ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪২)
লিজা কার্ডটা হাতে নিয়ে হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে। সকলে যে যার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কারো মুখেই কোন কথা নেই। দেবদূত বললেন,
-- হ্যাঁরে ইরা এটা তোর ঈশ্বরের কোন লীলা বলতো?
-- জানি না দাদা। আমার ছেলেটার কপালে ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত কী লিখেছেন?
-- এখানে আবার তোর ছেলেটা কোথা থেকে আসলো?
-- সব সময় চিন্তা ভাবনাগুলো পজেটিভ করতো।
কথা বলতে বলতেই অনলের ফোন। অর্পণের গাড়িতে উঠে একবার ফোন করে দেবদূত জানিয়ে দিয়েছিলেন তারা একজনের সহায়তায় কলকাতার দিকে এগোনোর চেষ্টা করছেন।
ততক্ষণে উবের এসে গেছে। যথারীতি একশ টাকা বেশি দিতে হবে যা ভাড়া দেখাচ্ছে তার থেকে। টু শব্দটি না করে সকলেই গাড়িতে উঠে বসেছেন। কিন্তু ঝড়ের গতিতে ঈশ্বরের দেবদূত হয়ে অর্পণ মজুমদার এসে তাদের যে আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করে গেছে সেই কথা ভাবতে কেউ আর নিজেদের মধ্যে কোন কথা বলার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি। সবাই চুপ। পাঁচটা প্রাণী গাড়িতে বসে কিন্তু কারও মুখেই কোন কথা নেই। সবাই ভাবছে।
রাত তখন একটা। গাড়ি এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। অনল গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই একে একে গাড়ি থেকে নেমে চুপচাপ বাড়ি ঢুকে গেলো। অনল বাবাকে ধরে নিয়ে এলো।
-- কী কাণ্ড বলো তো? আমি তো তোমাদের টেনশনে দম বন্ধ হয়ে মা*রা যাচ্ছিলাম।
দেবদূত বললেন,
-- তোর কী মনে হচ্ছে আমরা সবাই হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে দম ছেড়ে বেঁচে ছিলাম।
মামার কথা শুনে অনল একটু হেসে দিলো।
দেবদূত আবার বললেন,
-- রাত এখন অনেক। তবুও একটু চা খাবো অনল। তুই একটু চা কর। আর কেউ কিছু খেলে বলো অর্ডার করি এখনই।
ইরা বললেন,
-- এখন আর কোন খাবার অর্ডার করতে হবে না। ফ্রিজে তরকারি, মাছের ঝোল আছে। আমি দুটো ভাত বসিয়ে দিচ্ছি।
-- মা, আমি সব গরম করে ভাত করে রেখেছি। তোমরা সবাই ফ্রেস হয়ে টেবিলে খেতে আসো। আমি সব গুছিয়েই রেখেছি।
-- এই না হলে আমার ভাগ্নে
-- ইরা এত রাতে আমি ভাত আর খাবো না। দুধ থাকলে আমায় একটু দুধ মুসলি দাও।
অনলের বাবার সাথে অনলের মামাও সুর মেলালেন ভাত ছাড়া ঘরে যা আছে তাই দেওয়ার জন্য।
সবাই এক এক করে ওই রাতেই স্নান সেরে টেবিলে আসলেন। ইরা তার স্বামীর খাবরটা ঘরেই দিয়ে আসলেন। আগেই অনল চা করতে গেলে দেবদূত সবাইকে বললেন,
-- কে আমাদের গাড়ি করে এতটা নিয়ে এসেছে এখনই অনলকে বলার কোন প্রয়োজন নেই। পরে বললেও হবে। এই মুহূর্তে ওকে কিছু বলতে হবে না। কী থেকে কী ভেবে বসবে তার কোন ঠিক নেই। পরে ধীরে সুস্থে একসময় বললেই হবে।
অনল চা করতে করতে বিনীতাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে সকলে ভালোভাবেই বাড়িতে পৌঁছে গেছে। তারা সকলেই জেগে ছিলেন অনলের বাড়ির লোক বাড়িতে পৌঁছেছে কিনা জানার জন্য। কারণ তাদের ভিতরেও একটা আতঙ্ক কাজ করছিল পূর্ব ঘটনা মনে করে।
খাবার টেবিলে টুকটাক যা কথা হল তা হল বিনীতা শিলিগুড়ি পৌঁছেই ট্রান্সফারের চেষ্টা করবে। ওর ট্রান্সফার হয়ে গেলে অর্থাৎ ও কলকাতায় স্কুলে জয়েন করার পর বৌভাতের দিন ফিক্সড হবে। এরমধ্যে যেদিন রেজিস্ট্রি হবে ও যদি ছুটি না পায় একদিনের জন্য এসেই আবার চলে যাবে। বিয়ের অনুষ্ঠান নতুন করে আর কিছুই হবে না। এদিকে বৌভাতের দেরি হলে লিজা আবার একবার বাপেরবাড়ি কয়েকদিনের জন্য ঘুরে আসবেন। দেবদূত বোনের বাড়িতেই থাকবেন।
পরদিন অনল যথারীতি অফিস যায়। কৌশিকী দুপুরের দিকে অফিসে এসে বসের সাথে দেখা করে ওর কাজ মিটিয়ে ওর পরিচিতদের সাথে দেখা করে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতই আলাদা করে অনলের সাথে দেখা করতে যায় না। অনল শুনেছে কৌশিকী এসেছে অফিসে। মনেমনে ভেবেছে সেতো আসবেই ওর সাথে দেখা করতে। নিজের থেকে তাই আর কোন তাগিদ অনুভব সে করেনি কৌশিকীর সাথে দেখা করার। টিফিন আওয়ার শুরু হয়ে যায়। অনল ওয়াশরুমে যেতে গিয়ে কৌশিকীর মুখোমুখি হয়। কৌশিকী যেন দেখেও অনলকে দেখতে পায়নি। কারণ কালকের ফোনের অপমানটা সে হজম করতে তখনও পারেনি। এত বাজেভাবে অনল কথা বলেছে তার সাথে যা সে কোনদিন স্বপ্নেও কল্পনা করেনি।
-- কী ব্যাপার সেই কখন এসেছো দেখতেই তো পেলাম না।
কৌশিকী অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-- আসলে অফিসে কিছু কাজ নিয়ে এসেছি। সেটা মিটাতেই অনেকটা সময় চলে গেলো। তারপর সবাই মিলে এমনভাবে ধরলো সেই গল্প থেকে আর বেরোতেই পারলাম না। কেমন আছো?
-- বিন্দাস আছি। সবকিছু ঠিকঠাক। তুমি কেমন আছো। ছাত্রছাত্রীদের সাথে নিশ্চয় খুব ভালো সময় কাটছে।
-- নতুন কাজ, নতুন অভিজ্ঞতা। বাচ্চাদের সাথে বেশ ভালোই সময় কেটে যাচ্ছে।
কৌশিকী চুপ হয়ে গেলো। আর কোন কথা বাড়ালো না। অনল ওয়াশরুমে চলে গেলো। আর ঠিক সেই ফাঁকে অনলকে বোঝাতেই যে সে গায়ে পড়া মেয়ে নয় - সেই ফাঁকেই সে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু চোখটা কিছুটা অবাধ্য করায় শাড়ির আঁচলটা তাকে তুলতেই হল চোখ পর্যন্ত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে উবের বুক করার সাথে সাথেই পেয়ে গেলো।
হঠাৎ ফোন বজায় তাকিয়ে দেখে অনল ফোন করেছে। বুকটা ধড়াস করে উঠলো। নিজেকে সামলে ফোনটা রিসিভ করলো,
-- আরে দেখা না করেই চলে গেলে যে
-- দেখা হল, কথা হল - এরই মধ্যে ভুলে গেলে?
-- তুমি কি আমার উপর রাগ করেছো কালকের ব্যবহারে?
-- না না রাগ করবো কেন? তবে বুঝতে পেরেছি আমার ফোন তোমার বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
কথাটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই অনলের। তবুও সে বলল,
-- আসলে কাল খুব টেনশনে ছিলাম। বাড়িতে কেউ ছিল না।সবাই একটা বিশেষ কাজে বেরিয়েছিল। গরমে কী বলতে কী বলে ফেলেছি সরি তারজন্য।
-- আরে না না। ঠিক আছে। রাখি তাহলে। হোটেলের কাছে এসে গেছি। পরে কথা হবে।
-- একটা কথা বলার ছিল
কৌশিকী অপরপ্রান্তে চুপ করে আছে। সে লাইনে আছে কিনা বুঝতে "হ্যালো" বলাতে কৌশিকী বলল,
-- হ্যাঁ বলো শুনছি।
-- গতকাল আমার আশীর্বাদ ছিল। তাই বাড়ির সবাই বেরিয়েছিল। এখনো বিয়ের ডেট ফাইনাল হয়নি। আমার বিয়েতে কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে।
কৌশিকীর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করলো। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সে নিজেকে সংযত করে বেশ হাসি হাসি ভাবেই বলল,
-- কংগ্রাচুলেশন। দারুন খবর এটা। এখন বুঝতে পারছি কাল আমার ফোনটা কেন তোমার বিরক্তির কারণ হয়েছিল। আসলে আমারও ফোনটা করার কোন দরকারই ছিল না। আজ তো দেখাই হত
আর বেশি কথা বলতে কৌশিকী চাইলো না। যদি গলার স্বরে ধরা পড়ে যায়।তাই বলল,
--রাখি এখন একসময় জমিয়ে সব কথা শুনবো। এসে গেছি ।নামবো এখন
অনলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কৌশিকী ফোনটা কেটে দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত লিফটে উঠে নিজের রুমে চলে যায়।
নিজেকে নিজেই শান্তনা দেয় তার জীবনটাই তো কষ্টে ভরা। যে সন্তান ছোটবেলাতেই তার মা, বাবাকে হারায় তার জীবন যে কোনদিন সুখে পরিপূর্ণ হতে পারে না এটা সে সাময়িক ভুলে গেছিল। তাই হয়ত অনল দেখে তার ব্যবহারে সে মুগ্ধ হয়েছিল।
মামা,মামী কোনদিনও একফোটা কষ্ট তাকে দেননি। তার কখনোই মনে হয় না যে সে তাদের নিজের মেয়ে নয়। কিন্তু তবুও কোথাও যেন একটা ব্যথা সে সর্বদাই অনুভব করে। আজও রাতের আঁধারে সেই অক্সিডেন্টের সময়ের কথা তার মনেপড়ে। ভুলতে চেষ্টা করলেও সে কিছুতেই ভুলতে পারে না সেই দিনটার কথা। প্রতিবছর ওই দিনটা আসলেই মামা,মামী তাকে নিয়ে ঠিক ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু কোনদিনও তারা বলেননি কেন তারা ওইদিনই ওকে নিয়ে তারা বেড়াতে যান। যে কোন একটা মন্দিরে তারা কৌশিকীর নামে পুজো দেন তারপর বাড়িতে এসে নিরামিষ খান। কৌশিকী পুরোটাই বোঝে কিন্তু কোনদিনও তাদের কাছে কোন প্রশ্ন করেনি।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment