ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৫)
শিলিগুড়ি ট্রান্সফার হয়ে আসার পর থেকে কলেজ ছুটির পর কৌশিকী কোনদিনও খালি হাতে বাড়িতে ফেরেনি। আজ এর ব্যতিক্রম দেখে বারান্দায় বসে থাকা কৌশিকীর বাবা কিছুটা অবাক হয়ে গেলেন। বাবার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার পর সে ঘরের ভিতর ঢুকে দেখে মা তখনও শুয়ে।
-- কিগো মা তোমার কি শরীর খারাপ করেছে?
তিনি উঠে বসতে বসতে বলেন,
-- নারে শরীর খারাপ কিছু না। তবে মনেহচ্ছে অবেলায় খেয়ে অম্বল হয়ে গেছে।
-- এন্টাসিড খাওনি কেন? কতবার বলেছি তুমি অবেলায় খাবে না। তাও কথা শোনো না। কেন দেরি হল খেতে? কী এমন কাজ করছিলে?
মায়ের উত্তর না পেয়ে কৌশিকী নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। ফ্রেস হয়ে রান্নাঘরের দিকে এসেই দেখে মা চায়ের জল বসিয়েছেন। আবার একবার মাথা গরম। করে মাকে বকাঝকা করে ঘরে পাঠায়।
চা করে বাবাকে দিয়ে মায়ের আর নিজেরটা নিয়ে মায়ের ঘরে আসে।
-- তোমার জন্য লাল চা করলাম। গ্যাস হয়েছে, দুধ চা খেলে আবার গ্যাস হবে।
চা'টা মায়ের দিকে এগিয়ে দেয়।
-- কী হয়েছে তোর? আজ মেজাজটা এত গরম কেন? কলেজে কিছু হয়েছে?
কৌশিকী মায়ের দিকে তাকায়। সত্যিই তো আজ বাড়িতে ঢুকেই মাথা গরম করে ফেললো কেন? এরকম তো কোনদিন হয়নি ওর। তবে আজ কেন হল?
-- আজ কোন বাজার নেই হাতে, মাথাটাও গরম। নিশ্চয় তোর কিছু হয়েছে।
কৌশিকীর মনে পড়লো সত্যিই তো আজ অন্যমনস্কতার কারণে কোনকিছু কিনে নিয়ে আসার কথাও তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে।
কিন্তু মাকে ধরা না দিয়ে বলল,
-- আজ ব্যাগে টাকাই ছিল না।
মা কিছু বললেন না। কারণ টাকা আজকের যুগে ব্যাগে থাকে না, মোবাইলে থাকে। সবকিছুই গুগল পে। কিন্তু মেয়ের মনের ভিতর কিছু একটা চলছে ভেবেই কৌশিকীর মা চুপ করে গেলেন।
কৌশিকী কিছুতেই রাতে আর মাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দিলো না। সে নিজেই রুটি আর পাঁচমিশালি সবজি করে নিলো।
সকাল ন'টাতেই কৌশিকী বেরিয়ে যায়। তাই সকালের জন্যও কিছুটা রান্না সে করে রাখলো। কিন্তু আজ সে বড্ড বেশি চুপচাপ।
রাতের খাবার সেরে সবাই শুয়ে পড়লেও কৌশিকীর চোখে ঘুম এল না। বারবার আজকের দিনের কথাগুলো মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে। বিনীতার সঙ্গে আজকের সেই আচমকা দেখা সবটাই কি কাকতালীয়? ঈশ্বর কী চাইছেন? কী লিখে রেখেছেন তিনি তার জীবনে? জীবনের ওই পর্বটা সেতো ভুলেই যেতে চায়। যে গাছ চারা অবস্থাতেই ম*রে গেছে তার তো কোন চিহ্ন মাটিতে থাকে না। তবে কেন আজ হঠাৎ করেই বিনীতার সাথে তার দেখা হল? সব মিলিয়ে যেন বুকের ভেতর একটা অচেনা শূন্যতা তৈরি করছে।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎই ফোনটা হাতে তুলে নেয় সে। অনেকক্ষণ অনলের নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থাকে। কল করার প্রশ্নই আসে না। তবুও নামটার দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে শেষমেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা পাশে রেখে দেয়।
নিজের মনকে সে বোঝায় যে মানুষটার বিয়ে হয়ে গেছে তাকে নিয়ে ভাবা মানে নিজেকে ছোট করা। নাহ্ সে কিছুতেই অনলকে নিয়ে ভাববে না। অনল তার জীবনে কোনদিন ছিল না আজও কোথাও নেই।
ভোরের দিকে একটু ঘুম এলেও সকাল হতেই আবার সেই নিরাসক্ত মুখ। মা খেয়াল করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। শুধু চুপচাপ মেয়ের সামনে গরম চা আর টিফিনটা এগিয়ে দিলেন।
-- আজ এত চুপচাপ কেন মা? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?
-- না মা, ঠিক আছি।
ছোট্ট উত্তর। কিন্তু এই ‘ঠিক আছি’-র ভেতরেই কতটা না বলা কথা লুকিয়ে আছে, তা মা বুঝেও না বোঝার ভান করলেন।
কলেজে পৌঁছে কৌশিকী ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা কিছু জিজ্ঞেস করলে একটু থেমে উত্তর দিচ্ছে—এ যেন সেই চেনা কৌশিকী নয়।
হঠাৎই স্টাফরুমে ঢুকে একজন বলল, -- ম্যাডাম, আপনাকে কেউ বাইরে ডাকছে।
কৌশিকী অবাক হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তার পরিচিত একটি মেয়ে। যার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল চেন্নাই সি এম সি তে। কৌশিকী তার বাবার হার্টের অপারেশন করতে চেন্নাই গেছিল আর ওই মেয়েটি অর্থাৎ নন্দিনিও তার মায়ের চিকিৎসার জন্য চেন্নাই ছিল। কিন্তু নন্দিনী তার মাকে হারিয়ে ফেলার পরে একা একটা অল্প বয়সী মেয়ের পক্ষে অচেনা জায়গায় মায়ের সৎকার করা সম্ভবপর ছিল না। কলকাতায় শবদেহ আনার প্রশ্নই নেই। কারণ নন্দিনীর মা ছাড়া আপন আর কেউ নেই।ওই সময় কৌশিকী তাকে সর্বোতভাবে সাহায্য করেছিল। সেই সূত্র ধরেই তার পরিচয় নন্দিনীর সাথে।
দু'বছর আগের কথা। নন্দিনীর মা ছাড়া আর কেউ নেই শুনে কৌশিকী তাকে সাথে করেই নিজের বাড়ি শিলিগুড়ি ফিরেছিল। বেশ কয়েকমাস নন্দিনী ও বাড়িতে থেকে পরিবারের একজন হয়ে উঠছিল। আর ঠিক তখনই তার পরিচয় হয় একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলার সাথে।
একদিন নন্দিনী বাজার করতে একটু দূরে একটা বড় বাজারে যায়। হঠাৎ এক মহিলাকে ঘিরে বেশ শোলগোল পড়ে যায়। কারণ তিনি হঠাৎ করেই বাজারের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভিড় সেখানে যথেষ্ঠ কিন্তু নীরব দর্শকই বেশি। নন্দিনী ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে মাটিতে বসে বয়স্কা ভদ্রমহিলার মাথাটা কোলের উপর তুলে নেয়। ভিড়ের ভিতর থেকে তাকে একজনে একটা জলের বোতল দেয়। নন্দিনী বোতল থেকে জল নিয়ে ভদ্রমহিলার চোখে মুখে জল দিয়ে তার জ্ঞান ফেরায়। কিন্তু কামিনীদেবী অত্যন্ত দুর্বল বোধ করতে থাকেন। তাই বাধ্য হয়ে একটি রিকশা ডেকে নন্দিনী ওই মহিলাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। তার বিছানায় তাকে বসিয়ে দিয়ে নিজেই রান্নাঘর খুঁজে বের করে বিস্কুট এনে তাকে জল ও বিস্কুট খাইয়ে সুস্থ করে। রান্নাঘরে ঢুকে নন্দিনী একজন মহিলাকে রান্না করতে দেখে। তখনই কামিনীদেবী সম্পর্কে ওই মহিলার কাছ থেকে সে সামান্য কিছু জানতে পারে।
এদিকে নন্দিনীর দেরি দেখে কৌশিকীর মা ফোন করে ঘটনা সব শোনেন। নন্দিনী নিজের থেকেই জানায় তার ফিরতে একটু দেরি হবে কারণ ওই ভদ্রমহিলার নিজের কেউ বাড়িতে থাকে না। নন্দিনীর খবর পেয়ে কৌশিকীর মা নিশ্চিন্ত হন।
নন্দিনী রাঁধুনির কাছ থেকে জেনে নিয়ে কাছাকাছি এক ডাক্তারকে ডেকে এনে কামিনীদেবীকে পরীক্ষা করায়। কামিনীদেবী নিজেই টাকা বের করে নন্দিনীর হাতে দেন ডাক্তারের ফিস আর ওষুধের দাম। ডাক্তার জানায় কামিনীদেবীর লো প্রেসারের জন্য মাথা ঘুরে গেছিল। বিশেষ কিছু ওষুধ তিনি প্রেসক্রাইব করেন না। একটা ভিটামিন আর খাওয়াদাওয়ার প্রতি দৃষ্টি দিতে বলেন। নন্দিনীর ব্যবহারে কামিনীদেবী মুগ্ধ হয়ে যান। অচেনা একটি মানুষের জন্য যে মেয়ে এতটা করতে পারে সেই মেয়েটি খুবই ভালো না হয়ে পারে না। দুপুরে না খাইয়ে তিনি নন্দিনীকে ছাড়েন না। যাবার সময় তাকে আগামীকাল আবারও আসতে বলেন। নন্দিনীও ভদ্রমহিলার আন্তরিকতা দেখে তার ভিতর নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। আসবার সময় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে নিজের ফোন নম্বরটি দিয়ে আসে।
বাড়িতে ফিরে এসে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে কৌশিকীদের। কামিনীদেবী যে নন্দিনীর কেউ নেই শুনে তাকে বারবার তার কাছে গিয়ে থাকতে বলেছেন সেটাও সে জানায়। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করা নন্দিনী কৌশিকীকে বলেছিল তার জন্য যেকোন একটি চাকরির জোগাড় করে দিতে। নন্দিনী বেশ কয়েকজনকে বলেছিল।
সবকিছু শুনে কৌশিকী মা,বাবাকে বলে সে নিজেই একদিন সবকিছু দেখে আসতে যাবে। আজকালকার দিনে হুট করে কাউকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। কত কিছুই এখন ঘটে নিজের চোখে না দেখে একটু খোঁজখবর না নিয়ে সহায় সম্বলহীন মেয়েটাকে কারো আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু পরদিন সকালেই কামিনীদেবী ফোন করেন নন্দিনীকে।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment