ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৯)
আমার জিদ, আমার পরিশ্রম, ছোট কাজ হলেও করবো কিন্তু মাথা উঁচু করে বাঁচবো এই ছিল আমার সংকল্প।
বছরের পর বছর কেটে গেল।অভাব ছিল, কষ্ট ছিল, কিন্তু হাল ছাড়িনি কোনদিন। সময় তো বসে থাকে না সে তার নিজের নিয়ম মেনেই চলে। আমিও আমার বাচ্চাদু'টির মুখ চেয়ে কোন পরিশ্রম আর কষ্টকেই কষ্ট মনে করিনি। আজ আমার সেই ছোট্ট বিজয় বড় হয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে। বিজয় চাকরি পাওয়ার পর রান্নার বাড়িগুলি ছেড়ে দিয়েছি। শরীর আর নিতে পারছিল না। সংসারের হালও ফিরেছে।মেয়েটাও পড়াশোনা করে নিজের স্বপ্ন পূরণে স্কুলে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু ওর জীবনে একটা হঠাৎ করেই অঘটন ঘটে যায়।
-- সে কী ? কী সেই অঘটন
-- বলবো সব বলবো তোকে। কেউ নেই ওই ছেলেমেয়ে দু'টো ছাড়া আমার জীবন উপন্যাস শোনার জন্য। আজ এতগুলো বছর বাদে তোকে কাছে পেয়ে আমার কষ্টের কথার ঝর্ণার মুখ যেন খুলে গেছে। এতদিন পরে সব কথা বলতে পেরে যেন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি। বিকেল হয়ে এলো। চা জলখাবার করি। বলছি কী আজকের রাতটা থেকে যা। কাল খাওয়াদাওয়া করে যাস। কারোর সাথে তো এখনো কোন কথাই হয়নি।
-- দাঁড়া অনলকে বলছি। ও কী বলে দেখি।
সুস্মিতা উঠে গেলেন চায়ের ব্যবস্থা করতে। তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে।বাইরে হালকা হাওয়া বইছে। আনন্দি বকবক করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিনিতা ভাবলো ভালো এই সুযোগ। এখন দাদার ঘরে গিয়ে অনলের সাথে একটু কথা বলা যায়। সে বিনীতার পাশ থেকে আস্তে করে উঠে চলে গেলো। যাওয়ার সময় দেখলো মা রান্নাঘরে চা জলখাবার নিয়ে ব্যস্ত। মাসীমণি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।
ত্রিশ বছর বাদে দুই বন্ধুর সাক্ষাৎ। কত পুরোনো কথা কত নতুন কথা জমে আছে দু'জনের মনে। এই স্বল্প সময়ে বলে উঠা কিছুতেই সম্ভব নয়। ওদের ডিস্টার্ব না করাই ভালো। মা মাসিমনিকে পেয়ে এতটাই ব্যস্ত যে আমার সাথেও কথা বলার সময় পাচ্ছেন না। অবশ্য সে সুযোগও আসেনি এখনো। খাবার টেবিলে যা দু'টো একটা কথা হয়েছে যা সকলের সামনে বলা যায়। মা ঠিক রাতের অপেক্ষায় আছেন আর যেভাবেই হোক না কেন মাসীমণিকে ঠিক রাজি করাবেন আজ থেকে যাওয়ার জন্য।
বিনীতা এসে দাদার ঘরের সামনে দাঁড়ায়। দরজা ভেজানো। দরজায় নক করে জানতে চায়
-- দাদা, আসবো?
-- হ্যাঁ আয়। কবে থেকে তুই আমার ঘরে ঢোকার আগে অনুমতি নেওয়া শুরু করলি?
-- এই যে এই মুহূর্ত থেকে
সবাই হেসে দেয়।
বিজয় খাটে শুয়ে ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
-- আমার একটা ফোন করার দরকার ছিল। অনলকে রেখে সেই থেকে বেরোতেই পারছি না। তাহলে তুই একটু ওকে সঙ্গ দে আমি ফোনটা করেই চলে আসছি।
অনল এবং বিনীতা দু'জনেই বুঝতে পারে বিজয় ওদের কথা বলার সুযোগ দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
আস্তে করে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে গেলো। বিনীতা দাঁড়িয়ে আছে দেখে অনল বলল,
-- আরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসে বসো
-- হ্যাঁ বসছি।
বিনীতা গিয়ে খাটের এককোণে বসে। অনল ওর দিকে তাকিয়ে হেসে পড়ে বলে,
-- তোমায় দেখে মনেহচ্ছে এই বাড়িটা আমার আর তুমি এখানে ঘুরতে এসেছো
-- তা কী করবো আমি? আনন্দি যা ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে ওর সামনে গুটিয়ে না থাকলে ও ঠিক ধরে ফেলবে। এই যে এসেছি আমি সে সুযোগ পেয়েছি ও একটু ঘুমিয়ে পড়েছে বলে।
-- তা ঠিক। বোনটা আমার খুব বুদ্ধিমতী। তুমি ওকে ঘটনাটা বলে দাও
-- সে কী এইভাবে বলা ঠিক হবে না
-- তাহলে কীভাবে বলবে?
-- মা, দাদার সাথে কথা বলে কিছু একটা ঠিক তো করতেই হবে
-- বলছো?
-- মানে?
-- না, আমার মনেহচ্ছে তুমি বোধকরি আমায় ছেড়ে আর থাকতে পারছো না
অনল মিটিমিটি হাসছে
-- আমার তো মনেহচ্ছে কেসটা উল্টো
-- একটা কথা বলবো
-- বলো
-- তোমার হাতটা একটু ধরতে দেবে?
-- কেন হাত ধরে কী হবে? চিমটি কাটবে?
অনল হো হো করে হাসতে থাকে।
-- জানো তোমার সাথে এই ঘটনা ঘটার পর আমি বুঝেছি ভাগ্যকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। আমরা ঈশ্বরের হাতের পুতুল মাত্র। দেখো আমরা দু'জন দু'জনকে চিনতাম না, জানতাম না। কোনদিন দেখাও হয়নি। বিজয়ের সাথে হঠাৎ করেই একদিন দেখা ,নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আমার আসা। এইটুকু ঠিক ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে বিজয়ের সুন্দরী ছোটবোন যে আমার বউ হবে এটা কিন্তু বুঝতে পারিনি।
-- আসলেই আমাদের জীবনে আমরা পরিকল্পনা করি এক আর হয় আর এক।কারণ বিধাতা তো আগে থাকতেই সব ঠিক করেই রেখেছেন। সেখানে আমাদের ভাবনা-চিন্তা কেন কাজে আসবে?
-- মনেহচ্ছে আজকের রাতটা এখানেই থাকতে হবে। দুই মাসীমণি যা গল্প শুরু করেছেন তাতে একবেলায় শেষ হবে বলে মনেহয় না।
-- ওই মা সকলকে ডাকছেন চা খেতে। চলো এবার বেরোই। আনন্দি এখনো মনেহয় ওঠেনি। বাবা ভীষন দুষ্টু তোমার বোনটা।
-- আরে বোনের কানে একটু আমাদের সম্পর্কটা বলে দাও। দেখবে মা বাবাকে ওই ম্যানেজ করে ফেলেছে।
অনল হা হা করে হাসতে হাসতে হাসতে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।
সন্ধ্যায় সব একজায়গায় বসে চা আর তেলেভাজা খেতে খেতে ঠিক হয় আজ রাতে ফেরা হচ্ছে না সে কথাই বাড়িতে জানিয়ে দেওয়া হল।
একসময় সুস্মিতা অনলকে একা পেয়ে খুব আস্তে করে বললেন,
-- বাবা এবার তো আর জামাই যত্ন হল না। সেভাবে কথাও বলতে পারছি না। সবকিছু ঠিক হয়ে গেলে তখন জামাই যত্নটা করবো।
অনল একগাল হেসে বলল
-- বাবা এই যত্নের পরেও যত্ন আছে? আর সেটাকে জামাই যত্ন বলে?
-- কই আর যত্ন করতে পারছি বাবা। মনেহচ্ছে সবকিছুই আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। বৃথাই আমরা চিন্তা করি। সবই সেই তাঁর হাতে। আমাদের চিন্তা, চোখের জল ,ঈশ্বরের কাছে চাওয়া কিছুই কাজে আসে না। কারণ তিনি যা করবেন তা আগে থাকতেই তিনি লিখে রেখেছেন।
-- আমিও এই কথাটাই আপনার মেয়েকে বলছিলাম -
কথা শেষ হয় না দেখে আনন্দি এদিকেই আসছে। তাকে দেখেই অনল বলে উঠলো,
-- কিরে পাগলী, বাড়ি ফিরবি না আজ?
আনন্দি দাদার কাছে এসে দাদার একটা হাত ধরে আদুরে গলায় বলল,
-- দাদা বাড়িতে জানিয়ে দে না আজ রাতে আর বাড়ি ফিরছি না আমরা।
-- কেন রে ভালো লেগেছে জায়গাটা?
-- আরে ঘুমিয়েই তো অর্ধেক সময় চলে গেলো। কিছু দেখা হল না, কারও সাথে কথা হল না --
-- মাকে জানিয়ে দিয়েছি অনেক আগেই
সুস্মিতা ওদের কথার মাঝখানেই বললেন,
-- আমি রাতের রান্নার জোগাড়ে যাই।তোমরা কথা বল
-- আচ্ছা আপনারা কি বাঙাল?
-- হ্যাঁ কিন্তু কেন বলো তো
-- ওই যে আপনি বললেন না -" জোগাড়ে যাই" ওটা
মা'ও বলেন। মা বলেন খুলনা জেলার মানুষের ভাষা এটা।
-- তোমার মা খুলনা জেলার মানুষ? আমরাও তো তাই। দেখো আবার কোন সম্পর্ক বেরিয়ে যায়।
বলেই হাসতে লাগেন।
রাতে অনেক চেষ্টা করেও অনল কিংবা বিনীতা আর সুযোগ পায় না একান্তে কথা বলার। আনন্দি একেবারে আঠার মত লেগে আছে বিনীতার সাথে।
-- কিগো তুমি না বলেছিলে কী ঘটনা জানাবে তার তো কোন লক্ষণ দেখতে পারছি না
-- বলবো বলবো আজই বলবো সব। বলেছি যখন তখন না বললে কি ছাড়বে তুমি?
-- হেসো না, কিছু তো একটা আছে তোমার আর দাদার সাথে। মাথা ঘামিয়ে, চোখ কান খোলা রেখেও কিছুই বুঝতে পারছি না আসল ঘটনাটা কী?
-- ঘটনা একটু ঘোরালো। না বললে ঠিক বুঝবে না। রাতে শুয়ে আজ বলবো। তুমি গিয়ে আমার ঘরে বস আমি মাকে একটু রান্নায় সাহায্য করি।
-- ওককে ম্যাম
ওরা দু'জনেই হেসে যে যার কাজে চলে যায় - বিনীতা গিয়ে মায়ের কাছে রান্নাঘরে ঢোকে আর আনন্দি যায় বিনীতার ঘরে।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment