Wednesday, July 22, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৮)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ৫৮)

  কৌশিকী হন্তদন্ত হয়ে অফিস রুম থেকে বেরিয়ে আসে। তার এই চাকরি জীবনে ছাত্রছাত্রীরা ছাড়া কলেজ চলাকালীন কেউ কখনোই দেখা করতে আসেনি। এসে দেখে নন্দিনী তার জন্য অপেক্ষা করছে।
-- কিরে তুই এই অসময়ে? 
-- তোমার কলেজের সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম একটু দেখা করেই যাই।
-- ভালো করেছিস। অনেকদিন তোকে দেখি না। তা মাসিমা কেমন আছেন এখন?
-- খুব একটা হাঁটাচলা করতে পারেন না। শুয়েই থাকেন। আসলে আমি এদিকে এসেছি মায়ের জন্য একটা হুইল চেয়ার কিনতে। ক'দিন ধরেই ভাবি কিন্তু কিছুতেই সময় করতে পারি না। তাও রিনাদি আছে বলেই আমি কিছুটা সময় পাই। আজ রিনাদির জোরাজুরিতেই বেরিয়ে পড়লাম। বলল " তুমি যাও এদিকটা আমি সামলে নেবো।"

কৌশিকী একটু চিন্তিত মুখে বলল,
-- হুইল চেয়ার? হঠাৎ এতটা খারাপ হয়ে গেল নাকি মাসিমার শরীর?

নন্দিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বলল,
-- বয়স তো হলোই তার ওপর শরীরটাও আর আগের মতো নেই। হাঁটতে গেলেই হাঁপিয়ে যান। ডাক্তারও বলেছে বেশি চাপ না দিতে। তাই ভাবলাম একটা হুইল চেয়ার থাকলে অন্তত একটু রোদে বসাতে পারব, বারান্দায় নিয়ে যেতে পারব - এইসব ভেবেই রিনাদি আর আমি আলোচনা করেই ঠিক করলাম। তাছাড়া স্নান, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা এগুলোও ধরে ধরে করতে হয় তো। রিনাদি সবসময় ব্যস্ত থাকে আমার একার পক্ষে সম্ভব হয় না। পেরে উঠি না আমি। ভয়ও পাই যদি পড়ে যান। তাই এই সিদ্ধান্ত -

কৌশিকীর চোখে যেন হালকা জল চিকচিক করে উঠল।
-- তুই একা এত কিছু সামলাচ্ছিস কীভাবে বল তো?

নন্দিনী মৃদু হেসে বলল,
-- একা কই? রিনাদি তো আছেই আর জানো, মানুষ চাইলে সবই পারে। মন যদি সায় দেয় শরীরের বল তখন কয়েকগুণ বেড়ে যায় গো -

কৌশিকী হঠাৎ যেন কিছু ভাবল।
--চল, আমি আজ তোর সঙ্গে যাই। তুই একা কেন কিনতে যাবি? মনটা খারাপ হয়ে গেলো মাসিমার কথা জেনে।

নন্দিনী একটু অবাক হয়ে বলল,
-- আরে না না, তোমার তো ক্লাস আছে। আমি একাই পারবো দিদি।

--আজ আর ক্লাস নিয়ে ভাবছি না। এতদিন পর তুই এলি, তার ওপর এমন দরকারি কাজ আমি তোর সাথেই যাই । শুধু একটু বলে আসতে হবে অন্য কাউকে ক্লাস নেওয়ার কথা।

নন্দিনী একটু চুপ করে কৌশিকীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
 জানো দিদি, ভদ্রমহিলা ভীষন ভালো মানুষ কিন্তু খুব চাপা স্বভাবের। দু'টো সন্তান যার তার তো এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়। চুপচাপ যখন শুয়ে থাকেন চোখের থেকে অনর্গল জল ঝরে। বুঝতে পারি ওই অশ্রু উনার ছেলেমেয়ের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টের। ছেলেটা সম্পর্কে কিছু বললেও মেয়ে সম্পর্কে একদম চুপ! শুধু বলেন হারিয়ে গেছে। ব্যস তারপরেই উদাস হয়ে যান। আর কোন কিছু বলতে চান না। আমিও বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করি না পাছে কষ্ট দিয়ে ফেলি। তবে আমার কী মনেহয় জানো মেয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু মায়ের সাথে কোন যোগাযোগ নেই।

কৌশিকী চুপচাপ ওর কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ সময় চুপ করেই রইলো। তারপর খুব আস্তে করে বলে,
-- আসলে মানুষের জীবনে এমন কিছু কষ্ট থাকে যা অন্যের সাথে শেয়ার করা যায় না। আজীবন কষ্টটা বুকের ভিতর চেপে বসে থাকে।
 কৌশিকী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

  কলেজের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে কৌশিকী বলল,
-- কোথায় যাবি? কোনো দোকান দেখেছিস?

-- নাগো দিদি , ঠিক করিনি। ভাবছিলাম এখানকার মেডিক্যাল স্টোরগুলো ঘুরে দেখি।

-- তাহলে চল, আমি একটা জায়গা চিনি। ওখানে ভালো জিনিস পাওয়া যায়।

দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। বিকেলের নরম রোদ তাদের গায়ে এসে পড়ছে। রাস্তার ভিড়, গাড়ির শব্দ সব কিছুর মাঝেও তাদের কথোপকথন যেন আলাদা একটা জগত তৈরি করে ফেলল।

হঠাৎ নন্দিনী বলল,
-- জানো দিদি মাঝে মাঝে আমার মনেহয় জীবনটা কেমন যেন বদলে গেল! কোথায় ছিলাম আর আজ কোথায় থাকি। যাদের কোনদিন চিনতাম না, জানতাম না তারাই আজ আমার সবচেয়ে কাছের। সেদিন যদি তুমি আমার পাশে না দাঁড়াতে আজ আমি হয়ত বেঁচেই থাকতাম না। শিয়াল, কুকুরে ছিঁড়ে খেতো।
-- উল্টোপাল্টা কথা একদম বলবি না বলে দিলাম।
-- আগের জন্মে তুমি আমার কী ছিলে দিদি?
 কৌশিকী খুব গম্ভীর হয়ে উত্তর দিলো 
-- আগের জন্মেও আমি তোর দিদি ছিলাম আর এ জন্মেও আমি তোর দিদি।
 বলেই হেসে দিলো
-- আমার জীবনের সবকিছু কেমন বদলে গেলো। খুব পুণ্য করেছিলাম আগের জনমে তাই তোমাকে পেয়েছি।

কৌশিকী একটু থেমে বলল,
-- জীবনের বাঁক তো বদলাতেই থাকে। কিন্তু কিছু সম্পর্ক কখনো বদলায় না। থাক, অনেক হয়েছে এবার চল যে কাজে এসেছি সেই কাজটা করি। আর এসব উল্টোপাল্টা কথা কখনোই মাথাতে আনবি না। তাহলে আমি কিন্তু খুব বকবো তোকে।

নন্দিনী চুপ করে রইল। তার চোখে তখন জল কিন্তু মনে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

হুইল চেয়ার কেনার এই ছোট্ট উদ্দেশ্যই তাদের জীবনের অনেক পুরনো কথা আর নতুন অনুভূতিকে আবার একসাথে বেঁধে দিল।
 হুইল চেয়ার কেনা শেষ হলে কৌশিকী জোর করেই নন্দিনীকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢোকে। কিছু খেয়ে তারা মাসিমার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বিকেল গড়িয়ে তখন প্রায় সন্ধ্যা। নন্দিনী আর কৌশিকী 
হুইল চেয়ার নিয়ে বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। নন্দিনী আস্তে করে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে।
ঘরের ভেতরটা শান্ত। জানলার পাশের খাটে মাসিমা শুয়ে আছেন। রিনাদি চুপচাপ পাশে বসে।
নন্দিনী মৃদু গলায় ডাকে, 
--মা 
কামিনীদেবী ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকান। নন্দিনীকে দেখে তার মুখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে ওঠে। 
--এলি মা? কোথায় গেছিলি? সেই থেকে ভাবছি।
নন্দিনী এগিয়ে গিয়ে তার হাতটা ধরে, 
 --হ্যাঁ মা একটু কাজে বেরিয়েছিল  আর দেখো, তোমার জন্য কী এনেছি।
কৌশিকী একটু  হেসে পড়ে সামনে এগিয়ে হুইল চেয়ারটা দেখায়।
কামিনীদেবী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন, 
 
নন্দিনী হেসে বলে, --
 তোমাকে আর শুধু শুয়ে থাকতে হবে না। এখন থেকে বারান্দায় বসে রোদ পোহাবে, একটু হাওয়া খাবে।
কামিনীদেবীর চোখ ধীরে ধীরে ভিজে ওঠে। 
-- আমার জন্য এত কিছু করিস কেন মা?
নন্দিনী মাথা নেড়ে বলে, 
-- “আমার জন্য” বলছো কেন?  তুমি ভালো থাকলে যে আমিও ভালো থাকবো সেটা জানো না? তোমার কষ্ট হলে আমারও যে কষ্ট হয় মা। 
কৌশিকী চুপচাপ দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখেও জল চলে আসে।
রিনাদি হেসে বলে, 
-- ঠিকই তো বলেছে দিদি। আপনিই তো ওর সব।
নন্দিনী আস্তে করে কামিনীদেবীকে উঠতে সাহায্য করে। কৌশিকী পাশ থেকে ধরে। অনেকদিন পর কামিনীদেবীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে হুইল চেয়ারে বসে।
    চেয়ারটা ধীরে ধীরে জানলার পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। বাইরে তখন সন্ধ্যার হালকা আলো, আকাশে লালচে আভা।
কামিনীদেবী গভীরভাবে বাইরে তাকিয়ে থাকেন। যেন অনেকদিন পর আবার পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখছেন।
-- কতদিন পর এই আকাশটা দেখলাম মা 
নন্দিনী তার কাঁধে হাত রাখে, 
-- এখন থেকে রোজই দেখবে।
কৌশিকী মৃদু হেসে বলে, 
 -- নন্দিনী আর রিনা দু’জন পালা করে নিয়ে আসবে বারান্দায়। মাঝে মাঝে আমিও এসে আপনাকে বাইরে নিয়ে যাবো।
কামিনীদেবী দু’জনের হাত একসাথে ধরে ফেলেন, 
-- তোরা থাকলে আমার আর কিছুই চাই না।
ঘরের ভেতরটা নিঃশব্দ হয়ে যায়। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই ছিল এক গভীর ভালোবাসা, যত্ন আর সম্পর্কের উষ্ণতা।
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো আরও ম্লান হয়ে আসছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে একটা নতুন আলো যেন হঠাৎ করেই জ্বলে উঠলো। 

ক্রমশ 

Thursday, July 16, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৭)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৭)

  তাদের কথার মাঝখানেই কামিনীদেবীর রাঁধুনি দু'বাটি পায়েস এনে খাট লাগোয়া একটি টেবিলের উপর রেখে বলল,
-- মাসিমা আজ খুব সকালে উঠে স্নান করে এই পায়েস রাঁধলেন। কতবার বললাম আমি করে দিচ্ছি - না, কিছুতেই কথা শুনলেন না। নিজের হাতেই রান্না করলেন।
কামিনীদেবী রিনার কথা শুনে বলে উঠলেন,
-- এত কথা কেন বলিস রিনা? যা দু'গ্লাস জল নিয়ে আয়।
 রিনা বেরিয়ে যেতেই এক এক করে দু'জনের হাতে পায়েসের বাটি তুলে দিয়ে একটু উদাস হয়ে গেলেন। নন্দিনী জানতে চাইলো ,
-- কী হল মাসিমা? কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন যে!
 কামিনীদেবী মেয়ের বাঁধানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- আমার মেয়েটা আমার হাতের পায়েস খুব ভালো খেতো। মাঝে মাঝেই বলতো মা আজ একটু পায়েস করো।
 নন্দিনী আর কৌশিকী দু'জন দু'জনের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা সময় চুপ করে থাকলো। খানিক পরে কৌশিকী বলে,
-- মাসিমা, আপনার কি ওই একটাই মেয়ে ছিল?
-- না,না আমার একটা ছেলেও আছে। সে দেশের বাইরে থাকে। মেমসাহেব বৌ। আমার নাতি,নাতনিও আছে। তোমাদের মেসোমশাই বেঁচে থাকতে টাকা পাঠাতো আমাদের জন্য। কিন্তু তিনি সে টাকা নিতে অস্বীকার করেন। ছেলে কোনদিন আর দেশে ফিরবে না। তাই তোমাদের মেসোমশাই এর আপত্তি ছেলের টাকা নেওয়ার। তার তো পেনশন আছে। শুধু ছেলেকে বলেছিলেন বছরে একবার করে দেশে আসতে। কিন্তু মেমসাহেব বৌ ছেলেকে হয় মা,বাবা নয়তো তাকে যেকোন একটা দিক বেছে নিতে বলেছিল। সে বৌকেই বেছে নিয়েছে। আর এটাই তো স্বাভাবিক। তাই তিনিও আর কোন যোগাযোগ রাখেননি। মা,বাবা সন্তান মানুষ করে তাদের সুখের জন্য, তাদের ভবিষ্যতও জন্য। বৃদ্ধ বয়সে দেখভালের জন্য। টাকার জন্য নয়। এটা আমার ছেলে কোনদিনও বুঝলো না। সে টাকা পাঠিয়েই দায়িত্ব সারতে চেয়েছিল।
 মাসিমার চোখে জল দেখে কৌশিকী প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলে, 
-- আচ্ছা মাসিমা, আপনার এখানে কতজন মেয়ে আছে? যারা আছে তারা কি সবাই চাকরি করে?
-- সবে বছরদু'য়েক হল শুরু করেছি। একজন নিয়ে নিজেই রান্না করে চালাচ্ছিলাম। সেও এক ইতিহাস। পরে একসময় বলবো। এখন ওই ছয়জনের মত আছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন চাকরি করে আর একজন পড়াশুনা করে। কলেজে পড়ে। তাই তো রান্নার জন্য লোক রাখতে হয়েছে। এখন আর নিজে কিছুই পারি না। হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লাম কিনা।
     
কামিনীদেবীর কথা শেষ হতেই ঘরের মধ্যে একটা ভারী নীরবতা নেমে এল। দূরে কোথাও যেন একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
নন্দিনী ধীরে ধীরে পায়েসের বাটি নামিয়ে রেখে কোমল গলায় বলল,
— আপনি অসুস্থ হওয়ার পর তো খুব কষ্ট হয়েছে নিশ্চয়ই?
কামিনীদেবী হালকা হাসলেন, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ক্লান্তি স্পষ্ট।
— কষ্ট তো ছিলই মা তবে মানুষ একা থাকতে থাকতে কষ্টকেও সঙ্গী করে নিতে শিখে যায়। প্রথম দিকে খুব ভয় পেতাম। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হতো, যদি কিছু হয়ে যায় তখন তো কেউ নেই পাশে। তবে রিনা আমার খুব ভালো মেয়ে। খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে রাতেও ও আমার কাছে থেকে যায়।
কৌশিকী একটু এগিয়ে এসে তার হাতটা আলতো করে ধরে বলল,
— এখন তো আমরা আছি মাসিমা।
এই কথাটা শুনে কামিনীদেবীর চোখ ভিজে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— তোদের যদি আগে পেতাম, তাহলে হয়তো এতটা একা লাগতো না।
ঠিক তখনই রিনা জল নিয়ে ফিরে এল।
— এই নিন মাসিমা, জল।
কামিনীদেবী স্বাভাবিক হয়ে বললেন,
— ওদের দে, তারপর তুইও বস। আজ সবাই মিলে খাই।
রিনা একটু অবাক হয়ে বলল,
— আমি? আমি এখানে বসে খাবো? আমার রাজ্যের কাজ পড়ে আছে। সেগুলো সারতে হবে। 
--যা - গিয়ে আমার আর তোর বাটি দু'টো নিয়ে আয় তো 
হ্যাঁ রে, তুই কি মানুষ না নাকি? তুইও তো আমারই মেয়ে।
 রিনা হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো ওদের দু'জনের পায়েসের বাটি আনতে। খানিক পরে দুইহাতে দু'টো পায়েসের বাটি নিয়ে এসে একটা কামিনীদেবীর দিকে এগিয়ে দিয়ে হেসে মেঝেতে এক কোণে বসে পড়ল।
  নন্দিনী চারদিকে তাকিয়ে দেখল—ঘরটা খুব বড় নয়, কিন্তু অদ্ভুত এক মায়া আছে। দেওয়ালে সাজানো কয়েকটা ছবি, একটা পুরনো অ্যালমারি, আর সেই বাঁধানো ছবিটা—যেটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ আগেই কামিনীদেবী হারিয়ে গিয়েছিলেন।
নন্দিনী ধীরে ধীরে বলল,
— মাসিমা, আমরা কি মাঝে মাঝে এখানে আসতে পারি?
কামিনীদেবী একটু চমকে উঠে তাকালেন,
— কেন রে? শুধু মাঝে মাঝে কেন? ইচ্ছে হলে রোজ আসবি। আমি তো চাই তুই আমার কাছেই থেকে যা। কিন্তু তোর দিদি আর বাড়িতে যাঁরা আছেন তাঁরা কি রাজি হবেন?
কৌশিকী হেসে বলল,
— তাহলে ঠিক রইল, আমরা প্রায়ই আসবো। আর নন্দিনীর এখানে থাকার প্রসঙ্গে মা,বাবার সাথে কথা বলে আপনাকে জানাবো । 
  কামিনীদেবী কিছু বললেন না, শুধু দু’হাত বাড়িয়ে নন্দিনী আর কৌশিকীকে কাছে টেনে নিলেন।
তার চোখের কোণে জমে থাকা জল এবার আর লুকিয়ে থাকলো না।
বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে। জানালার পর্দা দুলছে ধীরে ধীরে—মনে হচ্ছে যেন নতুন করে এই বাড়ির নিঃসঙ্গতা একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে।
 প্রায় ঘণ্টা দু'য়েক  সময় কাটিয়ে নন্দিনী ও কৌশিকী ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লো। কৌশিকী ওই পথেই কলেজে চলে যায় আর নন্দিনী বাড়িতে অর্থাৎ কৌশিকীদের বাড়িতে চলে আসে।
  ফোনে কামিনীদেবীর সাথে রোজই কথা হয় নন্দিনীর। রোজই তিনি ওদের যাওয়ার জন্য ছেলেমানুষের মত বায়না করতে থাকেন। 
 দিন এইভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু একদিন ভোর বেলায় কামিনীদেবীর রান্নার মেয়েটি ফোন করে নন্দিনীকে জানায় কামিনীদেবী সকালে বাথরুমে যেতে গিয়ে পড়ে গেছেন। খুব চোট পেয়েছেন। সকলে ধরাধরি করে কোনরকমে খাটে এনে শুইয়ে দিয়েছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। মনেহচ্ছে হাসপাতাল নিতে হবে। নন্দিনী ফোন পেয়ে সেই অবস্থাতেই বেরিয়ে আসে। সেদিন কৌশিকির আসবার কোন উপায় ছিল না। নন্দিনী বেরোনোর সময় কৌশিকী বেশ কিছু টাকা ওর হাতে জোর করেই দিয়ে দেয়।
 নন্দিনী এসে বুঝতে পারে কোমরের হাড় ভেঙে গেছে সম্ভবত। তাই তিনি এত কষ্ট পাচ্ছেন। সে এম্বুলেন্স ডেকে তাঁকে হাসপাতাল নিয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ওই অবস্থাতেও তিনি নন্দিনীর হাতে তার আলমারির চাবি দিয়ে বলেন,
-- আলমারি খুলে দেখ মা সামনেই একটা বাক্স আছে। ওর মধ্যে টাকা আছে। বেশ কিছু টাকা সাথে করে নিয়ে চল। আর এই আলমারির চাবিটা তোর কাছেই থাক। মেয়েগুলো আছে। এদিকটা তুই সামলে নিস। বাজার ঘাট যা করতে হবে রিনা লোক দিয়ে করে নেয়। শুধু তুই টাকাটা বের করে দিস।
 নন্দিনী অবাক হয়ে কামিনীদেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কামিনীদেবী বুঝতে পারেন নন্দিনী কী ভাবছে। যন্ত্রণায় তখন তিনি কাতর। তারই মাঝে আস্তে করে নিজের ডানহাতটি নন্দিনীর মাথার উপর দিয়ে বলেন,
-- মানুষ চিনতে আমার ভুল হয়নি। যদি ফিরে না আসি এসব সামলে এখানেই থেকে যাস 
 নন্দিনী কামিনিদেবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে,
-- কিচ্ছু হবে না তোমার। তুমি ঠিক সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। সে পর্যন্ত আমি সবকিছু সামলে নেবো। তুমি কিচ্ছু ভেবো না।
 এম্বুলেন্স এসে যায়। নন্দিনী ঠিক যা ভেবেছিল তাই হয়েছে। কোমরের হাড় সরে গেছে। ডাক্তার এ বয়সে অপারেশনের ঝুঁকি নেবেন না। মাসখানেক ট্রাকসন দিয়ে রাখলেন হাসপাতালে। তারপর বাড়িতে এনে স্নান, বাথরুম, খাওয়া ছাড়া বাকি সময় ওই ট্রাকসন দিয়ে ছ'মাস চললো। নন্দিনী আর ফিরে আসতে পারেনি কৌশিকীদের বাড়িতে। এই ক'টা মাসে কামিনীদেবী মাসিমা থেকে কবে যে নন্দিনীর মা হয়ে উঠেছেন তা বোধকরি নন্দিনী নিজেও মনে করতে পারবে না। 

ক্রমশ 

Tuesday, July 7, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ৫৬)

  ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৬)

  কামিনীদেবীর ফোন পেয়ে নন্দিনী ভাবে হয়ত আবারও তার শরীর খারাপ করেছে। সে উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চায়
-- হ্যাঁ মাসিমা আপনার শরীর কেমন আছে? 
-- শরীর তো ঠিক আছে মা। কিন্তু তোমার জন্য মনটা কেমন করছে। তাই ভাবলাম ফোনেই একটু কথা বলি।
তুমি আবার কবে আসবে মা? 
-- যাবো মাসিমা দুই একদিনের মধ্যেই যাবো।
-- সত্যি বলছো তো মা? শুধু বলার জন্য বলছো না তো? 

 কণ্ঠে একরাশ আবদার মিশে থাকে কামিনীদেবীর।
নন্দিনী একটু হেসে নরম গলায় বলে, 
--আরে না মাসিমা, সত্যিই যাবো। আপনি এমন করে ডাকলে না গিয়ে কি পারি?
-- জানো নন্দিনী, এই বয়সে মানুষটা বড় একা হয়ে যায়। ঘর ভরা মানুষ থাকলেও মনটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তোমার সাথে দুটো কথা বললেই যেন মনে হয় নিজের মেয়ের সাথেই কথা বলছি।
কথাগুলো শুনে নন্দিনীর বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, 
--আমি তো আছিই মাসিমা। আপনি একদম এমন কথা বলবেন না। আপনি বললেই আমি চলে আসবো।
-- তাই নাকি? তাহলে কালই চলে এসো না মা!  তোমাকে দেখতে বড্ড ইচ্ছা করছে। আমি নিজের হাতে তোমার জন্য পায়েস করে রাখবো ।
নন্দিনী হেসে ফেলে, 
-- ঠিক আছে, কাল বিকেলের দিকে আসবো। তবে আপনি কিন্তু বেশি কষ্ট করবেন না, বুঝলেন?
-- কষ্ট আবার কিসের? তোমার জন্য করলে সেটাই তো আমার আনন্দ।
ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়েই বসে থাকে নন্দিনী। তার মনে অদ্ভুত একটা টান অনুভব হয়—রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সামান্য সময়ের মধ্যেই কত আপন হয়ে উঠেছে এই মানুষটা।
মনের মধ্যে হালকা একটা হাসি নিয়ে সে নিজেকেই বলে, "কালই যাই... মাসিমার কাছে গেলে মনটা যেন অন্যরকম শান্তি পায়।"
বাইরে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে, আর নন্দিনীর মনেও জমে উঠছে আগামী দিনের একটুখানি উষ্ণ প্রত্যাশা।
 নন্দিনী চুপ করে বসে থাকে। কৌশিকী জানতে চায় নন্দিনীর কাছে
-- কী বললেন ভদ্রমহিলা
-- কবে যাবো আবার জানতে চাইলেন?
-- এখন ঠিক আছেন তো?
-- ভালো আছেন তো বললেন।
-- তাহলে একদিন আমিও যাই তোমার সাথে দেখা করে আসবো। আসলে কী জানো দিনকাল তো ভালো নয় কাউকেই সহজে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। 
-- কিন্তু দিদি উনাকে দেখে আমার ভালো মানুষই মনে হয়েছে। তবুও তোমায় নিয়েই আমি পুণরায় উনার কাছে যাব।
  কৌশিকীর কথা শুনে নন্দিনী মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
-- হ্যাঁ দিদি, তুমি থাকলে আমারও নিশ্চিন্ত লাগবে। তবে জানো, উনার চোখের দিকে তাকালেই মনে হয় যেন অনেকদিনের চেনা কেউ।

কৌশিকী একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
--সেটা হতে পারে, কিন্তু এখনকার দিনে সাবধানে থাকাই ভালো। মানুষের মুখ দেখে সব বোঝা যায় না। আগে আমরা যাই তো তারপরে নাহয় এসব নিয়ে আলোচনা করবো। এত বড় মস্ত পৃথিবীতে ভালোমন্দ উভয় মানুষের বাস রয়েছে। কিন্তু সবাই মানুষের মত দেখতে হলেও সব কিন্তু মানুষ নয়। তাই তো এত অপরাধ ঘটে চলেছে। এর বেশি আর কিছু আমি বলতে চাই না কারণ অদেখা অচেনা একজন বয়স্ক মানুষ সম্পর্কে কোন খারাপ মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

 নন্দিনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, 
--জানি দিদি,  তবুও উনাকে নিয়ে আমার মনে কোনো ভয় কাজ করে না। বরং একটা অদ্ভুত শান্তি পাই।
-- মানুষের জীবনে হঠাৎ কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হয় যাদের প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায়। খুব আপন মনেহয়। 
 কৌশিকীর এ কথার কোন উত্তর নন্দিনী দেয় না। সে আনমনা হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে। কৌশিকীর মা কৌশিকীর দিকে ফিরে বললেন,
-- দেখ মা নন্দিনীর কিন্তু আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। হুটপাট কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। দিনকাল মোটেই ভালো নয়। তবে তোর বিচার,বুদ্ধির উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে।
 কৌশিকী মায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে দেয়।

  বাইরের আলো আরও ফিকে হয়ে আসছিল। জানলার ফাঁক দিয়ে আসা হাওয়ায় পর্দা একটু দুলে উঠল। সেই নরম আলো-হাওয়ার মধ্যে দু'জনেই যেন নিজের নিজের ভাবনায় ডুবে গেল।

কৌশিকী উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-- ঠিক আছে, কাল তাহলে আমিও যাবো তোমার সাথে। দেখি কেমন মানুষ উনি।

নন্দিনীর মুখে তখন হালকা স্বস্তির ছাপ।
--চল, তাহলে কাল সকালে একটু তাড়াতাড়ি বেরোবো।

 রাতটা কাটল দু'জনেরই আলাদা আলাদা ভাবনায়।নন্দিনীর মনে ছিল এক অদ্ভুত টান মাসিমার কাছে যাওয়ার।আর কৌশিকীর মনে একটুখানি সংশয়। 

কিন্তু সেই সংশয় আর টানের মাঝেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল এক নতুন সম্পর্কের সূচনা, যার গভীরতা তারা কেউই তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি।

  পরদিন সকালটা যেন অন্যরকম এক উত্তেজনা নিয়ে শুরু হল।
নন্দিনী খুব ভোরেই উঠে পড়েছিল। অকারণেই তার মনটা আজ বেশ হালকা, আবার কোথাও যেন অদ্ভুত এক কৌতূহল কাজ করছে।
কৌশিকীও তৈরি হয়ে নিল তাড়াতাড়ি। ওর আজ একটু দেরিতেই ক্লাস। দেখা করে ওখান থেকেই কলেজ চলে যাবে। দু'জনে একসাথে বেরিয়ে পড়ল মাসিমার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
রাস্তা জুড়ে তখন সকালবেলার নরম রোদ, হালকা বাতাসে শহরটা যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। অটোতে বসে নন্দিনী বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল, যেন তাড়াতাড়ি পৌঁছতে চায়।
কৌশিকী একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
-- এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে বলতো?
নন্দিনী একটু লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল,
-- জানি না দিদি উনাকে দেখলেই যেন মনে হয় নিজের কেউ।
কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছে গেল সেই পুরনো বাড়িটার সামনে।
দরজাটা আধখোলা। বাড়িটা বাইরে থেকে বেশ সাধারণ, কিন্তু কোথাও যেন একটা শান্ত, আপন অনুভূতি ছড়িয়ে আছে। বাইরে দাঁড়িয়েই তারা লুচি ভাজার গন্ধ পাচ্ছে।
নন্দিনী ধীরে ধীরে দরজায় কড়া নাড়ল,
-- মাসিমা, আমি নন্দিনী-
ভিতর থেকে কাঁপা কিন্তু উষ্ণ একটা গলা ভেসে এল,
-- এসো মা, দরজা খোলা আছে।
দু'জনে ভিতরে ঢুকতেই দেখতে পেলেন, মাসিমা খাটের উপর বসে আছেন। মুখে সেই চেনা মমতাময়ী হাসি। নন্দিনীকে দেখেই যেন তার চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-- এসেছো মা! আমি তো ভাবছিলাম, আর বুঝি আসবে না
নন্দিনী এগিয়ে গিয়ে তাঁর পাশে বসে হাতটা ধরে ফেলল,
-- আসব না কেন মাসিমা? কথা দিয়েছিলাম তো।
কৌশিকী একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবটা লক্ষ্য করছিল।
সে এগিয়ে এসে নম্রভাবে বলল,
-- নমস্কার, আমি কৌশিকী, নন্দিনীর দিদি।
মাসিমা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন,
-- খুব ভালো করেছো মা, এসেছো। নন্দিনীর বয়স কম। তুমি ওর বড়। নিজের চোখে না দেখে বোনটাকে পাঠাবেই বা কেন?
-- না না মাসিমা সেসব কিছু নয়। আমার আর নন্দিনীর সম্পর্কটা আপনি জানেন না। তাই একটু ভয়টা বেশি পাই। 
-- সব জানাবো, সব শুনবো। এখন বসো তো।
কৌশিকী বসে পড়ল, কিন্তু তার চোখে এখনো একটা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের ছাপ।
হঠাৎ ঘরের এক কোণে রাখা একটা পুরনো ফটোফ্রেমের দিকে তার নজর গেল।
ছবিটায় এক তরুণী চোখেমুখে অদ্ভুত মিল নন্দিনীর সঙ্গে!
কৌশিকী অবাক হয়ে বলল,
-- এটা কার ছবি?
মাসিমা একটু চুপ করে রইলেন। তার চোখে যেন মুহূর্তের জন্য জল চিকচিক করে উঠল।
ধীরে ধীরে বললেন,
-- আমার মেয়ে অনেক বছর আগে হারিয়ে গেছে।
নন্দিনীর বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
সে অবচেতনেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কৌশিকী এবার একটু গম্ভীর স্বরে বলল,
-- কিন্তু দেখতে তো নন্দিনীর মতোই লাগছে!
মাসিমা গভীরভাবে নন্দিনীর দিকে তাকালেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
-- সেই কারণেই তো প্রথম দিন থেকেই ওকে এত আপন মনে হয়েছে মা
ঘরের মধ্যে হঠাৎ একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল।
বাইরের হাওয়া যেন থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
নন্দিনীর মনে তখন হাজারটা প্রশ্ন, হাজারটা অনুভূতির ঢেউ।
এ কি শুধুই কাকতালীয়…
না কি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো সত্য?
 ক্রমশ