ভালোবাসার নীল আকাশ (১৬ তম পর্ব)
খাওয়া চলছে, বাবা ছেলের টুকটাক কথাও চলছে। তপেশ বলছে কম, শুনছে বেশি। বারবার আড়চোখে নলিনীকে দেখছে। নলিনীও তাই। মাঝে মাঝে দু'জনের চোখাচোখি হয়ে গেলেই তড়িঘড়ি নলিনী মুখ নামিয়ে নিচ্ছে। বৃদ্ধের চোখে কোনকিছুই এড়াচ্ছে না। তিনি ছেলে এবং ছেলের বউকে এটাই দেখাতে ব্যস্ত যে তিনি কোনকিছুই দেখছেন না; একমনে খেয়ে চলেছেন। একসময় তাপসবাবু তার বৌমাটিকে বললেন,
-- মা, আমাদের তো সব দেওয়া হয়ে গেছে। তুমি বসে পড়লে হত না?
-- তা কীকরে হয় বাবা। বাড়িতে এত লোকজন। কেউই এখনো খেতে বসেনি। ওদের না খাইয়ে আমি কীকরে খেয়ে নিই বাবা? ওরা যে সকলেই আমায় মা বলে ডাকে।
তপেশ অবাক হয়ে নলিনীর দিকে তাকায়। মনেমনে ভাবে বাড়িতে আর যারা রয়েছে তারা সকলেই এ বাড়ির লোক নয়। দাসদাসী, ঠাকুর, মালি। এদেরকেও নলিনী নিজের লোকই ভাবে। মেয়েটা সত্যিই খুব ভালো।
আগামীকাল দোলপুর্ণিমা। নলিনীর বন্ধুরা আসবে। দুপুরের খাওয়ার পর্ব শেষ হতেই বন্ধুদের টিফিনের ব্যবস্থা শুরু হয়ে গেলো। নলিনীর নির্দেশে রান্নার মাসি লুচির গুলি আর আলু চচ্চড়ি তৈরি রেখেছে। গরম গরম ভেজে দেবে সব।
ওদিকে রাধা গোবিন্দের মন্দিরে মন্দির ধোয়া মোছা, ফুল দিয়ে সাজানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। সর্বদিকেই নলিনীর সতর্ক দৃষ্টি।
লুচির গুলি বেলা হয়ে গেছে, আলু চচ্চড়ির গন্ধে যেন গোটা বাড়িটাই ভরে উঠেছে। উঠোনে রোদ পড়ে নরম উষ্ণতা তৈরি করেছে—ঠিক দোলের আগের দিনের মতোই একটা আলাদা আবহ। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে বন্ধুদের দেখা নেয়। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
নলিনী একবার রান্নাঘরে, একবার উঠোনে,আর একবার রাধা গোবিন্দের মন্দিরে—সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা দেখছে। কিন্তু কাজের ভিড়ের মধ্যেও তার মনটা বারবার কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছে তার। তার জীবনের সব চেয়ে কাছের মানুষটি আজ অনেক কথা বলেছে তার সাথে। এতগুলো বছরের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে বোধকরি।
তপেশও বসে নেই। বাইরে থেকে সবকিছু দেখছে। বিশেষত মন্দিরের কাজ নিয়েই সে বেশি ব্যস্ত সেই আগের মত। সে নিজেও মনেমনে ভাবছে সবকিছুই আগের মত আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছে। বাবাকে দেখেও তার অনেকদিন পর মনেহচ্ছে তিনিও বুঝি খুব আনন্দে আছেন। জীবনের উপরের কালো মেঘ বোধকরি আস্তে আস্তে সরতে শুরু করেছে। তার মনও আজ বেশ ফুরফুরে। আজ অনেকদিন পর বাপ,ছেলের অনেক কথা হয়েছে, এখনো চলছে সেই কথা। ঠিক সেই আগের মত। কিন্তু সেই কথার ফাঁকে আড়চোখে
আবার কখনো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে নলিনীর ব্যস্ততা দেখছে। তার চোখে যেন একটা নতুন করে চিনে নেওয়ার চেষ্টা—এই কি সেই নলিনী, যাকে সে একদিন ছেড়ে চলে গিয়েছিল মাত্র কয়েকটি কথা বলে? সে তো এটাই চেয়েছিল নিজেকে তৈরি করতে আর নলিনীর পড়াশুনাটা যাতে বন্ধ না হয়। সবাই তাকে ভুল বুঝলেও সে ঠিক তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে। হয়ত সে তার জীবনে কোন বড় চাকরি পায়নি ঠিকই কিন্তু কে বলতে পারে একদিন হয়ত ওই কলেজেই সে তার নিজের যোগ্যতায় ভালো জায়গায় পৌঁছাতে পারবে। তার ভাবনার ছেদ পড়ে বাবার কথাই।
হঠাৎ তপেশের বাবা মুচকি হেসে বললেন,
— কী রে তপেশ, ? সেই ছোট মেয়েটি দেখেছিস সবকিছু একা হাতে কেমন সামলাচ্ছে। আরে মানুষ চিনতে আমি ভুল করিনি। আমি আমার পরিবারের জন্য যোগ্য পাত্রীর সন্ধান পেয়েছিলাম। তাই তো মাকে তার নাতবৌ দেখানোর সুযোগ হয়েছিল। সারাজীবন রাধা গোবিন্দের নিষ্ঠাভরে সেবা করেছি তার প্রতিদান আমি পেয়েছি। ঈশ্বর আমাকে আমার পরিবারের জন্য উপযুক্ত পুত্রবধূ জোগাড় করে দিয়েছেন।
তপেশ নিজেও যে সেটা বুঝতে পারছে না তা নয়। কিন্তু বাবার এই কথার জবাবে কী বলবে বুঝতে পারছে না ।কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-- আসলে বাবা তুমি নলিনীকে খুব ভালোবাসো।
বৃদ্ধ হালকা হেসে বললেন, ভালবাসি কী আর সাধে রে! ওর মত গুনি মেয়েকে না ভালোবেসে পারা যায়?আসলে কী জানিস বাবা মানুষকে চিনতে অনেক সময় লাগে রে। তুইও হয়তো চিনতে শুরু করেছিস নয়ত একদিন ঠিক চিনতে পারবি।
তপেশ চুপ করে গেল। কথাগুলো যেন তার ভিতরে কোথাও গিয়ে লাগল। হয়ত সে নিজেও বিষয়টা বুঝতে পারছে। নলিনীকে মেনে নিতে তার তো কোন অসুবিধা নেই। শুধু সময়টা সঠিক ছিল না। সে যে পড়াশুনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। তাই সে বিয়েতে অমত করেছিল। কিন্তু ঠাকুমার নাতবৌ দেখার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়েই অসময়ে বিয়েটা করে কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে বাধ্য হয়েছিল। আজ সে তার সবটুকু দিয়েই নলিনীকে চায়। তার যে মনের কোন এক কোণে নলিনীর জন্য একটু একটু করে ভালোবাসা জমা হয়েছে সেটা যে সে ছাড়া আর কেউই জানে না। কিন্তু তার বড্ড জানতে ইচ্ছা করে নলিনীর মনেও কি তার জন্য কোন জায়গা তৈরি হয়নি? নানান ভাবনায় ডুবে যায় সে। হঠাৎ বাইরে গাড়ির আওয়াজে তার ভাবনার তাল কেটে যায়।
এই সময় দরজার বাইরে হৈচৈ শুরু হলো— — নলিনীইই! কোথায় তুই?
অর্পিতা, ময়ূর, একসাথে এসে পড়েছে। হাসি-আড্ডায় মুহূর্তেই বাড়িটা জমে উঠল।
নলিনী ছুটে গিয়ে সবাইকে জড়িয়ে ধরল, — তোরা এলি! ভাবছিলাম আর আসবি না!
-- তোর এই ভাবনার কারণটা জানতে পারি? আমরা তো তোকে বলেছিলাম আমরা আসবোই। এখানে আসার আমাদের একটা প্রধান কারণও আছে। হাসতে হাসতে ময়ূর কথাগুলো বলল।
নলিনী জানতে চাইলো ,
-- কী কারণ রে -
কিন্তু উত্তর পেলো না। অর্পিতা, ময়ূর দু'জন দু'জনের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি হাসলো।
অর্পিতা মজা করে বলল, — দোলের আগে তোর বাড়িতে না এলে কি চলে? আর যখন আমরা সব জেনে গেছি।
ময়ূর চোখ টিপে বলল, — আর শুনেছি, আজ বাড়িতে বিশেষ অতিথিও এসেছে!
নলিনী একটু চমকে উঠে বলল, — কে বিশেষ অতিথি?
ময়ূর হেসে দূরে দাঁড়ানো তপেশের দিকে তাকিয়ে বলল, — আরে, আমরা কি অন্ধ নাকি?
নলিনী লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
তপেশ এগিয়ে এসে নম্র গলায় বলল, — তোমরা নলিনীর খুব কাছের মানুষ, তাই না?
অর্পিতা উত্তর দিল, — হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে … চেনা লাগছে কিন্তু না চিনলেও ক্ষতি নেই। আজ থেকে আপনাকেও চিনে নেবো।
-- হ্যাঁ চেনা লাগতেই পারে। কারণ একটা আছে বৈকি। তবে এখন সেটা বলা যাবে না। তবে বলবো - সময় তো চলে যাচ্ছে না।
এই কথায় যেন একটা অন্যরকম ইঙ্গিত ছিল। ওরা সেটা বুঝল, কিন্তু কিছু বলল না।
উঠোনে সবাই বসে পড়ল। লুচি ভাজা শুরু হলো। গরম গরম লুচি আর আলু চচ্চড়ি নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি—সব মিলিয়ে পরিবেশটা একদম উৎসবমুখর হয়ে উঠল।
কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও একটা অদৃশ্য টানাপোড়েন রয়ে গেল—তপেশ আর নলিনীর মধ্যে।
হঠাৎ অর্পিতা বলল, — কাল দোল। সবাই কিন্তু রঙ খেলবো। কেউ পালাতে পারবি না!
ময়ূর হেসে বলল, — বিশেষ করে দু’জনকে আমরা ছাড়বো না!
সবাই একসাথে বলল, — কারা?
ময়ূর তাকিয়ে বলল, — নলিনী আর তপেশদা!
নলিনী একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, — আরে না না, আমি এসব—
তপেশ ধীরে গলায় বলল, — কেন? খেলতে সমস্যা কোথায়?
নলিনী অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। তপেশের চোখে আজ এক অদ্ভুত কোমলতা।
সে নলিনীর দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে আস্তে করে বলল, — কাল… আমরা একসাথে রঙ খেলব।
নলিনীর বুকটা কেঁপে উঠল। এত সহজে, এত স্বাভাবিকভাবে তপেশ এমন কথা বলবে—সে ভাবতেই পারেনি।
নলিনী কিছু বলতে পারল না। শুধু লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। অর্পিতা আর ময়ূর যেন কিছুই দেখেনি কিছুই শোনেনি।
দূরে আকাশে তখন হালকা রঙের আভা—ঠিক যেন আসন্ন দোলের রঙের ইঙ্গিত।
কিন্তু এই রঙ কি শুধু আবিরের হবে?
না কি এতদিনের দূরত্ব, অভিমান আর না বলা ভালোবাসাও রঙে রঙিন হয়ে উঠবে? সময় সে কথা বলবে।
ক্রমশ -
No comments:
Post a Comment