ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ১)
-- না এটা কিছুতেই হতে পারে না। বিয়েটা ছেলেখেলা নয়। বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে এসে বৌ নিয়ে বাড়িতে যাবো -- এটা আমার মা,বাবা কিছুতেই মেনে নেবেন না।
-- অনল, শোন ভাই বিপাকে না পড়লে তোকে এমন অনুরোধ আমি কিছুতেই করতাম না। আমার বোনের বিয়েতে যত বন্ধু আজ এসেছে তাদের মধ্যে একমাত্র তুইই বিয়ে করিসনি।তুই ছাড়া এই বিপদ থেকে আমাদের কেউ উদ্ধার করতে পারবে না।
-- তাই বলে বিয়ে? না আমি এটা কিছুতেই পারবো না। আমার বিয়ে নিয়ে আমার মা,বাবার একটা স্বপ্ন আছে, আমার নিজেরও অনেক পরিকল্পনা আছে। সবে মাত্র চাকরি পেয়েছি। এটা হতে পারে না বিজয়।
--- আমি তোর পায়ে পড়ছি আমার বোনটাকে লগ্নভ্রস্তা হওয়ার আগে উদ্ধার কর ভাই।
-- এ অন্যায় অনুরোধ আমায় করিস না। আমার নিজেরই একটি বিবাহযোগ্যা বোন রয়েছে। এমতাবস্থায় হঠাৎ করে আমি বৌ নিয়ে বাড়িতে গেলে মা,বাবা আত্মীয়স্বজনের কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। আমায় ক্ষমা কর ভাই। বিকল্প কিছু রাস্তা বের কর।
-- তাহলে তুইই বল এখন আমি কী করবো?
বহুদিন বাদে ছেলেবেলার বন্ধু বিজয়ের সাথে অনলের হঠাৎ করেই দেখা। কলেজ ছাড়ার পর দু'জন দু'দিকে ছিটকে গেছিল। একটি বড় মাল্টিকম্পলসে বিজয় চাকরি পেয়ে গেলেও অনল চার বছরের বেকার জ্বালা সহ্য করে মাসদুয়েক হল রেলে চাকরি পেয়েছে। মেধাবী ছাত্র হলেও অনল হল ভীষন একগুঁয়ে টাইপের ছেলে একটি। বেসরকারি সংস্থায় ভালো চাকরির অফার পেলেও তা না নিয়ে দিনের পর দিন সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়ে গেছে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে দিনের পর দিন "আত্মীয়স্বজনের কিরে চাকরি পেয়েছিস", মা,বাবার, "কিরে কিছু হল?" বোনের "দাদা একটা কিছুতে ঢুকে পড় বসে থেকে লাভ কী হচ্ছে তোর -" কারো কথার কোন পাত্তা না দিয়ে নিজের মত করে চাকরির পরীক্ষা দিয়ে গেছে।
বিজয় শপিংমলে বোনের বিয়ের কাপড়চোপড় কিনতে এসেছে আর এদিকে প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে বাড়ির সকলের জন্য কিছু কেনাকাটি করতে এসেছে অনল।
কথায় কথায় বোনের বিয়ে সম্পর্কে সমস্ত ঘটনা জানায় বিজয়।
আর পনেরদিন পরেই বোনের বিয়ে। ছেলে নামকরা ক্রিমিনাল কোর্টের উকিল। মা আর ছেলে।নিজেদের বাড়ি বারাসাতে। বিয়ের আগের দিন থেকে পুরোনো বন্ধুকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে দু'জনে শপিং শেষে আড্ডা দিতে একটা কফিশপে কফি খেতে খেতে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বিয়ের আগেরদিন দেখা হচ্ছে এই আশ্বাসে দু'জনেই বাড়ির পথ ধরে।
অনেকদিন পর দুইবন্ধুর এই দেখা সামান্য সময় গল্প করতে করতে সেই অতীতের কলেজের দিনগুলিতে ফিরে যাওয়া অদ্ভুত এক আনন্দের রেশ নিয়ে দু'জনেই ফিরে আসে দু'জনের বাড়িতে। অনল পরেরদিন ফোন করে বিজয়কে জানায় বিয়ের আগেরদিন নয় বিয়ের দিনই খুব সকালে সে বিয়ে বাড়িতে হাজির হবে। সেইমত অনল বিয়ের দিন সকালেই চলে আসে। অনলকে সাথে নিয়ে বাড়ির সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় বিজয়। অনল তার ব্যাগ খুলে ছোট একটা লাল বাক্স বের করে বিজয়ের বোন বিনীতার হাতে দিয়ে বলে দেখো তো এটা পছন্দ হয় কিনা? আসলে জীবনে বাজার করা ছাড়া এসব কখনোই কিনিনি। এই প্রথম কিনলাম। আমি পাশ করেছি কিনা সেটা তোমার এই আংটিটা পছন্দের উপর নির্ভর করছে।
বিনীতা বাক্সটা খুলে বলে,
-- বাহ্ কী সুন্দর হয়েছে। এটা বেশ ছোটবড় করা যায়। খুব ভালো হয়েছে। তুমি পাশ করে গেছো অনলদা। বলেই হাসতে থাকে।
অনল তার দিকে তাকিয়ে বলে,
-- কেনার থেকে একটা মস্তবড় চিন্তায় ছিলাম।এখন মনেহচ্ছে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।
অনল একঝলক বিনীতার দিকে তাকিয়ে দেখে সুন্দরী বলতে যা বোঝায় বিনীতা ঠিক তাই। মায়াভরা দুটি চোখ, একমাথা চুল, বাঁশির মত নাক আর সুন্দর দু'টি গজদাঁত যা বিনীতার হাসিকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়। একটু পরেই গায়ে হলুদ তাই হলুদ শাড়ীর সাথে লাল ব্লাউজ তার দুধে আলতা রংকে আরও উজ্জ্বলতর করে তুলেছে। নিমেষেই অনল নিজেকে সামলে নেয়। বিজয়ের মা মেয়েকে বলেন দাদাকে প্রণাম করো
অনল কিছুটা পিছন হটে গিয়ে বলে,
-- প্রণাম করতে হবে না।আমি এসব বিশ্বাস করি না। মাথা যদি নত করতেই হয় তাহলে সেই সর্বশক্তিমানের কাছেই মাথা নত করবে। আর তাঁর পরেই আছেন মা,বাবা। তাই ছাড়া অন্য কোথাও মাথা নোয়াবে না। দেখো সায়েন্স নিয়ে পড়েছি কিন্তু তা সত্বেও বলছি প্রতিটা মানুষ তার ভাগ্য নিয়েই জন্মায়। ভাগ্যকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কপালের ছবিটা বিধাতা এঁকেই পাঠান। মানুষ তার পরিশ্রম দিয়ে সেই ছবিটার উপরে পুণরায় রংতুলির প্রলেপ দিয়ে সঠিক আকার দেয়। ভাগ্যে না থাকলে তোমার হাতের মুঠোয় ধরা জিনিসটাও হাত ফসকে বেরিয়ে ভেঙেচুরে খানখান হয়ে যাবে।
অনল একনাগাড়ে কথাগুলো বলতে লাগলে আশেপাশের কেউ কেউ বিরক্ত হলেও বিনীতার ভালোই লাগে এগুলো শুনতে। হঠাৎ অনল কথা থামিয়ে বলে,
-- এই দেখো বিয়ের দিনে তোমায় জ্ঞানগর্ব কথা শুনাতে শুরু করলাম।
-- আমার তো বেশ ভালোই লাগলো শুনতে। অন্যরকম একটা উপলব্ধি হল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব এসে পৌঁছাল। সবাই সেদিকে ছুটলো। অনল বিজয়ের ঘরে ঢুকে ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে গরম গরম ফুলকো লুচি, ছোলার ডাল আর চা খেয়ে গায়ে হলুদ দেখতে হাজার হল। কারণ ততক্ষণে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে কাজ শেষ।
বেশ হইহুল্লোড় এর মধ্যেই গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হল। দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষ। বিউটিপার্লারের লোক এসে বিনিতাকে সাজাতে বসেছে। অনল এরই মাঝে একটু ঘুমিয়ে নেয়। বোনের সাথে একটু আগেই ফোনে কথা হয়েছে। মা,বাবার বয়স হয়েছে তাই সবসময় একটা টেনশনেই থাকে অনল বাড়ির বাইরে থাকলেই। বিজয় এসে ঘরে ঢুকলে তাদের মধ্যে টুকটাক কথা হয়। বিজয় জামাকাপড় পরে রেডি হয়ে অনলকে জানিয়ে যায় বোনকে ঘোরানোর সময় যেন সে সাথ দেয়। অনল মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
সন্ধ্যা লগ্নেই বিয়ে। অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। দৌড়াদৌড়ি, হাসিঠাট্টা, হট্টগোল কানের কাছে মুখ নিয়ে ছাড়া কারও কথা বোঝবার উপায় নেই। ঢাক্কাপাড় ধুতি আর লাল পাঞ্জাবিতে অনেকেই অনলকে জামাই বলে ভুল করবে। একমাথা চুল, ছ'ফুট উচ্চতা তার। চোখদুটি যেন সবসময় কথা বলে। যে কোন মেয়েই তাকে দেখে ফিদা হবে। বিয়েবাড়িতে উপস্থিত অনেক তরুণীই তাকে নিয়ে গুঞ্জন শুরু করেছে। অনেকেই বিনীতার কাছ ছ থেকে জেনে নিয়েছে আজকে বিয়েবাড়িতে উপস্থিত "কে এই নায়ক?" বিনীতাও অনলের চেহারা দেখে যে মুগ্ধ হয়নি তা একেবারেই নয়। মনের অজান্তেই তার মন বলে উঠেছে "কী সুন্দর দেখতে।" কিন্তু সে বিয়ের কনে মুহূর্তেই নিজেকে সংবরণ করে নিয়েছে।
ছাদনাতলায় পুরোহিত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। বারবার ঘড়ি দেখছেন তিনি। এদিকে বিজয়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। বারবার সে ঘরবার করছে। বিজয়ের মা ছুটতে ছুটতে এসে বললেন,
-- হ্যাঁরে বিজু এখনো ওরা আসছে না কেন? ফোন করেছিস?
-- হ্যাঁ মা ফোন তো করছি কিন্তু লাইন তো ঢুকছে না। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
-- তুই তোর ছোটমামাকে ফোন কর।
-- সেও চেষ্টা করছি। কিন্তু কোন ফোনেই ফোন ঢুকছে না।নেট ওয়ার্ক সমস্যা মনে হচ্ছে। সেই বিকেলে মামা বর আনতে গিয়ে ওই বাড়িতে ঢোকার পূর্ব মুহূর্তে ফোন করেছিলেন তারপর তো মামার সাথে আমার আর কোন কথা হয়নি। মাথা কাজ করছে না। কী হতে পারে, কী হচ্ছে ওখানে কিছুই বুঝতে পারছি না।
মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে তাকিয়ে দেখে পিছনে এসে ঠাকুরমশাই দাঁড়িয়েছেন। ঠাকুরমশাইয়ের দিকে ফিরতেই তিনি বললেন,
-- বাবা লগ্ন তো শেষের পথে। কী হবে এবার?
তাঁর কথার উত্তর দেওয়ার আগেই বিজয়ের ফোনটা বেজে ওঠে। বিজয় তড়িঘড়ি পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখে ছোটমামা ফোন করেছেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- এই তো ছোট মামা কল করেছেন।
ফোনটা কানে দিয়ে হ্যালো বলতেই ও প্রান্ত থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় মামা বললেন,
-- বিজু, বিনুটার জীবনে এরূপ সর্বনাশ হয়ে যাবে কোনদিনও ভাবিনি রে!
-- কী-- কী-- হয়েছে ছোটমামা?
ক্রমশ --