ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪১)
হাইওয়ের বুকটা যেন হঠাৎ করেই যেন থেমে গেছে। গাড়ি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। দূরে কোথাও একটা ট্রাকের হর্ন মাঝে মাঝে কানে বিঁধে যাচ্ছে, কিন্তু এই অংশটা যেন আলাদা এক নিস্তব্ধ দ্বীপ। রাস্তা থেকেও কোন গাড়ির যাতায়াত প্রায় নেই বললেই চলে। সকলেরই ভয়ে বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনোই সুরাহা করতে পারছে না।
এতগুলো মানুষ গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে, প্রত্যেকের মনেই একটা ভয় কাজ করছে।দেবদূত বারবার ফোনে অনলের সাথে কথা বলছেন, ড্রাইভার লাগাতার ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করছে, এটা ওটা নাড়াচাড়া করছে, আনন্দি নিঃশব্দে চারপাশে তাকিয়ে আছে চোখে মুখে একটা চাপা আতঙ্ক, যেন অজানা কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
এদিকে অনল আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুণরায় একটা গাড়ি বুক করে পাঠাতে। কিন্তু সেও সফল হতে পারছে না। চিন্তায় চিন্তায় তার অবস্থাও পাগলের মত।
আকাশে মেঘ জমে আছে, চাঁদের আলো ঢেকে গেছে। রাস্তার দু’পাশে ঘন অন্ধকার, গাছগুলো কেবল ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে। হালকা বাতাসে পাতার খসখস শব্দটা অস্বাভাবিক রকম স্পষ্ট শোনায়। মনে হয়, কেউ যেন লুকিয়ে লুকিয়ে সবকিছু দেখছে।
লিজা বললেন, গাড়িটা হঠাৎ করে খারাপ হলো কী করে?
ইরা চাপা গলায় উত্তর দিল,
-- বিপদ কী আর বলেকয়ে আসে ? আমাদের আরও আগেই বেরোনো উচিত ছিল। কী করে কী হবে কীভাবে বাড়ি পৌঁছাবো এখন কিছুই বুঝতেই পারছি না। মেঘও করেছে প্রচুর। যে কোন সময় বৃষ্টি শুরু হবে। এই নির্জন জায়গায় ভয়ে বুকটা শুকিয়ে যাচ্ছে।
আনন্দি হঠাৎ বলে উঠলো,
-- ও মামা এখানে কোন ভূত নেই তো?
মামা হেসে বলেন,
-- না না ভূততুত নেই। আমাদের সাথে একটা পেত্নী আছে।
-- মামা, তোমার এখনো রসিকতা করতে ভালো লাগছে?
কী করি বলতো? বুঝতেই তো পারছি না কী করবো এবার। সময় কাটাতে হবে তো।
কথাটা বললেন ঠিকই কিন্তু নিজেও একটা আতঙ্কের মধ্যেই রয়েছেন। তিন তিনজন নারী, একজন বয়স্ক মানুষ - আশীর্বাদ উপলক্ষ্যে সকলের গায়েই সোনার কিছু না কিছু রয়েছে। ছিনতাইয়ের ভয় না থাকলেও প্রাণের ভয় তো আছেই। কোথা থেকে কী হতে পারে ভেবেই পাচ্ছেন না।
এই নির্জন হাইওয়েতে, এতগুলো মানুষের মাঝেও একটা অদ্ভুত একাকিত্ব নেমে এসেছে।
এদিকে অনল কোন অবস্থাতেই কোনকিছু করতে না পেরে ঠিক করে একটা গাড়ি ভাড়া করে নিজেই রওনা দেবে। কিন্তু সেও তো কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। ততক্ষণে তো ভোর হয়ে আসবে। অনলের বাবাকে ধরে একটা জায়গায় বসানো হয়েছে। এত ধকল তিনি আর নিতেও পারছেন না। একেবারেই কাহিল হয়ে পড়েছেন। খুব যে একটা গাড়ি চলছে ওই রাস্তা দিয়ে তাও নয়। মাঝে মাঝে দু'একটি পাঞ্জাব লড়ি হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে একটি চারচাকা সামনের থেকে কিছুটা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। ভয়ে সব আমসি হয়ে গেছে। গাড়িটা থামিয়ে গাড়ি থেকে এক যুবক নেমে এলো। পরনে তার সাদা সার্ট আর ডেনিম জিন্স। চোখে চশমা। দেবদূত আনন্দিকে চোখের ইশারায় এই গরমের ভিতরেও গাড়িতে উঠে বসতে বললেন। সকলের বুক দুরু দুরু করছে।
যুবকটি সামনে এগিয়ে এলো। ড্রাইভারের কাছে জানতে চাইলো গাড়ি প্রসঙ্গে। ড্রাইভারের কাছে শুনে নিজেও একটু চেষ্টা করলো স্টার্ট হয় কিনা। তখন সকলে তার দিকে এগিয়ে এলো। কিছুটা হলেও তখন তাদের মন থেকে ভয় দূরীভূত হয়েছে। আনন্দি গাড়ি থেকে নেমে এলো। যুবকটি দেবদূতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-- যদিও আমার গাড়িতে সকলের জায়গা হবে না। একটু আপনারা যদি কষ্ট করে পিছনের সিটে চারজন বসতে পারেন আর একজন সামনে আমি আপনাদের এই ডেঞ্জারাস জায়গাটা পার করে দিতে পারি। ---আপনারা যাবেন কোথায়?
দেবদূত তার কথার উত্তর দিলেন। যুবকটি পুণরায় বলল,
-- এই মুহূর্তে এখান থেকে আপনারা কিছু পাবেন না। আর হাইওয়ে জায়গাটাও যে খুব একটা সুবিধার নয় সেটাও আপনারা জানেন। যদি আমায় বিশ্বাস করেন তাহলে আসতে পারেন আমার গাড়িতে।
সকলে সকলের মুখের দিকে তাকালেন। এই মুহূর্তে একে বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই। সকলে তার সাথে কিছুটা হেঁটে তার গাড়িতে উঠলো। লিজার শরীরটা একটু ভারিক্কি তিনি গিয়ে যুবকের পাশে বসলেন। পিছনের সিটে চারজন খুব কষ্ট করেই বসেছেন। গাড়ি ছুটে চললো কলকাতার দিকে। প্রথমে সবাই চুপচাপ। তারপর লিজাই যুবকের সাথে কথা জুড়লেন,
-- তোমার বাড়ি কোথায় বাবা?
-- বারাসাত
-- তাহলে তো তোমাকে উল্টো রাস্তা ধরতে হবে আমাদের জন্য
-- হ্যাঁ তা হবে। অসুবিধা নেই। মানুষের বিপদে তো মানুষই দাঁড়ায়। আপনারা খুব বিপদে পড়েছেন বুঝেই তো নামলাম গাড়ি থেকে। ওটা যে কতটা ভয়ঙ্কর জায়গা আপনারা ভাবতেই পারবেন না। এই কয়েকদিন আগেই ঠিক ওই জায়গার আশেপাশেই একটা মা*র্ডা*র হয়ে গেলো। প্রথমে ছিনতাই পরে তাকে মে*রেই ফেললো।
-- ঈশ্বরই তোমাকে আমাদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
-- এত রাতে আপনারা কোথা থেকে ফিরছেন? সকাল সকাল বেরোনো উচিত ছিল আপনাদের।
-- আর বোলো না বাবা। আমরা একটা শুভ কাজে গেছিলাম। সাথে গাড়ি আছে ভেবে একটু দেরি করেই বেরোলাম। কে জানতো কপালে এই দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে। আমরা তো প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছিলাম। সারারাত ওখানেই থাকতে হত তুমি না আসলে।
-- জায়গাটা এমনই খতরনাক সারারাত ওখানে আপনারা থাকতেই পারতেন না। তারমধ্যেই অনেককিছু ঘটে যেতে পারতো।
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। গাড়ি ছুটে চলেছে। পিছনে আনন্দির অবস্থা হয়েছে ভয়ানক। শেষ পর্যন্ত ইরা আস্তে আস্তে বললেন,
-- অনু, তুই আমার কোলের উপর বোস
-- হ্যাঁ ওটাই বাকি আছে
-- আরে বসতেই তো পারছিস না। তুই তো একদিকে কাত হয়ে আছিস। আমার দু'পায়ের মাঝখানে বোস। তাতে একটু কষ্ট কম হবে।
-- মা, আমি তোমার সেই দু'বছরের অনু নই যে তোমার দু'পায়ের মাঝখানে আরামসে বসে যাবো।
ইরা এবং তার মেয়ে যতই আস্তে কথা বলুক না কেন সব কথাই যুবকটির কানে যাচ্ছে। কিছুটা সময় চুপ করে থেকে গলাটা চড়িয়ে সে বলল,
-- বুঝতে পারছি আপনাদের বসতে অসুবিধা হচ্ছে। আর কিছুক্ষণ। কলকাতা লোকালয়ে ঢুকলেই আপনারা উবের পেয়ে যাবেন। আমি সেরূপ জায়গাতেই আপনাদের নামিয়ে দেবো। আর একটু কষ্ট করুন।
ইরা যুবকটির কথা শুনে বললেন,
-- আমি খুব ঈশ্বর বিশ্বাসী জানো। ঈশ্বর তো নিজে এসে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন না তিনি মানুষের রূপ ধরেই আসেন। আজ তিনিই তোমায় পাঠিয়েছেন আমাদের রক্ষা করতে।
-- সে সব আপনাদের বিশ্বাস। তবে আমি একজন সাধারণ মানুষ। কেউ বিপদে পড়লে ছুটে যাওয়া আমার সেই ছেলেবেলার অভ্যাস। এরজন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে জীবনে, প্রাণ সংশয় হয়েছে বহুবার। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। হয়ত আপনাদের মত মায়েদের ভাষায় ওই ঈশ্বরের লীলায়।
হেসে পড়লো যুবকটি
-- ব্যক্তিগত কথা হবে যদিও তবুও জানতে ইচ্ছা করছে আপনারা এইদিকে কোথায় গেছিলেন।
-- আমার ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ের বাড়িতে আশীর্বাদে গেছিলাম বাবা
-- বাহ্ তা বেশ। কোন গ্রামে?
-- শেখপুর অনেকে আবার সুখপুরও বলে।
যুবকটির গাড়ির গতিটা যেন হঠাৎ করেই কমে গেলো। সে কিছুটা সময় চুপ করে একমনেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে গাড়ি কলকাতার রাস্তায় ঢুকে পড়েছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর যুবকটি বলল,
-- ওখানে একটি বাড়িতে আমিও একবার একটি কাজে গেছিলাম।
-- পুরোপুরি গ্রাম ওটি। তবে এখন তো গ্রামগুলি অনেক উন্নত। সব রাস্তা পাকা, লাইট,জল সব আছে। শুধু বাজার, হাসপাতাল সেই আদিকালে পড়ে আছে
লিজা এবার বললেন,
-- তা অবশ্য ঠিক। তবে ফ্রেস অক্সিজেনটা পাওয়া যায়।
যুবকটি গাড়িটা ধীরে চালিয়ে এবার একটা জায়গায় গাড়িটা পার্ক করতে করতে বলে,
-- আপনারা এখান থেকে ইজিলি উবের বুক করতে পারবেন। রাত অনেক। একটু বেশি চাইবে।
দেবদূত গাড়ি থেকে নেমে যুবকটিকে ধন্যবাদের সাথে হ্যান্ডশেক করলেন। সবাই একে একে গাড়ি থেকে নেমে তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে শুরু করলো। লিজা তখন বললেন,
-- দেখো কাণ্ড! এতক্ষণ ধরে আমরা তোমার গাড়িতে বসে তোমার সাথেই গল্প করছি অথচ নামটাই জানা হয়নি।
যুবকটি মানিব্যাগ বার করে তার একটি কার্ড লিজার হাতে দিতে দিতে বলে,
-- আমি অর্পণ , অর্পণ মজুমদার। এডভোকেট
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment