ভালোবাসার নীল আকাশ ( ১৫ তম পর্ব)
সেই ফুলশয্যার রাতের পর এতগুলো বছর বাদে আজ পুণরায় তপেশের সাথে কথা। তপেশ একবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু নলিনীর বুকের ভিতরে যে ঝড় বয়ে চলেছে তার বিন্দুমাত্র তপেশ টের পাচ্ছে কি? নলিনী চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়লো। পুণরায় তপেশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে তার প্রশ্নের উত্তর দিলো কম্পিত কণ্ঠ
-- আমি ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজে পড়ি
-- ওই কলেজেই তো
কথা বলতে বলতে নলিনীর দিকে তাকিয়ে দেখে সে কথাটি বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। দরজার দিকে তাকিয়ে তপেশ দেখে নলিনীর চলে যাওয়ার প্রমাণ দিচ্ছে দরজার পর্দা হেলেদুলে।
আজ দু'মাস তপেশ ওই কলেজেই লাইব্রেরিয়ান পদে রয়েছে। কিন্তু নলিনীকে সে কোনদিন দেখেনি কিংবা হয়ত দেখেছে চিনতে পারেনি। শুভদৃষ্টিতে সেভাবে কেউ কাউকেই দেখেনি। ফুলশয্যার রাতে আবছা আলোয় যে মেয়েটির সাথে সে কথা বলেছিল তার দিকে তাকিয়েও সে সেদিন দেখেনি। তাই মুখোমুখি হলেও সে হয়ত নলিনীকে চিনতে পারেনি। নলিনীও ঠিক তাই। অজান্তেই তপেশের মন বলে ওঠে, "ঠাকুমা যে বলতেন জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে সবই ভবিতব্য।" এটাই হয়ত ঠিক। ঈশ্বর বোধহয় এইভাবেই তাদের বিয়েটা কপালে লিখেছিলেন। যা তার জীবনে ঘটেছে সবই কপালের লিখন ছাড়া আর কিছুই নয়।
অনেকদিন পর আজ বাবা, ছেলে একই সাথে ডাইনিংয়ে খেতে বসেছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাপসবাবু এখন তার নিজের ঘরেই খান। অনেকদিন পর আজ তাঁর মন খুব প্রফুল্ল। তিনি বুঝতে পারছেন এবার তাঁর মনের আশা পূরণ হতে চলেছে। ছেলের হাবভাব দেখে বাবা হিসাবে হয়ত তিনি তার মন সঠিক পড়তে পারছেন। সকালেও তিনি মাসিকে বিনা কারণেই ঘরে দেখে এটা ওটা করিয়ে আটকে রেখেছিলেন। তাকে পাঠিয়েই পর্দার বাইরে থেকে তাদের কথোপকথন শুনতে না পারলেও তারা যে কথা বলছে সে খবর তার বিশ্বস্ত গৃহ কর্মচারীটি এনে দিয়েছে। তাই আজ তিনি বেশ খোশমেজাজেই আছেন। ছেলের পছন্দসই বাজার করিয়েছেন। আজ কী কী রান্না হবে তাও তিনি তার বৌমারুপি কন্যাটিকে জানিয়ে দিয়েছেন। পরিশেষে তিনি বৌমাকে বলেছেন
-- আজ আমি ডাইনিংয়ে খেতে যাবো মা।
-- কিন্তু বাবা
-- কোন কিন্তু না। ছেলেকে একদম বুড়ো করে রেখে দিয়েছো। সব সময় শাসনে আছি। আজ আমার এই কথাটা তুমি রাখো মা। তোমার সেবাযত্ন নিয়ে আমি তো ভালোই আছি এখন। ক'টাদিন বাড়ির ভিতর এদিকওদিক করলে আমার শরীরের কোন ক্ষতি হবে না।
-- ঠিক আছে। আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাবো তবে।
-- যদিও আমি একাই যেতে পারবো তবুও তুমি যখন বলছো তাই হবে।
দুপুরে মাসিকে খাবার রেডি করতে বলে নলিনী আসে তার শ্বশুরকে নিয়ে যেতে। একটু আগেই মাসি খাবার খেতে ছোটবাবুকে দেখে গেছে। তাপসবাবু ঘরে বসে সেটা জানতে পেরে নিজে খেতে যাওয়ার জন্য দরজার কাছে দাঁড়িয়ে - ভাবখানা এমন তিনি কারও সাহায্য ছাড়াই একাই চললেন খেতে। তপেশ তার ঘর থেকে বেরিয়ে বাবাকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে এসে তাঁকে ধরে বলে,
-- আরে তুমি একা কোথায় যাচ্ছ?
-- কেন আমি দুপুরে খাবো না
-- তুমি তো ঘরে খাও। এইভাবে এগোতে গেলে তুমি তো পড়ে যাবে বাবা।
-- মোটেই পড়বো না। মা আমাকে ছোট খোকাটি পেয়েছে। যেন টলোমলো পায়ে হাঁটি।( বৃদ্ধ মনেমনে হাসছেন কথাগুলো বলে। কারণ এসবই তাঁর অভিনয় চলছে। ছেলের সাথে আগের মত ফ্রী হওয়ার জন্য)
তপেশ বাবাকে ধরে এগোতে থাকে। আর বৃদ্ধ বলেই চলেছেন,
-- আমাকে ধরার কোন দরকার নেই, আমি একাই যেতে পারবো। মা আমাকে একটু বেশি শাসনে রেখেছে তাই আমি ঘরে খেতাম, এখন থেকে আমি আমি ডাইনিংয়ে গিয়েই খাবো, আমি এখনো এত বুড়ো হইনি --
-- কে বলেছে আপনাকে বুড়ো ? আপনি আমার যুবক ছেলে -
বলতে বলতে নলিনী এসে তাপসবাবুকে ধরে ফেললো। তার মুখে হালকা হাসি, কিন্তু চোখের কোণে অদ্ভুত এক টান— যেন ভিতরে কোথাও জমে থাকা আবেগকে আড়াল তো করছেই একটা ভালোলাগাও কাজ করছে বাবা, ছেলেকে একসাথে দেখে।
-- আপনি একদম ঠিক বলছেন বাবা, আপনি একা একাই যেতে পারবেন। তবুও আমরা আছি তো, একটু নাহয় আমরা আপনাকে ধরে নিয়ে গেলাম। তাতে আমাদেরও ভালো লাগবে যে! এটুকু করতে দেবেন না?
তাপসবাবু মুচকি হেসে বললেন,
-- আহা, আদর না পেলে কি আর বাঁচা যায় নাকি? তবে বেশি আদর করলে কিন্তু আমি সত্যিই বুড়ো হয়ে যাবো।
তপেশ হেসে উঠলো। বহুদিন পর এই হাসি— নির্ভেজাল, স্বতঃস্ফূর্ত! নলিনী এক ঝলক তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এই মানুষটাই কি সেই মানুষ, যার সাথে তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত, অসম্পূর্ণ একটা সম্পর্ক জড়িয়ে আছে?
তিনজনে ধীরে ধীরে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো।
মাসি গরম ভাত, ডাল, আলু-পোস্ত, মাছের ঝোল, চিংড়ির মালাইকারি সাথে আবার কচি পাঠার পেঁয়াজ রসুন ছাড়া শুধুমাত্র লবঙ্গ,গোলমরিচ আর আদা দিয়ে পাতলা ঝোল সব সাজিয়ে রেখেছে। তাপসবাবু বসেই বললেন,
-- আজ তো দেখি রাজকীয় আয়োজন!
নলিনী হেসে বললো, -- আপনার জন্যই তো বাবা। আপনার কথামত সব বাজার করা হয়েছে আজ। বৃদ্ধ একটু হোঁচট খেলেন। কারণ তিনি তো আজ ছেলের পছন্দসই বাজারের ফর্দ করে দিয়েছিলেন। তপেশ বাবার দিকে একটু আড়চোখে দেখে
চুপচাপ বসে খেতে শুরু করলো বাপ, ছেলের চোখাচোখি হল।
কিন্তু হঠাৎই তার চোখ পড়লো নলিনীর দিকে। সে খুব স্বাভাবিকভাবে সবার থালায় খাবার পরিবেশন করছে— কিন্তু তার হাতের হালকা কাঁপুনি তপেশের চোখ এড়ালো না।
-- তুমি ঠিক আছো? — হঠাৎই প্রশ্নটা করে ফেললো তপেশ।
নলিনী একটু থমকে গেল। তারপর দ্রুত সামলে নিয়ে বললো, -- হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি। কেন?
-- না, এমনিই… মনে হলো—
বৃদ্ধ ছেলে আর বৌমার এই সাধারণ কথা শুনেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু তাদের মোটেই বুঝতে দিলেন না বিষয়টা।
কথাটা শেষ করলো না তপেশ। কিন্তু তার চোখে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল।
তাপসবাবু দু’জনের দিকে তাকিয়ে সবটাই লক্ষ্য করছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞ চোখ এড়ালো না এই অস্বস্তি, এই অদ্ভুত টানাপোড়েন।
খাওয়ার মাঝেই তিনি হঠাৎ বললেন, -- তপেশ, তোমার কলেজ কতদিন ছুটি? মানে আমি বলতে চাইছি তুমি কতদিন বাড়িতে আছো? ছুটি শেষ হলেই আবার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি এখান থেকেই কলেজ করবে ভাবছো?
সত্যি বলতে তপেশ তো এই ব্যাপারে কিছুই ভাবেনি। তাই সে চুপ করেই থাকলো। বৃদ্ধ তখন বললেন,
-- আমরা তোমাকে কিছু না বললেও তুমি নিশ্চয়ই শুনেছ আমার মা এখন কলকাতায় কলেজে পড়ছে। যদিও রোজ যেতে পারে না। কিন্তু তাতে কী মায়ের আমার রেজাল্ট মন্দ নয়। ওই যে কলেজটার নাম --
তপেশ বলে উঠলো,
-- ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজ
-- ওহ তুমি জানো দেখছি - তা তুমি কোন কলেজে আছো?
-- আমিও ওই কলেজেই আছি
নলিনী খাসির মাংসের ঝোলটা বাটিতে তুলছিল। তপেশের কথা শুনে তার হাত ফোসকে কিছুটা ঝোল টেবিলে পড়ে গেলো। বাবা, ছেলে দুজনেই দেখলেন কিন্তু সেই বিষয়ে কোন কথা না বলে তাদের আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন।
-- মা আমার এখান থেকেই যাতায়াত করে। একটু তো কষ্ট হয় বৈকি। কিন্তু তবুও বাড়িতে থাকার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে কী বলো? তোমার বিশেষ কোন অসুবিধা না হলে তুমিও বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতে পারো। গাড়ি তো আছেই।
কিছুটা সময় নিয়ে তপেশ মুখ নিচু করে খেতে খেতে বাবাকে জানালো,
-- এই বিষয়ে এখনো কিছু ভাবিনি। তবে এখন মনেহচ্ছে ভাবতে হবে।
শেষ কথাটা একটু আস্তেই বলে সে। কথাটা বৃদ্ধের কান অবধি না পৌঁছালেও নলিনী ঠিক শুনতে পায়। সে তার স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ে। তপেশও ওই সময় নলিনীর দিকে তাকিয়েই কথাটা বলে। দু'জনে চোখাচোখি হতেই লজ্জায় নলিনী মুখটা নিচু করে নেয় আর তপেশ একটা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে চোখটা নামিয়ে নেয়।
বয়সের ভারে বৃদ্ধের শ্রবণশক্তি সামান্য কমলেও ছানি অপারেশনের পর দৃষ্টিশক্তি হয়েছে প্রখর। সবকিছুই দেখে তিনি মনেমনে ভাবতে থাকেন "তবে কি আমার আর আমার বৌমা রুপি মেয়ের জীবনে দেখা স্বপ্নগুলি বাস্তব হতে চলেছে? মৃত্যুর আগে কি আমি আমার ছেলের জীবনটা গুছিয়ে দিয়ে যেতে পারবো? ঈশ্বর কি সে সুখ আমার কপালে লিখেছেন? এই বৃদ্ধ বয়সে সবচেয়ে দামী সিদ্ধান্তটা নিতে আমি যে কোন ভুল করিনি তা কি দেখে যেতে পারবো?"
ক্রমশ
8
No comments:
Post a Comment