ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৭)
ঘরে সবাই চুপ। একটা পিন পড়লেও শব্দ হবে। লিজা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- তুমি বলবে নাকি আমি বোলবো
-- দেখো তোমার বলাই ঠিক হবে। কারণ আমি তো ডিটেলস্টা বলতে পারবো না। তুমি পুরো ঘটনাটাই জানো। তাই তুমিই বলো।
আনন্দি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। তিনি চোখ, ভ্রু কুঁচকে আছেন। অনল মুখ নিচু করে মামীর পাশে বসে।
লিজা শুরু করলেন,
-- অনল তার হঠাৎ করে দেখা ছেলেবেলার বন্ধুর বোনের বিয়েতে অর্থাৎ বিনীতার বিয়েতে গেছিলো।
অনলের মা যেন আতকে উঠলেন।
-- বিনীতা বিবাহিতা?
-- সমস্ত কথা শোনো ইরা তারপর নাহয় যার যার কথা বোলো বোন।
-- হ্যাঁ বিনীতা বিবাহিতা। কিন্তু তার স্বামী কে শুনলে তুমি অবাক হবে। তাই বলছি চুপ করে আমার কথা শোনো আর অবাক হোও না।
-- বৌদি এত সাসপেন্স রেখে না বলে সরাসরি বলো কী হয়েছে?
-- একটু ধৈর্য ধরো বোন। সব বলবো। বলবো বলেই সবাইকে এখানে ডেকে এনেছি।
--তো অনল তার বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেলো। কিন্তু বর এলো না। বলা ভালো আসতে পারলো না। বর বেরোনোর সময় তাকে কিছু দুষ্কৃতী গুলি করে পালিয়ে যায়। বিনীতার ছোট মামা সেই খবর বিনীতার দাদাকে জানায়। বুঝতেই পারছো তখন বাড়ির পরিস্থিতি। বিনীতার দাদা বিজয় তখন কোন উপায় না দেখে ছোট থেকে চেনা বন্ধুটিকে বলে, তার বোনকে বিয়ে করে লগ্নভ্রস্তা হতে মুক্তি দিতে।
-- মানে অনলকে
-- হ্যাঁ ইরা।
-- আর ও বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেলো?
-- অনল তো সে ছেলে নয়। ও ওর মা, বাবার কথা, বোনের কথা, ওকে নিয়ে তাদের স্বপ্নের কথা সব বলে বিয়ে করতে রাজি নয় বলে দিলো। সবই বিধাতার লিখন ইরা।তুমি ঈশ্বর বিশ্বাসী। নিজেও বুঝতে পারছো যা তিনি ঠিক করেছেন তা ঘটবেই।
তখন শুধুমাত্র বিনীতাদের বাড়ির সম্মান বাঁচাতে লোক দেখানো বিয়েই করতে বলে তার বন্ধুটি। অনল তখন কী করবে? একটা লোকদেখানো বিয়েই হয় শেষ পর্যন্ত। কিন্তু যতই লোক দেখানো হোক না কেন বিয়ে তো বিয়েই। অনল বৌ বাড়ি আনতে সাহস পায় না। বিনীতা কিংবা তার বাড়ির লোকও জোর করে না। তারপর দেখা দু'জনের এই বাড়িতে।
অনলের মা ইরা এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিলেন। মুখটা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠেছে। চোখে বিস্ময়, রাগ, কষ্ট—সব মিশে আছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সে মুখ নিচু করেই বসে আছে।কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন—
-- বৌদি, তুমি এসব কবে জানলে? আমার ছেলের জীবনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো, আর আমি কিছুই জানলাম না? ও আমাকে জানাতে সাহসই পায় নি? এই ওদের আমি বন্ধুর মত করে মানুষ করেছি?
লিজা শান্ত গলায় বললেন,
--জানি ইরা, তোমার রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরিস্থিতিটা এমন ছিল যে তখন কাউকে কিছু জানানোর মতো সময়ই ছিল না অনলের পক্ষে।
-- কাছে ফোন ছিল না? কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার ছিল এটা। অনুমতি নেওয়ার কথা বলছি না। কিন্তু বিয়ে করছি কিংবা করতে বাধ্য হয়েছি এই কথাটা জানাতে কতটুকু সময় লাগতো?
ইরা একটু গলা উঁচু করলেন
---সময় ছিল না মানে? বিয়ে হয়ে গেলো, সেটা জানাতে সময় ছিল না? অনল, তোর একবারও মনে হয়নি তোর জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত আমাদের জানা উচিত।
অনল কিছু বলতে যাচ্ছিল। হাত চেপে মামী বাধা দিলেন। তিনি ধীরে ধীরে ইরার পাশে এসে বসে বললেন,
--- সিদ্ধান্তটা অনল নেয়নি ইরা, পরিস্থিতি ওকে নিতে বাধ্য করেছে। তুমি নিজেই ভাবো, একটা মেয়ের বিয়ের লগ্নে বর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় অন্তত সেই মুহূর্তে বাড়ির লোকজন তাই মনে করেছিল কারণ খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করেছিল। কয়েকমাস কোমায় থেকে সে এখন সুস্থ আছে। কিন্তু সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। ঈশ্বরের অশেষ দয়া যে সে বেঁচে আছে।সেই মুহূর্তে ওই বাড়ির মানসম্মান, একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ—সব একসাথে ঝুলে আছে। তখন ও কি করতো বলো?
ইরা একটু থেমে গেলেন। চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু গলার দৃঢ়তা তখনও আছে
-- তাই বলে নিজের জীবনের কথা একবারও ভাবলো না? আমাদের কথা? আমাদের স্বপ্ন?
-- ভেবেছিল ইরা, খুব ভেবেছি
লিজা নরম গলায় বললেন
---তাই তো প্রথমে না করে দিয়েছিল। কিন্তু যখন দেখলো একটা মেয়ের জীবন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, তখন নিজের কথা না ভেবে এগিয়ে গেছে। তুমি তো ওকে চেনো… ও এমনই। ওর এই মানসিকতা যে ও তোমার থেকেই পেয়েছে এটা কি তুমি অস্বীকার করতে পারো? মানুষের কষ্টে তোমার মত ওরও যে মন কাঁদে। ওই মুহুর্তে ওই বিয়েটা যদি না করে ওখান থেকে চলে আসতো আর এসে তোমায় এই কথাগুলো গল্প করতো তুমি খুশি হতে? তুমি কি তাকে বলতে না? "এই শিক্ষা দিয়ে তোকে মানুষ করেছি। বিপদে মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে চোরের মত পালিয়ে আসলি বিয়েবাড়ি থেকে?" মেনে নিতে পারতে তুমি তোমার ছেলের সেই আচরণ?
ইরা এবার একটু চুপ করে গেলেন। অনলের দিকে তাকালেন। অনল এখনও মাথা নিচু করে বসে আছে।
-- তাহলে এখন কী করতে হবে?
ইরার গলায় ক্লান্তি—এই বিয়েটা কি সত্যি বিয়ে? নিয়ম মেনে সিঁদুর দান হয়েছিল? সব নিয়মকানুন বিয়েতে ঠিকঠাক মানা হয়েছিল?
একটু থেমে আবারও বললেন,
--তাই বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই মুখ ছিল থমথমে। আমি তো কিছুই বুঝিনি।
তারপর আনন্দির দিকে ফিরে বললেন,
-- এই তুই কিছু জানতিস?
আনন্দি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
-- না কিছুই জানতাম না। বিনীতাদের বাড়িতে যাওয়ার পর বিনীতা সব বলল।
-- এই বিনীতা কিরে? বৌদি বল
দেবদূতের মুখে হাসি ফুটে উঠলো বোনের মুখে এই কথা শুনে। তিনি বুঝতে পারলেন শেষটা সুখের হতে চলেছে।
অনল একবার মাথা তুলে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েই মুখ নামিয়ে নিলো -
ইরা আবার বললেন,
-- সেদিন তো বিয়েটা হয়েই গেছে। আবার বিয়ে দেওয়ার তো কোন দরকার নেই। এবার বৌভাতটা করে দায়িত্বটা নিয়ে নিক।
লিজা একটু হেসে বললেন— -- প্রথমে দায়িত্ব ছিল, ঠিকই। কিন্তু এখন বিষয়টা শুধু দায়িত্বের মধ্যে নেই ইরা।
ইরা কপাল কুঁচকে বললেন
-- মানে?
-- মানে, ওরা দু’জনেই একে অপরকে বুঝতে শুরু করেছে। সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কটা বদলেছে। তুমি খেয়াল করোনি? বিনীতার চোখে অনলের জন্য যে টান… আর অনলের আচরণ…ওরা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলেছে। আমাদের পিছিয়ে আসার আর কোন উপায় নেই।
-- পিছিয়ে কেন আসবো? ধাক্কাটা সামলাতে তো একটু সময় লাগবে।
তারপর ইরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-- আমি শুধু একটা কথাই জানি বৌদি আমার ছেলে যেন সুখে থাকে। সে যদি সত্যিই ওই মেয়েটাকে মেনে নিয়ে থাকে তাহলে আমি তো বাধা দেবো না।
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
-- কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আমি বিনীতার সাথে নিজে কথা বলবো। সবটা বুঝে নিতে চাই। ওর মুখ থেকে সবটা শুনতে চাই মানে ওই আচারানুষ্ঠান সম্পর্কে।
লিজা মৃদু হাসলেন,
-- সেটাই তো হওয়া উচিত ইরা। কথা বলো, বুঝো আমি আর তোমার দাদা শুধু চাই, তুমি ওদের সম্পর্কটা মেনে নাও। বিনীতা খুব ভালো মেয়ে গো ইরা। সেই ছোটবেলায় ওকে দেখেছিলাম। আর সেদিন শিলিগুড়ি দেখা হল। দেখেই চিনতে পেরেছি। পুরো মায়ের মুখটা কেটে বসানো। ওরা খুব সুখী হবে দেখো।
ইরা ধীরে মাথা নাড়লেন। ঘরের ভারী পরিবেশটা একটু যেন হালকা হলো।
-- তাহলে বিয়েটা কি আবার হচ্ছে নাকি আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে বৌ নিয়ে চলে আসবো?
দেবদূতের কথা শেষ হলে অনলের বাবা বললেন,
-- বুঝতেই পেরেছিলাম মারত্মক কিছু একটা ঘটেছে। আমার মতে আবার বিয়ে দেওয়ার দরকার কী? খামোখা আরও কিছু অর্থ খরচ। দুই পক্ষ থেকে একজায়গায় একটা অনুষ্ঠান করলেই তো হয়ে যায়। দেখো তোমরা চিন্তাভাবনা করে -
অনলের বাবা কথাগুলো বলে নিজ ঘরের দিকে রওনা দিলেন।
-- তা বৌদি এই বিশাল ঘটনা তুমি জানলে কবে? ওখানে গিয়ে নাকি আগেই -
-- আরে আমি তো জেনেছি গতকাল রাতে। আনন্দিও তাই।
-- ওহ্ তারমানে ওই সেদিন অফিস থেকে ফিরে বউকে দেখেই উনি ওই জন্যই বলেছিলেন, "আজ কেউ কোথাও যাবে না।"
লিজা আর দেবদূত হেসে দিলেন বোনের কথা শুনে।
অনল উঠে গিয়ে মায়ের পায়ের উপর পড়ে বলে,
-- মা ক্ষমা করে দাও। আর কোনদিনও তোমায় না জানিয়ে কিচ্ছু করবো না। সেদিন যে কী পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলাম তা তুমি ভাবতেই পারবে না।
ইরা ছেলের কান ধরে উঠাতে উঠাতে বললেন,
-- আর বিয়ে থার দরকার নেই। এবার বৌভাতটাই হোক শুধুমাত্র।
ঘরের পরিবেশ হালকা হল ঠিক যেন ভ্যাপসা গরমের পর শান্তির বাতাবরণ হিসাবে এক পশলা বৃষ্টি।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment