Tuesday, May 26, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৯)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৯)

  মলয়বাবু রাস্তাতেই ছিলেন। তারই সমবয়সী একজন ময়ূরকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে ব্যঙ্গের ছলে হাতের ইশারায় ময়ূরকে দেখান। ময়ূর তার বাবাকে দেখেনি কারণ তিনি একটু দূরেই ছিলেন। তিনি নিজেও জানেন লোকজনের কথা তার মেয়ে পাত্তা দেয় না। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর মেয়েকে কেউ কিছু বললে তিনি তো কষ্ট পাবেনই।
   মলয়বাবু একটু আড়ালেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুখে হালকা হাসি থাকলেও ভিতরে ভিতরে কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছিল তাঁর। সমবয়সী এক ভদ্রলোক ময়ূরকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে চোখ টিপে, ঠোঁট বেঁকিয়ে ইশারায় কিছু বলতে চাইলো—সে ইঙ্গিতের ভাষা খুব পরিচিত, খুবই কটু।
মলয়বাবুর বুকটা যেন হালকা কেঁপে উঠল।
আমার মেয়েকে নিয়ে এভাবে ভাবছে?
মনে মনে যেন একটা চাপা আগুন জ্বলে উঠল।
তিনি জানেন, ময়ূর এমন মেয়ে নয় যে এসব কথায় ভেঙে পড়বে বা কারও মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের চলা বদলাবে। ছোটবেলা থেকেই সে নিজের মতো—স্বাধীন, দৃঢ়, নিজের সিদ্ধান্তে অটল। লোকের কথায় তার কিছু যায় আসে না।
তবুও নিজের মেয়ে সম্পর্কে কেউ কিছু বললে খারাপ তো লাগবেই।বাবা তো!
মেয়েকে নিয়ে কেউ কটু ইঙ্গিত করলে সেই আঘাতটা নিজের ওপরেই এসে লাগে।
এক মুহূর্তের জন্য মলয়বাবুর ইচ্ছে হলো লোকটাকে দু’কথা শোনান। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। রাস্তাঘাটে এসব নিয়ে কথা বাড়ালে সম্মান কমে, বাড়ে না এই বোধটুকু তার বহুদিনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা। আর তিনি তার মেয়েকে ভালোভাবেই চেনেন। এসবে সে পাত্তায় দেয় না। বরং বাবা এর প্রতিবাদ করলে আর তার কানে সে কথা গেলে সে আরও ক্ষেপে যাবে।
    তিনি শুধু একবার গভীর দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে ছিল নীরব প্রতিবাদ, অস্বীকৃতি আর একরাশ অসন্তোষ। এত নিম্ন রুচির মানুষটির সাথে তিনি এতদিন মেলামেশা করেছেন ভেবে নিজেকেই নিজের কাছে ছোট মনেহল।
 মলয়বাবুর রূহ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে লোকটা একটু থমকালো, তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল।
মলয়বাবু ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।
ময়ূর তখন নিশ্চিন্তে হাঁটছে, কিছুই টের পায়নি—নিজের মতো, নিজের জগতে।
মলয়বাবুর মুখে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
যা-ই বলুক লোকজন  আমার মেয়েটা ঠিক আছে। নিজের মতোই ঠিক আছে।
এই বিশ্বাসটাই যেন তাকে নিশ্চিন্ত করে দিলো।
  তিনি আর বিশেষ কিছু এই প্রসঙ্গে মেয়ের কাছে জানতে চাইলেন না। শুধু বললেন,
-- কী ভাবছিস ভবিষ্যৎ নিয়ে? এমাসেই তো রেজাল্ট বেরোবে ।আজকের পরীক্ষাটা কেমন হল?
-- হ্যাঁ বাবা ভালো হয়েছে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। ওদের কোম্পানিতে চাকরি হলে ব্যাঙ্গালোর গিয়ে থাকতে হবে মানে ওখানেই পোস্টিং হবে
 অন্নপূর্ণাদেবী যেন আতকে উঠলেন, সে কী ? একা কীকরে অতদূরে গিয়ে থাকবে?
-- আগে তো চাকরি হোক তারপর নাহয় ভাবা যাবে
 মলয়বাবু বললেন।
  রাতে অর্পিতার ফোন।
-- কিরে তোর তো বন্ধুত্ব আমার সাথে। তাহলে দাদার সাথে ঝামেলায় এখানে আসা বন্ধ করলি কেন? 
-- কী যা তাই বলিস। অর্পণদার সাথে আমার আবার কখন ঝামেলা হল?
-- বুঝি বুঝি সব বুঝি ইয়ার শুধু না বোঝার ভান করে থাকি।
-- তোর মাথাটাই গেছে বোধহয়। সময় পাচ্ছি না। চাকরির চেষ্টা করছি রে। কিছু না করলে আর হচ্ছে না রে। বাবা অনেকদিন আগেই তো রিটায়ার করেছেন। প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এককালীন যা টাকা পেয়েছেন পেনশন তো নেই। এখন ওই টুকটাক টিউশন পড়িয়ে আর কটা টাকাই বা পান। আমিও বা টিউশনি পড়িয়ে কিইবা পাই। ফাইনাল পরীক্ষার আগে তো সব টিউশন ছেড়েই দিয়েছিলাম। নতুন করে পেতে আবার তো একটু সময় দিতে হবে।
 -- শোন না নলিনী ফোন করেছিল। আবার ওদের ওখানে যেতে বলছে। এই একটা সুখবর আছে রে! নলিনী প্রেগন্যান্ট।
-- ওমা তাই? তাহলে তো একদিন যেতেই হবে ওদের বাড়ি।
-- ওদের বাড়ি যাওয়ার আগে একদিন আমাদের বাড়ি আয় 
-- হ্যাঁ যাবো সময় পেলে
-- কাল তো রবিবার। কাল একবার আয় না দাদা বাড়ি থাকবে তো
-- এই আমি কি তোদের বাড়িতে তোর দাদার জন্য যাই 
-- না না আমি কি সে কথা বললাম? আমি তো অন্ধ কিছুই দেখি না আবার মাঝে মাঝে কালাও হয়ে যাই কিছুই শুনি না
 অর্পিতা হাসতে থাকে।
-- বোকার মত হাসছিস কেন? 
-- আচ্ছা ঠিক আছে বুদ্ধিমানের মত না হেসেই বলছি কাল দুপুরে এসে এখানে খাবি কিন্তু। সেদিন তুই কিছুই খাসনি।
-- আরে না, যদি যাই তাহলে খেয়েদেয়ে বিকেলে যাবো। তবে যাবো কিনা কিন্তু কনফার্ম না।
-- হ্যাঁ হ্যাঁ কনফার্ম। কাল তুই আসছিস এবং দুপুরে এসে খাচ্ছিস।
 অর্পিতা ফোন কেটে দেয়। ময়ূরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই।
 ময়ূর গিয়ে মাকে জানিয়ে আসে কাল অর্পিতাদের বাড়িতে দুপুরে খাবে। মেয়ে যে মাঝে মাঝেই তার বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে খায়, থাকে এটা নিয়ে তাদের কোন বক্তব্য নেই। তাও অন্যের বাড়িতে খেলে মেয়েটা একটু ভালোমন্দ খেতে পারে। তাছাড়া তাঁরা জানেন ওই বাড়ির সকলেই ময়ূরকে খুব ভালোবাসে।
  সকাল এগারোটা নাগাদ ময়ূর বেরিয়ে পড়ে অর্পিতাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগে ওর সেখানে পৌঁছাতে। আজ অনেকটা সময় লেগে যায় জ্যামের কারণে। প্রায় একটা নাগাদ গিয়ে পৌঁছায়। রবিবার অর্পণ বাজার করে থাকে সাধারণত। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে সে জানে না অর্থাৎ অর্পিতা তাকে বলেনি যে ময়ূর আজ আসবে। 
 -- কিরে এত দেরি হল যে?
-- আরে রবিবার তাও রাস্তায় জ্যাম। 
--কতদিন পর আসলি বল তো?
-- বাড়িটা খুব একটা কাছে নয় রে
-- কিন্তু আগে তো প্রায়ই আসতিস 
 --আগে আসতাম বলে কি সেটাকেই ধরে রাখতে হবে? তুই কতদিন গেছিস আমাদের বাড়িতে?
 ময়ূর গিয়ে অর্পিতার ঘরে বসেই কথা বলছিল। কিন্তু তার কানটা ছিল খাড়া। কিন্তু অর্পণের কোন সাড়াশব্দ সে পায় না
 অর্পিতার মা খাবার রেডি করে সকলকে টেবিলে ডাকেন।
 এদিকে অর্পণ তার নিজের ঘরে স্নান করে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মায়ের ডাক তার কান অবধি পৌঁছায়নি। অর্পিতা গিয়ে দাদাকে ডেকে আনে। অর্পণ এসে ময়ুরকে দেখে চমকে যায়। স্বাভাবিকভাবেই সে জানতে চায়
-- অনেকদিন পর তোমায় দেখলাম
 ময়ূর বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি দিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লো খেতে।
 অর্পিতার মা জানতে চাইলেন,
-- হ্যাঁরে ময়ূর তুই এখন আর আসিস না কেন আগের মত।
-- চাকরির চেষ্টা করছি মাসিমা। বাড়িতে থেকে একটু পড়াশুনার চেষ্টা করছি।
-- যখন কলেজে পড়ছিলি তখন তো প্রায়ই আসা যাওয়া ছিল। তার থেকেও কী চাকরির পরীক্ষায় বেশি করে পড়তে হচ্ছে। 
 অর্পিতার মায়ের কথায় সবাই হেসে দেয়। 
 অর্পণ আড়চোখে মাঝে মাঝে ময়ূরকে যে দেখে চলেছে সেটা অর্পিতার নজর এরাচ্ছে না। কিন্তু ময়ূর আজকে ইচ্ছাকৃত ভাবেই অর্পণের দিকে একবারও ভুলেও তাকায়নি। 
-- দাদা তোর আজকে বিকেলে বেরোনো আছে নাকি?
-- হঠাৎ এই প্রশ্ন? কেন বলতো?
-- আরে কাজ আছে বলেই তো জানতে চাইলাম
-- কী কাজ? 
-- বেরোনো থাকলে বলতাম
-- না আমার আজ কোথাও বেরোনো নেই। বাড়িতেই আছি।
-- না বলছিলাম তুই যদি কাজে বেরোস তাহলে এই বাস রাস্তাটা অন্তত বাইকে ময়ূরকে এগিয়ে দিয়ে আসতে পারতিস।
 ময়ূর অর্পিতার দিকে তাকিয়ে পড়লো। অর্পিতার মুখে দুষ্টু হাসি। কিন্তু ময়ূর সঙ্গে সঙ্গেই বলল, 
-- না না আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে হবে কেন? আমি কি একা যাতায়াত করি না? যতসব উদ্ভট উদ্ভট পরিকল্পনা। অর্পণের বুঝতে একটুও বাকি থাকলো না তার বোনও এই সম্পর্কটা গড়ে উঠুক সেটা চাইছে।
-- সে পরে দেখা যাবে। এখন তো খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবো। কখন বেরোবে তুমি?
 অর্পণের কথার উত্তরে ময়ূর বলল,
-- আমি আমার সময়মত বেরোব আর আমি একাই যাবো। 
 ময়ূরের কথার কেউ কোন উত্তর দিলো না। কিন্তু অর্পণ সুযোগ পেয়ে ময়ূরকে খুব আস্তে বলল,
-- কেন আমার সাথে গেলে আমি খেয়ে ফেলবো নাকি? 
আমার সাথে বাইকেই তোমায় যেতে হবে।
 ময়ূরও খুব আস্তে বলে, 
-- না তা আমি যাবো না। সব তোমার ইচ্ছামত চলবে নাকি? এতদিন তো একাই যাতায়াত করেছি। কোনদিন তো পৌঁছে দাওনি। আজ হঠাৎ কী হল যে পৌঁছে দিতে চাইছো তাও বাইকে?

ক্রমশ 
 
-- 
  

Monday, May 25, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৮)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৮)

  ময়ূর অবাক হয়ে অর্পণের দিকে তাকিয়ে। আজ অর্পণকে যেন আরও সুন্দর লাগছে। অর্পণ এমনিতেই খুব হ্যান্ডসাম। প্রচণ্ড গরম পড়েছে বলে আজ পাতলা একটা সাদা সার্ট পড়েছে। গায়ের রংয়ের সাথে যেন মিশে আছে। 
-- কী হল গাড়ির কোন সমস্যা? 
 অর্পণ মনেমনে ভাবে "বেবী সমস্যাটা আমার গাড়ির নয় তোমার কথার। এত স্পষ্টভাবে ভালোলাগা পুরুষটির সামনে বারবার ভালোবাসার প্রমাণ দিলে গাড়ি তো কোন ছাড় ওই পুরুষটির হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবে। যত ছোট তোমায় ভেবেছিলাম তত ছোট তুমি নও। তোমাকে এড়িয়ে যাওয়া বোধহয় এ জীবনে আমার আর হল না।"
-- না গাড়ির কোন সমস্যা নয়। চা খাবে? নেমে এসো
-- না আমি চা খাবো না। তুমি খেলে তাড়াতাড়ি খেয়ে এসো। দেরি হচ্ছে বাড়ি যেতে হবে?
-- আরে বাবা আমি সাথে আছি তো। ঠিক পৌঁছে দেবো।
-- তোমার পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্ন নয়। 
-- তবে 
 ময়ূর গভীরভাবে অর্পণের দিকে তাকায়। ময়ূরের চোখের দিকে তাকিয়ে অর্পণ সঙ্গে সঙ্গে চোখটা নামিয়ে নেয়। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে বাইরে থেকে ময়ূরের কাছে এসে দরজাটা খুলে দিয়ে বলে,
-- এসো কিছু খাই
 -- আমি তোমায় ঠিক বুঝতে পারছি না বিশ্বাস করো। আমি কী চাই তুমি জানো কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না তুমি কী চাও?
-- কিচ্ছু চাই না। যা হচ্ছে তাকে আটকিও না। হতে দাও। তৃতীয় শক্তির উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এই অভাগাকে চা খাওয়ার একটু সঙ্গ দাও।
 অর্পণের এই কথা শুনে ময়ূরের হাসি পেলেও সে গম্ভীরভাবে সিটবেল্ট খুলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। অর্পণ ওকে নিয়ে একটা কপিসফে ঢুকে গেলো। ময়ূর চুপচাপ। 
 বার্গার আর ধোঁয়া ওঠা কফি 
-- আর কথা নেই? এত চুপচাপ কেন?
-- কী শুনতে চাইছো বলো? বারবার এককথা শুনতে বা বলতে ভালো লাগে না
-- যতটা ছোট তোমায় ভেবেছিলাম তুমি ঠিক ততটা ছোট নও। বুদ্ধিতে তুমি অতিশয় পাঁকা। উকালতিটা পড়লে নাম করতে পারবে।এতদিন তো এত কথা তোমার সাথে বলিনি তাই আমি বুঝতেও পারিনি তুমি এত সুন্দরভাবে এত স্পষ্ট কথা বোলো। 
-- তুমি কি আমায় এখানে আনলে আমার গুণকীর্তন করার জন্য।
-- শোনো ময়ূর, রাগ কোরো না। একটা কথা বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমার চেয়ে বয়সে বারো বছরের বড়। আমার একটা অতীত আছে। আবারও যেকোন সময় এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। তুমি পাগলামি কোরো না। বিষয়টা একটু বোঝার চেষ্টা করো।
-- আমারও একটা অতীত আছে যেটা তুমি জানো। আর আমার সেই অতীত নিয়ে ঘাঁটতে গেছিলে বলেই ওই ঘটনাটা ঘটেছিল। আবার পুণরায় তারা আমাকে একইভাবে কিডন্যাপ করতেই পারে -
 অর্পণের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। চোখদুটো পাকিয়ে ময়ূরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-- ফালতু কথা আর কোনদিনও বলবে না। আজই যেন এই কথা এখানেই শেষ হয়
-- কোনটা ফালতু আর মিথ্যে কথা
-- মিথ্যে কথা তো আমি বলিনি। আমি বলেছি কিডন্যাপের প্রসঙ্গ আর কখনোই তুলবে না।
 ময়ূর হা করে অর্পণের দিকে তাকিয়ে। মনেমনে ভাবছে,
"হায় রে কঠোর পুরুষ! বুক ভেঙে গেলেও মুখে প্রকাশ করতে পারছো না? আমি বুঝে গেছি তুমিই হচ্ছ আমার জীবনের সেই স্বপ্নের পুরুষ।"
 অর্পণ ওই একটি কথা বলে বিল মিটিয়ে হনহন করে বেরিয়ে এলো। আসবার সময় অবশ্য ময়ূরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-- এসো
 ব্যাস অর্পণ আর কোন কথা বলল না যতক্ষণ গাড়ি চালানো। বাড়ির কিছুটা দূরে রাস্তার উপর ময়ূর গাড়ি থেকে নামলো। কেন কিসের জন্য ময়ূর ওখানে নামতে চাইলো অর্পণ একবারের জন্যও জানতে চাইলো না। ময়ূর নামার সময় শুধু বলল,
-- সাবধানে যেও।

  ময়ূর নামার পর গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। সবে লাইটপোস্টগুলোতে রাস্তায় আলো জ্বলে উঠেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। অর্পণের গাড়িটার টেইল লাইট যতক্ষণ দেখা গেল, ততক্ষণ তার চোখ সেদিকেই আটকে রইল। যেন আলোটা মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের ভেতরেও একটা শূন্যতা তৈরি হল।
ময়ূর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
--এতটা দূরত্ব কেন রাখো তুমি অর্পণ? কাছে এসে আবার নিজেই সরে যাও। কেন মন খুলে মনের কথাগুলো বলতে পারছো না? বয়সের ডিফারেন্স কী সত্যিই তোমার সাথে আমার অনেকটা? শুধুমাত্র কারণ কি এই একটাই? নাকি অন্য কোন কারণ আছে?
   ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল সে। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা অন্যরকম। অর্পণের চোখের সেই এক মুহূর্তের দৃষ্টি—ঠান্ডা, নির্লিপ্ত, অথচ গভীরে যেন একটা ঝড়—ওটা সে ভুলতে পারছে না।
ওদিকে অর্পণ গাড়ি চালাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন আর স্টিয়ারিংয়ে নেই। 
হঠাৎ করেই ব্রেক কষে গাড়িটা রাস্তার এক পাশে দাঁড় করাল সে।
স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে মাথাটা একটু নিচু করে ফিসফিস করে বলল, "কেন এলে আমার জীবনে তুমি, ময়ূর? তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েও ফেরাতে পারছি নাতো আমি? বারবার জড়িয়ে যাচ্ছি তোমার সাথে আমি। তোমাকে না দেখতে পেলে আমারও যে ভালো লাগছে না। আমি তো তোমাকে নিয়ে কখনোই ভাবিনি। মাত্র কয়েকটা মুহূর্তের দুর্বলতায় কেন তোমায় নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি আমি? তোমার প্রতি যে দুর্বার আকর্ষণ সেই রাতে ছাদে বসে কথা বলার পর থেকে আমি অনুভব করছি তার থেকে আমি কিভাবে বেরোব?"
  তারপর নিজেই একটু হেসে উঠল "মেয়েটা সত্যিই একটা পাগলী। এই পাগলীর হাত থেকে মুক্তি কীভাবে পাবো?"
 "সত্যিই কি আমি ওর থেকে মুক্তি পেতে চাইছি? তাহলে আজ ও যখন বলল বাসে চলে যাবে তখন কেন জোর করে ওর সাথে এতটা সময় কাটালাম?" ক্রিমিনাল কোর্টের ডাকসাইটে উকিল অর্পণ মজুমদারের ক্যালকুলেশন ঠিক হচ্ছে না। হেরে যাচ্ছে সে। কিন্তু চেষ্টা করতেই হবে। বয়সের এত ব্যবধানে জীবনটা জড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতটা সুখের নাও হতে পারে।
   কিন্তু যতই নিজেকে বোঝাতে চাইছে, ততই যেন ময়ূরের মুখটা সামনে ভেসে উঠছে।তার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা, তার চুপচাপ এতদিন ধরে ভালোবেসে যাওয়া যা সে কখনোই স্বপ্নেও কল্পনা করেনি ময়ূরের তার প্রতি এই দুর্বলতার কথা।
অর্পণ চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
-- দূরে থাকাই ভালো। ওর জন্যও, আমার জন্যও। কিন্তু সত্যিই কি বারো বছর ডিফারেন্স একটা মারত্মক কিছু?
 অর্পণের মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চোখের উপর শুধু ময়ূরের মুখ। পাগল হয়ে যাবে সে এই মেয়েটার পাগল করা ভালোবাসায়। 
  গাড়িটা আবার স্টার্ট দিল সে। কিন্তু এবার গতি একটু কম। যেন কোথাও পৌঁছানোর তাড়া নেই আর।
এদিকে ময়ূর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই বিছানায় বসে পড়ল। তার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি।
"তুমি হেরে যাচ্ছ অর্পণদা। নিজেকে আড়াল করতে পারছো না।তুমি যতই দূরে যাওয়ার চেষ্টা করো পারবে না কারণ আমি সেটা করতে দেবো না। আমি কিন্তু থামবো না অর্পণদা কারণ আমি বুঝে গেছি তুমিও আমায় ভালোবাসো। মুখে স্বীকার করছো না কিন্তু তোমার আচারআচরণ আর স্বীকার না করার নীরবতাই তোমার স্বীকারোক্তি।"
   জানলার বাইরে তাকিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে রইল সে। দূরে একটা তারা ঝিলমিল করছে।
ময়ূর ধীরে ধীরে বলল, 
"একদিন তুমি নিজেই আমার কাছে এসে সবকিছু স্বীকার করবে। আমি অপেক্ষা করবো। কিন্তু এই অস্থিরতা নিয়ে কাজে মন দিতে পারবে তো? পারবে না,কিছুতেই পারবে না। এই কেসটাই তুমি ডাহা হেরে গেলে।"
 ময়ূরের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে চোখ বন্ধ করে অর্পণের প্রতি তার ভালোবাসার অনুভবে সিক্ত হতে থাকে। 
  ময়ূর ঠিক করে যতদিন না অর্পণ তার ভালোবাসার কথা তাকে মুখ ফুটে  বলছে ততদিন সে তাদের বাড়ি যাবে না। সেও দেখতে চায় অর্পণ কতদিন মুখ বন্ধ করে থাকতে পারে। 
  ফ্রেস হয়ে জামাকাপড় পাল্টে মায়ের কাছে যায়। সেখানেই বাবা বসে।  ওকে দেখতে পেয়ে বাবা বললেন,
-- কার গাড়ি করে আসলি?
 যে কারণে বাড়ির সামনে নামেনি ঠিক সেই কথাটাই বাবার কানে চলে এসেছে 
-- অর্পণদার। রাস্তায় দেখা হল তাই পৌঁছে দিয়ে গেলো। 
-- ওহ্।তুই তো একটা উবের ধরেই চলে আসতে পারতিস 
-- অর্পণদা তো ভালো মানুষ বাবা।
-- সে আমি জানি। কিন্তু লোকে তো আর ভালোভাবে নেয় না
-- তুমি তো জানো বাবা লোকের কথাই আমার কিচ্ছুটি যায় আসে না

ক্রমশ

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৭)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৭)
  জন্মদিন থেকে আসার পর বেশ কিছুদিন ধরেই ময়ূর অর্পিতাদের বাড়ি যাচ্ছে না। অর্পিতা বারবার ফোন করে তাকে যেতে বলায় সে শরীর খারাপের অজুহাতে আর আসেনি। এরমাঝে একদিন অর্পিতা এসে ঘুরে গেছে ওদের বাড়ি। বারাসাত থেকে একটু ভিতরের দিকে অর্পিতাদের বাড়ি হওয়ায় বাস থেকে নেমে অটো ধরে তারপর পৌঁছাতে হয়। এই এতটা পথ জার্নি করে শুধুমাত্র অর্পণের টানেই ময়ূর ওদের বাড়িতে যাতায়াত করে। কিন্তু জন্মদিনের ঘটনার পর সে অর্পণদের বাড়ি যাওয়া একদম বন্ধ করেই দিয়েছে। ময়ূর মনেকরে অর্পণের যদি বিন্দুমাত্র তারপ্রতি কোনরকম অনুভূতি থাকে তাহলে সে অর্পিতাকে বলবে তাকে যাওয়ার কথা নতুবা সে ফোন করবেই।
 এদিকে অর্পণও একটু চুপচাপ হয়ে যায়। অফিস থেকে ফেরেও বেশ তাড়াতাড়ি। অর্পিতা একদিন জিজ্ঞাসা করেই বসলো,
-- হ্যাঁরে দাদা কী হয়েছে তোর? আমার মনেহয় তুই যেন সারাক্ষণ কী ভাবিস? একটু চুপচাপ হয়ে গেছিস, অফিস থেকে বাড়িতে বেশ তাড়াতাড়িই ফিরিস।
-- তুই কি আমার উপর গোয়েন্দাগিরি শুরু করলি নাকি? একটা কেস নিয়ে খুব টেনশনে আছি। ওটা নিয়েই ভাবি 
-- হ্যাঁ সে আমি জানি কেসটা খুব জটিল 
-- মানে তুই কীকরে জানবি আমি কোন কেসটা নিয়ে টেনশনে আছি - 
-- আরে বাবা জানি, জানি। তুই না বললেও কিছুটা আন্দাজ করতে পারি 
 অর্পণ বোনকে আর বেশি ঘাটায় না। সে উঠে গিয়ে বুকশেলফ খুলে একটা মোটা বই বের করতে করতে বলে,
-- কেসটা নিয়ে একটু স্ট্যাডি করতে হবে। তুই আর বিরক্ত করিস না
 অর্পিতা হেসে পড়ে বলে,
-- তুই যে কেসটা নিয়ে ভাবছিস ওটা ওই বইয়ের পাতায় পাবি না। ওটা নিজের মনেই ভাবতে হবে
-- কী সব উল্টোপাল্টা কথা বলিস যে। বেরো এখন এখান থেকে। এখন থেকেই চেষ্টা কর চাকরির পরীক্ষাগুলো দিতে। রেজাল্ট বেরোনোর তো সময় হয়ে গেলো। 
 হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বলে বসলো,
-- হ্যাঁরে ময়ূরের কী খবর? সেই জন্মদিনের পরে আর দেখিনি আর আসেনি?
 অর্পিতা মনেমনে বলে, "পথে এসো চাদু" তারপর দাদার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- কিছুদিন ধরে ওর শরীরটা খুব খারাপ। ফোন করেছিলাম। বলল, বাড়ি থেকে মোটেই বেরোতে পারছে না। শরীর খুব দুর্বল
 অর্পণের চোখে মুখে উদ্বিগ্নতা অর্পিতার নজর এড়ায় না -
-- কেন কী হয়েছে? ডাক্তার দেখিয়েছে? ডাক্তার কী বলেছেন?
-- তুই এত প্রশ্ন করছিস কেন? ও তো আমার বন্ধু। তোর উদ্বিগ্নতা আর প্রশ্ন শুনে মনেহচ্ছে ওর জন্য তোর খুব টেনশন হচ্ছে
 অর্পণ বুঝতে পারে এভাবে কথাগুলো বলা হয়ত ঠিক হয়নি। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-- আরে না এতদিন ধরে আমাদের বাড়িতে আসছে। আমাদের সাথে তো ওর একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অসুস্থ হয়েছে তাই জানতে চাইছি 
-- হ্যাঁ সেতো আমি বুঝতেই পেরেছি। আমায় খুলে ঠিক বলেনি ওর কী হয়েছে। দেখ তুই ফোন করে তোকে বলে কিনা - 
 অর্পণ অবাক হয়ে জানতে চায়
-- আমি ফোন করবো?
-- কেন তাতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?
 অর্পণ আর কোন কথা না বলে হাতে ধরা বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে।
 অর্পিতা বেরিয়ে যায়। এইভাবে আরও বেশ কয়েকটা দিন কেটে যায়। একদিন ধর্মতলায় একটি কাজ থেকে ফেরার পথে সে দেখে ময়ূর বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। অনেক দূর থেকে ওকে দেখতে পেয়ে একদম ওর সামনে এসে গাড়িটা দাঁড় করায়। আচমকা একটা গাড়ি সামনে দাঁড়াতে দেখে ভয়ে সে কিছুটা পিছিয়ে যায়। 
  গাড়ির কাঁচটা আস্তে করে নামিয়ে দিল সে। মুখটা কাঁচ  থেকে বের করে বলল,
-- ময়ূর, ভয় পেয়ে গেলে নাকি ?
ময়ূর একটু থমকে দাঁড়ায়। চোখ কুঁচকে ভালো করে তাকিয়ে চিনতে পারে,অর্পণ। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে ওঠে।
-- ভয় পাবো না? এভাবে হঠাৎ সামনে গাড়ি নিয়ে তুমি দাঁড়াবে, সেটা আমি বুঝবো কী করে?
তার গলায় বিরক্তি থাকলেও ভিতরে লুকিয়ে থাকা স্বস্তিটা অর্পণের চোখ এড়ায় না।
অর্পণ হালকা হেসে দরজাটা খুলে দেয়
-- ওঠো, বাড়ি যাবে তো? নামিয়ে দেব।
-- রাস্তাটা সম্পূর্ণ তোমার বাড়ির উল্টো দিক। কোন দরকার নেই। আমি বাসেই চলে যেতে পারবো
-- এত রাগের কথা। এত রাগ ভালো নয়। একটু মাথা ঠাণ্ডা করে একবার সব ভাবলেই বুঝে যাবে কেন কিসের জন্য সেদিন ওই কথাগুলো বলেছি।
-- কী বুঝবো? বয়স তোমার থেকে কম হতে পারে কিন্তু এত কম নয় যে তোমার অযৌক্তিক যুক্তি আমি বুঝতে পারিনি
-- আরে বাবা ঠিক আছে। আস্তে , এটা রাস্তা। উঠে এসো। সবাই দেখছে তো। গাড়িতে বসেই ঝগড়া করবো দু'জনে 
ময়ূর একবার চারপাশে তাকায়। ধর্মতলার ভিড়, বাসের লম্বা লাইন, হর্নের শব্দ সব মিলিয়ে যেন আরও অস্বস্তিকর লাগছে। তবুও একটু দ্বিধা নিয়ে বলে,
— না বললাম তো দরকার নেই। আমি বাসেই চলে যাব।
অর্পণের গলাটা এবার একটু গম্ভীর—
—  খুব জেদ করছো কিন্তু। এবার ঠিক বকা দেবো।এই ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা খুব সেফ না। আর আমায় তুমি চেনো না? গাড়ি থেকে নেমে জোর করে গাড়িতে তুলে নেবো কিন্ত
-- সে জোর আমার প্রতি তোমার আছে? উহু মনে হয় না
-- আচ্ছা সব কথার উত্তর আমি গাড়িতে বসেই দেবো। এবার তো ওঠো 
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে ময়ূর। তারপর ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসে। দরজা বন্ধ হতেই বাইরের কোলাহলটা যেন একটু দূরে সরে যায়।
গাড়ি চলতে শুরু করে। কয়েক মিনিট কেউ কথা বলে না। শুধু হালকা একটা সুর বাজছে গাড়ির ভেতরে।
অর্পণ সেটা বন্ধ করে দিয়ে হঠাৎ বলল—
-- এড়িয়ে যাচ্ছো আমায়? আচ্ছা আমি তো একা ওই বাড়িতে থাকি না। তোমার বন্ধুটিও তো থেকে। তাহলে সেদিনের পর আর যাওনি কেন?
প্রশ্নটা শুনে ময়ূরের হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আসে। সে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে
-- এড়িয়ে যাচ্ছি না ব্যস্ত ছিলাম। আর কেনই বা তোমায় এড়িয়ে যাবো বলো তো? তুমি তো আমার কেউ হও না। বন্ধুর দাদা। হঠাৎ তোমার এটাই মনেহল কেন যে আমি তোমার জন্যই ওই বাড়িতে যাচ্ছি না
অর্পণ একটু হেসে বলে
-- তুমি মিথ্যে বললে খুব সহজে ধরা পড়ে যাও জানো? আর তাছাড়া অর্পিতা বলল তোমার শরীর খারাপ তুমি বলছ ব্যস্ত ছিলে। আসল সত্যিটা কী?
-- আসল সত্যিটা কী তুমি জানো না? নাকি জেনেও আমার মুখ থেকে আর একবার শুনতে চাইছো? সেদিন শুনতে কি ভালো লেগেছিল?
 অর্পণ হেসে দেয়। এই মেয়েটাকে সেও যে সত্যিই ভালবাসতে শুরু করেছে সেটা সে মুখে স্বীকার না করলেও তার অন্তর জানে।
-- এত স্পষ্ট কথা বোলো বলেই তো তোমায় আমি --
অর্পণ চুপ করে যায় 
ময়ূর এবার মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। চোখে একটু অভিমান, একটু অস্বস্তি
-- কী আমায় কী? ভালোবাসো ? নাকি একদম পছন্দ করো না? কোনটা?
গাড়ির ভেতরের বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। অর্পণ স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করে ধরে। প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,
-- রেজাল্টের কিন্তু সময় হয়ে গেলো। আরও স্ট্যাডি করবে নাকি চাকরির চেষ্টা করবে?
ময়ূর চুপ। শুধু বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছে।
গাড়ি তখন শহরের ভিড় পেরিয়ে একটু ফাঁকা রাস্তায় উঠেছে
আর তাদের দুজনের মাঝের অজানা দূরত্বটা যেন ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
 -- উত্তর দিলে না? কী ভাবছো ভবিষ্যত নিয়ে?
-- আপাতত যেটা নিয়ে ভাবছি তার একটা হিল্লে না হওয়া পর্যন্ত অন্য কিছু নিয়ে ভাবলেও মন দিতে পারবো না।
-- বাব্বা রে! মেয়ে তো সাংঘাতিক! এর তো মুখে কিছুই আটকায় না দেখছি 
-- হ্যাঁ আমি এরকমই। মনে এক মুখে আর এক এরকম আমি হতে পারবো না। 
-- আচ্ছা ঠিক আছে বুঝলাম। আমায় একটা মানুষের  নাম বলো যার মন আর মুখ আলাদা কথা বলে। এটা হয় না গো। মানুয়ের যেটা মনে থাকে সেটাই মুখে প্রকাশ করে --
-- কেন অর্পণদা, তোমার তো মন যে কথা বলে মুখে তো সে কথা আসে না ?
 অর্পণের গাড়িটা হঠাৎ করেই ব্রেক কোষে দাঁড়িয়ে পড়লো - আর ময়ূর অবাক হয়ে অর্পণের দিকে তাকিয়ে

ক্রমশ

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৬)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৬)
অর্পণ একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। ময়ূরের সেই নীরব হাসি যেন তার বুকের ভেতরের লুকোনো কথাগুলো এক এক করে টেনে বাইরে আনতে চাইছে।
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ। বাইরে রাতের হাওয়া হালকা শব্দে জানলার পর্দা নাড়িয়ে দিচ্ছে।
ময়ূর ধীরে ধীরে বলল,
---তুমি পালিয়ে এসেছো অর্পণদা নিজের কাছ থেকে।
অর্পণ এবার মাথা তোলে। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু তাতে লুকোনো আছে একটা অদ্ভুত ভয়।
--সবকিছু এত সহজ না ময়ূর। কিছু সম্পর্ক, কিছু অনুভূতি, ভুল সময়ে এসে পড়ে।
--নাকি আমরা সময়কে অজুহাত করি? 
 শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে ময়ূর।
অর্পণ একটু হেসে ফেলে, কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই।
-- তুমি বুঝবে না। তুমি এখনো অনেক ছোট।
ময়ূর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
-- আমি ছোট? আমার বয়স বাইশ বছর অর্পণদা। আর তুমি কি কখনো চেষ্টা করে দেখেছো আমাকে বুঝতে দেওয়ার? 
এবার ময়ূরের গলায় দৃঢ়তা।
কথাটা শুনে অর্পণ চুপ করে যায়। হঠাৎ করেই তার মনেহয় ময়ূরের কাছে সে ধরা পড়ে গেলেও কিছুতেই স্বীকার করা যাবে না তার ভিতরের দুর্বলতা। সে তার বোনের বন্ধু। তার থেকে অনেক ছোট।
মুহূর্তটা যেন থমকে দাঁড়ায়।
ময়ূর একটু এগিয়ে এসে বলে,
-- তুমি কিছু ভাবছো ।আমার মনেহচ্ছে তুমি ভয় পাচ্ছো কারণ তুমি জানো, তুমি যা অনুভব করছো সেটা সেটা আমি বুঝে ফেলেছি। কিন্তু তুমি স্বীকার করতে চাইছো না কারণ আমি তোমার ছোটবোনের বন্ধু এবং আমাদের বয়সের পার্থক্যটা অনেক।
অর্পণের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন আরও জোরে শোনা যায়।
সে ধীরে বলে,
-- কিছু অনুভূতি আছে যা স্বীকার করলে অনেক কিছু ভেঙে যায় তখন সেই অনুভূতিকে যেভাবেই হোক আটকে রাখতে হয়
-- অপরের প্রতি অনুভূতি স্বীকার না করে নিজে কষ্ট পাওয়ার অর্থটা আমার জানা নেই। আমাকে যদি একটু বুঝিয়ে বলতে ভালো হত। তুমি কি সত্যিই তোমার অনুভূতি স্বীকার করতে চাও না?— ময়ূর প্রশ্ন করে।
-- তুমি এখান থেকে যাও এখন। আমাকে একটু একা থাকতে দেও।
-- তুমি বললে এ বাড়ি থেকেই আমি চলে যেতে পারি এই মুহূর্তে। কিন্তু আমার যে উত্তরটা পাওয়া হয়নি -
অর্পণ এবার সরাসরি ময়ূরের দিকে তাকায়।
প্রথমবারের মতো তাদের চোখে চোখ পড়ে, কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো আড়াল নেই।
ময়ূর আস্তে করে বলে,
--আমি তোমার জীবনে ঝড় হতে চাই না অর্পণদা, কিন্তু তুমি যদি আমাকে এড়িয়ে যাও, তাহলে সেই ঝড়টা তোমার ভেতরেই চলবে। আর সেই ঝড় থেকে তুমি কোনদিনও বেরোতে পারবে না।
অর্পণের ঠোঁট কাঁপে। অনেকক্ষণ পর সে ফিসফিস করে বলে,
 -- নিজের জীবন গুছিয়ে নাও। আমার সাময়িক দুর্বলতাকে স্থায়ী কিছু ভেবে বসে থাকলে তোমারই ক্ষতি
ময়ূর মৃদু হেসে উত্তর দেয়,
-- তোমার সাময়িক দুর্বলতা হতে পারে কিন্তু আমার তো তা নয়। দিনের পর দিন হাসপাতালে তোমার পাশে বসে থেকে একদৃষ্টে তোমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমার মনের ভিতরে যে ঝড় উঠেছে সেটা তো সাময়িক নয়। তুমি যদি ভেবে থাকো সেই হাসপাতালে তুমি যতদিন ছিলে আমার জন্য তোমার ওই অবস্থা হয়েছে বলে কৃতজ্ঞতাবশত আমি গেছি তোমার পাশে থেকেছি তা নয় কিন্তু। আমার মনের তাগিদে বলতে পারো আমার ভালোবাসার তাগিদে আমি গেছি। ওই ক'টামাস আমার কীভাবে কেটেছে তার খবর কোনদিনও জানতে পারোনি। আমি কিভাবে বেঁচে ছিলাম কোনদিনও বুঝতেও পারোনি। কলেজ না থাকলে রোজ সন্ধ্যায় কেন তোমাদের বাড়িতে আসি কোনদিনও বোঝার চেষ্টা করোনি 
আবার নীরবতা।
কিছুক্ষণ পরে ময়ূর আবার বলে,
-- ঠিক আছে। তুমি যদি এই সম্পর্কে রাজি না থাকো আমি আর কোনদিনও তোমায় কিচ্ছু বলবো না। তুমি যদি এইভাবেই ভালো থাকতে পারো আমি কোনদিনও তোমার সামনে এসে দাঁড়াবো না। আর একবার বলি,শুভ জন্মদিন। খুব ভালো থেকো। ঈশ্বর তোমার সব মনের আশা যেন পূরণ করেন।
      বাইরে হাওয়া একটু জোরে বয়ে যায়।অর্পণ চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নেয়।
তার ভিতরের ঝড়টা এখনও থামেনি, হয়ত এই ঝড় আর কোনদিনও থামবে না। 
   ময়ূর অর্পণের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ডাইনিংয়ে যায়। অর্পিতা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে বিরাট কিছু ঘটে গেছে। তবুও ময়ূর নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েই বলে,
-- অর্পি অনেক রাত হল খেতে দে। বাড়ি যেতে হবে তো?
-- তোর মুখটা এরকম লাগছে কেন? কী হয়েছে? দাদার সাথে কী কথা হল? 
-- বলার মত কোন কথা নয়। এটা ওটা আলোচনা করছিলাম।
-- তাই কি?
 ময়ূর হেসে পড়ে বলে,
-- ওরে আমার খিদে পেয়েছে। অর্পিতার মা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি মেয়েকে বলেন,
-- কথা পরে আগে ওকে খেতে দে। রাত অনেক হয়েছে।
 অর্পিতা আর কথা না বাড়িয়ে ময়ূরকে চিকেন কষা আর ফ্রাইড রাইস যা সে নিজের হাতে করেছে সাথে দই, মিষ্টি, পায়েস খেতে দিল। ময়ূর সামান্য খেয়ে উঠে যেতে গেলে অর্পিতা হাত ধরে তাকে পুণরায় বসিয়ে দিলো।
-- রাগ হয়েছে দাদার উপর। খাবারের উপর রাগ করছিস কেন?
-- এমা! অর্পণদার উপর রাগ করবো কেন?
-- তুই মনেহয় ভুলে যাচ্ছিস আমিও একটি মেয়ে। আমার চোখে কিছুই পড়ছে না এটা ভাবলি কী করে? আমি কি কিছুই বুঝতে পারি না।
 ময়ূর চুপ করে আছে। মাথা নিচু।
-- একটু সময় দে দাদাকে। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। এতদিন তোকে একদৃষ্টিতে দেখেছে সেখান থেকে বেরোতে তো তার সময় লাগবে।
 ময়ূরের বলতে ইচ্ছা করছে, "তোর দাদার চোখে আমি আমার জন্য ভালোবাসা দেখেছি - " কিন্তু সে কোন কথা না বলে চুপচাপ থালার খাবার নাড়াচাড়া করে যাচ্ছে।
-- আজকে দাদার জন্মদিনে এটাই সেরা গিফট। আজ একসেপ্ট করেনি একদিন দেখবি ঠিক একসেপ্ট করবে।
  ময়ূর মাসিমা,মেসোমশাইকে বলে বেরিয়ে পড়ে। আজ আর অর্পণকে সে বলে আসে না।অর্পিতা গিয়ে দাদার ঘরে ঢুকে দেখে দাদা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।
-- ময়ূরের কী হয়েছে রে?
-- আমি কীকরে জানবো তার কী হয়েছে? 
-- না, আমি ভাবলাম তুই আর ও বসে গল্প করছিলি তাই হয়ত তুই জানবি। 
-- না আমি কিছু জানি না।
-- আচ্ছা চল রাত হয়েছে খাবি চল। মা,বাবাও বসে আছেন একসাথে খাবেন বলে।
-- ময়ূর খেয়েছে ও চলে গেছে?
-- হ্যাঁ ও অনেকক্ষণ চলে গেছে। কেন তোকে বলে যায়নি? ও তো  সকলকে বলেই বেরোয়।
 অর্পণ সে কথার উত্তর না দিয়ে উঠতে উঠতে বলে,
-- চল অনেক রাত হয়েছে খেয়ে নিই।
  অর্পণ খেয়েদেয়ে ঘরে এসে তার ঘর লাগোয়া বারান্দায় এসে বসে। আজকে ময়ূরের প্রতি তার সাময়িক দুর্বলতার রেশ সে এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ধরা পড়ে গেছে সে ময়ূরের কাছে এটাই হয়েছে তার কাছে বেশি লজ্জার। ময়ূরকে কোনদিনও সে সেভাবে দেখেইনি। বোনের বন্ধু ব্যাস ওইটুকুই। কিন্তু ময়ূর তাকে যে অনেকদিন ধরে ভালোবাসে আজই সে প্রথম ময়ূরের মুখ থেকেই শুনেছে। ময়ূর এখানে আসলেই বাড়ি চলে যাওয়ার সময় সকলকে ধরে ধরে বলে যায়। আজ প্রথম এর ব্যতিক্রম হল। অর্পণ মনে মনে ভাবে সামান্য অসতর্কতায় সে ময়ূরের কাছে ধরা পড়ে গেলো। ময়ূরকে তো কোনদিনও সেই চোখে সে দেখেনি। তাহলে কেন আজ এত দুর্বল হয়ে পড়ল?
 ময়ূর সেদিন বাড়িতে ফেরার পর খুবই আপসেট ছিল। এসে ফ্রেস হয়েই শুয়ে পড়েছিল। অনেক রাতে বেশ কয়েকবার অর্পিতার ফোনের পর ঘুম থেকে জেগে সে ফোন রিসিভ করে। কিন্তু কোন কথা আর হয় না যেহেতু সে ঘুমিয়ে পড়েছিল অর্পিতা তাকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করে না। কিন্তু অর্পিতা এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে দাদা ময়ূরের ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করে নিজেও খুব একটা ভালো নেই। সময় লাগবে সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যেতে। তবে এই সম্পর্কটা গড়ার জন্য তাকেও কিছুটা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে ময়ূরের জন্য। আর এর জন্য সে প্রস্তুত।

ক্রমশ 

Sunday, May 24, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৫)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৫)
 বহুদিন পরে বাড়িতে আজ খুশির আমেজ। আজ অর্পণের জন্মদিন। সেভাবে জাঁকজমক করে জন্মদিন পালন না হলেও এবারের জন্মদিনে নিমন্ত্রিত ময়ূর। অর্পিতা বুঝতে পেরেছে তার দাদার প্রতি ময়ূরের দুর্বলতা। 
 প্রায় বারো বছরের বয়সে বড় অর্পণ স্বপ্নেও সেকথা মনে আনেনি। সে তার বোনের বন্ধু অর্থাৎ কিনা তার আর একটি বোন এভাবেই কথা বলে থাকে। কিন্তু ময়ূর যে আস্তে আস্তে অর্পণকে মনের মধ্যে অনেকটাই জায়গা দিয়ে ফেলেছে সে কথা অর্পণ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। নিজের থেকে এতটা ছোট একটা মেয়ের সম্পর্কে এসব কথা তার অবচেতনেও মাথাতে আসেনি।
  অর্পণের জন্মদিনের বিকেলটা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে গড়াতে থাকল। অর্পিতা দুপুরেই ময়ূরকে আসতে বলেছিল। কিন্তু ময়ূর বলেছিল,
-- না আমি সন্ধ্যাতেই আসবো
-- কেন সেজেগুজে এসে কাকে দেখাবি বলতো?
 ময়ূর একটু লজ্জা পেয়ে গেলেও ধরা দিলো না। সে বলল,
-- প্রথমত মানুষ সাজে তার মানসিক শান্তির জন্য। দ্বিতীয়ত কেউ যদি তার সেই সাজকে প্রশংসা করে তাহলে সেই সাজের আনন্দ আর মানসিক শান্তি অনেক অনেক গুন বেড়ে যায়।
-- তাহলে তুই বলতে চাইছিস মানুষ কাউকে দেখানোর জন্য সাজে না?
-- না তাতো আমি বলিনি। অনেক সময় মানুষ নিজেকে এমনভাবে তৈরি করে যাতে তার প্রিয়জন খুশি হয়। সে শুধু সাজ কেন? রান্নাবান্না, কথাবার্তা, আচারআচরণ - সবকিছুতেই হতে পারে।
-- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে তুই তোর মানসিক শান্তির জন্যই সেজে আসিস। কিন্তু দুপুরবেলা আসলে ভালো লাগতো। আমরা তো নিজের নিজেরাই। 
 -- নারে হবে না। তাহলে আমি চলেই আসতাম।
-- তাহলে একটু তাড়াতাড়িই আসিস।
-- ওক্কে ইয়ার

     বাড়ির ছোট্ট ড্রয়িংরুমে কেক, কিছু সাধারণ সাজসজ্জা আর মাত্র দুটি বাচ্চা হাসি-আড্ডায় একটা উষ্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অর্পিতা বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে—ময়ূর এখনও আসেনি। দাদাকে বেশ কয়েকবার তাগাদা দিয়েছে নতুন পাঞ্জাবি পায়জামাটা পরে আসার জন্য। অর্পিতা রক্ষা পেয়েছে আজ রবিবার তাই। তানাহলে তো দাদার ফিরতে হয়ত রাত কাবার হয়ে যেত। 
 সাধারণত অর্পণ, অর্পিতার জন্মদিনে মা একটু পায়েস করে দেন আর একটু বাজারটা সেদিন অন্যরকম হয়। কিন্তু এবার অর্পিতার ইচ্ছার কারণেই এইভাবে আয়োজন। 
অবশেষে কলিংবেলের শব্দ। দরজা যদিও খোলাই ছিল কিন্তু তবুও ময়ূর বেল বাজিয়েই ভিতরে এলো। অর্পিতা ঠিক বুঝতে পেরেছে এটা ময়ূরই -
 হালকা হলুদ  রঙের শাড়ি আর লাল ব্লাউজ হাতে একটা ছোট্ট গিফট প্যাকেট চোখে একটু কৌতূহল আর লাজুক হাসি।  কাঁধে ঝুলছে ছোট সাদা পুঁতির একটা ব্যাগ। বেশ মিষ্টি লাগছে দেখতে ওকে
 এই প্রথম ময়ূরকে শাড়ি পরা দেখে অর্পণ। প্রথম অবস্থায় যেন একটু হোঁচট খায়। কারণ এতদিন ধরে তাকে সালোয়ার কামিজ কিংবা জিন্স,টপে দেখে অভ্যস্ত। এক নিমেষেই অর্পণের মনেহল মেয়েটা বেশ বড় হয়ে গেছে তো।
 অর্পণকে দেখতে পেয়েই -
— “শুভ জন্মদিন অর্পণদা,” একটু ইতস্তত করেই বলল সে।
অর্পণ হেসে বলল,
— আরে, এত ফরমাল কেন?  তুমি তো শাড়ি পরে বেশ বড় হয়ে গেছো। খুব সুন্দর লাগছে দেখতে তোমাকে।
-- দাদা, তোর জন্মদিনে তো আমিও শাড়ি পরেছি,সেজেছি। কই তুই তো একবারও আমায় বলিসনি কেমন লাগছে আমায় -
-- ও বলিনি তোকে? কী আর বলবো তোকে ? পেত্নীকে সাজলে আর কতই না ভালো লাগবে বল?
 হাত উঁচু করে অর্পণকে মা*রতে  এগিয়ে গেলো অর্পিতা আর অর্পণ ফুড়ুৎ করে ঘরের ভিতরে দৌড় দিলো।
ময়ূর ঘরে ঢুকতেই অর্পিতা চোখ টিপে হেসেছিল। --শুনলি দাদার চোখে তোকে ভালো লাগছে আর আমায় পেত্নী লাগছে। তোকে যে কবে থেকে দাদার ভালো লাগতে লেগেছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না
-- অর্পি বড্ড বেশি কথা বলছিস তুই 
কিন্তু সে যেন সবটাই উপভোগ করছে।
কেক কাটার সময় সবাই “হ্যাপি বার্থডে” গাইছে, কিন্তু ময়ূরের চোখ শুধু অর্পণের দিকেই। অর্পণ মোমবাতি নিভিয়ে যখন কেক কাটল, এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখাচোখি হলো। অর্পণ সেটা খুব স্বাভাবিকভাবেই নিল, কিন্তু ময়ূরের বুকের ভেতর যেন ধক করে উঠল।
 আসলে ভালোবাসা তো কোন বয়স, সম্পর্ক, ধর্ম কিচ্ছু মানে না। যে কোন সময় যে কাউকেই ভালো লাগতে পারে আর সেই ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা জন্ম নিতেই পারে।
কেক খাওয়ানোর সময় অর্পিতা ইচ্ছে করেই বলল,
— দাদা, ময়ূরকে কেক খাওয়ালি না?
 প্রথমে অর্পণ একটু ইতস্তত করলো পরে 
একটু হেসে কেকের একটা টুকরো ময়ূরের দিকে বাড়িয়ে দিল।
ময়ূর হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়েও থেমে গেল, তারপর একটু লজ্জা পেয়ে মুখ বাড়িয়ে কেকটা খেল।
অর্পিতা বেশ উপভোগ করলো বিষয়টা। আর মনেমনে ভাবলো "কুছ কুছ হোতা হ্যায়।"
 ঘরের ভিতরের আড্ডা জমে উঠেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে অর্পণের মা বললেন,
-- প্রচণ্ড গরম তো। সারাক্ষণই তো এসির মধ্যে সবাই। যা একটু ছাদের থেকে ঘুরে আয়।
 অর্পিতার বিষয়টা বেশ লাগলো। সে মনে ভাবলো,
"আজ একটা সুযোগ আমার বন্ধুটিকে দিতেই হবে।"
 কিছুক্ষণ পর ছাদে একটু হাওয়া খেতে গেল সবাই। পাশের বাড়ির দু'টো  বাচ্চা আর ময়ূর এই হচ্ছে নিমন্ত্রিত লোকের সংখ্যা।অর্পিতা ইচ্ছে করেই কিছুক্ষণ বাদেই বাচ্চা দু'টিকে নিয়ে নিচে নেমে এল, আর ছাদে রয়ে গেল শুধু অর্পণ আর ময়ূর।
একটু নীরবতা।
অর্পণ বলল,
— “তুমি খুব চুপচাপ আজ।”
ময়ূর হালকা হেসে বলল,
-- বড় হচ্ছি তো তাই গম্ভীর হওয়ার প্র্যাকটিস করছি।
 ময়ূরের কথা শুনে অর্পণের হাসি আর থামে না। সে হেসেই চলেছে আর ময়ূর তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
-- অর্পণদা তোমার হাসিটা তো খুব সুন্দর
 বোকার মত কথাটা বলে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো। অর্পণ অবাক হল, ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকালো আর মুহূর্তেই ময়ূর নিজেকে সংশোধন করে বলল,
-- তোমার এত হাসির কী হল? কলেজ শেষ হল। যে কোন সময় চাকরি পেয়ে যাবো।গম্ভীর হতে হবে না? সেই জন্যই তো বলেছি।
-- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা কী জানো সবকিছু সবাইকে মানায় না। এই যেমন ধরো যে খুব উচ্ছ্বল সে যদি হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যায়, আবার যে খুব চুপচাপ যদি দেখা যায় সে চিংড়ি মাছের মত লাফালাফি করছে এগুলো ঠিক মানায় না।
 ময়ূর এবার বেশ হাসছে। এই প্রথম অর্পণ ময়ূরের হাসির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে। হঠাৎ করে যেন ছাদের দখিনা বাতাস অর্পণের হৃদয়ে কিছুটা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে গেলো। বলে গেলো কেউ তার কানে কানে,
"মেয়েটিকে ভালো করে দেখো তো -"
 পূর্ণিমার আলোতেও অর্পণের চোখের মুগ্ধতা ময়ূরের চোখ এড়ালো না। ময়ূর খুব লজ্জা পেয়ে গেলো। কিন্তু তবুও সাহস নিয়ে বললো,
-- কী দেখছ অর্পণদা?
 অর্পণ স্বগতোক্তির মত আপনমনে বলে উঠলো, " এটা কী হল আমার? কেন হল? এটা কিভাবে সম্ভব?"
-- কী বলছো তুমি? কী সম্ভব? একাএকা মিনমিন করে কী বলছো তুমি?
-- ময়ূর নিচুতে চলো। অনেকক্ষণ আমরা দু'জন এখানে আছি।
-- কী হবে তাতে?
-- তুমি থাকো আমি নেমে যাচ্ছি।
-- হঠাৎ তোমার কী হল অর্পণদা? 
 অনল নিজেকে সামলাতে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। এসেই নিজের ঘরে ঢুকে গেলো। অর্পিতা বাচ্চা দু'টিকে টেবিলে খাওয়াচ্ছিল। সে জানতেও পারেনি যে দাদা নিচুতে এসে তার ঘরে ঢুকে গেছে। আর অর্পিতা একাই ছাদে হতভম্বের মত বসে। এইভাবে কিছুক্ষণ বসে থেকে সে আস্তে আস্তে ছাদ থেকে নেমে এসে সোজা অর্পণের ঘরে ঢুকে গেলো। অর্পণ চোখ বুঝে শুয়ে -

- কী হল তোমার? হঠাৎ এভাবে ছাদ থেকে পালিয়ে এলে?
 ময়ূরের কথা শুনে অর্পণ উঠে বসে,
-- শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। তাই চলে এলাম।
-- না তুমি মিথ্যে কথা বলছো - ব্যাপারটা অন্যকিছু
 ময়ূরের দৃঢ়তার কাছে ডাকসাইটে উকিল অর্পণ মজুমদার যেন একটু দমে গেলো। চোখ নিচু করে ময়ূরের দিকে না তাকিয়েই বলে,
-- সব সময় সব সত্যিকথা বলতে নেই। তাহলে ঝড় ওঠে
-- ভীরু, কাপুরুষেরা ঝড়ের ভয় পায়। তুমি তো তা নও। 
-- সত্যিই তুমি বড় হয়ে গেছো ময়ূর।
ময়ূর উত্তর দিল না। শুধু মৃদু হাসল।
সেই হাসির মধ্যে লুকিয়ে ছিল অনেক অজানা কথা, না বলা অনুভূতি আর বুঝতে পারা অর্পণের মানসিক দ্বন্দ্ব।

ক্রমশ 

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৪)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৪)

  অনল এয়ারপোর্ট থেকেই অফিসে চলে যায়। কিন্তু সে একটা কথা কিছুতেই মাথাতে আনতে পারছে না কৌশিকী তার সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সব সময় কথা বলতো। সেদিন ফোন করার পর থেকেই ওর ভিতর সেই স্বতস্ফূর্ততা আর নেই কেন? খুব বেশি খারাপ ব্যবহার করে ফেললো কি? 
 অনল একটা কথা মোটেই ভেবে পায় না যখন সে বিনীতার ফোনের জন্য অধীর আগ্রহে থাকে ঠিক তখনই কৌশিকী তাকে ফোন করে বসে। এটা একবার নয় বারবার হয়েছে? কিন্তু কেন? 
   অনলের মনের ভেতর যেন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব চলছে। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি অফিসে এলেও কাজের প্রতি মন বসছে না। ফাইল খুলে বসে আছে, কিন্তু চোখ ফাইলে আটকে থাকলেও মন তার সেখানে নেই—যেন কোনো একটা উত্তর সে খুঁজছে, যা সে নিজেই জানে না।
কৌশিকী…
মেয়েটা তো এমন ছিল না। সবসময় প্রাণখোলা, স্বতঃস্ফূর্ত—হাসতে হাসতে কথা বলতো, ছোটখাটো বিষয়গুলো শেয়ার করতো। অথচ সেদিন ফোন করার পর থেকেই যেন কোথাও একটা বদল। কথাগুলো ঠিকই বলছে, কিন্তু আগের মতো সেই উষ্ণতা নেই, সেই সহজত্ব নেই। যেন মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল উঠে গেছে। 
অনল নিজের মনেই প্রশ্ন করে—
"সহজ সরল মেয়েটার প্রতি খুব খারাপ আচরণ করে ফেললাম সেদিন? ও কি আমার আচরণে মনে খুব কষ্ট পেয়েছে? আর তাছাড়া ও ওর জীবনে আমায় এত গুরুত্বই বা দিচ্ছে কেন? আমি তো শুধুমাত্র ওর জীবনে অফিসের একজন কলিগ মাত্র।"
কিন্তু যতই ভাবছে, ততই জটিল লাগছে। কারণ স্পষ্ট কোনো উত্তর সে পাচ্ছে না। তবুও কোথাও একটা খচখচানি থেকে যাচ্ছে—হয়তো কথার ভঙ্গিতে, হয়তো অবচেতন কোনো অবহেলায় সে কৌশিকীকে আঘাত করে ফেলেছে।
আর একটা বিষয় তাকে আরও বেশি ভাবাচ্ছে।
এটা কাকতালীয় নাকি অন্য কিছু?
যখনই সে বিনীতার ফোনের জন্য অপেক্ষা করে—অধীর হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই কৌশিকীর ফোন আসে। একবার নয়, বারবার এমন হয়েছে। যেন কৌশিকী অদৃশ্যভাবে তার মনের অবস্থাটা বুঝে ফেলে!
এটা কি শুধুই কাকতালীয়? বিনীতা তার জীবনে সম্পূর্ণটুকু দখল করে বসে আছে। কিন্তু কৌশিকী তো শুধুমাত্র তার অফিসের একজন কলিগ মাত্র। অতি সাধারণ আর পাঁচটা কলিগের সাথে ঠিক যেমন সম্পর্ক কৌশিকীর সাথেও ঠিক তাই। এর বাইরে আর কিছুই নয়।
   আচ্ছা… কৌশিকী কী তাকে অন্যভাবে ভাবতে শুরু করেছে? 
 না না তা কী করে সম্ভব? এটা কিছুতেই হতে পারে না। কিন্তু সেটাই যদি সত্যি হয়? নিজেকে সামলে নিয়ে আবার ভাবে - দূর আর হলেও বা কী? তার দিক থেকে কোন সাড়া তো সে দেয়নি। তার তো বিয়েই হয়ে গেছে বিনীতার সাথে। শুধু প্রচারটা বাকি।
এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই অনল একটু অস্বস্তি বোধ করে। কারণ তার নিজের মন তো পরিষ্কার—সে বিনীতার অপেক্ষায় থাকে, তার কণ্ঠ শুনতে চায়। কিন্তু কৌশিকীর উপস্থিতি যেন বারবার সেই জায়গাটায় এসে পড়ছে, যেখানে সে তাকে রাখতে চায়নি কিংবা কখনো সেসব সে স্বপ্নেও ভাবেনি।
  প্রতিবার বিনা কারণে কৌশিকীর ফোন যেন প্রমাণ করে সে কিছু বলতে চেয়েছিল তাকে যা সে বলে উঠতে পারেনি। কিন্তু সে তো কখনোই কৌশিকীর সাথে সেরূপ ভাবে মেশেনি তার প্রতি অনুরক্তের কোন ইঙ্গিত সে দেয়নি? যা কিছু তাকে নিয়ে কৌশিকী ভেবেছে সে একাই ভেবেছে।
  যাকগে যাক। অন্যে তাকে নিয়ে কী ভাবছে তাই নিয়ে এত মাথাব্যথা না করলেও চলবে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার এই অন্যরকম আচরণটা অনলও ঠিক মেনে নিতে পারছে না। তাকে একভাবে দেখে অভ্যস্ত। হঠাৎ করেই তার ভিতরের এই পরিবর্তনটা মেনে নিতে একটু কষ্টই হচ্ছে তার। তবে কি তার এই  আচরণের পেছনে লুকিয়ে আছে না-বলা কোনো অভিমান, কোনো প্রত্যাশা।
অনল শেষমেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
 অনল নিজের মনেই নিজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় এই ব্যাপারে সে কোনদিনও তাকে কোন প্রশ্ন করবে না। তবে এটাও ভাবে তার সাথে আর দেখা হওয়ার সম্ভবনাও নেই বললেই চলে।

 বিনীতা পৌঁছে অনলকে ফোন করে জানিয়ে দেয়। আগামীকাল থেকেই তার স্কুল। একথাও জানাতে ভোলে না কৌশিকীর সাথে অনেক গল্প হয়েছে তার। তাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেছে। বিয়েতে স্কুল ছুটি থাকলে যাবে বলেছে ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা। অনল শুধু চুপচাপ বিনীতার কথা শুনে গেছে। 
  স্কুলে জয়েন করার পর থেকেই বিনীতা চেষ্টা শুরু করেছে ট্রান্সফারের। কিন্তু কোন জায়গা থেকেই আশাব্যাঞ্জক কোন কথা সে শুনতে পায়নি। রোজই দু থেকে তিনবার অনলের সাথে তার কথা হয় ওই একই কথা প্রতিবারই আলোচনা হয় দু'জনের মধ্যে আর সেটা হল ট্রান্সফার। উপর মহল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় অন্তত একবছর না হলে কোন বদলি নয়। সকলেরই মাথায় হাত। এখন উপায়? 
 এরই মাঝে রেজিস্ট্রির দিন এসে যায়। সেখানেও ছুটির সমস্যা। সমস্যা যেন অনল, বিনীতার জীবনে একেবারে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে আছে। রেজিস্ট্রির দিনটা ঠিক করা হয় রবিবার। শনিবার যেহেতু হাফ ডে সেদিন ক্লাস করে সে রওনা দেবে রবিবার রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়ার পর রাতেই আবার শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। এই ছাড়া আর কোন উপায় নেই। 
 সেইভাবেই সবকিছু রেডি হতে থাকে। 

  কৌশিকী বাড়িতে ফেরার পর থেকে মা অনেকবার করে জানতে চেয়েছেন,
-- কিরে তুই যে বলেছিলি কলকাতা থেকে ফিরে এসে আমাকে জানাবি বিয়ের কথা, ছেলেটির সাথে তোর কথা হয়েছে? 
কৌশিকী মায়ের কথা শুনে হো হো করে হেসে দিয়ে বলে,
-- ওমা, সেতো তোমায় শান্ত করতে কথাটা বলেছিলাম। সেই ছেলে আমি কোথায় পাবো যে তাকে আমায় বিয়ে করতে বলবো।
 বুকের কষ্ট বুকে চেপে মাকে কথাগুলো বলে হাসতে হাসতে মাকে জড়িয়ে ধরে পুণরায় বলে,
-- মাগো ,আমি বিয়ে করবো না। এত কষ্ট করে মানুষ করেছো আমায় আমি তোমাদের ছেড়ে চলে গেলে কে তোমাদের দেখবে? বয়স হয়েছে তোমাদের। অসুখ-বিসুখ লেগেই আছে। আমি পারবো না মা এইভাবে তোমাদের একা করে দিয়ে অন্যের ঘরে গিয়ে তাদের সুখী করতে। আমাকে তোমরা বিয়ের কথা বোলো না। বড় হয়েছি, চাকরি করছি নিজের মত স্বাধীনভাবে চলছি - বিয়ে করে যেচে অশান্তি ডেকে আনতে আমায় বোলো না। কোন অসুবিধা আমার জীবনে হবে না। আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও গিয়ে একটুও ভালো থাকবো না 
-- তাই বলে সারাজীবন আইবুড়ো থাকবি?
-- আচ্ছা মা, মনে কর কারো সাথে আমার বিয়ে হল। তারপর সেই বিয়েটা টিকলো না তখন তো আমাকে একাই থাকতে হবে।
-- এরকম অলক্ষুণে কথা বলে না মা। কার কপালে কী লেখা আছে তা কি কেউ বলতে পারে?
-- সেই জন্যই তো বলছি মা বিয়ে বিয়ে করে মাথা খারাপ কোরো না। তোমাদের কাছেই আমায় থাকতে দাও। আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না আর। কাছের মানুষ ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট আমি জানি। তোমরা হয়ত ভেবেছো আমি সব ভুলে গেছি। কিন্তু না মা আমার সব মনে আছে। তবে এখন আর আগের মত কষ্ট পাই না। তোমরা আমাকে দু'হাত ভরে দিয়েছো। তোমাদের ঋণ আমি কোনদিনও শোধ করতে পারবো না। তাই তোমাদের ছেড়ে আমি কোনদিনও যাবো না।
-- আমাদেরও ইচ্ছা করে তোকে বিয়ে দেবো, তোর সুখের সংসার দেখবো , নাতি নাতনিদের সাথে খেলা করবো 
-- পৃথিবীতে সবাইকেই যে বিয়ে করে সংসারী হতে হবে এমন কোন আইন এখনো পর্যন্ত বেরোয়নি মা। বিয়ের পর অনেকেই সুখী হয় না, সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তারাও তো বেঁচে থাকে। আমায় জোর কোরো না মা। বাবাকেও বলে দিও আমি বিয়ে করতে চাই না।
-- কী এমন কষ্ট পেয়েছিস ? কেউ কি তোকে কষ্ট দিয়েছে ? 
 কৌশিকী এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে পড়ে বলে,
-- আমি কি তোমার সেই মেয়ে মা যে কেউ আমায় কষ্ট দিলে আমি ভেঙে পড়বো। না মা আসলে আমি তোমাদের ছেড়ে কোনদিনও কোথাও যাবো না। তোমাদের কাছে থাকবো বলেই তো কলকাতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি তোমাদের কাছেই চলে এলাম। এতদিন তো তোমরা আমার জন্য করলে এবার একটু আমায় সুযোগ দাও তোমাদের সেবাযত্ন করার।

ক্রমশ 

Saturday, May 23, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৩)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৩)

  অর্পণ বাড়ি ফেরে অনেক রাতে। সকলে ঘুমিয়ে পড়লেও তার মা ঠিক জেগে। গাড়িটা বাড়ির ভিতর ঢোকার সাথে সাথেই মা দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন। অর্পণ মাকে দেখতে পেয়েই বলে ওঠে,
-- তুমি এখনো পর্যন্ত ঘুমাওনি? আমি কতবার বলেছি বয়স হয়েছে আমি নানান কাজে বাইরে থাকি আমার জন্য জেগে থাকবে না।
-- ওরে আমি তো মা'রে সন্তান ঘরে না ফিরলে ঘুম আসে না। শুয়েই তো ছিলাম কই ঘুম তো আসেনি -
-- এখন তো ফিরেছি এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো 
-- খাবি তো ?
-- না মা খেয়ে এসেছি।
-- ঠিক আছে আমি তবে খাবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ছি।
-- ঠিক আছে।
  অর্পণ গাড়ি গ্যারেজ করে স্নান সেরে নিজের ঘরে ঢোকে। নানান কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেদিনের ঘটনার পর শুনেছিল মেয়েটির ওই লগ্নেই বিয়ে হয়ে গেছে। যদিও কোন প্রয়োজন নেই তবুও জানতে ইচ্ছা করে মাঝে মাঝে, মেয়েটির সাথে কার বিয়ে হল? ছেলেটি কী করে?
  আমাদের সমাজে অনেক সময় পুরুষদের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ কম থাকে, তাই তাদের ভেতরের কষ্টটা অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। কাউকেই বলা যায় না অতি কাছের মানুষটিকেও কোন পুরুষ তার কষ্টের কথা,দুঃখের কথা, আঘাতের কথা শুনলে কোন নারীর সাথে তার মানসিক পরিস্থিতির তুলনা করে বসে। তাকে দুর্বল চিত্তের পুরুষ ভাবে। তাই লোক দেখাতে পুরুষকে হতে হয় কঠিন আবরণে মোড়া।
 সমাজের চাপে অনেক পুরুষই কাঁদতে বা কষ্ট প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে। কারণ পুরুষ কাঁদলে তাকে সকলেই হ্যাংলা পুরুষ মনে করে। 
ফলে ভিতরে চাপা কষ্ট জমতে থাকে এবং মানসিকভাবে সে ভীষন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অর্পণের জীবনে ওই ঘটনা বিশেষ কিছু প্রভাব না ফেললেও আজকে এই মানুষগুলির সুখপুর থেকে আসাটা তাদের বিপদে তার এগিয়ে যাওয়াটাই তার সামনে পুরোনো কিছু স্মৃতি ভেসে উঠলো। বিনীতাকে সে দেখেছিল না। মা,বাবার পছন্দতেই বিয়েতে মত দিয়েছিল। তবুও আজ গ্রামের নামটি শুনে বারবার মেয়েটির কথা তার মনে পড়ছে কেন? সে তো তাকে দেখেনি এমনকি তার প্রতি কোন ভালোবাসাও গ্রো করেনি।
 হায় রে মানুষের মন! তুমি নিজেও জানো না তুমি কী চাও।
 রাতটা আজ অদ্ভুত চুপচাপ। খামোখা কেন যে আজ অর্পণের ওই বিয়ে কিংবা মেয়েটির কথা মনে পড়ছে তা সে নিজেও জানে না। সে তো সবকিছু ভুলেই গেছিল। কখনো ওই ঘটনা তার মনে কোন প্রভাব ফেলেনি। তবে আজ কেন এরূপ হচ্ছে?
 সে তার ঘরের জালনায় এসে  দাঁড়ায়, রাত শেষের পথে। হয়ত ভোর হতে আর সামান্য কিছুটা সময়।সামনে শহরের আলো জ্বলছে—তবু তার ভিতরে আজ যেন সব অন্ধকার মনে হচ্ছে। 
 সে ধীরে খাটে এসে শুয়ে পড়ে। মোবাইলে দেখে ভোর চারটে। ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। কাল সঠিক সময়ে কোর্টে পৌঁছাতে হবে। আজ যে কেসটার ব্যাপারে সে ইনভেস্টিগেশনে গেছিল সেটারই কাল শুনানি।  মেয়েটিকে যেভাবে হোক বাঁচাতেই হবে। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার চরিত্রের দোষ দিয়ে তার নিজ সম্পত্তি থেকেই উৎখাত করতে বদ্ধ পরিকর। সম্পত্তি সব তার বাবার বাড়ির। জাল দলিল করে তারা মেয়েটির প্রতি অত্যাচার করে চলেছে। 
 আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে নারীরাই বঞ্চনার শিকার কেন হয়? 
 ঘড়িতে অ্যালাম দিয়ে অর্পণ ঘুমিয়ে পড়ে।
  
  অনল সময়ের অনেক আগেই গিয়ে দমদম মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ বিনীতার চলে যাওয়ার দিন। সে ট্রেনেই যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অনল জোর করে প্লেনের টিকিট কেটে দিলো। ট্রেন স্টেশনে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই অনলের চোখদু'টি  এদিকওদিক ঘুরছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পিছনে দাঁড়িয়ে বিনীতা বলে,
-- আমি এখানে মশাই
 -দু'জনেই হেসে দেয়। 
  কৌশিকী ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে এয়ারপোর্টে ঢুকতে গিয়ে হঠাৎ থমকে যায়। অনল একটি মেয়ের সাথে হাসি মুখে কথা বলছে। একবার ভাবে বোধহয় এর সাথেই অনলের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আর একবার ভাবে হয়ত কোন আত্মীয় হবে। সে আর না দাঁড়িয়ে ভিতরে ঢুকতে গিয়ে শুনতে পায় অনল তাকে ডাকছে -
-- কৌশিকী 
 পিছন ফিরে তাকিয়ে হেসে দেয় কৌশিকী। হাতের ইশারায় অনল তাকে ডাকে। কৌশিকী এগিয়ে আসে।
- তোর সাথে আবার দেখা হয়ে গেলো। পরিচয় করিয়ে দিই। এই হচ্ছে বিনীতা। একেই আশীর্বাদ করতে সবাই গেছিল ।
 আর বিনীতার দিকে ফিরে কৌশিকীর কথা বলতে গেলে কৌশিকী হাত বাড়িয়ে বিনীতার সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে বলে,
-- আমার পরিচয়টা আমি নিজেই দিই। আমি কৌশিকী। কয়েকমাস অনলের অফিসে ছিলাম। কিন্তু এখন একটা কলেজে জব পেয়ে ওই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাড়ির কাছে চলে গেছি।
 -- ভালোই হল তোমাদের দু'জনের সাথে পরিচয়  হয়ে। বিনীতার বাড়ি এখানেই একটু গ্রামের দিকে। ট্রান্সফারের চেষ্টা করছে। ও ট্রান্সফার হয়ে আসলেই আমাদের বিয়েটা হবে।
  কৌশিকী তার ভিতরের কষ্টটা চেপে রেখে হাসি মুখে ওদের বলল,
-- দু'জনকেই একসাথে কংগ্রাচুলেশন। খুব ভালো থেকো তোমরা। সময় হয়ে গেছে। আমি এগোই। তোমরা একটু কথা বলে নাও। 
 বিনীতার দিকে ফিরে বলল,
-- তুমি এসো তারপর কথা বলছি 
 কৌশিকী ভিতরে ঢুকে গেলো। একসময় বিনীতাও অনলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভিতরে এলো। কৌশিকীর সাথে নানান ধরণের গল্প করতে করতে এই সামান্য সময়ের পথটা তারা পাড়ি দিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেলো। ফোন নম্বরের আদানপ্রদানের মাধম্যে দু'জন দু'জনের খবরাখবর রাখবে সে কথাও তাদের মধ্যে হল। বিনীতা তার সেই দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি থেকে অনেকদিন আগেই একটা পি জি তে চলে গেছে। কারণ তার মনে হয়েছে তারা ঠিক চায় না সে ওখানে থাকুক। এখন যেখানে আছে সেখান থেকে স্কুলটাও একটু কাছে। যাতায়াতের খুব সুবিধা হয়। কোন যানবাহন ছাড়াই হেঁটেই যাতায়াত করতে পারে।
 যেহেতু বিনীতা একাই থাকে একটি রুমে স্কুল থেকে ফিরে তার অফুরান সময়। দোতলার উপরে ঘরটা। সবকিছুই আলাদা। সমস্ত ফার্নিচার আছে। এমন কী রান্নার গ্যাসও। ইচ্ছা হলে সে নিজে রান্না করে খেতেও পারে। তাতে অবশ্য বাড়ির মালকিনের কোন আপত্তি নেই। তবে সে চা'টা নিজেই করে খায়। চায়ের নেশাটা বিনীতার একটু বেশি। 
 বাড়ির মালকিনের বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। একাই থাকেন একটি মেয়ে সর্বক্ষণের সঙ্গী। ছেলে বিদেশে। কিন্তু তিনি ছেলের উপর নির্ভরশীল হয়ে কিছুতেই থাকবেন না। ছেলেকে বারবার নিষেধ করেছিলেন বিদেশে স্থায়ী না হতে। কিন্তু যখন সে কথা শুনলো না ঠিক তখন থেকেই তিনি ছেলের পাঠানো টাকা নিতে অস্বীকার করেন। অবশ্য ছেলে তাকে নিয়েও যেতে চেয়েছিল। সেটাতেও তার ছিল আপত্তি। কারণ স্বামীর বাড়ি আর নিজ দেশ এই দু'টোই  তার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তিনি এই প্রিয় জায়গা ছেড়ে কোথাও যাবেন না আমৃত্যু এখানেই থাকবেন তা ছেলেকে জানিয়ে দেন। 
 ছেলের লেখাপড়া স্বামী থাকতে শেষ হলেও স্বামী যখন অসুস্থ হন তখন জমানো টাকা একটাও নেই। তখন চলে গেছে গয়নাগুলো। অবশ্য ছেলে তখনো চাকরি পায়নি ভালো। তবে কিছু করতো যা দিয়ে তার নিজেরটুকুই চালাতে পারতো।তিনিও কোনদিন ছেলের কাছে হাত পাতেননি।
 এমতাবস্থায় তিনি এই বয়সেই ঠিক করেন কিছু তাকে করতে হবে। দোতলাবাড়ির উপরতলাটায় প্রথমে ভাড়া দেন। তবে ভাড়া দিয়ে তিনি বুঝতে পারেন ভাড়াটিয়া হয়ে যারা আসছে তাদের সকলে যে ভালো মানুষ তাও নয়। ভাড়া নিয়ে সমস্যা, জল,লাইট নিয়ে সমস্যা। যা তার পক্ষে ট্যাকেল করা সম্ভব নয়।
 তখন তিনি একা। স্বামীও চলে গেছেন। তখন তিনি একটি একটি মেয়েকে কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দেন। সেই তাকে পরামর্শ দেয় বাড়িটার তার নিজের এনট্রিটা আলাদা রেখে পি জি রাখতে। কারণ তার বাড়িটা একটি হাসপাতালের কাছে। অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে এখানে চিকিৎসার জন্য এসে দু'চারদিন থাকার জন্য ঘর খোঁজে। 
 সেই শুরু। তারপর তার ঘর বেড়েছে। প্রত্যেক ঘরের সাথে ওয়াশরুম হয়েছে। তিনি রান্নার জন্য একটি লোকও রেখেছেন। কেও ইচ্ছা করলে বাইরে খেতে পারে আবার আগেরদিন রাতে জানালে টিফিন থেকে শুরু করে লাঞ্চ, ডিনার সব পাওয়া যাবে এখানেই। যে মেয়েটি তার কাছে প্রথম আশ্রয়ের জন্য এসেছিল সে নন্দিনী। সেই সবটা এখন দেখাশুনা করে।

ক্রমশ 

    

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪২)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪২)

  লিজা কার্ডটা হাতে নিয়ে হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে। সকলে যে যার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কারো মুখেই কোন কথা নেই। দেবদূত বললেন,
-- হ্যাঁরে ইরা এটা তোর ঈশ্বরের কোন লীলা বলতো?
-- জানি না দাদা। আমার ছেলেটার কপালে ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত কী লিখেছেন?
-- এখানে আবার তোর ছেলেটা কোথা থেকে আসলো?
-- সব সময় চিন্তা ভাবনাগুলো পজেটিভ করতো।
 কথা বলতে বলতেই অনলের ফোন। অর্পণের গাড়িতে উঠে একবার ফোন করে দেবদূত জানিয়ে দিয়েছিলেন তারা একজনের সহায়তায় কলকাতার দিকে এগোনোর চেষ্টা করছেন। 
 ততক্ষণে উবের এসে গেছে। যথারীতি একশ টাকা বেশি দিতে হবে যা ভাড়া দেখাচ্ছে তার থেকে। টু শব্দটি না করে সকলেই গাড়িতে উঠে বসেছেন। কিন্তু ঝড়ের গতিতে ঈশ্বরের দেবদূত হয়ে অর্পণ মজুমদার এসে তাদের যে আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করে গেছে সেই কথা ভাবতে কেউ আর নিজেদের মধ্যে কোন কথা বলার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি। সবাই চুপ। পাঁচটা প্রাণী গাড়িতে বসে কিন্তু কারও মুখেই কোন কথা নেই। সবাই ভাবছে।
  রাত তখন একটা। গাড়ি এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। অনল গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই একে একে গাড়ি থেকে নেমে চুপচাপ বাড়ি ঢুকে গেলো। অনল বাবাকে ধরে নিয়ে এলো।
-- কী কাণ্ড বলো তো? আমি তো তোমাদের টেনশনে দম বন্ধ হয়ে মা*রা যাচ্ছিলাম।
 দেবদূত বললেন,
-- তোর কী মনে হচ্ছে আমরা সবাই হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে দম ছেড়ে বেঁচে ছিলাম।
 মামার কথা শুনে অনল একটু হেসে দিলো।
 দেবদূত আবার বললেন,
-- রাত এখন অনেক। তবুও একটু চা খাবো অনল। তুই একটু চা কর। আর কেউ কিছু খেলে বলো অর্ডার করি এখনই।
 ইরা বললেন,
-- এখন আর কোন খাবার অর্ডার করতে হবে না। ফ্রিজে তরকারি, মাছের ঝোল আছে। আমি দুটো ভাত বসিয়ে দিচ্ছি।
-- মা, আমি সব গরম করে ভাত করে রেখেছি। তোমরা সবাই ফ্রেস হয়ে টেবিলে খেতে আসো। আমি সব গুছিয়েই রেখেছি।
-- এই না হলে আমার ভাগ্নে
-- ইরা এত রাতে আমি ভাত আর খাবো না। দুধ থাকলে আমায় একটু দুধ মুসলি দাও।
 অনলের বাবার সাথে অনলের মামাও সুর মেলালেন ভাত ছাড়া ঘরে যা আছে তাই দেওয়ার জন্য।
 সবাই এক এক করে ওই রাতেই স্নান সেরে টেবিলে আসলেন। ইরা তার স্বামীর খাবরটা ঘরেই দিয়ে আসলেন। আগেই অনল চা করতে গেলে দেবদূত সবাইকে বললেন,
-- কে আমাদের গাড়ি করে এতটা নিয়ে এসেছে এখনই অনলকে বলার কোন প্রয়োজন নেই। পরে বললেও হবে। এই মুহূর্তে ওকে কিছু বলতে হবে না। কী থেকে কী ভেবে বসবে তার কোন ঠিক নেই। পরে ধীরে সুস্থে একসময় বললেই হবে।
 অনল চা করতে করতে বিনীতাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে সকলে ভালোভাবেই বাড়িতে পৌঁছে গেছে। তারা সকলেই জেগে ছিলেন অনলের বাড়ির লোক বাড়িতে পৌঁছেছে কিনা জানার জন্য। কারণ তাদের ভিতরেও একটা আতঙ্ক কাজ করছিল পূর্ব ঘটনা মনে করে।
 খাবার টেবিলে টুকটাক যা কথা হল তা হল বিনীতা শিলিগুড়ি পৌঁছেই ট্রান্সফারের চেষ্টা করবে। ওর ট্রান্সফার হয়ে গেলে অর্থাৎ ও কলকাতায় স্কুলে জয়েন করার পর বৌভাতের দিন ফিক্সড হবে। এরমধ্যে যেদিন রেজিস্ট্রি হবে ও যদি ছুটি না পায় একদিনের জন্য এসেই আবার চলে যাবে। বিয়ের অনুষ্ঠান নতুন করে আর কিছুই হবে না। এদিকে বৌভাতের দেরি হলে লিজা আবার একবার বাপেরবাড়ি কয়েকদিনের জন্য ঘুরে আসবেন। দেবদূত বোনের বাড়িতেই থাকবেন।
  পরদিন অনল যথারীতি অফিস যায়। কৌশিকী দুপুরের দিকে অফিসে এসে বসের সাথে দেখা করে ওর কাজ মিটিয়ে ওর পরিচিতদের সাথে দেখা করে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতই আলাদা করে অনলের সাথে দেখা করতে যায় না। অনল শুনেছে কৌশিকী এসেছে অফিসে। মনেমনে ভেবেছে সেতো আসবেই ওর সাথে দেখা করতে। নিজের থেকে তাই আর কোন তাগিদ অনুভব সে করেনি কৌশিকীর সাথে দেখা করার। টিফিন আওয়ার শুরু হয়ে যায়। অনল ওয়াশরুমে যেতে গিয়ে কৌশিকীর মুখোমুখি হয়। কৌশিকী যেন দেখেও অনলকে দেখতে পায়নি। কারণ কালকের ফোনের অপমানটা সে হজম করতে তখনও পারেনি। এত বাজেভাবে অনল কথা বলেছে তার সাথে যা সে কোনদিন স্বপ্নেও কল্পনা করেনি।

-- কী ব্যাপার সেই কখন এসেছো দেখতেই তো পেলাম না।
কৌশিকী অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-- আসলে অফিসে কিছু কাজ নিয়ে এসেছি। সেটা মিটাতেই অনেকটা সময় চলে গেলো। তারপর সবাই মিলে এমনভাবে ধরলো সেই গল্প থেকে আর বেরোতেই পারলাম না। কেমন আছো?
-- বিন্দাস আছি। সবকিছু ঠিকঠাক। তুমি কেমন আছো। ছাত্রছাত্রীদের সাথে নিশ্চয় খুব ভালো সময় কাটছে।
-- নতুন কাজ, নতুন অভিজ্ঞতা। বাচ্চাদের সাথে বেশ ভালোই সময় কেটে যাচ্ছে।
 কৌশিকী চুপ হয়ে গেলো। আর কোন কথা বাড়ালো না। অনল ওয়াশরুমে চলে গেলো। আর ঠিক সেই ফাঁকে অনলকে বোঝাতেই যে সে গায়ে পড়া মেয়ে নয় - সেই ফাঁকেই সে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু চোখটা কিছুটা অবাধ্য করায় শাড়ির আঁচলটা তাকে তুলতেই হল চোখ পর্যন্ত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে উবের বুক করার সাথে সাথেই পেয়ে গেলো। 
 হঠাৎ ফোন বজায় তাকিয়ে দেখে অনল ফোন করেছে। বুকটা ধড়াস করে উঠলো। নিজেকে সামলে ফোনটা রিসিভ করলো,
-- আরে দেখা না করেই চলে গেলে যে
-- দেখা হল, কথা হল - এরই মধ্যে ভুলে গেলে?
-- তুমি কি আমার উপর রাগ করেছো কালকের ব্যবহারে?
-- না না রাগ করবো কেন? তবে বুঝতে পেরেছি আমার ফোন তোমার বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
 কথাটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই অনলের। তবুও সে বলল,
-- আসলে কাল খুব টেনশনে ছিলাম। বাড়িতে কেউ ছিল না।সবাই একটা বিশেষ কাজে বেরিয়েছিল। গরমে কী বলতে কী বলে ফেলেছি সরি তারজন্য।
-- আরে না না। ঠিক আছে। রাখি তাহলে। হোটেলের কাছে এসে গেছি। পরে কথা হবে।
-- একটা কথা বলার ছিল
 কৌশিকী অপরপ্রান্তে চুপ করে আছে। সে লাইনে আছে কিনা বুঝতে "হ্যালো" বলাতে কৌশিকী বলল,
-- হ্যাঁ বলো শুনছি।
-- গতকাল আমার আশীর্বাদ ছিল। তাই বাড়ির সবাই বেরিয়েছিল। এখনো বিয়ের ডেট ফাইনাল হয়নি। আমার বিয়েতে কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে।
 কৌশিকীর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করলো। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সে নিজেকে সংযত করে বেশ হাসি হাসি ভাবেই বলল,
-- কংগ্রাচুলেশন। দারুন খবর এটা। এখন বুঝতে পারছি কাল আমার ফোনটা কেন তোমার বিরক্তির কারণ হয়েছিল। আসলে আমারও ফোনটা করার কোন দরকারই ছিল না। আজ তো দেখাই হত 
আর বেশি কথা বলতে কৌশিকী চাইলো না। যদি গলার স্বরে ধরা পড়ে যায়।তাই বলল,
--রাখি এখন একসময় জমিয়ে সব কথা শুনবো। এসে গেছি ।নামবো এখন
অনলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কৌশিকী ফোনটা কেটে দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত লিফটে উঠে নিজের রুমে চলে যায়।
 নিজেকে নিজেই শান্তনা দেয় তার জীবনটাই তো কষ্টে ভরা। যে সন্তান ছোটবেলাতেই তার মা, বাবাকে হারায় তার জীবন যে কোনদিন সুখে পরিপূর্ণ হতে পারে না এটা সে সাময়িক ভুলে গেছিল। তাই হয়ত অনল দেখে তার ব্যবহারে সে মুগ্ধ হয়েছিল। 
  মামা,মামী কোনদিনও একফোটা কষ্ট তাকে দেননি। তার কখনোই মনে হয় না যে সে তাদের নিজের মেয়ে নয়। কিন্তু তবুও কোথাও যেন একটা ব্যথা সে সর্বদাই অনুভব করে। আজও রাতের আঁধারে সেই অক্সিডেন্টের সময়ের কথা তার মনেপড়ে। ভুলতে চেষ্টা করলেও সে কিছুতেই ভুলতে পারে না সেই দিনটার কথা। প্রতিবছর ওই দিনটা আসলেই মামা,মামী তাকে নিয়ে ঠিক ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু কোনদিনও তারা বলেননি কেন তারা ওইদিনই ওকে নিয়ে তারা বেড়াতে যান। যে কোন একটা মন্দিরে তারা কৌশিকীর নামে পুজো দেন তারপর বাড়িতে এসে নিরামিষ খান। কৌশিকী পুরোটাই বোঝে কিন্তু কোনদিনও তাদের কাছে কোন প্রশ্ন করেনি। 

ক্রমশ 

Friday, May 22, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪১)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪১)

   হাইওয়ের বুকটা যেন হঠাৎ করেই যেন থেমে গেছে।  গাড়ি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। দূরে কোথাও একটা ট্রাকের হর্ন মাঝে মাঝে কানে বিঁধে যাচ্ছে, কিন্তু এই অংশটা যেন আলাদা এক নিস্তব্ধ দ্বীপ। রাস্তা থেকেও কোন গাড়ির যাতায়াত প্রায় নেই বললেই চলে। সকলেরই ভয়ে বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনোই সুরাহা করতে পারছে না।
    এতগুলো মানুষ গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে, প্রত্যেকের মনেই একটা ভয় কাজ করছে।দেবদূত বারবার ফোনে অনলের সাথে কথা বলছেন, ড্রাইভার লাগাতার  ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করছে, এটা ওটা নাড়াচাড়া করছে, আনন্দি  নিঃশব্দে চারপাশে তাকিয়ে আছে চোখে মুখে একটা চাপা আতঙ্ক, যেন অজানা কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
 এদিকে অনল আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুণরায় একটা গাড়ি বুক করে পাঠাতে। কিন্তু সেও সফল হতে পারছে না। চিন্তায় চিন্তায় তার অবস্থাও পাগলের মত। 
  আকাশে মেঘ জমে আছে, চাঁদের আলো ঢেকে গেছে। রাস্তার দু’পাশে ঘন অন্ধকার, গাছগুলো কেবল ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে। হালকা বাতাসে পাতার খসখস শব্দটা অস্বাভাবিক রকম স্পষ্ট শোনায়। মনে হয়, কেউ যেন লুকিয়ে লুকিয়ে সবকিছু দেখছে।
লিজা বললেন,  গাড়িটা হঠাৎ করে খারাপ হলো কী করে?
ইরা চাপা গলায় উত্তর দিল, 
-- বিপদ কী আর বলেকয়ে আসে ? আমাদের আরও আগেই বেরোনো উচিত ছিল। কী করে কী হবে কীভাবে বাড়ি পৌঁছাবো এখন কিছুই বুঝতেই পারছি না। মেঘও করেছে প্রচুর। যে কোন সময় বৃষ্টি শুরু হবে। এই নির্জন জায়গায় ভয়ে বুকটা শুকিয়ে যাচ্ছে।
 আনন্দি হঠাৎ বলে উঠলো,
-- ও মামা এখানে কোন ভূত নেই তো?
 মামা হেসে বলেন,
-- না না ভূততুত নেই। আমাদের সাথে একটা পেত্নী আছে।
-- মামা, তোমার এখনো রসিকতা করতে ভালো লাগছে?
 কী করি বলতো? বুঝতেই তো পারছি না কী করবো এবার। সময় কাটাতে হবে তো।
 কথাটা বললেন ঠিকই কিন্তু নিজেও একটা আতঙ্কের মধ্যেই রয়েছেন। তিন তিনজন নারী, একজন বয়স্ক মানুষ - আশীর্বাদ উপলক্ষ্যে সকলের গায়েই সোনার কিছু না কিছু রয়েছে। ছিনতাইয়ের ভয় না থাকলেও প্রাণের ভয় তো আছেই। কোথা থেকে কী হতে পারে ভেবেই পাচ্ছেন না।
এই নির্জন হাইওয়েতে, এতগুলো মানুষের মাঝেও একটা অদ্ভুত একাকিত্ব নেমে এসেছে। 
 এদিকে অনল কোন অবস্থাতেই কোনকিছু করতে না পেরে ঠিক করে একটা গাড়ি ভাড়া করে নিজেই রওনা দেবে। কিন্তু সেও তো কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। ততক্ষণে তো ভোর হয়ে আসবে। অনলের বাবাকে ধরে একটা জায়গায় বসানো হয়েছে। এত ধকল তিনি আর নিতেও পারছেন না। একেবারেই কাহিল হয়ে পড়েছেন। খুব যে একটা গাড়ি চলছে ওই রাস্তা দিয়ে তাও নয়। মাঝে মাঝে দু'একটি পাঞ্জাব লড়ি হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে একটি চারচাকা সামনের থেকে কিছুটা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। ভয়ে সব আমসি হয়ে গেছে। গাড়িটা থামিয়ে গাড়ি থেকে এক যুবক নেমে এলো। পরনে তার সাদা সার্ট আর ডেনিম জিন্স। চোখে চশমা। দেবদূত আনন্দিকে চোখের ইশারায় এই গরমের ভিতরেও গাড়িতে উঠে বসতে বললেন। সকলের বুক দুরু দুরু করছে। 
 যুবকটি সামনে এগিয়ে এলো। ড্রাইভারের কাছে জানতে চাইলো গাড়ি প্রসঙ্গে। ড্রাইভারের কাছে শুনে নিজেও একটু চেষ্টা করলো স্টার্ট হয় কিনা। তখন সকলে তার দিকে এগিয়ে এলো। কিছুটা হলেও তখন তাদের মন থেকে ভয় দূরীভূত হয়েছে। আনন্দি গাড়ি থেকে নেমে এলো। যুবকটি দেবদূতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-- যদিও আমার গাড়িতে সকলের জায়গা হবে না। একটু আপনারা যদি কষ্ট করে পিছনের সিটে চারজন বসতে পারেন আর একজন সামনে আমি আপনাদের এই ডেঞ্জারাস জায়গাটা পার করে দিতে পারি। ---আপনারা যাবেন কোথায়?
 দেবদূত তার কথার উত্তর দিলেন। যুবকটি পুণরায় বলল,
-- এই মুহূর্তে এখান থেকে আপনারা কিছু পাবেন না। আর হাইওয়ে জায়গাটাও যে খুব একটা সুবিধার নয় সেটাও আপনারা জানেন। যদি আমায় বিশ্বাস করেন তাহলে আসতে পারেন আমার গাড়িতে।
 সকলে সকলের মুখের দিকে তাকালেন। এই মুহূর্তে একে বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই। সকলে তার সাথে কিছুটা হেঁটে তার গাড়িতে উঠলো। লিজার শরীরটা একটু ভারিক্কি তিনি গিয়ে যুবকের পাশে বসলেন। পিছনের সিটে চারজন খুব কষ্ট করেই বসেছেন। গাড়ি ছুটে চললো কলকাতার দিকে। প্রথমে সবাই চুপচাপ। তারপর লিজাই যুবকের সাথে কথা জুড়লেন,
-- তোমার বাড়ি কোথায় বাবা?
-- বারাসাত
-- তাহলে তো তোমাকে উল্টো রাস্তা ধরতে হবে আমাদের জন্য
-- হ্যাঁ তা হবে। অসুবিধা নেই। মানুষের বিপদে তো মানুষই দাঁড়ায়। আপনারা খুব বিপদে পড়েছেন বুঝেই তো নামলাম গাড়ি থেকে। ওটা যে কতটা ভয়ঙ্কর জায়গা আপনারা ভাবতেই পারবেন না। এই কয়েকদিন আগেই ঠিক ওই জায়গার আশেপাশেই একটা মা*র্ডা*র হয়ে গেলো। প্রথমে ছিনতাই পরে তাকে মে*রেই ফেললো।
-- ঈশ্বরই তোমাকে আমাদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
-- এত রাতে আপনারা কোথা থেকে ফিরছেন? সকাল সকাল বেরোনো উচিত ছিল আপনাদের।
-- আর বোলো না বাবা। আমরা একটা শুভ কাজে গেছিলাম। সাথে গাড়ি আছে ভেবে একটু দেরি করেই বেরোলাম। কে জানতো কপালে এই দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে। আমরা তো প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছিলাম। সারারাত ওখানেই থাকতে হত তুমি না আসলে।
-- জায়গাটা এমনই খতরনাক সারারাত ওখানে আপনারা থাকতেই পারতেন না। তারমধ্যেই অনেককিছু ঘটে যেতে পারতো।
 আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। গাড়ি ছুটে চলেছে। পিছনে আনন্দির অবস্থা হয়েছে ভয়ানক। শেষ পর্যন্ত ইরা আস্তে আস্তে বললেন,
-- অনু, তুই আমার কোলের উপর বোস 
-- হ্যাঁ ওটাই বাকি আছে 
-- আরে বসতেই তো পারছিস না। তুই তো একদিকে কাত হয়ে আছিস। আমার দু'পায়ের মাঝখানে বোস। তাতে একটু কষ্ট কম হবে।
-- মা, আমি তোমার সেই দু'বছরের অনু নই যে তোমার দু'পায়ের মাঝখানে আরামসে বসে যাবো।
 ইরা এবং তার মেয়ে যতই আস্তে কথা বলুক না কেন সব কথাই যুবকটির কানে যাচ্ছে। কিছুটা সময় চুপ করে থেকে গলাটা চড়িয়ে সে বলল,
-- বুঝতে পারছি আপনাদের বসতে অসুবিধা হচ্ছে। আর কিছুক্ষণ। কলকাতা লোকালয়ে ঢুকলেই আপনারা উবের পেয়ে যাবেন। আমি সেরূপ জায়গাতেই আপনাদের নামিয়ে দেবো। আর একটু কষ্ট করুন।
 ইরা যুবকটির কথা শুনে বললেন,
-- আমি খুব ঈশ্বর বিশ্বাসী জানো। ঈশ্বর তো নিজে এসে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন না তিনি মানুষের রূপ ধরেই আসেন। আজ তিনিই তোমায় পাঠিয়েছেন আমাদের রক্ষা করতে।
-- সে সব আপনাদের বিশ্বাস। তবে আমি একজন সাধারণ মানুষ। কেউ বিপদে পড়লে ছুটে যাওয়া আমার সেই ছেলেবেলার অভ্যাস। এরজন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে জীবনে, প্রাণ সংশয় হয়েছে বহুবার। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।  হয়ত আপনাদের মত মায়েদের ভাষায় ওই ঈশ্বরের লীলায়।
 হেসে পড়লো যুবকটি
-- ব্যক্তিগত কথা হবে যদিও তবুও জানতে ইচ্ছা করছে আপনারা এইদিকে কোথায় গেছিলেন।
-- আমার ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ের বাড়িতে আশীর্বাদে গেছিলাম বাবা
-- বাহ্ তা বেশ। কোন গ্রামে?
-- শেখপুর অনেকে আবার সুখপুরও বলে।
 যুবকটির গাড়ির গতিটা যেন হঠাৎ করেই কমে গেলো। সে কিছুটা সময় চুপ করে একমনেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে গাড়ি কলকাতার রাস্তায় ঢুকে পড়েছে।
 বেশ কিছুক্ষণ পর যুবকটি বলল,
-- ওখানে একটি বাড়িতে আমিও একবার একটি কাজে গেছিলাম।
-- পুরোপুরি গ্রাম ওটি। তবে এখন তো গ্রামগুলি অনেক উন্নত। সব রাস্তা পাকা, লাইট,জল সব আছে। শুধু  বাজার, হাসপাতাল সেই আদিকালে পড়ে আছে 
 লিজা এবার বললেন,
-- তা অবশ্য ঠিক। তবে ফ্রেস অক্সিজেনটা পাওয়া যায়।
 যুবকটি গাড়িটা ধীরে চালিয়ে এবার একটা জায়গায় গাড়িটা পার্ক করতে করতে বলে,
-- আপনারা এখান থেকে ইজিলি উবের বুক করতে পারবেন। রাত অনেক। একটু বেশি চাইবে। 
 দেবদূত গাড়ি থেকে নেমে যুবকটিকে ধন্যবাদের সাথে হ্যান্ডশেক করলেন। সবাই একে একে গাড়ি থেকে নেমে তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে শুরু করলো। লিজা তখন বললেন,
-- দেখো কাণ্ড! এতক্ষণ ধরে আমরা তোমার গাড়িতে বসে তোমার সাথেই গল্প করছি অথচ নামটাই জানা হয়নি।
 যুবকটি মানিব্যাগ বার করে তার একটি কার্ড লিজার হাতে দিতে দিতে বলে,
-- আমি অর্পণ , অর্পণ মজুমদার। এডভোকেট

ক্রমশ 

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪০)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪০)

  কৌশিকী তার জীবনে অনেক চরাইউৎরাই পেরিয়ে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। মা,বাবার সাথে পাঁচ বছর বয়সে গ্যাংটক বেড়াতে গিয়ে গাড়ি অক্সিডেন্টে দু'জনকেই  হারিয়ে প্রায় পনেরদিন একাকী একটি শিশু হাসপাতালে ডাক্তার আর নার্সদের কোলে কোলে ঘুরে বেড়িয়েছে। শেষমেষ মামা,মামী অনেক খোঁজাখুঁজির পর হাসপাতালে ছুটে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেই থেকে মামা,মামীই তার মা,বাবা। আইনের জটিলতা কাটিয়ে নিঃসন্তান দম্পতির চোখের মণি হয়ে ওঠে সে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া কৌশিকী তার চালচলন, হাবভাবে নিজেকে আধুনিকা করে গড়ে তুললেও অন্তরটা তার একদম মোমের মত নরম। কিন্তু তাকে দেখে কেউ কখনোই সেটা বুঝতে পারবে না। বাইরেটা সে একটা কঠিন আবরণে নিজেকে মুড়ে রাখে। যুগ যুগ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও খুব ছেলেবেলার আঘাতটা আজও তার কাছে দগদগে ঘায়ের মত। চোখ বুজলেই যেন সে আজও দেখতে পায় মা,বাবার সাথে সে গাড়িতে বসে আছে আর গাড়িটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিচে পড়ে যাচ্ছে। দু'জনেই সেদিন দু'দিক থেকেই তাকে জড়িয়ে ছিলেন। দু'জনেই  চেয়েছিলেন আঘাত যত দু'জনেরই গায়ে লাগুক মেয়েটা যেন সুস্থ থাকে। ঈশ্বর হয়ত তাদের এই আকুতি শুনেছিলেন। উদ্ধারকারীরা কৌশিকীকে যখন উদ্ধার করেছিলেন তখন দু'জনের বুকের ভিতর সর্বশক্তি দিয়ে আটকে রাখা মেয়েটিকে তারা জ্ঞানহীন ভাবে অক্ষতই পেয়েছিলেন
এই দুঃস্বপ্নের থেকে সে যে কোনদিনও বেরোতে পারবে না এটাও সে জানে। কিন্তু কোনদিনও সে তার মামা কিংবা মামীকে যাদের আজ সে মা,বাবা বলেই ডাকে তাঁদের বলেনি। তারা জানেন পাঁচ বছরের স্মৃতি সে ভুলে গেছে। কিন্তু তার জীবনের ফেলে আসা অতীতের সেই ভয়ঙ্কর দিনটা এখনো জীবন্ত। মামা,মামীর কাছ থেকে মা,বাবার আদরের কোন খামতি কোনদিনও সে দেখেনি। কিন্তু তবুও কোথাও সেই ঘা'টা মাঝে মাঝেই তাকে ব্যথায় ভরিয়ে দেয় তবে সেটা সকলের অলক্ষ্যে। কখনোই সে কাউকে সে কথা বুঝতে দেয় না। 
 কাওকে কোনদিনও তার ভালো লাগতে পারে, সে কাওকে ভালবাসতে পারে এটা সে কোনদিনও স্বপ্নেও ভাবেনি। খুব কাছের দু'জনকে  একসাথে হারিয়ে হারানোর যন্ত্রণা সে প্রতি পলেপলে অনুভব করেছে। তাই মামা আর মামী ছাড়া নতুন করে কারো সাথে সে কোনদিনও জড়াতে চায়নি। কিন্তু অনলকে দেখে তার সমস্ত ভাবনার উপরে কে যেন জল ঢেলে দিয়েছিল। কিন্তু আজকের ফোনটা তার ভাবনার উপর ঈশ্বর আর একবার জল ঢেলে দিলেন কিন্তু নিঃশব্দে। অনল যে অন্য কাওকে ভালোবাসে এটা সে আজ নিশ্চিত হল। সে সঙ্গে সঙ্গেই মনস্থির করলো আর কখনোই অনলকে সে ফোন করবে না। আগামীকাল তার পুরোনো অফিসে গিয়ে একটা চেক আনার কথা সেটা নিয়েই অন্য কলিগদের সাথে একটু দেখা করে চলে আসবে। নিজের থেকে সে অনলের সাথে দেখা করতে যাবে না।

  কৌশিকীর গল্পটা ভাঙা স্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে জীবন গড়ার এক দৃঢ় উদাহরণ। সে ভাঙবে তবু মচকাবে না। ছোট থেকেই সে নিজেকে সেইভাবেই প্রস্তুত করেছে। ছোট্ট পাঁচ বছরের সেই মেয়েটা, যে একদিন হঠাৎ করেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শূন্যতার মুখোমুখি হয়েছিল, সে-ই আজ নিজের শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গ্যাংটকের সেই দুর্ঘটনার পর হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতর, অচেনা ডাক্তার আর নার্সদের কোলে কোলে ঘুরে বেড়ানো দিনগুলো তার জীবনের প্রথম কঠিন পরীক্ষা ছিল। বাবা-মায়ের মমতা হারিয়ে ফেলা সেই অসহায় শিশুটি হয়তো তখনও বুঝতে পারেনি, জীবন তাকে কত বড় লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করছে।
তারপর মামা-মামীর আগমন—ঠিক যেন অন্ধকারে এক টুকরো আলো। তাদের ভালোবাসা, স্নেহ আর নিরাপত্তার ছায়ায় ধীরে ধীরে আবার বাঁচতে শেখে কৌশিকী। আইনের জটিলতা পেরিয়ে, নিঃসন্তান সেই দম্পতির জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সে। মামা-মামী শুধু তাকে আশ্রয়ই দেননি, দিয়েছেন নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস।
ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা, আধুনিক চিন্তাভাবনা, আত্মবিশ্বাসী চালচলন—সব মিলিয়ে কৌশিকী আজকের দিনে একজন আত্মনির্ভর, সচেতন নারী। বাইরে থেকে তাকে দেখে অনেকেই ভাবতে পারে, সে খুব শক্ত, খুব হিসেবি। কিন্তু আসলে তার অন্তরটা এখনো সেই ছোট্ট মেয়েটার মতোই কোমল—মোমের মতো নরম, ভালোবাসায় ভরা।
জীবনের প্রতিটা আঘাত তাকে ভেঙে দেয়নি, বরং আরও শক্ত করে গড়ে তুলেছে। কৌশিকী জানে, হারানোর যন্ত্রণা কী, তাই যে কারও ভালোবাসাকে সে আরও গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু কিছুটা দূরত্ব রেখেই। সেই ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে রাখার ক্ষমতা সে রাখে। তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা গল্প, অনেক বেদনাময় স্মৃতি—তবুও সে এগিয়ে চলে, নিজের মতো করে, নিজের স্বপ্নের দিকে। 
 কলকাতার অফিসে জয়েন করার প্রথম দিন থেকেই অনলের প্রতি সে এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে। কিন্তু অনল তাকে কোনদিনও সেভাবে পাত্তা দেয়নি। কৌশিকী মন খুলে কখনোই অনলের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। চেষ্টা করেছে তার মনের কথা ব্যক্ত করবার জন্য কিন্তু কখনোই অনল তাকে বিন্দুমাত্র সময় দেয়নি। বারবার বিনা কারণে অনলকে ফোন করে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে। সবকিছু যেন ছাড়িয়ে গেছে আজকে অনলের ব্যবহার! ভীষন আঘাত পেয়েছে সে আজ অনলের আজকের কথাই। অনলের দিক থেকে কোন সবুজ সংকেত সে পায়নি একথা যেমন ঠিক তেমনই ঠিক সে কোনদিন অনলকে তার মনের কথা খুলে বলেনি কিংবা বলার মত সুযোগ পায়নি। কিন্তু তবুও একটা আশায় বুক বেঁধে ছিল। হয়ত  কিছুদিন দূরে থাকলে অনল তার শূন্যতা অনুভব করবে। অবশ্য সবই ছিল তার চিন্তা।
 সেই প্রথম দিন থেকে তার এই এক তরফা ভালোবাসা সে একাই বহন করে চলেছে। কিন্তু আজকে সে ফোনটা করেছিল আগামীকাল অফিসে এসে বাইরে কোথাও অনলের সাথে সময় কাটিয়ে তার মনের কথাগুলি বলার জন্য। কিন্তু যেভাবে এবং যে বিরক্তির সুরে অনল আজ কৌশিকীর সাথে কথা বলেছে তাতে সে নিজেই অবাক হয়ে গেছে। তার মন বলছে এই কথাগুলো অনলকে বলা একদম ঠিক হবে না। কারণ তার প্রতি অনলের বিন্দুমাত্র কোন ভালোলাগা নেই। খামোখা ভালোবাসার কথা জানিয়ে শুধু অপমানিতই নয় নিজের ভালোবাসাকেও অসম্মান করা হবে।
  
  এদিকে বিনীতাদের বাড়ি থেকে ফেরার পথে রাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে পড়ায় এই গরমে সকলে ভীষন নাজেহাল হয়ে পড়ে। বারবার অনল ফোন করতে থাকে। মনের ভিতর একটা খারাপ চিন্তা তার থেকেই যায়। বিনীতা যখন প্রথমবার আনন্দিরা বেরোনোর পর ফোন করে তখন ফোনটা ধরেই অনল বলে,
-- আজ তোমায় খুব সুন্দর লাগছিল 
-- তুমি কী করে জানলে?
-- দিব্য চক্ষু দিয়ে
-- আনন্দি ছবি পাঠিয়েছিল?
-- ইয়েস ম্যাম। শুধু ছবি নয় পুরো আশীর্বাদের ভিডিও করে পাঠিয়েছে। তোমার দেওয়া আলপনার খুব গুণকীর্তন করছিল।
-- সত্যিই ও একটা পাগলী! 
-- এটাই ঠিক হল জানো? আমরা বিয়ের দিনে রেজিস্ট্রি করে ওখান থেকে সোজা আমাদের বাড়িতে চলে আসবো। নতুন করে  বিয়ের অনুষ্ঠানের সত্যিই আর প্রয়োজন নেই। সবাই মিলে সঠিক ডিসিশনটাই নিয়েছে। আমার মামার উপর সে বিশ্বাস ছিল যে মামা এমনটাই করবেন। 
-- দাদা কিন্তু বলেছিল কলকাতা একটা ঘর ভাড়া করে আবার বিয়ের অনুষ্ঠান করতে। কারণ বরযাত্রীর একটা ব্যাপার তো থেকেই যায়।
-- আরে তারা সবাই বৌভাতে এসে খাবে। খামোখা কতগুলো টাকা খরচ করার কোন মানেই হয় না।
 রাত বাড়তে থাকে দু'জনের কথাও চলতে থাকে। হঠাৎ অনল বলে ওঠে 
-- একটু হোল্ড করো মামা ফোন করছেন
 বিনীতা ফোনটা ধরে থাকে ওদিকে অনল মামার ফোন রিসিভ করে জানতে পারে হাইওয়ের উপরে গাড়ি খারাপ হয়ে বসে আছে। আশেপাশে কোন দোকান , লোকালয় নেই। ড্রাইভার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু সফল হবে বলে মনে হচ্ছে না। শুনেই অনলের মাথায় হাত। মামার ফোনটা কেটে বিনীতাকে কথাটা জানিয়ে সে পুণরায় মামাকে ফোন করে বলে ওখানকার লোকেশনটা পাঠাতে। অন্য কোন উপায় বের করতে পারে কিনা -।

ক্রমশ 

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৯)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৯)

  বিয়ের আশীর্বাদের জায়গা মানেই একটা শান্ত, পবিত্র আর আনন্দে ভরা পরিবেশ—যেখানে নতুন সম্পর্কের সূচনা হয় আশীর্বাদ আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। আবার তার প্রস্তুতি যদি ঠাকুরঘরে হয়। তখন মনের মধ্যে একটা আলাদা অনুভূতি আর পবিত্রতা বিরাজ করে।
  বিনীতাদের ঠাকুর ঘরটা বেশ বড়। বিনীতা খুব সুন্দর করে আগেরদিন রাতেই আলপনা দিয়ে রেখেছে।
 মেঝেতে সাদা রঙের আল্পনা আঁকা তার মাঝে গোল করে বসার জায়গা রেখেছে। চারদিকে গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা ঝুলছে, বাতাসে হালকা ফুলের গন্ধ। একটা কোণায় ধূপকাঠির ধোঁয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, সঙ্গে শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনি মিলিয়ে তৈরি করছে এক পবিত্র আবহ।
 সাজসজ্জা ও আয়োজনের কোন ত্রুটি সেখানে নেই।
একটা পিতলের থালায় রাখা আছে ধান, দূর্বা, হলুদ, চন্দন যেগুলো দিয়ে আশীর্বাদ করা হবে। পাশে সাজানো মিষ্টির প্লেট তাতে হরেক রকমের মিষ্টি। বিনীতা মিষ্টি খেতে কোনদিনও পছন্দ করে না। তবুও নিয়ম রক্ষার্থে তো রাখতেই হবে। আশীর্বাদের সাজানো গুছানো জায়গা দেখে সকলেই খুব খুশি। বিশেষত ইরা।
 তিনি ঠাকুরঘরে প্রবেশ করে প্রথমেই জানতে চাইলেন,
-- ওমা কী সুন্দর করে সবকিছু গুছানো। কে করলো এসবকিছু।
 শুনেই সুস্মিতা বেশ গর্বের সাথে বললেন,
-- সবই বিনীতা করেছে। ও খুব সুন্দর আঁকে। ছোটবেলায় আঁকার জন্য অনেক পুরস্কারও পেয়েছে। একজন টিচারের কাছে আঁকা শিখতো। একদিন তিনি কী কারণে ওকে বকা দিলেন সেই থেকে ও আর আঁকার স্কুলে যেত না। কোন প্র্যাকটিস আর করত না। আমি বিজয় বহুবার বলেও ওকে আর আঁকার স্কুলে পাঠাতে পারিনি। কাল অনেক রাত অবধি এইসব করে তারপর ঘুমিয়েছে।
 একথা শুনে আনন্দি ফিসফিস করে বিনীতার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-- রাতে কী আর ঘুমিয়েছে? দাদার কথা ভাবতে ভাবতেই রাত কাটিয়ে দিয়েছে।
 বিনীতা তার হাতে ছোট্ট একটা চিমটি কেটে বলে,
-- তুমিও করবে রাত কাবার কারও কথা ভাবতে ভাবতে।দাঁড়াও আগে যাই তোমাদের বাড়ি তারপর ব্যবস্থা করছি।
-- সে গুড়ে বালি। ওই পথে আমি কোনদিনও হাঁটবো না ।
-- দেখা যাক কেউ কি আর বলতে পারে কার কপালে কী লেখা আছে?
 
  উলুর ধ্বনি আর শাখের আওয়াজ এর মধ্য দিয়ে শেষ হল বিনীতার আশীর্বাদ। মূল আশীর্বাদটা করলেন দেবদূত। মামা আশীর্বাদ করলে নাকি ভাগ্নে, ভাগ্নিরা সুখী হয় তাই ইরার ইচ্ছা  অনুযায়ী সকলের আগে মামা আশীর্বাদ করেন।  
      তারপর একে একে বড়রা সকলেই এগিয়ে এলেন।  প্রত্যেকে হাসিমুখে বিনীতার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতে লাগলেন—“সুখে থাকিস”, “ভালো থাকিস”, “সংসারটা ভরে উঠুক হাসিতে”—এইসব কথায় যেন ভরে উঠল চারপাশ। 
বিনীতা শান্তভাবে বসে, দু’হাত জোড় করে সবার আশীর্বাদ নিচ্ছিল। চোখে তার লাজুক হাসি, মাঝে মাঝে চোরা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল সকলের দিকে। বিজয় একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, মুখে এক অদ্ভুত মিষ্টি তৃপ্তি—যেন এতদিনের অপেক্ষা আজ একটু একটু করে পূর্ণতা পাচ্ছে তার বোনের জীবনে। সেদিন হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তটা মাঝে মাঝে মনে হত তার সে হাতে ধরে বুঝি বোনের জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। আজ সবকিছু দেখে মনেহচ্ছে ঈশ্বর তাকে নিরাশ করেননি। তিনিই চেয়েছিলেন এই বিয়েটা হোক। একটা বিপর্যয় একটা পরিবারের উপর দিয়ে ঘটে গেছে ঠিকই কিন্তু এটাই হয়ত ভবিতব্য ছিল বিনীতার জীবনে। বিজয় আজ খুব খুশি। সকলের অলক্ষ্যে সে নিজের অজান্তেই চোখ থেকে গড়িয়ে আসা জল খুব তাড়াতাড়ি মুছে নেয় যাতে কেউ দেখতে না পায়। তাদের নিয়ে মায়ের পরিশ্রম, মায়ের কষ্ট সে নিজের চোখে দেখেছে। আজ মায়ের মুখ ভরা হাসি দেখে সে খুশিতে আত্মহারা।

 আনন্দি আর লিজা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আপ্যায়নে। সবই নিজেরা তবুও সবাইকে হাসিমুখে সামলাচ্ছে তারা। বিনীতা আশীর্বাদ শেষে উঠে গেছিল মাকে কাজে সাহায্য করতে। আনন্দি হাত ধরে তাকে বসিয়ে দিয়েছে। তাকে কিছুই করতে দিচ্ছে না। বিজয় দূরে দাঁড়িয়ে আনন্দির এই কর্মতৎপরতা দেখে মনের কোন এক জায়গায় একটা ভালোলাগা কাজ করতে শুরু করেছে। মনেমনে বলেও ফেলছে, "মেয়েটা সত্যিই খুব ভালো আর মিশুকে।"

 এরই মাঝে আনন্দি এসে বিনীতার কানে কানে বলল, --কেমন লাগছে বল তো বৌদি?
 বিনীতা মৃদু হেসে উত্তর দিল, 
-- মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি। এত তাড়াতাড়ি এত সহজে সব মিটে যাবে কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। তবে এরূপ স্বপ্ন তুমিও দেখবে। ব্যবস্থা আমিই পাকা করবো।
-- হ্যাঁ ওই ভাবো বসে বসে। সেদিন কোনদিন তোমার জীবনে আসবে না। আইবুড়ো ননদের সাথেই তোমায় থাকতে হবে। তবে হ্যাঁ ননদ তোমার স্বাবলম্বী হয়েই ছাড়বে।
   সকলের আশীর্বাদ শেষ হলে, পুরোহিত মশাই আবার একটু মন্ত্র পড়ে অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ ঘোষণা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আবার শোনা গেল উলুধ্বনি আর শাঁখের আওয়াজ।
আশীর্বাদ শেষে সকলে পুণরায় ড্রয়িং রুমে চলে গেলো। ঘরের মাঝে তখন আড্ডা জমে উঠেছে। বাড়িটা যেন হঠাৎ করেই এক অন্যরকম উষ্ণতায় ভরে উঠেছে একটা নতুন সম্পর্কের সূচনার উষ্ণতা।
  তারপর শুরু হল খাওয়াদাওয়া। পাতে পাতে সাজানো লুচি, আলুর দম, চাটনি, মিষ্টি সবকিছু নিয়ে সবাই বসে পড়ল। হাসি-আড্ডা আর গল্পে জমে উঠল দুপুরটা।
আর এইসব কোলাহলের মাঝেই বিনীতা চুপ করে একবার চোখ বন্ধ করল—মনে মনে যেন প্রার্থনা করল,
"ঈশ্বর সবকিছু যেন ভালোভাবেই মিটে যায়। কোন রকম অসুবিধা যেন আর না হয়।"
 এদিকে অনল আজ বিকেলের মধ্যেই অফিস থেকে ফিরে এসেছে। নিজেই এককাপ চা করে নিয়ে সকলের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় বসে। বেশ কয়েকবার মেসেজে বিনীতার সাথে কথা হয়েছে। সন্ধ্যায় সকলে বেরোনোর পর ফোন করবে বলে দিয়েছে। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠায় রিসিভ করতে গিয়ে দেখে কৌশিকী ফোন করেছে। মেজাজটা একদম বিগড়ে গেলো। যখনই অনল একটু একাকী বিনীতার কথা ভাবতে বসে ঠিক তখনই এই মেয়েটা ফোন করে বসে। ফোনটা ধরে "হ্যালো" বলতেই কৌশিকী বলে,
-- এতদিন তোমাদের ছেড়ে চলে এসেছি। একবারও আমার কথা মনে করে ফোন করতে পারোনি?
-- এইরূপ তো কোন কথা ছিল না যে তোমায় মাঝে মাঝে ফোন করবো? 
 অনলের উত্তর শুনে কৌশিকী একটু থতমত খেলো। সে আশা করেনি অনল তাকে এইভাবে উত্তর দেবে।
-- তোমার কী হয়েছে এত রুহভাবে কথা বলছো কেন? 
-- না কিছুই হয়নি। আর এমন কী বললাম যে তোমার মনেহল আমি রূহভাবে উত্তর দিলাম? আসলে বাড়িতে কেউ নেই তো আমি একাই আছি। গরমে চা করতে গিয়ে মাথাটা বোধকরি বিগড়ে গেছে। হ্যাঁ বলো কেন ফোন করেছো?
-- না তেমন কোন বিশেষ দরকার নেই। আসলে আমি আগামীকাল কলকাতা আসছি। অফিসে যেতে হবে একটা কাজে। তুমি কাল অফিসে আসবে কিনা সেটাই জানার  - কৌশিকীর কথা শেষ হয় না, অনলের ফোনে বিনীতার কল ঢোকে অনল বলে,
-- একটা জরুরী ফোন আসছে আমায় ফোনটা ধরতে হবে 
বলেই অনল বিনীতার ফোন রিসিভ করে। কৌশিকী অনলের ব্যবহারে অবাক হয়ে ফোনটা কেটে দেয়। চুপচাপ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। অনেকক্ষণ কেটে যায় এইভাবেই। মায়ের ডাকে সম্বিৎ ফেরে। হাত দিয়ে চোখের জলটা মুছে মায়ের দিকে ফিরে জোর করে মুখে হাসি এনে জানতে চায়
-- হ্যাঁ মা বলো
-- কাল কখন বেরোবি।
--খুব ভোরে। ভেবো না মাত্র তো দু'টো দিন 
-- তুই কিন্তু বলেছিস এবার কলকাতা থেকে ফিরে তোর বিয়ের ব্যাপারে মত দিবি। মনে থাকে যেন।
-- এত তাড়াহুড়ো কেন করছো মা? চাকরি করছি কে মাথার দিব্যি দিয়েছে বিয়ে করতেই হবে?
-- এটা কোন কথা হল মা? আমাদের বয়স হয়েছে। আমাদের কিছু হয়ে গেলে কে দেখবে তোকে?
-- আমাকে কাউকে দেখতে হবে না মা। কারণ আমি চাকরি করি। টাকা দিলে কাজ করে দেওয়ার লোকের অভাব হবে না। রান্না না করেও ঘরে বসে ভালোমন্দ খেতে পারবো শুধুমাত্র একটা ফোনেই। আজকের যুগে মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়ালে মা,বাবার টাকা খরচ করে নিজের দিকের ছড়ি ঘোরানোর লোক কেউ চায় না। তাই স্বাবলম্বী মেয়েরা বিয়ে করতেই চায় না।
-- কোন একটা ছেলের কথা বলেছিলি - এবার গিয়ে তার সাথে কথা বলবি। সে বিয়েতে রাজি হলে আমরা কথাবার্তা এগোব।

ক্রমশ 
-- 

Thursday, May 21, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৮)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৮)

  মাঝখানে একদিন বাদ দিয়ে পরের দিনই ওরা আশীর্বাদে যাবে। সেই হিসাবে লিজা তার স্বামীর সাথে বেরিয়ে বিনীতার জন্য সোনার কিছু কিনতে যাবেন। আনন্দি সাথে যাবে বৌভাতের শপিংটাও হবে। সব ঠিকঠাক করে খেয়ে লিজা সুস্মিতাকে ফোন করে ফোনটা ধরিয়ে দিলেন।
-- হ্যাঁ সব তো গতকাল শুনলাম। ভাগ্যে যা লেখা আছে তাকে তো অস্বীকার করা যায় না। যা ঘটেছে সেটা নিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা আশীর্বাদে গিয়ে সামনাসামনি কথা বলবো।
-- সেটাই ঠিক হবে দিদি। একটু সকাল সকাল চলে আসবেন।
 ব্যাস এই সামান্য কথা বলে ইরা ফোন কেটে দিয়ে বৌদিকে বললেন,
-- কেনাকাটা যা করার তুমি করে নেবে ওদের সাথে। আমার বিয়ের হারটা দিয়েই আশীর্বাদ করবো। ওটা একটু পালিশ করে এনে দিলে ভালো হবে। না করলেও অসুবিধা নেই। ঘরেই একটু হলুদ জল দিয়ে ভিজিয়ে পরিষ্কার করে নিলেই হবে।8 ইল
 ইরা সবকিছুই করছেন ঠিকই কিন্তু কোথাও যেন একটা শূন্যতা তার মনে বিরাজ করছে। 
  রাতে সকলে খেয়ে যে যার ঘরে শুতে চলে গেলো। অনল বিনীতাকে ফোন করলো,
-- এই শুনেছ মা,বাবাকে সব বলে দিয়েছি
-- এটাই ভালো হল জানো। তানাহলে মনের ভিতর একটা অশান্তি কাজ করতো সারাজীবন। 
-- আনন্দিই জোর করলো মা বাবাকে জানানোর জন্য। ওটার অনেক বুদ্ধি জানো।
-- হ্যাঁ দুষ্টু বুদ্ধিটাও প্রবল।
-- বয়স অল্প তাই দুষ্টুমিতে বেশ সিদ্ধ। বাড়ির সকলের ভীষন আদরের। 
-- শোনো না পরশু খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবে। 
-- কেন তর সইছে না? কিন্তু আমি তো যাবো না। অফিস আছে।
-- ও তাই তো ,তুমিও কম দুষ্টু নও কিন্তু
-- দুষ্টুমির আর কী দেখলে? এরপর বুঝতে পারবে
-- এই ভালো হচ্ছে না কিন্তু। এখন রাখো ফোন। বেশি কথা বললে বেশি উল্টোপাল্টা বলতে শুরু করবে।
-- আচ্ছা আচ্ছা আর বলছি না।
    এরপর ফোনটা কেটে দিয়ে অনল কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইলো। মাথার ভেতর নানা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে।
   একদিকে বিনীতাকে নিজের জীবনে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে হঠাৎ করে সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যাওয়ার অদ্ভুত চাপ। তবুও কোথাও একটা শান্তি আছে—সবকিছু আর লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে না।
  ওদিকে বিনীতা ফোনটা রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেললো। এতদিনের দুশ্চিন্তা, ভয়, লুকোচুরি—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু তার মনেও একটা প্রশ্ন কুরে কুরে খাচ্ছে—সবকিছু কি সত্যিই এত সহজ হবে?
  পরের দিন সকাল থেকেই লিজারা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। গয়নার দোকানে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখেশুনে অবশেষে একটি সুন্দর সোনার সেট পছন্দ করলেন। আনন্দি তো একেবারে উৎসাহে টগবগ করছে। বৌদিকে এটা দাও না মামী, খুব সুন্দর লাগবে ওকে! বৌদিকে কিন্তু দারুণ দেখতে মামী।
লিজা হেসে বললেন, 
-- ওকে পুরো ওর মায়ের মত দেখতে। ওর মায়ের যখন বয়স কম ছিল ঠিক ওর মতই সুন্দর দেখতে লাগতো। আর তুই তো আগে থেকেই বৌদির পক্ষ নিয়ে বসে আছিস! এই পক্ষটা সারাজীবন রেখে চলিস। খুব কষ্ট করে ওর মা ওদের মানুষ করেছেন। ভীষন সংগ্রামী জীবন সুস্মিতার। জানতাম না তো কিছুই। এবার গিয়ে সব জানলাম।
  গয়না কেনা শেষ করে তারা বৌভাতের জন্য শাড়ি, কিছু প্রসাধনী, আর বাড়ির অন্যান্য জিনিসপত্রও কিনে নিলেন। আনন্দির চোখে-মুখে একরাশ আনন্দ। মনে হচ্ছে যেন নিজের বিয়ের কেনাকাটা করছে।

  এদিকে ইরা বাড়িতে বসে সবকিছু গুছিয়ে রাখছেন। আলমারির ভিতর থেকে নিজের বিয়ের সেই পুরোনো হারটা বের করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এতে! একফোঁটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর বুক থেকে, সময়টা কত দ্রুত বদলে যায়। এই হারটা বিয়েতে মা বাবা দু'জনে পছন্দ করে কিনেছিলেন। গলা ভর্তি ভারী গয়না। নতুন বউ থাকাকালীন সময়ে কয়েকদিন পড়েছেন। সেই থেকেই তোলা রয়েছে। আর একটা গলার হার আছে যেটা শ্বশুরবাড়ি থেকে আশীর্বাদে দিয়েছিল। সেটা রেখেছেন তাঁর আদরের কন্যা অনুর জন্য।
  পরের দিন আশীর্বাদের সকাল।
সকালে খুব ভোর থেকেই দুই বাড়িতেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। লিজারা নির্ধারিত সময়ের আগেই রওনা দিলেন। আনন্দি বারবার ঘড়ি দেখছে
মা, আর কতক্ষণ লাগবে? 
-- আর একটু, ধৈর্য ধর এখুনি হয়ে যাবে। আরে বাবা একটু গুছিয়ে বেরোই। এসেই তো আবার এর ভিতর ঢুকতে হবে।
-- না ইরা আজ এসে রান্নাবান্না তোমায় কিচ্ছুটি করতে হবে না। আমরা ফিরে রেস্ট নিয়ে হোটেল থেকে খাবার আনিয়ে খাবো। তোমার দাদাকে আমার বলা হয়ে গেছে। আর অনল তো অফিসে যাচ্ছে। ও তো দুপুরে খাবে না বাড়িতে। তাহলে তুমি এতক্ষন রান্নাঘরে কী করছো?
-- তোমাদের প্ল্যানের কথা তো আমি জানি না। আমি রাতের জন্য কিছুটা কাজ এগিয়ে রেখে যাচ্ছিলাম। ঠিক আছে। আমি এখুনি রেডি হচ্ছি।
 তাড়াহুড়ো করে ইরা রেডি হতে চলে এলেন। বাকিরা সব মোটামুটি রেডি। এবার বেরোনোর পালা। গাড়ি আগেই এসে গেটে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই গিয়ে একএক করে গাড়িতে বসলেন। গাড়ি ছেড়ে দিলো। ইরা দু'হাত জড়ো করে কপালে হাত ঠেকালেন।
  ওদিকে বিনীতাদের বাড়িতেও সাজসজ্জা প্রায় শেষ। বিনীতা লাল-হলুদ শাড়িতে সেজে বসে আছে। মাথায় জুঁই ফুলের মালা।মুখে হালকা মেকআপ। খুব সুন্দর দেখতে লাগছে তাকে।কিন্তু চোখে তার স্পষ্ট উত্তেজনা আর লজ্জা। সুস্মিতা এসে পাশে বসে বললেন, 
--  নার্ভাস লাগছে? কিছু ভাবছিস? সবই ভগবানের ইচ্ছা রে। সব কেমন অতি সহজেই হয়ে যাচ্ছে দেখেছিস? 
-- কেমন যেন একটা ভয় ভয় করছে। সেদিনের ঘটনাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে।
-- জীবনের ওই পার্টটা "স্বপ্ন দেখেছি" বলে ভুলে যেতে হবে। বিপদে পড়লে আমরা সাময়িক দমে যাই ঠিকই কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। সেতো সময়ের সাথে এগিয়েই চলবে। খারাপ ঘটনাগুলি ভুলে গিয়ে নতুনভাবে সবকিছু শুরু করতে হবে 
বিনীতা আস্তে করে মাথা নাড়লো।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। বিনীতা বলে উঠলো
-- মা, ওরা বোধহয়  এসে গেছে! তুমি তো এবার কাউকেই বলোনি। একাএকা সব সামাল দিতে পারবে তো? আচ্ছা আশীর্বাদ হয়ে গেলে আমি তো তোমায় হেল্প করতে পারবো।
-- আরে তোকে কিছুই করতে হবে না। লিজা সামলে নেবে আমার সাথে। ও কালকে ফোনে আমায় সেই কথাই জানিয়েছে । তোকে কিছু ভাবতে হবে না।
  বিজয় রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। সকলকে ভিতরে ঢুকতে বলে অনলের বাবার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে এসে সোফায় বসালো। তিনি বসেই বললেন,
-- কই আমার ঘরের লক্ষ্মী কোথায়? 
 বিনীতা অন্য ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সকলকে প্রণাম করলো। আনন্দি বিনীতাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল,
-- কী সুন্দর লাগছে গো তোমায় বিনীতা মানে বৌদি।
 বিনীতা, বৌদি ডাকটা শুনে লজ্জা পেয়ে গেলো। ইরা তাকে ডেকে নিজের কাছে বসালেন। মুখটা ধরে বললেন,
-- ঈশ্বর চেয়েছেন তুমি আমার ঘরে যাবে। তাই তো এতকিছু জীবনে ঘটে গেলো। কোন কথা কোনদিন আর মনে করবে না। ওসব ভুলে যাবে। 
 ইরা বিনীতার কপালে একটা চুমু খেলেন। তারপর সুস্মিতার দিকে ফিরে বললেন,
-- আগে আমরা আশীর্বাদটা করবো। কারণ আমরা কিন্তু না খেয়ে আছি। আশীর্বাদ করে তারপর চা খাবো।
-- হ্যাঁ আমার সব গুছানো। চলুন তবে আমরা ঠাকুরঘরে বসেই আশীর্বাদটা সারি।
 সকলে উঠে ঠাকুরঘরের দিকে রওনা দিলো।ঘরের ভিতর যেন এক মুহূর্তে উত্তেজনার ঢেউ বয়ে গেল। সকলে যে যার মত করে কথা বলে যাচ্ছে। যেহেতু অনল আজ নেই তাই বিজয় একটু চুপচাপ। তাকে চুপচাপ দেখে আনন্দি বলে উঠলো,
-- কিগো বিজয়দা বন্ধু আজ আসেনি বলে দেখি আমাদের সাথেও আড়ি করে কথা বলছো না।
-- কেন তুমিই তো সেদিন বললে আমরা নাকি তোমার পিছনে লাগি সব সময়। তাই ঠিক করেছি আজ থেকে আর পিছনে লাগবো না। সব সময় সামনে লাগবো। দাঁড়াও বিনীর বিয়েটা হয়ে যাক এরপর অনলকে বলবো তোমার জন্য একটা ছেলে দেখতে।
-- বয়েই গেছে আমার বিয়ে করতে। চাকরি করবো স্বাধীনভাবে সারাজীবন থাকবো। তুমি বরং একটা বিয়ে করো। দাদার বিয়েতে তো সেভাবে আনন্দ হবে না সেতো অর্ধেক বিয়ে সেরে ফেলেছে।তোমার বিয়েতে চুটিয়ে আনন্দ করবো।
  বিজয় মনে মনে ভাবছে -
 ক্রমশ 

Wednesday, May 20, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৭)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৭)
 ঘরে সবাই চুপ। একটা পিন পড়লেও শব্দ হবে। লিজা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- তুমি বলবে নাকি আমি বোলবো 
-- দেখো তোমার বলাই ঠিক হবে। কারণ আমি তো ডিটেলস্টা বলতে পারবো না। তুমি পুরো ঘটনাটাই জানো। তাই তুমিই বলো।
 আনন্দি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। তিনি চোখ, ভ্রু কুঁচকে আছেন। অনল মুখ নিচু করে মামীর পাশে বসে।
লিজা শুরু করলেন,
-- অনল তার হঠাৎ করে দেখা ছেলেবেলার বন্ধুর বোনের বিয়েতে অর্থাৎ বিনীতার বিয়েতে গেছিলো।
 অনলের মা যেন আতকে উঠলেন।
-- বিনীতা বিবাহিতা?
-- সমস্ত কথা শোনো ইরা তারপর নাহয় যার যার কথা বোলো বোন।
-- হ্যাঁ বিনীতা বিবাহিতা। কিন্তু তার স্বামী কে শুনলে তুমি অবাক হবে। তাই বলছি চুপ করে আমার কথা শোনো আর অবাক হোও না। 
-- বৌদি এত সাসপেন্স রেখে না বলে সরাসরি বলো কী হয়েছে?
-- একটু ধৈর্য ধরো বোন। সব বলবো। বলবো বলেই সবাইকে এখানে ডেকে এনেছি। 
 --তো অনল তার বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেলো। কিন্তু বর এলো না। বলা ভালো আসতে পারলো না। বর বেরোনোর সময় তাকে কিছু দুষ্কৃতী গুলি করে পালিয়ে যায়। বিনীতার ছোট মামা সেই খবর বিনীতার দাদাকে জানায়। বুঝতেই পারছো তখন বাড়ির পরিস্থিতি। বিনীতার দাদা বিজয় তখন কোন উপায় না দেখে ছোট থেকে চেনা বন্ধুটিকে বলে, তার বোনকে বিয়ে করে লগ্নভ্রস্তা হতে মুক্তি দিতে।
-- মানে অনলকে 
-- হ্যাঁ ইরা। 
-- আর ও বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেলো?
-- অনল তো সে ছেলে নয়। ও ওর মা, বাবার কথা, বোনের কথা, ওকে নিয়ে তাদের স্বপ্নের কথা সব বলে বিয়ে করতে রাজি নয় বলে দিলো। সবই বিধাতার লিখন ইরা।তুমি ঈশ্বর বিশ্বাসী। নিজেও বুঝতে পারছো যা তিনি ঠিক করেছেন তা ঘটবেই।
  তখন শুধুমাত্র বিনীতাদের বাড়ির সম্মান বাঁচাতে লোক দেখানো বিয়েই করতে বলে তার বন্ধুটি। অনল তখন কী করবে? একটা লোকদেখানো বিয়েই হয় শেষ পর্যন্ত। কিন্তু যতই লোক দেখানো হোক না কেন বিয়ে তো বিয়েই। অনল বৌ বাড়ি আনতে সাহস পায় না। বিনীতা কিংবা তার বাড়ির লোকও জোর করে না। তারপর দেখা দু'জনের  এই বাড়িতে।
    অনলের মা ইরা এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিলেন। মুখটা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠেছে। চোখে বিস্ময়, রাগ, কষ্ট—সব মিশে আছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সে মুখ নিচু করেই বসে আছে।কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন—
-- বৌদি, তুমি এসব কবে জানলে? আমার ছেলের জীবনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো, আর আমি কিছুই জানলাম না? ও আমাকে জানাতে সাহসই পায় নি? এই ওদের আমি বন্ধুর মত করে মানুষ করেছি?
লিজা শান্ত গলায় বললেন,
--জানি ইরা, তোমার রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরিস্থিতিটা এমন ছিল যে তখন কাউকে কিছু জানানোর মতো সময়ই ছিল না অনলের পক্ষে।
-- কাছে ফোন ছিল না? কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার ছিল এটা। অনুমতি নেওয়ার কথা বলছি না। কিন্তু বিয়ে করছি কিংবা করতে বাধ্য হয়েছি এই কথাটা জানাতে কতটুকু সময় লাগতো?
ইরা একটু গলা উঁচু করলেন
---সময় ছিল না মানে? বিয়ে হয়ে গেলো, সেটা জানাতে সময় ছিল না? অনল, তোর একবারও মনে হয়নি তোর জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত আমাদের জানা উচিত।
 অনল কিছু বলতে যাচ্ছিল। হাত চেপে মামী বাধা দিলেন। তিনি ধীরে ধীরে ইরার পাশে এসে বসে বললেন,
--- সিদ্ধান্তটা অনল নেয়নি ইরা, পরিস্থিতি ওকে নিতে বাধ্য করেছে। তুমি নিজেই ভাবো, একটা মেয়ের বিয়ের লগ্নে বর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় অন্তত সেই মুহূর্তে বাড়ির লোকজন তাই মনে করেছিল কারণ খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করেছিল। কয়েকমাস কোমায় থেকে সে এখন সুস্থ আছে। কিন্তু সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। ঈশ্বরের অশেষ দয়া যে সে বেঁচে আছে।সেই মুহূর্তে ওই বাড়ির মানসম্মান, একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ—সব একসাথে ঝুলে আছে। তখন ও কি করতো বলো?
ইরা একটু থেমে গেলেন। চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু গলার দৃঢ়তা তখনও আছে
-- তাই বলে নিজের জীবনের কথা একবারও ভাবলো না? আমাদের কথা? আমাদের স্বপ্ন? 
-- ভেবেছিল ইরা, খুব ভেবেছি
লিজা নরম গলায় বললেন 
---তাই তো প্রথমে না করে দিয়েছিল। কিন্তু যখন দেখলো একটা মেয়ের জীবন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, তখন নিজের কথা না ভেবে এগিয়ে গেছে। তুমি তো ওকে চেনো… ও এমনই। ওর এই মানসিকতা যে ও তোমার থেকেই পেয়েছে এটা কি তুমি অস্বীকার করতে পারো? মানুষের কষ্টে তোমার মত ওরও যে মন কাঁদে। ওই মুহুর্তে ওই বিয়েটা যদি না করে ওখান থেকে চলে আসতো আর এসে তোমায় এই কথাগুলো গল্প করতো তুমি খুশি হতে? তুমি কি তাকে বলতে না?  "এই শিক্ষা দিয়ে তোকে মানুষ করেছি। বিপদে মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে চোরের মত পালিয়ে আসলি বিয়েবাড়ি থেকে?" মেনে নিতে পারতে তুমি তোমার ছেলের সেই আচরণ? 
ইরা এবার একটু চুপ করে গেলেন। অনলের দিকে তাকালেন। অনল এখনও মাথা নিচু করে বসে আছে।
-- তাহলে এখন কী করতে হবে?
 ইরার গলায় ক্লান্তি—এই বিয়েটা কি সত্যি বিয়ে? নিয়ম মেনে সিঁদুর দান হয়েছিল? সব নিয়মকানুন বিয়েতে ঠিকঠাক মানা হয়েছিল? 
একটু থেমে আবারও বললেন,
--তাই বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই মুখ ছিল থমথমে। আমি তো কিছুই বুঝিনি।
তারপর আনন্দির দিকে ফিরে বললেন,
-- এই তুই কিছু জানতিস?
 আনন্দি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
-- না কিছুই জানতাম না। বিনীতাদের বাড়িতে যাওয়ার পর বিনীতা সব বলল।
-- এই বিনীতা কিরে? বৌদি বল 
দেবদূতের মুখে হাসি ফুটে উঠলো বোনের মুখে এই কথা শুনে। তিনি বুঝতে পারলেন শেষটা সুখের হতে চলেছে।
 অনল একবার মাথা তুলে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েই মুখ নামিয়ে নিলো -
 ইরা আবার বললেন,
-- সেদিন তো বিয়েটা হয়েই গেছে। আবার বিয়ে দেওয়ার তো কোন দরকার নেই। এবার বৌভাতটা করে দায়িত্বটা নিয়ে নিক।
লিজা একটু হেসে বললেন— -- প্রথমে দায়িত্ব ছিল, ঠিকই। কিন্তু এখন বিষয়টা শুধু দায়িত্বের মধ্যে নেই ইরা।
ইরা কপাল কুঁচকে বললেন
-- মানে?
-- মানে, ওরা দু’জনেই একে অপরকে বুঝতে শুরু করেছে। সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কটা বদলেছে। তুমি খেয়াল করোনি? বিনীতার চোখে অনলের জন্য যে টান… আর অনলের আচরণ…ওরা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলেছে। আমাদের পিছিয়ে আসার আর কোন উপায় নেই।
-- পিছিয়ে কেন আসবো? ধাক্কাটা সামলাতে তো একটু সময় লাগবে।
তারপর ইরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-- আমি শুধু একটা কথাই জানি বৌদি আমার ছেলে যেন সুখে থাকে। সে যদি সত্যিই ওই মেয়েটাকে মেনে নিয়ে থাকে তাহলে আমি তো বাধা দেবো না।
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
-- কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আমি বিনীতার সাথে নিজে কথা বলবো। সবটা বুঝে নিতে চাই। ওর মুখ থেকে সবটা শুনতে চাই মানে ওই আচারানুষ্ঠান সম্পর্কে।
লিজা মৃদু হাসলেন,
-- সেটাই তো হওয়া উচিত ইরা। কথা বলো, বুঝো আমি আর তোমার দাদা শুধু চাই, তুমি ওদের সম্পর্কটা মেনে নাও। বিনীতা খুব ভালো মেয়ে গো ইরা। সেই ছোটবেলায় ওকে দেখেছিলাম। আর সেদিন শিলিগুড়ি দেখা হল। দেখেই চিনতে পেরেছি। পুরো মায়ের মুখটা কেটে বসানো। ওরা খুব সুখী হবে দেখো।
ইরা ধীরে মাথা নাড়লেন। ঘরের ভারী পরিবেশটা একটু যেন হালকা হলো। 
-- তাহলে বিয়েটা কি আবার হচ্ছে নাকি আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে বৌ নিয়ে চলে আসবো?
দেবদূতের কথা শেষ হলে অনলের বাবা বললেন,
-- বুঝতেই পেরেছিলাম মারত্মক কিছু একটা ঘটেছে। আমার মতে আবার বিয়ে দেওয়ার দরকার কী? খামোখা আরও কিছু অর্থ খরচ। দুই পক্ষ থেকে একজায়গায় একটা অনুষ্ঠান করলেই তো হয়ে যায়। দেখো তোমরা চিন্তাভাবনা করে -
 অনলের বাবা কথাগুলো বলে নিজ ঘরের দিকে রওনা দিলেন।
-- তা বৌদি এই বিশাল ঘটনা তুমি জানলে কবে? ওখানে গিয়ে নাকি আগেই -
-- আরে আমি তো জেনেছি গতকাল রাতে। আনন্দিও তাই। 
-- ওহ্ তারমানে ওই সেদিন অফিস থেকে ফিরে বউকে দেখেই উনি ওই জন্যই বলেছিলেন, "আজ কেউ কোথাও যাবে না।"
লিজা আর দেবদূত হেসে দিলেন বোনের কথা শুনে।
 অনল উঠে গিয়ে মায়ের পায়ের উপর পড়ে বলে,
-- মা ক্ষমা করে দাও। আর কোনদিনও তোমায় না জানিয়ে কিচ্ছু করবো না। সেদিন যে কী পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলাম তা তুমি ভাবতেই পারবে না।
 ইরা ছেলের কান ধরে উঠাতে উঠাতে বললেন,
-- আর বিয়ে থার দরকার নেই। এবার বৌভাতটাই হোক শুধুমাত্র। 
 ঘরের পরিবেশ হালকা হল ঠিক যেন ভ্যাপসা গরমের পর শান্তির বাতাবরণ হিসাবে এক পশলা বৃষ্টি। 

ক্রমশ 



    

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৬)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৬)
  পঞ্জিকা দেখে পুরোহিত মশাই একদিন পরেই আশীর্বাদের দিন ঠিক করলেন। পুরোহিত বসে থাকতেই সন্ধ্যায় কথা হল ফোনে অনলের মা আর বিনীতার মায়ের সঙ্গে। আনন্দি কিংবা অনল কেউই মন খুলে বিয়ের কাজে হাত লাগাতে পারছে না কিংবা সেই আনন্দ দুই ভাইবোন কেউই দেখাতে পারছে না। লিজা বিষয়টা বুঝতে পেরে দু'জনকে ডেকে নিয়ে গেলেন তার ঘরে। জানতে চাইলেন,
-- তোদের ব্যাপারখানা কী? তোদের উৎসাহে যেন ভাটা পড়েছে মনেহচ্ছে
 অনল আরও কাছে এগিয়ে যায় মামীর কাছে। ফিসফিস করে বলে,
-- একটা কথা খুব ভাবছি মামী। সবই ঠিক আছে। কিন্তু মনটা কেমন যেন একটু খুঁতখুঁত করছে। কোনদিন মা, বাবা যদি বিষয়টা জানতে পারেন তাহলে খুব কষ্ট পাবেন।
-- সেটা ঠিক অনল। কিন্তু তাঁরা দু'জনেই কিন্তু তাকে পছন্দ করেছেন। 
  লিজা একটু থামলেন। তারপর অনলের কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বললেন,
— দেখ অনল, সব সত্যি কথা একদিন না একদিন সামনে আসেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেই সত্যি সবসময় কষ্টই দেবে। অনেক সময় সত্যি মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।
অনল চুপ করে রইল। চোখ নিচু। যেন ভেতরে ভেতরে হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
আনন্দি এবার ধীরে ধীরে বলল,
— কিন্তু মামী, যদি উল্টোটা হয়? তখন তো ভীষন আঘাত পাবেন তাঁরা? কী বলবো তখন আমরা? আমাদের দু'জনের প্রতিই তাঁদের বিশ্বাসটাই হারিয়ে যাবে যে
লিজা মৃদু হেসে বললেন,
— ভেঙে যাওয়ার ভয়েই যদি কিছু শুরু না করিস, তাহলে তো জীবনে কিছুই এগোবে না রে। আর তোর মা,বাবার চোখে আমি যা দেখেছি, তাতে তাঁরা তোদের সুখটাই চাইবেন।
একটু নীরবতা নেমে এলো ঘরে।
অনল হঠাৎ মাথা তুলে বলল,
— তাহলে আমাদের কী করা উচিত?আমার মনেহয় সবটাই তাঁদের আগে থেকেই জানিয়ে দিই।
-- এটাই ঠিক হবে মামী। এটা পরে ঘটলে খুব কষ্ট পাবেন তাঁরা বিশেষত মা। বাবা হয়ত মুখে কিছু বলবেন না কিন্তু মা প্রচণ্ড কষ্ট পাবেন।
লিজা একটু ভেবে বললেন,
— হ্যাঁ, বলবো আমরা সবাই মিলে এক জায়গায় বসে সব সত্যিটা জানিয়ে দেবো।তবে সময়টা ঠিক করে। আশীর্বাদটা হয়ে যাক। তারপর শান্তভাবে,সবটা তাঁদের বুঝিয়ে বলবো। যেহেতু তাঁরাও বিনীতাকে পছন্দ করেছেন তাঁরা অবাক হবেন ঠিকই কিন্তু পিছিয়ে যাবেন না। আর তাছাড়া তোর মামা যখন আছেন এত ভাবিস না।সব ঠিক হয়ে যাবে।
  আনন্দি অনলের দিকে তাকাল। চোখে যেন নতুন একটা ভরসা।
— দাদা, আমরা একসাথে থাকলে সব পারব, তাই না? তবে বলতেই হবে। পরে জানলে মায়ের কষ্টের সাথে সাথে নানান প্রশ্নও উঠবে তাঁদের লুকিয়ে যাওয়ার কারণ নিয়ে।
-- ঠিক বলেছিস। আর তাছাড়া আমরা আজ পর্যন্ত তাঁদের বিশেষ করে মাকে লুকিয়ে কোন কাজ করিনি।
-- কেন দাদা তুই তো তোর জীবনের সবচেয়ে বড় কাজটাই তো আমাদের সবাইকে লুকিয়ে করেছিস।
-- ওটা পরিস্থিতির চাপে পড়ে করতে বাধ্য হয়েছি।
-- তখনই এসে বললে বোধহয় এত সমস্যা হত না আজ।
-- ওরে পাগলী তখন বাড়িতে ঝড় উঠতো। সব লন্ডভন্ড হয়ে যেত।
-- কী জানি কী হত। ঠিক আছে মামী তাহলে তুমি  বোলো কথাগুলো মাকে, বাবাকে বিয়ের আগেই।
-- ভাবিস না। ঈশ্বর আছেন। তিনি সব ঠিক করে দেবেন।
অনল হালকা হাসল। অনেকদিন পর সেই নিশ্চিন্ত হাসি।
— চল, এখন সব চিন্তা একটু দূরে রাখ। সামনে অনেক কাজ আছে। সময় হাতে মোটেই নেই। কাজগুলো সারতে হবে। বিয়ে বলে কথা। আর তোর মামা যতই বলুক না কেন একদিনেই বাজার, শপিং সব সারবে ওটা শুধু কথার কথা। একটা পেন আর খাতা বা ডাইরি নিয়ে আয় তো। 
 লিজা বেরিয়ে গেলেন। ইরাকে ডেকে নিলেন ড্রয়িং রুমে। ইতিমধ্যে অনল আনন্দি এসে ঢুকলো ড্রয়িং রুমে। কিন্তু তাদের চোখে-মুখে আগের সেই দ্বিধা আর নেই—বরং একটুখানি সাহস, আর অদ্ভুত এক শান্তি।
 প্রথমেই শুরু হল কোথায় কি কিনতে যাওয়া হবে তার লিষ্ট। সকলের মত নিয়ে ফাইনাল লিস্ট তৈরি হল। যখন নিমন্ত্রণের জন্য কাকে কাকে বলা হবে ঠিক সেই মুহূর্তে দেবদূত  এসে ওদের আসরের যোগ দিলেন তিনি এসেই শুরু করলেন,
-- আরে আমায় না নিয়েই তোমরা বিয়ের কাজকর্ম শুরু করে দিলে?
 লিজা তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন,
-- বিয়ের এখনো ঢের দেরি। আমরা সকলে মিলে মোটামুটি একটা লিস্ট তৈরি করছি। ফাইনাল লিস্ট হলে তখন তো তোমাকে আর তোমার ভগ্নিপতিকে জানিয়েই করা হবে। তোমাদের সইসবুত না নিয়ে আমরা তো আর এগোতে পারবো না।সকল পরিশ্রম আমরা করবো তোমরা কেবল ওই সইটা করে দিও কাগজপত্রে। তখন আমরা একদম কোমর বেঁধে লেগে পড়বো। 
 লিজা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
-- অনল তুই গিয়ে বাবাকে একটু ডেকে আন। একটা কথা আমি সকলের সামনে আজকেই বলি। আমি ভেবে দেখলাম এখনই কথাটা বলা উচিত। তা না হলে তোর মা,বাবার কাছে আমরা ছোট হয়ে যাবো।
-- কী উল্টোপাল্টা বলছো বৌদি? তোমার মাথা ঠিক আছে তো? তোমরা ছোট হবে আমাদের কাছে?
 সে কথার উত্তর না দিয়ে তিনি অনলকে আর একবার তাড়া দিলেন। অনল বুঝতে পারলো মামী এখনই সবকিছু বলে দিতে চান। ভয় পেলো কিন্তু নিজেকে সান্ত্বনা দিলো "এটাই ঠিক।  অনেকটা এগিয়ে জানার চেয়ে শুরুতেই সবটা বলে দেওয়া ভালো।"
 তিনি তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন এবং তার চোখের ইশারায় বুঝলেন যে তিনিও এটাই চান। আনন্দির মুখ শুকিয়ে পুরো পাংশু হয়ে গেলো। লিজা সেটা বুঝতে পেরে বলেন,
-- এত ভয় পাওয়ার তো কিছুই নেই। যেটা সত্যি এই মুহূর্তে সেটাই সবাই জানবে। আমরা গতকাল জেনেছি বাড়ির বাদবাকি মানুষজন এখন জানবে। অসুবিধা কোথায়? যে কোন ঘটনা যে কোন সময় ঘটতে পারে। আমরা তারজন্য কেউ প্রস্তুত থাকি না। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তাকে সামাল দিতে পারাটাই জয়ী হওয়া।
 অনল তার বাবাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢোকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে অনলের চোখ,মুখ শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেছে। দেখলে মনে হচ্ছে সে যেন এক বিশাল ঝড়ের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। লিজা অনলকে তার পাশে বসালেন। 
তারপর শুরু করলেন কথা বলতে - 
 মানুষের জীবনে এমন এক এক সময় আসে যখন চিন্তা ভাবনা ,হিসাব-নিকাশ করে এগোনো যায় না। হয়ত কারও জীবন-মরণ পরিস্থিতি কিংবা হয়ত কারও মান-সম্মানের ফেস লস হওয়ার ভয় - সেই মুহূর্তে নিজের কথা, নিজের পরিবারের কথা ভাবতে গেলে বিপদে পড়া সামনের মানুষটির বিশাল ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই সেই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয় মানবিকতা, মনুষ্যত্বের কারণেই। যে মানুষের মধ্যে এই মানবিকতা আর মনুষ্যত্ব আছে সে কিছুতেই সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে পারে না।
-- তুমি এত কথা কেন বলছো বৌদি? কী হয়েছে সরাসরি বলো না। আমাকে জানোই তো। আমি সোজা সাপ্টা মানুষ। এত ভারী ভারী কথা ঠিক  বুঝতে পারি না।
-- জানিস তো ইরা আমাদের জীবনে কিংবা আমাদের সন্তানদের জীবনে যখন এমন কিছু ঘটনা ঘটে যখন আমাদের ইচ্ছা না থাকলেও সেগুলো মেনে নিতে হয় তাদের ভালোর জন্য, তাদের সুখের জন্য।
 দেবদূত কথাগুলো যখন শেষ করলেন তখন অনলের বাবা বললেন,
-- ইরা বুঝতে পারছে কিনা আমি জানি না। তবে আমি বুঝতে পারছি আমাদের সন্তান দু'টির মধ্যে কেউ এমন কোন কাজ করেছে যা তারা নিজেরা আমাদের কাছে বলতে না পেরে দাদা,বৌদিকে শিখণ্ডী হিসাবে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে। যদি তোমরা দু'জনে মনে করো অনল কিংবা আনন্দি যে সেই কাজটা করেছে তা ওই মানবিকতা আর মনুষ্যত্বের কারণেই করেছে , যদি তোমরা সে কাজে কোন অন্যায় দেখতে না পাও তাহলে কথা দিচ্ছি আমি কিংবা ইরা তার সেই অন্যায়কে ক্ষমা করে দেবো। কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে সরাসরি বলো তো কোনটা কী অন্যায় করে বসে আছে।
-- না না অন্যায় করেনি সে। এটাকে অন্যায় বলা যায় না। অবস্থার পরিপেক্ষিতে সে একটি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে কিন্তু তোমাদের ভয়ে বাড়িতে কিছুই জানায়নি।
 দেবদূত কথাগুলো বলে অনলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন সে মাথা নিচু করে বসে আছে।

ক্রমশ 

Tuesday, May 19, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৫)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৫)

  অনল উঠে তার ঘরে চলে গেলো। খাবার টেবিলে আলোচনা চলছে। আনন্দি একদম চুপ করে বসে যে যখন কথা বলছে তার দিকে তাকাচ্ছে। অনলের বাবা সারাজীবনই কম কথা বলেন। পরিবারের কোন আলোচনায় কখনো নিজের কোন মত ব্যক্ত করেন না যদি না তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়। ভীষন শান্তিপ্রিয় এবং নিরীহ মানুষ উনি। সকলের সব আলোচনা শুনে তিনি শুধু বললেন
-- মেয়েটাকে আমারও খুব পছন্দ হয়েছে। আমার অনলের সাথে বেশ মানাবে।
 তাহলে আমরা ফোনেই বিনীতার মায়ের সাথে কথা বলি উনি কী বলেন শুনি। তারপর একটা ভালো দিন দেখে আশীর্বাদটা করে ফেলি।
 অনলের মামা কথাগুলো বললেন।
 -- কিন্তু দাদা সবার আগে অনল আর বিনীতার মতটা দরকার। ওরা আজকালকার ছেলেমেয়ে। ওদের নিজস্ব পছন্দ অপসন্দ তো থাকবেই।
 ইরার বক্তব্য শুনে এবার লিজা কথা শুরু করলেন।
-- আমি অনল এবং বিনীতার সাথে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলেছি। দু'জনের কেউ কোন আপত্তি করেনি। আর তাছাড়া আমি সুস্মিতা মানে আমার বন্ধুকেও কথাটা বলেছি। ও তো শুনেই রাজি হয়ে গেছে। তবে ওর বক্তব্য দুটো অনুষ্ঠান একসাথে করলে খরচটা কম হবে। কিন্তু বিনীতার দাদার আবার আপত্তি তাতে। যাহোক এটা ওদের বিষয়। ওরা যেটা ভালো বুঝবেন সেটাই করবেন। তাহলে তুমি আজই ফোন করে ওর মায়ের সাথে কথা বোলো।
-- সেতো নাহয় বললাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সব কীভাবে হবে বলো তো?
-- আরে কোন চিন্তা করিস না। আমি আছি তো কোন অসুবিধা হবে না। ছেলের বিয়ে একদিনেই বাজার করে নিয়ে আসবো।
 দেবদূত হাসতে হাসতে বললেন,
দেবদূতের কথায় সবাই মৃদু একটু হেসে উঠলেও ভিতরে ভিতরে একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। দু'দিন ধরে শুধু কথার মধ্যেই ঘুরছিল বিষয়টা, আজ যেন সেটার একটা রূপ নিতে শুরু করেছে।
আনন্দি চুপচাপ বসে সব শুনছিল। তার চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল, যেখানে একটু আগেই অনল উঠে গিয়েছিল। মনে মনে ভাবছে—দাদা কি তার জীবনের ঘটে যাওয়া সত্যিটা কোনদিনও মা, বাবাকে জানাতে পারবে? যদি না পারে তাহলে তো সারাজীবন ওর ভিতরে একটা অপরাধ বোধ কাজ করবে। এ সত্যের মুখোমুখি না হতে পারলে সারাটাজীবন ওকে কুরেকুরে খাবে। নিজেই নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে না।
ওদিকে অনল নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে পড়েছে। মাথার ভেতর যেন হাজারটা চিন্তা একসাথে ঘুরছে। বিনীতাকে সে ভালোবাসে—এটা সে অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ঠিক হয়ে যাচ্ছে, এটা যেন একটু অবাস্তব লাগছে তার কাছে। মা,বাবাকে সত্যিটা জানানো উচিত। তানাহলে তাদের সরলতায় আঘাত করা হবে। কিন্তু ঘটনা যেভাবে এগোচ্ছে এখন কিছু বলতে গেলে মামী, মামাকে অসম্মান করা হবে। কোন দিকে যাবে সে এখন? মাথায় কিছুই আসছে না তার। প্রথমে এইসব বিষয় নিয়ে সে ভাবেনি। কিন্তু এখন কেন মনেহচ্ছে তার নিজের জীবনের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সে একটা মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে মা, বাবাকে ঠকাচ্ছে। কী করবে সে এখন? এইভাবে মিথ্যে দিয়ে জীবন শুরু করলে সুখী হতে পারবে সে?

 সে ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বিনীতার নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল।
ফোনটা কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে বিনীতার কণ্ঠ ভেসে এল— — হ্যালো?
অনল একটু থেমে বলল, — তুমি ফ্রি আছো?
— হ্যাঁ, বলো। (গলায় হালকা কাঁপুনি) ওখানে সবাই কী বলছে?
— সব ঠিকঠাক এগোচ্ছে। সবাই খুব খুশি… (একটু থেমে) 
বিনীতা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
 — তুমি খুশি তো?
 অনল একটু হেসে বলল, — আমি খুশি… যদি তুমি খুশি হও। 
ওপাশ থেকে মৃদু হাসির শব্দ এল, — তাহলে আমিও খুশি।তার মধ্যেও একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে 
-- কী সেই কিন্তু?

    লিজা ইতিমধ্যেই ফোনটা হাতে নিয়ে সুস্মিতার নম্বর ডায়াল করেছেন। সবাই একটু চুপ করে অপেক্ষা করছে। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোনটা রিসিভ হল।
— হ্যালো সুস্মিতা, আমি লিজা বলছি।
— হ্যাঁ বল, আমি তো তোর ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলাম।
লিজা হেসে বললেন, — তাহলে দেরি না করে বলি, আমরা সবাই চাইছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা ভালো দিন দেখে আশীর্বাদটা করে ফেলতে।
ওপাশ থেকে সুস্মিতার গলায় আনন্দ স্পষ্ট, — আমরাও সেটাই চাই। এতদিন পর যখন সব ঠিকই হল তখন আর দেরি করতে চাই না।
মামা পাশে থেকে ইশারা করলেন, — দিনটার কথা বলো।
লিজা আবার বললেন, — তাহলে একজন পণ্ডিত ডেকে দিন দেখে নিই? এই সপ্তাহেই যদি কিছু পাওয়া যায়!
— নিশ্চয়ই। আমি এখান থেকেও দেখে নিচ্ছি। এখন তো একটু ব্যস্ত আছি। অবেলায় আমি অনলের মা,বাবার সাথে কথা বলবো -
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর ঘরে যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। সবাই নিজেদের মতো করে পরিকল্পনা করতে শুরু করল—কে কী করবে, কী কী কিনতে হবে, কাকে খবর দিতে হবে।
শুধু আনন্দি এক কোণে দাঁড়িয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। আকাশটা নীল, একদম পরিষ্কার। কিন্তু তার মনের ভেতর যেন অদ্ভুত একটা মিশ্র অনুভূতি—খুশি, মা, বাবাকে সবাই মিলে ঠকাচ্ছি নাতো? তাঁরা সরল মনে আমাদের কথা বিশ্বাস করে নিলেন - কোথাও যেন একটা কাঁটা বুকের ভিতর বিধছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে অনল বলল, — কী ভাবছিস এত?
আনন্দি ঘুরে দেখে দাদা দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ মুখে শান্তির মাঝেও যেন কোথায় একটা বড় জিজ্ঞাসাবোধক চিহ্ন রয়ে গেছে। সে যেন কিছু বলতেই বোনের কাছে এসেছে।
— কিছু না… শুধু ভাবছি, সবকিছু খুব সুন্দরভাবেই এগোচ্ছে দাদা। কিন্তু তবুও কেন জানি না মনটা কেমন যেন লাগছে। 
-- কেন রে ? কী হল? 
-- আমার কেন জানি মনেহচ্ছে আমরা বোধহয় মা,বাবাকে ঠকাচ্ছি 
-- এটা আমার মনেও এসেছে রে - এখন কী করি বলতো? এই কথাটা আলোচনা করতেই তোর কাছে আসা।
-- আমিও তো সেটাই ভাবছি
-- বলে দেবো?
-- কিন্তু মামী তো বিষয়টা অন্যভাবে প্লেস করেছেন। এখন যদি বলে দিই তাহলে তো মামীকে সঙ্গে মামাকেও অসম্মান করা হবে। সেটাও তো আমরা করতে পারি না। মাথায় কিছুই আসছে না।
-- তবে একটা কথা কী জানিস সবকিছু তো নতুন ভাবেই হচ্ছে। ওই বিয়েটার তো কোন মানেই থাকছে না। 
-- হ্যাঁ সেটাও যে আমার মাথায় আসেনি তা কিন্তু নয়। আমরা বরং মামা, মামীর সাথে একবার কথা বলি আর সেইভাবেই এগোই।
  
 এদিকে অনলের ফোনটা কাটার পর থেকে বিনীতা ভেবে চলেছে অনল কী বলতে গিয়েও বললো না। সবকিছু তো ঠিকঠাক এগিয়ে চলেছে। তবে ওর মনে কিসের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। সে বিছানার উপর গিয়ে বসে। ফোন খুলে গ্যালারিতে গিয়ে খুব নিকট আত্মীয়ের তোলা মাত্র কয়েকটি বিয়ের ছবি সেগুলো দেখতে থাকে। মনেমনে ভাবে মানুষ বলে, জন্ম, মৃত্যু,বিয়ে সবই ঈশ্বরের পূর্বপরিকল্পিত। ঠিক তাই। উদাস হয়ে যায়। চুপচাপ শুয়ে থাকে। ঠিক তখনই ওর মা এসে ঘরে ঢোকেন।
-- হ্যাঁরে বিণী লিজা ফোন করেছিল। ওরা নতুন ভাবেই আবার বিয়েটা দিতে চায়। দু'একদিনের মধ্যেই আশীর্বাদের দিন পাকা করবে বলেছে। তুই কি ছুটিটা কটাদিন বাড়িয়ে নিতে পারবি?
-- না মা, নতুন চাকরি ছুটি কিছুতেই বাড়াতে পারবো না। দাদাকে কি জানিয়েছ? 
-- হ্যাঁ ফোন করেছিলাম। অফিসে খুব ব্যস্ত এখন। বাড়িতে এসে সব শুনবে বললো।
ভাবছি ওবেলায় একবার অনলের মায়ের সাথে কথা বলবো।
-- সে তুমি যা ভালো বোঝো করবে। 
-- কিন্তু বিয়েটা তো আমরা এখানে দিতে পারবো না। আমাদের কলকাতার দিকে ঘর ভাড়া করে বিয়েটা দিতে হবে। ওরা আগের বিয়ের ব্যাপারে বাড়িতে কিছুই জানায়নি। এখানে বিয়ে দিলে তো সব জানাজানি হয়ে যাবে। ছেলে এক থাকলেও পাড়া-প্রতিবেশী কে কখন কী বলে বসবে তার তো কোন ঠিক নেই।আবার না বিয়ের দিন কোন ঝামেলা হয়ে বসে।
-- আমার জীবনে যে ঈশ্বর কী লিখেছেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। আমি কিছু আর ভাবতে পারছি না। তুমি ,দাদা যা ভালো বোঝো তাই করো। আমার কোনটাতেই কোন আপত্তি নেই। তবে আবার দাদার একগাদা টাকা খরচ হবে এটা ভেবেই খারাপ লাগছে। আমার তো নতুন চাকরি। কতটুকু সাহায্য করতে পারবো আমি? 
-- এসব নিয়ে আপাতত তোকে ভাবতে হবে না 

ক্রমশ -