ভালোবাসার নীল আকাশ (১৭ তম পর্ব)
দোলের দিন সকাল। বাড়ির সকলেই ব্যস্ত রাধা গোবিন্দের পুজো নিয়ে। বহুদিন পর ছেলেকে পুজোর তদারকিতে সেই আগের অবস্থায় দেখে তাপসবাবু যারপর নাই খুশি। বারবার ঠাকুরের সামনে হাত জোর করে বিড়বিড় করে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলছেন না। মনপ্রাণ ঢেলে তাঁর সেবা করার ফল মনেহয় তিনি শীঘ্রই পেতে চলেছেন। খুশিতে তাঁর চোখে জল এসে যাচ্ছে।
পুজো শেষে একএক করে সকলে ঠাকুরের পায়ে আবির দিয়ে , প্রসাদের সাথে ঘরে তৈরি আলুর দম আর লুচি খেয়ে আবির খেলতে শুরু করলো। গ্রামের অনেক মানুষজন সেদিন ওদের বাড়িতে উপস্থিত। সকলেই তাপসবাবুর পায়ে আবির দিচ্ছে। তিনি মন্দিরের বারান্দায় বসে একেএকে সকলের কপালে একটা আবিরের টিপ পরিয়ে চলেছেন। একসময় নলিনী যখন শ্বশুরের পায়ে আবির দিতে আসে দুই বন্ধু সমেত তখন তিনি বলেন,
-- আজ আমি ছেলে আর বৌমার হাতের আবির একসাথেই নেবো। ডাকো তাকে। সে গেলো কোথায়?
ময়ূর, অর্পিতা তাঁর কথাই সায় দিয়ে বলল,
-- একদম ঠিক কথাই বলেছেন মেসোমশাই। এ সুযোগ আজ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। তবে আমাদের আশীর্বাদটা এখন করবেন তো?
-- সেতো নিশ্চয়। আর মা তুমি দেখো তো আমার পুত্রটি কোথায় গেলো?
নলিনী সবই বুঝতে পারছে। সে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। তারপর আমতা আমতা করে বলল,
-- বাবা এত বড় বাড়ি আমি কোথায় খুঁজব তাকে?
-- সেতো আমি জানি না মা। তবে তোমাকেই খুঁজে আনতে হবে।
অর্পিতা, ময়ূর মুখ টিপে টিপে হাসছে তখন। তারা তাপসবাবুর পায়ে আবির দিয়ে আশীর্বাদ নিয়ে তাঁর পাশেই বসে পড়লো। নলিনী কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তাকিয়ে গুটি গুটি পায়ে তপেশের খোঁজে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। বাড়ির বাইরেটা দেখে নিয়ে সে দোতলায় উঠে সব ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দাগুলো দেখতে লাগলো। না কোথাও তপেশ নেই। অগত্যা সে ছাদে উঠে দেখে তপেশ ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে। একটু ভয়, একটু লজ্জা সব মিলিয়ে সেও ছাদের দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে তপেশের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকলেও নলিনীর উপস্থিতি তপেশ বুঝেও একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকলো।
-- বাবা ডাকছেন?
এবার তপেশ সামনে ফিরে নলিনীকে বলে,
-- কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছি জানতে চাইবে না?
নলিনীর বুকের ভিতর তখন কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে। যার শব্দ এত কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও তপেশ কিন্তু মোটেই টের পাচ্ছে না। নলিনী তার কথার উত্তর না দিয়ে আবারও বলে,
-- বাবা ডাকছেন
-- আমার কথার উত্তর দেবে না?
নলিনী চোখ না তুলেই বলে,
-- এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন না মানে দাঁড়িয়ে আছো আমি কীকরে জানবো?
-- উত্তরটা আমি দিই। এর উত্তরটা তুমি জানো। কিন্তু আমি এটাও জানি তুমি এই উত্তরটা আমায় দেবে না।
তপেশ এবার নলিনীর খুব কাছে একদম সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
-- আমি জানতাম তুমি আমায় খুঁজতে আসবে
-- বাবা পাঠালেন ডাকতে
-- সেটাও জানতাম বাবা তোমাকেই পাঠাবেন আমায় খুঁজতে। আমি তো আমার বাবাকে চিনি। আর তিনি কী চান সেটাও জানি।
-- তুমি এসো আমি নিচুতে যাচ্ছি।
-- কিন্তু আমার যে একটা কথা ছিল।
নলিনী দাঁড়িয়ে পড়ে।
-- বলো
-- আমি কি তোমায় আবির মাখাতে পারি আজ?
-- আগে বাবার পায়ে আবির দিই তারপর নাহয় --
-- এই একাকী সুযোগটা কি তখন আমায় তুমি দেবে?
নলিনী কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। আবির না মেখেই সে তপেশের কথা শুনেই লাল হয়ে গেছে।
এবার তপেশ তার আরও কাছে এগিয়ে এসে বলে,
-- সেই রাতের কথাগুলো ভুলে যাও। যে কারণে কথাগুলো বলেছিলাম সে কাজ শেষ হয়ে গেছে। এবার কি আমরা একসাথে চলতে পারি না? একটু অপেক্ষা করে আবার বলে,
--নলিনী মুখ তুলে আমার দিকে তাকাও। সত্যি করে বলো তো তুমি কি আমায় ভালোবাসো না? আমি কিন্তু তোমায় খুব ভালোবেসে ফেলেছি।
নলিনী উত্তর দেবে কী সে তখন রীতিমত কাঁপছে। তপেশ এগিয়ে এসে তার চিবুক ধরে মুখটা তুলে বলে,
-- এত লজ্জা কিসের আমাকে? আমি তো তোমার স্বামী। হ্যাঁ সেই রাতটা আমাদের চলে গেছে ঠিকই কিন্তু আমরা ইচ্ছে করলেই প্রতিটা রাতকেই সেই রাতে পরিণত করতে পারি।
নলিনী তপেশের মুখে এই কথা শুনে লজ্জায় চোখদুটি বন্ধ করে ফেলে। আর সেই সুযোগে তপেশ নলিনীর কপালে আলতো করে একটা চুমু দেয়। নলিনী হেসে পড়ে তপেশকে মৃদু একটা ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে ছুটে পালিয়ে যায়।
সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নামছে মুখে মৃদু হাসি ওদিকে নলিনীর দেরি দেখে অর্পিতা আর ময়ূর পুরো বাড়ি তাদের খুঁজে না পেয়ে শেষ অবধি তারাও ছাদে উঠে আসছিল। ব্যাস সামনেই ওই দুইজনের সাথে ধাক্কা ।তিনজনেই সিঁড়িতে ধপাস। সবার উপরে সিঁড়িতে ছিল তপেশ। ওদের ওই অবস্থা দেখে দৌড়ে নামতে গিয়ে লক্ষ্য করে তিনজনে ওই অবস্থায় ব্যথা ভুলে হাহা হিহি করে চলেছে। তখন তপেশ দাঁড়িয়ে পড়ে গলা চড়িয়ে বলে,
-- আমি জানতাম না মেয়েরা পড়ে গেলে ব্যথা ভুলে হাহা করে হাসে।
তিনজনেই একসাথে তাকিয়ে দেখে তপেশ হাসি মুখে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। ময়ূর নলিনীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-- আমাদের আর লাগলো না কোন কাজে। নিজেরাই তোদের ফুলশয্যার খাট সাজিয়ে নিতে পারবি --
ওর কথা শুনে অর্পিতা বলে উঠলো,
-- এই ফাঁকা ছাদে তোরা দু'জনে কতটুকু এগোলি? নির্ঘাত ঠোঁটেই আটকে গেছিস?
নলিনী লজ্জায় লাল হয়ে ময়ূরকে এক ধাক্কা দেয়। ততক্ষণে তপেশ ওদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
-- আরে তোমরা এবার ওঠো। এইভাবে এখানে সিঁড়িতে বসে গল্প করে যাবে নাকি? আমায় নামতে দাও।
নলিনী লজ্জায় তপেশের দিকে আর তাকাতেই পারে না। তিনজনে কোনরকমে একটু সরে গিয়ে তপেশকে নামার জায়গা ছেড়ে দেয়। তপেশ একটিবার নলিনীর দিকে তাকিয়ে নেমে চলে যায়।
বাবার পায়ে আবির দিয়ে ওরা নিজেরা সেদিন প্রচুর আবির খেলে। বৃদ্ধ দু'হাত ভরে ছেলে আর তার বৌমাকে আশীর্বাদ করেন। তপেশ নলিনীকে একসময় একা পেয়ে আবির দিয়ে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে,
-- কয়েক বছর আগের রাতটা আমায় আজ ফেরত দেবে ?
নলিনী তপেশের কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করে এক ছুট। তপেশ তখন একটু জোরেই বলে,
-- আমি কিন্তু আশায় থাকবো -
নলিনী আর পিছন ফিরে তাকায় না।
অর্পিতা আর ময়ূর ঠিক করে আজ ওদের ফুলশয্যার খাট সাজাবে। রান্নার মাসিকে গিয়ে ধরে বাজার থেকে কিছু ফুল এনে দেওয়ার জন্য। মাসি হা করে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- পুজো তো শেষ হয়ে গেলো। এখন রাতের বেলা ফুল মালা দিয়ে আবার কী হবে গো?
অর্পিতা হাসতে হাসতে বলে,
-- তোমার ছোটবাবু আর বৌদির ফুলশয্যা হবে গো
মাসি জিহ্বা বের করে এক কামড় দিয়ে বলে,
-- আচ্ছা,আচ্ছা ঠিক আছে। এটা হলে তো খুবই ভালো হয়। আমি ব্যবস্থা করবো খণ।
সে সোজা গিয়ে বড়বাবুর কাছ থেকে টাকা চেয়ে বসে। তাপসবাবু জানতে চান কী হবে টাকা দিয়ে। মাসি তাঁকে জানায় আপনাকে জানানো দিদিমনিদের বারণ আছে। কিন্তু যা তারা করতে চাইছে আপনি তাতে খুশিই হবেন। তাদের উদ্দেশ্য আমারও মন্দ লাগেনি।
তাপসবাবু কিছুটা হলেও বুঝতে পারলেন। তিনি আলমারি থেকে টাকা বের করে মাসির হাতে দিয়ে বলেন,
-- এই নে যা খুশি কর। আমার তা জেনে কী হবে? তবে আমায় আর এককাপ চা দিয়ে যা।
-- বাবু, মা শুনলে কিন্তু বকুনি খাবেন। এই একটু আগেই এককাপ খেয়েছেন।
-- আরে আজ মা আমায় কিচ্ছু বলবে না।
বৃদ্ধের মুখে হাসি। মাসিও বুঝতে পারে বিষয়টি। সেও হেসে পড়ে বলে,
-- আচ্ছা ঠিক আছে আমি লুকিয়ে দিয়ে যাবো খন।
বৃদ্ধ একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাধা গোবিন্দের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেন না।
তপেশের ঘর নয় নলিনীর ঘরটাকেই ওরা বেছে নেয় ফুসজ্জার খাট সাজাতে। দু'জনে মিলে নলিনীকে গল্প, গুজবে আটকে রেখে মাসির পরামর্শে পাড়ার দু'জন যুবকের সাহায্যে ওরা খাট সাজাতে শুরু করে। রাতের খাবারটা আজ একটু তাড়াতাড়িই হয় সারাদিনের হইহুল্লোড়রে টায়ার্ড বলে সকলে একটু তাড়াতাড়িই খেয়ে নেয়। খাবার টেবিলেও সকলের গল্প, গুজবের মাঝে ময়ূর, অর্পিতা খেয়াল করে তপেশ বারবার নলিনীর দিকে আড়চোখে দেখছে। আর নলিনী তো লজ্জায় মুখই তুলতেই পারছে না তপেশের দিকে।
খাওয়াদাওয়ার পর এবার নলিনীকে নিয়ে তারা তার করে ঢোকে তাকে সাজাতে। আর ওদিকে বেচারা তপেশ খেয়ে ঘরে গিয়ে দরজা খোলা রেখে বউয়ের অপেক্ষায় বসে থাকে।
ক্রমশ