Friday, March 27, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (১০ম পর্ব)

 ভালোবাসার নীল আকাশ ( দশম পর্ব)

  তপেশ বিহ্বলের মত কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে রইলো। অর্পণকে যখন সকলে ধরাধরি করে গাড়িতে উঠাচ্ছে তখন তপেশ অর্পণের মুখটা দেখতে পেয়ে নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে "অর্পণদা।"
 সুন্দর সুপুরুষ একটি নির্ভীক ছেলে। যে কোনদিনও অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করেনি। নিজের জীবনের পরোয়া না করে সবসময় ন্যায়ের পথে চলেছে। আজ তার এই পরিস্থিতি দেখে তপেশ পুরো বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। দু'দিন  আগে তার জীবনে একটা ভুল বিয়ে আর আজ বিয়ের দিনে অর্পণদার জীবনের এই পরিণতি তার সবকিছু যেন লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে। 
 পাড়া হোক কিংবা বেপাড়া অর্পণদাকে যে কেউ যে কোন বিপদে ডাকলেই তার কাছ থেকে উপকার পেয়েছে। পড়াশুনায় প্রচণ্ড মেধাবী অর্পণদা পরবর্তীতে তাই উকালতিকে তার জীবনের পেশা হিসাবে বেছে নিয়ে আইনী মারফত সকলের পাশে দাঁড়িয়েছে। কেস লড়ে টাকা ইনকাম করা তার জীবনের লক্ষ্য কোনদিনও হয়ে ওঠেনি। ন্যায় বিচার পাইয়ে দেওয়ায় ছিল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। সেই অর্পণদার এই পরিস্থিতি! ঈশ্বর সত্যিই কি অন্ধ? তিনি কি কিছুই দেখতে পান না? তপেশের বাবার জমি সংক্রান্ত ব্যাপারেও কোন সমস্যা হলে অর্পণই তাঁর পাশে থেকে তাঁকে সবসময় সাহায্য করেছে। তপেশ ভাবতে থাকে নিশ্চয় কোন কেস নিয়ে সমস্যা হওয়াতে এবং অর্পণদা সেই কেস লড়াতে তারা ভয় পেয়ে অর্পণদাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে। কারণ আজ পর্যন্ত অর্পণদা কোন কেস হারেনি। কোন মিথ্যাচারীর কেস কোনদিন অর্পণদা হাতে নেয়নি। 
  তপেশ আবার হাঁটতে শুরু করে। প্রকৃত ঘটনা কিছু জানতে পারে না। এটা এমন একটা ঘটনা এই মুহূর্তে কারো কাছে জানতে চাওয়া মানে মনুষ্যত্বহীনতার পরিচয় দেওয়া। ট্রেনটা মিস করলে ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারবে না হোস্টেলে ভেবে সে জোরে পা চালায়।
  মানুষের জীবনে কত রকম ঘটনায় না ঘটে। সবাই ভাবে এক আর হয় আর এক! জীবনে দেখা স্বপ্নগুলি অধরায় থেকে যায় সব সময়। যে মেয়েটির আজ অর্পণদার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সে তো তার বুকের মাঝে অনেক স্বপ্ন সাজিয়ে নববধূ হয়ে অর্পনদার অপেক্ষায় বসে ছিল। মুহূর্তেই তার জীবনের সব স্বপ্ন ভেঙেচুরে তছনচ হয়ে গেলো। সেই পরিবারে অর্পণদার এই  খবর পৌঁছালে পরিবারটির উপর আকাশ ভেঙে পড়বে ভাবলেই শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে তপেশের। এত ভালো একটা মানুষের জীবনের এই পরিণতি!
 তপেশ গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অনেকদিন আর গ্রামে ফেরেনি। দুয়েকজনকে ফোন করে অর্পণদার এই গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর জেনেছে। অর্পণদা যে এখন কোমায় আছে তাও জেনেছে। 
      আর এদিকে নলিনী কলেজে ভর্তি হল। তাপসবাবু তার জমির কিছুটা বিক্রি করে নলিনীর জন্য এক গাড়ি কিনে বসলেন। গ্রামের লোকেরা মুখ টিপে হাসাহাসি, টোন-টিটকারি যে তার কানে আসেনি তা কিন্তু নয়। কারণ সেই যে ছেলে ঠাকুমার কাজ শেষে বেরিয়েছে তারপর আর আসেনি। কিন্তু মাসের শেষে ছেলের বরাদ্দ টাকা তাপসবাবু ঠিক পাঠিয়ে দেন। বাবার খবরাখবরও তপেশ রাখে ফোনের মাধ্যমেই। কিন্তু নলিনী সম্পর্কে কোন কথা বাবার কাছে  জিজ্ঞাসা করতে সে সাহস পায় না। 
 গ্রামে থেকেও যে লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হওয়া যায় সেটাই যেন তাপসবাবু নলিনীকে দিয়ে তার ছেলেকে দেখিয়ে দিতে চান। 
 নলিনী দু' একবার বাপেরবাড়িতে গেলেও সে দিনই ফিরে এসেছে তার বাবা অর্থাৎ শ্বশুর একা থাকবেন বলে। তাপসবাবুও এখন যেন নলিনী ছাড়া অসহায়! পড়াশুনার মধ্যেই নলিনী জমিজমা, বিষয়সম্পত্তি এমনকি সংসারের সবকিছুতেই সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে। শুধু শ্বশুর,বৌমা নয় এখন তারা বাপমেয়ের থেকেও দু'জন দু'জনের কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছেন। দু'জনের মনের কষ্টের দিকটা পরস্পর গোপন রেখেই চলেন।
 কোন কাজেই নলিনীর কোন না নেই। সবকিছুতেই সে যেন সিদ্ধহস্ত। সে সংসার,পড়াশুনা, বিষয় সম্পত্তি এমন কী পাঁচ সাতটা কাজের লোক থাকার পরেও শ্বশুরের সেবাযত্ন সব কিছুই তার নজর এড়ায় না। বয়স জনিত কারণে অনেক সময় জমিজমা সংক্রান্ত কোন ঝামেলায় নলিনী তাপসবাবুকে আর জড়ায় না নিজেই সমস্যার সমাধান করে থাকে। সবকিছু সত্ত্বেও বৃদ্ধের কোথাও যেন একটা কষ্ট কাজ করে তা নলিনী তাঁর মুখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারে। একমাত্র সন্তান ছেড়ে থাকার যে যন্ত্রণা তা  মাঝে মাঝে তাঁর মুখে ফুটে ওঠে। 
 স্কুলে নিয়মিত যাতায়াত করতে না পারলেও পরীক্ষার রেজাল্ট তার মন্দ নয়। আসলে ছেলেবেলা থেকেই নলিনী ছিল খুব মেধাবী। কোন প্রাইভেট শিক্ষক কোনদিন তার পরিবার তার জন্য রাখতে পারেননি। সে যেটুকু পড়াশুনা করেছে নিজের চেষ্টায় আর মেধার গুনে। 
  খুব সুন্দরী সে না হলেও চেহারা তার মন্দ নয়। অভাবের মধ্যে মানুষ হওয়ার ফলে চেহারার লালিত্য সেভাবে ছিল না। ভালো থাকা,খাওয়া আর পরার দৌলতে এখন সে রীতিমত রূপসী। নিজের ব্যক্তিত্ব আর পুরুষের কুনজর থেকে নিজেকে রক্ষা করার সমস্ত গুন তার মধ্যে আছে। 
  সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে জীবন ঠিক এগিয়ে যায়। আগে তপেশ মাঝে মধ্যে বাড়ি আসলেও বিয়ের পর থেকে মোটামুটি আসা বন্ধ করেছে বলাই ভালো।
   নলিনী যখন বারো ক্লাসেভর্তি হয় প্রথম দিন থেকেই স্কুলে নলিনীর খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছে ময়ূর। ময়ূরের কাছেই নলিনী অর্পণের সমস্ত ঘটনা শুনেছে। কিন্তু যে মেয়েটির সাথে অর্পণের বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার সম্পর্কে অর্পণের পরিবার কিংবা ময়ূর কিছুই জানে না। ময়ূর কোনকিছুই লুকায়নি নলিনীর কাছে। অর্পণের এই ঘটনার জন্য সে নিজেকেই দায়ী মনে করে। তার কেসটা নেওয়ার পর থেকেই অর্পণকে নানান হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে আর যার জের স্বরূপ আজ অর্পণের এই পরিস্থিতি!
মাত্র অল্প দিনের বন্ধুত্ব হলেও দু'টি নারী তাদের জীবনে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন এক বেদনাদায়ক ঘটনা থেকে খুব কাছাকাছি চলে আসে। ময়ূরের কাছেই নলিনী জানতে পারে বিয়ের দিনে ওই ঘটনা ঘটার পর ডাক্তার অপারেশন করে আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় চেয়েছিলেন অর্পণের জ্ঞান ফেরার জন্য। কিন্তু চারদিনেও অর্পণের জ্ঞান ফেরেনি। চারদিন পর ডাক্তার জানিয়ে দেন অর্পণ কোমায় চলে গেছে। কবে জ্ঞান ফিরবে আদতেও আর ফিরবে কিনা তাঁরা এই মুহূর্তে কিছুই জানাতে পারছেন না। প্রায় প্রতিদিনই অর্পিতা হাসপাতালে আসে কখনো মা, কখনো বা বাবাকে সাথে নিয়ে। তাই এখন আর নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না সে। 
  সময় কেটে যাচ্ছে ঝড়ের গতিতে। ময়ূর স্কুল ছুটি থাকলেই অর্পণকে দেখতে যায় নিয়ম করে। অর্পিতা এখনো স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেনি। ময়ূরের জন্যই যে আজ দাদার এই পরিণতি বুঝতে পারলেও মুখ ফুটে সে কথা সে বলতে পারছে না ময়ূরকে। কিন্তু কষ্টে তার বুকের ভিতর ফেটে যাচ্ছে। না পারছে ময়ূরকে কিছু বলতে না পারছে নিজেকে সামলে রাখতে। তবে একটা বিষয় অর্পিতা খেয়াল করেছে দাদা গু*লি*বিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই ময়ূরের দাদার প্রতি অদ্ভুত এক সহণাভুতি। ডাক্তারের সাথে কথা বলা, দাদার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানা এগুলো যেন ময়ূরের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হয়ে উঠেছে। ময়ূরের এই কাজগুলো অর্পিতাকে কিছুটা আনন্দ দিলেও এই ঘটনা যে ময়ূরের জন্য ঘটেছে তা সে মন থেকে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারছে না। এদিকে নিত্য হাসপাতাল আসা বাড়িতে বৃদ্ধ মা,বাবাকে সামলানো সবকিছু নিয়ে অর্পিতা নাজেহাল। তবে এখন ময়ূরের কথা শুনে রোজ আসা কিছুটা বন্ধ করেছে কারণ ময়ূর তার স্কুলে এই সমস্যার কথা জানিয়ে সপ্তাহে তিনদিন স্কুলে আসবে বলে পারমিশন নিয়েছে। তাই কিছুটা রিলিফ পেয়েছে অর্পিতা। কারণ এই দৌড়াদৌড়ি, ছুটাছুটিতে সে নিজেও কাহিল হয়ে পড়েছে।
 বয়সের ফারাক অর্পিতার সাথে তার দাদার দশ বছরের। সেই হিসাবে ময়ূরের সাথেও অর্পণের অনেকটাই বয়সের পার্থক্য। ময়ূর যেদিন হাসপাতাল আসে আর যদি তার সাথে অন্য কেউ না থাকে যতক্ষণ সে অর্পণের পাশে বসে থাকে ঠিক ততক্ষণই একদৃষ্টে সে অর্পণের দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনো বা চুলের ভিতর হাত ঢুকিয়ে মাথায় বিলি কাটতে থাকে। ঠিক এমনই একদিনে ময়ূর অদ্ভুত এক পরিবর্তন লক্ষ্য করে অর্পণের শরীরে। সে দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারকে ডেকে আনে।

ক্রমশ 

No comments:

Post a Comment