Tuesday, October 18, 2022

সহজে মানুষ চেনা যায় না



  সহজে মানুষ চেনা যায় না( আলো আঁধার)

  প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম সম্রাটকে। দাদার বিয়েতে প্রথম দেখা। লতায়পতায় সম্পর্কে বৌদির ভাই। দাদার বিয়ের পর নানান সূত্রে তার সাথে দেখা হত। আমি তখন সবে মাধ্যমিক দেবো।আর সম্রাট উচ্চমাধ্যমিক। আমার এই ভালো লাগাটা সম্রাট বুঝতে পেরেছিল কিনা আমি জানিনা। তবে সে একদিন ঠিক সুযোগ বুঝে তার মনের কথাটা আমায় জানিয়েছিল।
 সম্রাটের মুখে ' ভালোবাসি ' কথাটা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেছিলাম।ও হঠাৎ করেই আমার হাত ধরে বলেছিল,
--- দিদির বিয়েতে প্রথম দেখে তোমায় খুব ভালো লেগেছিলো। সেই থেকে ভালোলাগাটা  একটু একটু করে কখন যে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। অনেকদিন ধরেই কথাটা তোমায় বলবো ভাবছি কিন্তু সেই সুযোগ আর আসেনি। 
 আমি তো তখন লজ্জা আর ভালোলাগা মিশিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি। কোন রকমে চোখ তুলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে পালালাম। সেই শুরু।
 সম্রাটকে যেমন দেখতে,পড়াশুনায়ও ঠিক তেমনই। সম্রাট যখন কথা বলে তখন ওর গলার আওয়াজ আমার কাছে এতটাই ভালোলাগে আমি মুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়েই থাকি। সুন্দর গান করে, আবৃত্তি করে। যাকে বলে অলরাউন্ডার। 
  একটু একটু করে সম্রাট আর আমার ভালোবাসার পাঁপড়ি মেলতে শুরু করলো। আমিও নেহাৎ মন্দ ছিলাম না পড়াশুনায়। সম্রাট যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ভালো চাকরি পেয়ে গেলো আমিও কিছুদিনের মধ্যে একটা প্রাইভেট ফার্মে ঠিক চাকরি যুঠিয়ে নিলাম।
 দুই বাড়ির মতেই বেশ ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো। স্বপ্নের মত দিনগুলি চলে যেতে লাগলো। 
 নিজের ভাগ্যের প্রতি মাঝে মাঝে নিজেরই হিংসা হত। বিয়ের ঠিক দুবছরের মাথায় সুইজারল্যান্ডে সম্রাটের বিশাল চাকরির অফার। আমি রাজি থাকলেও আমার বাড়ি কিংবা সম্রাটদের বাড়ির কেউ রাজি ছিলো না সম্রাটের এই চাকরি অ্যাকসেপ্ট করার। কিন্তু আমার ও সম্রাটের যেহেতু দু'জনেরই মত আছে তাই কারো অমতই ঢপে টিকলো না। সম্রাট সুইজারল্যান্ড চলে গেলো। ছ'মাস পড়ে এসে আমায় সাথে নিয়ে যাবে। প্রতিটা মুহূর্তে চোখ বুঝে সুইজারল্যান্ডের মাটিতে দু'জনের সুখী জীবনের স্বপ্ন সফল করে চলেছি। রোজই সম্রাটের সাথে ফোনে কখনো ভিডিও কল কখনো বা এমনিই কথা হয়।
  ঠিক একবছরের মাথায় সম্রাট আমায় নিতে আসে।কিন্তু তার আগে অনেকবার ফোনে তার সাথে আমারo ঝামেলা হয়ে গেছে। এখন সে রোজ ফোন করে না, করলেও অল্প সময় কথা বলে। আগের সেই উৎফুল্লতা,আবেগ,অনুভূতি সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। 
  সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে মন দিয়ে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আমি যখন ব্যস্ত তখন প্রতি মুহূর্তে সম্রাটের ভিতর আমূল পরিবর্তন দেখতে পাই। মাঝে মধ্যেই নেশায় বুদ হয়ে ঘরে ফেরে। কোথায় তার গান,কবিতা? সবকিছু তার জীবন থেকে তো বটেই আমার জীবন থেকেই একটু একটু করে সম্রাট হারিয়ে যেতে থাকলো। নিত্য নতুন নারী সঙ্গ যে তার জীবনে আসছে তা তার গতিবিধি দেখেই বুঝতে পারতাম। অনেক বুঝিয়েছি ; মানাভিমান, ঝগড়াঝাঁটি করেও কোন ফল হয়নি। জীবনে হঠাৎ করে অতিরিক্ত অর্থ সম্রাটের জীবনটাই শেষ করে দিলো। ভালোবাসায় যে আলোর দিশা সম্রাটের ভিতর দেখতে পেয়েছিলাম তা হঠাৎ করেই অন্ধকারে ঢেকে দিলো।সম্রাটের কাছে টেকাই আমার দায় হয়ে পড়ল।শেষে বাড়ির সাথে যোগাযোগ করে একদিন সম্রাটকে না জানিয়েই পুনরায় কলকাতা ফিরে আসা।

    

Saturday, October 15, 2022

ভাগ্যরেখা



 ভাগ্যরেখা      (সুখ - দুঃখ)

  জীবনটা শুরু হয়েছিল একভাবে। তখন ভেবেছিলাম নিজের জীবন নিজেই গড়ে নিতে পারবো। পড়াশুনায় ভালো ছিলাম, বাবার আর্থিক ক্ষমতা ছিল। লোকে আমাকে সুন্দরী, বুদ্ধিমতীই বলতো। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক।সবই ঠিকঠাক চলছিল। মাধ্যমিকে বেশ কয়েকটি লেটার নিয়ে পাশ করলাম। বাবার আমাকে নিয়ে খুব গর্ব ছিল।শুধু বাবা কেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও আমাকে নিয়ে গর্বের শেষ ছিল না। নিজের ইচ্ছা এবং বাবার দেখানো স্বপ্ন নিয়ে ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হিসেবে নিজেকে কল্পনা করতাম। জীবন ছিল সুখী,সচ্ছল,উচ্ছল।
  কিন্তু এ সুখ আমার কপালে বিধাতা লিখেছিলেন সাময়িক। ভাগ্য লেখার দোয়াত-কলম যে ছিল তার হাতে। শুরুতে তিনি আমাকে সবকিছু দিয়েও আচমকা সবকিছুই কেড়ে নিলেন। উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার আগেই হঠাৎ আসা ঝড়ে সব তছনছ করে দিলো। একদিন রাতে ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন বাবা। জীবনের মোড় ঘুরে গেলো অন্যখাতে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন গেলো ভেঙ্গে। একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে দেখা দিলো ফাটোল। বাবা পরিবারের মেজ ছেলে হলেও যেহেতু ভালো চাকরি করতেন কাকা,জ্যাঠার থেকে তিনি বেশি সংসার খরচটা দিতেন। অন্যান্যরা সংসারের পিছনে খুব একটা অর্থ খরচ করতেন না। ভাইদের মধ্যে মিল ছিল ভীষণ।
   কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো সবই ছিলো বালির বাঁধ।বলতে গেলে যেহেতু বাবার টাকায় সংসারটা চলতো তাই সকলেই বাবার কথা শুনে চলতেন। উপর উপর সকলেরই একটা মিষ্টির প্রলেপ দেওয়া ছিল।
  বাবার সমস্ত কাজকর্ম মিটে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই একদিন সকলের হাঁড়ি আলাদা হয়ে গেলো। আমি, মা আর ভাই। কী করে কী হবে ভেবে ভেবে দিনরাত মা আর আমি প্রায় পাগল হওয়ার পথে। পেটে বিদ্যা কম তাই টিউশনি করেও বিশেষ কোন লাভ হয় না।তবুও নিজের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট কয়েকটা বাচ্চা পড়াতে শুরু করলাম। একটা একটা করে মায়ের গয়না বিক্রি হতে লাগলো। 
  চরম দরিদ্রতার ভিতর উচ্চমাধ্যমিকে খুব ভালো ফল করলাম। কিন্তু জয়েন্টে বসার মত আর্থিক সামর্থ না থাকায় অঙ্কে অনার্স নিয়ে ভর্তি হতে ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। তখন মায়ের গয়নাও শেষ।ভাই তখনো মাধ্যমিক দেয়নি। পড়াশুনা আমার বন্ধ হওয়ার পথে তখন। সবকিছু শুনে পাড়ার ক্লাব আর স্কুলের কয়েকজন শিক্ষকের সহয়তায় আমি কলেজে ভর্তি হলাম অঙ্কে অনার্স নিয়ে।
  আমি যখন দ্বিতীয় বর্ষ তখন মা চলে গেলেন আমাকে আর ভাইকে ছেড়ে। ভাই তখন সবে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে। পাড়ার কিছু সহৃদয় ব্যক্তি,কয়েকটি ক্লাব আর স্কুল কলেজের শিক্ষকদের সহয়তায় আমি বেশ ভালোভাবেই পাশ করে গেলাম। জীবনের প্রতি পদেপদে ঠোক্কর খেতে খেতে যখন এই জায়গায় এসে দাঁড়ালাম তার ঠিক তিন মাসের মাথায় ওই কলেজেই আমি পার্টটাইম জব পেয়ে গেলাম স্যার আর ম্যামদের সহায়তায়। 
  বছর দুয়েক বাদে আমার চাকরিটা পার্মানেন্ট হয়।ভাই এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। জীবনে সব আশা পূরণ না হলেও একটা জায়গায় এসে আজ দাঁড়াতে পেরেছি। কিন্তু যে দুটো মানুষ বেঁচে থাকলে সব থেকে খুশি হতেন তারাই আজ আমার জীবনে নেই। মাঝে মাঝে ভীষণ মন খারাপ হলেও ভাইকে নিয়ে সব কষ্ট ভুলে ভালো থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আমাকে যেতেই হবে।
 

Friday, October 14, 2022

শুধু ভালোবাসি

শুধু ভালোবাসি

ভালোবাসা যায় এভাবেও --- 
 যা পাইনি রিয়া তা নিয়ে প্রথম প্রথম ভীষণ দুঃখ ছিল,কষ্ট ছিল। কিন্তু জানো এক সময় নিজেই উপলব্ধি করলাম আমি তো তোমায় ভালবাসতাম, তাহলে তোমায় নিজের করে পাইনি বলে আমার এত কষ্ট কেন হচ্ছে? প্রতিদিন তোমার খবর পাচ্ছি, ফেসবুকে তোমার ছবি দেখছি। যেহেতু তোমায় ভালোবাসি আমি তো তোমায় সুখী দেখতেই চেয়েছিলাম। সেটাই যদি হয় আমার এই কষ্ট পাওয়ার তো কোন মানেই হয় না। আর ঠিক তখনই তোমাকে নিজের করে না পাওয়ার কষ্টটা আস্তে আস্তে কমতে থাকলো আর তোমার প্রতি ভালোবাসাটা দিনকে দিন বাড়তে থাকলো।
 হ্যাঁ তুমি জানতে চাইতেই পারো আমি কেন বিয়ে করিনি। আসলে আমার জীবনের প্রথম প্রেম ছিলে তুমি। তোমাকে নিয়ে যে স্বপ্নগুলো আমি দেখেছিলাম সেই স্বপ্ন আমি অন্য কাউকে নিয়ে পূরণ করতে গেলে প্রতি পদেপদে ঠোকর খেতাম; তোমাকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন অন্যকে দিয়ে কি পূরণ হত বলো? তাই ওই রাস্তায় আমি আর হাঁটিনি। আর ঠিক এইভাবেই তোমাকে ভালোবেসে আমি বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবো। প্রকৃত ভালোবাসায় শরীর থাকে না থাকে ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসা।
 রিয়া আর সৌম্য একই পাড়ার দুটি কিশোর কিশোরী। ছেলেবেলা থেকেই দু'জন দু'জনের বন্ধু। রিয়া চ্যাটার্জী আর সৌম্য দাস। দু'জনের মিলনের পথে এটাই ছিল প্রতিবন্ধকতা। সৌম্যর বাড়িতে রাজি থাকলেও রিয়ার বাড়িতে এই অসবর্ণ বিয়েতে কিছুতেই রাজি হয়নি। রিয়া সৌম্যকে বলেছিল পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে। কিন্তু সেক্টর ফাইভে কর্মরত মোটা মাইনের চাকরি করা সৌম্য চায়নি রিয়াকে তার প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে। 
 রিয়ার বিয়ে হয়ে যায় বয়সে দশ বছরের বড় স্কুল শিক্ষক সুনীলের সাথে। একটি সন্তান হওয়ার পর সুনীলের হঠাৎ স্ট্রোক হয়।বাম অঙ্গ পুরো অসার হয়ে যায়। তখন রিয়া প্রাইভেট পড়িয়ে ছেলেকে মানুষ করতে থাকে সাথে সুনীলের ব্যয়বহুল চিকিৎসা যা প্রায় অসম্ভব ছিল। পরিণতি বত্রিশ বছর বয়সেই রিয়া সুনীলকে হারায়।
 ছেলে এখন বি.কম করছে। এখন মায়ের মত সেও প্রচুর টিউশনি করে। সৌম্য একের পর এক চাকরি ছেড়েছে ভালো অফার পেয়ে। এখন সৌম্য সুইজারল্যান্ড। বাবা গত হলেও মা এখনো জীবিত। এখনো রোজই ছেলের মাথার পোকা তুলে খান বিয়ে করার জন্য। সৌম্য যখন দেশে ফেরে তখন সে মাকে নিয়েই মাসখানেক কলকাতা তাদের পুরনো বাড়িতে কাটিয়ে যায়।
  ফেসবুকে সৌম্য ,রিয়া বন্ধু থাকলেও কেউ কোনদিন কারো ব্যক্তিগত কথা কারো সাথেই শেয়ার করেনি। কিন্তু দু'জনেই দু'জনের খবর সব জানতো কমন বন্ধুদের মাধ্যমে।এবার দেশে ফেরার আগে সৌম্য জানিয়েই এসেছিলো রিয়ার সাথে দেখা করতে চায়। তাই বহু বছর বাদে পুরনো কফিশপে দু'জনের দেখা।
 কথা হয় কম, নীরবতায় বেশি। নীরবতায় যেন তাদের মনের সব কথা বলে যাচ্ছে। রিয়ার দু'একটি প্রশ্নের উত্তরে সৌম্য যেটুকু বললো রিয়া তাই শুধু শুনে গেলো।
  কথা শেষে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দু'জনের বুক চিরে দুটি দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো যা দু'জন এত কাছে থেকেও টের পেলো না নিজেরা ছাড়া!



 
 

লক্ষী বৌমা

  লক্ষ্মী বৌমা 

অবশেষে এলো সেই দিন --
  একার হাতে সবকিছু।সুতরাং আমাকে সেই কাক ডাকা ভোরেই প্রতিদিন উঠতে হয়।শ্বাশুড়ী মা বাতের রোগী।সারাটা রাত তিনি যন্ত্রণায় কষ্ট পান।ভোরের দিকে তাই ঘুমিয়ে পড়েন।সংসারের কোন কাজই তিনি করতে পারেন না। স্বামীর অফিসের তাড়া থাকে।তিনি আটটায় উঠে কোন রকমে স্নান,খাওয়া সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকেন।যেতে আসতেই তার চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় চলে যায়। তারপর বাবাইয়ের টিফিন করা, সাড়ে ন'টায় তার বাস আসে তার আগেই তাকে রেডি করে ঠিক সময়ে তাকে নিয়ে ছুটতে হয় বড় রাস্তার মোড়ে। বাসে তুলে দিয়েই দৌড়াতে দৌড়াতে ঘরে ফিরেই সংসারের বাকি কাজে হাত লাগানো।ততক্ষণে শ্বাশুড়ী মা ঘুম থেকে উঠে পড়েন।তার চা,জল খাবার দিয়ে যদি সময় পাওয়া যায় তাহলে বসে টিফিনটা করি নতুবা মুখে খাবার পুড়ে চিবাতে চিবাতে এদিক ওদিক ছুটে কাজ করা।কোনদিন বসে চা টাও খেতে পারিনি।গরম চা প্লেটে ঢেলে তাড়াতাড়ি শেষ করেছি বিয়ের পর থেকে জীবনের এই বেলা পর্যন্ত। তিনটে বাজতেই ছেলেকে আনতে আবার সেই বড় রাস্তায় মোড়ে।
 কাজের লোক কোনদিনও রাখতে পারিনি আর্থিক কারণে।খুব ভালো গান গাইতাম একসময়। পড়াশুনায় ছিলাম মধ্যম মানের।ভেবেছিলাম চাকরির বাজারের যা অবস্থা গান নিয়েই জীবনটাকে গড়ে নেবো।কিন্তু কপাল এমন মন্দ গ্র্যাজুয়েশনের আগেই স্ট্রোক করে বাবা চলে গেলেন চিরতরে।দাদা তখন চাকরি করছে ঠিকই কিন্তু মা আর দাদা দু'জনে মিলে আমার গ্র্যাজুয়েশনের রেজাল্ট বেরোনোর আগেই আমার বিয়ে ঠিক করে ফেললেন।আমার কোন আপত্তিতে কোনোই কান দিলেন না।
  বিয়ের সাথে সাথেই আমার জীবনে দেখা স্বপ্নগুলো একটা একটা করে ফুলের পাপড়ি ঝরে যাওয়ার মত জীবন থেকে হারিয়ে যেতে থাকলো।
  বাড়িতে নূতন বউ হয়ে ঢুকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার শ্বাশুড়ী তার ছেলের বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ আনেননি এনেছেন একটি কাজের লোক।যে সারা দিনরাত কাজের বিনিময়ে খেতে পরতে পারবে আর রাত হলে তার ছেলের শারীরিক খুদা মেটাবে।আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালোলাগা, মন্দলাগা কোনকিছুর দাম দেওয়ার মত এদের যেমন কোন মনোভাব নেই ঠিক তেমনই কোন সামর্থ্য কিংবা কোন সুযোগও নেই। তাই সবকিছুই ভাগ্যের দোহাই দিয়ে মুখ বুজে মেনে নিয়েছিলাম।
 দু'বছরের মাথায় বাবাই আসে আমার কোল জুড়িয়ে।হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে রান্না করে রেখে তবে হাসপাতাল যেতে হয়েছিল।বিয়ের পরদিন থেকেই দেখেছি শ্বাশুড়ী মায়ের বাতের যন্ত্রণায় আহা,উহু করে হাঁটাচলা করতে।সেই অস্তমঙ্গলায় একবার বাপের বাড়িতে গেছিলাম সেই শেষ।আর গেছি মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে।চারদিনের মাথায় ঘরে বসে সামান্য কাজ করেছি কিন্তু মায়ের কাজে সেদিনও বাপেরবাড়ি আমার যাওয়া হয়নি কারণ শ্বাশুড়ী মা তখন এতটাই অসুস্থ্য আমার পক্ষে কয়েক ঘণ্টার জন্যও কোথাও বেরোনো সম্ভব নয়।
  কাকে নালিশ জানাবো ? নালিশ জানানোর যেমন কেউ নেই ঠিক তেমনই জানিয়েও তো কোন লাভ নেই কারণ সবকিছুই তো আমি চোখের সামনে দেখতে পারছি।
  ছেলে বড় হল।ব্যাংকে ভালো চাকরিও পেলো।তখন একটা কাজের লোক জোর করে সে রাখলো মায়ের কষ্ট দেখে।শ্বাশুড়ী মা তখন শুধু শুয়েই থাকেন আর যন্ত্রণায় পুরো বাড়ি মাথায় করেন চিৎকার করতে করতে।ওষুধ,মালিশ কিছুই বাদ নেই কিন্তু তবুও তিনি কোনদিনও বাতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাননি।
  ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করা হল।মেয়ে পছন্দ করে আসার পর ছেলে বললো,
--- বিয়ের আগে একবার ওকে আমাদের বাড়িতে আনা যায় না মা?
--- এ আবার কেমন কথা? বিয়ের আগে কিভাবে বিয়ের কনেকে তার উঠবি স্বামীর বাড়িতে আসার কথা বলবো? তোর দরকার হলে তুই আলাদা করে কথা বল অন্য কোথাও।
 ছেলের বিয়ে হল।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার বৌমা অস্তমঙ্গলা সেরে এসে পুরো রান্নাঘরের দায়িত্ব নিলো।আমাকে কিছুই করতে দেয় না। আমি কিছু করতে গেলেই বলে,
-- মা রান্নাঘরের দায়িত্ব এতদিন আপনি সামলেছেন।এবার থেকে এ দায়িত্ব শুধু আমার।আপনি শুধু ঠাকুমাকে দেখুন।আমিও দেখবো তাকে যখন আপনি পারবেন না।কিন্তু রান্নাঘরে আপনাকে আর আমি কোনদিন ঢুকতে দেবো না।
  স্বামী আমার সব দেখেশুনে বললেন,
--- আমার মনেহয় কি জানো তোমার বুবাই বিয়ের আগেই তার সাথে দেখা করে এ কথা আদায় করে নিয়েছে।যাক কপাল করে ছেলের বউ পেয়েছ বটে!
 তারপর সত্যিই একদিন বুবাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিলাম ওই কারণেই সে বিয়ের আগে রমাকে এ বাড়িতে একবার এনে নিজের চোখে সবকিছু দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগ না হওয়ায় ফোনে কন্টাক্ট করে তার সাথে দেখা করে তার একটাই কথা ছিল ,
--- আমার মা সারাটা জীবন পরিশ্রম করেছেন ।অসুস্থ্য শরীরেও রান্না করেছেন।তুমি কি পারবে আমার মাকে রান্নাঘর থেকে মুক্তি দিতে? কয়েক মাসের মধ্যেই আমি রান্নার লোক রেখে দেবো।মাত্র ছ'টা মাস আমি সময় চাচ্ছি।
  এখন রান্নার মাসি,কাজের মাসি সবই আছে আমার ছেলের দৌলতে।শ্বাশুড়ী মা বুবাইয়ের বিয়ের তিনমাসের মধ্যে মারা যান।আজ আমার কোন কাজ আর সংসারে নেই।এই বয়সে এসে আবার হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছি বৌমার পীড়াপীড়িতে।বৌমা আমার সত্যিই লক্ষী।



 

Friday, September 2, 2022

কেউ কারো নয়

কেউ কারো নয় 

কতদিন আর মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে যাবো --

  ব্যালকনি থেকে নন্দিতা উঁকি দিয়ে দেখে গেটের কাছে একটি হলুদ ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে।ফ্ল্যাটটিতে আটটা পরিবার বাস করে।একমাত্র বীরেনবাবুর ছাড়া আর সকলেরই গাড়ি রয়েছে। বীরেনবাবু আর তার স্ত্রী থাকেন দোতলার পশ্চিম দিকের ফ্ল্যাটটিতে।
  বীরেনবাবু আর তার স্ত্রীর দু'জনেরই বয়স হয়েছে।ছেলে থাকে আমেরিকায়।বছর দু'য়েক আগে এসে বাপের বিশাল তিনতলা বাড়ি বিক্রি করে বাবা,মায়ের জন্য ছোট্ট দু'কামরার এই ফ্ল্যাটটি কিনে দিয়ে বাকি টাকা পয়সা নিয়ে পুনরায় আমেরিকা চলে গেছেন।যদিও স্বামী,স্ত্রী দেখা হলে প্রায়ই বলে থাকেন ছেলে মাসে মাসে টাকা পাঠায় কিন্তু সেটা যে সত্যি নয় এটা ফ্ল্যাটের অনেকেই বুঝতে পারেন।
  মাঝে মাঝে নন্দিতা এটা সেটা রান্না করে যখন তাঁদেরকে দিতে গেছে অধিকাংশ দিনই সে দেখেছে এক তরকারী ভাত করা।প্রথম থেকেই নন্দিতার বয়স্ক এই মানুষ দু'টির প্রতি অদ্ভুত এক মায়া।কেন তা সে নিজেই জানে না।নন্দিতা তার শ্বাশুড়ী ,চার বছরের ছেলে আর স্বামী থাকে তিন তলায়।
  বীরেনবাবুর স্ত্রীর হঠাৎ এই বয়সে এসে ধরা পড়ে ব্লাড ক্যান্সার।যেহেতু নন্দিনী বীরেনবাবুর স্ত্রী ললিতাদেবীকে নিয়ে নিজে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল তাই ললিতাদেবী নন্দিনীকে বলেছিলেন,
--- এই বয়সে এসে মানুষটা একথা জানলে বড্ড কষ্ট পাবেন। তাই মা তুমি এই রোগের কথা ওনাকে কিছু জানিও না।কটাদিনই বা আর বাঁচবেন আর আমারও তো সময় শেষ।
 নন্দিনী ললিতাদেবীর কথা রেখেছে। সে শুধু বীরেনবাবু কেন ফ্ল্যাটের অন্যান্য বাসিন্দাদেরও অনেকদিন পর্যন্ত কিছু বলেনি।নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া, ওষুধপত্র কেনা সবই নন্দিনী করে। নন্দিনী বয়স্ক ভদ্রলোকটিকে নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়ে বানিয়ে বানিয়ে ডাক্তার এই বলেছেন,ডাক্তার ওই বলেছেন - বলতে বলতে নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন দু থেকে তিনবার বীরেনবাবুর ফ্ল্যাটে নন্দিনীকে যেতেই হয়। 
  যেহেতু শ্বাশুড়ী আছেন এবং তিনি বীরেনবাবুদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তাই সব সময়ই তিনি তার বৌমার এই কাজকে সমর্থন করে গেছেন।
  আগেরদিন অনেক রাত পর্যন্ত বীরেনবাবুর শরীর খারাপ হওয়াতে নন্দিনী ওদের ফ্ল্যাটেই ছিল।তার আগেই সন্ধ্যার দিকে ললিতাদেবীকে নিয়ে নার্সিংহোম ভর্তি করতে হয়েছে প্রচণ্ড শরীর খারাপ হওয়াতে।বীরেনবাবু চোখে খুবই কম দেখেন। মোটা পাওয়ারের চশমা পরেও সবকিছু আবছা দেখেন।চোখে ভালো দেখতে পেলে তিনি দেখতে পেতেন কিংবা জানতে পারতেন এক একটা গয়না বিক্রির টাকায় এক একটা কেমো নেওয়ার ফলে তার লালির মাথায় এখন একটাও চুল নেই।
  সেদিন যখন নন্দিনী বীরেনবাবু অসুস্থ্য হলে বাড়িতে ডাক্তার দেখে এনেছিল তখন ডাক্তারবাবুর সাথে কথা প্রসঙ্গে বলছিলো, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভদ্রলোককে এতদিন ঠিক রেখেছিলাম।কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হলেও কানটা তো ঠিক আছে।মাসিমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় পাশের ফ্ল্যাটের দু'জন ভদ্রলোকের কানাঘুষো শুনে উনি জেনে যান মাসিমার রোগের কথা।তারপর থেকেই এই অবস্থা।
  বীরেনবাবু রাতে দরজা বন্ধ না করে শোয়ার ফলে সকালে দুধ দিতে এসে ছেলেটি ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে বীরেনবাবু মেঝেতে পড়ে আছেন।চিৎকার করে লোক জড়ো করে।সেই সময় নিচুতে একটি ট্যাক্সি তার চালক পরিষ্কার করছিলো।সেও ছুটে আসে।
 রাত করে ফেরার ফলে ঘুম থেকে উঠতে নন্দিতার একটু দেরি হয়।কিন্তু ওই ট্যাক্সি আর সিঁড়িতে অসংখ্য পায়ের শব্দ শুনে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে চলে যায় সেখানে।গিয়ে দেখে সব শেষ।বীরেনবাবু আর নেই।ততক্ষনে ফ্ল্যাটের অপর এক বাসিন্দা যিনি পেশায় ডাক্তার তিনি জানিয়ে দেন বেশ কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি এ নশ্বর দেহ ত্যাগ করেছেন।
  বীরেনবাবুর ফ্ল্যাটে যাওয়ার আগে নন্দিনী ফোনটা নিয়েই গেছিলো কিছুটা বিপদের আঁচ পেয়ে।ঠিক তখনই নার্সিংহোম থেকে ফোন করে নন্দিনীকে জানিয়ে দেওয়া হয় ভোর চারটে নাগাদ ললিতাদেবী পরপারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন।
  ফ্ল্যাটের লোকেরা তার ছেলেকে জানানোর ফলে সে জানিয়ে দেয় তার পক্ষে আসা কিছুতেই সম্ভব নয় এখন। দুটি দেহ চাঁদা তুলে সৎকার করা হয়।


  
    

অতীত শুধু ভাবনায় মানায়

জীবনে দেখা স্বপ্নগুলো কোনটাই পূরণ হল না নন্দিনীর। নিজেকে নিয়ে যখন ভাবতে বসে তখন বুকটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। অথচ পড়াশুনায় বেশ ভালই ছিল সে,চেহারাও খারাপ ছিল না।কিন্তু ভাগ্য! সবকিছু থাকা স্বর্তেও ভাগ্যের বিরম্বরায় জীবন যুদ্ধে পর্যুদস্ত সে। কিশোরী বয়সে ভালোলাগার কথা সেই মানুষটাকেই কোনদিন মুখ ফুটে বলতে পারেনি। বাবার পছন্দ করা ছেলেকে পড়াশুনার মাঝপথে বিয়ে দেওয়ার ফলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটুকুও ধুলিৎসাত হয়ে যায়।
 দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার তীব্র লড়াইয়ে যখন নিজের মনকে শক্ত করে নিয়েছে ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ করেই বিমলের চলে যাওয়া। লড়াইয়ের রাস্তাটা তখন আরো বন্ধুর হয়ে পড়ে। লড়াইটা তখন নন্দিনীর একার কাছে আরো কঠোর হয়ে ওঠে।মেয়ের শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তার বিয়ে দিয়ে ছেলের উচ্চশিক্ষার আর্থিক দিক থেকে যখন জর্জরিত ঠিক তখনই ফেসবুকের সূত্র ধরে তার জীবনে নূতন করে ঝড় তোলে কিশোরীবেলার সেই ভালোলাগা। 
 পুরনো অনেক কথার ভিড়ে ফোনালাপেই মনের অনেক কাছে চলে আসে তারা। কোন চাহিদা ছাড়াই নন্দিনী বাঁচার একটা রাস্তা খুঁজে পায়। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে কিশোরকে তার ভালো লেগেছিলো জীবনের শুরুতে, তার এখন আমূল পরিবর্তন! 
  নন্দিনী যে তার জীবনে শুধুমাত্র একটা সময় কাটানোর যন্ত্র সৌমেনের কথাবার্তায় সে কোনদিনও বুঝতে পারেনি।বেশ কয়েকমাস কেমন একটা নেশার মত পেয়ে বসেছিলো নন্দিনীর। সৌমেন যেহেতু নির্দিষ্ট সময় ধরে ফোন করতো তাই ওই সময়টা নন্দিনী সব কাজ শেষ করে ফোনের অপেক্ষাতেই থাকতো। সৌমেনের সাথে কথা বলতেই ভালো লাগতো নন্দিনীর। নন্দিনী জানতো সৌমেন বিবাহিত,স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সে খুব সুখী। সুতরাং নন্দিনীর অন্য কোন চাহিদা সৌমেনের কাজ থেকে ছিল না; শুধু মাঝে মধ্যে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে একটু কথা বলা। এই কথা বলার মধ্যেই নন্দিনী ফিরে পেয়েছিল তার হারানো শৈশব।
 কিন্তু হঠাৎ করেই সৌমেন নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে।সৌমেনের কথাবার্তায় নন্দিনী বহুবার বুঝতে পেরেছে সে যতটা সুখী হওয়ার ভান করে ততটা সুখী সে নয়, সেও বোধহয় এইভাবে হঠাৎ পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে ভালো থাকে।কিন্তু বউকে যে মারাত্মক ভয় পায় আর হয়ত এই ভয় পাওয়ার কারণ থেকেই কোনকিছু ঘটায় সে নন্দিনীকে ফোন করা মোটামুটি বন্ধই করে দেয়। 
 হঠাৎ করে এই বয়সে এসে বিনা কারণে এত বড় একটা আঘাত নন্দিনী কিছুতেই নন্দিনী মেনে নিতে পারে না।তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। কারণ সৌমেনের কাছ থেকে তার কিছুই চাওয়ার ছিল না। সৌমেন সরাসরি যদি তাকে কারণটা জানিয়ে সরে যেত তাহলে নন্দিনীর এতটা খারাপ লাগতো না।কারণ সেও চায় না তার কারণে সৌমেনের সংসারে কোন ক্ষতি হয়। এক্ষেত্রে নন্দিনীর মনে হতে লাগলো "অপরাধী জানিল না কি তার অপরাধ বিচার হইয়া গেলো" -। 
 নিঃসঙ্গ জীবনে সৌমেন দমকা হাওয়ার মত বেশ কিছুদিন নন্দিনীর জীবনে ফ্রেস অক্সিজেন হয়ে এসেছিলো। নন্দিনী সৌমেনের না বলা সত্ত্বেও তার অসুবিধাগুলো বুঝতে পেরেই তাকে ব্লক করে দেয়। জীবন যুদ্ধে আরো একবার পরাজয় নন্দিনীর!
 তবে এই ঘটনা থেকে নন্দিনী একটা কথা বুঝতে পারে আর তা হল অতীত অতীতেই থাকা ভালো ,সুযোগ পেলেও তাকে কখনোই সামনে আনা উচিত নয়। তাতে কষ্ট বাড়ে বৈ কমে না।অতীত থাক মননে আর ভাবনায়। শুধুমাত্র অবসরে একান্তে তাকে ভাবলে অন্তত মানসিক কিছুটা তো তৃপ্তি আসবে। সুযোগ পেলেও অতীতকে গ্রহণ না করায় ভালো।

Wednesday, August 31, 2022

কারো গলগ্রহ হবো না

 কারো গলগ্রহ হবো না 
খিদের মুখে ভাত, ডালই অমৃত।
  সারাটাদিন পথে পথে ঘুরে কোন কাজের সন্ধান না পেয়ে চলতি পথে একটা ছোট পার্কে ঢুকে চুপচাপ বসে নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবছিলাম।সারাটা দিন পেটে জল ছাড়া কিছুই পড়েনি।
খিদে আর ক্লান্তিতে চোখটাও লেগে এসেছিলো।হঠাৎ একটা চিৎকারে কিছুটা সজাগ হয়ে তাকিয়ে দেখি চার,পাঁচটা ছেলে একটা তরুণীর উপর যেন হামলে পড়েছে।রাত তখন খুব একটা বেশি নয়।তবে জায়গাটা একটু নির্জন।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত তখন দশটা।কলকাতা শহরে রাত দশটা মানে কিছুই নয়।বুঝতে পারলাম মেয়েটির সম্মান এবং জীবন দুইই বিপন্ন।বাড়িতে হয়ত তার বাবা,মা এবং অন্যান্যরা তারজন্য ভাবছে।তার ফেরার অপেক্ষা করছে।স্বল্প সময়ের মধ্যে এও ভাবলাম আমার জন্য ভাবার তো কেউ নেই।আমি মেয়েটিকে বাঁচাতে গেলে হয়ত ওরা আমায় মেরেই ফেলবে।অভুক্ত অবস্থায় শরীরে নেই বিন্দুমাত্র জোর।তাছাড়া সংখ্যায় ওরা অনেকজন।কিন্তু হঠাৎ করেই শারীরিক বলের কাছে যেন আমার মানসিক বলটা কয়েকশ গুন বেড়ে গেলো।ছুটে এগিয়ে গেলাম ওদের কাছে 
  জন্মের পর থেকেই অভাব,দুঃখ আর কষ্টের মধ্য দিয়ে আমার জীবন শুরু।মা আমার নাম রেখেছিলেন সৌমেন।আদর করে আমায় সমু বলে ডাকতেন।জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছি আমায় নিয়ে মা মামাবাড়িতে শুধুমাত্র মাথার উপর একটু ছাদের আশায় ঘরের কাজ আর রান্নাবান্নার বিনিময়ে থাকেন সারাদিনে বিন্দুমাত্র সময় পান না।সন্ধ্যায় সব কাজকর্ম আর রান্না সেরে সাতটার মধ্যে বেরিয়ে গিয়ে দুটো বাড়িতে রান্না করে রাত দশটার মধ্যে ফিরে আবার সকলকে খেতে দেওয়া, বাসন মেজে রাখা।এই দুটো বাড়িতে রান্না করেই মা আমায় মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়েছেন।তারপর আর পড়ার সুযোগ আমার হয়ে ওঠেনি।
  বহুবার মাকে জিজ্ঞাসা করেও বাবার কথা জানতে পারিনি।তবে একটু বড় হতেই মামীর মাকে বিঁধিয়ে কথা বলার ধরণ দেখে বুঝতে পারতাম মা ও, আজ আমার সামনে যে মেয়েটি বিপদের মধ্যে পড়ে নরপশুদের হাত থেকে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমার জন্মটাও ঠিক একইভাবে।আমাকে মা মেরে ফেলতে পারেননি বা হয়ত নিজেও মরার সাহস দেখাতে পারেননি আমাকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য যেদিন থেকে একথা বুঝতে পেরেছি সেদিন থেকেই মাকে আমার জন্মদাতার কথা বলে আর লজ্জায় ফেলতে চাইনি।হতে পারি আমি জারজ কিন্তু জন্ম তো আমায় মা একা দেয়নি। যে বা যারা একটা নারীর সম্মান নষ্ট করে শুধু আমার জন্মদাত্রীর গায়ে নয় আমার গায়েও কালি লেপ্টে দিয়েছে তার খবরে আমার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।
  সামান্য ক'টা টাকা রোজগার করার জন্য ফুটপাথের হোটেলগুলোতে বাসন মাজা থেকে শুরু করে কি না করেছি।কিন্তু মা কখনোই চাইতেন না আমি এইসব কাজ করি।কিন্তু সেই মুহূর্তে কোন উপায়ও ছিল না।মায়ের নিউমোনিয়া হল।ডাক্তার জলের কাজ একদম করতে নিষেধ করলেন।রান্নার বাড়ি দু'টো ছেড়ে দিতে হল।ওই শরীরে মা আমার গুছিয়ে দেওয়া সবকিছু নিয়ে দাঁড়িয়ে রান্না করতে গিয়ে একদিন মাথা ঘুরে পড়ে যান।তারপর হাসপাতাল থেকে আর বাড়ি আসেননি।মুখ বন্ধ করে মায়ের কাজের পূর্ব পর্যন্ত মামীর সকল গঞ্জনা সহ্য করে কালীঘাটে নমনম করে মায়ের কাজ করে আর ওবাড়ির মুখো হইনি।
  লোকগুলো মেয়েটির জামা ছিঁড়ে ফেলেছে ততক্ষনে; মুখটা তারই ওড়না দিয়ে বাঁধা। ওদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা মোটা লাঠি পেয়ে গেছিলাম ভাগ্যক্রমে।লাঠিটা নিয়ে এলোপাথাড়ি মারতে লাগলাম ওদের।ওরা তখন মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।অসুরের মত তখন যেন আমার গায়ে শক্তি।মেয়েটি ওই অবস্থায় পার্কের থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে চিৎকার চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করলো।
 নিজের গায়ের জীর্ণ জামাটা খুলে ওর হাতে দিয়ে বললাম,
-- পরে নাও। চলো তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।
 শরীরের নানান জায়গায় আমার কেটে গেছে তখন, ব্যথায় টনটন করছে।হঠাৎ করেই খিদেটা তখন আবার চাগার দিয়ে উঠলো।ওই অবস্থায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মেয়েটির সাথে ওর বাড়িতে গেলাম।
 বাড়ির সকলে ঘটনার আদ্যপান্ত বিবরণ শুনে এবং সকাল থেকে আমি না খাওয়া জেনে আমাকে ভাত ও ডাল দিয়ে খেতে দিলেন।কারণ মেয়েটির বাড়ির অবস্থাও খুব একটা ভালো নয় তা তাদের বাড়ি,ঘর দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম।খিদের মুখে ওই ডাল, ভাতই ছিল আমার কাছে অমৃত।সেদিন রাতটা ওখানেই কাটিয়ে পরদিন কেউ ওঠার আগেই সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ি এই আশায় -একটা তো মাত্র পেট ও ঠিক চলে যাবে কিন্তু কারো বাড়িতে অন্য কারো গলগ্রহ হয়ে কিছুতেই থাকবো না।


Monday, August 29, 2022

সেই বকুলফুল গাছটা

 কয়েকদিন আগেই সজলের সাথে মনিকার বিশাল ঝামেলা হয়ে গেছে। সজলের বক্তব্য মনিকা যে প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে সেখানে ছুটির কোন সময় জ্ঞান নেই।তাই বারবার সজল চাপ দিতে থাকে ওই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোন চাকরি নেওয়ার জন্য।কিন্তু তিন বছর হয়ে গেছে এই চাকরি তাই মনিকাও এই চাকরি ছাড়তে নারাজ।
  বেশ কয়েক বছর আগে হঠাৎ বৃষ্টির সম্মুখীন হয়ে মাথা বাঁচাতে অপরিচিত দু'টি কিশোর কিশোরী বৃষ্টির থেকে মাথা বাঁচাতে রাস্তার উপরে একটি বকুল ফুল গাছের তলায় আশ্রয় নিয়েছিল।বৃষ্টির সাথে বাতাস ছিল প্রচুর।গাছ থেকে বকুলফুল পড়ে ঢিপ হচ্ছিল গাছের তলায়।মনিকা ওড়নার এক কোণে ভিজতে ভিজতেই বকুলফুল কুড়িয়ে জমা করছে দেখে সজলও অপরিচিত মেয়েটিকে ওই কাজে সাহায্য করে।ফুল কুড়াতে কুড়াতেই দু'জনের কথা
-- আপনি বকুলফুল খুব ভালোবাসেন?
-- খুব।জানেন একমাত্র এই ফুল যত শুকিয়ে যাক না কেন এর গন্ধ কিন্তু থেকেই যাবে।
--- তাই নাকি? আমি কিন্তু জানতাম না এটা।
  তারপর বেশ কয়েকমাস পড়ে দু'জনের পরিচয় যখন বেশ গাঢ় হয় তখন একদিন সজল তার মনিকে বলে,
-- বকুল ফুলের গন্ধটা জানো ঠিক ভালোবাসার মত। দিন যত গড়াবে ভালোবাসাও ঠিক ততই গাঢ় হবে।
  ওদের দেখা হওয়ার কথা থাকলেও দু'জনের মিট করার জায়গাটা হচ্ছে বুকুল গাছতলা।তারপর সেখান থেকে যেখানে যাওয়ার যাবে। দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে দু'জন দু'জনকে চেনে।তারপর কলেজ,হায়ার এডুকেশন চাকরি।সজল বেসরকারি হলেও সুচাকুরে।আর মনিকা একটা সাধারণ প্রাইভেট কোম্পানিতে।কিন্তু মনিকা চাকরি পাওয়ার দু'বছর বাদে সজলের চাকরি।
 দুই বাড়ির সকলেই জানে ওদের সম্পর্কটা। বিয়ের সব ঠিকও ছিল।কিন্তু হঠাৎ করে সজলের মায়ের মৃত্যুর কারণে বিয়ের তারিখ কিছুটা পাল্টে দিতে হল। মায়ের মৃত্যুর একবছর পার না হলে বিয়ে সম্ভব নয়। সজল রোজই অফিস থেকে ফিরে বাস স্ট্যান্ডে মনিকার জন্য অপেক্ষা করে কারণ বাস থেকে নেমে যে রাস্তাটা ধরে মনিকা বাড়িতে যায় সেটা খুব নির্জন।আর এখানেই সজলের ভয়।একটা নির্দিষ্ট সময় হলে তাও হয়।কোন কোন দিন সজল ছ'টা থেকে রাত ন'টা দশটা অবধি দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে সজল খুব জোর দিতে থাকে মনিকাকে এই চাকরিটা ছেড়ে দিতে।চাকরি করা নিয়ে তার কোন আপত্তি নেই কিন্তু মনিকার অফিসের ছুটির কোন নির্দিষ্ট সময় নেই , যদি কখনো অঘটন ঘটে যায় সেই ভয়ে।
 একদিন রাত দশটা বেজে যায় মনিকার দেখা নেই।ফোনেও পাচ্ছে না।বারবার ফোন করে যাচ্ছে। 'নট রিচেবল' - ছাড়া আর কিছুই শব্দ শুনতে সে পাচ্ছে না। প্রথমে রাগ,অভিমান পরে টেনশনে পাগলের মত প্রতিটা বাস আসলেই উঁকি ঝুঁকি। মনিকার বাড়িতে একমাত্র বয়স্ক মা। তিনি মেয়ের টেনশনে বেশ কয়েকবার ফোন করেছেন সজলকে। কারণ তিনিও মনিকাকে ফোনে পাচ্ছেন না।
 রাত তখন দশটা।মনিকা একটা উবের করে নামছে দেখে সজল ছুটে যায়। এতক্ষণ যার জন্য এত টেনশন হচ্ছিল তাকে সুস্থ্য,স্বাভাবিক দেখতে পেয়েই সব টেনশন গিয়ে মাথায় রাগ হয়ে জমা হল।মনিকা নেমেই সজলকে বলতে গেলো তার দেরি হওয়ার কারণ কিন্তু কে শুনবে কার কথা --
-- জানো সজল আজ না
-- আমি কোন কথা জানতে  চাইছি না। বহুদিন ধরে বলছি তুমি অন্য কোথাও চাকরির চেষ্টা করো কিছুতেই তুমি আমার কথা গ্রাহ্য করছো না।
  সজল মনিকার কোন কথা শুনার প্রয়োজনই বোধ করলো না উপরন্তু মনিকার বাড়িতে যেতে যেতেই রাস্তার উপরেই চিৎকার করে রাগ দেখাতে শুরু করলো। মনিকা তাকে বারবার অনুরোধ করলো রাস্তার উপরে চিৎকার না করতে।কিন্তু কে শোনে কার কথা!
সজল এতটাই রেগে ছিল তার মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেলো,
-- আমার সাথে সারাজীবন থাকতে হলে এই চাকরি তোমায় ছাড়তে হবে।আমার তো চাকরিতে কোন আপত্তি নেই।তুমি অন্য কোথাও চাকরি খোঁজো।
 সজলের এই চিৎকার চেঁচামেচিতে মনিকার মাথা এমনিতেই গরম ছিল তারপর এই শর্ত দেওয়ায় মনিকাও রেগে বলে বসলো,
--- আমাকেও ভেবে দেখতে হবে ভবিষ্যতে তোমার সাথে আমি থাকবো কিনা।চাকরির বয়স বেড়েছে।সামনে আমার প্রমোশন হবে।এখানে আমার একটা উন্নত ভবিষ্যত আছে। আমি কিছুতেই এই চাকরি ছাড়বো না।
-- তাহলে আমার সাথে সম্পর্ক ছাড়তে হবে।
--- আমি তো তোমায় ধরে রাখিনি। আমার ভালোবাসার প্রতি যদি তোমার বিশ্বাস না থাকে তাহলে সেই সম্পর্ক আজ না হলেও কাল ভেঙ্গে যাবেই। তাই আরও জড়িয়ে যাওয়ার আগেই উভয়কেই বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে।আর জেনে রাখো তোমার কথাই আমি চাকরি কিছুতেই ছাড়বো না।
  কেটে গেছে চার বছর।দু'জনের ইগো ঝেড়ে কেউই আর কোনদিন কারো সামনে গিয়ে দাঁড়ায়নি। প্রথম দেখার স্মৃতিটা মনে রেখে দু'জনেই সেই বকুল গাছটার কাছ থেকে যাওয়ার সময় কিছুক্ষণ থমকে যায়।সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মত তাদের সামনে ভেসে ওঠে দু'টি কিশোর কিশোরীর গাছতলায় ফুল কুড়ানোর দৃশ্য।বুকের ভিতর হঠাৎ ওঠা ঝড় সামলে নিয়ে আবার রোজ নামচায় লেগে পড়ে। একই শহর অনেক সময় একই রাস্তা কেউ আগে কেউ পড়ে হাঁটছে কিন্তু ইগো ঝেড়ে কেউ কারো সামনে আর যায়নি।

২৯-৮-২২ 

Wednesday, August 10, 2022

হরিহর আত্মা

  হরিহর আত্মা (m)

  ছেলেবেলা থেকেই দীপিকা আর অঞ্জনা খুব ভালো বন্ধু।সেই প্রথম স্কুলে ভর্তি হওয়া থেকে গ্র্যাজুয়েশন একই স্কুল এবং একই কলেজ। যার ফলে রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই এই দুটি পরিবারের লোকজনও আত্মিক বন্ধনে খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছে।কোন পরিবারের লোকজনকে বাদ দিয়ে অন্য পরিবারে ছোট থেকে বড় কোন অনুষ্ঠানই হয় না।পড়াশুনায় দু'জনেই মাঝারি মানের।দু'বাড়ির লোকেরাই মজার ছলে বলে,"যে বাড়িতে দু'টি ছেলে আছে আমরা সেই বাড়িতেই আমাদের মেয়েদের বিয়ে দেবো।"
  দীপিকার মাসতুত বোনের বিয়েতে দু'পরিবারেরই সকলের নিমন্ত্রণ।সেখানেই দীপিকাকে দেখে একটি পরিবার তাদের ছেলের জন্য পছন্দ করে।কথাবার্তা এগোতে লাগে।এখন বলতে গেলে প্রায় চব্বিশ ঘন্টায় দু'বন্ধু একসাথে সময় কাটায়।আনন্দের মাঝে মাঝে দু'জন দু'জনকে ছেড়ে থাকতে হবে মনে হলেই উভয়ের মনের ভিতরে বিষাদের কালো মেঘে চোখের কোল বেয়ে জল ঝরতে শুরু করে
  দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে এলো।বিদায়ের মুহূর্তে দীপিকা আর অঞ্জনার একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্না দেখে পাড়া-প্রতিবেশীরাও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।সে এক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি।
  বৌভাতের দিন অবশ্য দু'জনে অনেকটাই সামলে গেছে।তবুও ফেরবার সময় দু'জনের চোখেই জল।
  দীপিকার বিয়ের ঠিক বছর দু'য়েকের মাথায় অঞ্জনার বিয়ে ঠিক হয়। সম্মন্ধটা অবশ্য দীপিকাই করে।দীপিকার স্বামীর অফিস কলিগ দেবাংশুকে দেখেই দীপিকার মাথায় এটা ঘুরপাক খেতে থাকে।অনেক বলেকয়ে স্বামী সুমিতকে দিয়ে দেবাংশুকে কথাটা বলায়।দেবাংশু বন্ধু সুমিতকে বলে,
-- দেখ যদি প্রেম করতাম তাহলে বাবা,মাকে আমিই জানাতাম।কিন্তু যেহেতু এটা প্রেম নয় তাই এ সম্মন্ধটা তোকে বা তোর বউকেই বাবা,মাকে জানাতে হবে। হ্যাঁ একটা কথা আমি বলতে পারি অঞ্জনাকে আমি বহুবার দেখেছি নানান অনুষ্ঠানে তোদের বাড়িতে।মন্দ নয় দেখতে।আর সেক্ষেত্রে আমার মত জানতে চাইলে আমি হ্যাঁ ই বলবো।
 সুমিত অফিস থেকে ফিরে সব কথা দীপিকাকে জানায়।দীপিকা ফোনে অঞ্জনার বাবা,মায়ের সাথে কথা বলে ছেলের সব বিবরণ দেয়।তারা এই ব্যাপারে সব দায়িত্ব দীপিকাকেই সমর্পণ করেন।
  সুমিত ও দীপিকা দেবাংশুদের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা,মাকে অঞ্জনার ছবি দেখিয়ে পছন্দ করিয়ে মেয়ে দেখার জন্য কথা আদায় করে বাড়িতে ফেরে।
  মেয়ে দেখে পছন্দ হওয়ার পর একসময় বিয়ের তারিখও ফাইনাল হয়ে বিয়ে হয়ে যায়।
 এদিকে দীপিকার বিয়ে হয়েছে চার বছর কিন্তু মাতৃত্বের স্বাদ সে আজও পায়নি।নানান পরীক্ষা নিরীক্ষায় ধরা পড়ে সে কোনদিনও মা হতে পারবে না।খুব ভেঙ্গে পরে।সুমিত তাকে অনেক বোঝায় আজকের দিনে মা হওয়া কোন ব্যাপারই না।প্রয়োজনে তারা একটি সন্তান দত্তক নিয়ে নেবে।কিন্তু দিনরাত কেঁদে কেঁদে প্রায় পাগলের মত অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়।আর ঠিক এই মুহুর্তেই বিয়ের দু'বছরের মাথায় অঞ্জনা প্রেগন্যান্ট হয়।এত বড় একটা খুশির খবর সে আর দেবাংশু ছাড়া কাউকেই দিতে পারে না দীপিকার কথা ভেবে।এমনকি তার শ্বশুর শ্বাশুড়িকেউ জানাতে পারে না যদি দীপিকার কানে চলে যায়।
  আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে ধরা পড়ে অঞ্জনা যমজ বাচ্চা জন্ম দিতে চলেছে।সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় খেলে একটা সন্তান তো সে দীপিকাকে দত্তক দিতে পারে।কিন্তু কিছুতেই দেবাংশুকে রাজি করাতে পারে না।শ্বশুর শ্বাশুড়ি তখনও কিছুই জানেন না।দিনরাত স্বামীর সাথে মত বিরোধ মনোমালিন্য চলতে থাকে।ঠিকভাবে অঞ্জনা খাওয়া দাওয়া করে না,ওষুধ দিতে গেলে খাবে না বলে জানিয়ে দেয়।শেষ পর্যন্ত দেবাংশু মেনে নিতে বাধ্য হয়।আর তখনই বাড়িতে সকলকে জানানো হয়।
  দীপিকাকে এই সুখবরটা তার বাড়ি গিয়েই দেবে ঠিক করে।স্বামীকে নিয়ে দীপিকার বাড়ি যায় সে।সবকিছু খুলে বলে তাকে।দীপিকা দুই হাতে অঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে," আমাদের মত আমাদের সন্তানেরাও একই স্কুল,একই কলেজে পড়বে। আমরা দু'জনেই একসাথে মা হবো।"
  কিন্তু তারা ঠিক করে তারা চারজন ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ কোনদিন এ কথা জানবে না।তাই তখন থেকেই দীপিকা প্রেগন্যান্ট বলে চাউর করা হয়। একেই বলে মনেহয় হরিহর আত্মা।


 
  

Saturday, July 30, 2022

মানুষ চেনা বড় দায় (দশম ও শেষ পর্ব)

 অতনু তার মাকে আলমারির ভিতর হতে সেই ছবি বের করা থেকে শুরু করে নিকিতার সাথে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা মায়ের কাছে ব্যক্ত করে।তার মা অবাক হয়ে শুধু শুনে যান। অতনুর কথা শেষ হলে জানতে চান,
--- নিকিতার সাথে তোর রক্তের সম্পর্ক আছে ঠিকই কিন্তু কি প্রয়োজন ছিল তোর এইভাবে কিছুদিন নিজের পদমর্যাদা ভুলে তার আন্ডারে কাজ করার?
--- জানিনা মা, হঠাৎ করেই কেন জানিনা ওর পরিচয় জানার পর ভীষণভাবে ইচ্ছা করছিলো ওর সাথে কিছুটা সময় কাটাতে। একেই মনেহয় রক্তের টান বলে।
 কথাটা শুনে অতনুর মা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন।
  মাকে নিয়ে অতনু গ্রামের বাড়িতে ফিরে এলো।সে বহুবার মাকে বলেছিল তার সাথে ব্যাঙ্গালোর যাওয়ার কথ।কিন্তু তিনি কিছুতেই রাজি হননি।অগত্যা তাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসলে তার শ্বশুরমশাই আর কয়েকটা দিন ছুটি বারিয়ে পুজোটা কাটিয়ে যেতে বলেন।অতনু তাইই করে।বউ,ছেলে নিয়ে বেশ হৈ হৈ করে তার সময় কেটে যায় বেশ কিছুদিন।
  আর এদিকে নিকিতা অতনু সাহার সব পরিচয় জোগাড় করে।প্রতি বছর সে পুজোর সময় ছুটি নিয়ে কলকাতা বাবা,মায়ের কাছে আসে।এবারও তার ব্যতিক্রম হয় না। ষষ্ঠীর দিনে আসা আর লক্ষী পুজোর পর যাওয়া।বছরে একবারই বাড়িতে আসে।যা ছুটি নেওয়ার ওই একবারেই নেয়। এবার লক্ষী পুজোর পরও মেয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে না দেখে ডিনার টেবিলে নিকিতার কাছে জানতে চাইলেন তার বাবা ,
--- হ্যারে তুই এবার কি একটু বেশিদিন ছুটি নিয়ে এসেছিস?
 নিকিতা সে কথার উত্তর না দিয়ে বললো,
-- আচ্ছা বাবা, তুমি তো কোনদিনও তোমার গ্রামের গল্প, আমার ঠাকুমা,ঠাকুরদার গল্প করোনি? তারা কি কেউ বেঁচে নেই এখন ?
সুভাষবাবু খেতে খেতে খাওয়া বন্ধ করে হঠাৎ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
--- কি হল বাবা উত্তর দিলে না? তোমার মুখে তো কোনদিন পিলজঙ্গ নামটাও শুনিনি।
---তুই কি করে জানলি আমার গ্রামের বাড়ি পিলজঙ্গ?
--- আরো অনেককিছুই এখন জানি বাবা।
 সুভাষবাবু কোন কথার উত্তর না দিয়ে খাওয়া শেষ না করেই উঠে গেলেন। নিকিতার মা জানতে চাইলেন,
-- কি ব্যাপার বলতো? হঠাৎ তোর বাবার গ্রামের বাড়ি নিয়ে পড়লি কেন?
--- তোমার এসব না জানাই ভালো মা।এই বয়সে এসে তুমি কোন আঘাত পাও তা আমি চাই না।
--- মানেটা কি?
 নিকিতা কোন উত্তর না দিয়ে বেসিনে মুখ ধুতে ধুতে বললো,
-- মা, আমি কাল খুব ভোরে বেরিয়ে যাবো। ফোন করে জানিয়ে দেবো রাতে ফিরতে পারবো কিনা।অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
 নিকিতার মা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন ততক্ষণ নিকিতা ডাইনিং ছেড়ে বাবার ঘরে ঢুকে বাবাকে বললো,
--- বাবা, কাল আমি তোমার গাড়িটা নিয়ে একটু বেরবো। কখন ফিরবো বলতে পাচ্ছি না। একটু পিলজঙ্গ গ্রামে যাবো। ভয় পেও না, আমি মাকে কোন কথা জানাবো না। পুরোপুরি সব কিছু বুঝতে না পারলেও এইটুকু অন্তত বুঝেছি আমার একটা দাদা আছে। তোমার কাছ থেকে আমি কিছুই জানতে চাইছি না, ওখানে গিয়েই আমি সব জানবো অন্য কারো কাছে।গ্রামের নাম আর তোমার বাড়ির ঠিকানা একসময় জেনেছিলাম তোমার কাগজপত্র ঘাটতে ঘাটতে। এই ঠিকানা আর তার পিতৃপরিচয় থেকে তার পরিচয় জানতে পেরেছি।
 সুভাষবাবু যেন কথা বলতেই ভুলে গেছেন।আজ এত বছর পর তার অতীত তার মেয়ে সামনে আনবে তিনি ভাবতেই পারেননি।
 ভোরবেলা নিকিতা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো পিলজঙ্গ গ্রামের উদ্দেশ্যে।

 অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নিকিতা যখন তার শিকড় খুঁজে পেলো সেই বাড়িতে তালা বন্ধ।আশেপাশে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলো বাড়ির ছেলে কয়েকটা দিন আগেই তার কর্মস্থলে ফিরে গেছে আর তার মা গ্রামের রায় চৌধুরীদের বাড়িতে।নিকিতা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়ে অতনুর মায়ের সাথে দেখা করে সব পরিচয় দেয়।অতনুর মা তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেন।নিকিতা তাকে সাথে করে নিয়ে যেতে চায়।তিনি জানান,
-- যেহেতু তুমি বললে তোমার মা জানেন না তাই আমিও এই বয়সে এসে কারো সুখের সংসারে কাঁটা হতে চাই না।আমার ভালোবাসা তার সাথে ছিলো আজীবন থাকবে। আমি আজও তাকে ঠিক সেই আগের মতই ভালোবাসি।আমি তোমার ডাকে সারা দেওয়া মানেই একটা সংসারে আগুন জ্বালানো। তা আমি কোনদিনও পারবো না।তুমি ফিরে যাও মা।আমার বিটু তোমার দাদা।ওর সাথে সম্পর্কটা রাখলে আমার জীবনের না পাওয়াগুলো পূর্ণতা পাবে।আমি মরে শান্তি পাবো এই ভেবে অন্তত আমার বিটুর রক্তের সম্পর্কের কেউ আছে।
  ভদ্রমহিলা যখন কথাগুলি নিকিতাকে বলছেন সে শুধু অবাক হয়ে শুনছে।একজন নারীই পারে এতটা কষ্টসহিষ্ণু হতে।সে মনেমনে প্রতিজ্ঞা করে মাকে না জানিয়েই আজীবন সে তার দাদার সাথে সম্পর্ক রেখে চলবে।
সারা দুপুর সে তার বড়মার কাছ থেকে তার বাবার সমস্ত কথা শুনে সন্ধ্যায় এই মহীয়সী নারীর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে আগামীবার আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

     শেষ



  





  

মানুষ চেনা বড় দায় ( নবম পর্ব)

 মায়ের অসুস্থ্যতার খবর পেয়ে হঠাৎ করেই অতনু গ্রামের বাড়িতে চলে যায়।বিয়ের পর বেশ কিছুদিন তার স্ত্রী তার সাথে থাকলেও পরে সেই যে বাচ্চা হতে সে বাপের বাড়িতে গেছে তারপর সে আর অতনুর কাছে ফিরে আসেনি।অতনু মাঝে মধ্যে তার শ্বশুরবাড়িতে যায়।আদরের দুলালী একাএকা তার সময় কাটে না তাই সে বাপের বাড়িতেই ছেলে নিয়ে থাকা সমীচীন মনে করেছে। অতনু বা তার মায়ের এতে কোনো আপত্তিও নেই; আর থাকলেই বা শুনছে কে? বুদ্ধিমত্তা আর কৃতজ্ঞতা বশত তারা এটাকে সানন্দেই মেনে নিয়েছেন।
  মায়ের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ দেখে সে মাকে কলকাতা নিয়ে আসতে চায়।রায় চৌধুরীবাবু তাকে সমর্থন করেন।একটা গাড়ি ভাড়া করে মাকে নিয়ে কলকাতার এক নামী নার্সিংহোমে ভর্তি করিয়ে নিজে হোটেলে থাকতে শুরু করে। আস্তে আস্তে মায়ের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।একদিন ভিজিটিং আওয়ারে অতনুর মা অতনুকে বলেন,
--- ছেলেবেলায় বহুবার তুই তোর বাবার কথা জানতে চেয়েছিস তবে বড় হওয়ার পর কোনদিন আর বাবার কথা আমার কাছে বলিসনি। কিন্তু আমি কোনদিন তোকে তার সম্পর্কে কিছুই বলিনি। আজ আমি তোকে তার সম্মন্ধে কিছু জানাতে চাই।
--- আমি সব জানি মা।ঠাম্মা আমায় সব বলেছেন।কিন্তু তুমি কষ্ট পাবে বলে কোনদিন কিছু তোমায় বলিনি।তাকে আমি চিনি।তিনি কলকাতা শহরে কোথায় থাকেন? কি করতেন সব জানি।
  কথা বলতে বলতে মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে মায়ের দু'চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।হাত দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বলে,
-- আমি জানি তুমি আজও বাবাকে ভালোবাসো।জীবনের সব থেকে মূল্যবান সময় তো কাটিয়েই ফেলেছো তবে কেন আজ এই চোখের জল ফেলছো?
-- একবার যদি তার সাথে দেখা হত শুধু একটা কথাই জানতে চাইতাম কি ছিলো আমার অপরাধ? তবে একটা কথা ভেবে অবাক হচ্ছি তুই তাকে কিভাবে চিনলি? তার বাড়ি, ঘরের ঠিকানা কিভাবে জানলি?

ক্রমশ 

প্রকৃত বন্ধু

   প্রকৃত বন্ধু   
 
  সদ্য বাবাকে হারানো আর হঠাৎ করেই স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশায় প্রথম অবস্থায় দোলন ভীষণভাবে মুষরে পড়ে। এত বড় সংসারের দায়িত্ব বিশেষত ভাইবোনগুলোকে কিভাবে একা তাদের জীবনে দাঁড় করাবে এই ভেবেই সে কোন কুল কিনারা পাচ্ছিল না। যদিও মা বেঁচে আছেন কিন্তু তিনি সংসারটা সামলানো ছাড়া আর কিইবা করতে পারবেন? 
  বাবার মৃত্যুর পর সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে দোলনের উপর।দোলন এখন একটা কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক।দীপকের সাথে বছর খানেক ধরে পরিচয়।দু'জন দু'জনকে ভালোবাসলেও কেউই মুখ ফুটে কাউকে বলেনি।
  ভালোবাসা যেখানে শুরুর থেকেই গভীর হয় হয়ত সেখানে সত্যিই মুখ ফুটে পরস্পরকে বলার প্রয়োজন হয় না।দোলনের মা, একবোন আর ছোট দুই ভাই। 
  দোলন ও দীপক যখন মনেমনে ভাবছে তারা এবার একই ছাদের তলায় সংসার গুছিয়ে নেবে ঠিক সেই মুহূর্তেই দোলনের পিতৃ বিয়োগ। পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়লো দোলনের উপর।বাবা প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করলেও মাইনে ছিল ভালো। সুতরাং বেশ ভালোভাবেই তাদের সংসার চলে যেত। সঞ্চয় খুব বেশি না হলেও মোটামুটি। কিন্তু সঞ্চয় দিয়ে এতগুলো মানুষের শুধু তো খাওয়াপরাই নয় অসুখবিসুখ সর্বোপরি তিন তিনটে ছোট ছোট ভাইবোনদের পড়াশুনার খরচ।
  মায়ের সাথে পরামর্শ করে সঞ্চয়ে হাত না দিয়ে দোলন তার মাস মাইনের টাকাটা মায়ের হাতে দিয়ে কোনরকমে সংসার চালিয়ে নিয়ে যেতে বলে।দোলনের পাশে প্রকৃত বন্ধু হয়ে দাঁড়ায় দীপক।দীপকের সাথে এতদিন মিশেও দোলন জানতে পারেনি দীপকের মধ্যে বন্ধুত্বের এক সুন্দর রূপ লুকিয়ে আছে।এতদিন দীপককে কাছে পেয়েছে শুধু একজন প্রেমিক হিসেবে আর আজ দীপক তার কাছে সব চেয়ে কাছের এক বন্ধু।
  দীপকের সাথে একান্তে আলাপচারিতায় দীপক দোলনকে জানিয়েছে,
--- ভালোবেসে বিয়ে করে একই ছাদের তলায় থেকে সংসার করার নামই শুধু ভালোবাসা নয়।সুখে-দুখে, বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে থেকে সুখী হওয়া কিংবা সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ দু'জনে মিলে খুঁজে বের করার নামই ভালবাসা, আজীবন দু'টি মন এক হয়ে থাকার নাম ভালোবাসা।তার জন্য একই ছাদের তলায় থাকার কোন দরকারই পড়ে না। মেশমশাইয়ের অবর্তমানে তুমিই এই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তার মত করেই সামলাবে। আজীবন আমি তোমার পাশে থাকবো। সব দায়িত্ব, কর্তব্য শেষ হওয়ার পর সকলে যখন যে যার জীবনে দাঁড়িয়ে যাবে তখন নাহয় ভেবে দেখা যাবে আমাদের মাথার উপরের ছাদটা এক হবে কিনা। 
  দীপক যখন এই কথাগুলি বলছে সে দু'হাত দিয়ে দোলনের হাত দু'টিকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।দোলনের দু'চোখ বেয়ে নীরবেই অশ্রু পড়ে চলেছে।আজ যেন সে নূতন করে আবার দীপককে আবিষ্কার করলো।
  স্বামী, প্রেমিক, বন্ধু সকলেই পায়।কিন্তু সেই স্বামী কিংবা প্রেমিক অধিকাংশ নারীর কাছে বন্ধু হয়ে উঠতে পারে না।একজন মানুষ আর একজন মানুষের কাছে যখন প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠতে পারে তাহলেই মনেহয় জীবনে সবকিছু পাওয়া হয়ে যায়।
 
  

Wednesday, July 20, 2022

মানুষ চেনা বড় দায় (অষ্টম পর্ব)

 বেশ কিছুদিন ধরে নিকিতা অতনুকে আর অফিসে দেখতে পায় না।ভাবে হয়ত ছুটি নিয়েছে।কোন কারণ ছাড়াই লোকটির কথা বারবার কেন তার মনে পড়ছে নিজেও বুঝতে পারছে না।একটু ভালো পোষ্টে থাকার ফলে এদিকওদিক খবর নেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু সবাই যেন অতনু সাহা সম্পর্কে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে।
  অতনু ওরফে বিটু বেশ কয়েক বছরের মধ্যেই অফিসের বেশ উচ্চ পদে চলে যায়।নূতন নূতন ছেলেমেয়ে অফিসের নানান ব্রাঞ্চে নিয়োগ হতে থাকে, তাদের কোন ব্রাঞ্চে কখন ট্রান্সফার করতে হবে তা দেখা অতনুর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। 
  একদিন কাজ করতে করতে নিকিতা সাহার পরিচয় সে জানতে পারে যে কিনা তাদেরই অফিসের অন্য ব্রাঞ্চে আছে এবং বেশ ভালো পোষ্টেই আছে।বাবার নাম আর পুরনো ঠিকানা দেখেই সে বুঝতে পারে এ হচ্ছে তার কলেজ অধ্যাপক এস.এস. অর্থাৎ তার বাবা সুভাষ সাহার একমাত্র মেয়ে।
  কি জানি কেন তার মাথায় এ খেয়াল চাপলো।সে কিছু নতুন ছেলেমেয়ের সাথে মাত্র কয়েকটা দিন নিকিতার অফিসে এসে তার আন্ডারে চাকরি করতে চাইলো।
  নিকিতা রোজই খবর নেয় অতনু সাহা অফিসে এসেছে কিনা।কিন্তু হঠাৎ করেই যেন লোকটা অফিস থেকে সকলের অলক্ষ্যে উবে গেছে।এবার সে ঠিক করে ল্যাপটপ ঘেঁটে নতুন যোগদান করা ছেলেমেয়েদের নামের লিস্টটা তাকে বের করতেই হবে।
 লোকটা বয়সে বড়,দেখতেও খুব একটা ভালো নয় কিন্তু তবুও প্রথম দিন থেকেই লোকটার প্রতি অদ্ভুত একটা মায়া কাজ করছে কেন এটাই নিকিতা বুঝতে পারছে না।

 ক্রমশ -

Thursday, July 14, 2022

ভাগ্যই জীবনের শেষ কথা বলে

ভাগ্যই জীবনে শেষ কথা বলে  

  নিজের জন্য কিছু একটা করা ভীষণ দরকার হয়ে পড়েছিল।
  একাই বাবুঘাট গঙ্গার পাড়ে বসে এলোমেলো ভাবনার সাথে এই ভাবনাটাই নন্দিনীকে ভাবিয়ে যাচ্ছিল।তখনো সন্ধ্যা হয়নি।অস্তগামী সূর্যের লাল আভা গঙ্গার জলে পড়ে এক মনোরম শোভায় আকৃষ্ট হয়ে বেশ অনেকক্ষণ বসে ছিল নন্দিনী।আজকে আর ঘরে ফেরার কোন তাড়া নেই তার।অনেক কষ্টে গড়ে তোলা সংসারে তার দায়িত্ব আজ ফুরিয়েছে।এলোমেলো ভাবনারা আজ সত্যিই মনটাকে বারবার অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
  বাবা,মায়ের পছন্দ করা সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি মানুষকে মেনে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির দরজায় পা রেখেই বুঝে গেছিলো এ বাড়িতে শ্বাশুড়ী মায়ের কথাই শেষ কথা।বাংলায় এম. এ. করা নন্দিনীর ভীষণ ইচ্ছা ছিল শিক্ষকতা করার।কিন্তু বাবার জেদের কাছে বর্ষতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল মায়ের এক কথাই,
--- তুই কি চাস নন্দা? এমনিতেই মানুষটার হাই ব্লাডপ্রেসার,সুগার।আর এই বিয়ে নিয়ে তুই যে তাল শুরু করেছিস তাতে মানুষটাকে তুই আরও অসুস্থ্য করে ছাড়বি। আরে চাকরি করতে হলে বিয়ের পড়ে করিস।এই মানুষটাকে শেষ বয়সে এসে একটু শান্তি দে।
 মায়ের এই স্বার্থপরের মত কথা শুনে দরজা বন্ধ করে আকুল হয়ে সারারাত কেঁদে সকালেই মাকে জানিয়ে দিয়েছে,
-- তোমরা যেখানে আমার বিয়ে দেবে আমি রাজি।
 স্বামী ভালো মনের মানুষ।নন্দিনীকে খুবই ভালোবাসে।কিন্তু মায়ের মুখের উপর একটা কথা বলার সাহস তার নেই।সেই ফুল শয্য্যার রাত থেকে একটি কথাই শুনে যাচ্ছে নন্দিনী, "একটু কষ্ট করে মানিয়ে নাও। মা আমায় অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন।মায়ের কথার অবাধ্য হয়ো না কখনো।"
 বিয়ের মাসখানেক পড়ে স্বামী বিমলেন্দুকে জানিয়েছিল নিজের মনের কথা। বিমলেন্দু তাকে বলেছিল,
-- চাকরি করবে এত খুব ভালো কথা, তবে মায়ের মতটা নিয়ে তবে এগিও।
 না,তিনি রাজি হননি। কিন্তু নন্দিনী তার এই ইচ্ছার মৃত্যুও ঘটাতে পারেনি। মনের মধ্যে সুপ্ত ইচ্ছাকে লালন করে চলেছে আজ অবধি। বাবা,মা জীবিত থাকাকালীন সময়ে দশ বছরের বিবাহিত জীবনে দশবারও বাপেরবাড়িতে যেতে পারেনি অর্থাৎ শ্বাশুড়ী যেতে দেননি।এই দশ বছরের মধ্যেই সে বাবা,মা উভয়কেই হারিয়েছে। তাই এখন সেখানে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়েছে।
 ঘুমের মধ্যে হঠাৎ স্ট্রোকে স্বামীর যখন মৃত্যু হয় ছেলে তখন ডাক্তারি পড়ছে।শ্বাশুড়ির সামান্য পেনশনে সংসার চালাতে হয়েছে।তবুও তিনি নন্দিনীকে কিছু রোজগারের জন্য বাইরে বেরোতে দেননি।জমানো পুঁজি শেষ হয়েছে ছেলে রাহুলকে পড়াশুনা শেষ করাতে।
  শ্বাশুড়ী গত হয়েছেন বছর খানেক।ছেলে তার আগেই উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডন পাড়ি দেয়।তারপর সেখানেই সেটেল্ড।এখন নন্দিনী সম্পূর্ণ একা।রাহুল প্রবাসী এক বাঙ্গালী মেয়েকে বিয়ে করে মাকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয় নূতন বাড়ি কিনে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে জানিয়ে।বয়স এখন নন্দিনীর পঞ্চান্ন।এই বয়সে চাকরি পাওয়া অসম্ভব।কিন্তু নিজেকে খেয়েপরে তো বাঁচতে হবে।
 পেপারে অ্যাড দেখে একটা কোচিং সেন্টারে গেছিলো বাংলার শিক্ষক হিসাবে পড়ানোর দায়িত্বটা পাওয়ার আশায়।না,তারা তাকে নিরাশ করেননি।সেদিনই সে দশম শ্রেণীর একটি ক্লাস নেয় পরীক্ষা মূলক হিসাবে।তারা তাকে জানিয়েছেন দুদিনের মধ্যে ফোন করে জানাবেন।সেখান থেকেই হাঁটতে হাঁটতে এসে গঙ্গার পাড়ে বসে।
  নন্দিনী গঙ্গার পবিত্র জলের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে সেই সময় যদি বাপেরবাড়ি কিংবা শ্বাশুড়ীর কাছে চাকরির জন্য বাঁধাপ্রাপ্ত না হতে হত তাহলে আজ এই পরিস্থিতির মধ্যে তাকে পড়তে হত না।আসলে মানুষের মেধা আর ইচ্ছা থাকলেই হয় না তার সাথে সাথে ভাগ্যেরও দরকার আছে।ভাগ্যে না থাকলে মানুষের পাওয়া জিনিসও অনেক সময় হাত ফস্কে বেরিয়ে যায়।
 

Saturday, July 9, 2022

সময় মানুষকে বুঝতে শেখায়

সময় মানুষকে বুঝতে শেখায় 

  তিন বছর হল তিয়াসার বিয়ে হয়েছে।বাবা,মায়ের পছন্দ করা ছেলেকে খুশি মনেই মেনে নিয়েছে।কলেজ লাইফে জয়কে পছন্দ করলেও কোনদিন মুখ ফুটে বলতে পারেনি তিয়াসা।জয়ের নায়কোচিত চেহারা কলেজের সব মেয়েদের পছন্দের প্রথম কারণ ছিলো।সকলেই জয়কে দেখলে কেমন যেন হ্যাংলার মত ঘিরে ধরতো যা তিয়াসা কোনদিন পারেনি।জয়ের ভূত মাথার থেকে সেদিনই নেমেছে তিয়াসার যেদিন সে নিজ চোখে দেখেছে কলেজ ক্যাম্পাসের ভিতর নিরিবিলি জায়গায় তিয়াসার ক্লাসমেট সুপর্ণাকে জয় জড়িয়ে ধরে কিস করেছে।
  কলেজ লাইফে এরপর শুধু জয় কেন অন্য কোন ছেলের দিকে তিয়াসা আর কোনদিন ফিরেও তাকায়নি।সাধারণ ভাবেই গ্র্যাজুয়েশনের পর বাড়িতে শুয়ে,বসে আর মাঝে মাঝে মাকে রান্না আর ঘরের কাজে সাহায্য করেই সময় কেটে যাচ্ছিল।বাবার রিটায়ারমেন্ট এর দিনে বাবার নির্দেশমত মাকে নিয়েই অফিসে উপস্থিত হয়েছিল।সেখানেই বাবার এক সহকর্মী তিয়াসাকে দেখে পছন্দ করেন তার একমাত্র ছেলের জন্য।
  কথাবার্তা এগোতে লাগে। তিয়াসা ও পলাশ পরস্পরকে চেনে,জানে। দু'জনেরই দু'জনকে ভালো লাগে।
  কিন্তু বিয়ের পর তিয়াসা দেখে, যে পলাশকে সে ছ'মাস ধরে চিনেছে,জেনেছে আর যে পলাশকে সে বিয়ে করেছে সে সম্পূর্ণ আলাদা।বিয়ের আগে ঘুরতে গিয়ে পলাশের যে কেয়ারিং মনোভাব সে দেখেছে বৌভাতের দু'দিন যেতে না যেতেই পলাশের সেই মনোভাব আর সে খুঁজে পায়নি।কিছুটা গায়ে পড়া হয়ে ছ'মাস আগে চেনা পলাশকে খুঁজতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।
 প্রথম প্রথম বেশ কটাদিন তিয়াসার মন খারাপ করলেও পড়ে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।সংসারে মানুষ তো তিনজন।সকালে পলাশ অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার শ্বশুরমশাইও বেরিয়ে যান।সারাটাদিন তিয়াসা একাই।ঘর গুছিয়ে,শুয়ে-বসে তার সময় কাটে।শ্বশুর আগেই ফেরেন অফিস থেকে।তিনি প্রতিদিনই ফেরার পথে কিছু না কিছু খাবার কিনে আনেন।এসেই বাচ্চাদের মত তার আদরের বৌমাকে প্যাকেটটা দিয়ে বলেন,
-- বৌমা,দু'কাপ চা করে আনো তাড়াতাড়ি। পুলু ফেরার আগেই এককাপ খেয়ে নিই ও আসলে আর এক কাপের সাথে তখন তিনজনে মিলে জমিয়ে টিফিন করবো।আমি বেশি চা খেলে ব্যাটা আজকাল বেশ চিল্লায়। 
 কথাটা বলেই হাসতে থাকেন।পলাশ বাড়িতে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে বাবার আনা টিফিন খেতে খেতে বলে,
-- বাড়িতে এসে ক'কাপ চা খেলে? রোজ রোজ এত তেলে ভাজা এখন তোমার খাওয়া ঠিক নয় বাবা।
 একথা শুনে অনেক সময় তিয়াসা বলে উঠেছে,
-- সেকথা আমিও বাবাকে বারবার বলেছি।কিন্তু বাবা কথাই শোনেন না।টিফিনটা তো আমিই বানাতে পারি রোজ।
-- বানাতে পারি নয় এখন থেকে তুমিই বানিয়ে রাখবে।
    এইভাবেই চলতে থাকে দিন।বিয়ের পর থেকে পলাশ তিয়াসার ব্যাপারে যেমন উদাসীন ছিলো তার কোন পরিবর্তন হয় না।এরই মাঝে একদিন তিয়াসার শ্বশুর অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখেন তিয়াসার ভীষণ জ্বর।বাড়িতে ফিরেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছেলেকে ফোন করেন।পলাশ বাড়িতে ফিরে দেখে জ্বরে বেহুস তার স্ত্রী আর বাবা তার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছেন।সে কোনরকমে হাত,মুখ ধুয়ে বাবাকে কিছুটা মুড়ি আর চা করে দিয়ে তিয়াসার কাছে গিয়ে বসে।আগেই তাকে জ্বরের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।তখন ঘাম দিয়ে জ্বর কমছে। তিয়াসা উঠে বসার চেষ্টা করে।পলাশ তাকে বলে,
-- একদম না।যেমন শুয়ে আছ তেমন ভাবেই শুয়ে থেকো।আমি দু'টি ভাত ফুটিয়ে নিতে পারবো।
-- কিন্তু বাবা তো রাতে রুটি খান।
-- আজ ভাত খেয়ে নেবেন।তুমি আগে সুস্থ্য হও পরে এসব দেখবে।
 সেদিন রাতে যতবার তিয়াসার ঘুম ভেঙেছে সে অনুভব করেছে পলাশের একটা হাত ঘুমের মধ্যেও তার চুলে বিলি কেটে চলেছে। তিয়াসা একটু নড়লেই পলাশ উঠে বসে জানতে চেয়েছে,
-- শরীর খারাপ লাগছে?
 পরদিন শ্বশুর,স্বামী কেউ আর অফিস যায় না।সারাটা দিন বাপ,ছেলে কেউই তাকে বিছানা ছেড়ে নামতে দেয় না।মাথাটাও পলাশ ধরে নিয়ে গিয়ে বাথরুমে ধুইয়ে নিয়ে আসে।খাবার টেবিলে ভাত গুছিয়ে ঘরে এসে তিয়াসাকে ধরে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসায়।
 তিয়াসা বুঝতে পারে পলাশকে সে যেমন দেখেছিল ঠিক তেমনই সে আছে।সেই তাকে বুঝতে ভুল করেছিল।আসলে মানুষ বিপদে না পড়লে কাছের মানুষগুলিকে ঠিক চিনতে পারে না।মানুষ বিপদে পড়লে কাছের মানুষগুলির ভালো - মন্দ উভয় দিকই জলের মত পরিস্কার হয়ে যায়। তবে এ কথাও মানতেই হবে একটি ছেলে যখন একটি মেয়ের সাথে প্রেম করে তখন পরস্পরকে কাছে পাওয়ার যে অদম্য ইচ্ছা কাজ করে, চার দেওয়ালের মধ্যে তাকে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে পেয়ে যাওয়ার পর সেই ইচ্ছেটা যখন পূরণ হয়ে যায় তখন কিছুটা হলেও তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হয়ে থাকে।আর এটাই বাস্তবতা। কারণ ভালোবাসাটা তখন সহবাসে পরিণত হয় আর দায়িত্ববোধটা ভীষণভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

#মানবী