ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৮)
ময়ূর অবাক হয়ে অর্পণের দিকে তাকিয়ে। আজ অর্পণকে যেন আরও সুন্দর লাগছে। অর্পণ এমনিতেই খুব হ্যান্ডসাম। প্রচণ্ড গরম পড়েছে বলে আজ পাতলা একটা সাদা সার্ট পড়েছে। গায়ের রংয়ের সাথে যেন মিশে আছে।
-- কী হল গাড়ির কোন সমস্যা?
অর্পণ মনেমনে ভাবে "বেবী সমস্যাটা আমার গাড়ির নয় তোমার কথার। এত স্পষ্টভাবে ভালোলাগা পুরুষটির সামনে বারবার ভালোবাসার প্রমাণ দিলে গাড়ি তো কোন ছাড় ওই পুরুষটির হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবে। যত ছোট তোমায় ভেবেছিলাম তত ছোট তুমি নও। তোমাকে এড়িয়ে যাওয়া বোধহয় এ জীবনে আমার আর হল না।"
-- না গাড়ির কোন সমস্যা নয়। চা খাবে? নেমে এসো
-- না আমি চা খাবো না। তুমি খেলে তাড়াতাড়ি খেয়ে এসো। দেরি হচ্ছে বাড়ি যেতে হবে?
-- আরে বাবা আমি সাথে আছি তো। ঠিক পৌঁছে দেবো।
-- তোমার পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্ন নয়।
-- তবে
ময়ূর গভীরভাবে অর্পণের দিকে তাকায়। ময়ূরের চোখের দিকে তাকিয়ে অর্পণ সঙ্গে সঙ্গে চোখটা নামিয়ে নেয়। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে বাইরে থেকে ময়ূরের কাছে এসে দরজাটা খুলে দিয়ে বলে,
-- এসো কিছু খাই
-- আমি তোমায় ঠিক বুঝতে পারছি না বিশ্বাস করো। আমি কী চাই তুমি জানো কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না তুমি কী চাও?
-- কিচ্ছু চাই না। যা হচ্ছে তাকে আটকিও না। হতে দাও। তৃতীয় শক্তির উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এই অভাগাকে চা খাওয়ার একটু সঙ্গ দাও।
অর্পণের এই কথা শুনে ময়ূরের হাসি পেলেও সে গম্ভীরভাবে সিটবেল্ট খুলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। অর্পণ ওকে নিয়ে একটা কপিসফে ঢুকে গেলো। ময়ূর চুপচাপ।
বার্গার আর ধোঁয়া ওঠা কফি
-- আর কথা নেই? এত চুপচাপ কেন?
-- কী শুনতে চাইছো বলো? বারবার এককথা শুনতে বা বলতে ভালো লাগে না
-- যতটা ছোট তোমায় ভেবেছিলাম তুমি ঠিক ততটা ছোট নও। বুদ্ধিতে তুমি অতিশয় পাঁকা। উকালতিটা পড়লে নাম করতে পারবে।এতদিন তো এত কথা তোমার সাথে বলিনি তাই আমি বুঝতেও পারিনি তুমি এত সুন্দরভাবে এত স্পষ্ট কথা বোলো।
-- তুমি কি আমায় এখানে আনলে আমার গুণকীর্তন করার জন্য।
-- শোনো ময়ূর, রাগ কোরো না। একটা কথা বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমার চেয়ে বয়সে বারো বছরের বড়। আমার একটা অতীত আছে। আবারও যেকোন সময় এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। তুমি পাগলামি কোরো না। বিষয়টা একটু বোঝার চেষ্টা করো।
-- আমারও একটা অতীত আছে যেটা তুমি জানো। আর আমার সেই অতীত নিয়ে ঘাঁটতে গেছিলে বলেই ওই ঘটনাটা ঘটেছিল। আবার পুণরায় তারা আমাকে একইভাবে কিডন্যাপ করতেই পারে -
অর্পণের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। চোখদুটো পাকিয়ে ময়ূরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-- ফালতু কথা আর কোনদিনও বলবে না। আজই যেন এই কথা এখানেই শেষ হয়
-- কোনটা ফালতু আর মিথ্যে কথা
-- মিথ্যে কথা তো আমি বলিনি। আমি বলেছি কিডন্যাপের প্রসঙ্গ আর কখনোই তুলবে না।
ময়ূর হা করে অর্পণের দিকে তাকিয়ে। মনেমনে ভাবছে,
"হায় রে কঠোর পুরুষ! বুক ভেঙে গেলেও মুখে প্রকাশ করতে পারছো না? আমি বুঝে গেছি তুমিই হচ্ছ আমার জীবনের সেই স্বপ্নের পুরুষ।"
অর্পণ ওই একটি কথা বলে বিল মিটিয়ে হনহন করে বেরিয়ে এলো। আসবার সময় অবশ্য ময়ূরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-- এসো
ব্যাস অর্পণ আর কোন কথা বলল না যতক্ষণ গাড়ি চালানো। বাড়ির কিছুটা দূরে রাস্তার উপর ময়ূর গাড়ি থেকে নামলো। কেন কিসের জন্য ময়ূর ওখানে নামতে চাইলো অর্পণ একবারের জন্যও জানতে চাইলো না। ময়ূর নামার সময় শুধু বলল,
-- সাবধানে যেও।
ময়ূর নামার পর গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। সবে লাইটপোস্টগুলোতে রাস্তায় আলো জ্বলে উঠেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। অর্পণের গাড়িটার টেইল লাইট যতক্ষণ দেখা গেল, ততক্ষণ তার চোখ সেদিকেই আটকে রইল। যেন আলোটা মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের ভেতরেও একটা শূন্যতা তৈরি হল।
ময়ূর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
--এতটা দূরত্ব কেন রাখো তুমি অর্পণ? কাছে এসে আবার নিজেই সরে যাও। কেন মন খুলে মনের কথাগুলো বলতে পারছো না? বয়সের ডিফারেন্স কী সত্যিই তোমার সাথে আমার অনেকটা? শুধুমাত্র কারণ কি এই একটাই? নাকি অন্য কোন কারণ আছে?
ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল সে। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা অন্যরকম। অর্পণের চোখের সেই এক মুহূর্তের দৃষ্টি—ঠান্ডা, নির্লিপ্ত, অথচ গভীরে যেন একটা ঝড়—ওটা সে ভুলতে পারছে না।
ওদিকে অর্পণ গাড়ি চালাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন আর স্টিয়ারিংয়ে নেই।
হঠাৎ করেই ব্রেক কষে গাড়িটা রাস্তার এক পাশে দাঁড় করাল সে।
স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে মাথাটা একটু নিচু করে ফিসফিস করে বলল, "কেন এলে আমার জীবনে তুমি, ময়ূর? তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েও ফেরাতে পারছি নাতো আমি? বারবার জড়িয়ে যাচ্ছি তোমার সাথে আমি। তোমাকে না দেখতে পেলে আমারও যে ভালো লাগছে না। আমি তো তোমাকে নিয়ে কখনোই ভাবিনি। মাত্র কয়েকটা মুহূর্তের দুর্বলতায় কেন তোমায় নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি আমি? তোমার প্রতি যে দুর্বার আকর্ষণ সেই রাতে ছাদে বসে কথা বলার পর থেকে আমি অনুভব করছি তার থেকে আমি কিভাবে বেরোব?"
তারপর নিজেই একটু হেসে উঠল "মেয়েটা সত্যিই একটা পাগলী। এই পাগলীর হাত থেকে মুক্তি কীভাবে পাবো?"
"সত্যিই কি আমি ওর থেকে মুক্তি পেতে চাইছি? তাহলে আজ ও যখন বলল বাসে চলে যাবে তখন কেন জোর করে ওর সাথে এতটা সময় কাটালাম?" ক্রিমিনাল কোর্টের ডাকসাইটে উকিল অর্পণ মজুমদারের ক্যালকুলেশন ঠিক হচ্ছে না। হেরে যাচ্ছে সে। কিন্তু চেষ্টা করতেই হবে। বয়সের এত ব্যবধানে জীবনটা জড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতটা সুখের নাও হতে পারে।
কিন্তু যতই নিজেকে বোঝাতে চাইছে, ততই যেন ময়ূরের মুখটা সামনে ভেসে উঠছে।তার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা, তার চুপচাপ এতদিন ধরে ভালোবেসে যাওয়া যা সে কখনোই স্বপ্নেও কল্পনা করেনি ময়ূরের তার প্রতি এই দুর্বলতার কথা।
অর্পণ চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
-- দূরে থাকাই ভালো। ওর জন্যও, আমার জন্যও। কিন্তু সত্যিই কি বারো বছর ডিফারেন্স একটা মারত্মক কিছু?
অর্পণের মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চোখের উপর শুধু ময়ূরের মুখ। পাগল হয়ে যাবে সে এই মেয়েটার পাগল করা ভালোবাসায়।
গাড়িটা আবার স্টার্ট দিল সে। কিন্তু এবার গতি একটু কম। যেন কোথাও পৌঁছানোর তাড়া নেই আর।
এদিকে ময়ূর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই বিছানায় বসে পড়ল। তার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি।
"তুমি হেরে যাচ্ছ অর্পণদা। নিজেকে আড়াল করতে পারছো না।তুমি যতই দূরে যাওয়ার চেষ্টা করো পারবে না কারণ আমি সেটা করতে দেবো না। আমি কিন্তু থামবো না অর্পণদা কারণ আমি বুঝে গেছি তুমিও আমায় ভালোবাসো। মুখে স্বীকার করছো না কিন্তু তোমার আচারআচরণ আর স্বীকার না করার নীরবতাই তোমার স্বীকারোক্তি।"
জানলার বাইরে তাকিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে রইল সে। দূরে একটা তারা ঝিলমিল করছে।
ময়ূর ধীরে ধীরে বলল,
"একদিন তুমি নিজেই আমার কাছে এসে সবকিছু স্বীকার করবে। আমি অপেক্ষা করবো। কিন্তু এই অস্থিরতা নিয়ে কাজে মন দিতে পারবে তো? পারবে না,কিছুতেই পারবে না। এই কেসটাই তুমি ডাহা হেরে গেলে।"
ময়ূরের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে চোখ বন্ধ করে অর্পণের প্রতি তার ভালোবাসার অনুভবে সিক্ত হতে থাকে।
ময়ূর ঠিক করে যতদিন না অর্পণ তার ভালোবাসার কথা তাকে মুখ ফুটে বলছে ততদিন সে তাদের বাড়ি যাবে না। সেও দেখতে চায় অর্পণ কতদিন মুখ বন্ধ করে থাকতে পারে।
ফ্রেস হয়ে জামাকাপড় পাল্টে মায়ের কাছে যায়। সেখানেই বাবা বসে। ওকে দেখতে পেয়ে বাবা বললেন,
-- কার গাড়ি করে আসলি?
যে কারণে বাড়ির সামনে নামেনি ঠিক সেই কথাটাই বাবার কানে চলে এসেছে
-- অর্পণদার। রাস্তায় দেখা হল তাই পৌঁছে দিয়ে গেলো।
-- ওহ্।তুই তো একটা উবের ধরেই চলে আসতে পারতিস
-- অর্পণদা তো ভালো মানুষ বাবা।
-- সে আমি জানি। কিন্তু লোকে তো আর ভালোভাবে নেয় না
-- তুমি তো জানো বাবা লোকের কথাই আমার কিচ্ছুটি যায় আসে না
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment