Friday, June 19, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৫)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৫)

  শিলিগুড়ি ট্রান্সফার হয়ে আসার পর থেকে কলেজ ছুটির পর কৌশিকী কোনদিনও খালি হাতে বাড়িতে ফেরেনি। আজ এর ব্যতিক্রম দেখে বারান্দায় বসে থাকা কৌশিকীর বাবা কিছুটা অবাক হয়ে গেলেন। বাবার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার পর সে ঘরের ভিতর ঢুকে দেখে মা তখনও শুয়ে।
-- কিগো মা তোমার কি শরীর খারাপ করেছে?
 তিনি উঠে বসতে বসতে বলেন,
-- নারে শরীর খারাপ কিছু না। তবে মনেহচ্ছে অবেলায় খেয়ে অম্বল হয়ে গেছে।
-- এন্টাসিড খাওনি কেন? কতবার বলেছি তুমি অবেলায় খাবে না। তাও কথা শোনো না। কেন দেরি হল খেতে? কী এমন কাজ করছিলে? 
 মায়ের উত্তর না পেয়ে কৌশিকী নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। ফ্রেস হয়ে রান্নাঘরের দিকে এসেই দেখে মা চায়ের জল বসিয়েছেন। আবার একবার মাথা গরম। করে মাকে বকাঝকা করে ঘরে পাঠায়। 
 চা করে বাবাকে দিয়ে মায়ের আর নিজেরটা নিয়ে মায়ের ঘরে আসে।
-- তোমার জন্য লাল চা করলাম। গ্যাস হয়েছে, দুধ চা খেলে আবার গ্যাস হবে।
 চা'টা মায়ের দিকে এগিয়ে দেয়।
-- কী হয়েছে তোর? আজ মেজাজটা এত গরম কেন? কলেজে কিছু হয়েছে?
 কৌশিকী মায়ের দিকে তাকায়। সত্যিই তো আজ বাড়িতে ঢুকেই মাথা গরম করে ফেললো কেন? এরকম তো কোনদিন হয়নি ওর। তবে আজ কেন হল?
 -- আজ কোন বাজার নেই হাতে, মাথাটাও গরম। নিশ্চয় তোর কিছু হয়েছে।
 কৌশিকীর মনে পড়লো সত্যিই তো আজ অন্যমনস্কতার কারণে কোনকিছু কিনে নিয়ে আসার কথাও তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। 
কিন্তু মাকে ধরা না দিয়ে বলল,
-- আজ ব্যাগে টাকাই ছিল না।
 মা কিছু বললেন না। কারণ টাকা আজকের যুগে ব্যাগে থাকে না, মোবাইলে থাকে। সবকিছুই গুগল পে। কিন্তু  মেয়ের মনের ভিতর কিছু একটা চলছে ভেবেই কৌশিকীর মা চুপ করে গেলেন।
 কৌশিকী কিছুতেই রাতে আর মাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দিলো না। সে নিজেই রুটি আর পাঁচমিশালি সবজি করে নিলো। 
 সকাল ন'টাতেই কৌশিকী বেরিয়ে যায়। তাই সকালের জন্যও কিছুটা রান্না সে করে রাখলো। কিন্তু আজ সে বড্ড বেশি চুপচাপ।
   রাতের খাবার সেরে সবাই শুয়ে পড়লেও কৌশিকীর চোখে ঘুম এল না। বারবার আজকের দিনের কথাগুলো মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে। বিনীতার সঙ্গে আজকের সেই আচমকা দেখা  সবটাই কি কাকতালীয়? ঈশ্বর কী চাইছেন? কী লিখে রেখেছেন তিনি তার জীবনে? জীবনের ওই পর্বটা সেতো ভুলেই যেতে চায়। যে গাছ চারা অবস্থাতেই ম*রে গেছে তার তো কোন চিহ্ন মাটিতে থাকে না। তবে কেন আজ হঠাৎ করেই বিনীতার সাথে তার দেখা হল? সব মিলিয়ে যেন বুকের ভেতর একটা অচেনা শূন্যতা তৈরি করছে।
 বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎই ফোনটা হাতে তুলে নেয় সে। অনেকক্ষণ অনলের নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থাকে। কল করার প্রশ্নই আসে না। তবুও নামটার দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে শেষমেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা পাশে রেখে দেয়।
নিজের মনকে সে বোঝায় যে মানুষটার বিয়ে হয়ে গেছে তাকে নিয়ে ভাবা মানে নিজেকে ছোট করা। নাহ্ সে কিছুতেই অনলকে নিয়ে ভাববে না। অনল তার জীবনে কোনদিন ছিল না আজও কোথাও নেই। 

 ভোরের দিকে একটু ঘুম এলেও সকাল হতেই আবার সেই নিরাসক্ত মুখ। মা খেয়াল করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। শুধু চুপচাপ মেয়ের সামনে গরম চা আর টিফিনটা এগিয়ে দিলেন।
-- আজ এত চুপচাপ কেন মা? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?
-- না মা, ঠিক আছি।
ছোট্ট উত্তর। কিন্তু এই ‘ঠিক আছি’-র ভেতরেই কতটা না বলা কথা লুকিয়ে আছে, তা মা বুঝেও না বোঝার ভান করলেন।
কলেজে পৌঁছে কৌশিকী ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা কিছু জিজ্ঞেস করলে একটু থেমে উত্তর দিচ্ছে—এ যেন সেই চেনা কৌশিকী নয়।
হঠাৎই স্টাফরুমে ঢুকে একজন বলল, -- ম্যাডাম, আপনাকে কেউ বাইরে ডাকছে।
কৌশিকী অবাক হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তার পরিচিত একটি মেয়ে। যার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল চেন্নাই সি এম সি তে। কৌশিকী তার বাবার হার্টের অপারেশন করতে চেন্নাই গেছিল আর ওই মেয়েটি অর্থাৎ নন্দিনিও তার মায়ের চিকিৎসার জন্য চেন্নাই ছিল। কিন্তু নন্দিনী তার মাকে হারিয়ে ফেলার পরে একা একটা অল্প বয়সী মেয়ের পক্ষে অচেনা জায়গায় মায়ের সৎকার করা সম্ভবপর ছিল না। কলকাতায় শবদেহ আনার প্রশ্নই নেই। কারণ নন্দিনীর মা ছাড়া আপন আর কেউ নেই।ওই সময় কৌশিকী তাকে সর্বোতভাবে সাহায্য করেছিল। সেই সূত্র ধরেই তার পরিচয় নন্দিনীর সাথে।
 দু'বছর আগের কথা। নন্দিনীর মা ছাড়া আর কেউ নেই শুনে কৌশিকী তাকে সাথে করেই নিজের বাড়ি শিলিগুড়ি ফিরেছিল। বেশ কয়েকমাস নন্দিনী ও বাড়িতে থেকে পরিবারের একজন হয়ে উঠছিল। আর ঠিক তখনই তার পরিচয় হয় একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলার সাথে।
 একদিন নন্দিনী বাজার করতে একটু দূরে একটা বড় বাজারে যায়। হঠাৎ এক মহিলাকে ঘিরে বেশ শোলগোল পড়ে যায়। কারণ তিনি হঠাৎ করেই বাজারের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভিড় সেখানে যথেষ্ঠ কিন্তু নীরব দর্শকই বেশি। নন্দিনী ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে মাটিতে বসে বয়স্কা ভদ্রমহিলার মাথাটা কোলের উপর তুলে নেয়। ভিড়ের ভিতর থেকে তাকে একজনে একটা জলের বোতল দেয়। নন্দিনী বোতল থেকে জল নিয়ে ভদ্রমহিলার চোখে মুখে জল দিয়ে তার জ্ঞান ফেরায়। কিন্তু কামিনীদেবী অত্যন্ত দুর্বল বোধ করতে থাকেন। তাই বাধ্য হয়ে একটি রিকশা ডেকে নন্দিনী ওই মহিলাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। তার বিছানায় তাকে বসিয়ে দিয়ে নিজেই রান্নাঘর খুঁজে বের করে বিস্কুট এনে তাকে জল ও বিস্কুট খাইয়ে সুস্থ করে। রান্নাঘরে ঢুকে নন্দিনী একজন মহিলাকে রান্না করতে দেখে। তখনই কামিনীদেবী সম্পর্কে ওই মহিলার কাছ থেকে সে সামান্য কিছু জানতে পারে।
 এদিকে নন্দিনীর দেরি দেখে কৌশিকীর মা ফোন করে ঘটনা সব শোনেন। নন্দিনী নিজের থেকেই জানায় তার ফিরতে একটু দেরি হবে কারণ ওই ভদ্রমহিলার নিজের কেউ বাড়িতে থাকে না। নন্দিনীর খবর পেয়ে কৌশিকীর মা নিশ্চিন্ত হন।
 নন্দিনী রাঁধুনির কাছ থেকে জেনে নিয়ে কাছাকাছি এক ডাক্তারকে ডেকে এনে কামিনীদেবীকে পরীক্ষা করায়। কামিনীদেবী নিজেই টাকা বের করে নন্দিনীর হাতে দেন ডাক্তারের ফিস আর ওষুধের দাম। ডাক্তার জানায় কামিনীদেবীর লো প্রেসারের জন্য মাথা ঘুরে গেছিল। বিশেষ কিছু ওষুধ তিনি প্রেসক্রাইব করেন না। একটা ভিটামিন আর খাওয়াদাওয়ার প্রতি দৃষ্টি দিতে বলেন। নন্দিনীর ব্যবহারে কামিনীদেবী মুগ্ধ হয়ে যান। অচেনা একটি মানুষের জন্য যে মেয়ে এতটা করতে পারে সেই মেয়েটি খুবই ভালো না হয়ে পারে না। দুপুরে না খাইয়ে তিনি নন্দিনীকে ছাড়েন না। যাবার সময় তাকে আগামীকাল আবারও আসতে বলেন। নন্দিনীও ভদ্রমহিলার আন্তরিকতা দেখে তার ভিতর নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। আসবার সময় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে নিজের ফোন নম্বরটি দিয়ে আসে।
 বাড়িতে ফিরে এসে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে কৌশিকীদের। কামিনীদেবী যে নন্দিনীর কেউ নেই শুনে তাকে বারবার তার কাছে গিয়ে থাকতে বলেছেন সেটাও সে জানায়। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করা নন্দিনী কৌশিকীকে বলেছিল তার জন্য যেকোন একটি চাকরির জোগাড় করে দিতে। নন্দিনী বেশ কয়েকজনকে বলেছিল। 
 সবকিছু শুনে কৌশিকী মা,বাবাকে বলে সে নিজেই একদিন সবকিছু দেখে আসতে যাবে। আজকালকার দিনে হুট করে কাউকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। কত কিছুই এখন ঘটে নিজের চোখে না দেখে একটু খোঁজখবর না নিয়ে সহায় সম্বলহীন মেয়েটাকে কারো আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু পরদিন সকালেই কামিনীদেবী ফোন করেন নন্দিনীকে।

ক্রমশ 

Sunday, June 7, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৪)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৪)

  ছেলেবেলাতেই কৌশিকী তার মা, বাবাকে হারিয়ে মনটাকে খুব শক্ত করে গড়ে তুলেছে। মামা,মামীর আদর যত্ন ছিল ঠিক মা,বাবার মতোই। কৌশিকীর ওই অল্প বয়সের ঘটনা মনে আছে ঠিকই যা সাধারণত অনেক শিশুরই থাকে না। সেই ছোটবেলার থেকে তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অভিশপ্ত দিনটির কথা হাসপাতালে একবারই সে তার মামা,মামীকে জানিয়েছিল। তারপর আর কোনদিনও সেই প্রসঙ্গ সে তাঁদের সাথে আলোচনা করেনি। স্বাভাবিকভাবেই তার মামা,মামী ভেবেছিলেন কৌশিকী সবই ভুলে গেছে। 

  শিশুমন সেতো নরম কাদার মত। নরম কাদাতে ছাপ পড়লে তা যেমন চিরস্থায়ী রূপ নেয় ঠিক তেমনই শিশুমনে যদি কোন ঘটনা মনের গভীরে দাগ কাটে তা আজীবন সে ভুলতে পারে না শুধু নয় ওই ঘটনা তার চারিত্রিক কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণও হয়ে ওঠে। কখনো তা  ভালো আবার মারত্মক খারাপও হয়ে ওঠে। মা,বাবাকে হারিয়ে তাঁদের স্নেহ ,ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হলেও ঠিক বিকল্প হিসাবে সে তার মামা,মামীর স্নেহ, ভালোবাসা পাওয়ার ফলে তার চরিত্রে কিংবা স্বভাবে খারাপ কোন প্রভাব পড়েনি। কিন্তু সে হয়ে উঠেছে কষ্ট সহিষ্ণু, কথা হজম করার মত ক্ষমতার অধিকারিণী।

     তবে এই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতাটাই ধীরে ধীরে তার একটা দুর্বলতায় পরিণত হচ্ছিল। সবকিছু চুপচাপ মেনে নেওয়ার অভ্যাস তাকে অনেক সময় নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে দিত না। ভেতরে ভেতরে জমে থাকা কষ্ট, না বলা কথাগুলো যেন তার মনের এক কোণে স্তূপ হয়ে থাকত। কিন্তু সে কখনোই মন খুলে এসব কথা কাউকেই শেয়ার করতে পারতো না।

      বাইরে থেকে কৌশিকীকে সবাই শক্ত, স্থির আর আত্মনির্ভরশীল মেয়ে বলেই জানত। কিন্তু সেই শক্ত খোলসের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভীষণ সংবেদনশীল মন, যে এখনো মাঝেমধ্যে হারিয়ে যাওয়া দু'টো মুখকে খুঁজে বেড়ায়—মা আর বাবা। খুঁজে বেড়ায় ঠিক নয় সেই মুখ দু'টো তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ভুলতে চাইলে কিংবা মনে করবে না সেই সব কথা ভাবলেও নির্জনে অন্ধকারে যখন সে একা থাকে তাঁরাই যেন তাকে সাথ দেয়। কষ্ট লাঘব করার শক্তি জোগায়।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে, নিঃশব্দে কখনো কখনো তার চোখ ভিজে উঠে। তবে সে কান্নার শব্দও কারও কানে পৌঁছাতে দেয় না। কারণ সে শিখে গেছে—কষ্ট নিজের মধ্যেই বয়ে নিয়ে চলতে হয়, কাউকে বুঝতে না দিয়ে। খুব কাছের দু'টো মানুষকে একসাথে হারিয়ে হাসপাতালে যে ক'টাদিন সে একাকী অচেনা মানুষগুলির সাথে ছিল ওই ক'টাদিনেই হঠাৎ করেই যেন সে অনেকটা বড় হয়ে উঠেছিল। মামা,মামীকে দেখে তাদের জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল বেশ ক'টাদিন পরে পরিচিত মানুষের মুখ দেখে। এরপর কৌশিকী ওই বয়স থেকেই আর শব্দ করে কাঁদেনি কিংবা বলা ভালো কাঁদতে পারেনি। তার কান্না ছিল এবং আজও আছে চাপা নিঃশব্দ ভাবে।

     তবুও, জীবনের প্রতি তার বিশ্বাসটা একদম ভেঙে পড়েনি। কারণ প্রিয় দু'টি মানুষকে হারিয়ে ঠিক তাদেরই মত  হয়তো ছোটবেলায় পাওয়া মামা-মামীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তাকে শিখিয়েছিল—সব হারিয়েও মানুষ আবার নতুন করে দাঁড়াতে পারে শুধুমাত্র দরকার ভালোবাসার সানিধ্য।
 
 কৌশিকী গড়া একটু অন্য ধাতুতে। হয়ত অন্য কোন বাচ্চা হলে ওই ছোট্ট বয়সে ঘটা ঘটনা তার মনেই থাকতো না ।কিন্তু কৌশিকী কোন কথাই ভোলেনি।

    কৌশিকী সুন্দরী, স্মার্ট, শিক্ষিত হওয়ার ফলে অনেক পুরুষই তার প্রেমে পড়েছে কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে তোমরা যা চাইছো সেটা কোনদিনও সম্ভব নয়। তাই তারা কোনদিনও তার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ খুলতে সাহস পায়নি। কৌশিকীর জীবনে প্রথম ভালোলাগা পুরুষ হল অনল। তার জীবনে দুর্ভাগ্য এটাই অনলকে যখন তার ভালো লাগে কিংবা বলা যায় সে অনলকে ভালোবেসেই ফেলেছে ঠিক তখনই অনলের জীবনের উপর দিয়ে এক মস্তবড় ঝড় বয়ে গেছে। তাই সে অনলের নাগাল কোনদিনও পায়নি।

  অনলকে অফিস ছাড়া সে যে কয়বার ফোন করেছে অনলের ব্যবহারই তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে অনল তাকে পছন্দ করে না। তাই সে আর তার বিরক্তির কারণ যেমন হয়নি অনলকে এড়িয়ে এড়িয়ে যেতেও তার খুব একটা কষ্ট হয়নি। আর যেটুকু কষ্ট সে পেয়েছে নিজেই চোখ মুছে নীরবে হজম করে নিতে পেরেছে এটাই তার বৈশিষ্ট্য। বুক ভেঙে গেলেও মুখে তার প্রকাশ সে করতে পারে না।

 কৌশিকী বদলে গেলো সেই ফোনের পর থেকেই।
  এরপর থেকেই কৌশিকী নিজেকে আরও গুটিয়ে নিতে শুরু করল। অনলের সাথে তার আর কোনো কথা হতো না। আগের মতো হঠাৎ করে ফোন করা, কোনো অজুহাতে কথা বলা—এসব সে একেবারেই বন্ধ করে দিল। যেন নিজের মনকে নিজেই কঠোরভাবে শাসন করেছে
“যেখানে জায়গা নেই, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে নিজেকে ছোট করা।”

 এয়ারপোর্টে দেখা হওয়া, কিংবা অফিসে শেষবারের মত যাওয়া কিন্তু তাকে না বলেই চলে আসা অনল প্রথমদিকে বিষয়টা খেয়ালই করেনি। বরং সে ভেবেছিল, এটাই স্বাভাবিক—যেটা সে চেয়েছিল, সেটাই তো হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু একটা বদল অনলের চোখে পড়তে লাগল। কিন্তু অনল তখন মহাব্যস্ত তার বিধ্বস্ত জীবন নিয়ে।
  কিন্তু সে তখন তার জীবনের ব্যক্তিগত ঝামেলা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল সেদিকে খেয়াল করবার মত তার হাতে সময় ছিল না। তবে হ্যাঁ মাঝে মাঝে কৌশিকীর কথা যে সে ভাবেনি তা একেবারেই নয়। কিন্তু বদলটাও তার চোখে পড়েছে ভীষণভাবে। ব্যাস ওই পর্যন্ত। কেন কিসের জন্য কৌশিকীর হঠাৎ এই বদল তার কারণ সে খুঁজতে যায়নি কিংবা চেষ্টাও করেনি কখনো। কারণ কৌশিকী তার মনের গভীরে সাধারণ আর পাঁচটা মেয়ের মতোই। অফিসের আর সকলের মত সেও একজন কলিগ মাত্র।


  জীবন কখনোই থেমে থাকে না। কারণ ঘড়ির কাঁটা থামতে জানে না। কৌশিকী তার কলেজ আর বাড়িতে ফিরে ছাত্রছাত্রীদের নোট তৈরি করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটা ছাত্রছাত্রী তার কাছে সন্তানের মত। সে নিজে নোটস তৈরি করে তার জেরক্স করে সকলকে দেয়। আজকের যুগে যা অন্য প্রফেসরদের মধ্যে দেখা যায় না। মায়ের স্নেহে সন্তানসম ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জ্ঞান বিতরণই শুধু নয় কীভাবে ইংলিশে তাদের ভয় কাটিয়ে উঠতে পারে সেদিকে সদাসতর্ক দৃষ্টি দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে তাদের এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলেছে।

  একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে বাসে তার সাথে হঠাৎ করেই বিনীতার দেখা। প্রথম অবস্থায় সে বিনীতাকে চিনতে পারেনি। কারণ সে যখন তাকে দেখেছিল তখন বিনীতা সালোয়ার কামিজ পরা এক কুমারী মেয়ে। শাড়ি, সিঁদুরে তাকে দেখে একটু সময় লাগবে বৈকি! বিনীতা তাকে খেয়াল না করলেও কৌশিকী তার দিকে তাকিয়ে বলে
-- তুমি বিনীতা না? সরি তুমি বললাম বলে
-- আরে না না। তুমি ছাড়া কি আপনি বলবে নাকি?
-- তুমি তো কৌশিকী?
 দু'জনেই হেসে দেয়। চলতে থাকে মামুলি কথাবার্তা। নিয়ে নেয় দু'জন দু'জনের ফোন নম্বর। বাস থেকে নেমেই কৌশিকীর বাড়ি আর বিনীতাকে বাস থেকে নেমে আরও কিছুটা পথ অটোতে যেতে হয়। কৌশিকী অনেক করে বলে তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। প্রয়োজনে রাতেও থাকতে পারে। কিন্তু বিনীতা কিছুতেই রাজি হয় না। সে আর একদিন যাবে বলে কথা দেয়। কৌশিকী নেমে পড়ে বাস থেকে। বিনীতা জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
 ভাগ্যের চাকা কোথায় কীভাবে ঘুরছে তা কেউ জানে না। যাকে মন থেকে মুছে ফেলেছে কৌশিকী অনেকদিন আগেই তারই স্ত্রীর সাথে আজ দেখা হয়ে কিছু পুরোনো কথা মনের মধ্যে আবারও ভেসে ওঠে তার। কিন্তু সে স্বল্প সময়ের জন্য। সামান্য হেঁটেই তার বাড়ি। রোজই কলেজ থেকে ফেরার পথে কিছু না কিছু বাজার করে সে নিয়ে যায় বিশেষত কাঁচা সবজি। কারণ তার (মামা) বাবা সবজি খেতে ভীষন ভালোবাসেন অর্থাৎ তিনি নিরামিষাশী। তাই অধিকাংশ দিনেই তাদের নিরামিষ রান্না হয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল আজ বিনীতার সাথে দেখা হওয়ার পর সে এতটাই অন্যমনস্ক ছিল সবজি না কিনেই হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির সামনে চলে আসে।
   মন এমন এক বিষয় সে কী চাইছে অনেক সময় সেই মনের উত্তরিধিকারিও বুঝতে পারে না। তখন সেখানে সব দর্শন ফেল।
  পাঠক, এবার তবে দেখা যাক কৌশিকী আর বিনীতার জীবন কীভাবে এগিয়ে চলে? 

ক্রমশ 
  

Friday, June 5, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (৫৩পর্ব)



    বিনীতা রেজিস্ট্রিতে নিজেই সাজবে বলেছিল। কিন্তু আনন্দির ঘ্যানঘ্যানানির পানপ্যাণীর জন্য পার্লারের লোক আনতে বাড়ির লোক বাধ্য হন। খুব সুন্দর করে তারা বিনীতাকে সাজিয়ে দেয়। 
   সকাল ঠিক এগারোটায় রেজিস্ট্রি অফিসার এসে পৌঁছতেই বাড়ির ভেতর একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো। সবাই যেন হঠাৎ একটু গুছিয়ে দাঁড়াল— এই কয়েকটা মিনিটেই জীবনের বড় একটা অধ্যায় বদলে যাবে দু'টি  তরুণ তরুণীর।
বিনীতা তখন ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে। পার্লারের লোকেরা কাজ শেষ করে চলে গেছে, কিন্তু আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে এখনও তার কেমন যেন অচেনা লাগছে। এতদিনের চেনা নিজেকে আজ নতুন মনে হচ্ছে—আজ সে শুধু বিনীতা নয়, কারও স্ত্রী, কারো বৌদি আবার কারো বা পুত্রবধূ হতে চলেছে। বাড়ির একমাত্র মেয়ের অন্য বাড়িতে নানান রুপের প্রকাশ হতে চলেছে।
আনন্দি এসে পাশে বসে হালকা করে ধাক্কা দিলো
-- কী গো এত চুপ করে কেন? দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। সাজটা কি অনলবাবু দেখেছেন? তিনি তো নতুন পাঞ্জাবী পায়জামা পরে বর সেজে বসে আছেন। 
বিনীতা একটু হেসে বললো, 
-- আমি বৌ সাজলে তাকে তো বর সাজতেই হবে গো। 
বলেই হাসি বিনীতার
আনন্দি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, 
-- এই হচ্ছে হবে এটাই ভালো ছিল জানো ? হয়ে গেলো মানে ব্যাস চিন্তা,ভাবনা, আয়োজন সব শেষ।ভালো জিনিস দেরি করে হলে সব ভালো হয়। আর তুমি তো কালই উড়ে যাবে, আহারে বেচারি বৌদি আমার !
শোনো আজ কিন্তু ফুলশয্যা। দেখোনি তো দাদার খাটটা যা দুর্দান্ত সাজানো হয়েছে। বেচারা খাটে উঠতে পারছে না সেই চেয়ারেই বসে রয়েছে। বলেছি আগে বৌদি বসবে তারপর তুই বসবি।
বিনীতা লজ্জা পেয়ে মুখটা নিচু করে নিলো।
   ওদিকে ড্রইংরুমে টেবিল-চেয়ার সাজানো হয়েছে। রেজিস্ট্রি অফিসার কাগজপত্র খুলে বসেছেন। অনল একটু অস্থিরভাবে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার। তার চোখে একটা চাপা টেনশন—কিন্তু তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অদ্ভুত একটা স্বস্তি। বেশ কয়েকবার মনেমনে ভেবেছে পার্লারের লোক যখন চলে গেছে বিনীতার সাজ শেষ হয়ে গেছে। কেমন লাগছে একটু দেখতে পেলে হত।
আনন্দির পিছনে লাগার ভয়ে সে আর সাহস করেনি। সবকিছু যেন স্বপ্নের মত লাগছে আজ তার কাছে। এত তাড়াতাড়ি এত সহজে সবকিছুর অবসান হবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। মোবাইলটা খুলে বিজয়ের পাঠানো সেই রাতে বিয়ের সময়ের কয়েকটা ছবি দেখতে দেখতে তার আবারও মনেহল, 'সত্যিই ঈশ্বরের লীলা বোঝা দায়।'
মামী এসে বিনীতাকে ডাকলেন,
-- চল মা, সবাই অপেক্ষা করছে। যত তাড়াতাড়ি এই কাজটা শেষ হবে তত তাড়াতাড়িই আমরা খেয়েদেয়ে আড্ডা দিতে পারবো।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো বিনীতা। তার পায়ের শব্দ যেন আজ একটু ভারী—প্রতিটা পা ফেলায় যেন একটা নতুন দায়িত্ব, নতুন সম্পর্ক জুড়ে যাচ্ছে। মামিমা আর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- ভীষন মিষ্টি লাগছে তোকে দেখতে। আমার ছেলেটার যে কী অবস্থা হবে তোকে দেখে।
বলেই হেসে দিলেন।
বিনীতা লজ্জায় পুরো লাল! সে আর মুখ তুলে তাকাতেই পারছে না।
অনলের সামনে এসে বসতেই দু’জনের চোখ একবারের জন্য মিললো। কিছুই বলা হলো না, কিন্তু সেই এক পলকের দৃষ্টিতে হাজারটা কথা আদান-প্রদান হয়ে গেল। 
রেজিস্ট্রি অফিসার তার প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। 
প্রথমে অনল, তারপর বিনীতা দু’জনেই মাথা নাড়লো। বিনীতার গলায় শব্দ আটকে যাচ্ছিল,  সেটা হয়ত লজ্জায় কিংবা হয়ত নতুন জীবনে পা ফেলতে গেলে সকলেরই মনের ভিতরে একটা আড়ষ্টতা কাজ করে তারই প্রতিফলন।
  সই করার সময় হাতটা সামান্য কেঁপে উঠলো তার। অনল সেটা খেয়াল করেই হালকা করে টেবিলের নিচে তার হাতটা ছুঁয়ে থাকলো। একটা আশ্বাস, একটা নীরব ভরসা। নীরবে বলতে চাইলো শুধু 'আমি  আছি তোমার সাথে। কোন ভয় নেই।'
সব কাগজপত্র সই হওয়ার পর অফিসার হাসিমুখে বললেন,
-- অভিনন্দন, এখন আপনারা আইনত স্বামী-স্ত্রী।
এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। দু'জন দু'জনের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইলো। দু'জনের চোখের সামনে ভেসে উঠলো বেশ কয়েকমাস আগের সেই বিয়ের দিনের ঘটনা। সবকিছু যিনি লন্ডভন্ড করে দিয়েছিলেন তিনিই যেন আবার সবকিছু সুন্দরভাবে গুছিয়ে ঠিক করে দিলেন।
তারপরই বাড়ির মধ্যে উলুধ্বনি, হাততালি, হাসির শব্দে ভরে উঠলো চারপাশ। হল নতুন করে আর একবার মালাবদল।
আনন্দি দৌড়ে এসে বিনীতাকে জড়িয়ে ধরলো,
-- হয়ে গেল  বিয়ে! তুমি এখন থেকে আমার বৌদি। কত ভয় ,জল্পনা,কল্পনা - দেখলে তো সব কেমন সুন্দরভাবে হল।
বিনীতা হেসে ফেললো, কিন্তু চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। আনন্দি সেটা দেখে বললো,
-- এই এই, এখনই কাঁদবে না! কাল তো যাচ্ছ, তখন কাঁদার অনেক সময় পাবে।
বিনীতা একে একে সকলকে প্রণাম করলো।  মাকে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। সুস্মিতাও মেয়েকে জড়িয়ে বারবার চোখের জল মুছছেন। বিজয়কে প্রণাম করতে গেলে সে বোনকে বুকের উপর মাথাটা রেখে বলল,
-- আমরা ঈশ্বরের হাতে খেলার পুতুল রে! তার ইচ্ছে ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না। মিছেই আমরা ভাগ্যের দোষ দিই। যা ঘটবে তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। খুব ভালো থাকবি তুই, খুব সুখী হবি। অনল খুব ভালো ছেলে। ছোটবেলা থেকেই আমি ওকে চিনি। মাঝে কয়েকটা বছর যোগাযোগটা বন্ধ ছিল। আবার দেখ ঠিক সময়মত ওর সাথে কেমন যোগাযোগ হয়ে গেলো।
অনল একটু দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি, অনেকদিনের একটা ভারী পাথর যেন বুক থেকে নেমে গেলো। কীকরে, কীভাবে যে সবকিছুর এত সুন্দর সমাধান হয়ে গেলো ভাবলেই সে অবাক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চোখে তার যেন একরাশ চিন্তা এই অল্প সময়ের সম্পর্ককে এত তাড়াতাড়ি দূরত্বে ঠেলে দিতে হচ্ছে ,মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা। কাল সকালেই বিনীতা ভোরের ফ্লাইটে চলে যাবে। ভাবলেই মনটা ভীষন খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার। চাকরি বাঁচানোর তাগিদে হলেও এই চলে যাওয়াটা মানিয়ে নেওয়া কি এত সহজ হবে? মন সায় দিচ্ছে না কিছুতেই।

   তবু আজকের দিন এবং রাতটা শুধু তাদের। এই কয়েকটা ঘণ্টা, কয়েকটা মুহূর্ত যেখানে নতুন জীবনের শুরুটা একটু হলেও নিজেদের মতো করে কাটিয়ে আবার দিনের পর দিন অপেক্ষা কবে আবার দেখা হবে।
  এবার শুরু হল ভাতকাপড়ের অনুষ্ঠান। লিজা আর ইরা থালা গুছিয়ে আগেই রেখেছিলেন। আনন্দির সহযোগিতায় লিজা থালা দু'টি নিয়ে আসলেন অনল ও বিনীতার সামনে। কিন্তু অনল কিছুতেই বলবে না ভাত, কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম। সে থালা নিয়ে দাঁড়িয়েই আছে। মামা তার অবস্থা বুঝতে পেরে বলেন,
-- ওরে আজকের দিনে স্বামীরা চাকরিজীবী মেয়েদের দায়িত্ব নেয় না। কিন্তু নিয়ম রক্ষার্থে তো কিছু একটা বলতে হবে।
অনল থালাটা বিনীতার হাতে দিয়ে বলল,
-- আজ থেকে সুখে,দুঃখে, হাসি, আনন্দে আমরা সারাজীবন দু'জন  দু'জনের পাশে থাকবো এই অঙ্গীকার করি এসো।
বিনীতা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে থালাটা ধরে। তার হাত থেকে থালা দু'টো নিয়ে লিজা টেবিলের উপর রেখে বলেন,
-- সবাই খেতে বোস। বিনীতা সকলের থালায় ঘি-ভাত  দিয়ে দাও।একসাথেই সবাই খেতে খেতে গল্প হবে।
টেবিল রেডি করতে করতে লিজা কথাগুলি বললেন।
এমনিতেই ইরা একটু কম কথা বলেন। আর তার ভাইবৌ যদি থাকেন সংসারের যাবতীয় ঝক্কি তিনিই সামলান।

আগেই ম্যারেজ রেজিস্টার মিষ্টি খেয়ে বেরিয়ে গেছেন। তিনি কিছুতেই ভাত খেতে চাইলেন না। সবাই টেবিলে খেতে খেতে গল্প জুড়ে দিলো। আনন্দি হঠাৎ বলে বসলো,
-- এরপর রিসেপশন পার্টিটা হয়ে গেলেই আবার মেয়ে দেখতে শুরু করতে হবে
সবাই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালো। কার জন্য মেয়ে দেখতে হবে কেউই বুঝতে পারলো না।বিজয় আনন্দির দিকে তাকিয়ে বলল,
-- ভুল বললে মেয়ে নয় ভালো একটা ছেলে দেখতে হবে। তোমার পরীক্ষাটা শেষ হলেই এবার উঠেপড়ে লাগবো তোমার বিয়ের ভোজ খাওয়ার জন্য
সবাই একসাথে হেসে উঠলো। আনন্দি মুখটা গম্ভীর করে বলল,
-- আজ্ঞে না, এবার একটা সুন্দর মেয়েই দেখতে হবে আর সেটা তোমার জন্য 
বিজয় এ'কথা শুনে প্রচণ্ড ভিসুম খেলো। তাড়াতাড়ি করে আনন্দি জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে
-- বিয়ের কথা শুনেই ভিসুম খেলে? বিয়ে ঠিক হলে না জানি কী কী খাবে।
তবে কথাটা সে খুব নিচু স্বরেই বলে। কারণ দু'জনেই বসে ছিল পাশাপাশি।

ক্রমশ 

   

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫২)



    বিনীতা রেজিস্ট্রিতে নিজেই সাজবে বলেছিল। কিন্তু আনন্দির ঘ্যানঘ্যানানির পানপ্যাণীর জন্য পার্লারের লোক আনতে বাড়ির লোক বাধ্য হন। খুব সুন্দর করে তারা বিনীতাকে সাজিয়ে দেয়। 
   সকাল ঠিক এগারোটায় রেজিস্ট্রি অফিসার এসে পৌঁছতেই বাড়ির ভেতর একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো। সবাই যেন হঠাৎ একটু গুছিয়ে দাঁড়াল— এই কয়েকটা মিনিটেই জীবনের বড় একটা অধ্যায় বদলে যাবে দু'টি  তরুণ তরুণীর।
বিনীতা তখন ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে। পার্লারের লোকেরা কাজ শেষ করে চলে গেছে, কিন্তু আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে এখনও তার কেমন যেন অচেনা লাগছে। এতদিনের চেনা নিজেকে আজ নতুন মনে হচ্ছে—আজ সে শুধু বিনীতা নয়, কারও স্ত্রী, কারো বৌদি আবার কারো বা পুত্রবধূ হতে চলেছে। বাড়ির একমাত্র মেয়ের অন্য বাড়িতে নানান রুপের প্রকাশ হতে চলেছে।
আনন্দি এসে পাশে বসে হালকা করে ধাক্কা দিলো
-- কী গো এত চুপ করে কেন? দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। সাজটা কি অনলবাবু দেখেছেন? তিনি তো নতুন পাঞ্জাবী পায়জামা পরে বর সেজে বসে আছেন। 
বিনীতা একটু হেসে বললো, 
-- আমি বৌ সাজলে তাকে তো বর সাজতেই হবে গো। 
বলেই হাসি বিনীতার
আনন্দি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, 
-- এই হচ্ছে হবে এটাই ভালো ছিল জানো ? হয়ে গেলো মানে ব্যাস চিন্তা,ভাবনা, আয়োজন সব শেষ।ভালো জিনিস দেরি করে হলে সব ভালো হয়। আর তুমি তো কালই উড়ে যাবে, আহারে বেচারি বৌদি আমার !
শোনো আজ কিন্তু ফুলশয্যা। দেখোনি তো দাদার খাটটা যা দুর্দান্ত সাজানো হয়েছে। বেচারা খাটে উঠতে পারছে না সেই চেয়ারেই বসে রয়েছে। বলেছি আগে বৌদি বসবে তারপর তুই বসবি।
বিনীতা লজ্জা পেয়ে মুখটা নিচু করে নিলো।
   ওদিকে ড্রইংরুমে টেবিল-চেয়ার সাজানো হয়েছে। রেজিস্ট্রি অফিসার কাগজপত্র খুলে বসেছেন। অনল একটু অস্থিরভাবে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার। তার চোখে একটা চাপা টেনশন—কিন্তু তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অদ্ভুত একটা স্বস্তি। বেশ কয়েকবার মনেমনে ভেবেছে পার্লারের লোক যখন চলে গেছে বিনীতার সাজ শেষ হয়ে গেছে। কেমন লাগছে একটু দেখতে পেলে হত।
আনন্দির পিছনে লাগার ভয়ে সে আর সাহস করেনি। সবকিছু যেন স্বপ্নের মত লাগছে আজ তার কাছে। এত তাড়াতাড়ি এত সহজে সবকিছুর অবসান হবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। মোবাইলটা খুলে বিজয়ের পাঠানো সেই রাতে বিয়ের সময়ের কয়েকটা ছবি দেখতে দেখতে তার আবারও মনেহল, 'সত্যিই ঈশ্বরের লীলা বোঝা দায়।'
মামী এসে বিনীতাকে ডাকলেন,
-- চল মা, সবাই অপেক্ষা করছে। যত তাড়াতাড়ি এই কাজটা শেষ হবে তত তাড়াতাড়িই আমরা খেয়েদেয়ে আড্ডা দিতে পারবো।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো বিনীতা। তার পায়ের শব্দ যেন আজ একটু ভারী—প্রতিটা পা ফেলায় যেন একটা নতুন দায়িত্ব, নতুন সম্পর্ক জুড়ে যাচ্ছে। মামিমা আর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- ভীষন মিষ্টি লাগছে তোকে দেখতে। আমার ছেলেটার যে কী অবস্থা হবে তোকে দেখে।
বলেই হেসে দিলেন।
বিনীতা লজ্জায় পুরো লাল! সে আর মুখ তুলে তাকাতেই পারছে না।
অনলের সামনে এসে বসতেই দু’জনের চোখ একবারের জন্য মিললো। কিছুই বলা হলো না, কিন্তু সেই এক পলকের দৃষ্টিতে হাজারটা কথা আদান-প্রদান হয়ে গেল। 
রেজিস্ট্রি অফিসার তার প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। 
প্রথমে অনল, তারপর বিনীতা দু’জনেই মাথা নাড়লো। বিনীতার গলায় শব্দ আটকে যাচ্ছিল,  সেটা হয়ত লজ্জায় কিংবা হয়ত নতুন জীবনে পা ফেলতে গেলে সকলেরই মনের ভিতরে একটা আড়ষ্টতা কাজ করে তারই প্রতিফলন।
  সই করার সময় হাতটা সামান্য কেঁপে উঠলো তার। অনল সেটা খেয়াল করেই হালকা করে টেবিলের নিচে তার হাতটা ছুঁয়ে থাকলো। একটা আশ্বাস, একটা নীরব ভরসা। নীরবে বলতে চাইলো শুধু 'আমি  আছি তোমার সাথে। কোন ভয় নেই।'
সব কাগজপত্র সই হওয়ার পর অফিসার হাসিমুখে বললেন,
-- অভিনন্দন, এখন আপনারা আইনত স্বামী-স্ত্রী।
এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। দু'জন দু'জনের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইলো। দু'জনের চোখের সামনে ভেসে উঠলো বেশ কয়েকমাস আগের সেই বিয়ের দিনের ঘটনা। সবকিছু যিনি লন্ডভন্ড করে দিয়েছিলেন তিনিই যেন আবার সবকিছু সুন্দরভাবে গুছিয়ে ঠিক করে দিলেন।
তারপরই বাড়ির মধ্যে উলুধ্বনি, হাততালি, হাসির শব্দে ভরে উঠলো চারপাশ। হল নতুন করে আর একবার মালাবদল।
আনন্দি দৌড়ে এসে বিনীতাকে জড়িয়ে ধরলো,
-- হয়ে গেল  বিয়ে! তুমি এখন থেকে আমার বৌদি। কত ভয় ,জল্পনা,কল্পনা - দেখলে তো সব কেমন সুন্দরভাবে হল।
বিনীতা হেসে ফেললো, কিন্তু চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। আনন্দি সেটা দেখে বললো,
-- এই এই, এখনই কাঁদবে না! কাল তো যাচ্ছ, তখন কাঁদার অনেক সময় পাবে।
বিনীতা একে একে সকলকে প্রণাম করলো।  মাকে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। সুস্মিতাও মেয়েকে জড়িয়ে বারবার চোখের জল মুছছেন। বিজয়কে প্রণাম করতে গেলে সে বোনকে বুকের উপর মাথাটা রেখে বলল,
-- আমরা ঈশ্বরের হাতে খেলার পুতুল রে! তার ইচ্ছে ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না। মিছেই আমরা ভাগ্যের দোষ দিই। যা ঘটবে তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। খুব ভালো থাকবি তুই, খুব সুখী হবি। অনল খুব ভালো ছেলে। ছোটবেলা থেকেই আমি ওকে চিনি। মাঝে কয়েকটা বছর যোগাযোগটা বন্ধ ছিল। আবার দেখ ঠিক সময়মত ওর সাথে কেমন যোগাযোগ হয়ে গেলো।
অনল একটু দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি, অনেকদিনের একটা ভারী পাথর যেন বুক থেকে নেমে গেলো। কীকরে, কীভাবে যে সবকিছুর এত সুন্দর সমাধান হয়ে গেলো ভাবলেই সে অবাক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চোখে তার যেন একরাশ চিন্তা এই অল্প সময়ের সম্পর্ককে এত তাড়াতাড়ি দূরত্বে ঠেলে দিতে হচ্ছে ,মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা। কাল সকালেই বিনীতা ভোরের ফ্লাইটে চলে যাবে। ভাবলেই মনটা ভীষন খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার। চাকরি বাঁচানোর তাগিদে হলেও এই চলে যাওয়াটা মানিয়ে নেওয়া কি এত সহজ হবে? মন সায় দিচ্ছে না কিছুতেই।

   তবু আজকের দিন এবং রাতটা শুধু তাদের। এই কয়েকটা ঘণ্টা, কয়েকটা মুহূর্ত যেখানে নতুন জীবনের শুরুটা একটু হলেও নিজেদের মতো করে কাটিয়ে আবার দিনের পর দিন অপেক্ষা কবে আবার দেখা হবে।
  এবার শুরু হল ভাতকাপড়ের অনুষ্ঠান। লিজা আর ইরা থালা গুছিয়ে আগেই রেখেছিলেন। আনন্দির সহযোগিতায় লিজা থালা দু'টি নিয়ে আসলেন অনল ও বিনীতার সামনে। কিন্তু অনল কিছুতেই বলবে না ভাত, কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম। সে থালা নিয়ে দাঁড়িয়েই আছে। মামা তার অবস্থা বুঝতে পেরে বলেন,
-- ওরে আজকের দিনে স্বামীরা চাকরিজীবী মেয়েদের দায়িত্ব নেয় না। কিন্তু নিয়ম রক্ষার্থে তো কিছু একটা বলতে হবে।
অনল থালাটা বিনীতার হাতে দিয়ে বলল,
-- আজ থেকে সুখে,দুঃখে, হাসি, আনন্দে আমরা সারাজীবন দু'জন  দু'জনের পাশে থাকবো এই অঙ্গীকার করি এসো।
বিনীতা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে থালাটা ধরে। তার হাত থেকে থালা দু'টো নিয়ে লিজা টেবিলের উপর রেখে বলেন,
-- সবাই খেতে বোস। বিনীতা সকলের থালায় ঘি-ভাত  দিয়ে দাও।একসাথেই সবাই খেতে খেতে গল্প হবে।
টেবিল রেডি করতে করতে লিজা কথাগুলি বললেন।
এমনিতেই ইরা একটু কম কথা বলেন। আর তার ভাইবৌ যদি থাকেন সংসারের যাবতীয় ঝক্কি তিনিই সামলান।

আগেই ম্যারেজ রেজিস্টার মিষ্টি খেয়ে বেরিয়ে গেছেন। তিনি কিছুতেই ভাত খেতে চাইলেন না। সবাই টেবিলে খেতে খেতে গল্প জুড়ে দিলো। আনন্দি হঠাৎ বলে বসলো,
-- এরপর রিসেপশন পার্টিটা হয়ে গেলেই আবার মেয়ে দেখতে শুরু করতে হবে
সবাই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালো। কার জন্য মেয়ে দেখতে হবে কেউই বুঝতে পারলো না।বিজয় আনন্দির দিকে তাকিয়ে বলল,
-- ভুল বললে মেয়ে নয় ভালো একটা ছেলে দেখতে হবে। তোমার পরীক্ষাটা শেষ হলেই এবার উঠেপড়ে লাগবো তোমার বিয়ের ভোজ খাওয়ার জন্য
সবাই একসাথে হেসে উঠলো। আনন্দি মুখটা গম্ভীর করে বলল,
-- আজ্ঞে না, এবার একটা সুন্দর মেয়েই দেখতে হবে আর সেটা তোমার জন্য 
বিজয় এ'কথা শুনে প্রচণ্ড ভিসুম খেলো। তাড়াতাড়ি করে আনন্দি জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে
-- বিয়ের কথা শুনেই ভিসুম খেলে? বিয়ে ঠিক হলে না জানি কী কী খাবে।
তবে কথাটা সে খুব নিচু স্বরেই বলে। কারণ দু'জনেই বসে ছিল পাশাপাশি।

ক্রমশ