ভালোবাসার নীল আকাশ (৭ম পর্ব)
অর্পণের বিয়ের দিন সকাল -
বাড়িতে পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ভর্তি। সকলেই খোশমেজাজে। সকাল থেকেই আচারঅনুষ্ঠান একটার পর একটা চলেছে। অর্পিতার বন্ধু হিসাবে ময়ূরও উপস্থিত বিয়ে বাড়িতে। অর্পণ ময়ূরকে একা পেয়ে বলল,
-- তুমি একদম ভেবো না ময়ূর। বিয়েটা মিটতে দাও তারপর তোমার কেসটা আমি দেখছি। মনে সাহস রেখো। তবে একটা কথা তোমায় বলবো , আমি অর্পির কাছে শুনেছি তুমি খুবই সাহসী মেয়ে সেটা তোমার আচারআচরণে আমিও বুঝতে পারছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বলবো রাস্তাঘাটে বেশি বেরোবে না। একা হোক কিংবা কারও সাথে। সমা*জবিরো*ধীদের কোন অবস্থাতেই বিশ্বাস করা যায় না। ওরা পারে না এমন কোন কাজ নেই।
অর্পণের কথা শুনে ময়ূর সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়। অর্পণের ফোন বারবার বাজতে থাকে। ফোনটা ওর বোন অর্পিতার কাছে। একটা নম্বর থেকেই বারবার ফোন আসতে থাকায় অর্পিতা ফোনটা দাদার হাতে দিতে যায়,
-- দেখ টো দাদা বারবার একই নম্বর থেকে ফোন আসছে।
অর্পণ বুঝতে পারে কেন এই ফোনটা বারবার আসছে এবং কী তার উদ্দেশ্য?
সে ফোনটা না নিয়েই বলে,
-- বাজতে থাকুক। ঘরে গিয়ে রিংব্যক করে নেবো।
সন্ধ্যার আগেই বরের রওনা দেওয়ার কথা। তারই তোড়জোড় চলছে। একদল হলুদ নিয়ে দুপুরেই চলে গেছে মেয়ের বাড়ি। বেরোনোর জন্য অর্পণ রেডি। আবার ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনটা ধরে '' হ্যালো " বলতেই অপর প্রান্ত থেকে বেশ কড়া ভাষায় ভেসে এলো,
-- শেষবারের মত বলছি এই কেস তুমি নিও না। নতুন জীবন শুরু করতে চলেছ সবকিছুর আগেই প্রাণটাকে খোয়ানোর জন্য কেন উঠেপড়ে লেগেছ?
-- আপনি যতই আমায় থ্রে*ট করেন না কেন আমি কোনকিছুতেই ভয় পাই না। আমি এ রাস্তা থেকে সরবো না।
-- ভেবে দেখো। তোমার বাড়িতে আমার লোক পৌঁছে গেছে। তুমি রাজি হলে তাদের ফিরে আসতে বলবো আর রাজি যদি না হও আর কয়েকটা মুহূর্তের জীবন তোমার।
ফোনটা কেটে দিয়ে পাঞ্জাবীর পকেটে রেখে দেয়। ফোন পুণরায় বেজে ওঠে। কিন্তু অর্পণ আর রিসিভ করে না। বেশ কয়েকবার ফোনটা বাজতে থাকলে অর্পণ ফোনের সুইচ অফ করে দেয়।
মাকে প্রণাম করে, রিচুয়াল মেনে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে আর ঠিক তখনই খুব কাছ থেকে গুলি এসে অর্পণের বুকে লাগে। সবাই এতটাই হকচকিয়ে যায় যে অপরাধী মুহূর্তেই সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়।
সঙ্গে সঙ্গে বরের সাজানো গাড়িতে করেই অর্পণকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনা কিসের জন্য কেন ঘটলো কেউ না বুঝলেও ময়ূর ঠিক বুঝতে পারে এটা কিসের জের।
তখন বিনিতাদের বাড়ি থেকে তার মামা আর একজন প্রতিবেশী বর নিতে সেখানে হাজির। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা পুরো পাথর হয়ে যান। কী করবেন কিছুই বুঝতে পারেন না। মুহূর্তেই একটা আনন্দউচ্ছ্বল বিয়েবাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি পুরো ফাঁকা হয়ে যায়। সবাই চলে গেলেও খুব কাছের কয়েকজন ছাড়া ময়ূর থেকে যায় সেখানে। সে বন্ধুকে সান্ত্বনা দেবে কী নিজেই পাথর হয়ে আছে ঘটনার আকস্মিকতায়। তার জন্যই আজ অর্পিতার দাদার এই অবস্থা! মনেমনে নিজেকে নিজেই দোষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু মুখ ফুটে কাউকেই কিছু বলতে সাহস পায় না। এ ঘটনার কারণ কিছুটা হলেও অর্পিতা যে টের পেয়েছে তা ময়ূরও বুঝতে পেরেছে। কিন্তু সেও স্থবির!
হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ কেস বলে নিতে প্রথমে অস্বীকার করলেও অনেক টালবাহানার পর শেষমেষ ভর্তি করতে তারা পারে। সঙ্গে সঙ্গেই অপারেশন থিয়েটারে। বিনীতার বাড়ির লোক যে গাড়িটা করে বর নিতে এসেছিল সেটা করেই অর্পনকে হাসপাতাল আনা হয়েছে। সেই গাড়িতে অর্পণের খুব কাছের বেশ কয়েকজন উঠে পড়ায় তারা অন্য একটা গাড়ি করে হাসপাতাল পৌঁছান। হাসপাতাল যাওয়ার আগে বিজয়কে ফোন করে অর্পণের খবরটা দিয়ে যান তার ছোটমামা।
অর্পণের বাড়িতে শোকের ছায়া। ময়ূর বাড়িতে ফোন করে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে দিয়েছে আর এও বলেছে আজ রাতে সে বাড়িতে ফিরছে না।অর্পণের মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন। প্রতিবারই ময়ূরের তত্ত্বাবধানে তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বৃদ্ধ বাবা হতবাক হয়ে শুয়ে। তাঁর মুখেও কোন কথা নেই।
অর্পিতা বারবার হাসপাতালে উপস্থিত পরিচিতদের ফোন করছে কিন্তু কেউই তার ফোন তুলছে না। অর্পণের খবরের উদ্বিগ্নতায় তার বোন,মা,বাবার পাগল পাগল পরিস্থিতি। কিন্তু হাত,পা বাঁধা। কী করবেন এখন কী করা উচিত কিছুই কেউ বুঝতে পারছে না।
বিয়ে বাড়িতে বর নেওয়ার জন্য যে দু'জন এসেছিলেন তারাও সারাটা রাত নিদ্রাহীন অবস্থায় হাসপাতালে বসে। তাদের দু'জনের অবস্থা হয়েছে চক্রবুহে প্রবেশ। না পারছেন চলে যেতে না পারছেন থেকে যেতে।
অর্পণের বুকে গু*লি লাগাতে সঙ্গে সঙ্গেই অর্পণ জ্ঞান হারিয়ে বিনীতার ছোট মামার গায়ের উপর পড়ে যায়। কারণ তিনি অর্পণের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। গোটা একটা দিন ওই রক্তমাখা জামা পরেই বিনীতার ছোটমামা কাটিয়ে দেন।যেহেতু অর্পণের বুকে গুলি লাগার সাথে সাথেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তাই সেখানে উপস্থিত অনেকেই ভাবেন অর্পণ বুঝি মারা গেছে। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর অপারেশন থিয়েটারে তার বুক থেকে গুলি বের করার পর ডাক্তার বাহাত্তর ঘণ্টা সময় চান তার জ্ঞান ফেরার। ভোররাতে ফোন করে অর্পিতাকে কথাটা জানানোর পর তারা যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
সেই মুহূর্তে বিজয়ের ছোটমামা তখন বিজয়কে আর ফোন করতে সাহস পান না। এখন সেখানে কী পরিস্থিতি সেটা ভাবতেই তাঁর বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে। তিনি ভোররাতে এই খবর পাওয়ার পর তার সঙ্গীকে সাথে নিয়ে বিজয়দের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু কিছুটা পথ আসার পর তাদের গাড়ি এমনভাবে বিকল হয়ে পড়ে এতো সকালে কোন গ্যারেজ খোলা না পেয়ে তাদের অনেকটা সময় রাস্তাতেই কেটে যায়। এদিকে রক্তমাখা জামা পরে রাস্তায় এত ভোরে কোন পথচারীর চোখে পড়লেই তারা উৎসুক দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। অনেকে আবার এসে প্রশ্নও করছেন। এমতাবস্থায় তিনি ওই বিকল গাড়ির মধ্যে বসেই বেশ কয়েক ঘণ্টা কাটিতে দেন।
যখন বিজয়দের বাড়িতে ফেরেন প্রায় দুপুর। তিনি ফিরে দেখেন তার আদরের ভাগ্নির অন্য একটি ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি অর্পণের বাড়ির সমস্ত ঘটনা সেই মুহূর্তে কারো কাছে বলেন না। শুধু বিজয়কে বলেন,
-- সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেলো। অনেক কথা আছে। এই মুহূর্তে আর কিছু বলছি না। সব পরে বলবো। কিন্তু যে ছেলেটির সাথে তুই বোনের বিয়েটা দিলি তার সম্পর্কে কি কিছু জানিস?
-- মামা, আমারও অনেককিছু বলার আছে। সব বলবো আর শুনবো তোমার কাছ থেকে। কিন্তু পরে।
দম বন্ধ করে অর্পণের বাড়ির লোক হাসপাতালে পালাক্রমে অপেক্ষমাণ। কখন অর্পণের জ্ঞান ফেরে। অর্পিতার সাথে প্রতিবারই ময়ূর আসছে হাসপাতালে। সে ভীষণভাবে একটা অপরাধ বোধে ভুগছে। নিজেকে নিজেই দোষারোপ করছে আজ তার জেদের ফলেই অর্পিতার দাদার এই পরিস্থিতি। নিজেকে কিছুতেই সে ক্ষমা করতে পারছে না। মা,বাবার কথা শুনে সে যদি এই কেসটা থেকে সরে দাঁড়াতো তাহলে বৃদ্ধ মা,বাবা আর অবিবাহিত বোনের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির এই দশা হত না। আজ অর্পণদার এই পরিস্থিতির জন্য একমাত্র সেই দায়ী। নিজের জেদের জন্য একটা মানুষের জীবন চলে যাচ্ছিল এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। বন্ধু অর্পিতা বিষয়টা টের পেলেও সেও কিন্তু এটা নিয়ে তাকে কোন কথাই বলেনি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে গুমরে মরছে এটা ময়ূর ঠিক বুঝতে পারছে। ময়ূর ঈশ্বরের কাছে সবসময় প্রার্থনা করে চলেছে অর্পণের জন্য। তার এখন ভাবনা একটাই যদি অর্পণদার কিছু হয়ে যায় তাহলে সারাটা জীবন এই অপরাধের দায়ভার কিভাবে সে বয়ে বেড়াবে?
কিভাবে কেমন করে সে এর প্রায়শ্চিত্ত করবে?
১৯-৩-২৬