ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ২৪)
অনলের মাথাতে কিছুতেই আসছে না এটা কিভাবে সম্ভব হল? সত্যিই কি তবে আমরা ঈশ্বরের হাতের পুতুল? তিনি সবকিছু নির্ধারণ করেন মানুষের জীবনের? আগেকারদিনের ঠিক যেন সেই সুতো বাঁধা পুতুলের মত। এখন কিভাবে অনল এগোবে সেটাই তো বুঝতে পারছে না।
ওদিকে আনন্দি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলে উঠলো,
-- আমি ঠিক জানতাম দাদা এসে গেলে আমাদের আর বেরোতে দেবে না। চলো বিনীতা আমরা গিয়ে চেঞ্জ করে আসি।
অনলের মা বললেন,
-- আরে দাঁড়া তোর দাদা ফ্রেস হয়ে আসুক। সকলে মিলে চা খাই। একটু টিফিনেরও ব্যবস্থা করি।
কথাটা শুনেই অনলের মামা দেবদূত প্রায় চিৎকার করে উঠলেন
-- ওরে আমার বয়স হয়েছে ইরা ।এত খাওয়াস না আমায়। অসুস্থ হয়ে পড়বো আমি
একএক করে টিফিন খাওয়া সকলে নসাৎ করে দিলো। অনলের মা তখন বিনীতাকে বললেন,
-- তুমি তো দুপুরেও তেমন কিছু খাওনি এখন কিছু করি মা তোমার জন্য। আমি তো অনলের জন্য সামান্য চিড়ের পোলাও করবো তুমি একটু খাও।
-- এখন আর কিছু খাবো না মা সিমা
বিনীতার মুখ থেকে প্রথমে মা কথাটা বেরিয়ে গেলেও সেটা পড়ে সে ঠিক ম্যানেজ করে নেয়। ইতিমধ্যে অনল এসে ঢোকে ডাইনিংয়ে। এসেই সে বিনীতার দিকে তাকিয়ে পড়ে। দু'জনে চোখাচোখি হয়। মুহুতেই দু'জনেই চোখ সরিয়ে নেয়। অনল ঠিক বিনীতার মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসে।
দু’জনের সামনে একই টেবিল, অথচ মাঝখানে অদৃশ্য এক দূরত্ব। চারপাশে সবাই আছে—হাসি, গল্প, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ—সবই চলছে, কিন্তু অনল আর বিনীতার কাছে যেন সব শব্দই ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট।
অনল চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু তার চোখ বারবার নিজের অজান্তেই উঠে যাচ্ছে বিনীতার দিকে। সে নিজেকে সামলাতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। এতদিনের না বলা কথা, অভিমান, অপেক্ষা—সব একসাথে বুকের মধ্যে জমাট বেঁধে আছে।
বিনীতা প্রথমে চোখ নামিয়ে রাখলেও, তারও মন যেন স্থির নেই। চায়ের কাপটা হাতে নিয়েও সে চুমুক দিতে ভুলে যাচ্ছে। তার চোখের পাতা কাঁপছে, যেন প্রতিটা মুহূর্তে নিজেকে বোঝাতে চাইছে—“না, তাকাবি না… এখন নয়…”
কিন্তু ভালোবাসা কি কখনও এত সহজে মানে?
হঠাৎই এক মুহূর্তে, যেন অজান্তেই, দু’জনের চোখ আবার মিলল।
সেই চোখাচোখিতে ছিল না কোনো কথা—
ছিল শুধুই অগণিত প্রশ্ন,
অগণিত উত্তর,
আর না বলা হাজার অনুভূতি।
অনলের চোখ যেন বলছে—
“তুমি কেন এতদিন আমায় ফোন করোনি?”
“ তুমি নিজেও তো একটা ফোন করতে পারতে? দাদা তো তোমায় নম্বর দিয়েছে…”
তাদের এই নীরবতা দু'জনের কাছেই অনেককিছু প্রশ্ন আর উত্তর হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে। এতগুলো মানুষ এত কাছে থেকেও কেউ কিচ্ছুটি টের পাচ্ছে না।
অনল চা খেয়ে আস্তে করে টেবিলের উপর কাপপ্লেট রেখে হাতটা না নামিয়ে নিজের হাতটা একটু এগিয়ে রাখে—খুব সামান্য, যেন কেউ বুঝতে না পারে।
ঠিক সেই সময় বিনীতা, কিছুটা অচেতনভাবেই, নিজের কাপপ্লেটটা টেবিলে রাখে।
দু’জনের আঙুল স্পর্শ করলো না…
কিন্তু খুব কাছে এসে থেমে গেল।
সেই সামান্য দূরত্বটাই যেন তাদের সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি—
ছোঁয়া যায়, তবুও ছোঁয়া যায় না।
আনন্দি হঠাৎই বলে উঠলো,
— কি রে, তোরা এত চুপচাপ কেন?
দু’জনেই চমকে উঠে দ্রুত নিজেদের স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
অনল হালকা হেসে বলল,
-- পরিচয় তো সবে হল। সময় দে বন্ধুত্ব করবার।
-- কিন্তু দাদা আমার মনেহচ্ছে তোরা যেভাবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছিস যেন তোরা আগে থাকতেই একে অপরকে চিনিস
আনন্দি ফিসফিস করে অনলের কানের কাছে বলে।
অনল চুল টেনে বোনের বলে,
-- বড্ড ফাজিল তুই। চুপচাপ বোস তো দেখি
বিনীতা অবাক হয়ে জানতে চাইলো
-- কী বলল ও?
— কিছু না, এমনি…
কিন্তু তার চোখ আবার একবার বিনীতার দিকে চলে গেল।
বিনীতা এবার চোখ সরাল না। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও, সে তাকিয়ে রইলো—একটু অভিমান, একটু লজ্জা, আর গভীর ভালোবাসা মেশানো সেই দৃষ্টিতে।
মনে মনে সে শুধু একটা কথাই বলল—
“ এখনো বাড়িতে কিছুই বলে উঠতে পারোনি?…”
আর অনল, সেই দৃষ্টি বুঝে নিয়েই, নিজের মনে নিঃশব্দে উত্তর দিল—
“ বলবো সব বলবো। এবার বলার সময় এসে গেছে…।বলে দিলেই তো বলা হয়ে গেলো। বেশ তো লাগছে এই মুহূর্তগুলি। আস্তে আস্তে সেই কলেজ লাইফের প্রেমের মত প্রেমটা জমুকনা!
হঠাৎ তোমায় দেখলাম আর বিয়ে হয়ে গেলো। তার চেয়ে এইভাবে প্রেম পর্বটা জমিয়ে আমরা আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসি নাহয় -
চারপাশে তখনও গল্প, হাসি, চায়ের আড্ডা চলছে—
কিন্তু সেই মুহূর্তে, অনল আর বিনীতার জন্য পুরো পৃথিবীটা যেন থেমে গেছে,
শুধু তাদের চোখের ভাষাটাই কথা বলছে…
ঠিক ভালোবাসা হওয়ার সেই আগের মুহূর্ত।
বিনীতা এবং অনল দু'জনেই একটু নিরিবিলি চাইছে যাতে কথা বলার সুযোগ পায়। কিন্তু এত লোকের ভিড়ে সে সুযোগ পাওয়া সম্ভব নয়। ভাবতে লাগলো কী করা যায়।
হঠাৎ লোডশেডিং। মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলের উপর রাখা। মামা,মামী গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে আর ভারতবর্ষের লোডশেডিংয়ের পি*ণ্ডী চটকাতে চটকাতে ছাদে উঠে গেলেন। আনন্দি তার ঘরে গেলো ইমারজেন্সি লাইটটা আনতে। অনলের বাবা গিয়ে বসলেন বড় বারান্দায়। মা মোমবাতি জ্বালিয়ে রান্নাঘরে।
ডাইনিংয়ে শুধুমাত্র অনল আর বিনীতা।সুযোগ পেয়েই অনল শুরু করলো খুব চাপাস্বরে -
-- আমি কিন্তু ভীষণভাবে আশা করেছিলাম আমায় ফোন করবে। এই ক'টামাসে এমন কোন দিন নেই আমি তোমার ফোনের আশা করিনি।
-- আমায় দাদা জানিয়েছিল সে তোমায় নম্বর দিয়েছে। আমিও তোমার ফোনের আশা করতাম। তারপর দেখলাম তুমি আর ফোন করলে না তখন ধরেই নিয়েছিলাম সেদিনের ঘটনাটা হয়ত হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফল তুমি কোন যোগাযোগ রাখতে চাও না বলেই হয়ত আর ফোন করলে না।
-- কাল আমি গিয়ে তোমায় পৌঁছে দেবো।
-- তা কীকরে সম্ভব? মাসীমণি তো মায়ের সাথে দেখা করতে যাবে।
-- আরে মামী আমার মাইডিয়ার। ঠিক ম্যানেজ করে নেবো। আর হ্যাঁ এবার চেষ্টা করো শিলিগুড়ি থেকে বদলি হয়ে কলকাতার দিকে আসবার।
-- এই বাড়ির কাছে
মুখে বিনীতার দুষ্টু হাসি
-- হ্যাঁ এই বাড়ির কাছে। প্রথম বিয়েটা বাড়িতে জানাতে না পারলেও এই মেয়েটাকে আমার ভালো লেগেছে বিয়ে করতে চাই - বাড়িতে এই কথাটুকুই যথেষ্ঠ। আর একবার তোমায় বিয়ে করে নেবো। কিন্তু বদলিটা তো হতে হবে।
অনল হাসতে থাকে মুখে হাত দিয়ে
অনলের কথা শেষ হতেই আনন্দি তার ঘরের ইমার্জেন্সী লাইট নিয়ে চলে এলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিকও চলে এসেছে।
-- এই দাদা তোরা এতক্ষণ কী কথা বলছিলি?
-- তাহলে তোকে জানানোর জন্য প্রথম থেকে আবার শুরু করি?
অনলের কথা বলার ধরণ দেখে বিনীতা হেসে ফেলে। শুরু হয়ে যায় দুই ভাইবোনের খুনসুটি। ততক্ষণে ছাদ থেকে মামা,মামীও নেমে নিচুতে এসেছেন।
-- মামী, কাল আমি বিনীতাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো। তোমাকে আর কষ্ট করে যেতে হবে না।
সঙ্গে সঙ্গে মামী বলে উঠলেন
-- ওরে আমি তো আমার সইয়ের সাথে দেখা করতে যাবো। তুই পৌঁছে দিয়ে আসলে কীকরে হবে?
-- এটা তো ভেবে দেখিনি। তাহলে সবাই এক কাজ করি আমরা সবাই মিলে একবেলা বিনীতাদের বাড়িতে খেয়েদেয়ে একটু ঘোরাঘুরি করেই কলকাতা ফিরি।
বিনীতা চুপ করেই বসে আছে। যা বলার অনলই বলে চলেছে। সকলের মত নিয়ে ঠিক হল আগামীকাল সকালে মামী, অনল,আনন্দি আর বিনীতা টিফিন করে বেরিয়ে যাবে ফিরবে সেই সন্ধ্যায়।
রাতে খাবার টেবিলে সবাই বসে। অনলের মা ইরাদেবী একাই সকলকে পরিবেশন করছিলেন। বিনীতা উঠে গিয়ে বলল,
-- মাসিমা আমি আপনাকে একটু হেল্প করি। সেই থেকে গরমে রান্নাবান্না করলেন।
-- না না মা তুমি একদিনের জন্য এসেছো। তুমি বোসো আমিই সকলকে পরিবেশন করছি।
-- কিছু হবে না। আমিও আপনার এক মেয়েরই মত।
ইরাদেবী হেসে পড়লেন। আনন্দি মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
-- মা দেখো একে পছন্দ হলে ছেলের বৌ করতে পারো। কথা বলে দেখেছি কোথাও কোন প্রেমট্রেম নেই।
-- অনল পাশেই বসে খাচ্ছিল। তার কানে কিছু কথা গেছে। সেও ঝুঁকে পড়ে মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-- আমার কিন্তু কোন আপত্তি নেই
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment