সঙ্গে সঙ্গে মামী ওকে জানান
-- তুই ওকে কীকরে চিনবি রে! ও হচ্ছে আমার ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে। সেই ছোটবেলায় ওকে দেখেছি।শিলিগুড়িতে ওর সাথে দেখা। মুখটা খুব চেনা চেনা লাগছে দেখে নিজেই এগিয়ে গিয়ে এয়ারপোর্টে ওর সাথে কথা বলি। তারপর ওকে সাথে নিয়েই এখানে আসলাম। এবেলাটা ও থাকবে। বিকেলবেলা একটা গাড়ি বুক করে ওকে আমি নিজে গিয়ে পৌঁছে দেবো। আসলে ওর মায়ের সাথে দেখা করাটাই আমার মূল উদ্দেশ্য।
আনন্দি মেয়েটির পাশে বসে জানতে চাইলো
-- আমরা সমবয়সীই হবো হয়ত। তাই তুমি করেই বলছি।
-- আমি আনন্দি তোমার নাম কী গো?
-- আমি বিনীতা। শীলীগুলি আমি টিচারি করি। বাড়ি কলকাতার কাছেই। তবে একটু গ্রামের দিকে। প্রায় তিনমাস পরে বাড়ি ফিরছি। স্কুলে দিন সাতেকের ছুটি পড়েছে। মাসিমনি কিছুতেই ছাড়লেন না। তাই আসতে বাধ্য হলাম। বাড়ি যাওয়ার জন্য মনটা আকুপাকু করছে।
-- খুব ভালো হয়েছে এখানে আসলে বলেই তো তোমার সাথে পরিচিত হতে পারলাম। তুমি আমার ঘরে চলো। মামা আর মায়ের কথা শেষ হবে না। একটু ফ্রেস হয়ে নেবে চলো।
বিনীতা উঠে আনন্দির সাথে তার ঘরে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে একটু হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে এলো। তারপর কিছুক্ষণ একথা সেকথার পর বিনীতা উঠে গিয়ে দেওয়ালে টাঙ্গানো ওদের পরিবারের বাঁধানো ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটা ছবিতে গিয়ে চোখ আটকে গেলো। একি! কে এ? আমি এখানে কাকে দেখছি? নানা এটা কিভাবে সম্ভব? নিশ্চয়ই আমার কোন ভুল হচ্ছে। একদৃষ্টে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে বিনীতা। আনন্দি সেটা দেখতে পেয়ে বলল,
-- এই ছবিটাতে আমরা দুই ভাইবোন আর মা,বাবা। এটা আমার দাদা। এই কয়েকমাস হল দাদা চাকরি পেয়েছে।
ঠিক এই সময় আনন্দির মা খেতে ডাকলেন। বিনীতার মাথায় কিছুই ঢুকছে না কী হচ্ছে ওর সাথে এসব? হঠাৎ করে ও এখানে এসে উপস্থিত হল কীভাবে? সত্যিই কি আমাদের সবকিছু বিধাতার হাতে? আমাদের হাতে কিছুই নেই? এবার কি তার জীবনের জট খুলতে চলেছে? নাকি কোন অশনিসংকেত আসতে চলেছে?
বিনীতাকে হাত ধরে টেনে আনে আনন্দি কারণ বিনীতাকে দু'বার ডাকার পরেও সে অন্যমনস্কভাবে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল।
খাওয়ার টেবিলে বসতেই আনন্দির মা হেসে বললেন,
— এসো মা, এতক্ষণ গল্প করছিলে বুঝি? চল, আগে খাওয়া হোক, তারপর আবার গল্প করা যাবে।
বিনীতা বুঝতে পারে উনি অনলের মা। কোথায় যেন একটা ভয় বিনীতার ভিতরে কাজ করতে লাগলো। তবুও বিনীতা মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
— হ্যাঁ আনন্দির সাথে গল্প করে খুব ভালো লাগলো।
উনি প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বললেন,
— ভালো লাগবেই তো! আনন্দির তো কথার শেষ নেই। কথা বলার লোক পেলেই বকবক করে তার মাথা খারাপ করে দেয়।
আনন্দি একটু অভিমানী গলায় বললো,
— এই যে! এসব বলবে না তুমি। ভালো মানুষেরা একটু বেশি কথা বলে। তার ভিতর কোন প্যাঁচ থাকে না।
সবাই হেসে উঠলো।
খাওয়া শুরু হতেই আনন্দি আবার বিনীতার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো,
— তোমার স্কুলটা কোথায় বললে?
— শিলিগুড়ির একটু বাইরে। ছোট্ট একটা গ্রাম, কিন্তু খুব সুন্দর। বাচ্চাগুলোও খুব মিষ্টি।
— তোমার কি বাড়ি খুব মনে পড়ছে?
বিনীতা একটু থেমে বললো,
— হ্যাঁ… খুব। আসলে এতদিন পরে ফিরছি তো… মা-কে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। জানিয়েছি মাসীমণি জোর করে নিয়ে এসেছেন। যেতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তবুও কেমন যেন লাগছে।
তার চোখের কোণে যেন হালকা জল চিকচিক করে উঠলো, কিন্তু সে সামলে নিলো।
মামী সেটা লক্ষ্য করে বললেন,
— আরে বাবা, এত মন খারাপের কী আছে? একটা বেলা এখানে থাক, বিকেলে তোকে ঠিক পৌঁছে দেবো। তোর মাকে তো আমি সেকথা বলেই দিয়েছি। কিচ্ছু হবে না।
— জানি মাসীমণি… তবুও…
আনন্দি সঙ্গে সঙ্গে হাতটা ধরে বললো,
— আচ্ছা শোনো, একদম মন খারাপ কোরো না। আমরা দুপুরে অনেক গল্প করবো, তারপর ছাদে গিয়ে আমার বাগান দেখাবো। মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা তো। ও দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
ছবিটা দেখার পর থেকে বিনীতার বাড়ি ফেরার তাড়ার থেকেও অনল কখন আসবে, কখন তার সাথে দেখা হবে, সে বিষয়টাকে কীভাবে ম্যানেজ করবে এগুলোই ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তার মনেহচ্ছে যদি তাকে কেউ আজ এখানে থেকে যেতেও বলে সে থেকে যাবে। জীবনের সবচেয়ে জট পাকানোর বিষয়টার একটা, দুটো জট যদি খুলতে পারে।
বিনীতা একটু হেসে বললো,
— ঠিক আছে, দেখি তুমি কতটা পারো!
খাওয়া শেষ হতেই সবাই একটু বিশ্রাম নিতে গেল। আনন্দি কিন্তু ছাড়ার পাত্র নয়। সে বিনীতাকে টেনে নিয়ে নিজের ঘরে গেল।
ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে বললো,
— এবার বলো, ওই ছবিটার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলে কেন? দাদাকে চেনো নাকি? নাকি দাদাকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেলে?
কথাটা বলেই হাহা করে হেসে উঠলো।
বিনীতা চমকে উঠলো, এ মেয়ের মুখে তো কিছুই আটকায় না। মনেমনে নিজেকে সংযত করে নিজের মনে নিজেই বলল," বিনীতা খুব সাবধান। বেফাঁস কিছু বলে ফেলে ধরা পড়ে যেও না।"
— এ বাবা! কিসব প্রশ্ন? আসলে ছবিটা খুব সুন্দর উঠেছে। ব্যাকগ্রাউন্ডটাও খুব সুন্দর। এটাই মনেহচ্ছে ছাদের ফুলের বাগান তোমার।
-- হ্যাগো ছাদে তোলা এটা। তবে শোনো আমি সাইকোলজি নিয়ে পড়ছি। মানুষের মন বুঝতে পারি।
তাই খুব তাড়াতাড়ি মানুষ চিনতে পারি। তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা আছে ব্যাপার। কী ব্যাপার বলো তো?
বিনীতা একটু চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো,
— একজন মানুষের সাথে তোমার দাদার চেহারার খুব মিল। তাই দেখছিলাম আর কি!
আনন্দির চোখ বড় হয়ে গেলো,
— ওহ্! মানে গল্পটা ইন্টারেস্টিং!
— ইন্টারেস্টিং না… একটু জটিল।
— নামটা বলবে কে সেই মানুষটা?
বিনীতা জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। দূরে রোদের আলো পড়েছে, হালকা বাতাস বইছে। সেই দিকে তাকিয়েই আস্তে করে বললো,
— অনেকদিন আগের কথা তো নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। আরে ছাড়ো এসব আমরা অন্য কথা বলি।
আনন্দি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো। সে বুঝতে পারলো, এই নামটা না বলার মধ্যে অনেক না বলা কথা লুকিয়ে আছে। প্রথমদিনেই বেচারাকে আর ঘাটা ঠিক হবে না।
-- আমার পেট থেকে তো কথা বের করে চলেছ। এবার নিজের কথা কিছু বলো তো -
-- আমার কথা? কী জানতে চাও বলো। আচ্ছা আমিই বলছি। আপাতত জীবনে কেউ আসেনি। আসার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ 'নো এন্ট্রি ' সাইন বোর্ড ঝুলানো আপাতত। কারণ নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে চলার ইচ্ছা একদম নেই।
-- তুমি দারুন কথা বলো।
-- থ্যাঙ্ক ইউ,থ্যাঙ্ক ইউ ।তবে কী জানো আমার মতে জীবনে বিয়েটাই শেষ কথা নয়।
-- কথাটা সত্যি হলেও মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে পরিবারের মানুষজন ভাবে মেয়েকে বিয়ে দিতেই হবে।
প্রতিটা মুহূর্তই বিনীতা ভাবছে আনন্দি হয়ত ওর দাদার কোন প্রসঙ্গ তুলবে কিন্তু আলোচনাটা সেদিকে টাইতেই পারছে না। হঠাৎ আনন্দি বলে উঠলো,
-- আমি তো দাদাকে বলেই দিয়েছে তোর ইচ্ছে হলে তুই বিয়ে কর, সংসার কর আমার দ্বারা ওসব হবে না। আমি আমার মা,বাবা যতদিন বাঁচবেন তাঁদের কাছেই থাকবো।
-- শুনে দাদা কী বললেন?
-- আমার দাদার জীবনে বিয়ে,সংসার,সন্তান অনেক স্বপ্ন। বিয়ে নিয়ে যে সে কত স্বপ্ন দেখে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
-- তোমার নাম তো আনন্দি । তোমার দাদার নামটা কী?
-- দাদার নাম অনল।
বিনীতার বুকের ভিতর ধক করে উঠলো। ঈশ্বরের কী লীলা দেখো। ঈশ্বর ঠিক তাকে সঠিক জায়গায় এনে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু কীভাবে এখন অনল এসে সবটা ম্যানেজ করবে? আজই সব সে বলে দেবে নাকি? একটা আশা আর অনেকটা ভয় মিলিয়েমিশিয়ে বিনীতা অপেক্ষা করে আছে কখন অনল ফিরবে।
বিকেলের রোদ তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেটা ভাবলেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু হঠাৎ করে এই বাড়িতে উপস্থিত হওয়াটা যেন নতুন করে কিছু শুরু করার ইঙ্গিত দিচ্ছে… হবে কি জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে কাছে পাওয়ার অবসান? সে কি সেই দিনের কথা মনে রেখেছে? দিনান্তে একবারও কি সেই বিনীতা মেয়েটার কথা তার মনে পড়ে। পাবে কি সে আজ সব প্রশ্নের উত্তর?
ক্রমশ…
No comments:
Post a Comment