,
-- ওমা, সেতো তোমায় শান্ত করতে কথাটা বলেছিলাম। সেই ছেলে আমি কোথায় পাবো যে তাকে আমায় বিয়ে করতে বলবো।
বুকের কষ্ট বুকে চেপে মাকে কথাগুলো বলে হাসতে হাসতে মাকে জড়িয়ে ধরে পুণরায় বলে,
-- মাগো ,আমি বিয়ে করবো না। এত কষ্ট করে মানুষ করেছো আমায় আমি তোমাদের ছেড়ে চলে গেলে কে তোমাদের দেখবে? বয়স হয়েছে তোমাদের। অসুখ-বিসুখ লেগেই আছে। আমি পারবো না মা এইভাবে তোমাদের একা করে দিয়ে অন্যের ঘরে গিয়ে তাদের সুখী করতে। আমাকে তোমরা বিয়ের কথা বোলো না। বড় হয়েছি, চাকরি করছি নিজের মত স্বাধীনভাবে চলছি - বিয়ে করে যেচে অশান্তি ডেকে আনতে আমায় বোলো না। কোন অসুবিধা আমার জীবনে হবে না। আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও গিয়ে একটুও ভালো থাকবো না
-- তাই বলে সারাজীবন আইবুড়ো থাকবি?
-- আচ্ছা মা, মনে কর কারো সাথে আমার বিয়ে হল। তারপর সেই বিয়েটা টিকলো না তখন তো আমাকে একাই থাকতে হবে।
-- এরকম অলক্ষুণে কথা বলে না মা। কার কপালে কী লেখা আছে তা কি কেউ বলতে পারে?
-- সেই জন্যই তো বলছি মা বিয়ে বিয়ে করে মাথা খারাপ কোরো না। তোমাদের কাছেই আমায় থাকতে দাও। আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না আর। কাছের মানুষ ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট আমি জানি। তোমরা হয়ত ভেবেছো আমি সব ভুলে গেছি। কিন্তু না মা আমার সব মনে আছে। তবে এখন আর আগের মত কষ্ট পাই না। তোমরা আমাকে দু'হাত ভরে দিয়েছো। তোমাদের ঋণ আমি কোনদিনও শোধ করতে পারবো না। তাই তোমাদের ছেড়ে আমি কোনদিনও যাবো না।
-- আমাদেরও ইচ্ছা করে তোকে বিয়ে দেবো, তোর সুখের সংসার দেখবো , নাতি নাতনিদের সাথে খেলা করবো
-- পৃথিবীতে সবাইকেই যে বিয়ে করে সংসারী হতে হবে এমন কোন আইন এখনো পর্যন্ত বেরোয়নি মা। বিয়ের পর অনেকেই সুখী হয় না, সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তারাও তো বেঁচে থাকে। আমায় জোর কোরো না মা। বাবাকেও বলে দিও আমি বিয়ে করতে চাই না।
-- কী এমন কষ্ট পেয়েছিস ? কেউ কি তোকে কষ্ট দিয়েছে ?
কৌশিকী এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে পড়ে বলে,
-- আমি কি তোমার সেই মেয়ে মা যে কেউ আমায় কষ্ট দিলে আমি ভেঙে পড়বো। না মা আসলে আমি তোমাদের ছেড়ে কোনদিনও কোথাও যাবো না। তোমাদের কাছে থাকবো বলেই তো কলকাতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি তোমাদের কাছেই চলে এলাম। এতদিন তো তোমরা আমার জন্য করলে এবার একটু আমায় সুযোগ দাও তোমাদের সেবাযত্ন করার।
ক্রমশ