ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৩)
বিনীতার নানান ভাবনার মাঝে হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। দেখে দাদা ফোন করেছে। ফোনটা কানে দিয়ে হ্যালো বলতেই বিজয় বলে উঠলো,
-- বেড়িয়েছিস?
এদিকে ফোনটা রিং হওয়ার সাথে সাথে আনন্দি বলল,
-- বিনীতা তুমি কথা বলতে লাগো আমি একটু আসছি।
বিনীতা ফোনটা কানে চেপে ধরে জানলার কাছে গিয়ে চাপাস্বরে দাদাকে বলল,
-- না, এখনো বের হইনি। কিন্তু দাদা একটা মারত্মক ঘটনা ঘটেছে।
-- কী হয়েছে? কোন খারাপ কিছু?
-- খারাপ কী ভালো বুঝতে পারছি না।
-- হেঁয়ালি না করে সরাসরি সব বল।
-- বলছি বলছি।
কানে আরও বেশি করে ফোনটা চেপে ধরে খুব আস্তে করে বিনীতা তার দাদাকে জানালো
-- আরে আমি যে বাড়িটাই এসেছি সেটা অনলদের বাড়ি
-- মানে
-- মায়ের ছেলেবেলার বন্ধু হচ্ছেন অনলের আপন মামী
-- ও মাই গড! অনলের সাথে দেখা হয়েছে? তুই কে কেউ কিছু বুঝতে পেরেছে?
-- তোর মাথাটাই গেছে। ওরা কীভাবে বুঝবে আমি এবাড়ির কে? অনল এখনো অফিস থেকেই ফেরেনি। মাসীমণি একটু পরেই আমায় নিয়ে বেরোবেন। দেখা হবে কিনা তাও জানি না।
-- আরে দেখা তো করতেই হবে। দরকার হলে আজ রাতটা ওখানেই থেকে যা।
-- তারা থাকতে না বললে আমি কি নিজের থেকে বলবো নাকি?
-- সেও তো এককথা। এত দেখি তোর জীবনের নাটক একেবারে জমে উঠেছে।
তারপর বিজয় একটু হেসে বলল,
-- নাটক না, একেবারে সিনেমা চলছে তোর জীবনে! তবে শোন, মাথা ঠান্ডা রেখে সবকিছু সামলাস। আবেগে কিছু বলে ফেলিস না যেন।
বিনীতা একটু থেমে নিচু গলায় বলল,
-- দাদা, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কী করবো। হঠাৎ করে যদি অনলের সামনে পড়ে যাই… কী বলবো ওকে?
-- তোকে কিছু বলতে হবে না। তুই চুপ থাকবি। ও তোকে তো কনের সাজে দেখেছিল। দেখ তোকে চিনতে পারে কিনা। তবে আমি আমার বন্ধুকে যতদুর চিনি ও তোকে ঠিক চিনতে পারবে। ও কী বলে বাড়িতে, এখনই কিছু বলতে চায় কিনা সেসব তো আমরা কিছুই জানি না। তবে যা হবে ভালোর জন্যই হবে। হুট করে তোর অনলের সাথে বিয়ে হওয়া আর এইভাবে ওই বাড়িতে পৌঁছে যাওয়া সব বিধাতা অঙ্ক কষেই করছেন। ওর সাথে দেখা হলে তুই একদম চুপ থাকবি। শুধু দেখবি ওর আচরণ কেমন।
-- কিন্তু ও যদি না চিনতে পারে?
-- আরে পারবে পারবে। আর না চিনলেও তুই নিজেকে সামলে নিলেই হবে। আমি মাকে সবটা জানাচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে ভাবিস না।
কথা বলতে বলতে বিনীতা জানলার বাইরে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-- জানিস দাদা, বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে… মনে হচ্ছে অনেকদিনের জমে থাকা কিছু একটা আজ সামনে আসতে চলেছে।
বিজয় একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
-- এটাই তো জীবন রে বোন !কখন কার সাথে, কীভাবে দেখা হয়ে যাবে কেউ জানে না। তবে একটা কথা মনে রাখিস—নিজেকে ছোট করে কিছু বলবি না। তুই যা, যেমন, সেটাই থাকবি।
-- হুম… আমাকে তো চিনিস। নিজেকে ছোট করে আমি আমার প্রাপ্য পেতে চাই না। তবে ওরা যদি আমায় থাকতে না বলে আমি কিন্তু নিজের থেকে এখানে থাকতে চাইবো না।
-- সেতো অবশ্যই।আর একটা কথা, অনল যদি সত্যিই তোকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে সে নিজেই এগিয়ে আসবে। তোকে জোর করে কিছু করতে হবে না। আর আমি জানি মাত্র একটা দিনেই অনল তোকে ভালোবেসে ফেলেছে। কারণ ওর সাথে আমার ফোনে কথা হয়েছে আগেই। ওর কথা শুনে আমার এটাই মনে হয়েছে। ও এগোতে পারছে না কারণ তোর দিক থেকে কোন সাড়া ও পায়নি।
বিনীতা হালকা হেসে বলল,
-- আমি জানি না দাদা কী হচ্ছে আর কী হতে চলেছে।
-- যা হবে ভালোই হবে। কিচ্ছু ভাবিস না।
-- হঠাৎ করে এখানে এসে পড়ে আর এই বাড়িটাই অনলদের বাড়ি জেনে আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। মাথাটাই কাজ করছে না।
-- তোর মুখে এসব শুনতে আমার ভালো লাগে নারে। তুই তো দুর্বল নোস ।
-- এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি যে দুর্বল হতে বাধ্য হচ্ছি।
--আচ্ছা আচ্ছা, এখন বেশি ইমোশনাল হবি না।
ঠিক তখনই পিছন থেকে আনন্দির গলা শোনা গেল,
-- বিনীতা, আমি রেডি। তুমি কি রেডি হয়ে গেছো?
বিনীতা তাড়াতাড়ি ফিসফিস করে বলল,
-- দাদা, পরে কথা বলবো। ওরা এসে গেছে। এবার মনেহয় বেরোতে হবে
-- ঠিক আছে, আপডেট দিতে ভুলিস না কিন্তু!
-- আচ্ছা, রাখছি।
ফোনটা কেটে দিয়ে বিনীতা একবার নিজের মুখটা আয়নায় দেখল। চোখে স্পষ্ট উত্তেজনা আর অজানা এক আশঙ্কা। নিজের মনকে শক্ত করে নিয়ে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল…
আজ হয়তো সত্যিই তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
-- বলছিলাম কী রেডি আমি, মামী দুজনেই। কিন্তু আজকের রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে গেলে হত না?
এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল বিনীতা।
-- হ্যাঁ সে থাকা যেতেই পারে। কিন্তু থাকলে লাভটা কী হবে?
বিনীতা হাসতে থাকে।
-- লাভ বলতে আমরা সারাটা রাত গল্প করতে পারবো।মামিমারও একটু বিশ্রাম হবে এই আর কী?
বিনীতারও যে থাকার ইচ্ছা সেটা তো বুঝতে দেওয়া যাবে না। তাই অভিনয়টা কিছুক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে অন্তত অনল না ফেরা পর্যন্ত।
বিনীতা ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে নিতে বলল,
-- দেখো আজ যদি আমি চলে যাই'ও তোমাদের আমার এত ভালো লেগেছে আমি আবারও আসবো তোমাদের কাছে।
এরই মধ্যে কলিংবেল বেজে উঠলো। আনন্দি বলে উঠলো
-- ওই দাদা এসে গেছে। এবার আর বেরোনো হবে না
-- ওমা কেন? তোমার দাদা কি মানুষকে বাড়িতে আটকে রাখে নাকি?
-- কোন মানুষকে এখনো আটকে রাখতে দেখিনি। কিন্তু তুমি এত সুন্দরী তোমায় আটকে দিতেও পারে।
-- এই তোমার মুখে কিছুই আটকায় না কেন? এইভাবে কেউ বলে?
-- দেখো আমার মনে যা আসে আমি তাই বলে ফেলি। দেখাই যাক না দাদা তোমাদের যেতে দেয় কিনা।
অনল মামা,মামীকে দেখেই প্রণাম করে জানতে চায়,
-- ভালো আছো তো তোমরা? কত বছর বাদে তোমাদের দেখলাম বলো তো?
মামা ভাগ্নেকে বুকের সাথে চেপে ধরে বললেন,
-- আরে ভালো আছি বলেই তো এতদূর আসতে পারলাম। এখন বল তুই কেমন আছিস? বৌমা কবে আসবে ঘরে? এবার একদম বৌমাকে এনে তবে ফিরবো।
অনল মৃদু হেসে দিয়ে বলে,
-- আসবে আসবে।সময় হলেই আসবে। সবকিছুর একটা সময় আছে তো। সবে মাত্র চাকরি পেয়েছি এরই মধ্যে বিয়ে নিয়ে ভাবলে চলে?
বিনীতা রেডি হয়ে আনন্দির সাথে ড্রয়িংরুমে এসে ঢোকে। সে বিনীতার দিকে না তাকিয়েই বোনকে বলে,
-- এই ভর সন্ধ্যাবেলায় সেজেগুজে কোথায় চললি?
কথাটা বলেই পাশে তাকিয়ে দেখে বিনীতা দাঁড়িয়ে। বিনীতার মুখের দিকে তাকিয়ে অনল পুরো থ। এ কাকে দেখছে সে? কিভাবে এখানে এলো? কার সাথে এলো?বাড়ি চিনলো কীকরে?
অনলের অবাক করা মুখের দিকে তাকিয়েই বিনীতা নিচের দিকে চোখ নামিয়ে নিলো। কিন্তু অনলের মুখ থেকে আর একটাও কথা বের হচ্ছে না। সে বিনীতাকে দেখে একেবারে বোবা হয়ে গেছে।
এদিকে মামা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে এবার তোমরা বেরিয়ে পড়ো। আর শোনো পৌঁছাতে যদি খুব বেশি রাত হয় আজ আর তোমরা ফিরো না। কাল সকালেই ফিরো।
অনল বুঝতে পারছে না কারা বেরোচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কাদের রাত হলে ফিরতে নিষেধ করা হচ্ছে। সে হতভম্বের মতই বিনীতার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। বিনীতা সেই যে মাথা নিচু করেছে আর মাথা তোলেনি।
মামা তখন বললেন,
-- হ্যাঁরে অনল তুই একটা উবের বুক করে দে তো। তোর মামীর পাল্লায় পড়ে মেয়েটার বাড়ি পৌঁছাতে কত দেরি হল। ওর মা,ভাই কত চিন্তা করছেন বলতো?
অনল সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ঘরে যেতে যেতে বলল,
-- এই সন্ধ্যাবেলায় কেউ কোথাও যাবে না। মামীর বয়স হয়েছে। এতটা জার্নি করে এসেছেন। আবার এখন বেরোবেন। ওটা একটু গ্রামের দিকে বাড়ি। তিনজন মহিলাকে ছাড়া যাবে না।
মামা অবাক হয়ে বলে উঠলেন,
-- ওরে তোকে তো এখনো আমি লোকেশন পাঠাইনি। তুই কীভাবে বুঝলি ওটা একটু গ্রামের ভিতর
অনল নিজের জিহবা নিজেই কামড়ে নিল। বিনীতা মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে পড়লো। অনল যেন মামার কথা শুনতেই পায়নি এমন ভাব দেখিয়ে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলো
ক্রমশ