ভালোবাসার নীল আকাশ (১২ পর্ব)
কৌশিকী, অনলের তার প্রতি এই উদাসীনতায় একদম মুসরে পড়ে। কিন্তু সেটা ভিতরে অনলকে সে কিছুতেই বুঝতে দেয় না কারণ অনলের দিক থেকে কোন সাড়া তার প্রতি ছিল না। আর তাছাড়া বিয়ে বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই সে অনলের ভিতর অদ্ভুত এক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে । কিছু যে একটা তার জীবনে ঘটেছে এটা সে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। এরপর দিন সাতেক অফিস করার পর কৌশিকী চাকরিতে রিজাইন দিয়ে নিজের বাড়ির কাছে শিলিগুড়ির সরকারি স্কুলের চাকরিটাই বেছে নেয়। চলে যায় কৌশিকী। কৌশিকীর মনে সবসময় অনল বিরাজ করলেও অনলের মনে সব সময়ের জন্য রয়ে গেছে বিনীতা।
ওই ঘটনার পর থেকে বিনীতা আজ প্রায় একমাস হতে চললো অনলের সাথে কোন যোগাযোগই করেনি। প্রথম প্রথম অনলের খুব খারাপ লাগলেও আস্তে আস্তে এটা জীবনের উপর দিয়ে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা বলেই মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে অনল। কিন্তু মন মানে কী?
এরই মাঝে এক রবিবারের দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে ফোন নিয়ে অনল খুটখাট করছিল। হঠাৎ বিজয়ের মোবাইল থেকে বেশ কিছু ছবি অনলের ওয়াটসঅ্যাপে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই অনল দেখতে শুরু করে তার বিয়ের ছবিগুলো। ছবি দেখা শেষ করার আগেই বিজয় ফোন করে। অনল "হ্যালো" বলতেই বিজয় বলে ওঠে,
-- তোর জীবনের এই ঘটনার জন্য আমিই একমাত্র দায়ী। আমি জানি না তুই আমাকে ক্ষমা করতে পারবি কিনা, বন্ধু হিসাবে ক্ষমা চাওয়ার কোন মুখ আমার আছে কিনা তাও জানা নেই।
বিজয়ের কথার মাঝখানেই অনল বলে ওঠে,
-- এই দাঁড়া দাঁড়া কিসব বলছিস তুই? একই বাক্যে একবার বন্ধু বলছিস আর একবার ক্ষমা চাইছিস? তোর দাবিটা কী আমার কাছে? আমাকে কি একটা অমানুষ ভেবেছিস? আর এসব কথা কেনই বা বলছিস? আমি তো এই ব্যাপারে তোকে দায়ী করিনি। এটা আমার কপালের লিখন! তানাহলে এতদিন বাদে তোর সাথে আমার দেখাই বা হবে কেন?
বিজয় চুপ করে আছে দেখে অনল আবার বলে,
-- হ্যালো শুনতে পারছিস?
-- হ্যাঁ শুনছি বল। আসলে সেদিন মায়ের কথাগুলো শোনার পর আমিও পরে ভেবে দেখলাম আমি ঠিক করিনি। আমার বোন যাতে লগ্নভ্রষ্ট না হয় সেদিকটা দেখতে গিয়ে তোর জীবনটাও আমি নষ্ট করে দিলাম।
-- এসব কথা এখন বলছিস কেন? আর বলেই বা লাভ কী? যা হবার তাতো হয়েই গেছে। আমি তো তোর বোনকে বলেই এসেছি যদি ও না চায় তাহলে এই সম্পর্ককে অস্বীকার করতে পারে। আমার দিক থেকে কোন জোর নেই। আমি জানি সেদিন গাড়িতে আমাদের কথা বলার জন্যই তুই সেখান থেকে সরে গেছিলি। আমি তোর বোনকে ফোন নম্বর দিয়ে এসেছিলাম। বলেছিলাম আমাকে ওর নম্বরটা দেওয়ার কথা। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে আমায় কোন ফোন করেনি। আমি বুঝতে পারছি সে আমার সাথে কোন যোগাযোগ রাখতে চায় না। আমি ইচ্ছা করলে তোর কাছ থেকে নম্বর নিয়ে ওকে ফোন করতেই পারতাম। কিন্তু আমি সেটা করিনি কারণ এই সম্পর্কটা সে রাখবে কি রাখবে না এটা সম্পূর্ণ তার উপর নির্ভর করছে। আমি কোন জোর করবো না কখনো।
-- কেন ও তো তোর বিবাহিতা স্ত্রী। তুই জোর করবি না কেন? উল্টো দিক থেকে ও নিজেও তো এটাই ভাবতে পারে।
-- সত্যি বলতে কি জানিস বিজয়? আমি বোধহয় ওই কয়েক ঘণ্টায় বিনীতাকে ভালোবেসে ফেলেছি। নিজের মনটাকে নিজেই বুঝতে পারছি না। আসলে কোনদিন প্রেমে পড়িনি তো।
কথাটা বলে অনল হেসে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বিজয় বলে ওঠে,
-- আমিও এই ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। তাই তোকে কোন হেল্প করতে পারলাম না ওই প্রেমে পড়ার ব্যাপারে আর কী!
বিজয়ও হাসতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে আবার নিজেই শুরু করে
-- বিনীতা… ও ইচ্ছে করে তোকে এড়িয়ে যাচ্ছে।
অনলের বুকটা যেন হঠাৎ ধক করে ওঠে, -- মানে? কী বলছিস তুই?
-- সেদিন বিয়ের পরদিনই ও আমাকে সব বলেছিল। ও বলেছিল, এই বিয়েটা পরিস্থিতির চাপে হয়েছে। ও তোকে অসম্মান করতে চায় না, আবার নিজের মনকেও ঠকাতে পারছে না। তাই ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তোকে সময় দেবে… আর নিজেও দূরে থাকবে।
অনল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর একটু কঠিন গলায় বলে, -- তাহলে এতদিন যোগাযোগ না করার কারণ এটাই?
-- হ্যাঁ। আর একটা কথা… ও এখন শিলিগুড়ি নেই।
-- কোথায় গেছে?
-- দিল্লিতে। স্কুল ছুটি পড়েছে। আমার এক মাসি থাকেন দিল্লিতে। তাই ঘুরতে যাওয়া একটু আর কি!
অনলের মাথাটা যেন ঝিমঝিম করে ওঠে। এতদিন যার একটা ফোনের জন্য প্রতিটা মুহূর্ত অপেক্ষা করেছে সে এত দূরে… আর ইচ্ছে করেই দূরে!
-- তুই আরও আগে আমাকে কিছু জানাসনি কেন?
বিজয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে, -- বলার সাহস পাইনি। সাহস কথাটা ঠিক হল না আসলে সেদিনের হঠাৎ ঘটা ঘটনার জন্য নিজেকে ভীষণভাবে দায়ী মনে হচ্ছিল। সত্যিই তো তোর জীবনের সুন্দর একটা স্বপ্নের মুহূর্ত আমি নষ্ট করে দিয়েছি। তবুও ভেবেছি জানিস ব্যাপারটা হয়ত তোরা দু'জনে মিলে ঠিক করে নিতে পারবি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তোরা দু'জনেই দু'দিক থেকে অদ্ভুতভাবে নীরব! কেউ কারো সাথেই যোগাযোগ করছিস না। আবার এও ভেবেছি সময় দিলেই হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে… কিন্তু আজ তোর ওই ছবিগুলো দেখার পর… আর পারলাম না।
অনল হালকা হেসে বলে, -- মজার ব্যাপার কী জানিস? আমি ভাবছিলাম বিনীতা যখন চুপ করে আছে তাহলে ও হয়ত এই সম্পর্কটা চাইছে না। তাই আমার উচিত দুঃস্বপ্ন ভেবে সবটা ভুলে যাওয়া… কিন্তু যত ভুলতে চাইছি, ততই যেন ওকে বেশি মনে পড়ছে।
-- তুই কী করতে চাইছিস এখন?
অনল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, -- জানি না… কিন্তু একটা কথা বুঝেছি, পালিয়ে গিয়ে কিছু হয় না। ও যদি নিজের মতো সময় নিতে চায়, নিক। কিন্তু আমি আমার দিক থেকে একবার অন্তত চেষ্টা করব।
-- কীভাবে?
-- ওর সাথে কথা বলব। সরাসরি। যা বলার সামনে বসেই বলব।
বিজয় একটু থেমে বলে, -- যদি ও তোকে ফিরিয়ে দেয়?
-- দেবে না। তোর কী মনেহয়? তোরই তো বোন।আমায় ফিরিয়ে দেবে?
-- ও খুব জেদি রে! কারো অনুকম্পার পাত্রী হতে রাজি নয়। আত্মমর্যাদা ওর জীবনে সবচেয়ে উঁচু স্থানে।
অনল শান্ত গলায় উত্তর দেয়, -- তাহলেও অন্তত আফসোস থাকবে না যে চেষ্টা করিনি।
-- তবে আমি তোর প্রতি আশাবাদী। মা যাই বলুন না কেন আমি জানি সেদিন আমি কোন ভুল করিনি আমার বোনের সারাজীবনের সঙ্গী বাছতে। আমার বোন খুব সুখী হবে।
অনল চুপ করে থাকে। বিজয় ফোনটা কেটে দেয়। তার মনের মধ্যে একটা খুশির ঝলক দিয়ে ওঠে। আজ অনলের সাথে কথা বলে সে বুঝতে পারে অনলের মনের ভিতর বিনীতা অনেকটা জায়গা নিয়ে বসে আছে। সে মায়ের ঘরের দিকে এগিয়ে যায় অনলের সাথে যে তার কথা হয়েছে সেটা জানাতে। সেই মুহূর্তে ছোটমামার ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনটা কানে ধরে "হ্যালো"বলতেই মামা বলে ওঠেন,
-- তোকে একটা খবর দেওয়ার আছে রে বিজয়। বিনীতার বিয়েটা যে ঘটক ঠিক করেছিলেন তিনি আজ ফোন করেছিলেন। সেদিন অপারেশন করে অর্পণের শরীর থেকে গুলি বের করার পর বেশ কিছুদিন ও কোমায় ছিল। এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।
-- একটা ভালো খবর শোনালে মামা। আমি অবশ্য ঘটককে জানিয়ে দিয়েছি সেদিনই আমার বোনঝির বিয়ে হয়ে গেছে।
-- আমাদের কি একদিন ওকে দেখতে যাওয়া উচিত?
-- যাবো আমি তুই দু'জনেই যাবো। এগুলো ভবিতব্য রে! যা হবার তাই হয়েছে। কিন্তু মনুষ্যত্ব বলে একটা কথা আছে। সেই কারণেই দেখতে যাবো।
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর অনল জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আকাশটা আজ অদ্ভুত নীল। ঠিক যেন তার নিজের মনের মতো—অস্পষ্ট, অথচ গভীর।
সে নিজের মনেই বলে ওঠে, -- বিনীতা, এবার আর দূরে নয়… যেভাবেই হোক, আমি একবার তোমার সাথে দেখা করে তোমার মতটা জানতে চাই। আসলে কী চাও তুমি? সামনে থেকে তোমায় কিছু প্রশ্ন করব। যদি তুমি না চাও আমি সরে দাঁড়াবো তোমার জীবন থেকে।
অনলের চোখে যেন নতুন আলো জ্বলে ওঠে।
হয়তো… আবার একটা নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
জানালার বাইরে আকাশটা আজ সত্যিই অদ্ভুত নীল। যেন ভালোবাসার সেই নীল আকাশ আবার নতুন করে ডানা মেলতে প্রস্তুত ।
ক্রমশ…
No comments:
Post a Comment