ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩১)
বিনীতার গলা ধরে আসে। চোখের কোণে জল। হাত দিয়ে জলটা মুছে নেয়। আনন্দি হা করে তার মুখের দিকে তাকানো। এত হাসিখুশি মেয়েটার জীবনে কী এমন ঘটেছিল যে কথা মনে করতে গেলে গলা ধরে আসছে, চোখের থেকে জল ঝরছে।
বিনীতা আবার শুরু করে ঠিক সেই মুহূর্তে মামা ফোন করে জানান " কিছু দুষ্কৃতকারী বর গাড়িতে ওঠার সময় একদম সামনের থেকে গুলি করে বাইকে উঠে পালিয়ে গেছে। সকলেই। ভেবেছিল স্পট ডেড। কিন্তু কয়েকমাস কোমায় থেকে সে এখন সুস্থ আছে ঈশ্বরের আশীর্বাদে।"
-- অ্যা সেকি! সেখানে তো প্রচুর লোক ছিল কেউ তাদের ধরতে পারেনি?
-- ঘটনার আকস্মিকতায় সকলে হতভম্ব হয়ে যায়। ঘটনাটা ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। যখন সকলের সম্বিৎ ফেরে অপরাধী নাগালের বাইরে।
বিনীতা চুপ করে যায়। আনন্দিও চুপ করে বসে। কারও মুখে কোন কথা নেই। শুধু রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকে মত দু'জনেরই চোখের সামনে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুটা সময় এভাবেই কেটে যায়।
এরপর আনন্দি জানতে চায়
-- তারপর
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বিনীতা বলতে শুরু করে,
-- দাদার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়েছে। মা সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছেন।
-- আর তুমি?
-- আমি নির্বাক, স্থবির!
অনেক ভেবে দাদা ঠিক করে এই মুহূর্তে যদি আমার বিয়ে দিতে না পারে তাহলে আমি লগ্নভ্রস্থা হবো। কিন্তু উপযুক্ত পাত্র কোথায়?
শেষমেষ গিয়ে তোমার দাদা অনলকে বলে আমায় বিয়ে করতে।
অনল কিছুতেই রাজি হয় না। সে তার জায়গায় দাঁড়িয়ে যা বলে তার কোনটাকেই অস্বীকার করা যায় না। সে সবেমাত্র চাকরি পেয়েছে, মা,বাবার তার বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন, তার নিজের স্বপ্ন, তার একটা ছোট বোন আছে তার হায়ার স্টাডি, বিয়ে -- সব মিলিয়ে মিশিয়ে সে এই বিয়েটা করতে অপারগ। দাদা তখন কী করবে কিছুই বুঝতে না পেরে তোমার দাদাকে বলে,
-- যেহেতু বাড়িতে আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী রয়েছে তাই বিয়েটা হোক শুধুমাত্র লোক দেখানো।
-- তুমি কিছু বললে না তোমার দাদা এই কথা বলার পর
-- হ্যাঁ বলেছিলাম তবে তোমার দাদা রাজি হওয়ার পর।
-- দাদা কোন শর্ত রেখেছিল?
-- হ্যাঁ রেখেছিল। বলেছিল এইমুহূর্তে সে আমায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবে না।
-- সারাজীবনই ওই বুদ্ধি নিয়েই চললো
আনন্দির মুখ থেকে খুব আস্তে কথাগুলি বেরিয়ে যায়
-- কিছু বললে?
-- না না কিছু বলিনি। তুমি বলো তারপর কী হল
-- আমি তোমার দাদাকে ডেকে শুধু বলেছিলাম তার ইচ্ছা না থাকলে সে যেন কারও কথাই প্ররোচিত হয়ে বিয়ে করতে রাজি না হয়। আর সত্যিই যদি বিয়েটা হয় তাহলে সে না চাইলে আমি কোনদিন আমার অধিকার দাবি করবো না। সেই শর্তেই বিয়েটা হয়। আমি কোনদিনও তাকে ফোন করিনি সেও করেনি।
-- তাহলে দাদা বিয়ে করে তোমায় এখানে রেখে চলে গেলো?
-- বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান সব মেনেই সিঁদুর দান হলো।
সুতরাং আমার দিক থেকে আমি এই বিয়েটা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারলাম না। তোমার দাদার মঙ্গলার্থে আজও সকলের অলক্ষ্যে আমি সিঁদুর পরি। কিন্তু আমি সেইভাবেই নিজেকে তৈরি করে নিয়েছিলাম তোমার দাদা নিজের থেকে এগিয়ে না আসলে আমি কোনদিনও তোমার দাদাকে ফোন কিংবা তার সামনে দাঁড়াবো না।
-- তারপর দেখা আমাদের বাড়িতে?
-- হ্যাঁ। বিয়ের দু'দিন আগে আমি চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট হাতে পাই শিলিগুড়ি পোস্টিং। বিয়ের পর এমনিতেই আমাকে সেখানে চলে যেতে হত। যেহেতু তোমার দাদা আমায় সঙ্গে নিতে চায়নি আমার দাদা ঠিক করলেন শুধুমাত্র সকলকে বোঝাতে ওইদিন একসাথেই আমরা বাড়ি থেকে বের হবো আমরা যাবো শিলিগুড়ি আর তোমার দাদা একাই যাবে বাড়ি। তাতে সকলে অন্তত ভাববে আমি শ্বশুরবাড়ি গেলাম। সেইমত সেদিন বেরোনো হল।
-- কতকিছু ঘটে গেছে তোমাদের জীবনের উপর দিয়ে। সেইজন্যই দাদা বাড়িতে ফিরে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছিলো। আমি অনেকবার বিয়েবাড়ির গল্প শুনতে চেয়েছি। বলবে বলবে বলেও কিছু বলেনি।
আনন্দি ধীরে ধীরে বিনীতার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে চাপা গলায় বলল,
— বিনীতা এখন অবশ্য তোমার নাম ধরে আমার ডাকা ঠিক নয়। তুমি আমার বৌদি … তুমি এতদিন একা একা এসব সহ্য করেছো?
বিনীতা হালকা হেসে মাথা নাড়ল,
— এই মুহূর্তে আমায় বৌদি বলে ডেকো না। আগে তোমাদের বাড়ির সকলে জানুক আমায় মেনে নিক তারপর নাহয় ডেকো। আর কী জানো আমি একা তো ছিলামই। তবে নিজের সিদ্ধান্তে ছিলাম, তাই অভিযোগ করারও অধিকার ছিল না। সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। বিশ্বাস ছিল ঈশ্বরের উপর।
আনন্দির চোখে জল এসে গেল,
— কিন্তু দাদা? দাদা কি একবারও… একবারও তোমার খোঁজ নেয়নি?
বিনীতা একটু চুপ করে থেকে বলল,
— হয়তো নিয়েছিল… নিজের মতো করে আমার দাদার কাছ থেকে। তবে সরাসরি নয়।
— মানে?
— মানে মাঝে মধ্যেই আমার দাদার সাথে কথা হত ফোনে। তখন আমায় নিয়েই আলোচনা বেশি করতো তোমার দাদা। কিন্তু আমায় কোনদিন ফোন করেনি সে। যদিও আমিও কোনদিন ফোন করিনি তাকে।
আনন্দি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল,
— দাদা এমন! বাইরে থেকে যতটা কঠিন, ভিতরে ততটাই নরম…
বিনীতা মৃদু হেসে বলল,
— আমি কথা বলেই বুঝতে পেরেছিলাম ও খারাপ মানুষ নয়। তাই তো … (একটু থেমে) সেদিন তোমাদের বাড়িতে ওর ছবি দেখে যখন বুঝতে পারি এটা আমার শ্বশুরবাড়ি আর তোমার দাদা ফিরে যখন বলল, "আজ কেউ কোথাও যাবে না -" তখনই বুঝেছিলাম ও কী চায়।
আর তাই তো কোন কথা না বলেই থেকে গেছিলাম সেদিন রাতে।
-- তারপর কথা হয়েছিল দাদার সাথে আমাদের বাড়িতে?
-- না সেদিন রাতে হয়নি কিন্তু পরদিন ভোরে হয়েছিল।
-- এখন তোমরা কী চাইছো? আমি বাড়িতে বলবো?
-- বুঝতে পারছি নাগো
— কতদিন আর অপেক্ষা করবে ?
— কিছু তো একটা করতে হবে এবার?
ঘরের মধ্যে আবার কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। বাইরে হালকা বাতাসে জানলার পর্দা দুলছে।
আনন্দি হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— আচ্ছা নতুন করে তোমাদের আবার বিয়ের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?বাড়িতে গিয়ে বললাম তোমাকে দাদার পছন্দ। মা,বাবাও তোমাকে পছন্দ করেছেন। বিয়েটাও আবার হল আমরাও বেশ আনন্দ করলাম।
বিনীতা হেসে দিয়ে বলল,
— দাদা আর বোনের বুদ্ধি তো দেখছি একই
-- কেন দাদাও এই কথা বলেছে বুঝি?
-- হ্যাঁ গো ।
বিনীতা হাসতে থাকে।
-- এখন বুঝতে পারছি দাদার পরিবর্তনের কারণ
-- কিসের পরিবর্তন?
— আগে দাদা খুব হাসিখুশি ছিল, বাড়ির সবাইকে নিয়ে থাকত। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে… কেমন যেন নিজের মধ্যে ঢুকে গেছে। কারো সাথে তেমন কথা বলে না, নিজের রুমেই বেশি থাকে।
বিনীতার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল, কিন্তু মনটা বলল 'ও তাহলে সত্যিই আমায় ভালোবেসে ফেলেছে।'
— আমার জন্য?
আনন্দি মাথা নিচু করে বলল,
— হয়তো… অথবা নিজের অপরাধবোধে।
— অপরাধবোধ কেন?
— কারণ দাদা জানে, তোমার সাথে যা হয়েছে সেটা অন্যায়। সে তোমার প্রাপ্য সম্মান, ভালোবাসা—কিছুই দিতে পারেনি।
বিনীতার চোখ আবার ভিজে উঠল,
— কিন্তু সেটা তো ওর দোষ ছিল না আনন্দি…
— দোষ না থাকলেও, মনে তো লাগে
একটু থেমে আনন্দি হঠাৎ দৃঢ় গলায় বলল,
— আমি সব ঠিক করে দেব।
বিনীতা অবাক হয়ে বলল,
— কী করে সব ঠিক করবে?
— তোমাদের দু'জনের এই দূরত্ব। আর না! এতদিন যা হয়েছে হয়েছে এবার আমি আমার বৌদিকে বাড়ি নিয়ে যাবো।
বিনীতা হালকা হেসে বলল,
— সবকিছু কি এত সহজ?
আনন্দি দৃঢ়ভাবে বলল,
— সহজ না হলেও, অসম্ভব না।
— আমি দাদার বোন, আর তুমি… (হালকা হেসে) তুমি তো আমার বৌদি।
বিনীতা চুপ করে রইল। তার চোখে যেন অনেকদিন পর একফোঁটা আশার আলো জ্বলে উঠল।
ঠিক তখনই বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আনন্দি ফিসফিস করে বলল,
— মনে হচ্ছে কেউ এসেছে…
বিনীতা হঠাৎ একটু অস্থির হয়ে উঠল,
— না না… আমি এখন আর কারও সাথে এই বিষয়ে কথা বলতে পারবো না…
আনন্দি তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— পালিয়ে আর কতদিন থাকবে গো?
পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে দরজার সামনে এসে থামল…
ক্রমশ…
No comments:
Post a Comment