ভালোবাসার নীল আকাশ ( এগারো পর্ব)
ডাক্তার, নার্স ছুটে আসে। সকলে লক্ষ্য করে অর্পণের হাতের আঙুল নড়াচড়া করছে। ডাক্তার জানান অর্পণের জ্ঞান ফিরছে। ময়ূর আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে বাইরে ছুটে গিয়ে অর্পিতাকে ফোন করে। অর্পিতা সেই মুহূর্তে হাসপাতালে আসতে চায়। কিন্তু তখন ভিজিটিং আওয়ার শেষ হওয়ার পথে। এখন আসলে সে দাদাকে দেখতে পারবে না তাই বরং আগামীকাল আসাই ভালো হবে। অর্পিতা ময়ূরকে বলে সে যেন ডাক্তারের কাছ থেকে সবকিছু ভালোভাবে জেনে আসে। হাসপাতাল থেকে অর্পিতার বাড়ি হয়ে ফিরতে সেদিন ময়ূরের বেশ রাত হয়ে যায়। ময়ূরের বাড়ির লোক বেশ টেনশনে ছিলেন কারণ কয়েকদিন আগেই এরূপ একটি ঘটনা ময়ূরের জীবনের উপর দিয়ে ঘটে গেছে। সত্যি বলতে ময়ূরের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে আগেও যেমন ছিল এখনো ঠিক তেমনই অকুতোভয়। কোনকিছুতেই ভয় পাওয়ার মেয়ে সে নয়।
আস্তে আস্তে অর্পণের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।লাইফ সাফোর্ট সব খুলে দেওয়া হয়। সে উঠে বসতে পারে। নিজে হাতে খেতেও পারছে। ঠিক সাতদিন পরে অর্পণকে ছেড়ে দেয় হাসপাতাল থেকে। এই কটাদিন ময়ূরের উপর থেকেই যেন ঝড়টা বেশি গেছে। হাপাতাল,বাড়ি,অর্পিতার বাড়ি করতে করতে ময়ূর হাঁফিয়ে উঠেছে। মাঝে মধ্যে আবার স্কুলেও যেতে হয়েছে। আর সেটা সে বাধ্য হয়েই গেছে মা,বাবার মন রাখতে।
হাসপাতালে অর্পণের কাছে একটা টুলে বসে চোখ বন্ধ করা অর্পণের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ময়ূরের ভিতরে অর্পণের প্রতি যে ভালোবাসার বীজ সে বপন করেছে তা ধীরে ধীরে শিকড় গজাতে শুরু করেছে। সে এখন রোজ তাদের বাড়িতে না আসলেও মাঝে মধ্যেই অর্পণদাকে দেখতে আসে। আর রোজই সাথে করে নিয়ে আসে মায়ের হাতের কিংবা নিজেই রান্না করে কিছু খাবার।
অর্পণের সাথে খুব একটা কথা হয় না ময়ূরের। কিন্তু ময়ূর বুঝতে পারে অর্পণ তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। সে এটাও বুঝতে পারে অর্পণের এই ব্যাপারে কোন হেলদোল নেই। মাঝেমধ্যে বোনের সাথে ইয়ার্কি করতে গেলে বোনের বন্ধু অর্থাৎ সেই বোন হিসাবেই ময়ুরকেও বলে,
-- মাথায় এক গাট্টা মারবো।
কিংবা কখনো বা বলে,
-- ওহ্ তোরা এত বুঝে গেছিস মনেহচ্ছে তোরা দু'জনেই আমার গার্জিয়ান হয়ে গেছিস। আমি এখন যথেষ্ঠ ভালো আছি। এবার ময়ূরের কেসটা শুরু করবো।
এ কথা শুনে অর্পিতা, ময়ূর দু'জনেই কেঁপে ওঠে। অর্পিতা অসহায়ের মত ময়ূরের দিকে তাকায়। ময়ূর সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
-- কিন্তু আমি তো কেসটা লড়তে চাই না।
-- মানে? তারমানে তুমি আমায় হেরে যেতে বলছো? যে কেস নিয়ে এত কিছু হয়ে গেলো সেখান থেকে মাথা নিচু করে সরে আসতে বলছো?
-- না আসলে ঘটনাটা তা নয়। সামনেই পরীক্ষা। আর তাছাড়া মা,বাবা তো প্রথম থেকেই চাননি যে কেসটা আমি লড়ি। তাঁরা তো আপনার কাছেও এসেছিলেন যাতে আপনি কেসটা হাতে না নেন।
-- এই দাঁড়াও কেসের প্রসঙ্গে পরে আসছি। তুমি আমায় আপনি বলবে না। তুমি অর্পিতার বন্ধু। আমার বোন কি আমায় আপনি বলে? তুমি করে কথা বলবে। হ্যাঁ এবার বলো কী বলছিলে?
-- সে রকম কিছু নয়। এই সময় এইসব করতে গেলে পড়াশুনায় মন বসাতে পারবো না।
-- তুমি কী করবে? কেসটা তো লড়ব আমি
-- হ্যাঁ সেতো নিশ্চয়। কিন্তু আমাকেও তো মাঝে মধ্যেই হাজিরা দিতে যেতে হবে। আমাকে ছাড়া তো আর কেসটা লড়তে পারবেন মানে পারবে না।
অর্পণ অবাক হয়ে ময়ূরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথম দিন যে মেয়েটার মধ্যে আগুন দেখেছিল সেই আগুন আজ আর নেই। পরিবর্তে সে যখন কথা বলছে তার মধ্যে একটা সলজ্জ ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। অর্পিতার কাছে সে শুনেছে ময়ূর এই ক'টামাস প্রায়ই হাসপাতাল গেছে আর দু'ঘন্টা সময় ওই টুলের উপরে বসেই তার মুখের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিয়েছে। অর্পিতা কথা প্রসঙ্গে তার দাদাকে এটাও বলেছে ময়ূরের এই কেসটা নেওয়ার ফলে তাকে যে এই বিপদের মুখে পড়তে হয়েছে সেটা সবাই জানে। তাই সে তার দাদাকে অনুরোধও করেছে যাতে পুণরায় কেসটা কোর্টে না তোলে। তারমানে অর্পিতা কি কিছু বলেছে ওকে?
অর্পণ ময়ূরের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- এই তোমাকে কেসটা না করার বুদ্ধিটা দিয়েছে কে? পরিষ্কার করে তার নামটা আমায় বলো শুনি
-- না না কেউ আমায় নিষেধ করেনি। তখন প্রথম প্রথম আমার প্রচন্ড রাগ ছিল তাই --
কথা শেষ করার আগেই অর্পণ বলে ওঠে,
-- এখন রাগটা নেই কেন?
ময়ূর হেসে দেয়। তুমি আমায় যতই বলো আমি আমার পড়াশুনার ক্ষতি করে এই কেস নিয়ে আর মাতবো না। তাছাড়া বাবার সামান্য ইনকাম। টিউশন ফি, সংসার খরচ তার উপর এই কেস কোথা থেকে আসবে এত অর্থ?
-- ওহ্ বুঝেছি। তারমানে প্রথম থেকেই ধরে বসে আছো আমি এই কেস করতে তোমার কাছ থেকে ফি নেবো। আরে না তুমি হচ্ছ অর্পিতার বন্ধু। আমি দাদা হয়ে বোনের কেস লড়তে কি টাকা নিতে পারি? কিন্তু কেসটা আমি লড়বোই। যে কেসের জন্য আমাকে মে"রে পর্যন্ত ফেলতে চেয়েছে সে কেস আমি এত সহজে ছেড়ে দেবো না।
-- কিন্তু আমি তো কেস লড়বো না।
ওদের কথার মাঝে অর্পিতা বলে উঠে,
-- ঘরেই কেসের লড়াইটা চালিয়ে যা আমি চা টিফিনের ব্যবস্থা করি।
ওখান থেকে ময়ূরও সরে পড়ার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
-- চল, আমিও তোর সাথেই যাই
-- এই যাই মানে কী? এখানে বসো।তোমার সাথে আমার কথা আছে।
-- কিন্তু আমার তো কথা শেষ হয়ে গেছে। এবার চা টা খেয়ে বাড়ি যাবো।
-- আমাকে সত্যি করে বলো তো কেন তুমি আর কেসটা লড়তে চাইছো না? আমার এই ঘটনার জন্য?
অর্পিতা আগেই উঠে চলে গেছে। ময়ূর অর্পণের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বলে,
-- একদম যে তা নয় সেটা মোটেই নয়। সবচেয়ে প্রধান কারণটা হচ্ছে পড়াশুনার ভীষন ক্ষতি হয়ে যাবে।
কথাটা মুখে বললেও ময়ূরের অন্তরাত্মা জানে এটা সর্বৈব মিথ্যে কথা। যে ঘটনা ঘটতে চলেছিল তার থেকে বেরোতে পেরে ময়ূর যেন দম ছেড়ে বেঁচেছে। সারাটা জীবন একটা মানুষের মৃত্যুর দায় বহন করে বেড়াতে হত। কী ভয়ানক ঘটনা ঘটেছিল। ঈশ্বর মঙ্গলময় তাই হয়ত এই দায় থেকে ময়ূর নিষ্কৃতি পেয়েছে।
-- দেখো আমি তোমায় জোর করতে পারি না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে এরূপ ঘটনা ঘটতেই পারে। আমরা যদি ভয়ে সব সময় পিছিয়ে যাই তাহলে তো অন্যায় হতেই থাকবে কোনদিন কোন প্রতিকার হবে না।
অর্পণের কথাগুলো যেন ঘরের ভেতরের বাতাসকে ভারী করে তুললো। ময়ূর চুপ করে বসে থাকে। তার চোখ নিচু, কিন্তু মনের ভেতর ঢেউ উঠছে একের পর এক।
অর্পণ আবার ধীরে বলে,
— আমি জানি তুমি ভয় পেয়েছো… আর সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি কি সত্যিই চাও, যারা অন্যায় করেছে তারা এভাবে পার পেয়ে যাক?
ময়ূর মাথা তুলে তাকায়। অর্পণের চোখে সে আগের সেই আগুনটাই দেখতে পায়—অটল, দৃঢ়।
কিন্তু আজ সেই আগুনের পাশে একটা মমতাও যেন মিশে গেছে।
— আমি ভয় পাইনি… — ময়ূর আস্তে বলে।
— তাহলে? — অর্পণের গলায় প্রশ্ন।
ময়ূর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
— আমি আর কোন ঝামেলায় জড়াতে চাই না, আমি কাউকে হারাতে চাই না… আর বিশেষ করে তোমাকে না।
কথাটা বেরিয়ে যেতেই ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। যেন সময় থমকে গেছে।
অর্পণ স্থির দৃষ্টিতে ময়ূরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই প্রথম সে ময়ূরের চোখের ভেতরটা পড়ার চেষ্টা করে। সেখানে আর শুধু একটা কেসের লড়াই নেই… আছে গভীর একটা টান, একটা অজানা অনুভূতি।
ঠিক তখনই অর্পিতা ট্রে হাতে ঘরে ঢোকে।
— কি রে, তোরা এত চুপচাপ কেন? মনে হচ্ছে যেন কোর্টের রায় বেরোতে চলেছে!
ময়ূর একটু হেসে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
অর্পণও হালকা গলায় বলে,
— রায় তো একদিন বেরোবেই, … তবে তার আগে লড়াইটাও দরকার।
অর্পিতা দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। সে মজা করে বলে,
— আচ্ছা, তোমরা কেস লড়বে কি লড়বে না সেটা সম্পূর্ণ তোমাদের ব্যাপার। তবে আমার মনেহচ্ছে এবার অন্য একটা কেস ফাইল হতে চলেছে।
ময়ূর লজ্জায় বলে ওঠে,
— আরে চুপ কর না! কী যে বলিস!
অর্পণ হালকা হেসে চা হাতে তুলে নেয়। কিন্তু তার চোখে একটা নতুন ভাব—যেন সে কিছু বুঝতে শুরু করেছে।
চা খাওয়ার ফাঁকে অর্পণ আবার বলে,
— ঠিক আছে, তুমি এখনই সিদ্ধান্ত নিও না। সময় নাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো… সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোটা কখনো ভুল নয়।
ময়ূর চুপ করে মাথা নাড়ে।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে ময়ূরের মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা আবার ভারীও লাগে।
রাস্তায় বাতির আলো পড়ছে, হালকা হাওয়া বইছে… কিন্তু তার ভেতরে যেন একটা নতুন অনুভূতির জন্ম হচ্ছে।
সে নিজের মনেই বলে,
"আমি কি সত্যিই শুধু কেসটা থেকে সরে আসতে চাইছি… না কি আমি ওর জন্য ভয় পাচ্ছি?"
অন্যদিকে, অর্পণও সেই রাতে ঘুমোতে পারে না।
ময়ূরের কথাগুলো বারবার কানে বাজতে থাকে—
"আমি কাউকে হারাতে চাই না… বিশেষ করে তোমাকে না…"
অর্পণ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। বয়সে অনেক ছোট মেয়েটির জন্য অর্পণের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে -।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment