ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৬)
অর্পণ একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। ময়ূরের সেই নীরব হাসি যেন তার বুকের ভেতরের লুকোনো কথাগুলো এক এক করে টেনে বাইরে আনতে চাইছে।
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ। বাইরে রাতের হাওয়া হালকা শব্দে জানলার পর্দা নাড়িয়ে দিচ্ছে।
ময়ূর ধীরে ধীরে বলল,
---তুমি পালিয়ে এসেছো অর্পণদা নিজের কাছ থেকে।
অর্পণ এবার মাথা তোলে। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু তাতে লুকোনো আছে একটা অদ্ভুত ভয়।
--সবকিছু এত সহজ না ময়ূর। কিছু সম্পর্ক, কিছু অনুভূতি, ভুল সময়ে এসে পড়ে।
--নাকি আমরা সময়কে অজুহাত করি?
শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে ময়ূর।
অর্পণ একটু হেসে ফেলে, কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই।
-- তুমি বুঝবে না। তুমি এখনো অনেক ছোট।
ময়ূর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
-- আমি ছোট? আমার বয়স বাইশ বছর অর্পণদা। আর তুমি কি কখনো চেষ্টা করে দেখেছো আমাকে বুঝতে দেওয়ার?
এবার ময়ূরের গলায় দৃঢ়তা।
কথাটা শুনে অর্পণ চুপ করে যায়। হঠাৎ করেই তার মনেহয় ময়ূরের কাছে সে ধরা পড়ে গেলেও কিছুতেই স্বীকার করা যাবে না তার ভিতরের দুর্বলতা। সে তার বোনের বন্ধু। তার থেকে অনেক ছোট।
মুহূর্তটা যেন থমকে দাঁড়ায়।
ময়ূর একটু এগিয়ে এসে বলে,
-- তুমি কিছু ভাবছো ।আমার মনেহচ্ছে তুমি ভয় পাচ্ছো কারণ তুমি জানো, তুমি যা অনুভব করছো সেটা সেটা আমি বুঝে ফেলেছি। কিন্তু তুমি স্বীকার করতে চাইছো না কারণ আমি তোমার ছোটবোনের বন্ধু এবং আমাদের বয়সের পার্থক্যটা অনেক।
অর্পণের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন আরও জোরে শোনা যায়।
সে ধীরে বলে,
-- কিছু অনুভূতি আছে যা স্বীকার করলে অনেক কিছু ভেঙে যায় তখন সেই অনুভূতিকে যেভাবেই হোক আটকে রাখতে হয়
-- অপরের প্রতি অনুভূতি স্বীকার না করে নিজে কষ্ট পাওয়ার অর্থটা আমার জানা নেই। আমাকে যদি একটু বুঝিয়ে বলতে ভালো হত। তুমি কি সত্যিই তোমার অনুভূতি স্বীকার করতে চাও না?— ময়ূর প্রশ্ন করে।
-- তুমি এখান থেকে যাও এখন। আমাকে একটু একা থাকতে দেও।
-- তুমি বললে এ বাড়ি থেকেই আমি চলে যেতে পারি এই মুহূর্তে। কিন্তু আমার যে উত্তরটা পাওয়া হয়নি -
অর্পণ এবার সরাসরি ময়ূরের দিকে তাকায়।
প্রথমবারের মতো তাদের চোখে চোখ পড়ে, কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো আড়াল নেই।
ময়ূর আস্তে করে বলে,
--আমি তোমার জীবনে ঝড় হতে চাই না অর্পণদা, কিন্তু তুমি যদি আমাকে এড়িয়ে যাও, তাহলে সেই ঝড়টা তোমার ভেতরেই চলবে। আর সেই ঝড় থেকে তুমি কোনদিনও বেরোতে পারবে না।
অর্পণের ঠোঁট কাঁপে। অনেকক্ষণ পর সে ফিসফিস করে বলে,
-- নিজের জীবন গুছিয়ে নাও। আমার সাময়িক দুর্বলতাকে স্থায়ী কিছু ভেবে বসে থাকলে তোমারই ক্ষতি
ময়ূর মৃদু হেসে উত্তর দেয়,
-- তোমার সাময়িক দুর্বলতা হতে পারে কিন্তু আমার তো তা নয়। দিনের পর দিন হাসপাতালে তোমার পাশে বসে থেকে একদৃষ্টে তোমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমার মনের ভিতরে যে ঝড় উঠেছে সেটা তো সাময়িক নয়। তুমি যদি ভেবে থাকো সেই হাসপাতালে তুমি যতদিন ছিলে আমার জন্য তোমার ওই অবস্থা হয়েছে বলে কৃতজ্ঞতাবশত আমি গেছি তোমার পাশে থেকেছি তা নয় কিন্তু। আমার মনের তাগিদে বলতে পারো আমার ভালোবাসার তাগিদে আমি গেছি। ওই ক'টামাস আমার কীভাবে কেটেছে তার খবর কোনদিনও জানতে পারোনি। আমি কিভাবে বেঁচে ছিলাম কোনদিনও বুঝতেও পারোনি। কলেজ না থাকলে রোজ সন্ধ্যায় কেন তোমাদের বাড়িতে আসি কোনদিনও বোঝার চেষ্টা করোনি
আবার নীরবতা।
কিছুক্ষণ পরে ময়ূর আবার বলে,
-- ঠিক আছে। তুমি যদি এই সম্পর্কে রাজি না থাকো আমি আর কোনদিনও তোমায় কিচ্ছু বলবো না। তুমি যদি এইভাবেই ভালো থাকতে পারো আমি কোনদিনও তোমার সামনে এসে দাঁড়াবো না। আর একবার বলি,শুভ জন্মদিন। খুব ভালো থেকো। ঈশ্বর তোমার সব মনের আশা যেন পূরণ করেন।
বাইরে হাওয়া একটু জোরে বয়ে যায়।অর্পণ চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নেয়।
তার ভিতরের ঝড়টা এখনও থামেনি, হয়ত এই ঝড় আর কোনদিনও থামবে না।
ময়ূর অর্পণের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ডাইনিংয়ে যায়। অর্পিতা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে বিরাট কিছু ঘটে গেছে। তবুও ময়ূর নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েই বলে,
-- অর্পি অনেক রাত হল খেতে দে। বাড়ি যেতে হবে তো?
-- তোর মুখটা এরকম লাগছে কেন? কী হয়েছে? দাদার সাথে কী কথা হল?
-- বলার মত কোন কথা নয়। এটা ওটা আলোচনা করছিলাম।
-- তাই কি?
ময়ূর হেসে পড়ে বলে,
-- ওরে আমার খিদে পেয়েছে। অর্পিতার মা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি মেয়েকে বলেন,
-- কথা পরে আগে ওকে খেতে দে। রাত অনেক হয়েছে।
অর্পিতা আর কথা না বাড়িয়ে ময়ূরকে চিকেন কষা আর ফ্রাইড রাইস যা সে নিজের হাতে করেছে সাথে দই, মিষ্টি, পায়েস খেতে দিল। ময়ূর সামান্য খেয়ে উঠে যেতে গেলে অর্পিতা হাত ধরে তাকে পুণরায় বসিয়ে দিলো।
-- রাগ হয়েছে দাদার উপর। খাবারের উপর রাগ করছিস কেন?
-- এমা! অর্পণদার উপর রাগ করবো কেন?
-- তুই মনেহয় ভুলে যাচ্ছিস আমিও একটি মেয়ে। আমার চোখে কিছুই পড়ছে না এটা ভাবলি কী করে? আমি কি কিছুই বুঝতে পারি না।
ময়ূর চুপ করে আছে। মাথা নিচু।
-- একটু সময় দে দাদাকে। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। এতদিন তোকে একদৃষ্টিতে দেখেছে সেখান থেকে বেরোতে তো তার সময় লাগবে।
ময়ূরের বলতে ইচ্ছা করছে, "তোর দাদার চোখে আমি আমার জন্য ভালোবাসা দেখেছি - " কিন্তু সে কোন কথা না বলে চুপচাপ থালার খাবার নাড়াচাড়া করে যাচ্ছে।
-- আজকে দাদার জন্মদিনে এটাই সেরা গিফট। আজ একসেপ্ট করেনি একদিন দেখবি ঠিক একসেপ্ট করবে।
ময়ূর মাসিমা,মেসোমশাইকে বলে বেরিয়ে পড়ে। আজ আর অর্পণকে সে বলে আসে না।অর্পিতা গিয়ে দাদার ঘরে ঢুকে দেখে দাদা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।
-- ময়ূরের কী হয়েছে রে?
-- আমি কীকরে জানবো তার কী হয়েছে?
-- না, আমি ভাবলাম তুই আর ও বসে গল্প করছিলি তাই হয়ত তুই জানবি।
-- না আমি কিছু জানি না।
-- আচ্ছা চল রাত হয়েছে খাবি চল। মা,বাবাও বসে আছেন একসাথে খাবেন বলে।
-- ময়ূর খেয়েছে ও চলে গেছে?
-- হ্যাঁ ও অনেকক্ষণ চলে গেছে। কেন তোকে বলে যায়নি? ও তো সকলকে বলেই বেরোয়।
অর্পণ সে কথার উত্তর না দিয়ে উঠতে উঠতে বলে,
-- চল অনেক রাত হয়েছে খেয়ে নিই।
অর্পণ খেয়েদেয়ে ঘরে এসে তার ঘর লাগোয়া বারান্দায় এসে বসে। আজকে ময়ূরের প্রতি তার সাময়িক দুর্বলতার রেশ সে এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ধরা পড়ে গেছে সে ময়ূরের কাছে এটাই হয়েছে তার কাছে বেশি লজ্জার। ময়ূরকে কোনদিনও সে সেভাবে দেখেইনি। বোনের বন্ধু ব্যাস ওইটুকুই। কিন্তু ময়ূর তাকে যে অনেকদিন ধরে ভালোবাসে আজই সে প্রথম ময়ূরের মুখ থেকেই শুনেছে। ময়ূর এখানে আসলেই বাড়ি চলে যাওয়ার সময় সকলকে ধরে ধরে বলে যায়। আজ প্রথম এর ব্যতিক্রম হল। অর্পণ মনে মনে ভাবে সামান্য অসতর্কতায় সে ময়ূরের কাছে ধরা পড়ে গেলো। ময়ূরকে তো কোনদিনও সেই চোখে সে দেখেনি। তাহলে কেন আজ এত দুর্বল হয়ে পড়ল?
ময়ূর সেদিন বাড়িতে ফেরার পর খুবই আপসেট ছিল। এসে ফ্রেস হয়েই শুয়ে পড়েছিল। অনেক রাতে বেশ কয়েকবার অর্পিতার ফোনের পর ঘুম থেকে জেগে সে ফোন রিসিভ করে। কিন্তু কোন কথা আর হয় না যেহেতু সে ঘুমিয়ে পড়েছিল অর্পিতা তাকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করে না। কিন্তু অর্পিতা এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে দাদা ময়ূরের ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করে নিজেও খুব একটা ভালো নেই। সময় লাগবে সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যেতে। তবে এই সম্পর্কটা গড়ার জন্য তাকেও কিছুটা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে ময়ূরের জন্য। আর এর জন্য সে প্রস্তুত।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment