Friday, May 8, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (২১ পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ২১)

    আজ রবিবার। অনলের অফিস নেই, তাই বাজারে যাওয়াটা যেন তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই এই অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে। বাড়ির সামনের ছোটখাটো জিনিসপত্র বাবা কিনে নিলেও, বড় বাজারটা অনলই করে।
  বাড়ি থেকে বেরিয়েই পাড়ার ক্লাব। প্রতিদিন সকালে ক্লাবের সামনে ছোট্ট একটা বাজার বসে—কেউ মাছ নিয়ে বসেছে, কেউ সবজি, কেউ বা ডিম। ভোরের হালকা রোদ, আর তার সঙ্গে মিশে থাকা কাঁচা মাছ আর ধনেপাতার গন্ধ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম সকাল।
অনল ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে এগোয়। কিন্তু আজ তার মনটা যেন কোথাও আটকে আছে। প্রতিটা মুহূর্তে মনে পড়ছে বিনীতার কথা।
কয়েকদিন হয়ে গেল, তবুও বিনীতার কোনও ফোন নেই।
— “আমি কি ফোন করবো?”
মনে মনে প্রশ্নটা আসে।
তারপরই নিজেই নিজেকে থামিয়ে দেয়—
— “না… ও আগে করুক। আমি কেন সবসময় আগে এগোবো?”
কিন্তু কথাগুলো যতই শক্ত করে ভাবুক, মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা থেকে যাচ্ছে।
“এই অনল! কী রে, আজ এত চুপচাপ?”
পাশ থেকে ডেকে ওঠে সঞ্জয়, পাড়ারই এক ছেলে, মাছ বিক্রি করে।
অনল একটু চমকে তাকায়—
— “না রে, কিছু না… কই, কেমন আছিস?”
সঞ্জয় হেসে বলে—
— “আমি তো ভালোই আছি। তুই বল, কেমন চলছে? শুনলাম বড় অফিসার হয়ে গেছিস!”
অনল হেসে উড়িয়ে দেয়—
— “ধুর, অফিসার আবার কী! চাকরি করছি, এই যা।”
মাছ নিতে নিতে অনল হঠাৎ খেয়াল করে, পাশেই এক মেয়ে দাঁড়িয়ে। সাদা-নীল সালোয়ার, চুলটা খোলা…
এক মুহূর্তের জন্য তার বুক ধক করে ওঠে—
বিনীতা!
কিন্তু না…
ভালো করে তাকাতেই বুঝতে পারে, সে অন্য কেউ। যাকে দেখে এখন প্রথমে তাকেই যেন অনলের বিনীতা বলে মনে হয়।
নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
সবজি, মাছ কেনা শেষ করে অনল যখন বাড়ির দিকে ফিরছে, তখন তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
“বিনীতা কি সত্যিই আমার কথা ভাবছে না?”
বাড়িতে ঢুকতেই মা জিজ্ঞেস করে—
— “এত দেরি করলি কেন রে?”
— “কিছু না মা, একটু ভিড় ছিল।”
মা আর কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
অনল নিজের ঘরে এসে ব্যাগটা রেখে বিছানায় বসে পড়ে।
টেবিলের উপর মোবাইলটা পড়ে আছে।
সে একবার সেটার দিকে তাকায়…
আবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ পর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে মোবাইলটা হাতে তুলে নেয়।
স্ক্রিন আনলক করে—
বিনীতা নামটা সে এতবার বের করে দেখেছে এখন নম্বরটা যেন মুখস্থ হয়ে গেছে।
আঙুলটা কল বাটনের উপর গিয়ে থেমে যায়।
— “না… আজও না।”
সে ফোনটা আবার রেখে দেয়।
ঠিক সেই সময়—
 এইভাবেই দিন গড়িয়ে যেতে থাকে। প্রতিটা মুহূর্ত প্রতিটা ক্ষণ বিনীতা অনলের মনপ্রাণ জুড়ে থাকলেও সে কেন যেন নিজের ইগো ঝেড়ে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছে না। অনলের এই ইচ্ছের বাধা পাওয়াটাকে ঠিক ইগোও বলা যায় না। কোথাও একটা লজ্জাও কাজ করে তার ভিতর। শত হোক সে একজন পুরুষমানুষ। 
 অফিস থেকে একদিন ফিরে আসার পর মা বেশ খুশি খুশি হয়ে অনলকে বলেন,
-- হ্যাঁরে দুয়েকদিনের মধ্যেই তোর মামা,মামী আসবেন আজ ফোন করে বললেন।
সেদিনের সেই উচ্ছ্বলতা অনলের মধ্যে ছিল না। সে চা খেতে খেতে বলল,
-- তাহলে কালকে অফিস যাওয়ার আগে কি একবার বাজার যাবো?
মা খুব খুশি হয়ে বলেন,
-- তাহলে তো খুব ভালো হয় বাবা।আমি তো ভয়ে তোকে বলতেই সাহস পাচ্ছিলাম না।
-- তুমি আবার কবে থেকে আমায় ভয় পেতে শুরু করলে?
-- বাবা আজকাল তুই যা গম্ভীর থাকিস। দশটা কথা বললে একটার উত্তর দিস আর বাকি ন'টা হাওয়ায় ভেসে যায়।
-- মা, তাহলে বোধহয় আমি কানে কম শুনছি। তুমি কথা বলছো আর আমি উত্তর দিচ্ছি না তোমার বোঝা উচিত ছিল 
 এরপর হাসতে হাসতে বলে,
-- তাহলে একজন ইএনটি আমায় দেখাতেই হবে
  পরদিন একটু সকালে উঠে অনল বেশ কিছু বাজার করে মায়ের হাতে দিয়ে বলে,
-- আমার জন্য তাড়াহুড়ো করার কোন দরকার নেই। তুমি ধীরে সুস্থে সব করো।আমি নাহয় বাইরে কিছু খেয়ে নেবো। তাছাড়া এখন খেতে গেলে দেরিও হয়ে যাবে।
-- তোর অফিসের রান্না আমি কল রাতেই করে রেখেছি। সকালে উঠে শুধু ভাত করলাম। ঝট করে স্নান সেরে টেবিলে চলে আয়। সব রেডি। 
-- সে কী?
 -- আমার ছেলে না খেয়ে অফিস চলে যাবে আর আমি আমার ভাই ,ভাইবউয়ের জন্য তরিজুট করে রান্না করবো অত ভালো মানুষ আমি হয়ে পারিনি। আমার ছেলেমেয়ের ব্যাপারে আমি একটু একচোখা।
অনল মাকে জড়িয়ে ধরে মুখে একটা চুমু করে বলে,
-- সেইজন্যই তো তুমি আমার বেস্ট মা। 
 স্নানে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলতে থাকে,
-- ওকে, তবে তাই হোক। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মায়ের বাধ্য ছেলে হয়ে স্নান সেরে টেবিলে চলে আসছি।
 অনল স্নানে চলে যাওয়ার পর তার মায়ের সেলে ভাইবউয়ের ফোন আসে। দিদি আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার বাড়ি পৌঁছে যাবো। কাল তোমায় একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। দিদি, আমাদের সাথে একটি মেয়ে যাবে। ও আমার ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে। ওর সাথে হঠাৎ দেখা হল শিলিগুড়ি এসে। তোমায় গিয়ে সব বলবো। আমি বলেছি ওকে দুপুরে খেয়েদেয়ে যেতে। দিদি কোন অসুবিধা হবে নাতো?
-- আরে কিসের অসুবিধা? এমন করে বলছো যেন বিশাল এক অপরাধ করে ফেলেছ। কতদূরে আছো? আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি কখন তোমরা আসবে? সাবধানে এসো। রাখি কেমন?
 অনল তড়িঘড়ি স্নান সেরে একবারে জামাপ্যান্ট পরেই টেবিলে এসে কোনরকমে গোগ্রাসে খেতে লাগলো। মা এসে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে বললেন,
-- বৌদি বলল ওদের সাথে বৌদির ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়ে আসছে। চলে যাবে থাকবে না।
-- মা এখন কোন কথা শুনবো না। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। অফিস থেকে ফিরে সব শুনবো।
-- আচ্ছা আচ্ছা তুই সাবধানে যাস আসিস।
 অনল ছুটে ছুটে তার কাজগুলো সেরে দৌড়াতে দৌড়াতে বেরিয়ে গেলো। মা তার এই ছুটে বেরিয়ে যাওয়া দেখতে পেয়েই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন,
-- ও-রে এত তাড়াহুড়ো করিস না। সাবধানে চলাচল করিস। পারলে একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস। দুগ্গা দুগ্গা বলে মা হাত কপালে ঠেকালেন।
 দুপুর আড়াইটা নাগাদ বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠলো। আনন্দি বাড়িতে নেই। অনলের বাবা খেয়েদেয়ে একটু শুয়েছেন। বেলের আওয়াজ শুনেই অনলের মা দৌড়াতে দৌড়াতে দরজা খুলতে চলে এলেন। দাদা বলে কথা। ছেলেবেলার সেই কাঁচামিঠে সম্পর্কগুলো কখনোই ভোলা যায় না। বয়স বারুক, যুগযুগ ধরে দেখা না হোক ঠিক যেন হিরের আংটি ভাইবোনের সম্পর্কগুলো।
 দরজা খুলেই দাদাকে জড়িয়ে ধরা, নিচু হয়ে দাদাকে প্রণাম করা, (বৌদি সমবয়সী হওয়াতে প্রথম থেকেই প্রণাম নেন না) হাহা করে কথা বলা সে এক অন্য অনুভূতি। যাদের ভাই কিংবা দাদা নেই সত্যিই কিন্তু তারা এসব থেকে বঞ্চিত আর এর মজাটাও জানতে পারে না। 
 অনলের বাবা শ্যালকের আগমন টের পেয়ে আস্তে আস্তে উঠে এই বিশাল যজ্ঞে সামিল হলেন। ওদের সাথেই একটি বাইশ,চব্বিশ বছরের মেয়ে, দেখতে বেশ মিষ্টি ঢুকে অনলের বাবা,মাকে প্রণাম করে ওদের পিছুপিছু এসে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে থাকে চুপচাপ। দাদা আর বোনের গল্প আর চিৎকার, চেঁচামেচিতে অন্য সকলের গলার আওয়াজ শোনা যেমন যাচ্ছে না তাদের হাসাহাসিতে অন্য কেউ কথাও বলতে পারছে না। সেই ছেলেবেলায় কে কবে কাকে মেরে ফুলিয়ে দিয়েছে, বাবার কাছে নালিশ করে কে কাকে মার খাইয়েছে কিছুই বাদ যাচ্ছে না।
 অনন্দী এসেই মামা,মামীকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। পাশে অচেনা মেয়েটিকে দেখে জানতে চায়
-- উনাকে তো চিনতে পারছি না
 সঙ্গে সঙ্গেই মামী ওকে জানান --

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment