ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪৫)
বহুদিন পরে বাড়িতে আজ খুশির আমেজ। আজ অর্পণের জন্মদিন। সেভাবে জাঁকজমক করে জন্মদিন পালন না হলেও এবারের জন্মদিনে নিমন্ত্রিত ময়ূর। অর্পিতা বুঝতে পেরেছে তার দাদার প্রতি ময়ূরের দুর্বলতা।
প্রায় বারো বছরের বয়সে বড় অর্পণ স্বপ্নেও সেকথা মনে আনেনি। সে তার বোনের বন্ধু অর্থাৎ কিনা তার আর একটি বোন এভাবেই কথা বলে থাকে। কিন্তু ময়ূর যে আস্তে আস্তে অর্পণকে মনের মধ্যে অনেকটাই জায়গা দিয়ে ফেলেছে সে কথা অর্পণ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। নিজের থেকে এতটা ছোট একটা মেয়ের সম্পর্কে এসব কথা তার অবচেতনেও মাথাতে আসেনি।
অর্পণের জন্মদিনের বিকেলটা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে গড়াতে থাকল। অর্পিতা দুপুরেই ময়ূরকে আসতে বলেছিল। কিন্তু ময়ূর বলেছিল,
-- না আমি সন্ধ্যাতেই আসবো
-- কেন সেজেগুজে এসে কাকে দেখাবি বলতো?
ময়ূর একটু লজ্জা পেয়ে গেলেও ধরা দিলো না। সে বলল,
-- প্রথমত মানুষ সাজে তার মানসিক শান্তির জন্য। দ্বিতীয়ত কেউ যদি তার সেই সাজকে প্রশংসা করে তাহলে সেই সাজের আনন্দ আর মানসিক শান্তি অনেক অনেক গুন বেড়ে যায়।
-- তাহলে তুই বলতে চাইছিস মানুষ কাউকে দেখানোর জন্য সাজে না?
-- না তাতো আমি বলিনি। অনেক সময় মানুষ নিজেকে এমনভাবে তৈরি করে যাতে তার প্রিয়জন খুশি হয়। সে শুধু সাজ কেন? রান্নাবান্না, কথাবার্তা, আচারআচরণ - সবকিছুতেই হতে পারে।
-- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে তুই তোর মানসিক শান্তির জন্যই সেজে আসিস। কিন্তু দুপুরবেলা আসলে ভালো লাগতো। আমরা তো নিজের নিজেরাই।
-- নারে হবে না। তাহলে আমি চলেই আসতাম।
-- তাহলে একটু তাড়াতাড়িই আসিস।
-- ওক্কে ইয়ার
বাড়ির ছোট্ট ড্রয়িংরুমে কেক, কিছু সাধারণ সাজসজ্জা আর মাত্র দুটি বাচ্চা হাসি-আড্ডায় একটা উষ্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অর্পিতা বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে—ময়ূর এখনও আসেনি। দাদাকে বেশ কয়েকবার তাগাদা দিয়েছে নতুন পাঞ্জাবি পায়জামাটা পরে আসার জন্য। অর্পিতা রক্ষা পেয়েছে আজ রবিবার তাই। তানাহলে তো দাদার ফিরতে হয়ত রাত কাবার হয়ে যেত।
সাধারণত অর্পণ, অর্পিতার জন্মদিনে মা একটু পায়েস করে দেন আর একটু বাজারটা সেদিন অন্যরকম হয়। কিন্তু এবার অর্পিতার ইচ্ছার কারণেই এইভাবে আয়োজন।
অবশেষে কলিংবেলের শব্দ। দরজা যদিও খোলাই ছিল কিন্তু তবুও ময়ূর বেল বাজিয়েই ভিতরে এলো। অর্পিতা ঠিক বুঝতে পেরেছে এটা ময়ূরই -
হালকা হলুদ রঙের শাড়ি আর লাল ব্লাউজ হাতে একটা ছোট্ট গিফট প্যাকেট চোখে একটু কৌতূহল আর লাজুক হাসি। কাঁধে ঝুলছে ছোট সাদা পুঁতির একটা ব্যাগ। বেশ মিষ্টি লাগছে দেখতে ওকে
এই প্রথম ময়ূরকে শাড়ি পরা দেখে অর্পণ। প্রথম অবস্থায় যেন একটু হোঁচট খায়। কারণ এতদিন ধরে তাকে সালোয়ার কামিজ কিংবা জিন্স,টপে দেখে অভ্যস্ত। এক নিমেষেই অর্পণের মনেহল মেয়েটা বেশ বড় হয়ে গেছে তো।
অর্পণকে দেখতে পেয়েই -
— “শুভ জন্মদিন অর্পণদা,” একটু ইতস্তত করেই বলল সে।
অর্পণ হেসে বলল,
— আরে, এত ফরমাল কেন? তুমি তো শাড়ি পরে বেশ বড় হয়ে গেছো। খুব সুন্দর লাগছে দেখতে তোমাকে।
-- দাদা, তোর জন্মদিনে তো আমিও শাড়ি পরেছি,সেজেছি। কই তুই তো একবারও আমায় বলিসনি কেমন লাগছে আমায় -
-- ও বলিনি তোকে? কী আর বলবো তোকে ? পেত্নীকে সাজলে আর কতই না ভালো লাগবে বল?
হাত উঁচু করে অর্পণকে মা*রতে এগিয়ে গেলো অর্পিতা আর অর্পণ ফুড়ুৎ করে ঘরের ভিতরে দৌড় দিলো।
ময়ূর ঘরে ঢুকতেই অর্পিতা চোখ টিপে হেসেছিল। --শুনলি দাদার চোখে তোকে ভালো লাগছে আর আমায় পেত্নী লাগছে। তোকে যে কবে থেকে দাদার ভালো লাগতে লেগেছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না
-- অর্পি বড্ড বেশি কথা বলছিস তুই
কিন্তু সে যেন সবটাই উপভোগ করছে।
কেক কাটার সময় সবাই “হ্যাপি বার্থডে” গাইছে, কিন্তু ময়ূরের চোখ শুধু অর্পণের দিকেই। অর্পণ মোমবাতি নিভিয়ে যখন কেক কাটল, এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখাচোখি হলো। অর্পণ সেটা খুব স্বাভাবিকভাবেই নিল, কিন্তু ময়ূরের বুকের ভেতর যেন ধক করে উঠল।
আসলে ভালোবাসা তো কোন বয়স, সম্পর্ক, ধর্ম কিচ্ছু মানে না। যে কোন সময় যে কাউকেই ভালো লাগতে পারে আর সেই ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা জন্ম নিতেই পারে।
কেক খাওয়ানোর সময় অর্পিতা ইচ্ছে করেই বলল,
— দাদা, ময়ূরকে কেক খাওয়ালি না?
প্রথমে অর্পণ একটু ইতস্তত করলো পরে
একটু হেসে কেকের একটা টুকরো ময়ূরের দিকে বাড়িয়ে দিল।
ময়ূর হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়েও থেমে গেল, তারপর একটু লজ্জা পেয়ে মুখ বাড়িয়ে কেকটা খেল।
অর্পিতা বেশ উপভোগ করলো বিষয়টা। আর মনেমনে ভাবলো "কুছ কুছ হোতা হ্যায়।"
ঘরের ভিতরের আড্ডা জমে উঠেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে অর্পণের মা বললেন,
-- প্রচণ্ড গরম তো। সারাক্ষণই তো এসির মধ্যে সবাই। যা একটু ছাদের থেকে ঘুরে আয়।
অর্পিতার বিষয়টা বেশ লাগলো। সে মনে ভাবলো,
"আজ একটা সুযোগ আমার বন্ধুটিকে দিতেই হবে।"
কিছুক্ষণ পর ছাদে একটু হাওয়া খেতে গেল সবাই। পাশের বাড়ির দু'টো বাচ্চা আর ময়ূর এই হচ্ছে নিমন্ত্রিত লোকের সংখ্যা।অর্পিতা ইচ্ছে করেই কিছুক্ষণ বাদেই বাচ্চা দু'টিকে নিয়ে নিচে নেমে এল, আর ছাদে রয়ে গেল শুধু অর্পণ আর ময়ূর।
একটু নীরবতা।
অর্পণ বলল,
— “তুমি খুব চুপচাপ আজ।”
ময়ূর হালকা হেসে বলল,
-- বড় হচ্ছি তো তাই গম্ভীর হওয়ার প্র্যাকটিস করছি।
ময়ূরের কথা শুনে অর্পণের হাসি আর থামে না। সে হেসেই চলেছে আর ময়ূর তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
-- অর্পণদা তোমার হাসিটা তো খুব সুন্দর
বোকার মত কথাটা বলে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো। অর্পণ অবাক হল, ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকালো আর মুহূর্তেই ময়ূর নিজেকে সংশোধন করে বলল,
-- তোমার এত হাসির কী হল? কলেজ শেষ হল। যে কোন সময় চাকরি পেয়ে যাবো।গম্ভীর হতে হবে না? সেই জন্যই তো বলেছি।
-- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা কী জানো সবকিছু সবাইকে মানায় না। এই যেমন ধরো যে খুব উচ্ছ্বল সে যদি হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যায়, আবার যে খুব চুপচাপ যদি দেখা যায় সে চিংড়ি মাছের মত লাফালাফি করছে এগুলো ঠিক মানায় না।
ময়ূর এবার বেশ হাসছে। এই প্রথম অর্পণ ময়ূরের হাসির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে। হঠাৎ করে যেন ছাদের দখিনা বাতাস অর্পণের হৃদয়ে কিছুটা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে গেলো। বলে গেলো কেউ তার কানে কানে,
"মেয়েটিকে ভালো করে দেখো তো -"
পূর্ণিমার আলোতেও অর্পণের চোখের মুগ্ধতা ময়ূরের চোখ এড়ালো না। ময়ূর খুব লজ্জা পেয়ে গেলো। কিন্তু তবুও সাহস নিয়ে বললো,
-- কী দেখছ অর্পণদা?
অর্পণ স্বগতোক্তির মত আপনমনে বলে উঠলো, " এটা কী হল আমার? কেন হল? এটা কিভাবে সম্ভব?"
-- কী বলছো তুমি? কী সম্ভব? একাএকা মিনমিন করে কী বলছো তুমি?
-- ময়ূর নিচুতে চলো। অনেকক্ষণ আমরা দু'জন এখানে আছি।
-- কী হবে তাতে?
-- তুমি থাকো আমি নেমে যাচ্ছি।
-- হঠাৎ তোমার কী হল অর্পণদা?
অনল নিজেকে সামলাতে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। এসেই নিজের ঘরে ঢুকে গেলো। অর্পিতা বাচ্চা দু'টিকে টেবিলে খাওয়াচ্ছিল। সে জানতেও পারেনি যে দাদা নিচুতে এসে তার ঘরে ঢুকে গেছে। আর অর্পিতা একাই ছাদে হতভম্বের মত বসে। এইভাবে কিছুক্ষণ বসে থেকে সে আস্তে আস্তে ছাদ থেকে নেমে এসে সোজা অর্পণের ঘরে ঢুকে গেলো। অর্পণ চোখ বুঝে শুয়ে -
- কী হল তোমার? হঠাৎ এভাবে ছাদ থেকে পালিয়ে এলে?
ময়ূরের কথা শুনে অর্পণ উঠে বসে,
-- শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। তাই চলে এলাম।
-- না তুমি মিথ্যে কথা বলছো - ব্যাপারটা অন্যকিছু
ময়ূরের দৃঢ়তার কাছে ডাকসাইটে উকিল অর্পণ মজুমদার যেন একটু দমে গেলো। চোখ নিচু করে ময়ূরের দিকে না তাকিয়েই বলে,
-- সব সময় সব সত্যিকথা বলতে নেই। তাহলে ঝড় ওঠে
-- ভীরু, কাপুরুষেরা ঝড়ের ভয় পায়। তুমি তো তা নও।
-- সত্যিই তুমি বড় হয়ে গেছো ময়ূর।
ময়ূর উত্তর দিল না। শুধু মৃদু হাসল।
সেই হাসির মধ্যে লুকিয়ে ছিল অনেক অজানা কথা, না বলা অনুভূতি আর বুঝতে পারা অর্পণের মানসিক দ্বন্দ্ব।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment