ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৩২)
রাত তখন প্রায় দশটা। সুস্মিতার রান্নাঘরে সকলের খাওয়াদাওয়ার পরেও কিছু কাজ ছিল। সেগুলো সারতে আরও খানিকটা সময় চলে গেলো। লিজা সেখানে দাঁড়িয়ে সুস্মিতাকে সাহায্য করছিলেন। কিন্তু সুস্মিতার অনুরোধে তিনি ঘরে চলে যান।সুস্মিতা কাজ সেরে ঘরে এসে দেখেন লিজা ফোনে স্বামীর সাথে কথা বলছেন। শেষ কথাদু'টি তার কানে গেলো।
-- হ্যাঁ সুস্মিতা আর তার ছেলে যদি রাজি থাকে তাহলে আমরা মেয়েটিকে আপন করেই নেবো। আমি আসি এসে কথা বলছি।
সুস্মিতা ঘরে ঢুকলে লিজা ফোনটা কেটে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসেন।
-- তোর কাজ শেষ হল? আমরা এসে তোর খাটুনি আরও বাড়িয়ে দিলাম
-- কী বলছিস রে! কত বছর বাদে দু'জনে মনপ্রাণ খুলে কথা বললাম বলতো?
-- সেটা তো নিশ্চয়। তবে তোর পরিশ্রমটাও তো ভাবতে হবে।
খাটে বসতে বসতে বললেন
-- তোকে কিছু ভাবতে হবে না। এই বয়সে এসে আবার যে তোর সাথে দেখা হবে সেটাই কোনদিন ভাবিনি রে! সবই ঈশ্বরের লীলা।
-- এই শোন না তোর মেয়েটাকে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে। অনলকে তো তুই দেখলি। খুব ভালো ছেলে রে! তুই রাজি থাকলে আমার ননদ, নন্দাইয়ের সাথে কথা বলতে পারি।
সুস্মিতা অবাক হয়ে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। একটু আগে বলা কথাটাই মনেমনে আর একবার বললেন "প্রভু সত্যিই তোমার লীলা বোঝা দায়।"
-- কী রে কিছু বললি না তো। আমার ছেলেটার বিয়ে না হলে আমি বিনীতাকে আমার ঘরের লক্ষ্মী করে নিয়ে যেতাম। সেটা যখন হবার নয় তখন --
-- তোকে কাল বলেছিলাম না বিনীতার জীবনের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। আগে সেই ঘটনাটা শোন। তারপর এই কথার পরিষ্কার তুই নিজেই পেয়ে যাবি।
-- হ্যাঁ বলেছিলি তো। বলতো কী হয়েছিল ওর জীবনে? মেয়েটা কিন্তু খুবই লক্ষ্মীমন্ত। তার জীবনে এমন কী ঘটেছে যার জন্য তুই সরাসরি হ্যাঁ বলতে পারছিস না।
-- তবে শোন -
আমরা কলকাতায় একটা বিয়ে বাড়িতে যাই। বিনীতার তখন এম. এস সি কমপ্লিট। চাকরির চেষ্টা করছে। চাকরি না পেয়ে বিয়েতে রাজি নয়। আমি আমার জীবন দিয়ে বুঝেছি মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো কতটা প্রয়োজন। আমিও তখন মেয়ের বিয়ে দিতে প্রস্তুত নই। ওই বিয়ে বাড়িতে বারাসাতের একটু ভিতরের দিক থেকে একটি পরিবার আসে। তারা সকলেই বিনীতাকে দেখে পছন্দ করে। ছেলেটি খুব বড় উকিল। তারও একটি বোন আছে। বিয়েবাড়িতে পরিচয় হওয়াতে অনেক কথাবার্তা গল্পগুজব হয়। হঠাৎ একদিন ভদ্রমহিলা মানে ওই ছেলেটির মা ফোন করেন এবং তার ছেলের সাথে বিনীতার বিয়ের কথা বলেন।
-- তারপর
-- বলছি দাঁড়া। একনাগাড়ে কথা বলে হাঁফিয়ে গেছি।
লিজা জলের বোতলটা তার দিকে এগিয়ে দেন। সুস্মিতা একটু জল খেয়ে আবার শুরু করেন
-- আমি সরাসরি বলি মেয়ে চাকরি না পাওয়া অবধি বিয়েতে রাজি নয়।
-- শুনে কী বললেন তিনি?
-- আমাদের কোন আপত্তি নেই। ততদিন আমরা অপেক্ষা করবো। ব্যাস এরপর মাঝে মাঝেই ভদ্রমহিলা ফোন করতেন। কথাবার্তা বলতাম। আমি কিন্তু তলে তলে বিনীতার বিয়ের গয়নাগাটি সব তৈরি করে ফেলেছিলাম কারণ ওই নাছোড়বান্দা মহিলা এই মেয়েই তার ছেলের বউ করবেন এই মনোভাব ব্যক্ত করার পর। বিনীতার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসলো। আমি ফোন করে জানালাম। একমাস হাতে সময় ছিল। উনি বললেন, "এই একমাসের মধ্যেই বিয়ে দেবো। বিয়ের পরে বিনীতা চাকরিতে জয়েন করবে।"
মাঝে মাঝে আমাদের মনের অবস্থা এমন হয় আমরা কিছু না বুঝেই কাজ করে ফেলি। আমি তো মোটামুটি রেডি ছিলাম। বিজয়ও বলল "মা এত করে যখন বলছেন তখন বিয়েটা দিতে রাজি হয়ে যাও। বিয়ের পরেই নাহয় চাকরিতে জয়েন করবে। অসুবিধা কিছু হবে না।" মত দিয়ে দিলাম।
সুস্মিতা চুপ করে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার শুরু করলেন,
-- বিয়েরদিন ঠিক সময়েই ছেলের বাড়ি থেকে হলুদ এলো। বিনীতার গায়েও হলুদ হয়ে গেলো। বাড়িতে আত্মীয়, বন্ধুস্বজন গিজগিজ করছে। ছোড়দা বর আনতে গেছিলেন। লগ্ন পেরিয়ে যাচ্ছে। ভীষন চিন্তায় আমি আর বিজয়। ঠিক এই সময়ে ছোড়দা ফোন করে জানালেন --
সুস্মিতা ঠকঠক করে কাঁপছেন চুপ করে বসে। লিজা তার হাতটা ধরলেন মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললেন,
-- কী হল তোর? এত কাঁপছিস কেন?
সুস্মিতা বোতল খুলে বেশ খানিকটা জল খেলেন। তারপর আরও কিছুটা সময় নিয়ে বললেন,
-- আসলে কী জানিস সেদিনের ওই সময়টার কথা মনে পড়লে আজও আমি শিউরে উঠি।
-- কেন এমন কী হয়েছিল যা ভাবলেই তোর এত আতঙ্ক হয়।
-- বর যখন গাড়িতে উঠতে যাবে ঠিক তখনই একদম সামনে থেকে অর্পণকে গুলি করে পালিয়ে যায়
-- ওমা সেকী? কেন কী করেছিল সে?
-- সে একটা কেস লড়বে একটি মেয়েকে কথা দিয়েছিল। কেসটি ছিল কিডন্যাপিং কেস। এই কেসের সাথে জড়িত ছিল একজন নেতার ছেলে। বারবার ফোনে অর্পণকে নিষেধ করেছিল নেতার লোকজন কেসটা না নিতে। কিন্তু অর্পণ ছিল ভীষন সাহসী একটি ছেলে। সে কারও জন্য কোন কথাতেই পাত্তা না দিয়ে মেয়েটিকে কথা দিয়েছিল কেসটি সে লড়বে। ওই মেয়েটি ছিল তার বোনের বন্ধু। মেয়েটিও ছিল অসীম সাহস। যখন কেউ এই কেসটি নিতে রাজি হচ্ছে না তখন সে তার মা বাবার অমতে অর্পণের কাছে এসে কেসটি নিতে অনুরোধ করে। আমরা এসব কথা অনেক পরে জেনেছি।
-- তারপর কী হল বল। কিন্তু তার আগে বল ছেলেটি বেঁচে আছে না মারা গেছে।
-- প্রথমে তো আমরা শুনেছিলাম স্পট ডেথ। কিন্তু পরে জেনেছিলাম কোমায় চলে গেছে। আরও পরে জেনেছি এখন সে ভালো আছে কোর্টে যাচ্ছে। কিন্তু এই ঘটনার পর ওই কেসটি আর যে কোন কারণেই হোক সে আর করেনি কিংবা যায় হোক না কেন আমরা ঠিক জানি না।
-- ওকে বেশ। তারপর বিনীতার কী হল বল।
-- বিজয় তো তখন পুরো পাগল। নিজের মাথার চুল নিজেই ছিঁড়ছে। আমায় সমানে বলে যাচ্ছে "আমি আছি তো তোমায় কিছু ভাবতে হবে না। আমি বিনীকে লগ্নভ্রস্থা কিছুতেই হতে দেবো না। এই লগ্নেই আমি ওর বিয়ে দেবো ভালো ছেলে দেখে।"
কিন্তু বিয়ে বাড়িতে ভালো ছেলের খোঁজ কোথায়? কিছুদিন আগেই অনলের সাথে ওর দেখা হয় বিয়ের বাজার করতে গিয়ে একটা মলে। ও অনলকে বিয়েরদিন সকলেই আসতে বলে। সেইমত অনল বিয়ের দিন সকালেই আসে। ওই খবর জানার পর অনল গিয়ে বিজয়কে অনুরোধ করে বিনীতাকে বিয়ে করার জন্য।
অনল তো আকাশ থেকে পড়ে
এইটুকুন শুনেই লিজা নড়েচড়ে বসে বলেন,
-- ভেরি ইন্টারেস্টিং
-- এখন তোর কাছে এটা মনেহচ্ছে। তখন মা ছেলের পাগলা গারদে দেওয়ার পরিস্থিতি চলে এসেছিল। যাহোক - অনল তো কিছুতেই রাজি নয়। স্বাভাবিক সেটা। বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসে বৌ নিয়ে বাড়িতে কীভাবে ফিরবো? তাছাড়া একটা ছেলে কিংবা মেয়ের জীবনে বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকে। তারপর বিজয় তাকে অনেক করে বোঝালো। শেষমেষ সে রাজি হল।
লিজা বুকে হাত দিয়ে বুকভরে নিশ্বাস নিয়ে বললেন,
-- বাব্বা ! আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিলাম। এখন যেন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম।
-- সত্যি লিজা তুই না সেই আগের মতই থেকে গেলি। বড় হতে হতে যে বুড়ি হয়ে গেলি তাও তোর স্বভাব গেলো না।
-- কে বুড়ি? আমি এখনো সেই সুইট সিক্সটিন।
জোর হাসি দু'জনের
-- শেষটা শোন।অনল রাজি তো হল কিন্তু শর্ত রাখলো সে বৌ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে না। মা, বাবার মত না নিয়ে সে কিছুতেই বিনীতাকে সাথে করে নিয়ে যেতে পারবে না।
-- বয়েই গেলো ও নিয়ে গেলো না। বিনীতার শ্বশুর, শাশুড়িরা নিয়ে যাবে ওকে ওর বাড়িতে। আমি শুধু ভাবছি কী অদ্ভুত সবকিছু। শিলিগুড়িতে বিনীতাকে দেখে তোর মেয়ে বলে চিনতে পারা অথচ ওকে আমি আগে কখনোই দেখিনি শুধু তোর মুখের সাথে মিল,কোন কারন ছাড়া ওকে ওই বাড়িতে নিয়ে যাওয়া , এখানে আসা -- সব সবকিছু কিন্তু ওই উপরওয়ালার লিখন -
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment