ভালোবাসার নীল আকাশ (৩ পর্ব)
-- ছোটমামা লগ্ন শেষের পথে। যা ঘটেছে সেটাকে মেনে নিতেই হবে। বলো মামা অর্পণের কী হয়েছে?
ছোটমামা তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
-- সে আর নেই রে --
বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
বিজয় এরকমই কিছু আন্দাজ করেছিল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
-- কিভাবে ঘটলো ঘটনাটা?
-- একদল দুষ্কৃতিকারী এসে বেরোনোর একটু আগে একদম সামনে থেকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।
মামা আকুল হয়ে কেঁদে চলেছেন। বিজয় বললো,
-- ফিরে এসো তোমরা সাবধানে। পরে বাকিকথা শুনবো।
-- হাসপাতাল আছি। একটু দেরি হবে ফিরতে। এই মুহুর্তে মনুষ্যত্ব বাধা দিচ্ছে এদের ফেলে চলে যেতে। অনেক আত্মীয়বন্ধুর আছে ঠিকই কিন্তু --
-- ওকে ওকে তুমি যেটা ভালো বোঝো করো।আমি ছাড়ছি।
সংক্ষেপে মাকে কথাগুলো বলে বিজয় গিয়ে অনলকে লোকালয় থেকে একেবারে হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের ঘরের ভিতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।
বিজয় কিছুক্ষণ চুপ করে অনলের দিকে তাকিয়ে রইল। বিয়েবাড়ির ভিড়, লোকজনের কোলাহল—সব যেন হঠাৎ থেমে গেছে তাদের চারপাশে।
অনলও চুপ। চোখে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি। বন্ধুর বিপদ সে বুঝছে, কিন্তু নিজের সীমারেখাটাও স্পষ্ট।
হঠাৎ বিজয় ধীরে বলে উঠল,
— “একটা কথা বলি? পুরো বিয়ে না। শুধু আজকের দিনের জন্য।”
অনল ভ্রু কুঁচকাল।
— “মানে?”
— “মানে… আজ শুধু বিয়েবাড়িতে সবাইকে বোঝানোর জন্য। রেজিস্ট্রি নয়, সিঁথি সিঁদুর নয়, কোনো আইনি ঝামেলা নয়। লোক দেখানো। রাতেই তুই নিজের বাড়ি ফিরে যাবি।”
অনল আঁতকে উঠল।
— “এগুলো কি খেলনা নাকি? মেয়েটার কথা ভেবেছিস?”
বিজয় মাথা নিচু করল।
— “ভেবেছি বলেই তো তোর কাছে এসেছি। লগ্নভ্রস্টা হলে ওর জীবনটাই দাগ পড়ে যাবে। গ্রামের লোক, আত্মীয়—কেউ সত্যটা শুনবে না। শুধু বলবে, ‘মেয়ে নিয়ে সমস্যা ছিল।’”
এই প্রথম অনলের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে জানে—সমাজ কতটা নির্মম হতে পারে। নিজের বোনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল তার।
— “মেয়েটা জানে?” অনল খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল।
— “জানে,” বিজয় ফিসফিস করে বলল।
-- কী করছে সে এখন?
“আর কাঁদছে না। একদম চুপ। ওই চুপটাই আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।”
অনল বিজয়ের ঘরের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। নতুন চাকরি, নতুন স্বপ্ন, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পাওয়া সম্মান—সব এক মুহূর্তে দুলে উঠল।
ঠিক তখনই বিজয়ের ফোন বেজে উঠল।
ওপাশ থেকে কাঁপা গলায় এক মহিলা—
— কী হবে এখন বিজু? আমার মাথায় তো কিছুই আসছে না।
-- মা, তুমি বিনুর কাছে যাও। ঈশ্বর যা কপালে লিখেছেন ওর তাই হবে।
বিজয় ফোন কেটে দিলো।
বিজয় ফোন কেটে অনলের দিকে তাকাল। চোখে জল, গলায় অসহায়তা।
— “ভাই… শেষবার বলছি।”
অনল গভীর নিশ্বাস নিল।
সে জানে—এই সিদ্ধান্ত তার জীবন দু’দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। একদিকে নীতিবোধ, অন্যদিকে মানবিকতা।
কয়েক সেকেন্ড পর সে শুধু বলল—
— “মেয়েটার নাম কী?”
বিজয় অবাক হয়ে অনলের দিকে তাকাল।
বিজয় কিছুটা থমকে গেল। তারপর খুব আস্তে বলল—
— “বিনু… আসল নাম বিনীতা।”
অনল নামটা কয়েকবার মনে মনে আওড়াল। “বিনীতা”—নামের মধ্যেই যেন একটা নরম, সংযত সুর আছে।
— “ওর সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই,” অনল ধীরে বলল।
বিজয় যেন এই উত্তরটাই আশা করছিল। দরজা খুলে বাইরে বেরোল। বিয়েবাড়ির উঠোনে এখনও আলো জ্বলছে, কিন্তু সেই আলোয় আর উৎসব নেই—শুধু চাপা গুঞ্জন। আত্মীয়স্বজনেরা দূরে দূরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে।
কয়েক মিনিট পর বিজয় ফিরে এল। তার পিছনে লাল বেনারসী পরা, মাথায় হালকা ঘোমটা টানা একটি মেয়ে। চোখদুটো লাল নয়, বরং অদ্ভুত শান্ত। সেই শান্তিই যেন আরও বেশি অস্থির করে তোলে।
অনল উঠে দাঁড়াল।
ঘরে এক মুহূর্ত নীরবতা।
বিনীতা নিজেই প্রথম বলল—
— “আপনাকে জোর করা হচ্ছে না তো?”
প্রশ্নটা সোজা, কিন্তু তার ভিতরে কতটা মর্যাদা! অনল একটু থমকাল, তারপর বলল—
— “না। জোর নয়। কিন্তু সিদ্ধান্তটা সহজও নয়।”
বিনীতা মাথা নাড়ল।
— “আমারও নয়।”
অনল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে যেন দুই জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ।
বিনীতা আবার বলল—
— “আমি কাউকে বেঁধে রাখতে চাই না। শুধু আজকের অপমানটা… বাবা-মা সহ্য করতে পারবেন না। কাল কী হবে জানি না, কিন্তু আজ যদি বিয়েটা না হয়, সবাই দোষটা আমার ঘাড়েই চাপাবে।”
অনল প্রথমবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কান্না নেই, ভয় নেই—শুধু ক্লান্তি আর দৃঢ়তা।
— “আপনি জানেন, আমি কাল সকালেই চলে যাব?” অনল স্পষ্ট করে বলল।
— “জানি,” বিনীতা শান্ত স্বরে উত্তর দিল।
— “আপনি চাইলে আর কখনো দেখা হবে না। আমি কাউকে কিছু বলব না। শুধু আজকের রাতটা… একটা আড়াল।”
এই ‘আড়াল’ শব্দটা অনলের ভেতরে কোথাও গিয়ে লাগল।
বাইরে হঠাৎ শাঁখের শব্দ শোনা গেল। কেউ একজন হয়তো পরিস্থিতি সামলাতে পুরোহিতকে খবর দিয়েছে।
বিজয় কাঁপা গলায় বলল—
— “সময় খুব কম, অনল…”
অনল চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। নিজের মায়ের কথা, বোনের কথা, সমাজের নিষ্ঠুরতা—সব একসঙ্গে মাথার ভিতর ঘুরতে লাগল।
তারপর সে চোখ খুলে বলল—
— “একটা শর্ত আছে।”
বিজয় আর বিনীতা দু’জনেই তাকাল।
— “আজ যা হবে, তা কাগজে-কলমে কিছুই নয়। আর যদি কখনো ভবিষ্যতে তুমি”—সে বিনীতার দিকে তাকাল—“নিজের ইচ্ছায় আমাকে ডাকো, তবেই আমি ফিরে আসব। বাধ্যবাধকতায় নয়।”
বিনীতা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল—
— “আমি কাউকে বাধ্য করব না। নিজের ভাগ্য নিজেই সামলাতে শিখেছি।”
অনল মাথা নাড়ল।
— “তাহলে চল।”
বাইরে যখন তারা বেরোল, তখন সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। গুঞ্জন থেমে গেল। কেউ ফিসফিস করে বলল—
— “বর এসেছে…”
শাঁখধ্বনি আবার উঠল। আলোর নিচে অনল আর বিনীতা পাশাপাশি বসল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, অনলের মনে হল—এটা কি সত্যিই শুধু ‘লোক দেখানো’?
নাকি ভাগ্য নিজের মতো করে নতুন গল্প লিখতে শুরু করেছে?
রাত গভীর হল। মন্ত্রপাঠ শেষ হল।সাথে শেষ হল লোক দেখানো সিঁদুর দান। কিন্তু সিঁদুর দান কি সত্যিই লোক দেখানো হয়? কিশোরী বয়স থেকে নারী স্বপ্ন দেখে তার জীবনের এই দিন, এই মহেন্দ্রক্ষণটির। এটা তো কোন নাটক কিংবা যাত্রাপালা নয় যে লাল আবির দিয়ে লোক দেখানো সিঁদুর দান হল। অনলের হাত দিয়ে যে সিঁদুর আজ বিনীতার সিঁথিতে উঠলো তাকে কি অস্বীকার করার ক্ষমতা দু'জনের কারো আছে?
—সে প্রশ্নের উত্তর যেন বাতাসেই রয়ে গেল।
বিয়ে শেষ হল। ভাগ্য মানুষকে যেমন মাটি থেকে আকাশে তোলে আবার আকাশ থেকেই মাটিতে ফেলে। বিনীতা এবং অনলের জীবনে যে এর কোনটা হল দু'জনের কেউই তা বুঝতে পারলো না।
বিয়ে বাড়ির গুঞ্জন শেষ হল, বিয়ে সম্পন্ন হল, মুষ্টিমেয় কয়েকজন নিকট আত্মীয় ছাড়া সবাই যে যার বাড়ির পথে রওনা দিলো।বাড়িও একসময় ফাঁকা হল। বিনীতা তার নিজের ঘরে চলে গেলো আর বিজয় অনলকে হাত ধরে নিজের ঘরে এনে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে। অনল পুরো চুপ! এই মুহুর্তে তার কী করণীয় সে নিজেই বুঝতে পারছে না। বাড়ির প্রত্যেকের মুখ তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে প্রতিটা মুহুর্তে।
সবটাই কী কাকতালীয়? নাকি বিধাতার নির্দেশ? ভাগ্য কি একেই বলে?
বিজয় একসময় শান্ত হয়। কিন্তু অনল একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বিজয় বললো,
-- আমার বোনটা খুব ভালো রে। তোকে কিছুই ভাবতে হবে না ওকে নিয়ে। আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি আছে শিলিগুড়ি। কাল তোর সাথে একসাথেই ওকে নিয়ে আমিও বেরিয়ে যাবো। ওর স্কুলের চাকরিটা হয়ে যাবে আশা করছি। ও শিলিগুড়িতে আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতেই থাকবে এখন থেকে। সবাই জানবে ও শ্বশুরবাড়িতে রয়েছে। তুই কিচ্ছু ভাবিস না ভাই। আজ যে সম্মান তুই আমার রক্ষা করেছিস তারজন্য আমি সারাজীবন তোর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবো।
বিজয় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে যায়,
-- তুই একটু ঘুমিয়ে নে। আমি বাকি কাজগুলি সারি।
না, ঘুমাতে অনল পারে না। ছটফট করতে করতে একসময় উঠে ছাদে চলে যায়।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অনল একা ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল—
আজ যে সিদ্ধান্ত সে নিল, তার পরিণতি কি সত্যিই শুধু এক রাতের?
নাকি এই রাতই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভোর হয়ে উঠবে?
ক্রমশ