ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২০)
অনলের প্রতিক্ষণে বিনীতার কথা মনে পড়ে। মাত্র কটা মাসের মধ্যে অদেখা অচেনা বিনীতাকে অনল বোধকরি খুব ভালোভাবে স্ট্যাডি করতে পেরেছে । কোন অবস্থাতেই যে বিনীতা ইগো ঝেড়ে মাথা নোয়াবে না এটা অনল খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে। এই ঘটনার উপর দু'জনের কারোরই হাত ছিল না এটা সত্যি কিন্তু ঘটনার সমাধান সূত্র বের করতে গেলে একজনকে এগিয়ে যেতেই হবে। তবে সেটা বিনীতা কিছুতেই হবে না। প্রতি মুহূর্তে অনল ভেবে চলেছে কীভাবে এর সমাধান পাওয়া যায়। সব মানুষের ভিতর সব গুন থাকে না। বিনীতা যে সবগুনের অধিকারিণী তাতো নয়।
অনল উদাস হয়ে জানলার দিকে তাকায়। অনলের ঘরের দক্ষিণের কোন দেওয়াল নেই।পুরোটাই জানলা। বহু পুরোনো বাড়ি। তখন বাড়িতে ইলেকট্রিক ছিল না। তাই অনলের দাদু তাঁর ছেলে অর্থাৎ অনলের বাবার জন্য দক্ষিণের ঘরটা করেছিলেন। এইভাবে যাতে গরমে কোন কষ্ট না হয়। পুরো জানলাগুলি কাঠের। প্রথমে দাদু, বাবা বড় হলে বাবা আর এখন অনল এই ঘরের মালিক। এখন সবগুলো জানলা খোলা, বন্ধ করাও একটা ঝক্কি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাত অনেক হয়ে গেছে। চারদিক নিস্তব্ধ। জানলার বাইরে আকাশটা ফাঁকা, কিন্তু অনলের মনটা যেন ভীষণ ভারাক্রান্ত। বারবার শুধু একটা মুখই ভেসে উঠছে—বিনীতা।
অনল বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে বলে উঠলো,
— “তুমি এত কঠিন কেন বিনীতা?”
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেই উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করে।
— “না, কঠিন নয়… তুমি আসলে নিজের জায়গায় অটল। তুমি কাউকে এত সহজে তোমার ভিতরে ঢুকতে দাও না।”
অনল চোখ বন্ধ করে। গত কয়েক মাস আগে বিয়ের দিনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো একে একে ভেসে ওঠে—বিনীতার হাসি, তার চুপ করে থাকা, বৌ সাজে ঘর থেকে বেরিয়ে দৃঢ়তার সাথে তার কথা বলা , আবার অকারণে চুপ হয়ে যাওয়া।
— “তোমার এই ইগোটা আসলে ইগো নয়… এটা তোমার আত্মসম্মান।”
নিজের সঙ্গেই কথা বলতে থাকে অনল।
— “তুমি হয়তো ভাবছো, আগে এগিয়ে গেলে তুমি ছোট হয়ে যাবে… কিন্তু তুমি কি জানো, এই চুপ করে থাকাটাই আমাদের আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে।
— “তোমারও তো কষ্ট হচ্ছে… আমি বুঝি। কিন্তু তুমি সেটা কাউকে দেখাতে চাও না। নিজের ভেতরেই সব চাপা রাখো।”
হঠাৎ উঠে বসে অনল। যেন একটা সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।
— “না, এভাবে আর চলতে পারে না। যদি কেউ এগিয়ে না আসে, তাহলে সবকিছু এমনই ঝুলে থাকবে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলে,
— “তুমি না পারো, আমি পারি। কারণ ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে অহংকারের চেয়ে সেটা বড় হওয়া উচিত।”
অনল ফোনটা হাতে তুলে নেয়। অনেকক্ষণ ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিনীতার নামটা যেন তাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
আঙুলটা কল বাটনের উপর গিয়ে থেমে যায়।
বিনীতার নম্বরটা না চাইতেই অনল পেয়ে গেছে বিজয়ের কাছ থেকে। সেদিনের কথার পরেই বিজয় নম্বরটা তাকে ওয়াটসঅ্যাপ করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই অনল নম্বরটা সেভ করে নিয়েছে। কিন্তু ফোন করা আর হয়ে ওঠেনি। প্রায় প্রতিদিনই সে ফোন করবে ভেবেও ফোন করে উঠতে পারে না।
— “যদি তুমি ফোনটা না ধরো?”
মনে একটা অজানা ভয় কাজ করে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে।
— “তবুও চেষ্টা করতে হবে…”
ঠিক সেই মুহূর্তে—
ফোনটা হঠাৎ বেজে ওঠে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটা নাম—
উফ্ আবার কৌশিকী। যখনই অনল বিনীতার ফোনের অপেক্ষায় থাকে এই কৌশিকী কেন তাকে ফোন করে বসে? নাহ্ এই মুহুর্তে আমি কিছুতেই কৌশিকীর ফোন ধরবো না।ভালোবাসার মানুষের কথা ভাবতে লাগলেও একটা সুন্দর অনুভূতি থাকে। সেই অনুভূতিকে কিছুতেই আমি নষ্ট হতে দেবো না।
অনল কৌশিকীর ফোনটা ধরে না।
বিছানায় শুয়ে অনল বারবার মোবাইলটা হাতে নিচ্ছে, আবার রেখে দিচ্ছে। স্ক্রিনটা নিঃশব্দ, তবুও যেন সে অপেক্ষা করছে—একটা নাম জ্বলে ওঠার জন্য।
বিনীতা।
মনে মনে বলে ওঠে,
— “তুমি কি একবারও ভাবছো না আমার কথা?”
তারপরই নিজের কথাতেই যেন থমকে যায়।
— “না… তুমি ভাবছো। কিন্তু তুমি আগে এগোবে না।”
অনল উঠে বসে। জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরের অন্ধকারে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিনীতাকে যেন আরও পরিষ্কার বুঝতে পারে।
— “তোমার এই চুপ করে থাকাটা… এটা রাগ নয়, এটা অভিমান।”
মৃদু হেসে ফেলে সে।
— “আর সেই অভিমানের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ভালোবাসা… যেটা তুমি কিছুতেই স্বীকার করতে চাও না।”
হঠাৎ একটু কষ্ট মেশানো গলায় বলে ওঠে,
— “কিন্তু আমিও তো মানুষ বিনীতা… আমিও তো চাই তুমি একবার আমায় ফোন করে কিছু বলো
ঘরের ভেতর রাতের নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে ওঠে।
অনল আবার ফোনটা হাতে নেয়। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে। আঙুলটা ধীরে ধীরে কল বাটনের দিকে এগোয়… তারপর থেমে যায়।
— “না… যদি সবকিছু আমার দিক থেকেই শুরু হয়, তাহলে তুমি কখনোই বুঝবে না আমার না থাকাটার মূল্য।”
ফোনটা আবার রেখে দেয়।
— “এইবার তুমি বোঝো…”
চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে অনল। কিন্তু ঘুম আর আসে না। দু’জনের মাঝখানে জমে ওঠা নীরবতাটা যেন আরও বড় হয়ে ওঠে।
কৌশিকী বারবার ফোন করছে। মেয়েটা কী চায় তার কাছে? অফিস থেকে রিজাইন দিয়ে চলে গেছে প্রায় মাস দু'য়েক। এমন কিছু বন্ধুত্ব তার সাথে গড়ে ওঠেনি অনলের। তবুও কেন সে বারবার ফোন করে? কী বলতে চায় সে? সত্যি আজ অনলের মনে হচ্ছে কে যেন বলেছিলেন মেয়েদের মন বোঝা দেবতারও অসাধ্য! আজ তাকে সামনে পেলে গড় হয়ে একটা প্রণাম করতাম!
সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়, কিন্তু অনলের কাছে সবকিছু যেন অস্বাভাবিক লাগছে। ঘুম থেকে উঠেও যেন সে ফ্রেস হতে পারেনি।
ব্রাশ করে প্রাত্যহিক কাজ সেরে মায়ের কাছে চা চাইতে গিয়ে দেখে চা একদম রেডি। মা বেশ খুশি খুশি। চা ' টা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
-- জানিস দশ বছর পর বড়দা দেশে ফিরেছেন?
-- বাহ্ এত খুব খুশির খবর
অনলের বড়মামা লন্ডনপ্রবাসী। অনেকদিন তিনি এদেশে আসেননি। মায়ের ঠিক হিসাব আছে বছর দশেক আগে একবার ফিরেছিলেন। মায়ের বাবার বাড়িতে আজ আর কেউ নেই। মায়েরা এই দুই ভাইবোন বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়ে গেছেন শেষবার এসে মামা। মামা এসেছেন শুনেই অনলের মনের ভিতর একটা খুশির ঝলক দিয়ে উঠলো। হ্যাঁ মামা আসলে তো তাঁর শ্বশুরবাড়ি উঠবেন আর সেটা তো শিলিগুলি। বিনীতাও শিলিগুড়ি। কোথাও যেন একটা মিলনের সুর বাজছে অনলের মনের মধ্যে। সে আনন্দের সঙ্গে জানতে চাইলো
-- মা মামাকে কি আনতে যেতে হবে?
-- ওমা! সে কেন? সবে সকালে ল্যান্ড করেছেন। হয়ত এখনো শ্বশুরবাড়ি পৌঁছেই পারেনি। তোর মামী এত তাড়াতাড়ি তাকে ছাড়বে কলকাতায়?
যেন আগুনে জল পড়লো। অনল তখন বললো,
-- তাহলে মামা কি একা আসবেন?
-- কেন সাথে তো তোর মামীও আসেন।
অনল যে অ্যাঙ্গেলে প্রশ্নটা জানতে চেয়েছিল উত্তরটা দিলেন মা একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে।সে আর কিছু না বলে চায়ের কাপটা নিয়ে ডাইনিংয়ে এসে বসলো।
আনন্দি হঠাৎ এসে সেখানে বসে পড়লো।
-- হ্যাঁরে দাদা আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করছি তুই সেই যে বিয়ে বাড়িতে বেড়াতে গেলি সেখান থেকে ফেরার পর থেকে কেমন যেন একটু চুপচাপ হয়ে গেছিস। ওখানে সবকিছু ভালোভাবে মিটেছে? তুই কি কিছু লুকাচ্ছিস আমাদের কাছ থেকে?
-- তোর এরকম মনে হওয়ার কারণ কী জানতে পারি?
-- না আসলে আমি তো আমার দাদাকে ভালোভাবেই চিনি। বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই তোর ভিতর সেই আগের উচ্ছ্বলতা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু আমি কেন মা'ও সে কথাই বলছিলেন।
-- ঘটনা কিছু ঘটেছে। তবে সেগুলো বলার সময় আসেনি।
-- দেখ তাহলে। আমরা তো তোকে চিনি রে! যদি তোর কোন তাড়া না থাকে তাহলে তোর সময়মত সব জানাস।
-- জানাবো, তোকেই আগে সব জানাবো। কিন্তু আমায় একটু সময় দে। আগে ব্যাপারটা নিজে ভালোভাবে বুঝি।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment