Friday, June 5, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (৫৩পর্ব)



    বিনীতা রেজিস্ট্রিতে নিজেই সাজবে বলেছিল। কিন্তু আনন্দির ঘ্যানঘ্যানানির পানপ্যাণীর জন্য পার্লারের লোক আনতে বাড়ির লোক বাধ্য হন। খুব সুন্দর করে তারা বিনীতাকে সাজিয়ে দেয়। 
   সকাল ঠিক এগারোটায় রেজিস্ট্রি অফিসার এসে পৌঁছতেই বাড়ির ভেতর একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো। সবাই যেন হঠাৎ একটু গুছিয়ে দাঁড়াল— এই কয়েকটা মিনিটেই জীবনের বড় একটা অধ্যায় বদলে যাবে দু'টি  তরুণ তরুণীর।
বিনীতা তখন ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে। পার্লারের লোকেরা কাজ শেষ করে চলে গেছে, কিন্তু আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে এখনও তার কেমন যেন অচেনা লাগছে। এতদিনের চেনা নিজেকে আজ নতুন মনে হচ্ছে—আজ সে শুধু বিনীতা নয়, কারও স্ত্রী, কারো বৌদি আবার কারো বা পুত্রবধূ হতে চলেছে। বাড়ির একমাত্র মেয়ের অন্য বাড়িতে নানান রুপের প্রকাশ হতে চলেছে।
আনন্দি এসে পাশে বসে হালকা করে ধাক্কা দিলো
-- কী গো এত চুপ করে কেন? দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। সাজটা কি অনলবাবু দেখেছেন? তিনি তো নতুন পাঞ্জাবী পায়জামা পরে বর সেজে বসে আছেন। 
বিনীতা একটু হেসে বললো, 
-- আমি বৌ সাজলে তাকে তো বর সাজতেই হবে গো। 
বলেই হাসি বিনীতার
আনন্দি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, 
-- এই হচ্ছে হবে এটাই ভালো ছিল জানো ? হয়ে গেলো মানে ব্যাস চিন্তা,ভাবনা, আয়োজন সব শেষ।ভালো জিনিস দেরি করে হলে সব ভালো হয়। আর তুমি তো কালই উড়ে যাবে, আহারে বেচারি বৌদি আমার !
শোনো আজ কিন্তু ফুলশয্যা। দেখোনি তো দাদার খাটটা যা দুর্দান্ত সাজানো হয়েছে। বেচারা খাটে উঠতে পারছে না সেই চেয়ারেই বসে রয়েছে। বলেছি আগে বৌদি বসবে তারপর তুই বসবি।
বিনীতা লজ্জা পেয়ে মুখটা নিচু করে নিলো।
   ওদিকে ড্রইংরুমে টেবিল-চেয়ার সাজানো হয়েছে। রেজিস্ট্রি অফিসার কাগজপত্র খুলে বসেছেন। অনল একটু অস্থিরভাবে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার। তার চোখে একটা চাপা টেনশন—কিন্তু তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অদ্ভুত একটা স্বস্তি। বেশ কয়েকবার মনেমনে ভেবেছে পার্লারের লোক যখন চলে গেছে বিনীতার সাজ শেষ হয়ে গেছে। কেমন লাগছে একটু দেখতে পেলে হত।
আনন্দির পিছনে লাগার ভয়ে সে আর সাহস করেনি। সবকিছু যেন স্বপ্নের মত লাগছে আজ তার কাছে। এত তাড়াতাড়ি এত সহজে সবকিছুর অবসান হবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। মোবাইলটা খুলে বিজয়ের পাঠানো সেই রাতে বিয়ের সময়ের কয়েকটা ছবি দেখতে দেখতে তার আবারও মনেহল, 'সত্যিই ঈশ্বরের লীলা বোঝা দায়।'
মামী এসে বিনীতাকে ডাকলেন,
-- চল মা, সবাই অপেক্ষা করছে। যত তাড়াতাড়ি এই কাজটা শেষ হবে তত তাড়াতাড়িই আমরা খেয়েদেয়ে আড্ডা দিতে পারবো।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো বিনীতা। তার পায়ের শব্দ যেন আজ একটু ভারী—প্রতিটা পা ফেলায় যেন একটা নতুন দায়িত্ব, নতুন সম্পর্ক জুড়ে যাচ্ছে। মামিমা আর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- ভীষন মিষ্টি লাগছে তোকে দেখতে। আমার ছেলেটার যে কী অবস্থা হবে তোকে দেখে।
বলেই হেসে দিলেন।
বিনীতা লজ্জায় পুরো লাল! সে আর মুখ তুলে তাকাতেই পারছে না।
অনলের সামনে এসে বসতেই দু’জনের চোখ একবারের জন্য মিললো। কিছুই বলা হলো না, কিন্তু সেই এক পলকের দৃষ্টিতে হাজারটা কথা আদান-প্রদান হয়ে গেল। 
রেজিস্ট্রি অফিসার তার প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। 
প্রথমে অনল, তারপর বিনীতা দু’জনেই মাথা নাড়লো। বিনীতার গলায় শব্দ আটকে যাচ্ছিল,  সেটা হয়ত লজ্জায় কিংবা হয়ত নতুন জীবনে পা ফেলতে গেলে সকলেরই মনের ভিতরে একটা আড়ষ্টতা কাজ করে তারই প্রতিফলন।
  সই করার সময় হাতটা সামান্য কেঁপে উঠলো তার। অনল সেটা খেয়াল করেই হালকা করে টেবিলের নিচে তার হাতটা ছুঁয়ে থাকলো। একটা আশ্বাস, একটা নীরব ভরসা। নীরবে বলতে চাইলো শুধু 'আমি  আছি তোমার সাথে। কোন ভয় নেই।'
সব কাগজপত্র সই হওয়ার পর অফিসার হাসিমুখে বললেন,
-- অভিনন্দন, এখন আপনারা আইনত স্বামী-স্ত্রী।
এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। দু'জন দু'জনের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইলো। দু'জনের চোখের সামনে ভেসে উঠলো বেশ কয়েকমাস আগের সেই বিয়ের দিনের ঘটনা। সবকিছু যিনি লন্ডভন্ড করে দিয়েছিলেন তিনিই যেন আবার সবকিছু সুন্দরভাবে গুছিয়ে ঠিক করে দিলেন।
তারপরই বাড়ির মধ্যে উলুধ্বনি, হাততালি, হাসির শব্দে ভরে উঠলো চারপাশ। হল নতুন করে আর একবার মালাবদল।
আনন্দি দৌড়ে এসে বিনীতাকে জড়িয়ে ধরলো,
-- হয়ে গেল  বিয়ে! তুমি এখন থেকে আমার বৌদি। কত ভয় ,জল্পনা,কল্পনা - দেখলে তো সব কেমন সুন্দরভাবে হল।
বিনীতা হেসে ফেললো, কিন্তু চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। আনন্দি সেটা দেখে বললো,
-- এই এই, এখনই কাঁদবে না! কাল তো যাচ্ছ, তখন কাঁদার অনেক সময় পাবে।
বিনীতা একে একে সকলকে প্রণাম করলো।  মাকে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। সুস্মিতাও মেয়েকে জড়িয়ে বারবার চোখের জল মুছছেন। বিজয়কে প্রণাম করতে গেলে সে বোনকে বুকের উপর মাথাটা রেখে বলল,
-- আমরা ঈশ্বরের হাতে খেলার পুতুল রে! তার ইচ্ছে ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না। মিছেই আমরা ভাগ্যের দোষ দিই। যা ঘটবে তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। খুব ভালো থাকবি তুই, খুব সুখী হবি। অনল খুব ভালো ছেলে। ছোটবেলা থেকেই আমি ওকে চিনি। মাঝে কয়েকটা বছর যোগাযোগটা বন্ধ ছিল। আবার দেখ ঠিক সময়মত ওর সাথে কেমন যোগাযোগ হয়ে গেলো।
অনল একটু দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি, অনেকদিনের একটা ভারী পাথর যেন বুক থেকে নেমে গেলো। কীকরে, কীভাবে যে সবকিছুর এত সুন্দর সমাধান হয়ে গেলো ভাবলেই সে অবাক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চোখে তার যেন একরাশ চিন্তা এই অল্প সময়ের সম্পর্ককে এত তাড়াতাড়ি দূরত্বে ঠেলে দিতে হচ্ছে ,মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা। কাল সকালেই বিনীতা ভোরের ফ্লাইটে চলে যাবে। ভাবলেই মনটা ভীষন খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার। চাকরি বাঁচানোর তাগিদে হলেও এই চলে যাওয়াটা মানিয়ে নেওয়া কি এত সহজ হবে? মন সায় দিচ্ছে না কিছুতেই।

   তবু আজকের দিন এবং রাতটা শুধু তাদের। এই কয়েকটা ঘণ্টা, কয়েকটা মুহূর্ত যেখানে নতুন জীবনের শুরুটা একটু হলেও নিজেদের মতো করে কাটিয়ে আবার দিনের পর দিন অপেক্ষা কবে আবার দেখা হবে।
  এবার শুরু হল ভাতকাপড়ের অনুষ্ঠান। লিজা আর ইরা থালা গুছিয়ে আগেই রেখেছিলেন। আনন্দির সহযোগিতায় লিজা থালা দু'টি নিয়ে আসলেন অনল ও বিনীতার সামনে। কিন্তু অনল কিছুতেই বলবে না ভাত, কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম। সে থালা নিয়ে দাঁড়িয়েই আছে। মামা তার অবস্থা বুঝতে পেরে বলেন,
-- ওরে আজকের দিনে স্বামীরা চাকরিজীবী মেয়েদের দায়িত্ব নেয় না। কিন্তু নিয়ম রক্ষার্থে তো কিছু একটা বলতে হবে।
অনল থালাটা বিনীতার হাতে দিয়ে বলল,
-- আজ থেকে সুখে,দুঃখে, হাসি, আনন্দে আমরা সারাজীবন দু'জন  দু'জনের পাশে থাকবো এই অঙ্গীকার করি এসো।
বিনীতা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে থালাটা ধরে। তার হাত থেকে থালা দু'টো নিয়ে লিজা টেবিলের উপর রেখে বলেন,
-- সবাই খেতে বোস। বিনীতা সকলের থালায় ঘি-ভাত  দিয়ে দাও।একসাথেই সবাই খেতে খেতে গল্প হবে।
টেবিল রেডি করতে করতে লিজা কথাগুলি বললেন।
এমনিতেই ইরা একটু কম কথা বলেন। আর তার ভাইবৌ যদি থাকেন সংসারের যাবতীয় ঝক্কি তিনিই সামলান।

আগেই ম্যারেজ রেজিস্টার মিষ্টি খেয়ে বেরিয়ে গেছেন। তিনি কিছুতেই ভাত খেতে চাইলেন না। সবাই টেবিলে খেতে খেতে গল্প জুড়ে দিলো। আনন্দি হঠাৎ বলে বসলো,
-- এরপর রিসেপশন পার্টিটা হয়ে গেলেই আবার মেয়ে দেখতে শুরু করতে হবে
সবাই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালো। কার জন্য মেয়ে দেখতে হবে কেউই বুঝতে পারলো না।বিজয় আনন্দির দিকে তাকিয়ে বলল,
-- ভুল বললে মেয়ে নয় ভালো একটা ছেলে দেখতে হবে। তোমার পরীক্ষাটা শেষ হলেই এবার উঠেপড়ে লাগবো তোমার বিয়ের ভোজ খাওয়ার জন্য
সবাই একসাথে হেসে উঠলো। আনন্দি মুখটা গম্ভীর করে বলল,
-- আজ্ঞে না, এবার একটা সুন্দর মেয়েই দেখতে হবে আর সেটা তোমার জন্য 
বিজয় এ'কথা শুনে প্রচণ্ড ভিসুম খেলো। তাড়াতাড়ি করে আনন্দি জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে
-- বিয়ের কথা শুনেই ভিসুম খেলে? বিয়ে ঠিক হলে না জানি কী কী খাবে।
তবে কথাটা সে খুব নিচু স্বরেই বলে। কারণ দু'জনেই বসে ছিল পাশাপাশি।

ক্রমশ 

   

No comments:

Post a Comment