Monday, May 11, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৫)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৫)

 রাতে অনেক চেষ্টা করেও অনল বিনীতার সাথে দেখা করতে কিংবা কথা বলতে পারে না। বিনীতারও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনলের সাথে কোন কথা হয় না। অনল ও আনন্দির ঘর একদম পাশাপাশি। একই ছাদের তলায় শুধু মাঝখানের একটা দেওয়াল দু'টি মানুষকে কয়েক হাজার দূরত্বে নিয়ে গেছে। দু'জনেই জেগে অধিক রাত পর্যন্ত কারও চোখেই কোন ঘুম নেই কিন্তু কেউই বেরিয়ে এসে কারও সাথে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না।
  বিনীতা শুয়েছে আনন্দির কাছে। যতক্ষণ না আনন্দি ঘুমিয়েছে সে বকবক করেই চলেছে। বিনীতা হু হা করে উত্তর দিয়েছে। কোন কথাই তার মাথায় ঢোকেনি।

  রাতের নীরবতা ভেদ করে পাশে শুয়ে থাকা 
রাত যেন একটু বেশিই গভীর । চারদিক নিস্তব্ধ, অথচ সেই নীরবতার মাঝেই যেন হাজারো না বলা কথা মনের ভিতর বারবার প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে এই অন্ধকার ভেদ করে।
অনল নিজের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে, কিন্তু তার মাথার ভেতরের চিন্তার গতি যেন তার থেকেও অনেক বেশি। বারবার মনে পড়ছে বিনীতার মুখটা—সেই হরিণী চোখ, বলতে চেয়েও সেই না বলা অপ্রকাশিত কথাগুলো।
সে নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করে— “যদি ও সত্যিই কথা বলতে চাইত, তাহলে কি একবারও বেরিয়ে আসত না?”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেরই যুক্তি ভেঙে পড়ে— “না, তা  কীকরে সম্ভব? আজই এই বাড়িতে ওর প্রথম দিন। ওর ভিতর লজ্জা আর ভয় দু'টোই  তো কাজ করবে।আমিই তো যাইনি…এটা তো আমার নিজের বাড়ি। আমিই তো দরজাটা খুলিনি সেই অজানা একটা ভয় আর লজ্জা তো আছেই।"
একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছে তার ভিতরে। বলতে চেয়েও সেই না বলা কথাগুলো মনের ভিতর তোলপাড় করে উঠছে। কিংবা ভালোবাসার লড়াই! একবার মনে হচ্ছে উঠে গিয়ে দরজায় নক করে,  একসাথে গিয়ে বাড়ির সবাইকে বলে দিই ওকে আমি অগ্নি সাক্ষী করে বিয়ে করেছি আইনত ও আমার স্ত্রী। আবার পরক্ষণেই একটা অজানা ভয় তাকে আটকে দিচ্ছে— “যদি ও আমার কথার সায় না দেয়? যদি ও সবকিছু অস্বীকার করে? ওর মনের কথাটাই তো এখনো শোনা হয়নি
এই একটা প্রশ্নই যেন তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে।

  ওদিকে ঠিক পাশের ঘরে, আনন্দির পাশে শুয়ে থাকা বিনীতার অবস্থাও আলাদা কিছু নয়।
আনন্দি অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দে বোঝা যাচ্ছে যে সে স্বপ্নের জগতে চলে গেছে। কিন্তু বিনীতার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। সে চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে, ঠিক যেমনটা অনল করছে অন্য ঘরে।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়… একবার শুধু ডাকে— “অনল…”
কিন্তু ঠোঁট পর্যন্ত এসে শব্দটা থেমে যাচ্ছে। তার নিজেরই মনে প্রশ্ন জাগছে— “কেন আমি যাব? সব? ওর বাড়ি এটা ওতো আসতেই পারতো বোনের ঘরে।তখন তো কিছু কথা অন্তত বলা যেত। তা না করে নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে আছে।
তার ভিতরেও একই লড়াই—অভিমান বনাম ভালোবাসা।
  হঠাৎ তার চোখের কোণে জল জমে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে জামার  তুলে মুছে নেয় —যদিও জানে, এই মুহূর্তে তাকে দেখার মতো কেউ নেই।
সে মনে মনে বলে— “তুমি কি একবারও ভাবছো না আমার কথা, অনল?”
অথচ একই সময়ে, ঠিক পাশের ঘরে অনলও মনে মনে বলছে— “তুমি কি একবারও আমাকে বলতে পারলে না কিছু, বিনীতা?”
একই ছাদের নিচে, মাত্র একটা দেওয়ালের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছে দুটো মন। অথচ সেই দেওয়ালটাই যেন আজ সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয়ে উঠেছে।
দু’জনেই অপেক্ষা করছে—কেউ একজন এগিয়ে আসবে, কেউ একজন ভাঙবে এই নীরবতা।
কিন্তু রাত বাড়তে থাকে, আর সেই অপেক্ষাও আরও গভীর হয়।
হয়তো ভালোবাসা আছে, খুব গভীরভাবেই আছে…
কিন্তু সেই ভালোবাসার উপর জমে থাকা অভিমান আর অপ্রকাশিত কথাগুলোই আজ তাদের সবচেয়ে বড় বাধা।
ফ্যানের একঘেয়ে শব্দ, ঘড়ির কাঁটার টিকটিক, আর দুটো অস্থির হৃদস্পন্দন—এই নিয়েই কেটে যায় রাতের প্রতিটা মুহূর্ত।
ভোর আসবে… আলো ফুটবে…
কিন্তু তাদের সম্পর্কের এই অন্ধকার কি কাটবে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে তাদেরই একটুখানি সাহসে… কে আগে বলবে " মাত্র ওই একটা দিনেই খুব ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়"
একটা মাত্র ডাকে…
 মাত্র একটা শব্দ "ভালবাসি।"

  খুব ভোরেই উঠে পড়ে বিনীতা। তখন বাড়ির কেউই উঠে পারেনি। ঘরের দরজা খুলে বাইরের ফুরফুরে হওয়ায় বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। কিন্তু একি? এত সকালে বারান্দার গ্রীল কে খুললো? নাকি কাল এত গোলোগুজবের মধ্যে বাইরের গ্রীল দিতেই ভুলে গেছে বাড়ির লোক। ভাবতে ভাবতে গ্রীল পেরিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ায়। সামনে দেখতে পায় অনল আম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে। হাতে বেশ কয়েকটা আম। হয়ত রাতে বাতাসে আমগুলি পড়ে গেছে।
 বিনীতা এগিয়ে যায় অনলের দিকে। বিনীতাকে দেখে অনল বলে,
-- এত সকালে উঠে পড়লে? ঘুম আসেনি রাতে তাই না?
-- কেন? তোমার ঘুম হয়নি রাতে?
-- কীকরে ঘুম আসবে বলো তো? তুমি তো মুখফুটে কোন কথা বলছো না?
-- কী জানতে চাইছো তুমি? এতদিন সাহস করে বাড়িতে জানাতেই পারোনি কিছু? আমার কাছ থেকে কী জানতে চাও বলো? সব কথা কী মুখফুটে বলার দরকার আছে? তুমি বুঝতে পারছো না এই বিয়েটা যদি আমি মেনে না নিতাম তাহলে তোমার গতকাল "কেউ বেরোবে না আজ কোথাও " - কথাটা শুনতাম? আর আমায় দেখে ভাবছো আমি তোমার দেওয়া সিঁদুর পরিনি তাই না?
 বিনীতা এলোমেলো চুলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে  মাথাটা অনলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-- দেখো তো এখানে সিঁদুরের চিহ্ন দেখতে পাও কিনা।
 অনল বিনীতার এই স্পষ্ট কথা শুনে হেসে পড়লো। বুকে হাত দিয়ে বলে উঠে,
-- যাক বাবা নিশ্চিত হতে পারলাম। আমিও সেদিনের পর থেকে একটা মুহূর্তের জন্যও তোমার কথা মন থেকে সরাতে পারিনি। অথচ আমরা কিন্তু আগে কেউ কাউকেই চিনতাম না। খুব ভালোবেসে ফেলেছি ওই একটা দিনেই।
 বিনীতা লজ্জা পেয়ে গেলো অনলের এই সরাসরি "ভালোবেসে ফেলেছি"- কথাটা শুনে।
-- এখন কিভাবে সব ম্যানেজ করবে?
-- ম্যানেজ আর কী? সম্বন্ধ করে তোমায় আবার বিয়ে করবো 
-- সে কী 
-- হ্যাঁ গো সেটাই করবো। আগে তো আজকে তোমাদের বাড়িতে যাই। বিজয়ের সাথে কথা বলি। চিন্তা করো না আমি সব ম্যানেজ করে নেবো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
-- আর আমাদের পাড়ার লোকজন?
-- বিয়েটা তো ওখানে হবে না। এই কলকাতাতেই বিয়ে, বৌভাত সব একবাড়িতেই হবে। আজকাল এসব হয়।
-- আমি এখন ভিতরে যাই। সবাই উঠে পড়বে আর উঠে যদি সবাই দেখে আমরা দু'জনে এখানে কথা বলছি বিশেষ করে আমার ননোদিনী তাহলে আজই ও আমাদের বিয়ে দিয়ে ছাড়বে।
 অনল হো হো করে হেসে ওঠে।
-- ঠিক চিনেছ তুমি আমার বোনকে। ওর মুখে সত্যিই কিছু আটকায় না। যাও তবে এখন ভিতরে? ও একটা কথা - বিজয়কে সব জানিয়েছ?
-- হ্যাঁ গতকালই জানিয়েছি
-- কী বললো?
-- বললো তোমার প্রতি ওর বিশ্বাস আছে তুমি সবকিছু ম্যানেজ করে নিতে পারবে।

  টিফিন করে ওরা বেরোনোর জন্য প্রস্তুত। অনলের বাবা এমনিতেই খুব কম কথা বলেন। বিনীতা তাকে প্রণাম করতে গেলে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেন,
-- তোমায় আমার খুব আপন মনেহয় মা। হয়ত আগের জনমে তুমি আমার কেউ ছিলে। আবার এসো আমাদের বাড়ি।
 অনল সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবা কথাটা বলার সাথে সাথে সে বিনীতার দিকে তাকিয়ে পড়ে। বিনীতা মুচকি হেসে এগিয়ে যায় অনলের মায়ের কাছে। তাঁকে প্রণাম করলে তিনিও আশীর্বাদ করে বিনীতাকে বলেন,
-- মনেহচ্ছে তোমাদের বাড়িতে আমারও একবার যেতে হবে। দেখি কবে নাগাদ যেতে পারি। তবে মা একটা কথা বলি, বাড়ি থেকে এতদূরে থাকো। চেষ্টা করো কলকাতায় বদলী হয়ে আসার।
  অনল, আনন্দি, বিনীতা আর ওর মামী গিয়ে গাড়িতে বসলেন।
 
ক্রমশ -

No comments:

Post a Comment