ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৪)
আগে থাকতেই বিজয় একটা গাড়ি বুক করে রেখেছিল। সকাল আটটার সময় গাড়ি এসে হাজির। সবাই রেডি বেরোবার জন্য। অনল একটু সুযোগ পেয়ে বিনীতাকে বলল,
-- আর কিছুদিনের অপেক্ষা। তারপরেই তোমায় আমার কাছে নিয়ে যাবো। তুমি শুধু একটু তাড়াতাড়ি ট্রান্সফারের চেষ্টাটা করো।
-- আর রোজ ফোনটা কে করবে?
-- সেটা নাহয় এখন থেকে আমিই করবো।
বিনীতা হেসে দিলো। দূর থেকে আনন্দি ওদের দেখতে পেয়ে দৌড়ে ওদের কাছে এসে দাঁড়ালো। তারপর খুব গম্ভীর স্বরে বললো,
-- একটু বেখেয়াল হয়েছি কী সেই সুযোগ দু'জনেই নিয়ে নিয়েছে। কিছুই তো করতে পারলি না এতদিনে। এখন বেশ দু'জনে সুযোগের সদ্ব্যবহার করছিস?
-- উফ্ অনু তোর জন্য কি আমি একটু আমার বউয়ের সাথে কথাও বলতে পারবো না।
_ না এখন পারবি না। আগে আমরা সব ব্যবস্থা করি তারপর পারবি।
আনন্দির কথা শুনে অনল আর বিনীতা হেসে ওঠে। পরিবেশটা হালকা হয়ে যায়। বিনীতা একটু লজ্জা পেয়ে মুখটা নিচু করে ফেলে, আর অনল মজা করে বলে ওঠে,
— দেখছো তো, নিজের বোনই এখন পাহারা দিচ্ছে!
বিজয় তখন গাড়ির দরজা খুলে বলে,
— আচ্ছা আচ্ছা, অনেক গল্প হয়েছে। এবার সবাই ওঠো, না হলে দেরি হয়ে যাবে।
সবাই একে একে গাড়িতে উঠে বসে। হঠাৎ মামী বললেন,
-- যাহ খুব ভুল হয়ে গেছে। আমায় একটু নামতে হবে।
সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে মামীর দিকে তাকালো। জানলার পাশেই বসেছিলেন তিনি দ্রুত নেমে পড়লেন।
বিনীতা গাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে। তিনি তার গলার থেকে চেনটা খুলে বিনীতার গলায় পরিয়ে দিতে দিতে বললেন,
-- ধুমধাম করার আগেই আমি নিজের মত করে তোমায় আশীর্বাদ করে গেলাম। সাবধানে থেকো আর খুব তাড়াতাড়ি ট্রান্সফার নিয়ে কলকাতার দিকে চলে এসো।
বিনীতা নিচু হয়ে মামীকে প্রণাম করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। গাড়ি ছেড়ে দিলো।
বাইরে সকালের আলো, রাস্তার ধারে দোকানপাট খুলছে, মানুষজন তাদের দিনের কাজ শুরু করছে—সবকিছু যেন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু গাড়ির ভেতরে সবার মনেই একটা অদ্ভুত টান। কিছু যেন তারা ফেলে যাচ্ছে।
-- কিছু ভাবিস না দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই যদি আগেই সবকিছু আমাদের জানাতিস তাহলে আরও আগেই এসব ঝামেলা মিটে যেত। দুশ্চিন্তায়, দুর্ভাবনায় তোদের দু'জনের দিন কাটাতে হত না। দেখবি বাবা
সবকিছু ভালোয় ভালোয় হবে। এতদিন পর আর কোনো ঝামেলা যাতে না হয় সেই ভাবেই এগোবো আমরা।
আনন্দি বিজ্ঞের মত বলে ওঠে
— কিছু হবে না মামী। আমরা সবাই একসাথে আছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।
-- হ্যাঁ তুই যখন বলছিস তখন সব ঠিক হবে। সারাজীবনের জ্ঞানদিদি
-- দাদা ভালো হবে না বলছি। আমায় রাগাস না। তাহলে কিন্তু বৌ পাবি না
আনন্দির কথা শুনে অনল আর লিজা দু'জনেই হেসে ফেলেন।
গাড়ি এগিয়ে চলে। যে যার মত করে সমস্যার সমাধানের পথ ভেবে চলেছে। তবে সকলের মনটা বেশ ফুরফুরে। অনল অনেককিছুই ভেবে চলেছে। মনে পড়ছে তার বিয়ের দিনের সব ঘটনা। সবকিছু যে এত তাড়াতাড়ি এমনভাবে সমাধান হতে পারে তা সে কল্পনাতেও আনেনি। আসলে বিধাতা যখন বিপদে ফেলেন তিনিই আবার সবকিছুর সমাধানের পথও খুঁজে দেন।
গাড়ি এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ালো। অনল ড্রাইভারকে টাকা দিতে গিয়ে জানতে পারলো বিজয় পেমেন্ট দিয়েই পাঠিয়েছে। কথাটা শুনে লিজা হেসে দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন।
ইরা ওদের দেখতে পেয়েই কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,
-- ফিরলে কেন বৌদি? বন্ধুর বাড়িতেই থেকে যেতে পারতে তো। ছোটবেলার বন্ধু বলে কথা! আমরা তো তোমার অনেক দূরের --
লিজা ননদিনীকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
-- ওরে বাবা কত রাগ হয়েছে আমার ননদিনীর। ঠিক আছে তোমার কাছে নাহয় আরও কয়েকটা দিন বেশি থেকে যাবো। আপাতত স্নান করে আগে ফ্রেস হই। অনেক কথা আছে তোমাদের সাথে আমার। খেতে খেতে সব বলবো।
-- ঠিক আছে ঠিক আছে। যাও আগে একটু বিশ্রাম নাও তারপর স্নানে যেও। দাদা ঘরেই আছে।
লিজা তাদের জন্য বরাদ্দ ঘরটাতে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন। দেবদূত সেটা দেখতে পেয়ে বললেন,
-- আরে ফিরেই ঘরের দরজা বন্ধ করছো কেন?
-- কিছু কথা আছে। আপাতত তোমাকে আগে সেই কথাগুলো শুনতে হবে।
-- সে ঠিক আছে। কিন্তু এই বয়সে দু'জনে দরজা বন্ধ করে থাকলে বাচ্চা দু'টো কী ভাববে?
-- কিচ্ছু ভাববে না। ওরা সব জানে।
-- তাহলে তো ব্যাপার গুরুতর। কী হয়েছে?
-- অবস্থার চাপে পড়ে অনল বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে কয়েকমাস আগে।
-- সে কী? বাড়ির কেউ তো জানে না।এখন উপায়?
-- উপায় বের করার জন্য তো তুমি আছো। মেয়েটাকে চেনো। আমার বন্ধুর মেয়ে বিনীতা।
-- এ্যা
-- হ্যাঁ
-- আরে ঘটনাটা খুলে বলো। সে অনেক কথা। সংক্ষেপে যেটা সেটা হচ্ছে বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেছিলো, সেদিনই কিছু দুষ্কৃতীর হাতে বর বাড়ি থেকে গাড়িতে ওঠার সময় গুলিবিদ্ধ হয়। তারপর
-- মারা গেছে -
-- সেই মুহূর্তে সকলে সেটাই মনে করেছিল কিন্তু কয়েকমাস কোমায় থেকে এখন পুরোপুরি সুস্থ। ঘটনাটা খুবই দুঃখজনক হলেও কিন্তু সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। ওই বিয়ের আসরে অনলের বন্ধু অনেক জোরাজুরি করে তার বোনের সাথে অনলের বিয়ে দেয়। কিন্তু অনল সাথে করে বৌ বাড়িতে নিয়ে আসতে সাহস পায় না
-- সেটাই তো স্বাভাবিক
-- যাহোক এখন এই বিয়েটাকে স্বীকৃতি দিতে হবে কীভাবে কী করবে সেটা বসে বসে ভাবো আমি স্নান সেরে আসি। খাবার টেবিলেই সব আলোচনা হবে কিন্তু আজ এবং এখনই।
-- হ্যাঁ আমাকে অথৈ সমুদ্রে ফেলে দিয়ে উনি চললেন স্নানে। যাও তাড়াতাড়ি স্নান সেরে আসো টেনশনে আমার প্রচন্ড খিদে পেয়ে গেলো।
-- আরে তুমি হচ্ছ আমার মুস্কিল আসান। জানো মেয়েটি খুবই ভালো। আমি কিন্তু তাকে আমার গলার চেন দিয়ে আশীর্বাদ করে এসেছি।
-- বাহ্ চমৎকার। গলার চেন তোমার দিয়েছো কিন্তু আমার গলার উপরে তো ইরা খাঁড়া ধরে দাঁড়িয়ে পড়বে।
-- আরে না, তোমার বোন, ভগ্নিপতি তুমি যা বলবে তাই শুনবে। শুধু কীভাবে এগোবে সেটা ভাবো।
খাবার টেবিলে সবাই হাজির। হঠাৎ দেবদূত বললেন,
-- হ্যাঁরে ইরা ছেলেটার তো এবার বিয়ে দেওয়া দরকার। আমরা থাকতে থাকতে মেয়ে দেখা শুরু করলে হয় না।
-- হ্যাঁ দাদা আমরাও যে ভাবছি না সেটা নয়। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যে মেয়ে কোথায় পাই বলতো?
অনল আর আনন্দি পাশাপাশি চেয়ারে। অনল মাথা নিচু করে খেয়ে চলেছে। আনন্দি চেয়ারের নিচু থেকে দাদার হাঁটুতে এক চিমটি কাটে। অনল "আঃ" করে চিৎকার করে ওঠে। সকলে অনলের দিকে তাকিয়ে পড়লে আনন্দি বলে,
-- আহা তোমরা আলোচনা চালিয়ে যাও। আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম দাদা সব শুনতে পাচ্ছে কিনা।
--- একটা সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছে চুপচাপ বসে খা।
ইরা আনন্দির উদ্দেশ্যে কথাগুলি বলে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- আমার না ওই বিনীতা মেয়েটাকে খুব ভালো লেগেছে। খুব শান্ত, ধীর,স্থির। কিন্তু এখনকার মেয়ে তো কোথায় নিজে পছন্দ করে বসে আছে তার ঠিক নেই।
অনলের বাবা ছাড়া বাকি যারা টেবিলে ছিলেন সকলের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠলো। অনল ভিসুম খেলো। সঙ্গে সঙ্গে আনন্দি জলের পাত্র এগিয়ে দিয়ে বলল,
-- নে জলটা খেয়ে নে।
অনল চোখ বড় বড় করে বোনের দিকে তাকিয়ে জলের গ্লাস থেকে কিছুটা জল খেয়ে উঠে গেলো। কারণ তার খাওয়া শেষ হয়ে গেছিল।
মামী ডেকে বললেন,
-- অনল উঠে যাচ্ছিস কেন? তোর বিয়ের কথা হচ্ছে তোর থাকাটাও তো দরকার।
-- আমি থেকে কী করবো মামী? তোমরা যা বলবে সেটাই আমি করবো।
-- হ্যাঁ হ্যাঁ জানি তো তুই খুবই বাধ্য ছেলে মা,বাবার
আনন্দির কথা শুনে এবার মামী বললেন,
-- তুই একটু চুপ কর অনু। দাদার বিয়েটা দিয়েই আমরা এবার যাবো। চুপচাপ খেয়ে উঠে যা।
-- এ বাবা কেন? আমি তোমাদের সব আলোচনা শুনবো।
-- ঠিক আছে শুধু শুনবি কিন্তু। একটাও কথা বলতে পারবি না।
ইরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন -
ক্রমশ