Thursday, July 16, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৭)

ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৭)

  তাদের কথার মাঝখানেই কামিনীদেবীর রাঁধুনি দু'বাটি পায়েস এনে খাট লাগোয়া একটি টেবিলের উপর রেখে বলল,
-- মাসিমা আজ খুব সকালে উঠে স্নান করে এই পায়েস রাঁধলেন। কতবার বললাম আমি করে দিচ্ছি - না, কিছুতেই কথা শুনলেন না। নিজের হাতেই রান্না করলেন।
কামিনীদেবী রিনার কথা শুনে বলে উঠলেন,
-- এত কথা কেন বলিস রিনা? যা দু'গ্লাস জল নিয়ে আয়।
 রিনা বেরিয়ে যেতেই এক এক করে দু'জনের হাতে পায়েসের বাটি তুলে দিয়ে একটু উদাস হয়ে গেলেন। নন্দিনী জানতে চাইলো ,
-- কী হল মাসিমা? কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন যে!
 কামিনীদেবী মেয়ের বাঁধানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- আমার মেয়েটা আমার হাতের পায়েস খুব ভালো খেতো। মাঝে মাঝেই বলতো মা আজ একটু পায়েস করো।
 নন্দিনী আর কৌশিকী দু'জন দু'জনের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা সময় চুপ করে থাকলো। খানিক পরে কৌশিকী বলে,
-- মাসিমা, আপনার কি ওই একটাই মেয়ে ছিল?
-- না,না আমার একটা ছেলেও আছে। সে দেশের বাইরে থাকে। মেমসাহেব বৌ। আমার নাতি,নাতনিও আছে। তোমাদের মেসোমশাই বেঁচে থাকতে টাকা পাঠাতো আমাদের জন্য। কিন্তু তিনি সে টাকা নিতে অস্বীকার করেন। ছেলে কোনদিন আর দেশে ফিরবে না। তাই তোমাদের মেসোমশাই এর আপত্তি ছেলের টাকা নেওয়ার। তার তো পেনশন আছে। শুধু ছেলেকে বলেছিলেন বছরে একবার করে দেশে আসতে। কিন্তু মেমসাহেব বৌ ছেলেকে হয় মা,বাবা নয়তো তাকে যেকোন একটা দিক বেছে নিতে বলেছিল। সে বৌকেই বেছে নিয়েছে। আর এটাই তো স্বাভাবিক। তাই তিনিও আর কোন যোগাযোগ রাখেননি। মা,বাবা সন্তান মানুষ করে তাদের সুখের জন্য, তাদের ভবিষ্যতও জন্য। বৃদ্ধ বয়সে দেখভালের জন্য। টাকার জন্য নয়। এটা আমার ছেলে কোনদিনও বুঝলো না। সে টাকা পাঠিয়েই দায়িত্ব সারতে চেয়েছিল।
 মাসিমার চোখে জল দেখে কৌশিকী প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলে, 
-- আচ্ছা মাসিমা, আপনার এখানে কতজন মেয়ে আছে? যারা আছে তারা কি সবাই চাকরি করে?
-- সবে বছরদু'য়েক হল শুরু করেছি। একজন নিয়ে নিজেই রান্না করে চালাচ্ছিলাম। সেও এক ইতিহাস। পরে একসময় বলবো। এখন ওই ছয়জনের মত আছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন চাকরি করে আর একজন পড়াশুনা করে। কলেজে পড়ে। তাই তো রান্নার জন্য লোক রাখতে হয়েছে। এখন আর নিজে কিছুই পারি না। হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লাম কিনা।
     
কামিনীদেবীর কথা শেষ হতেই ঘরের মধ্যে একটা ভারী নীরবতা নেমে এল। দূরে কোথাও যেন একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
নন্দিনী ধীরে ধীরে পায়েসের বাটি নামিয়ে রেখে কোমল গলায় বলল,
— আপনি অসুস্থ হওয়ার পর তো খুব কষ্ট হয়েছে নিশ্চয়ই?
কামিনীদেবী হালকা হাসলেন, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ক্লান্তি স্পষ্ট।
— কষ্ট তো ছিলই মা তবে মানুষ একা থাকতে থাকতে কষ্টকেও সঙ্গী করে নিতে শিখে যায়। প্রথম দিকে খুব ভয় পেতাম। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হতো, যদি কিছু হয়ে যায় তখন তো কেউ নেই পাশে। তবে রিনা আমার খুব ভালো মেয়ে। খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে রাতেও ও আমার কাছে থেকে যায়।
কৌশিকী একটু এগিয়ে এসে তার হাতটা আলতো করে ধরে বলল,
— এখন তো আমরা আছি মাসিমা।
এই কথাটা শুনে কামিনীদেবীর চোখ ভিজে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— তোদের যদি আগে পেতাম, তাহলে হয়তো এতটা একা লাগতো না।
ঠিক তখনই রিনা জল নিয়ে ফিরে এল।
— এই নিন মাসিমা, জল।
কামিনীদেবী স্বাভাবিক হয়ে বললেন,
— ওদের দে, তারপর তুইও বস। আজ সবাই মিলে খাই।
রিনা একটু অবাক হয়ে বলল,
— আমি? আমি এখানে বসে খাবো? আমার রাজ্যের কাজ পড়ে আছে। সেগুলো সারতে হবে। 
--যা - গিয়ে আমার আর তোর বাটি দু'টো নিয়ে আয় তো 
হ্যাঁ রে, তুই কি মানুষ না নাকি? তুইও তো আমারই মেয়ে।
 রিনা হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো ওদের দু'জনের পায়েসের বাটি আনতে। খানিক পরে দুইহাতে দু'টো পায়েসের বাটি নিয়ে এসে একটা কামিনীদেবীর দিকে এগিয়ে দিয়ে হেসে মেঝেতে এক কোণে বসে পড়ল।
  নন্দিনী চারদিকে তাকিয়ে দেখল—ঘরটা খুব বড় নয়, কিন্তু অদ্ভুত এক মায়া আছে। দেওয়ালে সাজানো কয়েকটা ছবি, একটা পুরনো অ্যালমারি, আর সেই বাঁধানো ছবিটা—যেটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ আগেই কামিনীদেবী হারিয়ে গিয়েছিলেন।
নন্দিনী ধীরে ধীরে বলল,
— মাসিমা, আমরা কি মাঝে মাঝে এখানে আসতে পারি?
কামিনীদেবী একটু চমকে উঠে তাকালেন,
— কেন রে? শুধু মাঝে মাঝে কেন? ইচ্ছে হলে রোজ আসবি। আমি তো চাই তুই আমার কাছেই থেকে যা। কিন্তু তোর দিদি আর বাড়িতে যাঁরা আছেন তাঁরা কি রাজি হবেন?
কৌশিকী হেসে বলল,
— তাহলে ঠিক রইল, আমরা প্রায়ই আসবো। আর নন্দিনীর এখানে থাকার প্রসঙ্গে মা,বাবার সাথে কথা বলে আপনাকে জানাবো । 
  কামিনীদেবী কিছু বললেন না, শুধু দু’হাত বাড়িয়ে নন্দিনী আর কৌশিকীকে কাছে টেনে নিলেন।
তার চোখের কোণে জমে থাকা জল এবার আর লুকিয়ে থাকলো না।
বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে। জানালার পর্দা দুলছে ধীরে ধীরে—মনে হচ্ছে যেন নতুন করে এই বাড়ির নিঃসঙ্গতা একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে।
 প্রায় ঘণ্টা দু'য়েক  সময় কাটিয়ে নন্দিনী ও কৌশিকী ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লো। কৌশিকী ওই পথেই কলেজে চলে যায় আর নন্দিনী বাড়িতে অর্থাৎ কৌশিকীদের বাড়িতে চলে আসে।
  ফোনে কামিনীদেবীর সাথে রোজই কথা হয় নন্দিনীর। রোজই তিনি ওদের যাওয়ার জন্য ছেলেমানুষের মত বায়না করতে থাকেন। 
 দিন এইভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু একদিন ভোর বেলায় কামিনীদেবীর রান্নার মেয়েটি ফোন করে নন্দিনীকে জানায় কামিনীদেবী সকালে বাথরুমে যেতে গিয়ে পড়ে গেছেন। খুব চোট পেয়েছেন। সকলে ধরাধরি করে কোনরকমে খাটে এনে শুইয়ে দিয়েছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। মনেহচ্ছে হাসপাতাল নিতে হবে। নন্দিনী ফোন পেয়ে সেই অবস্থাতেই বেরিয়ে আসে। সেদিন কৌশিকির আসবার কোন উপায় ছিল না। নন্দিনী বেরোনোর সময় কৌশিকী বেশ কিছু টাকা ওর হাতে জোর করেই দিয়ে দেয়।
 নন্দিনী এসে বুঝতে পারে কোমরের হাড় ভেঙে গেছে সম্ভবত। তাই তিনি এত কষ্ট পাচ্ছেন। সে এম্বুলেন্স ডেকে তাঁকে হাসপাতাল নিয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ওই অবস্থাতেও তিনি নন্দিনীর হাতে তার আলমারির চাবি দিয়ে বলেন,
-- আলমারি খুলে দেখ মা সামনেই একটা বাক্স আছে। ওর মধ্যে টাকা আছে। বেশ কিছু টাকা সাথে করে নিয়ে চল। আর এই আলমারির চাবিটা তোর কাছেই থাক। মেয়েগুলো আছে। এদিকটা তুই সামলে নিস। বাজার ঘাট যা করতে হবে রিনা লোক দিয়ে করে নেয়। শুধু তুই টাকাটা বের করে দিস।
 নন্দিনী অবাক হয়ে কামিনীদেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কামিনীদেবী বুঝতে পারেন নন্দিনী কী ভাবছে। যন্ত্রণায় তখন তিনি কাতর। তারই মাঝে আস্তে করে নিজের ডানহাতটি নন্দিনীর মাথার উপর দিয়ে বলেন,
-- মানুষ চিনতে আমার ভুল হয়নি। যদি ফিরে না আসি এসব সামলে এখানেই থেকে যাস 
 নন্দিনী কামিনিদেবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে,
-- কিচ্ছু হবে না তোমার। তুমি ঠিক সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। সে পর্যন্ত আমি সবকিছু সামলে নেবো। তুমি কিচ্ছু ভেবো না।
 এম্বুলেন্স এসে যায়। নন্দিনী ঠিক যা ভেবেছিল তাই হয়েছে। কোমরের হাড় সরে গেছে। ডাক্তার এ বয়সে অপারেশনের ঝুঁকি নেবেন না। মাসখানেক ট্রাকসন দিয়ে রাখলেন হাসপাতালে। তারপর বাড়িতে এনে স্নান, বাথরুম, খাওয়া ছাড়া বাকি সময় ওই ট্রাকসন দিয়ে ছ'মাস চললো। নন্দিনী আর ফিরে আসতে পারেনি কৌশিকীদের বাড়িতে। এই ক'টা মাসে কামিনীদেবী মাসিমা থেকে কবে যে নন্দিনীর মা হয়ে উঠেছেন তা বোধকরি নন্দিনী নিজেও মনে করতে পারবে না। 

ক্রমশ 

No comments:

Post a Comment