ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৯)
মলয়বাবু রাস্তাতেই ছিলেন। তারই সমবয়সী একজন ময়ূরকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে ব্যঙ্গের ছলে হাতের ইশারায় ময়ূরকে দেখান। ময়ূর তার বাবাকে দেখেনি কারণ তিনি একটু দূরেই ছিলেন। তিনি নিজেও জানেন লোকজনের কথা তার মেয়ে পাত্তা দেয় না। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর মেয়েকে কেউ কিছু বললে তিনি তো কষ্ট পাবেনই।
মলয়বাবু একটু আড়ালেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুখে হালকা হাসি থাকলেও ভিতরে ভিতরে কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছিল তাঁর। সমবয়সী এক ভদ্রলোক ময়ূরকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে চোখ টিপে, ঠোঁট বেঁকিয়ে ইশারায় কিছু বলতে চাইলো—সে ইঙ্গিতের ভাষা খুব পরিচিত, খুবই কটু।
মলয়বাবুর বুকটা যেন হালকা কেঁপে উঠল।
আমার মেয়েকে নিয়ে এভাবে ভাবছে?
মনে মনে যেন একটা চাপা আগুন জ্বলে উঠল।
তিনি জানেন, ময়ূর এমন মেয়ে নয় যে এসব কথায় ভেঙে পড়বে বা কারও মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের চলা বদলাবে। ছোটবেলা থেকেই সে নিজের মতো—স্বাধীন, দৃঢ়, নিজের সিদ্ধান্তে অটল। লোকের কথায় তার কিছু যায় আসে না।
তবুও নিজের মেয়ে সম্পর্কে কেউ কিছু বললে খারাপ তো লাগবেই।বাবা তো!
মেয়েকে নিয়ে কেউ কটু ইঙ্গিত করলে সেই আঘাতটা নিজের ওপরেই এসে লাগে।
এক মুহূর্তের জন্য মলয়বাবুর ইচ্ছে হলো লোকটাকে দু’কথা শোনান। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। রাস্তাঘাটে এসব নিয়ে কথা বাড়ালে সম্মান কমে, বাড়ে না এই বোধটুকু তার বহুদিনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা। আর তিনি তার মেয়েকে ভালোভাবেই চেনেন। এসবে সে পাত্তায় দেয় না। বরং বাবা এর প্রতিবাদ করলে আর তার কানে সে কথা গেলে সে আরও ক্ষেপে যাবে।
তিনি শুধু একবার গভীর দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে ছিল নীরব প্রতিবাদ, অস্বীকৃতি আর একরাশ অসন্তোষ। এত নিম্ন রুচির মানুষটির সাথে তিনি এতদিন মেলামেশা করেছেন ভেবে নিজেকেই নিজের কাছে ছোট মনেহল।
মলয়বাবুর রূহ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে লোকটা একটু থমকালো, তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল।
মলয়বাবু ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।
ময়ূর তখন নিশ্চিন্তে হাঁটছে, কিছুই টের পায়নি—নিজের মতো, নিজের জগতে।
মলয়বাবুর মুখে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
যা-ই বলুক লোকজন আমার মেয়েটা ঠিক আছে। নিজের মতোই ঠিক আছে।
এই বিশ্বাসটাই যেন তাকে নিশ্চিন্ত করে দিলো।
তিনি আর বিশেষ কিছু এই প্রসঙ্গে মেয়ের কাছে জানতে চাইলেন না। শুধু বললেন,
-- কী ভাবছিস ভবিষ্যৎ নিয়ে? এমাসেই তো রেজাল্ট বেরোবে ।আজকের পরীক্ষাটা কেমন হল?
-- হ্যাঁ বাবা ভালো হয়েছে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। ওদের কোম্পানিতে চাকরি হলে ব্যাঙ্গালোর গিয়ে থাকতে হবে মানে ওখানেই পোস্টিং হবে
অন্নপূর্ণাদেবী যেন আতকে উঠলেন, সে কী ? একা কীকরে অতদূরে গিয়ে থাকবে?
-- আগে তো চাকরি হোক তারপর নাহয় ভাবা যাবে
মলয়বাবু বললেন।
রাতে অর্পিতার ফোন।
-- কিরে তোর তো বন্ধুত্ব আমার সাথে। তাহলে দাদার সাথে ঝামেলায় এখানে আসা বন্ধ করলি কেন?
-- কী যা তাই বলিস। অর্পণদার সাথে আমার আবার কখন ঝামেলা হল?
-- বুঝি বুঝি সব বুঝি ইয়ার শুধু না বোঝার ভান করে থাকি।
-- তোর মাথাটাই গেছে বোধহয়। সময় পাচ্ছি না। চাকরির চেষ্টা করছি রে। কিছু না করলে আর হচ্ছে না রে। বাবা অনেকদিন আগেই তো রিটায়ার করেছেন। প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এককালীন যা টাকা পেয়েছেন পেনশন তো নেই। এখন ওই টুকটাক টিউশন পড়িয়ে আর কটা টাকাই বা পান। আমিও বা টিউশনি পড়িয়ে কিইবা পাই। ফাইনাল পরীক্ষার আগে তো সব টিউশন ছেড়েই দিয়েছিলাম। নতুন করে পেতে আবার তো একটু সময় দিতে হবে।
-- শোন না নলিনী ফোন করেছিল। আবার ওদের ওখানে যেতে বলছে। এই একটা সুখবর আছে রে! নলিনী প্রেগন্যান্ট।
-- ওমা তাই? তাহলে তো একদিন যেতেই হবে ওদের বাড়ি।
-- ওদের বাড়ি যাওয়ার আগে একদিন আমাদের বাড়ি আয়
-- হ্যাঁ যাবো সময় পেলে
-- কাল তো রবিবার। কাল একবার আয় না দাদা বাড়ি থাকবে তো
-- এই আমি কি তোদের বাড়িতে তোর দাদার জন্য যাই
-- না না আমি কি সে কথা বললাম? আমি তো অন্ধ কিছুই দেখি না আবার মাঝে মাঝে কালাও হয়ে যাই কিছুই শুনি না
অর্পিতা হাসতে থাকে।
-- বোকার মত হাসছিস কেন?
-- আচ্ছা ঠিক আছে বুদ্ধিমানের মত না হেসেই বলছি কাল দুপুরে এসে এখানে খাবি কিন্তু। সেদিন তুই কিছুই খাসনি।
-- আরে না, যদি যাই তাহলে খেয়েদেয়ে বিকেলে যাবো। তবে যাবো কিনা কিন্তু কনফার্ম না।
-- হ্যাঁ হ্যাঁ কনফার্ম। কাল তুই আসছিস এবং দুপুরে এসে খাচ্ছিস।
অর্পিতা ফোন কেটে দেয়। ময়ূরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই।
ময়ূর গিয়ে মাকে জানিয়ে আসে কাল অর্পিতাদের বাড়িতে দুপুরে খাবে। মেয়ে যে মাঝে মাঝেই তার বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে খায়, থাকে এটা নিয়ে তাদের কোন বক্তব্য নেই। তাও অন্যের বাড়িতে খেলে মেয়েটা একটু ভালোমন্দ খেতে পারে। তাছাড়া তাঁরা জানেন ওই বাড়ির সকলেই ময়ূরকে খুব ভালোবাসে।
সকাল এগারোটা নাগাদ ময়ূর বেরিয়ে পড়ে অর্পিতাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগে ওর সেখানে পৌঁছাতে। আজ অনেকটা সময় লেগে যায় জ্যামের কারণে। প্রায় একটা নাগাদ গিয়ে পৌঁছায়। রবিবার অর্পণ বাজার করে থাকে সাধারণত। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে সে জানে না অর্থাৎ অর্পিতা তাকে বলেনি যে ময়ূর আজ আসবে।
-- কিরে এত দেরি হল যে?
-- আরে রবিবার তাও রাস্তায় জ্যাম।
--কতদিন পর আসলি বল তো?
-- বাড়িটা খুব একটা কাছে নয় রে
-- কিন্তু আগে তো প্রায়ই আসতিস
--আগে আসতাম বলে কি সেটাকেই ধরে রাখতে হবে? তুই কতদিন গেছিস আমাদের বাড়িতে?
ময়ূর গিয়ে অর্পিতার ঘরে বসেই কথা বলছিল। কিন্তু তার কানটা ছিল খাড়া। কিন্তু অর্পণের কোন সাড়াশব্দ সে পায় না
অর্পিতার মা খাবার রেডি করে সকলকে টেবিলে ডাকেন।
এদিকে অর্পণ তার নিজের ঘরে স্নান করে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মায়ের ডাক তার কান অবধি পৌঁছায়নি। অর্পিতা গিয়ে দাদাকে ডেকে আনে। অর্পণ এসে ময়ুরকে দেখে চমকে যায়। স্বাভাবিকভাবেই সে জানতে চায়
-- অনেকদিন পর তোমায় দেখলাম
ময়ূর বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি দিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লো খেতে।
অর্পিতার মা জানতে চাইলেন,
-- হ্যাঁরে ময়ূর তুই এখন আর আসিস না কেন আগের মত।
-- চাকরির চেষ্টা করছি মাসিমা। বাড়িতে থেকে একটু পড়াশুনার চেষ্টা করছি।
-- যখন কলেজে পড়ছিলি তখন তো প্রায়ই আসা যাওয়া ছিল। তার থেকেও কী চাকরির পরীক্ষায় বেশি করে পড়তে হচ্ছে।
অর্পিতার মায়ের কথায় সবাই হেসে দেয়।
অর্পণ আড়চোখে মাঝে মাঝে ময়ূরকে যে দেখে চলেছে সেটা অর্পিতার নজর এরাচ্ছে না। কিন্তু ময়ূর আজকে ইচ্ছাকৃত ভাবেই অর্পণের দিকে একবারও ভুলেও তাকায়নি।
-- দাদা তোর আজকে বিকেলে বেরোনো আছে নাকি?
-- হঠাৎ এই প্রশ্ন? কেন বলতো?
-- আরে কাজ আছে বলেই তো জানতে চাইলাম
-- কী কাজ?
-- বেরোনো থাকলে বলতাম
-- না আমার আজ কোথাও বেরোনো নেই। বাড়িতেই আছি।
-- না বলছিলাম তুই যদি কাজে বেরোস তাহলে এই বাস রাস্তাটা অন্তত বাইকে ময়ূরকে এগিয়ে দিয়ে আসতে পারতিস।
ময়ূর অর্পিতার দিকে তাকিয়ে পড়লো। অর্পিতার মুখে দুষ্টু হাসি। কিন্তু ময়ূর সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
-- না না আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে হবে কেন? আমি কি একা যাতায়াত করি না? যতসব উদ্ভট উদ্ভট পরিকল্পনা। অর্পণের বুঝতে একটুও বাকি থাকলো না তার বোনও এই সম্পর্কটা গড়ে উঠুক সেটা চাইছে।
-- সে পরে দেখা যাবে। এখন তো খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবো। কখন বেরোবে তুমি?
অর্পণের কথার উত্তরে ময়ূর বলল,
-- আমি আমার সময়মত বেরোব আর আমি একাই যাবো।
ময়ূরের কথার কেউ কোন উত্তর দিলো না। কিন্তু অর্পণ সুযোগ পেয়ে ময়ূরকে খুব আস্তে বলল,
-- কেন আমার সাথে গেলে আমি খেয়ে ফেলবো নাকি?
আমার সাথে বাইকেই তোমায় যেতে হবে।
ময়ূরও খুব আস্তে বলে,
-- না তা আমি যাবো না। সব তোমার ইচ্ছামত চলবে নাকি? এতদিন তো একাই যাতায়াত করেছি। কোনদিন তো পৌঁছে দাওনি। আজ হঠাৎ কী হল যে পৌঁছে দিতে চাইছো তাও বাইকে?
ক্রমশ
--
No comments:
Post a Comment