ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩০)
বিনীতা মাকে রান্নায় সাহায্য করতে রান্নাঘরে ঢুকে টুকটাক কথা বলতে শুরু করে ওই বাড়ি সম্পর্কে। মায়ের কথামত বিনীতা গিয়ে বিজয়কে ডেকে আনে। তিনজনে মিলে ঠিক করেন বিনীতা যেমন আলাদাভাবে আনন্দিকে সব জানাবে আবার তার মা আলাদাভাবেই বন্ধু লিজাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলবেন। আনন্দি এবং লিজা দু'জনের মতামতের ভিত্তিতে আগামীকাল যাওয়ার আগে তারা এই ব্যাপারে কতটা সাহায্য করতে পারবে সেটা সকলের সামনে সুস্মিতা জানতে চাইবেন। আর রাতেই বিজয় প্ল্যানের কথা জানাবে অনলকে। তার মতামতই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিজয় হঠাৎ কথার মাঝেই বলল,
— “অনলকে আজই সব বলব। দেরি করলে জিনিসগুলো জটিল হয়ে যাবে।”
সুস্মিতা মাথা নেড়ে বললেন,
— “ঠিক বলেছিস। ওর মতামতটা খুব দরকার। ও কী ভাবছে এই বিষয়টা নিয়ে সেটা ওর কাছ থেকেই পরিষ্কার করে জানতে হবে। এখনই যদি ও বাড়িতে সব বলে বিনীতাকে নিয়ে যেতে চায় আমরা সেটাও যেমন মেনে নেবো আবার নতুন করে যদি সবকিছুর এরেজমেন্ট করতে চায় আমাদের সেটাতেও কোন আপত্তি থাকবে না। ওর ভাবনা ছাড়া এই ব্যাপারে এগোনো ঠিক হবে না।”
-- অনল খুব ভালো ছেলে মা। আমি ওকে ছেলেবেলা থেকেই চিনি। আমাদের কোন সিদ্ধান্তেই ও না বলবে না। তবে যা করবো ওর কাছে জেনে ওর মত নিয়েই করবো। ভেবো না সব ঠিক হয়ে যাবে।
রাতে খাওয়ার টেবিলে সবাই গল্পগুজবে মশগুল। বাইরে হালকা হাওয়া বইছে, জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পর্দাগুলোকে দুলিয়ে দিচ্ছে। এমন একটা শান্ত পরিবেশ যে যেমন পারছে তার পিছনে লেগে চলেছে। মাঝে মাঝে বিজয় আনন্দির পিছনেও লাগছে। আর তা শুনেই আনন্দি দাদাকেই দোষারোপ বেশি করছে।
-- দাদা একদম ভালো হচ্ছে না কিন্তু। তুই তোর মত তোর বন্ধুকেও আমার পিছনে লেলিয়ে দিয়েছিস?
-- মানুষকে মানুষের পিছনে কীভাবে লেলিয়ে দেয় আমায় একটু বুঝিয়ে বলবে আনন্দি?
কথাটা বিজয় বলেই মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো।
আনন্দি একটু চোখ কুঁচকে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— খুব ভালো করেই বোঝো বিজয়দা! সবসময় আমার সাথে মজা করার জন্যই আমার পিছনে তোমরা সবাই মিলে লেগে পড়ো
বিজয় হেসে গ্লাসে জল নাড়াতে নাড়াতে বলল,
— “ওমা! তাই নাকি? জীবনটাই তো আমাদের মাত্র ক'টাদিনের। যে কটাদিন বাঁচবো হেসে,খেলে পিছনে লেগেই নাহয় বাঁচি। দুঃখ, কষ্ট তো আমাদের জীবনে লেগেই আছে। সবাই একসাথে হলে সেগুলোকে ভুলে গিয়ে নাহয় একটু মজা করি। অবশ্য তোমার এতে আপত্তি থাকলে আমি আর কিছু বলছি না।
-- বিজয় কথাগুলো ভারী ভারী হয়ে যাচ্ছে। খাবার টেবিলে ভারী কথা কিন্তু একদম বেমানান।
অনল বিজয়ের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে।
এই কথায় টেবিলে হালকা হাসির রোল ওঠে। আনন্দি মুখটা গম্ভীর করে নিলেও ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকোতে পারল না।
বিনীতা চুপচাপ বসে সব দেখছিল। তার চোখ বারবার আনন্দি আর বিজয়ের কথোপকথনের দিকে চলে যাচ্ছিল। এই স্বাভাবিক, হাসিখুশি পরিবেশটা যেন তার মনে একটু সাহস জোগাচ্ছিল—রাতে কঠিন কথাগুলো বলার জন্য।
সুস্মিতা হালকা গলায় বললেন,
— আচ্ছা তোরা এত হাসাহাসি করছিস, কিন্তু কালকের কথা ভেবেছিস কেউ?
মুহূর্তের মধ্যে টেবিলটা একটু চুপ হয়ে গেল।
বিজয় গম্ভীর হয়ে বলল,
— ভাবছি তো মা। আমি খাওয়া শেষ করেই অনলকে সাথে নিয়ে ঘুমাতে যাবো আর কাল সকালে উঠবো। এর আর ভাবাভাবির কী আছে
কথাটা বলে মায়ের দিকে চোখের ইশারায় আর কিছু বলতে নিষেধ করে। মা'ও ঠিক বুঝে ফেলেন ছেলে তার কী কথা বলতে চাইছে।
আনন্দি একটু চমকে তাকাল,
— মানে?
বিনীতা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এক অদ্ভুত দোলাচল—ভয় আর আশার মিশ্রণ।
বিজয় শান্ত গলায় বলল,
— যেটা তোর মাথায় ঢুকবে না তার কোন মানে, অর্থ কোনোটাই নেই।
সেও বোনের দিকে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো এই প্রসঙ্গ নিয়ে এখানে না আলোচনা করাই ভালো। আমরা যেভাবে ঘটনাটা আলাদা আলাদা বলবো ঠিক করেছি সেটাই ঠিক হবে।
লিজা এদের কথার কোন অর্থই খুঁজে পারছেন না। তিনি চুপচাপ খেয়ে চলেছেন।
আনন্দি এবার আর কিছু বলল না। সে শুধু বিনীতার দিকে তাকাল। দু’জনের চোখে চোখ পড়তেই যেন বিনীতার মনেপড়ে গেলো এই মেয়েটাকে কীভাবে সে কথাগুলো বলবে? কিভাবে সে নেবে? আদতেও কী এই বিয়েটা সে মেনে নিয়ে মা, বাবাকে বুঝিয়ে বলতে পারবে?
হাজারটা প্রশ্ন একসাথে তার মনে ভেসে উঠল। কিন্তু উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। সে নিজেও জানে না তার মনে ভেসে উঠা প্রশ্নগুলির উত্তর।
মানুষের জীবনে এমন সময় মাঝে মাঝে আসে মুহূর্তেই যেখানে জন্ম নেয় হাজার হাজার প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর দাদা সেখানে কেউ থাকে না। উত্তর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকতে হয়। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাবে টিকটিক করে ঠিক এইভাবেই আসবে একদিন প্রকৃত সময় আর তখনই সেসব প্রশ্নের উত্তর আসবে। শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা!
খাওয়া শেষ হতেই বিজয় উঠে বারান্দায় চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সেখানে অনলও পৌঁছে গেলো।
-- কিরে বিজয় কী ভাবছিস এত?
-- একটা মীমাংসায় তো আসতে হবে।
-- বল কিভাবে এগোতে চাস?
-- আমরা তিনজনে কথা বলে ঠিক করেছি আমরা আনন্দি আর মাসিমনিকে আলাদা আলাদা ভাবে সব জানাবো। ওরা কী বলেন সেটা জেনে তারপর এগোবো।আজ রাতেই মা মাসিমনিকে আর বিনীতা আনন্দিকে জানাবে। আমি আনন্দির সাথে কথা বলে বুঝেছি ও যথেষ্ঠ ইন্টেলিজেন্ট। ওর মতামতটাও দরকার।
-- আমার কোনটাতেই কোন আপত্তি নেই রে।
রাতে আনন্দি আর বিনীতা পাশাপাশি শুয়ে। বিনীতা চুপচাপ একদম, যেন ঠিক করে নিচ্ছে—কীভাবে শুরু করবে।
-- কিগো কী যেন বলবে বলেছিলে? আমার তো মনেহচ্ছে কথাটা ভীষন গুরুত্বপূর্ণ। শুরু করো শুনি তোমার গোপন কথা।
-- গোপন কথা নয় গো। আমার জীবনের এক ঝড়ের কথা। কিন্তু কীভাবে শুরু করবো সেটাই ভাবছি।
একটু চুপ থেকে বিনীতা আবার শুরু করে,
-- তুমি ঠিকই বুঝেছো আমি তোমার দাদাকে ওই আমার বিয়ের দিনই প্রথম দেখি। যখন পরিচয় হয় তখন সে শুধুমাত্র আমার দাদার ছেলেবেলার একজন বন্ধু। তোমার দাদা সেদিন সকালে আসে আমায় একটা গিফট দেয় আর তখন আমার দাদা পরিচয় করে দেয় তার ছেলেবেলার বন্ধুর সাথে। ব্যাস ওইটুকুন। আসল ঘটনা শুরু হয় তারপর -
-- কিগো চুপ করে গেলে কেন? কী এমন সেই ঘটনা? যা বলতে তুমি এত দ্বিধাবোধ করছো?
-- বিয়েবাড়ির হৈ চৈ এর মধ্যে আমার গায়েহলুদ হয়ে গেলো। ছোটমামা আর তার এক বন্ধু বেরোলেন বর আনতে। পার্লার থেকে লোক এসে আমায় কণে সাজে সাজিয়ে দিলো। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে তখনও মামা বর নিয়ে আসেন না। মা, দাদা প্রচণ্ড টেনশনে আছেন। ঠাকুরমশাই বারবার তাগাদা দিচ্ছেন ।
বিনীতা আবারও চুপ। সে জানলার দিকে তাকিয়ে --
এবার আর আনন্দি তাকে কোন তাগাদা দিলো না কথা শুরু করবার জন্য। সেও চুপ করে বিনীতার দিকে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ পর বিনীতা আবার শুরু করলো -
-- তখন আমার ভিতরেও একটা ভয় কাজ করছে। তবে সেই মুহূর্তে নিজেকে নিজেই শান্তনা দিয়ে চলেছি " যাই হয়ে যাক না কেন আমি ভেঙে পড়বো না। তখন চাকরির জয়েনিং লেটার পেয়ে গেছি। চাকরিটা হয়েছে শিলিগুড়ির এক স্কুলে। মনে একটা আশঙ্কা থাকলেও মুখে সেটা প্রকাশ ছিল না। আবার কিছুক্ষণ নীরবতা-
আনন্দি তার হাতটা ধরে বলল,
— যে ঘটনা ঘটে গেছে তা বলতে এত দ্বিধা কেন বিনীতা। তুমি সবটা বলো। আমরা আছি তো নিশ্চয় কিছু হেল্প করতে পারবো।
বিনীতা চোখ নামিয়ে নিল। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে… তারপর খুব ধীরে বলতে শুরু করল— কিন্তু তার গলাটা কেঁপে উঠল। বিয়েবাড়ির সর্বত্র যখন মৃদু গুজন আর তখনও পর্যন্ত বর না আসার একটা মারত্মক টেনশন সকলের মধ্যে, সেই মুহূর্তে আমার ছোটমামার একটা ফোনে সবকিছু হঠাৎ আসা কালবৈশাখীর মত তছনচ হয়ে গেলো - পূর্ব পরিকল্পিত কাজ আর ভাবনা একমুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে গেলো।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment