ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৪০)
কৌশিকী তার জীবনে অনেক চরাইউৎরাই পেরিয়ে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। মা,বাবার সাথে পাঁচ বছর বয়সে গ্যাংটক বেড়াতে গিয়ে গাড়ি অক্সিডেন্টে দু'জনকেই হারিয়ে প্রায় পনেরদিন একাকী একটি শিশু হাসপাতালে ডাক্তার আর নার্সদের কোলে কোলে ঘুরে বেড়িয়েছে। শেষমেষ মামা,মামী অনেক খোঁজাখুঁজির পর হাসপাতালে ছুটে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেই থেকে মামা,মামীই তার মা,বাবা। আইনের জটিলতা কাটিয়ে নিঃসন্তান দম্পতির চোখের মণি হয়ে ওঠে সে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া কৌশিকী তার চালচলন, হাবভাবে নিজেকে আধুনিকা করে গড়ে তুললেও অন্তরটা তার একদম মোমের মত নরম। কিন্তু তাকে দেখে কেউ কখনোই সেটা বুঝতে পারবে না। বাইরেটা সে একটা কঠিন আবরণে নিজেকে মুড়ে রাখে। যুগ যুগ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও খুব ছেলেবেলার আঘাতটা আজও তার কাছে দগদগে ঘায়ের মত। চোখ বুজলেই যেন সে আজও দেখতে পায় মা,বাবার সাথে সে গাড়িতে বসে আছে আর গাড়িটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিচে পড়ে যাচ্ছে। দু'জনেই সেদিন দু'দিক থেকেই তাকে জড়িয়ে ছিলেন। দু'জনেই চেয়েছিলেন আঘাত যত দু'জনেরই গায়ে লাগুক মেয়েটা যেন সুস্থ থাকে। ঈশ্বর হয়ত তাদের এই আকুতি শুনেছিলেন। উদ্ধারকারীরা কৌশিকীকে যখন উদ্ধার করেছিলেন তখন দু'জনের বুকের ভিতর সর্বশক্তি দিয়ে আটকে রাখা মেয়েটিকে তারা জ্ঞানহীন ভাবে অক্ষতই পেয়েছিলেন
এই দুঃস্বপ্নের থেকে সে যে কোনদিনও বেরোতে পারবে না এটাও সে জানে। কিন্তু কোনদিনও সে তার মামা কিংবা মামীকে যাদের আজ সে মা,বাবা বলেই ডাকে তাঁদের বলেনি। তারা জানেন পাঁচ বছরের স্মৃতি সে ভুলে গেছে। কিন্তু তার জীবনের ফেলে আসা অতীতের সেই ভয়ঙ্কর দিনটা এখনো জীবন্ত। মামা,মামীর কাছ থেকে মা,বাবার আদরের কোন খামতি কোনদিনও সে দেখেনি। কিন্তু তবুও কোথাও সেই ঘা'টা মাঝে মাঝেই তাকে ব্যথায় ভরিয়ে দেয় তবে সেটা সকলের অলক্ষ্যে। কখনোই সে কাউকে সে কথা বুঝতে দেয় না।
কাওকে কোনদিনও তার ভালো লাগতে পারে, সে কাওকে ভালবাসতে পারে এটা সে কোনদিনও স্বপ্নেও ভাবেনি। খুব কাছের দু'জনকে একসাথে হারিয়ে হারানোর যন্ত্রণা সে প্রতি পলেপলে অনুভব করেছে। তাই মামা আর মামী ছাড়া নতুন করে কারো সাথে সে কোনদিনও জড়াতে চায়নি। কিন্তু অনলকে দেখে তার সমস্ত ভাবনার উপরে কে যেন জল ঢেলে দিয়েছিল। কিন্তু আজকের ফোনটা তার ভাবনার উপর ঈশ্বর আর একবার জল ঢেলে দিলেন কিন্তু নিঃশব্দে। অনল যে অন্য কাওকে ভালোবাসে এটা সে আজ নিশ্চিত হল। সে সঙ্গে সঙ্গেই মনস্থির করলো আর কখনোই অনলকে সে ফোন করবে না। আগামীকাল তার পুরোনো অফিসে গিয়ে একটা চেক আনার কথা সেটা নিয়েই অন্য কলিগদের সাথে একটু দেখা করে চলে আসবে। নিজের থেকে সে অনলের সাথে দেখা করতে যাবে না।
কৌশিকীর গল্পটা ভাঙা স্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে জীবন গড়ার এক দৃঢ় উদাহরণ। সে ভাঙবে তবু মচকাবে না। ছোট থেকেই সে নিজেকে সেইভাবেই প্রস্তুত করেছে। ছোট্ট পাঁচ বছরের সেই মেয়েটা, যে একদিন হঠাৎ করেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শূন্যতার মুখোমুখি হয়েছিল, সে-ই আজ নিজের শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গ্যাংটকের সেই দুর্ঘটনার পর হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতর, অচেনা ডাক্তার আর নার্সদের কোলে কোলে ঘুরে বেড়ানো দিনগুলো তার জীবনের প্রথম কঠিন পরীক্ষা ছিল। বাবা-মায়ের মমতা হারিয়ে ফেলা সেই অসহায় শিশুটি হয়তো তখনও বুঝতে পারেনি, জীবন তাকে কত বড় লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করছে।
তারপর মামা-মামীর আগমন—ঠিক যেন অন্ধকারে এক টুকরো আলো। তাদের ভালোবাসা, স্নেহ আর নিরাপত্তার ছায়ায় ধীরে ধীরে আবার বাঁচতে শেখে কৌশিকী। আইনের জটিলতা পেরিয়ে, নিঃসন্তান সেই দম্পতির জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সে। মামা-মামী শুধু তাকে আশ্রয়ই দেননি, দিয়েছেন নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস।
ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা, আধুনিক চিন্তাভাবনা, আত্মবিশ্বাসী চালচলন—সব মিলিয়ে কৌশিকী আজকের দিনে একজন আত্মনির্ভর, সচেতন নারী। বাইরে থেকে তাকে দেখে অনেকেই ভাবতে পারে, সে খুব শক্ত, খুব হিসেবি। কিন্তু আসলে তার অন্তরটা এখনো সেই ছোট্ট মেয়েটার মতোই কোমল—মোমের মতো নরম, ভালোবাসায় ভরা।
জীবনের প্রতিটা আঘাত তাকে ভেঙে দেয়নি, বরং আরও শক্ত করে গড়ে তুলেছে। কৌশিকী জানে, হারানোর যন্ত্রণা কী, তাই যে কারও ভালোবাসাকে সে আরও গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু কিছুটা দূরত্ব রেখেই। সেই ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে রাখার ক্ষমতা সে রাখে। তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা গল্প, অনেক বেদনাময় স্মৃতি—তবুও সে এগিয়ে চলে, নিজের মতো করে, নিজের স্বপ্নের দিকে।
কলকাতার অফিসে জয়েন করার প্রথম দিন থেকেই অনলের প্রতি সে এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে। কিন্তু অনল তাকে কোনদিনও সেভাবে পাত্তা দেয়নি। কৌশিকী মন খুলে কখনোই অনলের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। চেষ্টা করেছে তার মনের কথা ব্যক্ত করবার জন্য কিন্তু কখনোই অনল তাকে বিন্দুমাত্র সময় দেয়নি। বারবার বিনা কারণে অনলকে ফোন করে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে। সবকিছু যেন ছাড়িয়ে গেছে আজকে অনলের ব্যবহার! ভীষন আঘাত পেয়েছে সে আজ অনলের আজকের কথাই। অনলের দিক থেকে কোন সবুজ সংকেত সে পায়নি একথা যেমন ঠিক তেমনই ঠিক সে কোনদিন অনলকে তার মনের কথা খুলে বলেনি কিংবা বলার মত সুযোগ পায়নি। কিন্তু তবুও একটা আশায় বুক বেঁধে ছিল। হয়ত কিছুদিন দূরে থাকলে অনল তার শূন্যতা অনুভব করবে। অবশ্য সবই ছিল তার চিন্তা।
সেই প্রথম দিন থেকে তার এই এক তরফা ভালোবাসা সে একাই বহন করে চলেছে। কিন্তু আজকে সে ফোনটা করেছিল আগামীকাল অফিসে এসে বাইরে কোথাও অনলের সাথে সময় কাটিয়ে তার মনের কথাগুলি বলার জন্য। কিন্তু যেভাবে এবং যে বিরক্তির সুরে অনল আজ কৌশিকীর সাথে কথা বলেছে তাতে সে নিজেই অবাক হয়ে গেছে। তার মন বলছে এই কথাগুলো অনলকে বলা একদম ঠিক হবে না। কারণ তার প্রতি অনলের বিন্দুমাত্র কোন ভালোলাগা নেই। খামোখা ভালোবাসার কথা জানিয়ে শুধু অপমানিতই নয় নিজের ভালোবাসাকেও অসম্মান করা হবে।
এদিকে বিনীতাদের বাড়ি থেকে ফেরার পথে রাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে পড়ায় এই গরমে সকলে ভীষন নাজেহাল হয়ে পড়ে। বারবার অনল ফোন করতে থাকে। মনের ভিতর একটা খারাপ চিন্তা তার থেকেই যায়। বিনীতা যখন প্রথমবার আনন্দিরা বেরোনোর পর ফোন করে তখন ফোনটা ধরেই অনল বলে,
-- আজ তোমায় খুব সুন্দর লাগছিল
-- তুমি কী করে জানলে?
-- দিব্য চক্ষু দিয়ে
-- আনন্দি ছবি পাঠিয়েছিল?
-- ইয়েস ম্যাম। শুধু ছবি নয় পুরো আশীর্বাদের ভিডিও করে পাঠিয়েছে। তোমার দেওয়া আলপনার খুব গুণকীর্তন করছিল।
-- সত্যিই ও একটা পাগলী!
-- এটাই ঠিক হল জানো? আমরা বিয়ের দিনে রেজিস্ট্রি করে ওখান থেকে সোজা আমাদের বাড়িতে চলে আসবো। নতুন করে বিয়ের অনুষ্ঠানের সত্যিই আর প্রয়োজন নেই। সবাই মিলে সঠিক ডিসিশনটাই নিয়েছে। আমার মামার উপর সে বিশ্বাস ছিল যে মামা এমনটাই করবেন।
-- দাদা কিন্তু বলেছিল কলকাতা একটা ঘর ভাড়া করে আবার বিয়ের অনুষ্ঠান করতে। কারণ বরযাত্রীর একটা ব্যাপার তো থেকেই যায়।
-- আরে তারা সবাই বৌভাতে এসে খাবে। খামোখা কতগুলো টাকা খরচ করার কোন মানেই হয় না।
রাত বাড়তে থাকে দু'জনের কথাও চলতে থাকে। হঠাৎ অনল বলে ওঠে
-- একটু হোল্ড করো মামা ফোন করছেন
বিনীতা ফোনটা ধরে থাকে ওদিকে অনল মামার ফোন রিসিভ করে জানতে পারে হাইওয়ের উপরে গাড়ি খারাপ হয়ে বসে আছে। আশেপাশে কোন দোকান , লোকালয় নেই। ড্রাইভার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু সফল হবে বলে মনে হচ্ছে না। শুনেই অনলের মাথায় হাত। মামার ফোনটা কেটে বিনীতাকে কথাটা জানিয়ে সে পুণরায় মামাকে ফোন করে বলে ওখানকার লোকেশনটা পাঠাতে। অন্য কোন উপায় বের করতে পারে কিনা -।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment