Saturday, May 23, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৩)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৩)

  অর্পণ বাড়ি ফেরে অনেক রাতে। সকলে ঘুমিয়ে পড়লেও তার মা ঠিক জেগে। গাড়িটা বাড়ির ভিতর ঢোকার সাথে সাথেই মা দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন। অর্পণ মাকে দেখতে পেয়েই বলে ওঠে,
-- তুমি এখনো পর্যন্ত ঘুমাওনি? আমি কতবার বলেছি বয়স হয়েছে আমি নানান কাজে বাইরে থাকি আমার জন্য জেগে থাকবে না।
-- ওরে আমি তো মা'রে সন্তান ঘরে না ফিরলে ঘুম আসে না। শুয়েই তো ছিলাম কই ঘুম তো আসেনি -
-- এখন তো ফিরেছি এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো 
-- খাবি তো ?
-- না মা খেয়ে এসেছি।
-- ঠিক আছে আমি তবে খাবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ছি।
-- ঠিক আছে।
  অর্পণ গাড়ি গ্যারেজ করে স্নান সেরে নিজের ঘরে ঢোকে। নানান কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেদিনের ঘটনার পর শুনেছিল মেয়েটির ওই লগ্নেই বিয়ে হয়ে গেছে। যদিও কোন প্রয়োজন নেই তবুও জানতে ইচ্ছা করে মাঝে মাঝে, মেয়েটির সাথে কার বিয়ে হল? ছেলেটি কী করে?
  আমাদের সমাজে অনেক সময় পুরুষদের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ কম থাকে, তাই তাদের ভেতরের কষ্টটা অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। কাউকেই বলা যায় না অতি কাছের মানুষটিকেও কোন পুরুষ তার কষ্টের কথা,দুঃখের কথা, আঘাতের কথা শুনলে কোন নারীর সাথে তার মানসিক পরিস্থিতির তুলনা করে বসে। তাকে দুর্বল চিত্তের পুরুষ ভাবে। তাই লোক দেখাতে পুরুষকে হতে হয় কঠিন আবরণে মোড়া।
 সমাজের চাপে অনেক পুরুষই কাঁদতে বা কষ্ট প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে। কারণ পুরুষ কাঁদলে তাকে সকলেই হ্যাংলা পুরুষ মনে করে। 
ফলে ভিতরে চাপা কষ্ট জমতে থাকে এবং মানসিকভাবে সে ভীষন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অর্পণের জীবনে ওই ঘটনা বিশেষ কিছু প্রভাব না ফেললেও আজকে এই মানুষগুলির সুখপুর থেকে আসাটা তাদের বিপদে তার এগিয়ে যাওয়াটাই তার সামনে পুরোনো কিছু স্মৃতি ভেসে উঠলো। বিনীতাকে সে দেখেছিল না। মা,বাবার পছন্দতেই বিয়েতে মত দিয়েছিল। তবুও আজ গ্রামের নামটি শুনে বারবার মেয়েটির কথা তার মনে পড়ছে কেন? সে তো তাকে দেখেনি এমনকি তার প্রতি কোন ভালোবাসাও গ্রো করেনি।
 হায় রে মানুষের মন! তুমি নিজেও জানো না তুমি কী চাও।
 রাতটা আজ অদ্ভুত চুপচাপ। খামোখা কেন যে আজ অর্পণের ওই বিয়ে কিংবা মেয়েটির কথা মনে পড়ছে তা সে নিজেও জানে না। সে তো সবকিছু ভুলেই গেছিল। কখনো ওই ঘটনা তার মনে কোন প্রভাব ফেলেনি। তবে আজ কেন এরূপ হচ্ছে?
 সে তার ঘরের জালনায় এসে  দাঁড়ায়, রাত শেষের পথে। হয়ত ভোর হতে আর সামান্য কিছুটা সময়।সামনে শহরের আলো জ্বলছে—তবু তার ভিতরে আজ যেন সব অন্ধকার মনে হচ্ছে। 
 সে ধীরে খাটে এসে শুয়ে পড়ে। মোবাইলে দেখে ভোর চারটে। ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। কাল সঠিক সময়ে কোর্টে পৌঁছাতে হবে। আজ যে কেসটার ব্যাপারে সে ইনভেস্টিগেশনে গেছিল সেটারই কাল শুনানি।  মেয়েটিকে যেভাবে হোক বাঁচাতেই হবে। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার চরিত্রের দোষ দিয়ে তার নিজ সম্পত্তি থেকেই উৎখাত করতে বদ্ধ পরিকর। সম্পত্তি সব তার বাবার বাড়ির। জাল দলিল করে তারা মেয়েটির প্রতি অত্যাচার করে চলেছে। 
 আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে নারীরাই বঞ্চনার শিকার কেন হয়? 
 ঘড়িতে অ্যালাম দিয়ে অর্পণ ঘুমিয়ে পড়ে।
  
  অনল সময়ের অনেক আগেই গিয়ে দমদম মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ বিনীতার চলে যাওয়ার দিন। সে ট্রেনেই যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অনল জোর করে প্লেনের টিকিট কেটে দিলো। ট্রেন স্টেশনে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই অনলের চোখদু'টি  এদিকওদিক ঘুরছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পিছনে দাঁড়িয়ে বিনীতা বলে,
-- আমি এখানে মশাই
 -দু'জনেই হেসে দেয়। 
  কৌশিকী ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে এয়ারপোর্টে ঢুকতে গিয়ে হঠাৎ থমকে যায়। অনল একটি মেয়ের সাথে হাসি মুখে কথা বলছে। একবার ভাবে বোধহয় এর সাথেই অনলের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আর একবার ভাবে হয়ত কোন আত্মীয় হবে। সে আর না দাঁড়িয়ে ভিতরে ঢুকতে গিয়ে শুনতে পায় অনল তাকে ডাকছে -
-- কৌশিকী 
 পিছন ফিরে তাকিয়ে হেসে দেয় কৌশিকী। হাতের ইশারায় অনল তাকে ডাকে। কৌশিকী এগিয়ে আসে।
- তোর সাথে আবার দেখা হয়ে গেলো। পরিচয় করিয়ে দিই। এই হচ্ছে বিনীতা। একেই আশীর্বাদ করতে সবাই গেছিল ।
 আর বিনীতার দিকে ফিরে কৌশিকীর কথা বলতে গেলে কৌশিকী হাত বাড়িয়ে বিনীতার সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে বলে,
-- আমার পরিচয়টা আমি নিজেই দিই। আমি কৌশিকী। কয়েকমাস অনলের অফিসে ছিলাম। কিন্তু এখন একটা কলেজে জব পেয়ে ওই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাড়ির কাছে চলে গেছি।
 -- ভালোই হল তোমাদের দু'জনের সাথে পরিচয়  হয়ে। বিনীতার বাড়ি এখানেই একটু গ্রামের দিকে। ট্রান্সফারের চেষ্টা করছে। ও ট্রান্সফার হয়ে আসলেই আমাদের বিয়েটা হবে।
  কৌশিকী তার ভিতরের কষ্টটা চেপে রেখে হাসি মুখে ওদের বলল,
-- দু'জনকেই একসাথে কংগ্রাচুলেশন। খুব ভালো থেকো তোমরা। সময় হয়ে গেছে। আমি এগোই। তোমরা একটু কথা বলে নাও। 
 বিনীতার দিকে ফিরে বলল,
-- তুমি এসো তারপর কথা বলছি 
 কৌশিকী ভিতরে ঢুকে গেলো। একসময় বিনীতাও অনলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভিতরে এলো। কৌশিকীর সাথে নানান ধরণের গল্প করতে করতে এই সামান্য সময়ের পথটা তারা পাড়ি দিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেলো। ফোন নম্বরের আদানপ্রদানের মাধম্যে দু'জন দু'জনের খবরাখবর রাখবে সে কথাও তাদের মধ্যে হল। বিনীতা তার সেই দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি থেকে অনেকদিন আগেই একটা পি জি তে চলে গেছে। কারণ তার মনে হয়েছে তারা ঠিক চায় না সে ওখানে থাকুক। এখন যেখানে আছে সেখান থেকে স্কুলটাও একটু কাছে। যাতায়াতের খুব সুবিধা হয়। কোন যানবাহন ছাড়াই হেঁটেই যাতায়াত করতে পারে।
 যেহেতু বিনীতা একাই থাকে একটি রুমে স্কুল থেকে ফিরে তার অফুরান সময়। দোতলার উপরে ঘরটা। সবকিছুই আলাদা। সমস্ত ফার্নিচার আছে। এমন কী রান্নার গ্যাসও। ইচ্ছা হলে সে নিজে রান্না করে খেতেও পারে। তাতে অবশ্য বাড়ির মালকিনের কোন আপত্তি নেই। তবে সে চা'টা নিজেই করে খায়। চায়ের নেশাটা বিনীতার একটু বেশি। 
 বাড়ির মালকিনের বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। একাই থাকেন একটি মেয়ে সর্বক্ষণের সঙ্গী। ছেলে বিদেশে। কিন্তু তিনি ছেলের উপর নির্ভরশীল হয়ে কিছুতেই থাকবেন না। ছেলেকে বারবার নিষেধ করেছিলেন বিদেশে স্থায়ী না হতে। কিন্তু যখন সে কথা শুনলো না ঠিক তখন থেকেই তিনি ছেলের পাঠানো টাকা নিতে অস্বীকার করেন। অবশ্য ছেলে তাকে নিয়েও যেতে চেয়েছিল। সেটাতেও তার ছিল আপত্তি। কারণ স্বামীর বাড়ি আর নিজ দেশ এই দু'টোই  তার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তিনি এই প্রিয় জায়গা ছেড়ে কোথাও যাবেন না আমৃত্যু এখানেই থাকবেন তা ছেলেকে জানিয়ে দেন। 
 ছেলের লেখাপড়া স্বামী থাকতে শেষ হলেও স্বামী যখন অসুস্থ হন তখন জমানো টাকা একটাও নেই। তখন চলে গেছে গয়নাগুলো। অবশ্য ছেলে তখনো চাকরি পায়নি ভালো। তবে কিছু করতো যা দিয়ে তার নিজেরটুকুই চালাতে পারতো।তিনিও কোনদিন ছেলের কাছে হাত পাতেননি।
 এমতাবস্থায় তিনি এই বয়সেই ঠিক করেন কিছু তাকে করতে হবে। দোতলাবাড়ির উপরতলাটায় প্রথমে ভাড়া দেন। তবে ভাড়া দিয়ে তিনি বুঝতে পারেন ভাড়াটিয়া হয়ে যারা আসছে তাদের সকলে যে ভালো মানুষ তাও নয়। ভাড়া নিয়ে সমস্যা, জল,লাইট নিয়ে সমস্যা। যা তার পক্ষে ট্যাকেল করা সম্ভব নয়।
 তখন তিনি একা। স্বামীও চলে গেছেন। তখন তিনি একটি একটি মেয়েকে কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দেন। সেই তাকে পরামর্শ দেয় বাড়িটার তার নিজের এনট্রিটা আলাদা রেখে পি জি রাখতে। কারণ তার বাড়িটা একটি হাসপাতালের কাছে। অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে এখানে চিকিৎসার জন্য এসে দু'চারদিন থাকার জন্য ঘর খোঁজে। 
 সেই শুরু। তারপর তার ঘর বেড়েছে। প্রত্যেক ঘরের সাথে ওয়াশরুম হয়েছে। তিনি রান্নার জন্য একটি লোকও রেখেছেন। কেও ইচ্ছা করলে বাইরে খেতে পারে আবার আগেরদিন রাতে জানালে টিফিন থেকে শুরু করে লাঞ্চ, ডিনার সব পাওয়া যাবে এখানেই। যে মেয়েটি তার কাছে প্রথম আশ্রয়ের জন্য এসেছিল সে নন্দিনী। সেই সবটা এখন দেখাশুনা করে।

ক্রমশ 

    

No comments:

Post a Comment