ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩৬)
পঞ্জিকা দেখে পুরোহিত মশাই একদিন পরেই আশীর্বাদের দিন ঠিক করলেন। পুরোহিত বসে থাকতেই সন্ধ্যায় কথা হল ফোনে অনলের মা আর বিনীতার মায়ের সঙ্গে। আনন্দি কিংবা অনল কেউই মন খুলে বিয়ের কাজে হাত লাগাতে পারছে না কিংবা সেই আনন্দ দুই ভাইবোন কেউই দেখাতে পারছে না। লিজা বিষয়টা বুঝতে পেরে দু'জনকে ডেকে নিয়ে গেলেন তার ঘরে। জানতে চাইলেন,
-- তোদের ব্যাপারখানা কী? তোদের উৎসাহে যেন ভাটা পড়েছে মনেহচ্ছে
অনল আরও কাছে এগিয়ে যায় মামীর কাছে। ফিসফিস করে বলে,
-- একটা কথা খুব ভাবছি মামী। সবই ঠিক আছে। কিন্তু মনটা কেমন যেন একটু খুঁতখুঁত করছে। কোনদিন মা, বাবা যদি বিষয়টা জানতে পারেন তাহলে খুব কষ্ট পাবেন।
-- সেটা ঠিক অনল। কিন্তু তাঁরা দু'জনেই কিন্তু তাকে পছন্দ করেছেন।
লিজা একটু থামলেন। তারপর অনলের কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বললেন,
— দেখ অনল, সব সত্যি কথা একদিন না একদিন সামনে আসেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেই সত্যি সবসময় কষ্টই দেবে। অনেক সময় সত্যি মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।
অনল চুপ করে রইল। চোখ নিচু। যেন ভেতরে ভেতরে হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
আনন্দি এবার ধীরে ধীরে বলল,
— কিন্তু মামী, যদি উল্টোটা হয়? তখন তো ভীষন আঘাত পাবেন তাঁরা? কী বলবো তখন আমরা? আমাদের দু'জনের প্রতিই তাঁদের বিশ্বাসটাই হারিয়ে যাবে যে
লিজা মৃদু হেসে বললেন,
— ভেঙে যাওয়ার ভয়েই যদি কিছু শুরু না করিস, তাহলে তো জীবনে কিছুই এগোবে না রে। আর তোর মা,বাবার চোখে আমি যা দেখেছি, তাতে তাঁরা তোদের সুখটাই চাইবেন।
একটু নীরবতা নেমে এলো ঘরে।
অনল হঠাৎ মাথা তুলে বলল,
— তাহলে আমাদের কী করা উচিত?আমার মনেহয় সবটাই তাঁদের আগে থেকেই জানিয়ে দিই।
-- এটাই ঠিক হবে মামী। এটা পরে ঘটলে খুব কষ্ট পাবেন তাঁরা বিশেষত মা। বাবা হয়ত মুখে কিছু বলবেন না কিন্তু মা প্রচণ্ড কষ্ট পাবেন।
লিজা একটু ভেবে বললেন,
— হ্যাঁ, বলবো আমরা সবাই মিলে এক জায়গায় বসে সব সত্যিটা জানিয়ে দেবো।তবে সময়টা ঠিক করে। আশীর্বাদটা হয়ে যাক। তারপর শান্তভাবে,সবটা তাঁদের বুঝিয়ে বলবো। যেহেতু তাঁরাও বিনীতাকে পছন্দ করেছেন তাঁরা অবাক হবেন ঠিকই কিন্তু পিছিয়ে যাবেন না। আর তাছাড়া তোর মামা যখন আছেন এত ভাবিস না।সব ঠিক হয়ে যাবে।
আনন্দি অনলের দিকে তাকাল। চোখে যেন নতুন একটা ভরসা।
— দাদা, আমরা একসাথে থাকলে সব পারব, তাই না? তবে বলতেই হবে। পরে জানলে মায়ের কষ্টের সাথে সাথে নানান প্রশ্নও উঠবে তাঁদের লুকিয়ে যাওয়ার কারণ নিয়ে।
-- ঠিক বলেছিস। আর তাছাড়া আমরা আজ পর্যন্ত তাঁদের বিশেষ করে মাকে লুকিয়ে কোন কাজ করিনি।
-- কেন দাদা তুই তো তোর জীবনের সবচেয়ে বড় কাজটাই তো আমাদের সবাইকে লুকিয়ে করেছিস।
-- ওটা পরিস্থিতির চাপে পড়ে করতে বাধ্য হয়েছি।
-- তখনই এসে বললে বোধহয় এত সমস্যা হত না আজ।
-- ওরে পাগলী তখন বাড়িতে ঝড় উঠতো। সব লন্ডভন্ড হয়ে যেত।
-- কী জানি কী হত। ঠিক আছে মামী তাহলে তুমি বোলো কথাগুলো মাকে, বাবাকে বিয়ের আগেই।
-- ভাবিস না। ঈশ্বর আছেন। তিনি সব ঠিক করে দেবেন।
অনল হালকা হাসল। অনেকদিন পর সেই নিশ্চিন্ত হাসি।
— চল, এখন সব চিন্তা একটু দূরে রাখ। সামনে অনেক কাজ আছে। সময় হাতে মোটেই নেই। কাজগুলো সারতে হবে। বিয়ে বলে কথা। আর তোর মামা যতই বলুক না কেন একদিনেই বাজার, শপিং সব সারবে ওটা শুধু কথার কথা। একটা পেন আর খাতা বা ডাইরি নিয়ে আয় তো।
লিজা বেরিয়ে গেলেন। ইরাকে ডেকে নিলেন ড্রয়িং রুমে। ইতিমধ্যে অনল আনন্দি এসে ঢুকলো ড্রয়িং রুমে। কিন্তু তাদের চোখে-মুখে আগের সেই দ্বিধা আর নেই—বরং একটুখানি সাহস, আর অদ্ভুত এক শান্তি।
প্রথমেই শুরু হল কোথায় কি কিনতে যাওয়া হবে তার লিষ্ট। সকলের মত নিয়ে ফাইনাল লিস্ট তৈরি হল। যখন নিমন্ত্রণের জন্য কাকে কাকে বলা হবে ঠিক সেই মুহূর্তে দেবদূত এসে ওদের আসরের যোগ দিলেন তিনি এসেই শুরু করলেন,
-- আরে আমায় না নিয়েই তোমরা বিয়ের কাজকর্ম শুরু করে দিলে?
লিজা তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন,
-- বিয়ের এখনো ঢের দেরি। আমরা সকলে মিলে মোটামুটি একটা লিস্ট তৈরি করছি। ফাইনাল লিস্ট হলে তখন তো তোমাকে আর তোমার ভগ্নিপতিকে জানিয়েই করা হবে। তোমাদের সইসবুত না নিয়ে আমরা তো আর এগোতে পারবো না।সকল পরিশ্রম আমরা করবো তোমরা কেবল ওই সইটা করে দিও কাগজপত্রে। তখন আমরা একদম কোমর বেঁধে লেগে পড়বো।
লিজা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
-- অনল তুই গিয়ে বাবাকে একটু ডেকে আন। একটা কথা আমি সকলের সামনে আজকেই বলি। আমি ভেবে দেখলাম এখনই কথাটা বলা উচিত। তা না হলে তোর মা,বাবার কাছে আমরা ছোট হয়ে যাবো।
-- কী উল্টোপাল্টা বলছো বৌদি? তোমার মাথা ঠিক আছে তো? তোমরা ছোট হবে আমাদের কাছে?
সে কথার উত্তর না দিয়ে তিনি অনলকে আর একবার তাড়া দিলেন। অনল বুঝতে পারলো মামী এখনই সবকিছু বলে দিতে চান। ভয় পেলো কিন্তু নিজেকে সান্ত্বনা দিলো "এটাই ঠিক। অনেকটা এগিয়ে জানার চেয়ে শুরুতেই সবটা বলে দেওয়া ভালো।"
তিনি তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন এবং তার চোখের ইশারায় বুঝলেন যে তিনিও এটাই চান। আনন্দির মুখ শুকিয়ে পুরো পাংশু হয়ে গেলো। লিজা সেটা বুঝতে পেরে বলেন,
-- এত ভয় পাওয়ার তো কিছুই নেই। যেটা সত্যি এই মুহূর্তে সেটাই সবাই জানবে। আমরা গতকাল জেনেছি বাড়ির বাদবাকি মানুষজন এখন জানবে। অসুবিধা কোথায়? যে কোন ঘটনা যে কোন সময় ঘটতে পারে। আমরা তারজন্য কেউ প্রস্তুত থাকি না। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তাকে সামাল দিতে পারাটাই জয়ী হওয়া।
অনল তার বাবাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢোকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে অনলের চোখ,মুখ শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেছে। দেখলে মনে হচ্ছে সে যেন এক বিশাল ঝড়ের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। লিজা অনলকে তার পাশে বসালেন।
তারপর শুরু করলেন কথা বলতে -
মানুষের জীবনে এমন এক এক সময় আসে যখন চিন্তা ভাবনা ,হিসাব-নিকাশ করে এগোনো যায় না। হয়ত কারও জীবন-মরণ পরিস্থিতি কিংবা হয়ত কারও মান-সম্মানের ফেস লস হওয়ার ভয় - সেই মুহূর্তে নিজের কথা, নিজের পরিবারের কথা ভাবতে গেলে বিপদে পড়া সামনের মানুষটির বিশাল ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই সেই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয় মানবিকতা, মনুষ্যত্বের কারণেই। যে মানুষের মধ্যে এই মানবিকতা আর মনুষ্যত্ব আছে সে কিছুতেই সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে পারে না।
-- তুমি এত কথা কেন বলছো বৌদি? কী হয়েছে সরাসরি বলো না। আমাকে জানোই তো। আমি সোজা সাপ্টা মানুষ। এত ভারী ভারী কথা ঠিক বুঝতে পারি না।
-- জানিস তো ইরা আমাদের জীবনে কিংবা আমাদের সন্তানদের জীবনে যখন এমন কিছু ঘটনা ঘটে যখন আমাদের ইচ্ছা না থাকলেও সেগুলো মেনে নিতে হয় তাদের ভালোর জন্য, তাদের সুখের জন্য।
দেবদূত কথাগুলো যখন শেষ করলেন তখন অনলের বাবা বললেন,
-- ইরা বুঝতে পারছে কিনা আমি জানি না। তবে আমি বুঝতে পারছি আমাদের সন্তান দু'টির মধ্যে কেউ এমন কোন কাজ করেছে যা তারা নিজেরা আমাদের কাছে বলতে না পেরে দাদা,বৌদিকে শিখণ্ডী হিসাবে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে। যদি তোমরা দু'জনে মনে করো অনল কিংবা আনন্দি যে সেই কাজটা করেছে তা ওই মানবিকতা আর মনুষ্যত্বের কারণেই করেছে , যদি তোমরা সে কাজে কোন অন্যায় দেখতে না পাও তাহলে কথা দিচ্ছি আমি কিংবা ইরা তার সেই অন্যায়কে ক্ষমা করে দেবো। কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে সরাসরি বলো তো কোনটা কী অন্যায় করে বসে আছে।
-- না না অন্যায় করেনি সে। এটাকে অন্যায় বলা যায় না। অবস্থার পরিপেক্ষিতে সে একটি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে কিন্তু তোমাদের ভয়ে বাড়িতে কিছুই জানায়নি।
দেবদূত কথাগুলো বলে অনলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন সে মাথা নিচু করে বসে আছে।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment