অনল উঠে তার ঘরে চলে গেলো। খাবার টেবিলে আলোচনা চলছে। আনন্দি একদম চুপ করে বসে যে যখন কথা বলছে তার দিকে তাকাচ্ছে। অনলের বাবা সারাজীবনই কম কথা বলেন। পরিবারের কোন আলোচনায় কখনো নিজের কোন মত ব্যক্ত করেন না যদি না তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়। ভীষন শান্তিপ্রিয় এবং নিরীহ মানুষ উনি। সকলের সব আলোচনা শুনে তিনি শুধু বললেন
-- মেয়েটাকে আমারও খুব পছন্দ হয়েছে। আমার অনলের সাথে বেশ মানাবে।
তাহলে আমরা ফোনেই বিনীতার মায়ের সাথে কথা বলি উনি কী বলেন শুনি। তারপর একটা ভালো দিন দেখে আশীর্বাদটা করে ফেলি।
অনলের মামা কথাগুলো বললেন।
-- কিন্তু দাদা সবার আগে অনল আর বিনীতার মতটা দরকার। ওরা আজকালকার ছেলেমেয়ে। ওদের নিজস্ব পছন্দ অপসন্দ তো থাকবেই।
ইরার বক্তব্য শুনে এবার লিজা কথা শুরু করলেন।
-- আমি অনল এবং বিনীতার সাথে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলেছি। দু'জনের কেউ কোন আপত্তি করেনি। আর তাছাড়া আমি সুস্মিতা মানে আমার বন্ধুকেও কথাটা বলেছি। ও তো শুনেই রাজি হয়ে গেছে। তবে ওর বক্তব্য দুটো অনুষ্ঠান একসাথে করলে খরচটা কম হবে। কিন্তু বিনীতার দাদার আবার আপত্তি তাতে। যাহোক এটা ওদের বিষয়। ওরা যেটা ভালো বুঝবেন সেটাই করবেন। তাহলে তুমি আজই ফোন করে ওর মায়ের সাথে কথা বোলো।
-- সেতো নাহয় বললাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সব কীভাবে হবে বলো তো?
-- আরে কোন চিন্তা করিস না। আমি আছি তো কোন অসুবিধা হবে না। ছেলের বিয়ে একদিনেই বাজার করে নিয়ে আসবো।
দেবদূত হাসতে হাসতে বললেন,
দেবদূতের কথায় সবাই মৃদু একটু হেসে উঠলেও ভিতরে ভিতরে একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। দু'দিন ধরে শুধু কথার মধ্যেই ঘুরছিল বিষয়টা, আজ যেন সেটার একটা রূপ নিতে শুরু করেছে।
আনন্দি চুপচাপ বসে সব শুনছিল। তার চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল, যেখানে একটু আগেই অনল উঠে গিয়েছিল। মনে মনে ভাবছে—দাদা কি তার জীবনের ঘটে যাওয়া সত্যিটা কোনদিনও মা, বাবাকে জানাতে পারবে? যদি না পারে তাহলে তো সারাজীবন ওর ভিতরে একটা অপরাধ বোধ কাজ করবে। এ সত্যের মুখোমুখি না হতে পারলে সারাটাজীবন ওকে কুরেকুরে খাবে। নিজেই নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে না।
ওদিকে অনল নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে পড়েছে। মাথার ভেতর যেন হাজারটা চিন্তা একসাথে ঘুরছে। বিনীতাকে সে ভালোবাসে—এটা সে অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ঠিক হয়ে যাচ্ছে, এটা যেন একটু অবাস্তব লাগছে তার কাছে। মা,বাবাকে সত্যিটা জানানো উচিত। তানাহলে তাদের সরলতায় আঘাত করা হবে। কিন্তু ঘটনা যেভাবে এগোচ্ছে এখন কিছু বলতে গেলে মামী, মামাকে অসম্মান করা হবে। কোন দিকে যাবে সে এখন? মাথায় কিছুই আসছে না তার। প্রথমে এইসব বিষয় নিয়ে সে ভাবেনি। কিন্তু এখন কেন মনেহচ্ছে তার নিজের জীবনের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সে একটা মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে মা, বাবাকে ঠকাচ্ছে। কী করবে সে এখন? এইভাবে মিথ্যে দিয়ে জীবন শুরু করলে সুখী হতে পারবে সে?
সে ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বিনীতার নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল।
ফোনটা কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে বিনীতার কণ্ঠ ভেসে এল— — হ্যালো?
অনল একটু থেমে বলল, — তুমি ফ্রি আছো?
— হ্যাঁ, বলো। (গলায় হালকা কাঁপুনি) ওখানে সবাই কী বলছে?
— সব ঠিকঠাক এগোচ্ছে। সবাই খুব খুশি… (একটু থেমে)
বিনীতা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
— তুমি খুশি তো?
অনল একটু হেসে বলল, — আমি খুশি… যদি তুমি খুশি হও।
ওপাশ থেকে মৃদু হাসির শব্দ এল, — তাহলে আমিও খুশি।তার মধ্যেও একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে
-- কী সেই কিন্তু?
লিজা ইতিমধ্যেই ফোনটা হাতে নিয়ে সুস্মিতার নম্বর ডায়াল করেছেন। সবাই একটু চুপ করে অপেক্ষা করছে। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোনটা রিসিভ হল।
— হ্যালো সুস্মিতা, আমি লিজা বলছি।
— হ্যাঁ বল, আমি তো তোর ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলাম।
লিজা হেসে বললেন, — তাহলে দেরি না করে বলি, আমরা সবাই চাইছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা ভালো দিন দেখে আশীর্বাদটা করে ফেলতে।
ওপাশ থেকে সুস্মিতার গলায় আনন্দ স্পষ্ট, — আমরাও সেটাই চাই। এতদিন পর যখন সব ঠিকই হল তখন আর দেরি করতে চাই না।
মামা পাশে থেকে ইশারা করলেন, — দিনটার কথা বলো।
লিজা আবার বললেন, — তাহলে একজন পণ্ডিত ডেকে দিন দেখে নিই? এই সপ্তাহেই যদি কিছু পাওয়া যায়!
— নিশ্চয়ই। আমি এখান থেকেও দেখে নিচ্ছি। এখন তো একটু ব্যস্ত আছি। অবেলায় আমি অনলের মা,বাবার সাথে কথা বলবো -
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর ঘরে যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। সবাই নিজেদের মতো করে পরিকল্পনা করতে শুরু করল—কে কী করবে, কী কী কিনতে হবে, কাকে খবর দিতে হবে।
শুধু আনন্দি এক কোণে দাঁড়িয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। আকাশটা নীল, একদম পরিষ্কার। কিন্তু তার মনের ভেতর যেন অদ্ভুত একটা মিশ্র অনুভূতি—খুশি, মা, বাবাকে সবাই মিলে ঠকাচ্ছি নাতো? তাঁরা সরল মনে আমাদের কথা বিশ্বাস করে নিলেন - কোথাও যেন একটা কাঁটা বুকের ভিতর বিধছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে অনল বলল, — কী ভাবছিস এত?
আনন্দি ঘুরে দেখে দাদা দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ মুখে শান্তির মাঝেও যেন কোথায় একটা বড় জিজ্ঞাসাবোধক চিহ্ন রয়ে গেছে। সে যেন কিছু বলতেই বোনের কাছে এসেছে।
— কিছু না… শুধু ভাবছি, সবকিছু খুব সুন্দরভাবেই এগোচ্ছে দাদা। কিন্তু তবুও কেন জানি না মনটা কেমন যেন লাগছে।
-- কেন রে ? কী হল?
-- আমার কেন জানি মনেহচ্ছে আমরা বোধহয় মা,বাবাকে ঠকাচ্ছি
-- এটা আমার মনেও এসেছে রে - এখন কী করি বলতো? এই কথাটা আলোচনা করতেই তোর কাছে আসা।
-- আমিও তো সেটাই ভাবছি
-- বলে দেবো?
-- কিন্তু মামী তো বিষয়টা অন্যভাবে প্লেস করেছেন। এখন যদি বলে দিই তাহলে তো মামীকে সঙ্গে মামাকেও অসম্মান করা হবে। সেটাও তো আমরা করতে পারি না। মাথায় কিছুই আসছে না।
-- তবে একটা কথা কী জানিস সবকিছু তো নতুন ভাবেই হচ্ছে। ওই বিয়েটার তো কোন মানেই থাকছে না।
-- হ্যাঁ সেটাও যে আমার মাথায় আসেনি তা কিন্তু নয়। আমরা বরং মামা, মামীর সাথে একবার কথা বলি আর সেইভাবেই এগোই।
এদিকে অনলের ফোনটা কাটার পর থেকে বিনীতা ভেবে চলেছে অনল কী বলতে গিয়েও বললো না। সবকিছু তো ঠিকঠাক এগিয়ে চলেছে। তবে ওর মনে কিসের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। সে বিছানার উপর গিয়ে বসে। ফোন খুলে গ্যালারিতে গিয়ে খুব নিকট আত্মীয়ের তোলা মাত্র কয়েকটি বিয়ের ছবি সেগুলো দেখতে থাকে। মনেমনে ভাবে মানুষ বলে, জন্ম, মৃত্যু,বিয়ে সবই ঈশ্বরের পূর্বপরিকল্পিত। ঠিক তাই। উদাস হয়ে যায়। চুপচাপ শুয়ে থাকে। ঠিক তখনই ওর মা এসে ঘরে ঢোকেন।
-- হ্যাঁরে বিণী লিজা ফোন করেছিল। ওরা নতুন ভাবেই আবার বিয়েটা দিতে চায়। দু'একদিনের মধ্যেই আশীর্বাদের দিন পাকা করবে বলেছে। তুই কি ছুটিটা কটাদিন বাড়িয়ে নিতে পারবি?
-- না মা, নতুন চাকরি ছুটি কিছুতেই বাড়াতে পারবো না। দাদাকে কি জানিয়েছ?
-- হ্যাঁ ফোন করেছিলাম। অফিসে খুব ব্যস্ত এখন। বাড়িতে এসে সব শুনবে বললো।
ভাবছি ওবেলায় একবার অনলের মায়ের সাথে কথা বলবো।
-- সে তুমি যা ভালো বোঝো করবে।
-- কিন্তু বিয়েটা তো আমরা এখানে দিতে পারবো না। আমাদের কলকাতার দিকে ঘর ভাড়া করে বিয়েটা দিতে হবে। ওরা আগের বিয়ের ব্যাপারে বাড়িতে কিছুই জানায়নি। এখানে বিয়ে দিলে তো সব জানাজানি হয়ে যাবে। ছেলে এক থাকলেও পাড়া-প্রতিবেশী কে কখন কী বলে বসবে তার তো কোন ঠিক নেই।আবার না বিয়ের দিন কোন ঝামেলা হয়ে বসে।
-- আমার জীবনে যে ঈশ্বর কী লিখেছেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। আমি কিছু আর ভাবতে পারছি না। তুমি ,দাদা যা ভালো বোঝো তাই করো। আমার কোনটাতেই কোন আপত্তি নেই। তবে আবার দাদার একগাদা টাকা খরচ হবে এটা ভেবেই খারাপ লাগছে। আমার তো নতুন চাকরি। কতটুকু সাহায্য করতে পারবো আমি?
-- এসব নিয়ে আপাতত তোকে ভাবতে হবে না
ক্রমশ -
No comments:
Post a Comment