Tuesday, July 7, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ৫৬)

  ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৬)

  কামিনীদেবীর ফোন পেয়ে নন্দিনী ভাবে হয়ত আবারও তার শরীর খারাপ করেছে। সে উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চায়
-- হ্যাঁ মাসিমা আপনার শরীর কেমন আছে? 
-- শরীর তো ঠিক আছে মা। কিন্তু তোমার জন্য মনটা কেমন করছে। তাই ভাবলাম ফোনেই একটু কথা বলি।
তুমি আবার কবে আসবে মা? 
-- যাবো মাসিমা দুই একদিনের মধ্যেই যাবো।
-- সত্যি বলছো তো মা? শুধু বলার জন্য বলছো না তো? 

 কণ্ঠে একরাশ আবদার মিশে থাকে কামিনীদেবীর।
নন্দিনী একটু হেসে নরম গলায় বলে, 
--আরে না মাসিমা, সত্যিই যাবো। আপনি এমন করে ডাকলে না গিয়ে কি পারি?
-- জানো নন্দিনী, এই বয়সে মানুষটা বড় একা হয়ে যায়। ঘর ভরা মানুষ থাকলেও মনটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তোমার সাথে দুটো কথা বললেই যেন মনে হয় নিজের মেয়ের সাথেই কথা বলছি।
কথাগুলো শুনে নন্দিনীর বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, 
--আমি তো আছিই মাসিমা। আপনি একদম এমন কথা বলবেন না। আপনি বললেই আমি চলে আসবো।
-- তাই নাকি? তাহলে কালই চলে এসো না মা!  তোমাকে দেখতে বড্ড ইচ্ছা করছে। আমি নিজের হাতে তোমার জন্য পায়েস করে রাখবো ।
নন্দিনী হেসে ফেলে, 
-- ঠিক আছে, কাল বিকেলের দিকে আসবো। তবে আপনি কিন্তু বেশি কষ্ট করবেন না, বুঝলেন?
-- কষ্ট আবার কিসের? তোমার জন্য করলে সেটাই তো আমার আনন্দ।
ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়েই বসে থাকে নন্দিনী। তার মনে অদ্ভুত একটা টান অনুভব হয়—রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সামান্য সময়ের মধ্যেই কত আপন হয়ে উঠেছে এই মানুষটা।
মনের মধ্যে হালকা একটা হাসি নিয়ে সে নিজেকেই বলে, "কালই যাই... মাসিমার কাছে গেলে মনটা যেন অন্যরকম শান্তি পায়।"
বাইরে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে, আর নন্দিনীর মনেও জমে উঠছে আগামী দিনের একটুখানি উষ্ণ প্রত্যাশা।
 নন্দিনী চুপ করে বসে থাকে। কৌশিকী জানতে চায় নন্দিনীর কাছে
-- কী বললেন ভদ্রমহিলা
-- কবে যাবো আবার জানতে চাইলেন?
-- এখন ঠিক আছেন তো?
-- ভালো আছেন তো বললেন।
-- তাহলে একদিন আমিও যাই তোমার সাথে দেখা করে আসবো। আসলে কী জানো দিনকাল তো ভালো নয় কাউকেই সহজে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। 
-- কিন্তু দিদি উনাকে দেখে আমার ভালো মানুষই মনে হয়েছে। তবুও তোমায় নিয়েই আমি পুণরায় উনার কাছে যাব।
  কৌশিকীর কথা শুনে নন্দিনী মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
-- হ্যাঁ দিদি, তুমি থাকলে আমারও নিশ্চিন্ত লাগবে। তবে জানো, উনার চোখের দিকে তাকালেই মনে হয় যেন অনেকদিনের চেনা কেউ।

কৌশিকী একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
--সেটা হতে পারে, কিন্তু এখনকার দিনে সাবধানে থাকাই ভালো। মানুষের মুখ দেখে সব বোঝা যায় না। আগে আমরা যাই তো তারপরে নাহয় এসব নিয়ে আলোচনা করবো। এত বড় মস্ত পৃথিবীতে ভালোমন্দ উভয় মানুষের বাস রয়েছে। কিন্তু সবাই মানুষের মত দেখতে হলেও সব কিন্তু মানুষ নয়। তাই তো এত অপরাধ ঘটে চলেছে। এর বেশি আর কিছু আমি বলতে চাই না কারণ অদেখা অচেনা একজন বয়স্ক মানুষ সম্পর্কে কোন খারাপ মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

 নন্দিনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, 
--জানি দিদি,  তবুও উনাকে নিয়ে আমার মনে কোনো ভয় কাজ করে না। বরং একটা অদ্ভুত শান্তি পাই।
-- মানুষের জীবনে হঠাৎ কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হয় যাদের প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায়। খুব আপন মনেহয়। 
 কৌশিকীর এ কথার কোন উত্তর নন্দিনী দেয় না। সে আনমনা হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে। কৌশিকীর মা কৌশিকীর দিকে ফিরে বললেন,
-- দেখ মা নন্দিনীর কিন্তু আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। হুটপাট কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। দিনকাল মোটেই ভালো নয়। তবে তোর বিচার,বুদ্ধির উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে।
 কৌশিকী মায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে দেয়।

  বাইরের আলো আরও ফিকে হয়ে আসছিল। জানলার ফাঁক দিয়ে আসা হাওয়ায় পর্দা একটু দুলে উঠল। সেই নরম আলো-হাওয়ার মধ্যে দু'জনেই যেন নিজের নিজের ভাবনায় ডুবে গেল।

কৌশিকী উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-- ঠিক আছে, কাল তাহলে আমিও যাবো তোমার সাথে। দেখি কেমন মানুষ উনি।

নন্দিনীর মুখে তখন হালকা স্বস্তির ছাপ।
--চল, তাহলে কাল সকালে একটু তাড়াতাড়ি বেরোবো।

 রাতটা কাটল দু'জনেরই আলাদা আলাদা ভাবনায়।নন্দিনীর মনে ছিল এক অদ্ভুত টান মাসিমার কাছে যাওয়ার।আর কৌশিকীর মনে একটুখানি সংশয়। 

কিন্তু সেই সংশয় আর টানের মাঝেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল এক নতুন সম্পর্কের সূচনা, যার গভীরতা তারা কেউই তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি।

  পরদিন সকালটা যেন অন্যরকম এক উত্তেজনা নিয়ে শুরু হল।
নন্দিনী খুব ভোরেই উঠে পড়েছিল। অকারণেই তার মনটা আজ বেশ হালকা, আবার কোথাও যেন অদ্ভুত এক কৌতূহল কাজ করছে।
কৌশিকীও তৈরি হয়ে নিল তাড়াতাড়ি। ওর আজ একটু দেরিতেই ক্লাস। দেখা করে ওখান থেকেই কলেজ চলে যাবে। দু'জনে একসাথে বেরিয়ে পড়ল মাসিমার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
রাস্তা জুড়ে তখন সকালবেলার নরম রোদ, হালকা বাতাসে শহরটা যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। অটোতে বসে নন্দিনী বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল, যেন তাড়াতাড়ি পৌঁছতে চায়।
কৌশিকী একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
-- এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে বলতো?
নন্দিনী একটু লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল,
-- জানি না দিদি উনাকে দেখলেই যেন মনে হয় নিজের কেউ।
কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছে গেল সেই পুরনো বাড়িটার সামনে।
দরজাটা আধখোলা। বাড়িটা বাইরে থেকে বেশ সাধারণ, কিন্তু কোথাও যেন একটা শান্ত, আপন অনুভূতি ছড়িয়ে আছে। বাইরে দাঁড়িয়েই তারা লুচি ভাজার গন্ধ পাচ্ছে।
নন্দিনী ধীরে ধীরে দরজায় কড়া নাড়ল,
-- মাসিমা, আমি নন্দিনী-
ভিতর থেকে কাঁপা কিন্তু উষ্ণ একটা গলা ভেসে এল,
-- এসো মা, দরজা খোলা আছে।
দু'জনে ভিতরে ঢুকতেই দেখতে পেলেন, মাসিমা খাটের উপর বসে আছেন। মুখে সেই চেনা মমতাময়ী হাসি। নন্দিনীকে দেখেই যেন তার চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-- এসেছো মা! আমি তো ভাবছিলাম, আর বুঝি আসবে না
নন্দিনী এগিয়ে গিয়ে তাঁর পাশে বসে হাতটা ধরে ফেলল,
-- আসব না কেন মাসিমা? কথা দিয়েছিলাম তো।
কৌশিকী একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবটা লক্ষ্য করছিল।
সে এগিয়ে এসে নম্রভাবে বলল,
-- নমস্কার, আমি কৌশিকী, নন্দিনীর দিদি।
মাসিমা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন,
-- খুব ভালো করেছো মা, এসেছো। নন্দিনীর বয়স কম। তুমি ওর বড়। নিজের চোখে না দেখে বোনটাকে পাঠাবেই বা কেন?
-- না না মাসিমা সেসব কিছু নয়। আমার আর নন্দিনীর সম্পর্কটা আপনি জানেন না। তাই একটু ভয়টা বেশি পাই। 
-- সব জানাবো, সব শুনবো। এখন বসো তো।
কৌশিকী বসে পড়ল, কিন্তু তার চোখে এখনো একটা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের ছাপ।
হঠাৎ ঘরের এক কোণে রাখা একটা পুরনো ফটোফ্রেমের দিকে তার নজর গেল।
ছবিটায় এক তরুণী চোখেমুখে অদ্ভুত মিল নন্দিনীর সঙ্গে!
কৌশিকী অবাক হয়ে বলল,
-- এটা কার ছবি?
মাসিমা একটু চুপ করে রইলেন। তার চোখে যেন মুহূর্তের জন্য জল চিকচিক করে উঠল।
ধীরে ধীরে বললেন,
-- আমার মেয়ে অনেক বছর আগে হারিয়ে গেছে।
নন্দিনীর বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
সে অবচেতনেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কৌশিকী এবার একটু গম্ভীর স্বরে বলল,
-- কিন্তু দেখতে তো নন্দিনীর মতোই লাগছে!
মাসিমা গভীরভাবে নন্দিনীর দিকে তাকালেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
-- সেই কারণেই তো প্রথম দিন থেকেই ওকে এত আপন মনে হয়েছে মা
ঘরের মধ্যে হঠাৎ একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল।
বাইরের হাওয়া যেন থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
নন্দিনীর মনে তখন হাজারটা প্রশ্ন, হাজারটা অনুভূতির ঢেউ।
এ কি শুধুই কাকতালীয়…
না কি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো সত্য?
 ক্রমশ