Wednesday, July 22, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৮)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( পর্ব ৫৮)

  কৌশিকী হন্তদন্ত হয়ে অফিস রুম থেকে বেরিয়ে আসে। তার এই চাকরি জীবনে ছাত্রছাত্রীরা ছাড়া কলেজ চলাকালীন কেউ কখনোই দেখা করতে আসেনি। এসে দেখে নন্দিনী তার জন্য অপেক্ষা করছে।
-- কিরে তুই এই অসময়ে? 
-- তোমার কলেজের সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম একটু দেখা করেই যাই।
-- ভালো করেছিস। অনেকদিন তোকে দেখি না। তা মাসিমা কেমন আছেন এখন?
-- খুব একটা হাঁটাচলা করতে পারেন না। শুয়েই থাকেন। আসলে আমি এদিকে এসেছি মায়ের জন্য একটা হুইল চেয়ার কিনতে। ক'দিন ধরেই ভাবি কিন্তু কিছুতেই সময় করতে পারি না। তাও রিনাদি আছে বলেই আমি কিছুটা সময় পাই। আজ রিনাদির জোরাজুরিতেই বেরিয়ে পড়লাম। বলল " তুমি যাও এদিকটা আমি সামলে নেবো।"

কৌশিকী একটু চিন্তিত মুখে বলল,
-- হুইল চেয়ার? হঠাৎ এতটা খারাপ হয়ে গেল নাকি মাসিমার শরীর?

নন্দিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বলল,
-- বয়স তো হলোই তার ওপর শরীরটাও আর আগের মতো নেই। হাঁটতে গেলেই হাঁপিয়ে যান। ডাক্তারও বলেছে বেশি চাপ না দিতে। তাই ভাবলাম একটা হুইল চেয়ার থাকলে অন্তত একটু রোদে বসাতে পারব, বারান্দায় নিয়ে যেতে পারব - এইসব ভেবেই রিনাদি আর আমি আলোচনা করেই ঠিক করলাম। তাছাড়া স্নান, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা এগুলোও ধরে ধরে করতে হয় তো। রিনাদি সবসময় ব্যস্ত থাকে আমার একার পক্ষে সম্ভব হয় না। পেরে উঠি না আমি। ভয়ও পাই যদি পড়ে যান। তাই এই সিদ্ধান্ত -

কৌশিকীর চোখে যেন হালকা জল চিকচিক করে উঠল।
-- তুই একা এত কিছু সামলাচ্ছিস কীভাবে বল তো?

নন্দিনী মৃদু হেসে বলল,
-- একা কই? রিনাদি তো আছেই আর জানো, মানুষ চাইলে সবই পারে। মন যদি সায় দেয় শরীরের বল তখন কয়েকগুণ বেড়ে যায় গো -

কৌশিকী হঠাৎ যেন কিছু ভাবল।
--চল, আমি আজ তোর সঙ্গে যাই। তুই একা কেন কিনতে যাবি? মনটা খারাপ হয়ে গেলো মাসিমার কথা জেনে।

নন্দিনী একটু অবাক হয়ে বলল,
-- আরে না না, তোমার তো ক্লাস আছে। আমি একাই পারবো দিদি।

--আজ আর ক্লাস নিয়ে ভাবছি না। এতদিন পর তুই এলি, তার ওপর এমন দরকারি কাজ আমি তোর সাথেই যাই । শুধু একটু বলে আসতে হবে অন্য কাউকে ক্লাস নেওয়ার কথা।

নন্দিনী একটু চুপ করে কৌশিকীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
 জানো দিদি, ভদ্রমহিলা ভীষন ভালো মানুষ কিন্তু খুব চাপা স্বভাবের। দু'টো সন্তান যার তার তো এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়। চুপচাপ যখন শুয়ে থাকেন চোখের থেকে অনর্গল জল ঝরে। বুঝতে পারি ওই অশ্রু উনার ছেলেমেয়ের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টের। ছেলেটা সম্পর্কে কিছু বললেও মেয়ে সম্পর্কে একদম চুপ! শুধু বলেন হারিয়ে গেছে। ব্যস তারপরেই উদাস হয়ে যান। আর কোন কিছু বলতে চান না। আমিও বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করি না পাছে কষ্ট দিয়ে ফেলি। তবে আমার কী মনেহয় জানো মেয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু মায়ের সাথে কোন যোগাযোগ নেই।

কৌশিকী চুপচাপ ওর কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ সময় চুপ করেই রইলো। তারপর খুব আস্তে করে বলে,
-- আসলে মানুষের জীবনে এমন কিছু কষ্ট থাকে যা অন্যের সাথে শেয়ার করা যায় না। আজীবন কষ্টটা বুকের ভিতর চেপে বসে থাকে।
 কৌশিকী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

  কলেজের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে কৌশিকী বলল,
-- কোথায় যাবি? কোনো দোকান দেখেছিস?

-- নাগো দিদি , ঠিক করিনি। ভাবছিলাম এখানকার মেডিক্যাল স্টোরগুলো ঘুরে দেখি।

-- তাহলে চল, আমি একটা জায়গা চিনি। ওখানে ভালো জিনিস পাওয়া যায়।

দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। বিকেলের নরম রোদ তাদের গায়ে এসে পড়ছে। রাস্তার ভিড়, গাড়ির শব্দ সব কিছুর মাঝেও তাদের কথোপকথন যেন আলাদা একটা জগত তৈরি করে ফেলল।

হঠাৎ নন্দিনী বলল,
-- জানো দিদি মাঝে মাঝে আমার মনেহয় জীবনটা কেমন যেন বদলে গেল! কোথায় ছিলাম আর আজ কোথায় থাকি। যাদের কোনদিন চিনতাম না, জানতাম না তারাই আজ আমার সবচেয়ে কাছের। সেদিন যদি তুমি আমার পাশে না দাঁড়াতে আজ আমি হয়ত বেঁচেই থাকতাম না। শিয়াল, কুকুরে ছিঁড়ে খেতো।
-- উল্টোপাল্টা কথা একদম বলবি না বলে দিলাম।
-- আগের জন্মে তুমি আমার কী ছিলে দিদি?
 কৌশিকী খুব গম্ভীর হয়ে উত্তর দিলো 
-- আগের জন্মেও আমি তোর দিদি ছিলাম আর এ জন্মেও আমি তোর দিদি।
 বলেই হেসে দিলো
-- আমার জীবনের সবকিছু কেমন বদলে গেলো। খুব পুণ্য করেছিলাম আগের জনমে তাই তোমাকে পেয়েছি।

কৌশিকী একটু থেমে বলল,
-- জীবনের বাঁক তো বদলাতেই থাকে। কিন্তু কিছু সম্পর্ক কখনো বদলায় না। থাক, অনেক হয়েছে এবার চল যে কাজে এসেছি সেই কাজটা করি। আর এসব উল্টোপাল্টা কথা কখনোই মাথাতে আনবি না। তাহলে আমি কিন্তু খুব বকবো তোকে।

নন্দিনী চুপ করে রইল। তার চোখে তখন জল কিন্তু মনে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

হুইল চেয়ার কেনার এই ছোট্ট উদ্দেশ্যই তাদের জীবনের অনেক পুরনো কথা আর নতুন অনুভূতিকে আবার একসাথে বেঁধে দিল।
 হুইল চেয়ার কেনা শেষ হলে কৌশিকী জোর করেই নন্দিনীকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢোকে। কিছু খেয়ে তারা মাসিমার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বিকেল গড়িয়ে তখন প্রায় সন্ধ্যা। নন্দিনী আর কৌশিকী 
হুইল চেয়ার নিয়ে বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। নন্দিনী আস্তে করে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে।
ঘরের ভেতরটা শান্ত। জানলার পাশের খাটে মাসিমা শুয়ে আছেন। রিনাদি চুপচাপ পাশে বসে।
নন্দিনী মৃদু গলায় ডাকে, 
--মা 
কামিনীদেবী ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকান। নন্দিনীকে দেখে তার মুখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে ওঠে। 
--এলি মা? কোথায় গেছিলি? সেই থেকে ভাবছি।
নন্দিনী এগিয়ে গিয়ে তার হাতটা ধরে, 
 --হ্যাঁ মা একটু কাজে বেরিয়েছিল  আর দেখো, তোমার জন্য কী এনেছি।
কৌশিকী একটু  হেসে পড়ে সামনে এগিয়ে হুইল চেয়ারটা দেখায়।
কামিনীদেবী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন, 
 
নন্দিনী হেসে বলে, --
 তোমাকে আর শুধু শুয়ে থাকতে হবে না। এখন থেকে বারান্দায় বসে রোদ পোহাবে, একটু হাওয়া খাবে।
কামিনীদেবীর চোখ ধীরে ধীরে ভিজে ওঠে। 
-- আমার জন্য এত কিছু করিস কেন মা?
নন্দিনী মাথা নেড়ে বলে, 
-- “আমার জন্য” বলছো কেন?  তুমি ভালো থাকলে যে আমিও ভালো থাকবো সেটা জানো না? তোমার কষ্ট হলে আমারও যে কষ্ট হয় মা। 
কৌশিকী চুপচাপ দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখেও জল চলে আসে।
রিনাদি হেসে বলে, 
-- ঠিকই তো বলেছে দিদি। আপনিই তো ওর সব।
নন্দিনী আস্তে করে কামিনীদেবীকে উঠতে সাহায্য করে। কৌশিকী পাশ থেকে ধরে। অনেকদিন পর কামিনীদেবীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে হুইল চেয়ারে বসে।
    চেয়ারটা ধীরে ধীরে জানলার পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। বাইরে তখন সন্ধ্যার হালকা আলো, আকাশে লালচে আভা।
কামিনীদেবী গভীরভাবে বাইরে তাকিয়ে থাকেন। যেন অনেকদিন পর আবার পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখছেন।
-- কতদিন পর এই আকাশটা দেখলাম মা 
নন্দিনী তার কাঁধে হাত রাখে, 
-- এখন থেকে রোজই দেখবে।
কৌশিকী মৃদু হেসে বলে, 
 -- নন্দিনী আর রিনা দু’জন পালা করে নিয়ে আসবে বারান্দায়। মাঝে মাঝে আমিও এসে আপনাকে বাইরে নিয়ে যাবো।
কামিনীদেবী দু’জনের হাত একসাথে ধরে ফেলেন, 
-- তোরা থাকলে আমার আর কিছুই চাই না।
ঘরের ভেতরটা নিঃশব্দ হয়ে যায়। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই ছিল এক গভীর ভালোবাসা, যত্ন আর সম্পর্কের উষ্ণতা।
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো আরও ম্লান হয়ে আসছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে একটা নতুন আলো যেন হঠাৎ করেই জ্বলে উঠলো। 

ক্রমশ 

No comments:

Post a Comment