ভালোবাসার নীল আকাশ ( ১৪ তম পর্ব)
বহুদিন ধরেই অর্পিতা আর ময়ূর নলিনীর বাড়িতে আসবে আসবে করছে। কিন্তু তপেশ যেদিন বাড়িতে আসে যেহেতু নলিনী এই সম্পর্কে কিছুই জানতো না আর সেদিনই ওরা ঠিক করেছে দোলের আগেরদিন ওরা নলিনীর শ্বশুরবাড়িতে আসবে আর দোলের দিন রাতে করে ওদের কলকাতা পৌঁছে দেবে নলিনীর ড্রাইভার। কিন্তু তপেশ এসে যাওয়াতে নলিনী এখন কী করবে বুঝতে না পেরে সকালবেলা টিফিন নিয়ে শ্বশুরের করে ঢুকে বলে,
-- বাবা, তোমায় বলেছিলাম না আমার দু'জন বন্ধু আসবে দোলের আগেরদিন। ওরা বহুদিন ধরেই আসতে চাইছে। মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের পুজো হবে বলে ওইদিন ঠিক করেছিলাম -
-- এত কিন্তু কিন্তু করছো কেন মা? হ্যাঁ আসবে। ভালো তো আমিও চাই তুমি এভাবেই হাসি আনন্দে থাকো। অসুবিধা তো কিছু নেই।
-- না, মানে আমি তো জানতাম না তোমার ছেলে ওইদিন বাড়ি আসবে তাই -
-- তাতে কী? ভালোই তো হল।
বৃদ্ধ মনেমনে কী ভেবে ভালো হল বললেন নলিনী তার কিছুই ঠাওর করতে না পেরে চুপ করেই থাকলো।
নলিনী কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শ্বশুরের কথার ভেতরে যেন অন্য কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে—এমনটাই মনে হচ্ছিল তার। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর গলায় বলল,
— ঠিক আছে বাবা, তাহলে আমি ওদের আসার সব ব্যবস্থা করে নিচ্ছি।
— হ্যাঁ মা, করো। আর শোনো, তপেশেরও তো ওদের সঙ্গে আলাপ হওয়া দরকার, তাই না? কারা তোমার বন্ধু, কাদের সাথে তুমি এখন উঠাবসা করছো সবকিছুই তো এখন তার জানার সময় এসেছে। আমার মনেহচ্ছে আমার প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে এবার।বৃদ্ধের গলায় যেন এক অদ্ভুত শান্ত হাসি।
নলিনীর বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। তপেশ আর অর্পিতা-ময়ূরের মুখোমুখি হওয়া—এই ব্যাপারটা সে কোনোভাবেই সহজভাবে নিতে পারছে না। সব বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলেও কিছু কথা তো গোপন থেকেই যায় যা একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু মুখে কিছু না বলে সেখান থেকে বেরিয়ে এল।
নিজের ঘরে এসে দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করতেই সে মোবাইলটা তুলে নিল। অর্পিতাকে ফোন করতেই ওপার থেকে খুশির গলা ভেসে এল,
— কিরে! অবশেষে ফোন করলি? আমরা কিন্তু রেডি হয়ে আছি।
নলিনী একটু থেমে বলল,
— তোদের আসা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই… কিন্তু একটা ব্যাপার হয়েছে।
— কী হয়েছে? তোর গলাটা এমন কেন? — অর্পিতার গলায় উদ্বেগ স্পষ্ট।
— তপেশ হঠাৎ করে বাড়ি এসেছে। আর দোলের সময় ও বাড়িতেই থাকবে।
কিছুক্ষণের জন্য ওপারটা নিস্তব্ধ। তারপর পুণরায় অর্পিতার গলা শোনা গেল,
— তপেশ? মানে… তোর স্বামী? ভালোই তো। পরিচয়টা হয়ে যাবে। তুই তো কোন কথাই তার সাথে এইকটা বছরে বলিসনি। এবার কথা হবে আর তাছাড়া আরও অনেককিছুই হতে পারে কী তাই তো?
অর্পিতা প্রচণ্ড হাসতে থাকে।
-- এই এই একদম বাজে বকবি না বলে দিচ্ছি। আমি কিন্তু তোদের সব বলেছি ওর আর আমার সম্পর্কের কথা।
-- আরে দাঁড়া আগে আমাদের আসতে দে তোদের বাড়িতে। তারপর দেখি কী করা যায়। আবার হাসতে থাকে অর্পিতা।
নলিনী দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ফেলে বলল,
— দেখ মানুষের ভাগ্যকে অস্বীকার করা যায় না। কপালে যা আছে তাই হবে। তাই বলে ওর কাছে আমি মাথা নত করতে পারবো না কারণ তাহলে আমার শ্বশুরমশাইকেই ছোট করা হবে। সেটা আমি পারবো না কিছুতেই।
অর্পিতা একটু ভেবে বলল,
— তাহলে কি আমরা আসবো না?
—আরে না! তোদের আমার বাড়িতে আসার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই রে। তোরা আসবি, থাকবি আর জমিয়ে আমরা দোল খেলবো।
-- এই খাওয়ার কথা বললি নাতো
দু'জনেই জোরে হাসতে থাকে। এরপর
নলিনী যেন একটু বেশি জোরেই বলে ফেলল।
— তোরা আসবি। এতদিন পর… একটা ডেট ফাইনাল করেছি আমরা। আর বাবা বলেছেন তোদের আসতেই হবে। আমরা খুব মজা করবো। তাড়াতাড়ি চলে আসবি কিন্তু।
ওপাশে অর্পিতা ধীর স্বরে বলল,
— ঠিক আছে, আমরা আসব। একদম ভাবিস না। আমরা দু'জনে ব্যাগ গুছিয়ে একদম রেডি।
নলিনী জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। বসন্তের হাওয়ায় গাছের পাতা নড়ছে, কিন্তু তার মনের ভিতরটা যেন অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে।
মনেমনে ভাবতে থাকে এতদিন পর এবার তপেশ বাড়ি ফেরার পর সেও লক্ষ্য করছে তার সম্পর্কে যেন একটু বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে, সে নিজেও বুঝতে পারছে না কী হতে চলেছে… । তবে অর্পিতার কথাটা খুব মনেহচ্ছে। সে বলেছে সবকিছুর একটা শেষ আছে। দেখিস তপেশদা এবার ঠিক তার মনের কথাটা তোকে জানাবে আর এবারই সব ঠিক হয়ে যাবে। কখনো কখনো মুখোমুখি হওয়াটাই দরকার হয়। তারজন্য উভয়কেই একটু সাহস যেমন দেখাতে হয় ঠিক তেমনই একটু মাথাও নোয়াতে হয়। একপক্ষের ইচ্ছায় কিছুই হয় না। এটা ভালোবাসা বস্। এখানে সবকিছুই চলে আর কোনকিছুতেই দোষ দেখলে হয় না।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে নলিনী ঘুমিয়ে পড়ে। আর ওদিকে তপেশ তার ঘর লাগোয়া লম্বা বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে ভাবতে থাকে নলিনী নিজের থেকে হয়ত কোনদিনও তাকে মেনে নিতে পারবে না কারণ সে সম্পূর্ণভাবেই এই ব্যাপারে বাবার উপর নির্ভরশীল। সেতো শুধু একটু সময় চেয়েছিল নিজেকে তৈরি করার। এখন সে মোটামুটি একটা চাকরি তো পেয়েছে। বাবার এই বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী সে হলেও সে কখনোই চায়নি বাবার উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাতে। বাবা বিষয়টা বুঝতে পারেননি বলেই হয়ত তাকে ভুল বুঝেছেন। কিন্তু এখন তো কোন সমস্যা নেই। তবে নলিনীর দিক থেকে কোন সাড়া না পেলে সে নিজের থেকে কোন কথা তাকে বলতেও পারছে না। কিন্তু কোথায় বাঁধছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। ঘরে,বাইরে সব জায়গায় সকলের মুখে নলিনীর প্রশংসা। শুনতেও খুব ভালো লাগছে তপেশের। তাহলে কি সে বিয়ের মাত্র ক'টি মন্ত্র পড়ার কারণেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছে? কী আছে ওই মন্ত্রে? তপেশ ভাবতে থাকে ওর মনের মধ্যে নলিনী জন্য যে ঝড় উঠেছে নলিনীর মনেও কি তারজন্য কোন জায়গা তৈরি হয়েছে? সে কি একবারের জন্যও তার কথা ভাবছে? নাকি ফুলশয্যার রাতের সেইসব কথা ধরে বসে আছে? যেভাবেই হোক নলিনীর সাথে কথা বলতেই হবে।
ভোরে উঠে সেদিন তপেশ নিজের বারান্দাতেই বসে ছিল। রান্নাঘরে কাজের মাসি চা করে যখন কাপে ঢালতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে বড়বাবুর ডাকে তাকে তাপসবাবুর ঘরের দিকে ছুটতে হল। অগত্যা নলিনী চা কাপে ঢেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থেকে তাকে দেখতে না পেয়ে নিজেই চা নিয়ে তপেশের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। বুকটা যদিও কাঁপছে তবুও চা'টা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে এই আশঙ্কায় তার ঘরের কাছে এসে পর্দা সরিয়ে দেখে তপেশ ঘরে নেই। এগিয়ে যায় বারান্দার দিকে। দেখে ইজি চেয়ারটাতে বসে আনমনেভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তপেশের সামনে চা'টা রেখেই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ তপেশের কথাই দাঁড়িয়ে পড়ে। বুকের ভিতর তখন নলিনীর সমুদ্রের গর্জন চলছে যা সেই একমাত্র শুনতে পাচ্ছে।
-- কথা ছিল
নলিনী দাঁড়িয়ে পড়ে।
-- তোমার আমাকে কিছু বলার নেই?
নলিনী কিছুটা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-- বাবার এখন বয়স হয়েছে। মাঝে মাঝেই শরীর খারাপ করে। কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া এই বিশাল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী আপনি । সবকিছু বুঝে নিতে হবে তো তিনি থাকতে থাকতে। আমি পরের বাড়ির মেয়ে। আর কতদিন এসব রক্ষা করে চলবো?
তপেশ নলিনীর এই কথাই একটুও অবাক হয় না। তারমত বুদ্ধিমতী মেয়ের কাছ থেকে এরকমই সে আশা করেছিল। বরং না হলেই হয়ত সে অবাক হত।
-- প্রথমেই তোমায় একটা কথা বলি। আমায় আপনি বলবে না। আপনি বললে অনেক দূরের মনেহয়। আমি কি সত্যিই তোমার দূরের কেউ?
নলিনী কাঁপতে থাকে। কোন উত্তর দেয় না। তপেশ আবার বলে,
-- হ্যাঁ আমার পড়াশুনা তো শেষ। ছোটখাটো একটা চাকরিও পেয়েছি। আশাকরি এরপরে আরও ভালো কিছু পেয়ে যাবো। এখন তো ছুটি পড়লেই বাড়িতে আসবো। কোন অসুবিধা হবে না আর। কিন্তু আমি বলছিলাম --
চুপ করে যায় তপেশ। নলিনী উৎসুক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তপেশ কথাটা ঘুরিয়ে দিয়ে বলে,
— শুনলাম তোমার বন্ধুরা আসছে?
— হ্যাঁ… ।
— ভালো। আমিও তো চিনে নেবো, তাই না? — তপেশের চোখে যেন কৌতূহলের সঙ্গে অন্য কিছু ঝলক দিল।
নলিনী হালকা হাসার চেষ্টা করল,
— নিশ্চয়ই।
তপেশ কাপটা নামিয়ে রেখে বলল,
— নলিনী, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বলো।
— তুমি কি সত্যিই খুশি এখানে?
প্রশ্নটা শুনে নলিনী থমকে গেল। এতদিনের জমে থাকা প্রশ্ন যেন হঠাৎ করেই সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,
— খুশি থাকার চেষ্টা করি। বাবা আমায় খুব ভালোবাসেন। তাঁর একমাত্র সন্তান তাঁর কাছে থাকে না। তাই বোধহয় আমায় এভাবেই আঁকড়ে ধরেছেন।
তপেশ গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল,
— চেষ্টা আর সত্যি—দু'টো কিন্তু আলাদা জিনিস। তবে আমি তো কিছুদিন সময় চেয়েছিলাম মাত্র। এখন তো সব কিছুই ঠিক হয়ে যেতে পারে ।তাই না?
নলিনী আর কিছু বলতে পারল না। বাতাসটা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎ করেই তপেশ জানতে চাইলো,
-- আচ্ছা তুমি কোন কলেজে পড়ো?
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment