Sunday, June 7, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৪)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৪)

  ছেলেবেলাতেই কৌশিকী তার মা, বাবাকে হারিয়ে মনটাকে খুব শক্ত করে গড়ে তুলেছে। মামা,মামীর আদর যত্ন ছিল ঠিক মা,বাবার মতোই। কৌশিকীর ওই অল্প বয়সের ঘটনা মনে আছে ঠিকই যা সাধারণত অনেক শিশুরই থাকে না। সেই ছোটবেলার থেকে তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অভিশপ্ত দিনটির কথা হাসপাতালে একবারই সে তার মামা,মামীকে জানিয়েছিল। তারপর আর কোনদিনও সেই প্রসঙ্গ সে তাঁদের সাথে আলোচনা করেনি। স্বাভাবিকভাবেই তার মামা,মামী ভেবেছিলেন কৌশিকী সবই ভুলে গেছে। 

  শিশুমন সেতো নরম কাদার মত। নরম কাদাতে ছাপ পড়লে তা যেমন চিরস্থায়ী রূপ নেয় ঠিক তেমনই শিশুমনে যদি কোন ঘটনা মনের গভীরে দাগ কাটে তা আজীবন সে ভুলতে পারে না শুধু নয় ওই ঘটনা তার চারিত্রিক কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণও হয়ে ওঠে। কখনো তা  ভালো আবার মারত্মক খারাপও হয়ে ওঠে। মা,বাবাকে হারিয়ে তাঁদের স্নেহ ,ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হলেও ঠিক বিকল্প হিসাবে সে তার মামা,মামীর স্নেহ, ভালোবাসা পাওয়ার ফলে তার চরিত্রে কিংবা স্বভাবে খারাপ কোন প্রভাব পড়েনি। কিন্তু সে হয়ে উঠেছে কষ্ট সহিষ্ণু, কথা হজম করার মত ক্ষমতার অধিকারিণী।

     তবে এই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতাটাই ধীরে ধীরে তার একটা দুর্বলতায় পরিণত হচ্ছিল। সবকিছু চুপচাপ মেনে নেওয়ার অভ্যাস তাকে অনেক সময় নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে দিত না। ভেতরে ভেতরে জমে থাকা কষ্ট, না বলা কথাগুলো যেন তার মনের এক কোণে স্তূপ হয়ে থাকত। কিন্তু সে কখনোই মন খুলে এসব কথা কাউকেই শেয়ার করতে পারতো না।

      বাইরে থেকে কৌশিকীকে সবাই শক্ত, স্থির আর আত্মনির্ভরশীল মেয়ে বলেই জানত। কিন্তু সেই শক্ত খোলসের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভীষণ সংবেদনশীল মন, যে এখনো মাঝেমধ্যে হারিয়ে যাওয়া দু'টো মুখকে খুঁজে বেড়ায়—মা আর বাবা। খুঁজে বেড়ায় ঠিক নয় সেই মুখ দু'টো তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ভুলতে চাইলে কিংবা মনে করবে না সেই সব কথা ভাবলেও নির্জনে অন্ধকারে যখন সে একা থাকে তাঁরাই যেন তাকে সাথ দেয়। কষ্ট লাঘব করার শক্তি জোগায়।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে, নিঃশব্দে কখনো কখনো তার চোখ ভিজে উঠে। তবে সে কান্নার শব্দও কারও কানে পৌঁছাতে দেয় না। কারণ সে শিখে গেছে—কষ্ট নিজের মধ্যেই বয়ে নিয়ে চলতে হয়, কাউকে বুঝতে না দিয়ে। খুব কাছের দু'টো মানুষকে একসাথে হারিয়ে হাসপাতালে যে ক'টাদিন সে একাকী অচেনা মানুষগুলির সাথে ছিল ওই ক'টাদিনেই হঠাৎ করেই যেন সে অনেকটা বড় হয়ে উঠেছিল। মামা,মামীকে দেখে তাদের জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল বেশ ক'টাদিন পরে পরিচিত মানুষের মুখ দেখে। এরপর কৌশিকী ওই বয়স থেকেই আর শব্দ করে কাঁদেনি কিংবা বলা ভালো কাঁদতে পারেনি। তার কান্না ছিল এবং আজও আছে চাপা নিঃশব্দ ভাবে।

     তবুও, জীবনের প্রতি তার বিশ্বাসটা একদম ভেঙে পড়েনি। কারণ প্রিয় দু'টি মানুষকে হারিয়ে ঠিক তাদেরই মত  হয়তো ছোটবেলায় পাওয়া মামা-মামীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তাকে শিখিয়েছিল—সব হারিয়েও মানুষ আবার নতুন করে দাঁড়াতে পারে শুধুমাত্র দরকার ভালোবাসার সানিধ্য।
 
 কৌশিকী গড়া একটু অন্য ধাতুতে। হয়ত অন্য কোন বাচ্চা হলে ওই ছোট্ট বয়সে ঘটা ঘটনা তার মনেই থাকতো না ।কিন্তু কৌশিকী কোন কথাই ভোলেনি।

    কৌশিকী সুন্দরী, স্মার্ট, শিক্ষিত হওয়ার ফলে অনেক পুরুষই তার প্রেমে পড়েছে কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে তোমরা যা চাইছো সেটা কোনদিনও সম্ভব নয়। তাই তারা কোনদিনও তার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ খুলতে সাহস পায়নি। কৌশিকীর জীবনে প্রথম ভালোলাগা পুরুষ হল অনল। তার জীবনে দুর্ভাগ্য এটাই অনলকে যখন তার ভালো লাগে কিংবা বলা যায় সে অনলকে ভালোবেসেই ফেলেছে ঠিক তখনই অনলের জীবনের উপর দিয়ে এক মস্তবড় ঝড় বয়ে গেছে। তাই সে অনলের নাগাল কোনদিনও পায়নি।

  অনলকে অফিস ছাড়া সে যে কয়বার ফোন করেছে অনলের ব্যবহারই তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে অনল তাকে পছন্দ করে না। তাই সে আর তার বিরক্তির কারণ যেমন হয়নি অনলকে এড়িয়ে এড়িয়ে যেতেও তার খুব একটা কষ্ট হয়নি। আর যেটুকু কষ্ট সে পেয়েছে নিজেই চোখ মুছে নীরবে হজম করে নিতে পেরেছে এটাই তার বৈশিষ্ট্য। বুক ভেঙে গেলেও মুখে তার প্রকাশ সে করতে পারে না।

 কৌশিকী বদলে গেলো সেই ফোনের পর থেকেই।
  এরপর থেকেই কৌশিকী নিজেকে আরও গুটিয়ে নিতে শুরু করল। অনলের সাথে তার আর কোনো কথা হতো না। আগের মতো হঠাৎ করে ফোন করা, কোনো অজুহাতে কথা বলা—এসব সে একেবারেই বন্ধ করে দিল। যেন নিজের মনকে নিজেই কঠোরভাবে শাসন করেছে
“যেখানে জায়গা নেই, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে নিজেকে ছোট করা।”

 এয়ারপোর্টে দেখা হওয়া, কিংবা অফিসে শেষবারের মত যাওয়া কিন্তু তাকে না বলেই চলে আসা অনল প্রথমদিকে বিষয়টা খেয়ালই করেনি। বরং সে ভেবেছিল, এটাই স্বাভাবিক—যেটা সে চেয়েছিল, সেটাই তো হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু একটা বদল অনলের চোখে পড়তে লাগল। কিন্তু অনল তখন মহাব্যস্ত তার বিধ্বস্ত জীবন নিয়ে।
  কিন্তু সে তখন তার জীবনের ব্যক্তিগত ঝামেলা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল সেদিকে খেয়াল করবার মত তার হাতে সময় ছিল না। তবে হ্যাঁ মাঝে মাঝে কৌশিকীর কথা যে সে ভাবেনি তা একেবারেই নয়। কিন্তু বদলটাও তার চোখে পড়েছে ভীষণভাবে। ব্যাস ওই পর্যন্ত। কেন কিসের জন্য কৌশিকীর হঠাৎ এই বদল তার কারণ সে খুঁজতে যায়নি কিংবা চেষ্টাও করেনি কখনো। কারণ কৌশিকী তার মনের গভীরে সাধারণ আর পাঁচটা মেয়ের মতোই। অফিসের আর সকলের মত সেও একজন কলিগ মাত্র।


  জীবন কখনোই থেমে থাকে না। কারণ ঘড়ির কাঁটা থামতে জানে না। কৌশিকী তার কলেজ আর বাড়িতে ফিরে ছাত্রছাত্রীদের নোট তৈরি করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটা ছাত্রছাত্রী তার কাছে সন্তানের মত। সে নিজে নোটস তৈরি করে তার জেরক্স করে সকলকে দেয়। আজকের যুগে যা অন্য প্রফেসরদের মধ্যে দেখা যায় না। মায়ের স্নেহে সন্তানসম ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জ্ঞান বিতরণই শুধু নয় কীভাবে ইংলিশে তাদের ভয় কাটিয়ে উঠতে পারে সেদিকে সদাসতর্ক দৃষ্টি দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে তাদের এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলেছে।

  একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে বাসে তার সাথে হঠাৎ করেই বিনীতার দেখা। প্রথম অবস্থায় সে বিনীতাকে চিনতে পারেনি। কারণ সে যখন তাকে দেখেছিল তখন বিনীতা সালোয়ার কামিজ পরা এক কুমারী মেয়ে। শাড়ি, সিঁদুরে তাকে দেখে একটু সময় লাগবে বৈকি! বিনীতা তাকে খেয়াল না করলেও কৌশিকী তার দিকে তাকিয়ে বলে
-- তুমি বিনীতা না? সরি তুমি বললাম বলে
-- আরে না না। তুমি ছাড়া কি আপনি বলবে নাকি?
-- তুমি তো কৌশিকী?
 দু'জনেই হেসে দেয়। চলতে থাকে মামুলি কথাবার্তা। নিয়ে নেয় দু'জন দু'জনের ফোন নম্বর। বাস থেকে নেমেই কৌশিকীর বাড়ি আর বিনীতাকে বাস থেকে নেমে আরও কিছুটা পথ অটোতে যেতে হয়। কৌশিকী অনেক করে বলে তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। প্রয়োজনে রাতেও থাকতে পারে। কিন্তু বিনীতা কিছুতেই রাজি হয় না। সে আর একদিন যাবে বলে কথা দেয়। কৌশিকী নেমে পড়ে বাস থেকে। বিনীতা জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
 ভাগ্যের চাকা কোথায় কীভাবে ঘুরছে তা কেউ জানে না। যাকে মন থেকে মুছে ফেলেছে কৌশিকী অনেকদিন আগেই তারই স্ত্রীর সাথে আজ দেখা হয়ে কিছু পুরোনো কথা মনের মধ্যে আবারও ভেসে ওঠে তার। কিন্তু সে স্বল্প সময়ের জন্য। সামান্য হেঁটেই তার বাড়ি। রোজই কলেজ থেকে ফেরার পথে কিছু না কিছু বাজার করে সে নিয়ে যায় বিশেষত কাঁচা সবজি। কারণ তার (মামা) বাবা সবজি খেতে ভীষন ভালোবাসেন অর্থাৎ তিনি নিরামিষাশী। তাই অধিকাংশ দিনেই তাদের নিরামিষ রান্না হয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল আজ বিনীতার সাথে দেখা হওয়ার পর সে এতটাই অন্যমনস্ক ছিল সবজি না কিনেই হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির সামনে চলে আসে।
   মন এমন এক বিষয় সে কী চাইছে অনেক সময় সেই মনের উত্তরিধিকারিও বুঝতে পারে না। তখন সেখানে সব দর্শন ফেল।
  পাঠক, এবার তবে দেখা যাক কৌশিকী আর বিনীতার জীবন কীভাবে এগিয়ে চলে? 

ক্রমশ 
  

No comments:

Post a Comment