Tuesday, November 23, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (চব্বিশ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (চব্বিশ পর্ব)
  ছন্দা আর তার দেড় বছরের ছোট ভাই একই ক্লাসে ভর্তি হল।ছন্দা তার ভাইকে আগলে রাখে এই বয়সেই মায়ের মত।একদিন অসাবধানতাবশত ভাই তার স্কুলের খোলা ছাদে উঠে গেলো।বাড়িতে যখন সবাই এ খবর জানলো তখন গ্রামের বাড়ি থেকে বাঁশ কেটে এনে পুরো স্কুল ছাদ ব্যারিকেড করা হল।
  গ্রামের বাড়ির প্রচুর সম্পত্তি আর ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখভালের অভাবে তাই ঠিক হল ছেলেকে নিয়ে (সাথে দুই মেয়েও - ইরা এবং স্বপ্না কারণ ওদের চাকরি করতে ওখান থেকেই সুবিধা হয়)শান্তিদেবী গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন।ছন্দা নিজেই যেতে চাইলো না কারণ গ্রামের বাড়িতে তখন ইলেকট্রিক ছিলো না।হ্যারিকেনের আলোতে পড়তে হত।আর বর্ষাকালে মাটির রাস্তায় কাদা পায়ে স্কুলে যেতে হত যা ছন্দার একদমই পছন্দ নয়।তাই সে শহরেই থেকে গেলো। শান্তিদেবী পুনরায় ছেলে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান।
  ক্লাস ওয়ান থেকে প্রথম হয়ে ক্লাসে উঠলো ছন্দা। ঝড়,জল কোনকিছুতেই ছন্দা স্কুল বন্ধ করে না।প্রতিদিন সে যেভাবেই হোক স্কুলে উপস্থিত হবেই।বছরে দুটো পুরস্কার তার বাঁধা।একটা হল ক্লাসে প্রথম হওয়ার কারণে আর একটা হল নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত হওয়ার কারণে।অসুস্থ্য হলেও ছন্দা স্কুল কামাই করবে না।দু তিন বছরের মধ্যেই পুরো স্কুল শুধুই নয় ছোট্ট শহরটাতে সকলেই জেনে গেলো "এই মেয়েটা কোনদিনও স্কুল কামাই করে না"।প্রথমত অমরেশবাবুর ছোট মেয়ে আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে পুরো বছর ধরে স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতি আর মেধাবী হওয়ার কারণ।
 সেই ক্লাস ওয়ান থেকেই প্রতিটা ক্লাসে সেই হচ্ছে মনিট্রেস।ক্লাসমেটরাও সকলেই তাকে খুব ভালোবাসে আর তার কথাও শোনে।সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপার যেটা সেটা হল সকলেই তার টিফিন ছন্দাকে দিয়েই খেত।তখন ছন্দার পরিস্থিতিটা ছিল এরূপ নিজের জন্য কোন টিফিন সে আনলে সেটা আর তার খাওয়া হত না।তাই সে সব সময়ের জন্যই বাড়ি থেকে টাকা (সে সময়ে পঞ্চাশ পয়সা হলেও বাদাম বা অন্যকিছু হয়ে যেত)নিয়েই আসতো।তাই দিয়ে কিছু কিনে সকলকেই ভাগ করে দিত।বাড়ি থেকে স্কুল খুব একটা দূরত্ব না হলেও রাস্তাটা খুব কম ছিল না।কেউ কেউ আবার ছন্দার সাথে একসাথেই যাবে বলে অনেক আগেই তার বাড়ি চলে আসতো।
 নবম শ্রেণী।সুনীল নামে একটি ছেলে ছন্দার পিছনে খুব লাগতো।কিন্তু ছন্দা এসব মোটেই পছন্দ করতো না।সে বেশ কয়েকবার তাকে নিষেধ করেছে।কিন্তু কিছুতেই ছেলেটি তার কথা শুনতো না।এমন কি ছন্দা যখন সন্ধ্যায় স্যারের কাছে পড়তে যেত তখন সে সাইকেল নিয়ে তার পিছু পিছু চলত।একদিন খুব মাথা গরম হয়ে যায় তার।পড়তে যাওয়ার আগেই সে সটান চলে যায় সুনীলের বাড়ি।রীতিমত সুনীলের মাকে গিয়ে শাসিয়ে আসে সুনীলকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য।সুনীল যদি ভবিৎসতে আর তাকে বিরক্ত করে তাহলে সে স্কুলে হেডমাস্টারকে তো জানাবেই উপরন্তু সে তার বাবুকেও বলবে।
 সেদিন সুনীলের মা ছন্দার কথা শুনে হা করে মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।হয়ত তিনি মনেমনে ভেবেছিলেন মেয়েদের গার্জিয়ানরা আসে তাদের মেয়েদের বিরক্ত করলে সেই ছেলের বাড়িতে।আর এ তো দেখছি সম্পূর্ণ উল্টো ব্যাপার। এ মেয়ে তো সাংঘাতিক।ভদ্রমহিলা ছন্দার কোন কথার উত্তর দিয়েছিলেন না ঠিকই কিন্তু বয়াম থেকে নারকেল নাড়ু বের করে দিয়ে বলেছিলেন,
--- আমি তোমায় কথা দিচ্ছি আর কোনদিন সুনীল তোমায় বিরক্ত করবে না।কিন্তু মা এইভাবে তুমি কত ছেলের বাবা,মায়ের কাছে যাবে?তুমি দেখতে সুন্দর,পড়াশুনায় ভালো।ছেলেরা তো তোমার পিছনে পিছনে ঘুরঘুর করবেই।তবে তোমার এই সাহসকে আমি সম্মান জানিয়েই বলছি - সব ছেলেরা যেমন ভালো হয় না,ঠিক তেমনি তাদের সব গার্জিয়ানরাও কিন্তু ভালো হয় না।তাই নিজে একটু সতর্ক হয়ে রাস্তায় চলাফেরা কোরো।
 না এরপর সুনীল কোনদিন ছন্দাকে বিরক্ত করেনি।সে বছর ফাইনাল পরীক্ষার পর সুনীল অন্য স্কুলে ভর্তি হয়েছিল।পরবর্তীতে সুনীলের সাথে রাস্তায় বহুবার ছন্দার দেখা হয়েছে।সুনীল তাকে প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে।সুনীলের প্রতি ছন্দার কোন অনুরাগ না জন্মালেও হঠাৎ রাস্তায় দেখে যখন সুনীল তাকে এড়িয়ে যেত তখন ছন্দার ভিতর অদ্ভুত একটা অপরাধবোধ কাজ করতো কেন সেটা করতো তা ছন্দা কোনদিনও বুঝতে পারেনি।
যারা যে বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থাকতো তাদের হাতেই থাকতো সে বছরের স্বরসতী পুজোর সব দায়িত্ব।এমনকি স্কুলে স্কুলে গিয়ে নিমন্ত্রণের দায়িত্বও থাকতো।সুনীল যে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল সেখান থেকে যারা এসেছিল ছন্দার স্কুলে নিমন্ত্রণ করতে তাদের মধ্যে কিন্তু সুনীলও ছিল।কিন্তু সুনীল স্কুলের মধ্যে না ঢুকে বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল।আর ঠিক সেই মুহূর্তে ছন্দা তার বান্ধবীদের সাথে কাছেই এক স্কুলে নিমন্ত্রণ করে যখন ফিরছে তখন স্কুল গেটের কাছেই সুনীলের সাথে দেখা।ছন্দা ইচ্ছা করেই চলার গতিটা একটু শ্লথ করে যাতে তার বন্ধুরা আগে এগিয়ে যায়।বন্ধুরা এগিয়ে গেলে ছন্দা সুনীলের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে,
--- কি এমন করেছি যে তুমি একেবারে এই স্কুলই ছেড়ে দিলে?(তখনকার দিনে কোএডে পড়া অনেক ছেলেমেয়েরা একে অপরকে প্রথম অবস্থায় তুমি বলেই কথা বলতো।তারপর আস্তে আস্তে তুই তে আসতো।সব ক্ষেত্রে যে এটা হত তা কিন্তু নয়)
--- আমিও তো এমন কিছুই করেছিলাম না।কিন্তু তুমি তো আমার বাড়িতেই পৌঁছে গেলে আমায় শায়েস্তা করতে।পুলিশ যখন চোরকে মারে কোনদিন দেখেছো?আমার বাবা আমায় ঠিক চোরের মার মেরেছেন।আমি তো কোনদিন তোমায় কোন অসম্মান করিনি।শুধু তুমি যেখানে যেতে তোমার পিছন পিছন যেতাম।কোনদিন জানতে চেয়েছো কেন যেতাম?
--- কেন যেতে?
--- আজ আর সে কথা বলে কোন লাভ নেই।আর আমি সেকথা বলবোও না আর।তবে তোমার কথা আমার সারাজীবন মনে থাকবে।
 ছন্দা কি বুঝলো সেই জানে।সে আর কোন কথা না বলে স্কুলের মধ্যে ঢুকে গেলো।এরপর সুনীলের বাবা বদলী হয়ে যাওয়াতে সুনীলরা যে কোথায় চলে গেলো তা সুনীলের অনেক বন্ধুরাই জানে না আর ছন্দা তো কোন ছার!কিন্তু আজও ছন্দা যখন একা থাকে তখন বসে ভাবে তবে কি ওই বয়সেই সুনীল তাকে ভালোবাসতো?
 ছন্দার পড়াশুনার জীবনে কোন কিছুর জন্য তার ক্যারিয়ারের ক্ষতি হবে মনে করলেই সে কিন্তু অবলীলায় সেই সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারতো।তারজন্য যতটা কঠোর হতে হয় সে হত।হয়ত বিধাতা পুরুষ তার এই কঠোরতা দেখে অলক্ষ্যেই হেসেছিলেন।তাই হয়ত পরবর্তীতে ছন্দার জীবনে সবকিছু থাকার পরেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বলতে যা বোঝায় সেইখানে সে কোনদিনও পৌঁছাতে পারেনি।বিধাতা তার ভিতর সবকিছু দিয়েও হঠাৎ করেই যেন সেই সবকিছুই তার জীবন থেকে কেড়ে নিলেন।

ক্রমশঃ 

Monday, November 22, 2021

বড্ড ভালোবাসি

বড্ড ভালোবাসি
" মানুষটা যে এভাবে বদলে যাবে চিন্তাও করে উঠতে পারিনি - সবই ঠিক ছিল।কি যে হঠাৎ করে ওর হল কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না সেই মুহূর্তে।"
  প্রথম দেখাতেই প্রেম।কালিম্পং বেড়াতে গিয়ে রাতুল আর রণিতার প্রথম দেখা।রণিতারা পাঁচ বন্ধু মিলে কালিম্পং ঘুরতে গেছিলো।সবাই স্কুল শিক্ষিকা।আর এদিকে রাতুল তার বাবা,মায়ের সাথে গেছে।এখন কোথাও ঘুরতে যাওয়া মানেই তো শুধু ছবি তোলা।পাঁচ বন্ধু মিলে অনেক সেলফি তোলা হলেও একসময় রণিতা অপরিচিত রাতুলকে দেখে বলে,
-- কাইন্ডলি আমাদের একটা ছবি তুলে দেবেন?
--- ও সিওর।
 গলায় ঝুলানো ডিএসএলআর টা রেডি করতেই রণিতা বলে ওঠে,
__না,না আমার মোবাইলে তুলে দিন।
 রাতুল হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নেয়।বেশ কয়েকটা ছবি তুলে দেয় রণিতাদের 
 নিজের ক্যামেরায় ওদের কিছু ছবি তুলতে চায়।রণিতা আপত্তি জানালেও অন্য বন্ধুরা সম্মতি জানায়।ফলে রণিতাকে রাজি হতেই হয়।হোটেলে ফিরে ওদের ছবিগুলি পাঠিয়ে দেবে বলে রণিতার কাছ থেকে ফোন নম্বরটা চেয়ে নেয়।অনিচ্ছা সত্বেও দিতে বাধ্য হয় সে কারণ রাতুল তার কাছেই নম্বরটা চায়।
 সেদিন রণিতার সব বন্ধুরা তার খুব পিছনে লেগেছিলো।ওদের দুজনের নামের মিল দেখে।রণিতারও প্রথম দেখাতেই রাতুলকে খুব ভালো লেগেছিলো।সেই শুরু।
 কাছাকাছি আসতে খুব একটা বেশি সময় নেয়নি দুজনেই।রাতুল ব্যবসায়ী।ছবি তোলা তার নেশা।নানান জায়গায় ঘুরতে যায়।কখনো একা আবার কখনো বা বাবা,মাকে সঙ্গে করেই।নানান জায়গায় তার ছবি পুরস্কৃত হয়।
 দুই বাড়ির সম্মতিক্রমে ছ'মাসের মধ্যেই ওরা বিয়ে করে।বিয়ের পরেই প্রথম ট্যুর আবার সেই কালিম্পং।পনেরটা দিন ওদের যেন ঘোরের মধ্যেই কেটে গেলো 
 শ্বশুর,শ্বাশুড়ী রণিতাকে নিজেদের মেয়ের মতোই ভালোবাসেন।কিন্তু রাতুলের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দিল এক বছরের মাথায় রণিতার এক বন্ধুকে কেন্দ্র করে।ছেলেবেলায় একই পাড়ায় থাকতো।এখন সেই বন্ধু শাহীন আমেরিকা থাকে।ফেসবুকের সৌজন্যে পুনরায় নূতন করে আবার দুজনের পরিচয়। লাঞ্চ টেবিলে সকলের সামনে বসেই রণিতা হাসতে হাসতে শাহীনের গল্প করছিলো।রণিতা ছেলেবেলার বন্ধুকে খুঁজে পেয়ে খুবই এক্সসাইটেড ছিল তা তার গল্প বলার ধরণেই সকলে বুঝতে পারছিল।হঠাৎ রাতুল প্রশ্ন করে,
--- নাম শুনে তো বোঝার উপায় নেই ছেলে না মেয়ে বন্ধু।
 রাতুলের কথা বলার ধরনে খেতে খেতে সকলেই তার মুখের দিকে তাকায়।ছেলের কথা শুনে তার বাবা বলে ওঠেন,
--- সে যে ওর বন্ধু এটাই যথেষ্ঠ নয় কি?সে ছেলে না মেয়ে তা জানার দরকার আছে কি?বন্ধু তো বন্ধুই হয়।সেখানে ছেলেমেয়ে,ছোট-বড়,বয়সের পার্থক্য কোনটাই ম্যাটার করে না।
 কোন কথা না বলে রাতুল খাওয়া শেষের আগেই উঠে চলে যায়।রণিতা সব কাজ সেরে ঘরে ঢুকে দেখে রাতুল ঘুমিয়েই পড়েছে।যা বিয়ের পর এই প্রথম ঘটলো।বিয়ের পর থেকেই ছুটির দিনে দুপুরে খেয়েদেয়ে দুজনে প্লান করতে বসে সন্ধ্যায় তারা কোথায় ঘুরতে যাবে।রণিতা ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত রাতুলকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে,
--- বাব্বা আমার ছেলেবেলার বন্ধুর কথা শুনে এত্ত রাগ হয়েছে?
 এরপর থেকেই রাতুলের মধ্যে পরিবর্তন আসতে থাকে।রাতুল যখনই দেখেছে রণিতা ফোন নিয়ে খুটখুট করছে তখনই রাতুলের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে
--- কি শাহীনের সাথে কথা হচ্ছে?
 অনেক বুঝিয়েছে রণিতা রাতুলকে।কিন্তু দিনকে দিন নানান কারণে রাতুল তাকে অপমান করতে থাকে।শেষে রণিতা একদিন রাতুলকে বলে,
--- আসলে তুমি একজন সাইকো পেসেন্ট।ডাক্তার দেখানো উচিত তোমার।
 সুখের সংসারে যখন তখন যেন আগুন জ্বলে ওঠে।রাতুলের মধ্যে এই পরিবর্তন তার বাবা,মাও মেনে নিতে পারে না।শ্বশুর,শ্বাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে আরও দুটি বছর কেটে যায় মাঝিহীন নৌকার মত।রাতুল ডাক্তারও দেখাবে না, বুঝালেও বুঝবে না।
 সহকর্মী সুস্মিতার সাথে গল্প প্রসঙ্গে রণিতা বলে,
--- ওর কাছ থেকে চলে এসেছি ঠিকই কিন্তু ওর বাবা,মায়ের সাথে আমার যোগাযোগ রয়েছে।ওকে আমি ডিভোর্স দিইনি; দেবোও না কোনদিন আর ও নিজেও চায়নি।ওর বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রেখে ওকে কাউন্সিলিং করিয়েছি।ট্রিটমেন্ট চলছে।ওর বাবা,মা সব জানেন।কিন্তু রাতুল জানে না এগুলো আমিই করাচ্ছি।একদিন ও পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠবে।আর সেদিন ও ওর নিজের ভুল বুঝতেও পারবে।আর সেদিনই ও ছুটে আসবে আমার কাছে।আমি যে ওকে বড্ড ভালোবাসি।



    

Sunday, November 21, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে(তেইশ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (তেইশ পর্ব)
  অমরেশবাবুর ষষ্ঠ মেয়েটির জন্মের পর তাঁর একটি পুত্র সন্তান হয়েছিল।একবার গ্রামের এক কালী পুজোয় তাকে কোলে করে শান্তিদেবী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর কোল থেকেই হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে সে অন্য এক ভদ্রমহিলার কোলে 'মা' বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।সেই থেকে ওই ভদ্রমহিলা রায় চৌধুরী পরিবারে সব সন্তানদের মা হয়ে ওঠেন।সকলেই তাকে মা বলেই ডাকতো।গরীব ঘরের মানুষ ছিলেন মহিলা।বিপদে,আপদে যেকোন সময় রায় চৌধুরী বাড়িকে সে পাশে পেয়েছে।আবার রায় চৌধুরী পরিবারে যে কোন দুর্যোগের সময় তিনি ছুটে এসেছেন।পাশে থেকে নানান কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।(সেই সন্তানটি যে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় মারা গেছিল আমি আগেই তা উল্লেখ করেছি)
 গ্রামের এই কালী পুজোকে ঘিরে নানান কথা সেই সময় লোকের মুখে মুখে ঘুরতো।এই পুজো হত এবং আজও হয়ে চলেছে জৈষ্ঠ মাসের এক অমাবস্যায়।এই পুজোর নাম সদের গাছতলার পুজো।একমাস ধরে বাড়ি বাড়ি কুলো নিয়ে শাক উলুধ্বনি সহকারে চাল,ডাল,টাকা ভিক্ষা করে বেড়ানো হয়।কথিত আছে এই রায় চৌধুরী বাড়ির কোন এক পূর্বপুরুষ একসময় রাস্তা দিয়ে যখন হেঁটে আসছিলেন তখন তিনি দেখেছিলেন একজন বৃদ্ধা মলিন বস্ত্র পরে ওই রাস্তার উপর এমনভাবে শুয়ে আছেন যে যিনি আসছিলেন তাকে আসতে গেলে উনাকে টপকে আসতে হয়।তিনি ভদ্রমহিলাকে বলেন,
--- মা তুমি এইভাবে রাস্তার উপর পড়ে আছো কেন?
--- ছেলেমেয়েরা যে আমায় দেখে না বাবা।তাই যেখানে সেখানে পড়ে থাকি।
--- আমায় বল কোথায় থাকে তোমার ছেলেমেয়েরা।আমি ওদের বুঝিয়ে বলবো।
--- বলবো বাবা।
 সেদিনই রাতে ওই ভদ্রলোক স্বপ্নে দেখেন স্বয়ং মা কালী তাকে বলছেন তার থাকার আস্তানা করে দিতে।এবং তিনিই জানিয়ে দেন তাঁর পুজো কিভাবে হবে। জায়গাও ঠিক করা হয় মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়েই।উপরে খড়ের ছাউনি এবং বাঁশের বেড়া দিয়ে মন্দির তৈরি করা হয়।তারপর মায়ের মূর্তি তৈরি করা হয়।এদিকে কুলো নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি খালি পায়ে হেঁটে ভিক্ষে করে বেড়ানো হচ্ছে।হঠাৎ এক মুসলিম পরিবার থেকে কিছু লোক ওই মায়ের মূর্তি দেখতে আসে।তারা মায়ের মূর্তি দেখে নাক সিঁটকে অবজ্ঞাভরে বলে,
-- এমা!হিন্দুদের এই মূর্তির মুখটা কি বিচ্ছিরি দেখতে!দেখে মনেহচ্ছে এর সারা গায়ে পক্স হয়েছে।
পড়ে  তারা বাড়ি ফিরে যায়।কিন্তু সেদিন রাতেই তাদের বাড়ির প্রতিটা সদস্যের গায়ে প্রবল ব্যথা নিয়ে জ্বর আসে আর সকলের গায়ে মুখে এমনভাবে পক্স হয় যে তারা হা করে খাবার খাওয়ার মত অবস্থায় থাকে না।প্রথমদিন কেন এরূপ হল বুঝতে না পারলেও আস্তে আস্তে তাদের বোধগম্য হল যে কালী মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলার ফল এটা।
  তারা ছুটে আসে ওই মন্দিরে যে পুরোহিত পুজো করবেন বলে স্থির করা হয়েছে তার কাছে।তিনি আদ্যোপান্ত বিবরণ শুনে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে বলেন।তারা পুরোহিতের কথামত সে কাজ করেও।কিন্তু সেদিন রাতে ওই মুসলিম পরিবারের গৃহকর্তা স্বপ্ন দেখেন মাকালী তাকে বলছেন,
--- এই মন্দিরে যতদিন পুজো হবে বংশপরম্পরায় তোদের বাড়ি থেকে চাল যাবে ওই কুলোয় একমাসের শেষ দিনে।ওই চাল দিয়েই আমার পুজো সম্পন্ন হবে।
 সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি অনুভব করেন তার শরীরে ব্যথা কম।ওই অবস্থায় তিনি ছুটে যান রায় চৌধুরী বাড়িতে।সেখানে পৌঁছে সবিস্তারে সব বর্ণনা করেন।সেদিনই ছিল কুলো নিয়ে ভিক্ষে করার শেষ দিন।ওই বাড়ি থেকে চাল নিয়ে সোজা সকলে আজও চলে যায় মায়ের মন্দিরে।আজও ওই মুসলিম পরিবারের দেওয়া চালের সাথে অন্য চাল মিশিয়ে মায়ের ভোগ রান্না করা হয়।যুগের পরিবর্তন হয়েছে,পরিবারের সদস্য পরিবর্তন হয়ে চলেছে কিন্তু সদের বটতলার পুজোয় ওই মুসলিম পরিবারের ভিক্ষে দেওয়া চালে মায়ের ভোগ আজও নিবেদন করা হয়।বহু বহু বছর আগে যে রীতি চালু হয়েছে;আজকের যুগে দাঁড়িয়ে হিন্দু,মুসলমানের মধ্যে যে দাঙ্গার ফলে হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে কিন্তু পিলজঙ্গ গ্রামের সেই রীতি আজও চালু রয়েছে।ওই পরিবারের আজও কেউ সাহস পায়না এই রীতি ভাঙ্গার।
 পূর্ব বাংলায় রায় চৌধুরী পরিবারে আজ আর কেউ থাকে না ঠিকই।কিন্তু তারা তাদের এ কাজ অর্পণ করে এসেছে অন্য এক ব্রাহ্মণ পরিবারে।তারা আজও একইভাবে একই নিয়ম মেনে এই পুজো করে থাকে।নেই সেখানে কোন হিন্দু,মুসলিম দাঙ্গা।সবাই সবার বিপদে আজও সেই পূর্বের মতই ঝাঁপিয়ে পড়ে।
  একবার পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই এক বাড়ি কি দুই বাড়ি চাল এনে রাখা হত।পুজোর দিনে অর্থাৎ একমাসের শেষদিনে ওই মুসলিম পরিবার থেকে চাল না এনেই কুলো নিয়ে সোজা মায়ের মন্দিরে চলে যাওয়া হয়। তারও কারণ ছিল।ওই পরিবারটি ছিল গ্রামের শেষ প্রান্তে।মাটির রাস্তা।কয়েকটা দিন সমানে ঝড় জল হওয়ায় ইচ্ছা করে বা গাফিলতি করেই হোকনা কেন তারা আর ভিক্ষা আনতে যায় না।কিন্তু সেদিনই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা।যতবারই মাটির উনুনে মায়ের ভোগ চাপানো হয় ততবারই উনুন নিভে তো যায়ই উপরন্তু উনুনের একপাশ ধসে যায়।আবার তা সারিয়ে যখন ভোগ চাপানো হয় তখন সেই একই কান্ড।সকলের মাথায় হাত!কেউই কিছুই বুঝতে পারে না।পুরোহিত সব দেখে ও শুনে বুঝলেন কিছু একটা অনিয়ম হয়েছে।তিনি এই পুজোর ব্যাপারে যারাই ইনভলব সকলের কাছে একে একে জেনে নিয়ে আসল সত্য উদঘাটন করতে পারলেন।সঙ্গে সঙ্গে আবার কুলো নিয়ে মহিলারা ছুটলো জলকাদা ভেঙ্গে ওই মুসলিম পরিবার থেকে চাল আনার জন্য।সেখানে গিয়ে তারা দেখে সেই সময়ের ওই বাড়ির গৃহকর্তা চাল আরো অনেক সামগ্রী নিয়ে বারান্দায় বসে আছেন পুজোয় সেগুলি দেবেন বলে।সাথে সেবারের পুজোয় দরিদ্র ভোজন করার জন্য একবস্তা চাল।তারা সেসব নিয়ে মন্দিরে ফিরে আসে।এর পরেই তারা নির্বিঘ্নে পুজো সম্পাদন করতে পারে।
 পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা আছে। যার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মেলে না।আগেকার দিনে ঠাকুর দেবতা নিয়ে এমন অনেক ঘটনা আমরা জানি বা শুনি যা আজকের যুগে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করতে হয়ত অনেকেরই মন সায় দেবে না।কিন্তু একথা অবিশ্বাস করার কোন উপায়ই নেই যে সুপ্রিম পাওয়ার বলে কিছু তো একটা আছেই।রামকৃষ্ণ,ব্যমাক্ষ্যাপা প্রমূখ- ছিলেন মানুষ। তাঁদের সাথে কিন্তু সুপ্রীম পাওয়ার ক্ষমতাধারীর সাথে দেখা হয়েছিল।সুতরাং যুগ যুগ ধরে প্রচলিত সেই সব ঘটনা অস্বীকার করবার কোন উপায়ই কিন্তু নেই।
 আজ আমরা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এমন অনেক ঘটনায় জানতে পারি যা আমাদের কাছে যুগ যুগ ধরে গল্পের আকারে এসেছে।বিজ্ঞানের এত উন্নতির ফলে এই শোনা গল্পগুলি যে সত্যি তা স্বীকার করতেই হবে।উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকানগরী।প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা জানতে পারছি সমুদ্রগর্ভে আজও সেই নগরীর অস্তিত্ব।

ক্রমশঃ 

Saturday, November 20, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (বাইশ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (বাইশ পর্ব)
  অমরেশবাবুর মেয়েরা বড় হওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে তিনি অন্দর মহলের সমস্ত ব্যাপার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।কারণ তিনি বুঝতে পারেন তিনি তার মেয়েদের যেভাবে বড় করেছেন তাতে করে ছোটখাটো কোন সমস্যা হলে সেই সমস্যাগুলি মোকাবেলা করার ক্ষমতা তারা করায়ত্ত করেছে।যদি কোন বিষয়ে তারা মনে করতো তাদের বাবুর উপদেশের দরকার তখন তারা সেই বিষয়ে বাবুর সাথে আলোচনা করে নিত।
 গৃহ শিক্ষক সুশান্ত পালের কথানুযায়ী তারা তাদের ছোট বোনকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করার জন্য নিজেদের মধ্যে আলোচনাকালে ছন্দা সেখানে উপস্থিত হয়ে ছলছল চোখে তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।( এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি।তখনকার দিনে একবারেই ক্লাস ওয়ানে বা টু তে ভর্তি হওয়া যেত।তারজন্য কোন বার্থ সার্টিফিকেটেরও কোন দরকার পড়তো না কারণ তখন বাড়িতেই অধিকাংশ শিশুই জন্ম নিত একজন ধাত্রীর তত্ত্বাবধানে) আবার ভর্তির জন্য কোন পরীক্ষাও দিতে হত না।বড়জোর মাস্টার মশাই জিজ্ঞাসা করতেন "তুমি পারবে তো।"ছোট ছোট শহরগুলিতে কোন সমস্যায় হত না।তাদের দাদা (অর্থাৎ মালতী যাকে তার ছোট সব বোনরাই দাদা বলতো আগেই বলেছি) তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কোলে উঠিয়ে নিয়ে আদর করে জানতে চায়,
--- তোমার চোখে জল কেন?তোমার আনন্দ হচ্ছে না স্কুলে ভর্তি হবে বলে?
 ছন্দা পিছন ঘুরে তার দাদার গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
--- আমি টু তে ভর্তি হবো না।
--- কেন টু তে ভর্তি হবে না?তুমি তো সব পারো। মাষ্টারমশাই বলেছেন তোমাকে টু তে ভর্তি করলেও তুমি ফাষ্ট হবে।
--- আর ভাই?ও তো ছোট।ওকে কে দেখবে?ও তো ওয়ানে ভর্তি হবে।আমি তো ভায়ের সাথে থাকবো না;তখন যদি ভাইকে কেউ মারে কে দেখবে?ওর তো কষ্ট হবে।
 ছন্দাকে কেউই রাজি করাতে পারে না ক্লাস টু তে ভর্তির জন্য।তার সেই এক গো "আমি ভায়ের সাথেই ভর্তি হবো।তানাহলে ওর কষ্ট হবে।" অগত্যা তাকে টু তে আর ভর্তি করানো গেলো না।দুজনকে নিয়ে গিয়ে একসাথেই ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করা হল।
 ছন্দার জন্মের দেড় বছর পর তার ভায়ের জন্ম হয়।এতগুলো মেয়ের পরে একটা মাত্র ছেলে।স্বভাবতই সকলেই ছেলে বা তাদের ভাইকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতো।ব্যতিক্রম একমাত্র অমরেশবাবু।কিন্তু তিনি কতক্ষন সময় আর বাড়িতে থাকেন?অযত্নে কিন্তু অবহেলায় নয় ছন্দা বড় হতে শুরু করে।এই ছোট বয়সেই সে বেশ সাবলম্বী হয়ে ওঠে।নিজের কাজগুলি সে নিজেই করে।নিজের হাতে ভাত খাওয়া,স্নান করা,স্নান করে এসে নিজের প্যান্ট নিজে মেলা - এইরূপ টুকটাক যাবতীয় কাজ সে নিজেই করে নেয়।ভাইকে নিয়ে যে সবাই মত্ত তাতে কোনদিনও সে কখনোই হিংসাবোধ করেনি।প্রতিটা দিদির কাছে ভাই যেমন প্রাণ ছিল;ওই ছোট্ট ছন্দার কাছেও তার ভাই প্রাণ ছিল।কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো ছন্দার কথা বলতে না পারার বিষয় নিয়ে।দু'বছর বয়সেও ছন্দা কথা বলতে পারেনা।কোন শব্দই সে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারেনা।সবকিছু সে সবাইকেই ইশারায় বোঝায়।তখন সকলে ধরেই নিলো এতগুলো মেয়ের মধ্যে একটি মেয়ে বোবাও হল।কিন্তু কিছু করারও নেই।তখনকার দিনে এইসব ব্যাপারে বাড়ির লোক কেউ খুব একটা মাথা ঘামাত না।আর ঘামিয়েই বা করবে কি?আজ থেকে বেশ কয়েক যুগ আগে চিকিৎসাশাস্ত্রও এত উন্নতির মুখ দেখেনি।তাই ঝাড়া,জলপড়া, মাদুলী,দেবতার স্থানে মানত এইসব করেই চলত।তাকে নিয়ে আকুতু কুতু হয়তো কেউ করতো না কিন্তু তাকে কেউ অবহেলাও করতো না।তবে অধিকাংশ সময় সে তার নিজের মনেই থাকতো।আর যে বিষয়টা তার মধ্যে প্রবলভাবে ছিলো তাহল বড়দের কোন কাজ করতে দেখলে সে সেই কাজ করাটাকে এমনভাবে লক্ষ্য করতো ঐটুকুন বয়সেই পরে সেই কাজগুলি বেশ ভালোভাবেই করতে পারতো।
 তিনবছর বয়স।মুখের থেকে কোন আওয়াজ বের করতেই পারেনা অথচ এই বয়সে সে তার নানান কাজে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে থাকে।ভারতীর প্রচণ্ড জ্বর।বাড়িতে কান্নার রোল ওঠার মত পরিস্থিতি।সেই মুহূর্তে কথা না বলতে পারা ওই ছোট্ট মেয়েটি রান্নাঘরে ঢুকে একটা বাটিতে জল নিয়ে এসে ভারতীর মাথার কাছে বসে শান্তিদেবীর আঁচল ভিজিয়ে তার সেজদির কপালে জলপট্টি দেওয়ার চেষ্টা করে।আবার কখনো হয়ত বাড়িতে অতিথি এসেছে সকলে বসে গল্প করছে সে রান্নাঘরে ঢুকে একটা কাপ নিয়ে ইশারায় তার দিদিদের বুঝিয়ে দেয় অতিথিকে চা করে দেওয়ার জন্য।ভাই একপা,দুপা করে হেঁটে বেড়াচ্ছে।ঘরের মেঝেতে জল পড়ে আছে।সে দৌড়ে গিয়ে হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়ে ওই জল মুছতে থাকে।আবার হয়ত অনেক সময় ভাই এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে সে পরে যেতে পারে ছোট্ট মেয়েটি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে এসেছে।এইরূপ অনেক ঘটনা। তখনও কিন্তু তার পুরোপুরি তিন বছর বয়স হয়নি।
 একবার গ্রামের কালী পূজা উপলক্ষে (এই পুজোর বর্ণনা আমি পড়ে দেবো)একজন সাধু গোছের মানুষ আসেন।এই পুজোতে একটা বিশাল অঙ্কের টাকা রায় চৌধুরী পরিবার থেকে যেত শুধু নয় পুজো প্রাঙ্গণে শান্তিদেবীর এক বিশাল ভূমিকা ছিল।
 ছোট্ট মেয়েটির বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে এবং সে কথা বলতে পারে না শুনে সাধু শান্তিদেবীকে বলেন,
--- মা,মেয়েটি তোমার যথেষ্ঠ বুদ্ধিমতী।কিন্তু তোমার কথামত ওর তিনবছর বয়স হতে চললো ওতো এখনো কথা বলতে পারে না।আমি একটা কথা বলি মন দিয়ে শোনো।আর বিশ্বাস নিয়ে কাজটি করো।আমার মনেহয় আগামী পুজোর আগেই ও কথা বলতে পারবে।
--- অনেক মানত,তাবিজ-কবজ করেছি বাবা।কিছুই হয়নি।
--- আমার কথাটা শুনে দেখো।আমার মনেহয় তাতে কাজ দেবে।
--- বলুন বাবা।
--- তুমি যে কোন কালী মন্দিরে একটা চাল কুমড়ো মানত করো ভক্তিভরে।হয়ত আগামী পুজোতে আমার আসা হবে না।কিন্তু আগামী পুজো আসার আগেই তোমার মেয়ের মুখে বুলি ফুটবে।
 সেদিন সেই পুজো প্রাঙ্গণেই দাঁড়িয়ে লোক মারফত গ্রামের কোন এক বাড়ি থেকে চাল কুমড়ো জোগাড় করে শান্তিদেবী মায়ের কাছে তার ছোট মেয়ের মুখের বুলি ফোটার জন্য মানত করেন।অদ্ভুতভাবে পরবর্তী পুজো আসার আগেই ছন্দা কথা বলতে শেখে।
 আমি আগেই বলেছি আমার এই উপন্যাসে কোন ঘটনায় কাল্পনিক নয়।কারণ সমস্ত ঘটনায় অমরেশবাবুর পরিবারকে কেন্দ্র করে।হয়তো পাঠককুল ভাবছেন চাল কুমড়ো মানত করলে যদি বোবা কথা বলতে পারতো তাহলে এই পৃথিবীতে আর কেউ বোবা থাকতো না।"বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর"-।হয়ত মেয়েটি একটু বেশি বয়সে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতে পারতো।অনেকেই দেরিতে কথা বলে।কিন্তু যেহেতু সাধুর কথানুযায়ী কাজটা করার পর সে কথা বলতে পেরেছিলো তাই শুধু ওই পরিবারের লোকজনই নয় গ্রামের মানুষেরাও সাধুর কথাটাকেই প্রাধান্য দিয়েছিল।এখনকার দিনে যুক্তি-তর্ক,বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনেক কিছুই আছে।কিন্তু তখনকার দিনে মানুষ অনেক কিছুই সরল বিশ্বাসে মেনে নিতেন।

ক্রমশঃ
 

Friday, November 19, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (একুশ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (একুশ পর্ব)
  অমরেশবাবুর তখন অনেকটাই বয়স।কিন্তু ডক্টর,উকিল এই ধরনের স্বাধীন প্রফেশনের লোকদের মত তো আর অবসর থাকে না।তিনি নিত্যই অফিস যাতায়াত করেন।বংশানুক্রমিক রোগ অ্যাজমায় জর্জরিত থাকতেন সবসময়।আজ থেকে বেশ কয়েক যুগ আগে ডক্টর সি.সি.করকে দেখিয়ে ইনহেলার নিয়ে চলাচল করতেন।নিজের প্রফেষণকে শেষ বয়স অবধি উচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিত্য তিনি আইনের বই পড়াশুনা করতেন।তার চেম্বারের একটি বড় আলমারি এবং ঘরের একপাশে থাকা আট ফুট বাই চার ফুটের যে বিশাল টেবিল ছিল তার সবটাই জুড়ে যত্রতত্র বইপত্র ঢিপ দিয়ে পরে থাকতো।কিন্তু সেসব যদি তার কোন মেয়ে গুছিয়ে রাখতো তাহলেই তিনি তার প্রয়োজনীয় জিনিসটিই সেদিন খুঁজে পেতেন না।তাই পারতপক্ষে টেবিল এবং আলমারি ঝারপোষ করা হলেও কেউ গুছিয়ে রাখতো না।
 অনেক সময় অনেক কাগজপত্র,দলিল,প্রয়োজনীয় আইনের বই অফিসে থাকাকালীন সময়ে দরকার পড়তো।তিনি লোক পাঠিয়ে দিতেন সেইসব নিতে কিন্তু সাথে থাকতো একটি চিরকুট।সেই চিরকুটে লেখা থাকতো প্রয়োজনীয় কাগজের বিবরণ। এবং নিচুতে তার নাম সই।যেহেতু বহু মানুষের অনেক প্রয়োজনীয় কাগজ থাকতো তাই তিনি বলেই রেখেছিলেন তার মেয়েদের দরকারে কোন লোককে কাগজ নিতে পাঠালে তিনি চিরকুট লিখে নিজের নাম সই করে দেবেন।কারণ প্রতিটা যুগেই দুষ্ট লোকের তো আর অভাব নেই।কেউ যদি অসাধু উপায়ে কোন কাগজ তার কাছ থেকে হাসিল করতে চায় এবং তার বাড়িতে এসে যদি বলে অমরেশবাবু নিজেই ওই কাগজ নিতে পাঠিয়েছেন এবং মেয়েরা যদি তা দিয়ে দেয় তাহলে তার নিজের মাধ্যমে সেই লোকের বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে।তাই কিছু নিতে লোক পাঠালে তিনি সাথে একটি চিঠি লিখে পাঠাতেন।
 আইন সম্পর্কে তিনি এতটাই অভিজ্ঞ ছিলেন হাকিম পরবর্তীতে জজদের সাথে একদম বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক ছিল তাঁর।দিনগুলি ছিল যেহেতু কয়েক যুগ আগে - তখনকার দিনে গুণী মানুষের কদর করতে সকলেই জানতেন।অনেক সময় অমরেশবাবুকে অনেক আইনী দিক জানতে বা কোন বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রধান বিচারক তার আর্দালিকে দিয়ে ডাকিয়ে নিতেন।এইসব মানুষগুলি অমরেশবাবুকে অসীম শ্রদ্ধা ও মান্য করতেন।আর যার ফলে তাঁর সহকর্মীরাও তাকে অন্য চোখে দেখতেন।
 কিছুদিনের জন্য হলেও একটা সময় তার বাড়ি আর কোর্ট এর দূরত্বটা খুব একটা ছিল না।তখন তার ভাড়া বাসা ছিল।হেঁটেই যাতায়াত করা যায়।কিন্তু অমরেশবাবু মোটেই হাঁটাচলা করতে পারতেন না।তিনি রিক্সা করেই যাতায়াত করতেন।এইসময় তার যাতায়াতের রাস্তায় ছিল ছোটখাট এক বাজার।রিক্সাতে বসেই তিনি বাজার করতে শুরু করতেন কোর্ট চত্বর থেকে ফেরার সময়।সাথে ব্যাগ থাকতো না।তিনি ওই রিক্সার পা দানীর কাছে মাছ তরকারি রেখেই রিক্সা করে আসতেন।তখনকার দিনে তো আর ক্যারিব্যাগ ছিল না।বড়জোর কাগজের ঠোঙ্গা।অনেক সময় রিক্সা চালকেরা তাদের গামছাটা এই তরকারি আর মাছ বাঁধার কাজেই লাগিয়ে দিত।ছোট মফরসল শহর হেতু অমরেশবাবুকে চিনতো না এমন মানুষ খুব কম আছে।
 অফিস করে এইভাবেই একদিন বাজার করে পা দানীতে রেখে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরলেন একজন অপরিচিত রিক্সাওয়ালার রিক্সায়।বাড়ি ফিরে তিনি যখন তার মেয়েদের ডেকে বললেন,
--- ব্যাগ নিয়ে গিয়ে রিক্সার উপর থেকে তরকারিগুলো নিয়ে এসো।
 ব্যাগ নিয়ে তাঁর এক মেয়ে দৌড় দিলো তরকারি আনতে।গিয়ে তো অবাক! রিক্সায় যে তরকারি আছে তা তো সে হাতে করেই নিয়ে আসতে পারতো।তাহলে বাবু খামোখা ব্যাগ নিয়ে আসতে বললেন কেন? ঘরে গিয়ে বাবুকে বলল,
--- বাবু মাত্র তো কটা তরকারি।তুমি ব্যাগ নিয়ে যেতে বললে কেন?
--- কেন মা আমি তো অনেক তরকারি কিনেছি।কই দেখি কটা তরকারি তুমি পেয়েছ?
 মেয়ে ব্যাগ খুলে তার বাবুকে দেখালো।তিনি বুঝলেন সব তরকারীই তার রিক্সার ঝাঁকুনিতে রাস্তায় পড়ে গেছে।কারণ আজকের রিক্সা চালক তাঁর অপরিচিত ছিলেন তাই হয়ত সে বুঝে রিক্সা চালাতে পারেনি।
 শান্তিদেবী সব শুনে বললেন,
--- এরজন্য তোমার মেয়েরাই দায়ী।তোমার মেয়েরা তোমায় আদর,যত্ন করে করে এতটাই অলস প্রকৃতির করে দিয়েছে যে রিক্সার পা দানীতে তরকারি কিনে রেখে সেগুলির দিকে একটু তাকিয়েও তুমি দেখো না।তোমার মত অলস মানুষ আমি জীবনেও দেখিনি।এরপর থেকে পকেটে থলে( তখনকার দিনে বাজারের ব্যাগকে থলে বলতো কোন কোন পরিবার)ব্যাগ নিয়ে যাবে।
 শান্তিদেবী যখন তার স্বামীকে কথাগুলো বলছেন তখন বাইরে কে যেন 'বাবু বাবু' বলে ডাকছে।(পরিচিত সকলেই তাকে বাবু বলেই ডাকতেন। একথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি)বাইরে বেরিয়ে দেখা গেলো একজন অপর রিক্সা চালক তার গামছায় পুঁটুলি করে বেঁধে কিছু তরকারি নিয়ে এসে শান্তিদেবীর হাতে দিয়ে বলছে,
--- সমস্ত রাস্তায় তরকারি পরে থাকতে দেখে আমি বুঝতে পেরেছি বাবু কোর্ট থেকে ফেরার পথে নিশ্চয় বাজার করে ফিরছিলেন কিন্তু বাবু তো একটু আত্মভোলা টাইপের মানুষ হয়ত বেখেয়ালেই তার কেনা সমস্ত তরকারি রাস্তায় পড়ে গেছে।
 অমরেশবাবু তাকে ভিতরে ডাকলেন।তরকারিগুলো ছাড়াও তাকে কিছু টাকা দিলেন।তার সাথে দীর্ঘক্ষণ গল্প করে জানলেন তার তিনটি ছেলেমেয়ে।পয়সার অভাবে মেয়ে দুটিকে স্কুলে ভর্তি করতে পারেনি।ছেলেটি স্কুলে পড়ছে।অমরেশবাবু সব শুনে সেই মুহূর্তেই তাকে কথা দিলেন তার ছেলেমেয়ের সমস্ত দায়িত্ব তিনি নিলেন।সে যেন মেয়ে দুটিকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়।ওই রিক্সাচালক তখন ঢিপ হয়ে অমরেশবাবুর পায়ের উপর পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
--- আপনি মানুষ না বাবু আপনি ভগবান।আমি সারাজীবন আপনার গোলাম হয়ে থাকবো।
--- আগে ওদের মানুষ করো।বিয়ে থা দিয়ে সংসারী করো পরে এসব কথা বলার সুযোগ পাবে।ছেলেমেয়েদের জন্য যা যা যখন লাগবে তুমি চলে আসবে তোমার বাবুর কাছে।
 পরবর্তীতে এই রিক্সাচালক তার মেয়েদুটিকে মাধ্যমিক পাশ করিয়ে তারপর বিয়ে দেয়।তারমধ্যে একটি মেয়ে সামান্য একটি চাকরীও পেয়ে যায়।আর ছেলেটি গ্র্যাজুয়েশন করে একটা প্রাইমারী স্কুলে চাকরি পায়।বলা বাহুল্য সবই কিন্তু অমরেশবাবুর সাহায্যার্থে।মেয়েদের বিয়ের সময়ও তিনি প্রচুর সাহায্য করেন।এরপর থেকেই অমরেশবাবুর অফিস যাওয়ার সময় হলেই তিনি রিক্সা নিয়ে হাজির হতেন।যদিও সে পয়সা (ভাড়া ছিল দশ পয়সা) নিতে চাইতো না কিন্তু কোনদিনও অমরেশবাবু ভাড়া না দিয়ে তার রিক্সা থেকে নামতেন না।মেয়েদের বিয়ে দিয়ে তার জামাইদের নিয়ে এসে তার জীবনের ভগবানকে দেখিয়ে গেছে।ছেলের চাকরি হওয়ার আনন্দে খারোই ভর্তি ( খারোই হচ্ছে বাঁশের তৈরি। বাঁশগুলিকে ছোট ছোট করে কেটে তা দিয়ে বুনতে হত।মাছ কেটে পুকুরে ধোঁয়া ও জল থেকে মাছ মেরে রাখার জন্য এগুলি ব্যবহার করা হত।ফাঁকা ফাঁকা থাকতো সেই হেতু এগুলোর মধ্যে জল থাকতো না।)অমরেশবাবুর প্রিয় কৈ মাছ নিয়ে এসে প্রণাম করে গেছে।যতদিন অমরেশবাবু বেঁচে ছিলেন তার সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলেছে। নাতি,নাতনী হলেও তাদের এনে দেখিয়ে যেত।শুধু মুখেই নয় মনেপ্রাণে সে অমরেশবাবুকে ভগবান বলেই মনে করতো।

ক্রমশঃ

ধর্যের ফল হয় মিঠা

ধর্য্যের ফল হয় মিঠা
" সন্তান আমার অথচ তার ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা নাকি আমার নেই!!আমার বাবা,মা আমায় কোন শিক্ষা দিতে পারেননি তাই আমিও নাকি আমার সন্তানকে কোন শিক্ষা দিতে পারবো না।তাই সাহেবের জন্মের পর আতুর উঠে যাওয়ার সাথে সাথেই তাকে আমার ঘর থেকে নিয়ে যাওয়া হল আমার একমাত্র বিধবা নিঃসন্তান ননদের ঘরে।সেখানেই আমার শ্বাশুড়ি এবং ননদ মিলে তাকে দেখাশুনা করে।"
--- এ আবার কি ধরনের কথা!তুই ওকে বুকের দুধ খাওয়াসনি?
--- ওই যখন ও খিদেতে কান্নাকাটি করতো তখন কেউ একজন নিয়ে আমার কাছে আসতো।আমি ওকে দুধ খাওয়ানোর সাথে সাথে কাকের মত ছো মেরে ওকে নিয়ে চলে যেত।আর আমি চোখের জলে ভাসতাম।
--- তোর স্বামী কিছু বলতেন না?
--- না,বলতো না।সে তো মায়ের ভয়ে জবুথবু।একদিন তার মায়ের সাথে অন্য কোন বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কিতে আমার কানে আসলো তার মা তাকে চেঁচিয়ে বলছে,
--- আমার কথার অবাধ্য হলে আমি আমার সবকিছু তোর বোনকে দিয়ে যাবো।ওই তো কটা মাইনে পাস;মাথার উপর ছাদ না থাকলে ঘরভাড়া দিয়ে খাবি কি?ব্যাস আমার বীরপুরুষ স্বামী ফুটো বেলুনের মত চুপসে গেলো।
--- এরূপ করার কারণটা কি তোর শ্বাশুড়ির?
  মা মরা গরীবের মেয়ে রেখার চেহারা দেখে পছন্দ করে বাড়ির ছেলের বউ করে নিয়ে এসেছিলেন সুপ্রিয়াদেবী।বিধবা সুপ্রিয়াদেবীর এক ছেলে ও এক মেয়ে। বাপের বাড়ির একমাত্র মেয়ে হওয়ার ফলে সেখানকার সমস্ত সম্পত্তি আর টাকাপয়সার মালিক বনে যান তিনি।আর এদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চাকরি করা স্বামীর মোটা অঙ্কের পেনশন।মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন মেয়েরই পছন্দ করা ছেলের সাথে।জামাই এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো।পরিবারের একমাত্র রোজগেরে ছেলে হওয়ার কারণে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এ বিয়ে মানতে বাধ্য হয়েছিল।বিয়ের একবছরের মাথায় রমলা প্রেগন্যান্ট হয়।রমলার যখন তিনমাস চলছে তখন জামাই তপন রোড অ্যাকসিডেন্ট করে মারা যায়।শুরু হয় রমলার প্রতি অত্যাচার।এই অত্যাচারের ফলেই তার গর্ভস্থ শিশুটি নষ্ট হয়ে যায়।চলে আসে সে তার মা, দাদার কাছে।সেই থেকে সে এখানেই থাকে।এগুলি সবই বিয়ের আগে থাকতেই জেনে এসেছে রেখা।কিন্তু কখনো এটা সে ভাবতে পারেনি তার সন্তান তার বুক থেকে কেড়ে নিয়ে শ্বাশুড়ী তার নিজের মেয়ের কোল ভরাবেন।
 রেখা ভাবে একই সাথে তো দুজনেই ছেলেটিকে নিয়ে থাকতে পারতাম।কিন্তু তার যেন কোন অধিকারই নেই নিজের সন্তানকে কাছে রাখার।নিজের মেয়ের মন ভালো রাখতে পরের মেয়ের কোল থেকে তার সন্তানকে কেড়ে নিলেন।
 রেখার স্বামী সবকিছু বুঝেও নিজ স্বার্থের জন্য চুপ করে থাকলো ঠিকই কিন্তু অফিস কলিগের সাথে আলোচনা করে সুন্দর একটি উপায়ও বের করলো।অফিসেরই একটি ছেলে সদ্য বাবা হয়েছে।কিন্তু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সে তার স্ত্রীকে হারিয়েছে।তাকে গিয়ে বোনকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।সদ্য স্ত্রী হারা ছেলেটি প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে বাড়ির লোকের সাথে পরামর্শ করে সে বিয়েতে মত দেয়।বাড়িতে এসে মা বোনকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করে।রমলা ছেলে নিয়ে যেতে চাইলে তার হবু স্বামী আপত্তি জানায়।
 রমলা চলে যায় তার শ্বশুরবাড়ি রেজিস্ট্রি বিয়ে করে।আর ছেলে ফিরে আসে তার মায়ের কোলে।
 অনেকদিন পর বন্ধু বিশাখার সাথে মন খুলে গত দুবছরের ঘটনা বলতে পেরে রেখাও অনেকটা হালকা হয়।
    

Thursday, November 18, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (কুড়ি পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (কুড়ি পর্ব)
   অমরেশবাবুর ছোট মেয়েটি ছেলেবেলা থেকেই একটু বিজ্ঞ টাইপের।পড়াশুনায় সে তুখোড়।ছোটবেলা থেকে সংসারের কাজকর্মেও তার জুড়ি মেলা ভার।ন্যায়,নীতি বোধ তার টনটনে।সত্যি কথা মুখের উপর বলে দিতে এক সেকেন্ডও দেরি করেনা।কেউ বলে ঠোঁট কাটা,কেউ বলে মুখরা।আর অমরেশবাবু স্বয়ং বলেন, "বিষ"।এবং এই বিষ নামেই মাঝে মধ্যে তিনি ডাকতেন।
--- বিষের মত ঝাঁঝ ওর কথায়।সত্যি কথা অনেক সময় যে বলা যায় না এটা ওকে বুঝাতেই পারলাম না কোনদিন।
  পৃথিবীতে যারা সৎপথে চলে,সত্যি কথা বলে তাদের শত্রু সংখ্যা সব সময়ের জন্যই একটু বেশি হয়।উদাহরণ স্বরূপ একটি কথা বলি।একজন খুব সেজেগুজে এসে জানতে চাইলো,
--- এই আমায় কেমন লাগছে দেখতে?
 তাকে খুশি করতে সকলেই এক বাক্যে বলে উঠবে,
--- ওহ্ দারুন লাগছে।
 কিন্তু অমরেশবাবুর ছোটমেয়ে ছন্দা মিথ্যা কথা বলে কাউকে খুশি করতে পারে না।তার চোখে ভালো লাগলে ভালো বলবে আবার খারাপ লাগলে খারাপ বলবে।আর এই কারণেই অনেকেই তাকে ঠিক পছন্দ করেনা।কিন্তু যারা পছন্দ করে তারা তাদের সবটুকু দিয়েই তাকে ভালোবাসে।প্রতিবছর ক্লাসে প্রথম হয়ে ওঠে সেই ছোট্টবেলা থেকেই।অঙ্ক ছিল তার প্রিয় বিষয়।ক্লাসের অনেকেই ছিল অঙ্কে কাচা।তাই স্বইচ্ছায় সে টিফিন আওয়ারে সেইসব ক্লাসমেটদের নিয়ে অঙ্ক করতে বসতো।পড়াশুনার দিক থেকে যারা একটু দুর্বল তাদের বিষয়গুলি বুঝিয়ে দেওয়া,পরীক্ষার সময় নানানভাবে তাদের সাহায্য করা এগুলোতেই ছিল ছন্দার আনন্দ।ছন্দা সব সময় পড়াশুনা নিয়েই থাকতে ভালবাসত।পুজোর সময় সন্ধ্যায় ঠাকুর দেখতে বের হবে পড়ার সময় নষ্ট - তাই সে সারা দুপুর বসে সন্ধ্যার পড়াটা করে নিত।মাঝে মধ্যে বিকেলবেলায় বাড়ি থেকে অনেকটা দূরত্বে মাঠে খেলতে যেত।
  শুধুমাত্র একটি পুত্র সন্তানের আশায় পরপর অনেকগুলি মেয়ে হতে থাকলে মেয়েগুলোকে এক একজনকে এক এক অদ্ভুত নামে ডাকা হত। আন্না (আর চাইনা),সমাপ্তি, ক্ষ্যান্ত,  ( বন্ধ),ইতি, চাইনা (চায়না নয় কিন্তু) এরূপ আরো কত কি!
 প্রতিবারই সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় শান্তিদেবী ছাড়াও বাড়ির সকলেই আশা করতেন এবারেরটা নিশ্চয়ই ছেলে হবে।কিন্তু আঁতুড়ঘরে শিশুর ক্রন্দন শুনে সকলে অধীর আগ্রহে যখন বুড়ি পিসিমার (ধাত্রী মা) কাছে জানতে চাইত বোন না ভাই?প্রতিবারই তারা নিরাশ হত আর সকলের চোখ থেকে টসটস করে জল গড়িয়ে পড়তো।ছন্দার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।যে ব্লেডে নাড়ি কাটা হবে সেটি না পুড়িয়েই বুড়ি পিসিমার হাতে চলে আসে।অমরেশবাবুর বকা খেয়ে তারপর আবার সেই ব্লেড নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে ফুটিয়ে নিয়ে আসা হয়।পরপর মেয়ে হওয়ায় সকলে অসন্তুষ্ট হলেও অমরেশবাবু কিন্তু কখনোই এই কারণে মন খারাপ করতেন না।তিনি বলতেন,
--- মেয়েরা হচ্ছে ঘরের লক্ষী।মা লক্ষী সবসময়ই আমার মেয়েদের রূপ ধরে আমার ঘরে বিরাজিত।এর ফলে আমার সংসারে কত উন্নতি হচ্ছে দিনকে দিন।আমি কিন্তু খুশি।
 কিন্তু তিনি খুশি হলে হবে কি?তার মা এবং তার স্ত্রী শান্তিদেবী তো খুশি নন।তারা তো বংশের প্রদীপ চান।
 কোথার থেকে ধরে আনলেন এক নামকরা জ্যোতিষীকে।তিনি শান্তিদেবীর হাত দেখে বললেন,
--- এবারের সন্তান তোমার ছেলে হবে।তবে ভবিতসতে তার অগাধ সম্পত্তি থাকলেও সে যে তা ভোগ করতে পারবে এমন কোন গ্যারান্টি আমি কিন্তু দিতে পারছি না।শুধু এই একটাই বাড়ি নয়,তার বেশ কয়েকটি বাড়িও হবে।সম্পত্তি,টাকা পয়সার কারণে তার শত্রু সংখ্যাও কিন্তু কম থাকবে না।
 বোঝো ঠেলা!যে সন্তান পৃথিবীতে এখনো ভূমিষ্টই হলনা তার পুরো জীবনের ঘটনা জানিয়ে গেলেন তার মায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে।অমরেশবাবু গেলেন ক্ষেপে।জ্যোতিষী বা তার মাকে তো আর ভৎসনা করতে পারেন না ;কিন্তু রাগে গজগজ করতে লাগলেন।কারণ জ্যোতিষী,হাত দেখা,ভবিৎসত বলে দেওয়া এসব তিনি মোটেই বিশ্বাস করতেন না।তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন মানুষই তার ভবিতসত কারিগর।পরিশ্রম করলে তার ফল মিঠা হবেই।জীবনে কিছু অর্জন করতে গেলে লক্ষ্যটাকে ঠিক রেখে পথ যতই কণ্টকাকীর্ণ হোকনা কেন সামনে এগিয়ে চলতেই হবে।তখন নিজে এসে সফলতা জীবনে ধরা দেবে।তাই তিনি জ্যোতিষীর বলে যাওয়া কথা নিয়ে মা এবং শান্তিদেবীকে চিন্তা করতে নিষেধ করেন।
 ছন্দার জন্মের পড়ে মাত্র দেড় বছর বাদে সত্যিই রায় চৌধুরী বংশের বংশধর আসে কার্তিকের মত চেহারা নিয়ে।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার যে মেয়েটি মাত্র দেড় বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছে যে মাকে ছাড়া,মায়ের বুকের দুধ ছাড়া যার এক মুহুর্ত চলে না সে কিন্তু একটু একটু করে বঞ্চিত হতে লাগলো।দুজনে দুপাশ থেকে মায়ের দুধ খেত।কিন্তু অদ্ভুতভাবে দু'মাসের মধ্যে শান্তিদেবীর বা পাশের ব্রেস্টে এক মস্তবড় ফোঁড়া হয়।রঙ্গিনীবালাদেবী তার বৌমাকে বলেন,
--- ফোঁড়া হওয়া দুধটা কিন্তু তুমি ছেলেকে খাওয়াবে না।ওটা তুমি আহ্লাদীকে খাওয়াবে।( ছেলে প্রণয়ের জন্মের পর রঙ্গিনীবালাদেবী ছন্দাকে আদর করে আহ্লাদী বলে ডাকতেন।তার বক্তব্য ছিল আহ্লাদীই রায় চৌধুরী পরিবারে বংশের প্রদীপকে পথ চিনিয়ে নিয়ে এসেছে।তাই তিনি সকলের চাইতে আহ্লাদী বা ছন্দাকেই একটু বেশি ভালবাসতেন।)কিন্তু কখনোই হারানো মানিককে বঞ্চিত করে নয়।( প্রণয়ের ডাক নাম ছিল হারা।তার কারণ পাঁচ বছর বয়সে এ বাড়ির একটি ছেলের মৃত্যু হয়েছিল যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি)
 রায় চৌধুরী বাড়িতে মুখে ভাত উঠে যাওয়ার কারণে গোবিন্দ মন্দির থেকে একটু পায়েস এনে প্রণয়ের মুখেভাত করা হয়।পড়ে জাকজমক করে পাঁচ বছরের জন্মদিন পালন করা হয়।এই জন্মদিনে শহর এবং গ্রাম মিলিয়ে কয়েকশ লোক নিমন্ত্রিত ছিলেন।
 হারার বয়স তিন বছর।ছন্দার বয়স সাড়ে চার বছর।রাখা হল হারার জন্য একজন শিক্ষক।কিন্তু ছন্দার কথা কেউ ভাবলো না।রোজ শিক্ষক সুশান্ত পাল হারাকে পড়াতে আসেন ভাই পড়ে আর হা করে বসে চেয়ে থাকে ছন্দা।তার পড়তে খুব ইচ্ছা করে কিন্তু অতটুকু মেয়ে কাকে বলবে? কি বলবে?ভাইকে স্যারের পড়ানো শুনতে শুনতেই তার অ, আ, ক,খ মুখস্ত হয়ে গেলো।সাহসে ভর করে একদিন স্যারকে জানালো যে সে ভায়ের পড়া মুখস্ত বলতে পারে।স্যার তাকে সুযোগ দিলেন।মেয়েটির প্রচণ্ড মেরিট দেখে তিনি সেদিনই বাড়ির লোককে জানালেন ছন্দাকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার কথা। বড় দিদিরা তখন তাকে সুশান্ত স্যারের কাছেই পড়ার জন্য ঠিক করে।তখন এসব ব্যাপারে তাদের বাবু বা মা খুব একটা মাথা ঘামাতেন না।বড় মেয়েদের উপরই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন।কিন্তু অভিজ্ঞ শিক্ষক কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝে গেলেন এ মেয়েকে যদি সরাসরি ক্লাস টু তে ভর্তি করা হয় সেখানেও সে তরতরিয়ে এগিয়ে যাবে।ঠিক হল ছেলেকে ক্লাস ওয়ানে এবং মেয়েকে ক্লাস টু তে ভর্তি করানো হবে।কিন্তু ছন্দা নিজেই বেঁকে বসলো।সে কিছুতেই ক্লাস টু তে ভর্তি হবে না।তার কারণটাও কিন্তু সে ব্যাখ্যা করে সকলে বুঝিয়ে বলছে।সবাই কেন সেটা বুঝতে পারছে না ;সেটাই ছন্দা বুঝতে পারছে না।

ক্রমশঃ

জীবনের প্রতি বাঁকে (উনিশ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (উনিশ পর্ব)
   সম্মিলিত মতের কাছে অমরেশবাবু হলেন পরাজিত।রাজি তাকে হতেই হল একটা চৌদ্দ বছরের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য।রায় চৌধুরী বাড়িতে বিয়ে মানে সে এক এলাহী ব্যাপার।শুরু হল সেই বিশাল আয়োজন।তখনকার দিনে বিয়ে মানে ব্যান্ড পার্টি,মাইক আর উপহার।এই উপহার হল পরিবারের সকলের হয়ে কেউ একজন কিছু কবিতা লিখতেন।আর সেগুলি বিয়ের আসরে পড়া হত।যেমন বিশাখার বিয়েতে বাবা,মায়ের তরফ থেকে লেখা হল
"পুত্রী দিয়ে পুত্র পেলাম,আর তো বাবা নহ পর-----"
ছোটদের তরফ থেকে 
"ছুটির পরে বাড়ি গেলে কে আর খাবার দেবে?
আদর করে হাত বাড়িয়ে কে আর বুকে নেবে?---"।এইরূপ বেশ বড় বড় কবিতা ছাপার অক্ষরে লেখা যা কোন একজন বেশ সুন্দর করে বিয়ের আসরে পড়তেন।কবিতাগুলো এত সুন্দর লেখা হত তা শুনে অনেকেই চোখের জলে ভাসতেন।
  বিয়ে সম্পর্কে তখনো বিশাখার কোন সম্যক জ্ঞানই জন্মায়নি।ভগ্নিপতি মনতোষের কাছে গিয়ে বিশাখা বায়না ধরলো
--- জামাইবাবু,আমি মাইকে গান করবো।
 বাড়ির সবাই অবাক।যে মেয়ের বিয়ে সে নিজে চাইছে গান করতে।অমরেশবাবুর কথাগুলো তখন সকলের মাথার মধ্যে বিড়বিড় করছে।"বিয়ের মানেই যে মেয়ে বোঝে না তাকে তোমরা বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছ?"মনোতোষ তখন এ বাড়ির সেরা জামাই।সে তখন বিশাখাকে বললো,
--- নিশ্চয়ই গাইবে। চলো আমিও তোমার সাথে গাইবো।
 বিয়েবাড়িতে সকালে মাইকে শুরু হল যেমন খুশি তেমন গাও।যে যেমন পারে গান,কবিতা --- চলতে লাগলো।
  বিয়ে তো হয়ে গেলো।মেয়ের তো সত্যিই নারী পুরুষের সম্পর্ক সম্পর্কে কোন জ্ঞান ছিল না।(তখনকার দিনে ছেলেমেয়েরা এই বয়সে এত পাকা কেউই ছিলনা)ফুলশয্যার রাতে স্বামী ঘরে ঢুকলে সে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে যায়।স্বামী তাকে আটকায়।বলে,
--- আরে আজকে তো আমাদের ফুলশয্যা।
--- সেতো দেখতেই পারছি। খাটটাকে ফুল দিয়ে সাজিয়েছে।আপনি এই খাটে শুয়ে পড়ুন।আমি আপনার কাছে শোবো না;আমি আপনার মায়ের কাছে শোবো।
 বোঝো কান্ড!
 চলতে লাগলো বেশ কয়েকটা দিন এইভাবে।মেয়ে অস্টমঙ্গলায় বাপের বাড়িতে এসে জানিয়ে দিলো,
--- ওই অসভ্য লোকটার সাথে সে আর তাদের বাড়িতে যাবে না।
 দিদিরা বললো,
--- কেন কি করেছে ও?
--- জানিস ও প্রচণ্ড অসভ্য।আমি খোকনদার কাছে শুয়েছি,দিপুদার (দেবদাস চ্যাটার্জী ও খোকনের কথা আগেই বলেছি) কাছে শুয়েছি তারা কত ভালো।আর ওই লোকটা আমার সাথে কি করতে আসে জানিস?
দিদিরা তো সব অবাক!এত সত্যি দেখতেই বড় হয়েছে।বাবু একে ঠিকই চিনেছিলেন।এর যে স্বামী,স্ত্রী সম্পর্কে কোনোই জ্ঞানই নেই।শুরু হল দিদিদের বদ্ধ দরজার মধ্যে বোনকে নিয়ে শিক্ষাদান।
 অনেক ঝড়ঝাপটা,অনেক অভিযোগ,শারীরিক মানসিক অত্যাচারের পর আজ এই শেষ বয়সে এসে সে চিৎকার করে বলতে পারে "আজ আমি সুখী।'
 কিন্তু তার আগে বিশাখার জীবনের আরও কিছু ঘটনা আমি আমার পাঠককুলের কাছে তুলে ধরবো।
 বিশাখা বিয়ের পর পুনরায় নবম শ্রেণীতে ভর্তি হল।এখানে পুরো স্কুল জেনে গেলো সে একজন ভালো খেলোয়াড়।স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।বিশাখা হাড়িভাঙ্গা,দৌড়, বর্শা নিক্ষেপ - নাম দিয়ে দিলো।তখন তার সেজদি ভারতী ওই প্রাইমারী স্কুলের পঞ্চাশ টাকা মাইনের শিক্ষিকা।তখনো সে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চাকরি পায়নি।কথাটা তার কানে গেলো।বিশাখা তখন সাত মাসের প্রেগন্যান্ট।সেজদি মাঠে ছুটে আসতে আসতে বাঁশিও বেজে উঠলো বিশাখাও দৌড় দিলো।অনেকেই তাকে নিষেধ করেছিল এই দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ না নিতে।কিন্তু সে তো নাছোড়বান্দা।ওই অবস্থায় সে সকলের আগে দৌড়ে প্রথম প্রাইজ নিয়ে তবে ফেরে।তবে বাকি দুটো প্রতিযোগিতায় তাকে অংশগ্রহণ করতে তার দিদি আর দেয় না।
 ৭৮ সাল।প্রচণ্ড বন্যায় সকলের ঘর,বাড়ি ভেসে যাচ্ছে।আর ঠিক সেই বন্যার মধ্যে বিশাখার পেইন ওঠে।সমস্ত ঘরময় জল।পথঘাট কিছুই চেনার উপায় নেই।চারিদিকে তাকালে জল ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। পাড়ায় একজনের একটা টাক্সির কথা বলা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এই জলের মধ্যে তাকে তো পাওয়াও সম্ভব নয়।জল ভেঙেই মনোতোষ হাজির হল বিশাখার বাড়িতে।মনোতোষ যেন রায় চৌধুরী পরিবারে সকলের বড়দা হয়ে উঠেছিল।বিশাখার সাহস কয়েকশ গুন বেড়ে গেলো।এতক্ষন সে যন্ত্রণায় ছটফট করছিলো জামাইবাবুকে দেখেই বললো,
--- আমি এই জলের মধ্যে হেঁটে যেতে পারবো।শুধু আপনি আমার হাতটা ধরে থাকবেন।পড়ে যেতে গেলে টেনে তুলে দেবেন।মনোতোষ হেসে পরে বললো,
--- আমি জানি তো।আর সেই জন্যই তো আমি এই জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে এলাম।কেন যে ওরা বলছে তুমি পারবে না আমার মাথায় সেটাই আসছে না।
 ছেলেমানুষের মত মনোতোষ বিশাখার সাথে গল্প করতে করতে প্রায় কোমর সমান জল পেরিয়ে তারা ডায়মন্ডহারবার রোডে উঠে ভাগ্যক্রমে একটা ট্যাক্সি পেয়ে যায়।অল্প বয়স বলেই হয়ত লেবার পেইনটা বিশাখা তার ভগ্নিপতির হাসি,ঠাট্টার কারণে কিছুটা হলেও ভুলতে পেরেছিলো।
 সংসারিক জীবনে বিশাখার স্বামী ছিলো উগ্র মেজাজের। স্বভাবখানা ছিলো তোমাকে আমি বিয়ে করে এনে উদ্দার করেছি।আমি সংসারের পুরুষ,রোজগার করি,ভালো খাওয়া,ভালো থাকা আর সমস্ত রকম সুখ ভোগ করার অধিকার একমাত্র আমার আছে।আমি তোমাকে খাওয়াচ্ছি, পরাছি তুমি আমার বাড়ির ঝি আর আমার দৈহিক ক্ষুদা নিবৃত্তি করার একটা যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে আসার পর এরূপ একটি দানবরুপী মানুষের সংস্পর্শে এসে তারও মন মানসিকতার পরিবর্তন হয়ে যায় আস্তে আস্তে।যে দিদিরা,ভগ্নিপতি এক সময় তার জন্য দুশ্চিন্তায় দুর্ভাবনায় খাওয়া,নাওয়া ভুলে গেছিলো বহু বছর পর নানান কারণে অকারণে এদের সাথেই দুর্ব্যবহার করে সম্পর্ক শেষ করেছে।তবে সুখের বিষয় একটাই সে এখন ভালো আছে,সুখী আছে।আর কষ্টের বিষয় যারা তার সুখের জন্য এত কাঠখর পুড়িয়েছে ওই রূপ স্বামীর মারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রাত জেগে বাইরে দরজার কাছে পাহারা দিয়েছে তারা আজ সবাই বিশাখার কাছে খারাপ।আসলে মানুষের জীবনটাই বড় বিচিত্র।সেই ছোট থেকে যতই যার বয়স বাড়ুক না কেন পরিবেশের প্রভাব তার উপরে পড়বেই।সেই ছোট্ট বয়সে সকলকে ছেড়ে এসে এমন একটা মানুষের সাথে তার উঠা,বসা,শোয়া,খাওয়া - আর প্রতিটা মুহূর্তে তার আচার-আচরণ দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই মানুষ ওই মানুষটির মত হয়ে যায়।হয়ে যাওয়ার আরও অনেক কারণ থাকে।কারণ প্রাণীকুলের মধ্যে মানুষই হচ্ছে সবথেকে স্বার্থপর।সে যদি দেখে তাকে যে মানুষটাকে নিয়ে জীবন কাটাতে হবে পারিপার্শ্বিক কিছু বর্জন করলে অন্তত অশান্তির হাত থেকে সে রেহাই পেতে পারে তখন অনেক সময় নিজের মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও ঘরের মানুষটার সাথে অ্যাডজাস্ট করতে অনেক কিছুই সে করে থাকে।মানুষের মনের ভিতরের খবর তো জানা যায় না।কিন্তু মন তো পরিবর্তনশীল।যে কোন সময় যে কোন কারনেই হোক না কেন মনের পরিবর্তন হতেই পারে।আর এই জন্যই তো কৃতজ্ঞ আর অকৃতজ্ঞ শব্দদুটির পাশাপাশি অবস্থান।

ক্রমশঃ
    

Wednesday, November 17, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (আঠারো পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (আঠারো পর্ব)
  অমরেশবাবুর খুকুমা মাত্র সাইত্রিশ বছর বয়সে সব লেনাদেনা চুকিয়ে চিরদিনের মত চলে গেলো ঠিকই কিন্তু রেখে গেলো নাড়ি কাটা ধন।ছোটবোন ছন্দার মেয়ের বয়স তখন সাড়ে তিন বছর।তার স্বামী তাকে জানালো,
--- খুকুদির মেয়েটিকে আমরাই দত্তক নিয়ে নেবো।তুমি বাড়ির সকলের সাথে কথা বলো।কারণ ওর বাবা তো একা মানুষ।সে তো ওকে মানুষ করতে পারবে না।তাছাড়া তার বয়স কম।কবে আবার বিয়ে করবে তার কোন ঠিক নেই।আমরাই ওকে মানুষ করবো।মনে করবো আমাদের দুটো মেয়ে।
 সতেরোটা দিন দুধের শিশু তার মাকে হারানোর পর ছন্দার কাছে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল।এদিকে স্বপ্নার বিয়ের আট বছর বাদেও কোন সন্তান হয় না।অনেক ডাক্তার,অপারেশন করার পরেও নিঃসন্তান অবস্থায় তাদের দিনাতিপাত।তার শ্বাশুড়ী বাইরের কোন শিশুকে দত্তক নিতে দেবেন না।আর তাছাড়া তখনকার দিনে দত্তক ব্যাপারটা সকলে তেমন জানতেন না আবার অনেকে জানলেও পছন্দ করতেন না।কিন্তু খুকুর মেয়েটিকে দত্তক নেওয়ার জন্য স্বপ্নার শ্বাশুড়ী তাকে এবং তার ছেলেকে বলেন।তার কথা অনুযায়ী 
--- আমরা তো এই মেয়েটিকে দত্তক নিতেই পারি।এর বাপ,মা জন্ম-ঠিকুজি আমরা সব জানি।ছন্দার তো একটি মেয়ে আছে।তোমরা গিয়ে ছন্দাকে আর বাড়ির সকলকে বুঝিয়ে বলো।মেয়েটিকে নিয়ে এসে তোমাদের শুন্য কোল পূরণ করো।
 স্বপ্না আর তার স্বামী এসে খুকুর মেয়েকে নিয়ে যায়।পড়ে সমরের কাছ থেকে তারা মেয়েকে আইনী মারফৎ দত্তক নিয়ে নেয়।খুকুর স্বামী কিন্তু ছ'মাসের মধ্যেই আবার বিয়ে করে। স্বপ্না ও তপন তাদের এই মেয়েকে নিজের সন্তানের মত স্নেহ, মায়া-মমতা দিয়ে মানুষ করার চেষ্টা করেছে।সব থেকে আশ্চর্য্য কিংবা ভালোলাগার বিষয় যেটি তা হল স্বপ্নার শ্বাশুড়ী একসময় স্বপ্নার সাথে যে দুর্ব্যবহার করেছিলেন সেই তিনিই খুকুর এই মেয়েটিকে নিজ নাতনীর মত ভালোবাসতেন।তার নিজের বিয়ের গয়না যা তিনি তার একমাত্র পুত্রবধূটিকেও দেননি তা তিনি এই নাতনীর বিয়ের জন্য স্বপ্নাকে দিয়েছিলেন।মানুষের কিছু ব্যবহার দেখে যে পুরো মানুষটিকে ভালো কিংবা মন্দ হিসাবে যে বিচার করা ঠিক নয় তা স্বপ্নার শ্বাশুড়ীকে দেখেই বোঝা যায়।একটা মানুষের ভিতরে ভালো মন্দ দুটি দিকই থাকে।পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানুষের মানসিক পরিস্থিতির উপর তার ব্যবহার নির্ভর করে।
 স্বপ্না মেয়েকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে নিজেরা পছন্দ করে উপযুক্ত ছেলের হাতেই সমর্পণ করে।বর্তমানে এক কন্যা সন্তানের জননী সে।ভালো মন্দ মিশিয়ে সে খুব সুখেই আছে।আর হ্যাঁ একটা সময়ে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যে সে স্বপ্নার বোনের মেয়ে এবং তারা তাকে দত্তক নিয়েই মানুষ করেছে।এটা জানানো হয়েছিলো এই কারণেই যেহেতু সমস্ত আত্মীয়-বন্ধুরা সমস্ত বিষয়টি জানতেন যদি কখনো অন্যের মাধ্যমে তার কানে যায় এবং সে যদি এই বিষয়ে কোন রিয়াক্ট করে তাই মাধ্যমিক দেওয়ার পরেই তাকে জানানো সকলে শ্রেয় বলে মনে করে।
  রায় চৌধুরী পরিবারে সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে যখন সবেমাত্র অমরেশবাবুর মাত্র দুটি কন্যা মানে বড় ও মেজটির বিয়ে হয়েছে তারপরেই বিয়ে হয় চৌদ্দ বছর বয়সে তার অষ্টম কন্যাটির।বিশাখা তখন নবম শ্রেণীতে পড়ে।খেলাধুলায় ভীষণ ভালো।যেখানেই যায় পুরস্কার নিয়েই ফেরে তা সে যে কোন ধরনের খেলা হোকনা কেন।যেখানেই ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কথা তার কানে আসে - নাওয়া,খাওয়া,ঘুম সব বাদ দিয়ে বাড়ির লোককে অধিকাংশ সময় না জানিয়েই ছুটে চলে যায় খেলতে।বাড়ির লোক খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনা নিয়ে যখন প্রতিটা সেকেন্ড,মিনিট কাটাচ্ছে ঠিক সেই সময়ে হাতে পুরস্কার নিয়ে হাসতে হাসতে সে হাজির।তাকে বাড়ির সকলে অনেক বুঝিয়েও পারেনি যে কোথাও খেলতে গেলে অন্তত বাড়ির যে কাউকে একটু বলে যায় যেন সে।এই বলে না যাওয়ার মধ্যেই সে যেন এক বিশাল আনন্দ খুঁজে পেতো।খেলা পাগল এই মেয়েটিকে নিয়ে অমরেশবাবুর চিন্তার শেষ নেই।তখনকার দিনে গ্রাম বা মফরসল শহরগুলোতে এখনকার দিনের মত খেলাধুলার এতো সুযোগ সুবিধা,এবং এই খেলার সোর্স এ চাকরির এত সুযোগ সুবিধা ছিলনা।সেভাবে কোন কোচও তখন পাওয়া যেতনা।
পড়াশুনার প্রতিও তেমন আগ্রহ ছিলোনা।শুধু সারাটা।দিন ধরে খেলা আর খেলা বিশেষত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।আর এই কারণে সারাটাদিন বাইরে থেকে সন্ধ্যায় তার ঘরে ফেরাটা কারোই ভালো লাগতো না।মন্দ মানুষ সব দেশে সব কালেই থাকে।সম্মান এবং প্রাণের আশঙ্কায় মেয়েকে নিয়ে অমরেশবাবু খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন।এমতাবস্থায় বোনকে ঘরমুখো করতে মায়ের সাথে পরামর্শ করে হঠাৎ করেই তার বিয়ে ঠিক করে ফেলে সবাই।অমরেশবাবু শুনে তো থ।
--- এটা কিছুতেই হতে পরে না।একটা বাচ্চা মেয়ের বিয়ে আমি কিছুতেই দিতে দেবো না।ও যা করছে করুক।ওর দেখভাল করার জন্য আমি একজন লোক নিয়োগ করবো।ঘরমুখো করার জন্য এই বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে আমি ওর জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনতে পারবো না।তোমাদের এই সিদ্ধান্তে আমার কোন মত নেই।
 বাড়িতে বিশাখার বিয়ে নিয়ে নিত্য অশান্তি।শেষমেষ অমরেশবাবু রেগেমেগে বললেন,
--- শোনো তোমরা যদি জোর করে ওর বিয়ে দাও আমি সত্যি বলছি ওকে নিয়ে অন্য কোথাও আমি চলে যাবো।কিছুতেই আমি এ বিয়ে হতে দেবো না।অবস্থা গুরুতর বুঝতে পেরে যে ঘটক বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এ বাড়িতে এসেছিলো সে ছেলের বাড়ি গিয়ে সবিস্তারে সবকিছু জানালো।একদিন দুপুরের দিকে প্রায় সাত আটজনের এক দল ছেলের বাড়ি থেকে এসে হাজির।এই মেয়েকেই তারা তাদের বাড়ির বউ করতে চায় বলে অমরেশবাবুর হাতদুটি ধরে অনুনয় বিনয় করতে লাগে।তারা কথা দেয় তারা বিশাখাকে বিয়ের পর পুনরায় পড়াবে।
 অমরেশবাবু সব শুনে বলেন,
--- নারী পুরুষের সম্পর্ক বোঝার মত যে মেয়ের জ্ঞান হয়নি তাকে বিয়ে দিলে কতটা সমস্যার মধ্যে আপনাদের পড়তে হতে পারে সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান আছে আপনাদের?
--- সকল বাবা,মায়ের কাছেই চিরকাল তার সন্তান ছোটই থাকে।বাবা,মায়েরা তাদের সন্তানদের ভাবেন তারা কিছুই জানে না,কিছুই বোঝে না।আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।শুধুমাত্র বিয়েটাই মত দিন।মেয়েটিকে আমাদের খুবই পছন্দ।খুবই লক্ষীমন্ত মেয়ে আপনার। এ মেয়ে যে সংসারে যাবে সে সংসার সুখ উপচে পড়বে।
--- আপনাদের সংসারে সুখ উপচে পড়ার জন্য আমি আমার কচি মেয়েটার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারবো না।আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন।
 তারাও নাছোড়বান্দা।দুপুর থেকে বিকেল,বিকেল থেকে সন্ধ্যা তারপর রাত।তাদের উঠার কোন নামই নেই।শেষমেষ হাত জোড় করে অমরেশবাবু বললেন,
--- আপনারা আমায় একটু ভাবনার সময় দিন।কয়েকটা দিন পরে আমি আপনাদের আমার মতামত জানাচ্ছি।যদি আমার মতের পরিবর্তন হয় তাহলে কিন্তু আপনাদের আমাকে দেয় কথার মর্যাদা রাখতে হবে।আমার মেয়ের পড়াশুনা কিন্তু বন্ধ করা চলবে না।

ক্রমশঃ 
  
    

Tuesday, November 16, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (সতের পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (সতের পর্ব)
  তখনকার দিনে ন'টি মেয়ে এবং একটি মাত্র ছেলে।শিক্ষা এবং সাংসারিক কাজকর্মে প্রতিটা মেয়েই দক্ষ।অবশ্য এদের মধ্যে ফাঁকিবাজ যে ছিলনা তা কিন্তু নয়।কেউ কেউ এমন ছিল যে এক বোনের কাজ অন্য বোনের ঘাড়ে মিষ্টি কথায় চাপিয়ে দিত।তবে স্কুল এবং পড়াশুনা এগুলো কেউ করতো স্বইচ্ছায় আবার কেউ করতো মায়ের ভয়ে।শাসন যা করার তা করতেন শান্তিদেবী।অমরেশবাবু সারাটা জীবন তার প্রতিটা মেয়েকে শুধু আদর আর ভালোবাসা দিয়ে গেছেন।'মা'আর 'তুমি'বলেই তিনি তার প্রতিটা মেয়ের সাথে কথা বলতেন।প্রতিটা মেয়ের আবদার ছিল তাদের বাবুর কাছেই।
  তার সপ্তম মেয়েটি তন্দ্রা ওরফে খুকু ছিল খুব সরল,সাদা।এই মেয়েটির উপর তার অন্য মেয়েরা তাদের নিজেদের কাজের বোঝা চাপিয়ে দিতো।খুকুকে অমরেশবাবু ডাকতেন খুকুমা বলে।পরবর্তীতে অমরেশবাবুর সমস্ত নাতি নাতনীরাও তাকে ওই নামেই ডাকতো।মনটা ছিল তার শিশুর মত সরল।কেউ কোন কুকথা বললেও সে বুঝেও না বোঝার ভান করতো।বলতো,
--- কি লাভ অন্যের সাথে ঝগড়া করে।কতদিনই বা বাঁচবো?এড়িয়ে গেলেই তো আর ঝগড়া হবে না।
কেউ হয়ত তখন বলেছে,
--- তাই বলে ওর ওই নোংরা কথাগুলির জবাব দিবি না?
--- ওর ওই কথাগুলির জবাব দিতে গেলে আমাকেও ওই নোংরা ভাষাতেই বলতে হবে।তাহলে ওর আর আমার মধ্যে পার্থক্য কোথায় থাকবে?
 এই ছিলো অমরেশবাবুর খুকুমা।বাড়ির প্রত্যেকের মুখের কথা বেরোনোর আগেই তার সে কাজ সে নিজ হাতে করে দিত।কোন অভিযোগ, কারো বিরুদ্ধে কোন নালিশ তার কোনদিনও ছিল না।অমরেশবাবু একটা কথা প্রায়ই বলতেন কেউ কখনো কোন গালিগালাজ করে  'অমুকের বাচ্চা'যদি বলে কোনদিনও সেই কথাটা তাকে ফিরিয়ে বলবে না।তাকে ভাই বলে সম্মধন করবে।তারমানে তুমি তাকে সেটাই বললে যা সে তোমায় বলেছে।অথচ কথাটা তুমি সরাসরি বললে না।আর তার এই নীতিটা একমাত্র তাঁর খুকুমা ই মেনে চলতেন।অমরেশবাবুর সমস্ত মেয়েরা পড়াশুনা করলেও তাঁর খুকুমা কিন্তু স্কুলের গণ্ডি পেরতে পারেনি।আসলে সংসার আর সকলের যত্ন নিয়ে সে এতটাই মাথা ঘামাত যে পড়াশুনার প্রতি তার কোন টান ই সে অনুভব করতো না।বাড়ির সকলেই চেষ্টা করেছিল কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারেনি।
  দিদি,বোন,ভাই সকলেই ছিল তার প্রাণ।সকলের প্রতি তার ছিল এক অসীম দরদ। কার কখন কি দরকার, কার কি অসুবিধা মুখে তাকে কিছু বলতে হত না।সে যেন এক অলৌকিক ক্ষমতাবলে সবকিছু বুঝে যেত।পরিবারের সকল সদস্যের সাথে তার যেন এক অলিখিত চুক্তি ছিলো সকলের  সবকিছু মুস্কিল আসানের।
 নিরীহ,অতি শান্ত সাত চড়ে কথা না বলা মানুষটির জীবনেও প্রেম এসেছিলো।এক অনুষ্ঠান বাড়িতে দেখা হওয়া কোন একটি মানুষের সাথে।চলত তার সাথে লুকিয়ে চিঠি আদানপ্রদান।বাড়ির কেউই কিছুই কোনদিন জানতে পারেনি।
 বাড়ির সকলে খুকুর বিয়ে দেওয়ার জন্য ছেলে দেখতে শুরু করলে সে এসব কথা জানায় সকলের ছোটবোনকে।তার ছোটবোন ছন্দা তার সেজদিকে একথা জানায়।এই সেজদি তাদের বাবুর বর্তমান এবং অবর্তমানে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়।ভাই এবং বোনদের লেখাপড়া শিখিয়ে বোনদের এক এক করে বিয়ে দিতে থাকে।তার জীবনটা ঠিক যেন মালা সিংহা অভিনীত কবিতা সিনেমার মত।নিজের কোন ভালোলাগা,ইচ্ছা নেই।ভাইবোনেরাই তার জীবনের সব।তাদের আবদার,তাদের শখ সবকিছুই এই সেজদি মেটায়।অমরেশবাবুর বয়স হয়ে যাওয়ার পর তাঁর রোজগার যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন থেকেই ভারতী নিজের ইচ্ছায় পুরো সংসারের সমস্ত দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
 অধিকাংশ সংসারে দেখা যায় কোন সদস্য যদি সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে তখন সেই পরিবারের বাবা, মায়েরাও কিছুটা হলে স্বার্থপর হয়ে পড়েন।একটা জীবনের বিনিময়ে অন্য জীবনগুলো যদি একটু সুখ,স্বচ্ছন্দ পায়- তারা সেদিকেই দৃষ্টিপাত করে মূল মানুষটির জীবনের কথা না ভেবে।মা না হয়েও কিভাবে সংসারে সকলের মা হয়ে উঠা যায় ভারতী তার পুরো জীবন দিয়ে রায় চৌধুরী পরিবারে তা বুঝিয়ে দিয়েছে।ছোট বোনেরা,ভাই যেমন তার সন্তানসম আবার তাদের ছেলেমেয়েরাও তার ছেলেমেয়ে।
  খুকুমার সাথে কথা বলে সেই ছেলেটিকে ডেকে আনে তাদের সেজদি।ছেলেটি আসে ঠিকই কিন্তু বিয়ে করতে অস্বীকার করে।কি অদ্ভুত!একটা মেয়ের সাথে আট থেকে দশ বছরের সম্পর্ক।অথচ যখন মেয়েটির বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হল তখন ছেলেটি জানালো,
--- আমি ওকে বন্ধু মনে করতাম।ভালোবাসি কোনদিন তো বলিনি।এরকম বন্ধু আমার অনেক আছে।
 নিরীহ,শান্ত স্বভাবের খুকু এরপর আর কোন কথা তার সাথে বলেনা।সে সোজা উঠে ঘরে চলে যায়।এরপর মাস ছয়েকের মধ্যে স্বল্প শিক্ষিত খুকুর জন্য তার উপযুক্ত পাত্র খুঁজে বের করে ভারতী তার বিয়ে দেয়।
 খুকুর শ্বশুরবাড়িটি শরিকের বাড়ি হলে কি হবে প্রচুর জমিজমা,পুকুর মিলিয়ে সে বিশাল ব্যাপার।কিন্তু যেহেতু খুকু বেশি লেখাপড়া জানতো না তাই তাকে ঠিক সেরূপ পাত্রের হাতেই সমর্পণ করা হয়েছে।ছোটখাট একটা চাকরি করে।কিন্তু অসম্ভব ভালোবাসে তার স্ত্রী তন্দ্রাকে।বাপ,মা মরা সমরকে কে কবে গুছিয়ে খেতে দিয়েছে তা সে মনেই করতে পারেনা।বিয়ের পর খুকুর যত্ন,ভালোবাসায় সমর এক নূতন জীবন খুঁজে পায়।পরস্পর যেন পরস্পরকে চোখে হারায়।ছুটির দিনগুলোতে দুজনে এদিকওদিক ঘুরে বেড়ায়।
 এভাবে দু'বছর কাটার পর তাদের সংসারে নূতন এক অতিথি আসে।সংসারে লক্ষীর আগমনে সংসারে শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে।মেয়েকে নিয়ে দুজনেই নূতন নুতন স্বপ্ন দেখতে থাকে।কিন্তু খুকু, সমরের জীবনে এসুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়না।মেয়ের বয়স তখন এক বছর এক মাস।এতটুকু ছোট বাচ্চাকে নিয়ে খুকু আত্মীয়ের বিয়েবাড়িতে যাবে না বলে বাপের বাড়িতে আসে তার মেয়েটিকে ছোট বোনের কাছে রেখে বিয়েবাড়িতে যাবে বলে।
 মেয়ের খাবারদাবার সবকিছু ছোট বোনকে বুঝিয়ে দিয়ে সে স্নানে ঢোকে।অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও যখন সে বাথরুম থেকে বেরোচ্ছে না তখন বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করে তার ছোট বোন ছন্দা দৌড়ে গিয়ে পাড়ার ক্লাবে জানায়। সেজদি তখন অফিসে।ক্লাবে তখন খুকুর ভাই ও এক বোনপো ছিল। এ খবর শুনেই তারা ছুটে আসে সঙ্গে পাড়ার অনেক ছেলেরা।বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে খুকুকে বের করা হয়।ডাক্তার ডাকা হলে তিনি জানান 'ব্রেন স্ট্রোক'।তবুও তাকে হাসপাতাল নেওয়া হয়।
 তেরো মাসে খুকু তার জীবনের সমস্ত শখ,আহ্বলাদ বিসর্জন দিয়ে একমাত্র মেয়ের কথা না ভেবে বিধাতার এক অমোঘ লিখনে সকলকে ছেড়ে পরপারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলো।ছোটবোন ছন্দা তখন দিদির মেয়েকে বুকে আঁকড়ে ধরলো।তখনো খুকুকে শ্মশানে নেওয়া হয়নি।খুকুর মেয়ে খিদেয় তীব্র চিৎকারে বাড়ি মাথায় করছে।ছন্দা নিজের চোখ মুছে তার দিদির বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।দিদিকে হারিয়ে সেই মুহূর্তে ছন্দা একটু কাঁদতেও পারেনি।ছন্দার মাতৃত্বের কাছে সেদিন দিদিকে হারানোর শোকটা মৃয়মাণ হয়ে পড়েছিলো।
  ( পরবর্তী পর্বে জানাবো এই বাচ্চাটা কার কাছে মানুষ হয়েছে।)

ক্রমশঃ 

  

Monday, November 15, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (ষোলো পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (ষোলো পর্ব)
  স্বপ্নাকে পৌঁছে দিয়ে গেলেন তার নন্দায়। স্বপ্না কিন্তু মুখে কুলুপ এঁটে থাকলো।শ্বশুরবাড়ির কোন ঘটনায় সে বাড়ির কাউকে জানালো না।দু থেকে তিনদিন যাওয়ার পর তার সেজদি ভারতী কিছুটা হলেও ঘটনার আঁচ পায়।অমরেশবাবু মেয়ের এই জামাই ছাড়া আসা আর মনমরা হয়ে থাকা দেখে  তিনি তার সেজো মেয়ে ভারতী ওরফে ভানুকে ডেকে বললেন,
--- আমার কাছে স্বপ্না যখন কিছু স্বীকার করছে না তুমি ওকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসা করো ওর শ্বশুরবাড়িতে কোন সমস্যা হয়েছে কিনা।
--- হ্যাঁ বাবু আমি জানতে চাওয়ায় আমার কাছে সব স্বীকার করেছে।ওর শ্বাশুড়ী ওকে পছন্দ করেন না।তপনকে ওর কাছে দেখলেই শ্বাশুড়ির মাথা গরম হয়ে ওঠে।কিন্তু তপন পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে ওর মাকে তিনি যদি তার স্বভাবের পরিবর্তন না করেন তাহলে স্বপ্নার প্রতি যে মানসিক অত্যাচার তিনি করছেন সবকিছুই সে বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দেবে।
--- বাড়ির কেউ কিছু এখনো জানে না?
--- না,এখনো পর্যন্ত কোন কথা অন্য কেউ জানে না।
--- আসলে কি জানো মা,ভদ্রমহিলা খুব অল্প বয়সে যখন বিধবা হয়েছেন তখন ছেলের বয়স ছ'মাস আর মেয়ের বয়স পাঁচ বছর।সংসারে ঝিয়ের মত পরিশ্রম করে ভাসুর,দেওরের চোখ রাঙ্গানি সহ্য করেও কোনদিন হয়ত তাদের মনই পাননি।তার ভিতরের চাপা যে কষ্ট রয়েছে তার বহিঃপ্রকাশ কোনদিনও হয়নি তার ছেলেমেয়ের স্বার্থে।তিনি তার অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখ খুললে যদি তাকে বাচ্চা দুটিকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়।বাংলায় একটা প্রবাদ আছে জানো তো ?"ঝিকে মেরে বৌকে শাসন।"আমার মনেহচ্ছে উনার ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটা কাজ করছে।উনি কোনদিনও উনার প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেননি।আর তার ফলেই আমার মেয়েটার উপর অন্যায় অত্যাচার করে উনার ভিতরের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন।যতই উনি মুখে বলুন না কেন ভাসুর,দেওরের সংসারে কোনদিন কোন কষ্ট উনি পাননি।সেটা উনার মহানুভবতা।উনি চাননা উনার শ্বশুরবাড়ির কারো বিরুদ্ধে কোন কথা কাউকে বলে তাদের চোখে শ্বশুরবাড়ির লোকদের ছোট করতে।উনাকে সময় দিলেই আস্তে আস্তে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।এই মুহূর্তে স্বপ্নার যেটা প্রয়োজন তাকে এ কথাগুলি বুঝিয়ে বলা।ভদ্রমহিলার সাথে কথা বলে আমি বুঝেছি উনি যথেষ্ঠ বুদ্ধিমতী।সময় উনাকে সঠিক পথে চালনা করবে।দেখো কটাদিনের মধ্যেই তপনকে উনিই পাঠাবেন স্বপ্নাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।অন্তত আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে।
 ঘটলোই তাই।দিন পনেরর মধ্যে তপন এসে স্বপ্নাকে নিয়ে গেলো মা পাঠিয়েছেন বলে।
 অমরেশবাবু এতটাই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন।তিনি তার অন্তর দৃষ্টি দিয়ে মানুষের সাথে কথা বলে তার ভিতরটাও দেখতে পেতেন।এরপরে স্বপ্নার সংসারে টুকটাক অশান্তি থাকলেও বড় ধরনের কোন অশান্তি আর হয়নি।ভদ্রমহিলার মধ্যে এক আমুল পরিবর্তন এসেছিল।পরবর্তীকালে তপন নিজে বড় বাড়ি করলেও তার মা তার সাথে সেই মুহূর্তে আসেননি।কারণ ভাসুরপত্নী মারা যাওয়ার কারণে আর ওই শরিকের বাড়ি ছেড়ে একে একে সকলে বাড়ি করে চলে যাওয়ার ফলে ভাসুর ঠাকুর তার একা হয়ে পড়েন।তিনি চলে গেলে কে তাকে দেখবে এই অজুহাতে তিনি ছেলে এবং তার বউয়ের কাছে আসেন না।পরবর্তীতে জ্যাঠা মারা যাওয়ার পরে তপন তার মাকে জোর করে নিজের কাছে নিয়ে আসে।এরপর যে কটাদিন তিনি বেঁচে ছিলেন তপন সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে তার সেবা করেছেন। একথা সত্যি স্বপ্না তাকে তিনবেলা ঠিকমত খাবার সামনে দিলেও সেই পুরনো কথাগুলো ভুলে গিয়ে কোনদিনও তার শ্বাশুড়ির কাছে ফ্রী হতে পারেনি।
 একবার অমরেশবাবুর সহকর্মী বন্ধু নারায়ণ স্যান্যালের ছেলেকে অপহরণ করে এক দুষ্ট চক্র।স্বভাবতই বার অ্যাসোসিযেশনের সকলেই খুব ভয় পেয়ে যান তাদের সন্তানদের নিয়ে।নারায়ণবাবু একটা কেসে জয়লাভ করেছিলেন।সেই কেসে এক কুখ্যাত ডাকাতকে তিনি যাবতজীবন জেল দিয়েছিলেন আইনি মারফৎ।এর জের হিসাবে ওর ডাকাত দলের যারা বাইরে ছিলো তারা উনার ছেলেকে অপহরণ করিয়েছিল।এই কেসে সর্বতভাবে নারায়ণবাবুকে সাহায্য করেছিলেন অমরেশবাবু।প্রথম অবস্থায় কেন এই অপহরণ বুঝতেই বেশ কয়েকটা দিন কেটে যায়।পড়ে তারা বুঝতে পারেন ওই ডাকাতকে জেলে দেওয়ার কারণে তাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ এটি।ডাকাতদের টার্গেট ছিল এর পরেই অমরেশবাবুর ছেলেকে অপহরণ।যা জানা যায় অনেক পড়ে।উকিলবারে রীতিমত সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রত্যেকেই এই অপহরণের ব্যাপারে বক্তৃতা দেয়।যা পেপারে বেরোয়।রাতের অন্ধকারে উকিল বারের দেওয়ালে নানান ধরনের পোষ্টার পড়তে শুরু করে।ভয় পেয়ে যান অমরেশবাবু এবং তার অপর উকিল বন্ধুরা।তার ছেলে তখন গ্রামের বাড়িতে তার মায়ের কাছে থাকে।তিনি গ্রামের বাড়ি গিয়ে বাড়ির সবাইকে ঘটনার পুঙ্খানপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে সতর্ক করে দেন।
 যেদিন তিনি গ্রামের বাড়িতে যান খোকন তাঁর সাথে দেখা করতে আসে।( খোকন চাকরি পাওয়ার পর তার নিজের বাড়িতেই অধিকাংশ দিন থাকতো কারণ ওখান থেকে তার অফিস করতে সুবিধা হত)সেই রাতে খোকন অমরেশবাবুর বাড়িতেই থেকে যায়।আর অদ্ভুত ব্যাপার সেই রাতেই বাড়িতে ডাকাত পরে।উদ্দেশ্য হয়ত ছিল অমরেশবাবুর ছেলেকে অপহরণ। এসেছিলো তারা চোর হয়ে।কিন্তু বাড়ির লোক জেগে যাওয়ায় তারা দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢোকে।বাড়ির বাগানের মেহগনি কাঠ কেটে দরজা বানানো।শাবল,কুঠার দিয়ে যখন তারা দরজা ভাঙতে চেষ্টা করছে খোকন তখন ঠাকুরঘরের বেরা কেটে অমরেশবাবুর ছেলেকে কোলে নিয়ে অন্ধকারে গ্রামের মেঠো পথ ধরে অন্য এক বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।আর ঘরের বাকি মানুষেরা যে যেখানে পারে লুকিয়ে যায়।ডাকাতরা যারা এসেছিলো তাদের কেউই এ বাড়ির কোনকিছু সম্পর্কে কোন ধারণা ছিলো না। কাঠের মই বেয়ে দুতলায় উঠতে হোত।কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বোঝা যেত না এটা কাঠের দোতলা বাড়ি।অমরেশবাবু সহ বাড়ির সকলেই মই বা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যান।কিন্তু সেই মইটাকে সরানোর জন্য নিচুতে তো একজনকে থাকতে হবে।তানাহলে ডাকাতরা বুঝে ফেলবে উপরে লোক আছে।নিচুতে থেকে যান শান্তিলতাদেবী।
 হুড়মুড় করে পাঁচ সাতজনের একটা দল ঘরে ঢুকে সমস্ত ঘরে কি এবং কাকে খুঁজতে থাকে তা একমাত্র তারাই জানে।কোথাও খুঁজে না পেয়ে তারা বারবার শান্তিদেবীর কাছে হিন্দিতে জানতে চায় সকলে কোথায়।শান্তিদেবী তাদের জানান আজ তিনি একাই আছেন বাড়িতে।সকলে এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছে।আর এই বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্যই অমরেশবাবু আজ বাড়িতে এসেছেন।ডাকাতরা নিজেরাই জানিয়েছিল সন্ধ্যার ট্রেনে অমরেশবাবু যে বাড়িতে এসেছেন তা তারা জানে।আর এদিকে উপরের কাঠের পাটাতনের ফাঁক দিয়ে সকলে দেখে চলেছে ডাকাত এবং বাড়ির মালকিনের হিন্দিতে কথোপকথন।
 ডাকাতরা ঘরে ঢুকে একজন মহিলাকে দেখে তারা কিন্তু কোনরকম দুর্ব্যবহার তার সাথে করেনি।উপরন্তু তাকে মাইজি বলে সম্মোধন করেছে।শান্তিদেবীর কাছে জল চেয়ে খেয়েছে।ঘরের ভিতর অনেক ডাব পারা ছিলো তারা সেগুলি খাবে কিনা জানতে চেয়েছে।শান্তিদেবী তাদের কাটারি/দা বের করে দিয়ে কেটে খেতে বলেছেন।চলে যাওয়ার সময় হাত জোড় করে শান্তিদেবীকে নমস্কার জানিয়েছে।
 এহেন অদ্ভুত ডাকাতের সম্মুখীন অন্য কেউ কোনদিন হয়েছে কিনা জানা নেই।তবে নামেই তারা ডাকাত।তারা কিন্তু কোন জিনিষ না নিয়েই সেদিন চলে যায়।অপহরণ বা খুন কোনটা করতে এসেছিলো জানা যায়নি।

ক্রমশঃ

Sunday, November 14, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (পনের পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (পনের পর্ব)
  অমরেশবাবুর ষষ্ঠ মেয়েটি গেছো বাদর টাইপের।পড়াশুনায় খুব একটা মন নেই। পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা আর যেকোন বড় ফলের গাছে উঠে দুই ডালের মাঝখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া তার কাছে কোন ব্যাপারই না।বাড়ির লোক তাকে সারা পাড়াময় খুঁজে কোথাও না পেয়ে যখন হাল ছেড়ে দিত তখন সে জামার ভিতর করে যে গাছে বসে থাকতো সেই গাছের ফল নিয়ে হেলতেদুলতে বাড়ি ফিরে আসতো।
--- কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
--- কেন পেয়ারা গাছে।পেয়ারাগুলো দেখেও বুঝতে পারছো না যে আমি কোথায় ছিলাম?
--- সারা দুপুর না খেয়ে পেয়ারা গাছে বসে ছিলি ?
--- কেন খেয়েছি তো 
--- কি খেয়েছিস?
--- পেট ভর্তি করে পেয়ারা খেয়েছি।
  এই হল স্বপ্না।রঙ্গিনীবালা অর্থাৎ তাদের ঠাকুমা যখন বেঁচে তখন স্বপ্না অনেক ছোট।বায়না ধরতো ঠাম্মার হাতে খাবে বলে।তখনকার দিনের বিধবা।মাছ,মাংস খান না।ছুঁয়েও দেখেন না।তিনি গামছা পরে স্বপ্নাকে যখন খাওয়াতে যেতেন সে ঠিক সেই মুহূর্তেই উঠোনে থাকা কোন গাছের উপর চড়ে বসতো। ঠাম্মা একগ্রাস তার মুখে দিতেন সে সেটা মুখে নিয়ে আবার গাছে।মুখের খাবার শেষ হলে দ্বিতীয় গ্রাস নিতে পুনরায় গাছ থেকে নেমে আসতো।এই স্বপ্নাকে খাওয়াতে গেলে বাড়িতে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হত।
 মাধ্যমিক পাশ করে প্রথম ডিভিশনে।(কি করে প্রথম বিভাগে যায় বাড়ির লোক আজও চিন্তা করে কোন সুরাহা করতে পারেনি)শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়।বন্ধুবান্ধব প্রচুর হতে থাকে।আর তাদের সাথে মেলামেশায় কলেজ কেটে সিনেমা দেখার এক প্রবল প্রবণতা দেখা দেয়।পোশাক,আশাকেরও পরিবর্তন আসে।অমরেশবাবু এটাকে ঠিক ভালোভাবে নিতে পারেন না।
 খোকন তখন পঞ্চায়েত অফিসে কাজ করছে।তিনি খোকনকে ডেকে বলেন,
--- স্বপ্নার জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা করো।
--- কিন্তু বাবু ওতো পড়াশুনা করছে।
--- ওর আর পড়াশুনার দরকার নেই।যেটুকু হয়েছে ওই দিয়েই পঞ্চায়েত অফিসে একটা চাকরি পেয়ে যাবে।দেখো তুমি কিছু করতে পারো কিনা।
 খোকনের চেষ্টায় স্বপ্না একটা চাকরি পেয়ে গেলো।তবে কোন অফিসে বসে নয়।তাকে ঘুরে ঘুরে কাজটা করতে হবে।কয়েকমাস বেশ সানন্দেই কাজ করে গেলো।টাকা তো আর সংসারে দিতে হয়না;নিজের প্রয়োজনে বিশেষত জামাকাপড়ের পিছনেই খরচ হতে লাগলো।সে যে শুধু নিজের জন্যই খরচ করে তা কিন্তু নয়।বাড়ির সকলের যার যা দরকার সে কিনে নিয়ে চলে আসে।মাসের শেষে গিয়ে দেখা যায় তার হাতে কোন টাকাপয়সা নেই।তখন সে আবার তার মায়ের কাছ থেকেই ধার করে।কিন্তু ধার সে শোধও করে মাইনে পেয়েই।আবার পরের মাসে সেই একই জিনিষ।আবার মাসের শেষে ধার মায়ের কাছ থেকে,মাসের প্রথমেই মায়ের টাকা শোধ।(এই ধার ও শোধ চলতেই থাকে যতদিন না তার বিয়ে হয়।কারণ বিয়ের আগেই "ভাল লাগছে না এই চাকরি করতে বলে চাকরীটা সে।ছেড়ে দেয়।)"
 এই চাকরি করার জন্য তাকে গ্রামের বাড়িতেই চলে আসতে হয়েছিলো।কিন্তু ঘুরে ঘুরে চাকরীর আনন্দ তার আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে আসতে লাগলো।এরই মধ্যে গ্রামের এক বিয়েবাড়িতে তাকে দেখে পছন্দ করায় দিদিরা একজোট হয়ে তার বিয়ে দেওয়ার জন্য বাবুকে বুঝাতে শুরু করে।বয়স যখন কম ছিলো অমরেশবাবুর তখন তার মনোভাব যা ছিল বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার পরিবর্তন হতে থাকে।তিনিও ভাবতে বাধ্য হন তাঁদের অবর্তমানে মেয়েগুলির কি হবে?আর ছেলে তো সকলের ছোট।হঠাৎ যদি তাঁর কিছু হয়ে যায় ছেলেটিকে দিদিরা ঠিক দেখবে।তিনি বিয়েতে মত দেন।এই বিয়েতে অমরেশবাবুকে কোন টাকা খরচ করতেই হয়না।কারণ তখন তার বেশ কয়েকটি মেয়ে বিশেষত তাঁর সেজো মেয়ে ভারতী কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে বেশ বড় চাকুরীরত।বলতে গেলে সেই এই বিয়ের সিংহভাগ খরচ করে।ছেলে হোমিওপ্যাথিক ডক্টর।নিজের বাড়ি।মা আর সে।কিন্তু তাদের কাকা,জ্যাঠা নিয়ে বিশাল পরিবার।
 এক গাছের ছাল অন্য গাছে লাগেনা ঠিকই।তাই প্রতিটা মেয়েকে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি এসে মারত্মক কসরত করতে হয় শুধুমাত্র মানিয়ে নেওয়ার জন্য। শারীরিক কষ্টটা মানিয়ে নিতে পারলেও মানসিক কষ্টটা কিছুতেই কেউ মানাতে পারে না।তার উপর স্বামী যদি হয় মায়ের আজ্ঞাধীন।কিন্তু বউকে যে তপন ভালোবাসে না তা কিন্তু নয়। অত্যাধিক সরল-সাদা হওয়ার কারণে মায়ের সমস্ত কথা সে বউকে যেমন বলে দিত ঠিক তেমনই তার বউ মায়ের সম্পর্কে কিছু বললে তাও বলে দিত।
 মা ছেলেকে বলে দিয়েছিলেন,
--- দুপুরবেলা বউয়ের কাছে শুতে যাবি না।এটা ভালো দেখায় না।
--- তাহলে কোথায় শোবো?
--- আমার ঘরে আমার খাটে।
আবার কখনো বলেছেন,
--- রাতেরবেলা ঘরে দরজা দিয়ে শুবি না।আমার বয়স হয়েছে।দরজা বন্ধ থাকলে আমি ডাকলে তুই শুনতে পাবি না।তাই দরজা খুলেই ঘুমাবি।
 পরিস্থিতিগুলি এমনই যে ঘটনাগুলি স্বপ্নাকে না বলেও উপায় নেই।দুপুরের ঘরে না আসলে স্বামীর কাছে কৈফিয়ত তলব না আসার কারণ।আবার রাতে দরজা বন্ধ করতে না দিলে তার কারণ ব্যাখ্যা করা।এমতাবস্থায় তপনও অসহায়। বাইশ বছরে বিধবা হওয়া মা যে কষ্ট করে তাকে এবং তার দিদিকে মানুষ করেছেন ছেলেবেলা থেকে তার গল্প শোনা আর জ্ঞান হওয়ার পর থেকে নিজের চোখে দেখাটাকে তো আর সে অস্বীকার করতে পারে না।কিন্তু তাই বলে একটা মেয়েকে এনে বিবেক,মনুষ্যত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে মায়ের কথামত তার সাথে দুর্ব্যবহারও তো করতে পারে না।তার অবস্থা দাঁড়ালো ঠিক যেন শাকের করাত।সে কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। পাড়ায় সেরূপ কোন বন্ধুমহলও নেই।একদিকে বউয়ের ঘ্যানঘ্যানানি।অপরদিকে মায়ের চোখ রাঙানি।পরিস্থিতি যখন তুঙ্গে তখন তপন একদিন তার মায়ের কাছেই স্পষ্ট জানতে চায়
--- তাহলে তুমি কি চাও?
--- আমি ওকে সহ্য করতে পারি না।
--- তার কারণটা কি?
--- আমার বুক থেকে ও তোকে কেড়ে নিয়েছে।
--- তাহলে বিয়ে দিয়েছিলে কেন?
--- তখন তো আর বুঝতে পারিনি তোকে বউয়ের হাতে ছেড়ে দিলে আমার এত কষ্ট হবে।
--- বিয়ে যখন দিয়েছো তখন তো আমাকে আমার বউয়ের সাথেই থাকতে দিতে হবে।
--- তুই এক কাজ কর।তোর বউকে বাপের বাড়িতে রেখে আয়।
--- কতদিন?
--- সারা জীবনের জন্য।
--- এটা তুমি কি করে বললে।আমার জীবনে কোন শখ আহ্বলাদ নেই?আমার কোন ভবিতসত নেই?বিয়ে দেওয়ার আগে এসব ভাবোনি কেন?আমি তো ওর জীবনটা নষ্ট করতে পারিনা।তুমি বলছো আমি কটাদিন ওকে ওর বাপের বাড়ি রেখে আসছি।কিন্তু এর মধ্যে তুমি নিজেকে ঠিক করে নাও।তোমার প্রতি সন্তান হিসাবে যেমন আমার দায়িত্ব আছে ঠিক তেমনই স্ত্রী হিসাবে স্বপ্নার প্রতিও আমার দায়িত্ব আছে।আমি কাউকেই অবহেলা করতে পারবো না।কটাদিন পরেই আমি ওকে বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসবো।তারমধ্যে তুমি তোমার মনকে বুঝাবে যে তুমি তোমার ছেলের বিয়ে দিয়ে বাড়িতে ঝি আনোনি।আর ছেলের বিয়ে দিয়ে সেই ছেলেকে বউয়ের কাছে যেতে না দিয়ে নিজের কাছে আটকাতেও পারবে না।কারণ আমিই সেটা হতে দেবো না।তাহলে আমাকে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।জেঠু,কাকাদের সব জানাতে হবে।বাকিটা তুমি ভেবে দেখো কি করবে?নিজের সম্মান নিয়ে যেমন আছো ঠিক তেমনই থাকবে নাকি বাড়ির সকলের কাছে তোমার এই আচরণের কথা জানাবো?

ক্রমশঃ 

Friday, November 12, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (চৌদ্দ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (চৌদ্দ পর্ব)
  হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে হঠাৎ করেই এক দাঙ্গা শুরু হল।চারিদিকে পরিচিত অনেক মানুষের মৃত্যুর খবর আসতে লাগলো।অমরেশবাবু সারাজীবনই নিরীহ এবং খুবই শান্তি প্রিয় মানুষ।বহু মানুষের সাথে সুসম্পর্ক থাকলেও যেহেতু উকালতি ছিল তার পেশা এবং গ্রামের যে কোন মানুষ বিপদে পড়লেই ঝামেলা, পুলিশ, কোর্ট পর্যন্ত গড়ালেই যে আগে তার কাছে ছুটে আসতো তিনি তার পক্ষ নিয়েই কেস লড়তেন।সে বাদী বা বিবাদী যে কোন পক্ষই হোক না কেন।
 উকালতি জীবনে নিজের পক্ষকে জিতিয়ে দেওয়ার তাগিদে প্রত্যেক উকিলই সত্য কে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য - এটাই তাদের কাজ।উকিলদের ( তখনকার দিনে মোক্তারদেরও) প্রফেশনই এটা।যে যত তার কথার মারপ্যাঁচে জজকে বোঝাতে পারবেন তিনিই হবেন জয়ী।
  শেখ আহম্মদ আলী খোকনের বিরুদ্ধে একবার একটি কেস তিনি লড়েছিলেন। কেসটি ছিলো এইরূপ - একজন ব্যক্তি তার মেয়ের বিয়ে ঠিক হলে শহরে এসে কিছু জমি বিক্রি করে সেদিনই তিনি তার মেয়ের বিয়ের গয়না কিনে এবং কিছু ক্যাশ টাকা নিয়ে নৌকা করে তার বাড়ি ফিরছিলেন।সেই সময় নৌকায় ডাকাত পরে।ডাকাতরা নৌকায় উঠেই প্রথমে যে হারিকেন নৌকায় জ্বালানো ছিল সেটি তারা ভেঙ্গে ফেলে।কিন্তু ডাকাতদের তারা চিনতে পারে এবং তাদের নাম উল্লেখ করেই তারা কেস দেয়।সেই কেসে ওই ডাকাতদের মধ্যে খোকনের নামটাও থাকে।আর অমরেশবাবু ছিলেন ওই ডাকাতদের পক্ষের উকিল।
 এমতাবস্থায় কেস লড়তে গিয়ে অমরেশবাবু দেখেন ঘটনাটি যে রাত্রে ঘটে বলে অপর পক্ষ দাবী করছে সে রাতটা ছিলো অমাবস্যার রাত।আর ডাকাতরা উঠেই যদি হারিকেন লাঠির আঘাতে ভেঙ্গে ফেলে তাহলে অন্ধকারে ডাকাতদের চেনা সম্ভব নয়।ডাকাতদের মুখ ছিলো কালো কাপড়ে বাঁধা এবং তারা ইশারায় কথা বলছিলো। অপর পক্ষের কথা অনুযায়ী তারা ডাকাতদের চিনেছিল জোছনার আলোতে।
 অমাবস্যার রাতে জোছনার আলো! কেসটা অমরেশবাবু জিতেছিলেন।আর এইভাবে খোকনের সাথে তার পরিচয়।অনেক পরে তিনি জেনেছিলেন খোকন ছিল রামচন্দ্রপুর গ্রামের অসহায় মানুষগুলির দীনবন্ধু।গ্রামের যারা মাথা অর্থাৎ মোড়ল টাইপের মানুষেরা এই অসহায় মানুষগুলির প্রতি যে অন্যায় করতো,তাদের জমিতে কাজ করিয়ে পুরো টাকা দিতো না - এইসবের প্রতিবাদ করতো এই খোকন।কিছুতেই তারা খোকন এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে পেরে উঠছিলো না।তাই শেষমেষ খোকন সহ তার এই কাজে সহায়ককারিদের বিরুদ্ধে কেস দেওয়া।আর এখান থেকেই রায় চৌধুরী বাড়ির সাথে খোকনের যোগাযোগ এবং আস্তে আস্তে পরিবারের একজন হয়ে ওঠা।
 খোকন অমরেশবাবুকে বাবু এবং শান্তিদেবীকে মা বলে ডাকতো।ছেলেবেলায় বাবা,মাকে হারিয়ে হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে হয়ে ওঠে।এমনভাবে সে বাবু,মা বলে ডাকতো তাতে যারা তাকে চিনতো না তারা বুঝতেও পারতো না খোকন এ পরিবারের ছেলে নয়।অমরেশবাবু ধর্মের ভেদাভেদ কোনদিনও মানতেন না।তিনি মানুষের মনুষ্যত্ব দেখে তার বিচার করতেন।খোকনের নামাজের সময় হলে যেমন সে বাড়ির যে কোন জায়গায় নামাজ পড়তে পারতো আবার বাড়িতে পুজো পার্বণের দিনে খোকন উপোস থেকে অঞ্জলী দিতো।সে ফুল সে নিজেই মায়ের পায়ের উপর দূর থেকে ছুড়ে ফেলতো।
 খোকনের ছিলো সাপে প্রচণ্ড ভয়।রায় চৌধুরী বাড়িতে ঘটা করে মনসা পুজো হত।সেই পুজোতে পুরো গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষজন আসতো।ভীষণ জাগ্রত ছিল এই রায় চৌধুরী বাড়ির মনসা পূজো।গ্রামের বাড়ি-বাগান জঙ্গল চারিপাশে।খোকন যেদিন যেখানেই সাপ দেখতো সেদিনই দুধ আর কাঠালী কলা কিনে এনে মাকে বলতো তার নামে মনসা গাছতলায় পুজো দিয়ে দিতে।খোকন অমরেশবাবুর প্রতিটা মেয়েকেই নিজের দিদি/বোন হিসাবেই দেখতো।শুধু তাই নয় ছোটরা কোন ভুল করলে রীতিমত দাদার মত তাদের শাসন করতো।এতে কিন্তু বাড়ির মালিক কিংবা মালকিন কিছুই মনে করতেন না। তাঁদের সাথে খোকনের যেন এগুলি অলিখিত চুক্তি ছিলো।যেহেতু খোকনের এক দাদা ছাড়া তিনকুলে আর কেউ ছিলো না এবং দাদা ছিলেন বিবাহিত তাই আস্তে আস্তে খোকন সম্পুর্নভাবেই রায় চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা হয়ে ওঠে।তারজন্য আলাদা ঘর তৈরি হয়।সম্পত্তি,জমিজমা এতই ছিলো আর সেইসব জমিতে প্রচুর পরিমাণে ধান ও সবজি চাষ হওয়ার ফলে এরূপ কিছু মানুষের বাসস্থান এই বাড়িতেই হয়ে উঠেছিল।
 অমরেশবাবু ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ব্যক্তি আর শান্তিদেবীও ঠিক তাই।ঠিক যেন মানুষের উপকার করার জন্য এই দুটি মানুষ মুখিয়ে থাকতেন।ব্যাপারটা ছিল আগুনের সাথে ঘিয়ের যোগাযোগ।
 এভাবে মানুষের উপকার করতে করতে অমরেশবাবু ঠিক করলেন পঞ্চায়েত ইলেকশনে যদি তার স্ত্রীকে দাঁড় করানো যায় আর তিনি যদি জয়লাভ করেন তাহলে আরও অনেক মানুষের উপকারে আসতে পারবেন।শান্তিদেবী ইলেকশনে দাঁড়ালেন। তাঁর প্রতীক ছিলো মাছ।খোকন সহ গ্রামের মানুষ কিছু শ্লোগান তৈরি করলো।"মাছ যায় ভেসে ভেসে,ভোট দেবেন হেসে হেসে", "শান্তিলতাকে দিলে ভোট,শান্তি পাবে গ্রামের লোক"।বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেন শান্তিদেবী।
 পঞ্চায়েত ইলেকশনে জয়লাভ করার পর প্রথমেই শান্তিদেবী রামকৃষ্ণ আশ্রমের সাহায্যে পাঁচশ শাড়ি গরীব মানুষদের ভিতর বিতরণ করলেন।সবই ব্যবস্থা করেছিলেন অমরেশবাবুই।তারপরের কাজটি ছিল গ্রামের একদম দরিদ্র মানুষদের জন্য পঞ্চায়েত অফিসের পাশেই অস্থায়ী ঘর তৈরি করে সেখানে রান্না করে পরিবারের সদস্যের মাথাপিছু খাবার দেওয়া দুবেলা।এইসব কাজ সম্পূর্ণভাবে খোকন দেখাশুনা করতো।এবং কাজ যাতে সুষ্ঠভাবে হয় অর্থাৎ আদতে দরিদ্র পরিবারগুলি যাতে কোনভাবেই বঞ্চিত না হয় তার সবকিছুই তদারকিতে ছিল খোকন।
  সব জায়গাতেই ভালোমন্দ সব রকম মানুষই বাস করে।এই কাজে নানানভাবে নানান দিক থেকে অর্থ সাহায্য আসতে থাকায় কিছু মানুষ সেই অর্থ নিজেদের কবলে নেওয়ার জন্য খোকনকে প্রস্তাব দিলো।খোকন তা অস্বীকার করে।শুরু হয় তাদের সাথে খোকনের শত্রুতা।নানানভাবে খোকনকে ভয় দেখাতে শুরু করে।কিন্তু খোকন অদ্ভুতভাবে সব কথা তার বাবু,মায়ের কাছে গোপন করে যায়।(পড়ে সে জানিয়েছিল বাবু,মাকে চিন্তায় ফেলতে চায়নি) এ সবকিছুর ফলস্বরূপ একদিন রাতে খোকন গ্রামের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে যখন বাড়ি ফিরছে তখন কিছু লোক তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে পরনের লুঙ্গি খুলে পা দুটিকে শক্ত করে বেঁধে ফাঁকা মাঠের ভিতর টেনে নিয়ে গিয়ে আধমরা করে রেখে পালিয়ে যায়।হয়ত তারা ভেবেছিলো খোকন মারাই গেছে।সারাটা রাত মাঠের ভিতর পরে থাকে খোকন।সকালে কিছু মানুষ তাকে মাঠের ভিতর দেখতে পেয়ে অমরেশবাবুর বাড়িতে খবর দেয়।তড়িঘড়ি তাকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।বেশ কয়েকদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাকে থাকতে হয়।তারপর সুস্থ্য হয়ে বাড়িতে ফিরেই সে দ্বিগুণ কর্মক্ষমতায় কাজ শুরু করে।তখন সে যেন খোচা খাওয়া বাঘ।

 ক্রমশঃ

Wednesday, November 10, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (তেরো পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (তেরো পর্ব)
  অমরেশবাবুর পঞ্চম কন্যাটি ছিলো বেশ ডাকাবুকো স্বভাবের।গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে সে কিন্তু শহরে আসেনি কলেজে পড়তে।হুট করে প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের এক পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করে দিলো।বয়স তখন তার সতেরো বছর।তখনকার দিনে তো একবারেই গিয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হতে হত।তাই মাধ্যমিক পাশ করতে করতেই পনেরো,ষোলো বছর।এমতাবস্থায় প্রাইমারী স্কুলে টিচার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে ওই বয়সেই দরখাস্ত করে বসলো কাউকে কিছুই না জানিয়ে।
 চাকরির পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড যখন এলো তখন তার বয়স আঠারোতে পড়েছে সবে।আর অদ্ভুত ব্যাপার হল ইরা চাকরির এই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে গেলো।কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো তার পোষ্টিং নিয়ে।
  বাড়ি থেকে ঘোর আপত্তি এ চাকরি নিয়ে।এই বয়সে এতটা পথ হেঁটে যাতায়াত করতে গিয়ে শরীর তো ভাংবেই উপরন্তু রাস্তাঘাটে নানান বিপদ-আপদ ঘটতে পারে তাই বাড়ির কেউই চায় না রোজ বারো মাইল হেঁটে ইরা এ চাকরি করুক।বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ছ'মাইল।যেতে আসতে তার বারো মাইল পথ হাঁটতে হবে।কারণ পুরোটাই হল মাটির রাস্তা।বর্ষাকালে জলকাদায় ভর্তি থাকে গ্রামের রাস্তাগুলি।মাঝে মধ্যে রিক্সা ভ্যান চলে ঠিকই কিন্তু তা যে সব সময় পাওয়া যায় তাতো নয়।আর প্রথম অবস্থায় মাইনেই বা কটা টাকা যে রোজ রিক্সা,ভ্যানে যাতায়াত করবে? মোদ্দা কথা এ চাকরিতে যোগদান করা যাবে না। আরও পড়াশুনা করে আরও ভালো চাকরির চেষ্টা করতে হবে।
 কিন্তু ইরা শুনবে না সে কথা।সে এই চাকরি করবেই।সে রোজ ওই বারো মাইল পথ হেঁটেই যাতায়াত করবে।কেউই তাকে বোঝাতে পারলো না এতে তার শারীরিক মারত্মক ক্ষতি হবে। ঝড়,বৃষ্টি,রাত-বিরেতে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।সে গো ধরে বসে থাকলো এ চাকরি সে করবেই।চাকরিতে সে জয়েন করলো।নিত্য এ বারো কিলোমিটার (তখনকার দিনে কিলোমিটার বলা হত না মাইল ই বলা হত)পথ সে অনায়াসে হেঁটে যাতায়াত করতো।
  হঠাৎ করেই তার মনেহল সে প্রাইভেটে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে।যেমন ভাবা ঠিক তেমনই কাজ।বইপত্র জোগাড় করে সে শুরু করলো অতোটা পথ হেঁটে যাতায়াত করার পর বাড়িতে এসে পড়াশুনা।কি অদ্ভুত তার শারীরিক এবং মানসিক দৃরতা।এইভাবে সে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে।কিন্তু নানানভাবে চেষ্টা করেও সে কিছুতেই বাড়ির কাছে বদলী হয়ে আসতে পারে না।যেন কোন এক অদৃশ্য শক্তি তার মানসিক দৃরতা যেমন বাড়িয়ে চলেছে ঠিক তেমনই সেই অদৃশ্য শক্তিই তার বদলীর পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।এইভাবে পাঁচ থেকে ছ'বছর চাকরি করার পর সে গ্রামের বাড়ির পাশের স্কুলে আসতে সক্ষম হয়।
 তবে এই যাতায়াতের মধ্যে সে বন্ধু,দাদা কিংবা গার্জিয়ান হিসাবে পাশে পেয়েছে তাদের খোকনদাকে।( যার পুরো নাম শেখ আহম্মদ আলী খোকন।পড়ে তার প্রসঙ্গে আসছি।একটি ভিন্ন ধর্মের ছেলে কিভাবে তার অমায়িক ব্যবহার আর ভালোবাসার গুনে একটা ব্রাহ্মণ বাড়ির ঘরের ছেলে হয়ে উঠেছিলো)যেকোন সময় যে কেউ যখন বিপদে পড়েছে খোকন কিন্তু সেখানে যমদূতের মত এসে হাজির হয়েছে।
 একবার ঈদের সময় খোকন বাড়ির সবাইকে নিমন্ত্রণ করলো তার বাড়িতে ঈদ উপলক্ষে যেতে হবে শুধু নয় রাতে তার বাড়িতে থাকতেও হবে।বাড়ি ফাঁকা রেখে সকলের পক্ষে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।অগত্যা ঠিক হল ইরা থাকবে বাড়িতে কারণ রাতে একা থাকতে তার কোন ভয় করবে না।আর ঈদের জন্য কোর্ট বন্ধ থাকায় সেদিন অমরেশবাবুও শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে আসেন।দিন থাকতে থাকতেই খোকন ইরা আর অমরেশবাবু বাদে অন্য  সবাইকে নিয়ে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলো।বাড়িতে থেকে গেলেন বাপ আর বেটি।খোকনের দিয়ে যাওয়া ঈদের খাবার খেয়ে তারা সেদিন একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েন।রাত তখন প্রায় একটা হবে।কিছু শব্দে ইরার ঘুম ভেংগে যায়।সে বুঝতে পারে বাড়িতে চোর এসেছে।অন্ধকারের মধ্যে পা টিপে টিপে শব্দটা যেদিক থেকে আসছে সেখানে যায়। হ্যাঁ তার অনুমান সঠিক। চোরে সিদ কাটছে।আগেই বলেছি অমরেশবাবুর বাড়িটি ছিল কাঠের বেড়া দেওয়া আর মেঝে ছিল মাটির।কিন্তু উঠোন থেকে খুব উচুঁ ছিল তাদের ঘরগুলি।বারান্দা ছিল তিনদিকে।যেদিকে বারান্দা ছিলো না সেখানে ছিল ঠাকুর ঘর।
 আগেকার দিনে গ্রামের অবস্থাপন্ন বাড়িগুলোতে চুরি,ডাকাতি লেগেই থাকতো।তাই বাড়ির প্রোটেকশনের জন্য চারিপাশে বারান্দা থাকতো।ডাকাত আসলে আলাদা ব্যাপার কিন্তু চোর আসলে অন্তত সিদ কাটতে পারবে না।(হয়ত আজকের যুগে অনেকেই এই সিদ কথাটার অর্থ  বুঝতে পারবেন না।তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি এই সিদ হচ্ছে মাটির ঘরের যে মেঝে থাকে তা শাবল জাতীয় কিছু দিয়ে কেটে বড় গর্তের মত করা হয় যা দিয়ে সরাসরি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করা যায়।এমনভাবে ওই ফাঁকাটা বা গর্ত করা হয় যার ভিতর দিয়ে একটি মানুষ অনায়াসে ঘরের ভিতরে ঢুকতে পারে)চোর গ্রামেরই লোক।সে জানতো এই বাড়ির কোথায় কিভাবে সিদ কেটে ঢুকতে হবে তাই সে ঠাকুরঘরের দিকেই সিদ কাটতে থাকে।ইরা তার বাবুকে গিয়ে সব জানালে তিনি তাকে বলেন,
--- চুপচাপ শুয়ে থাকো ওরা ঘরে ঢুকে যা নেবার নিয়ে যাক।
 কিন্তু ইরা তো অকুতোভয়।সে তার বাবুর এ কথা মানতে পারলো না।সে তার বাবুকে জানালো,
--- তুমি চুপচাপ এই ঘরে বসে থাকো।কোন অবস্থাতেই ঘর থেকে বেরোবে না।যা করার আমিই করছি।
 অমরেশবাবু অনেকবার তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন।কিন্তু এত সহজে হেরে যাওয়ার পাত্র তো ইরা নয়।সে তার বাবুর অনুরোধ,আদেশ কোনটার তোয়াক্কা না করে মাছ মারার কোচটা নিয়ে (এই কোচ হচ্ছে অনেকটা বড় ত্রিশূলের মত।ত্রিশূলে তিনটে চ্যাপ্টা লোহা আর কোচে থাকে দশ থেকে বারোটা কিংবা তারও বেশি লম্বা ধারালো সরু লোহা।যা খালবিলে বড় বড় মাছ দেখলে এই কোচ সেই মাছের উপর ফেলে মারা হয়।) যেখানে চোরে সিদ কাটছে সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। আগেই সে একটি ধানের বস্তা একাই টেনে এনে ঠাকুরঘরে রাখে।একটা চল্লিশ কিলোর বস্তা টেনে আনা ইরার পক্ষে কোন ব্যাপারই ছিলনা।(এত পরিশ্রম আর ভারী জিনিস টানাটানির ফল অবশ্য সে বৃদ্ধা বয়সে এসে হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে)এই সব কাজই কিন্তু সে অন্ধকারের মধ্যে অতি সন্তর্পনে করেছে যাতে বিন্দুমাত্র শব্দ না হয়।আর তার বাবু অন্ধকার ঘরে খাটের উপর বসে ঠকঠক করে কাঁপতে থেকেছেন।চোর সিদ কেটে সবে মাত্র যেই তার মাথাটি ওই গর্তের ভিতর দিয়ে ঢুকানোর চেষ্টা করেছে অমনি ইরা তার হাতের কোচটি দিয়ে চোরের মাথায় আঘাত করেছে। চোরটি আর্তনাদ করে তার মাথাটি বের করে নেওয়ার সাথে সাথেই ইরা ধানের বস্তাটি  ওই গর্তের মুখের কাছে টেনে দিয়ে মুখটি বন্ধ করে দিয়েছে।

ক্রমশঃ 

Tuesday, November 9, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (বারো পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে(বারো পর্ব)
  কোঠাবাড়ির স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো।যুগযুগ ধরে ওইভাবেই ওই একই জায়গায় ইটের স্তূপ পড়ে রইলো।সাপ,ব্যাঙের উপদ্রপের ভয়ে বাড়ির কেউই আর ওদিকটা যেত না।
  একবার বাড়ির বছর মাইনের অপর একটি ছেলে নাম গোপাল নারকেল তেল ভাঙ্গানোর জন্য শুকনো নারকেল নিয়ে (নারকেল ছুলে নাকেলের টুকরোগুলোকে ছোটছোট করে কেটে রোদে শুকিয়ে মেশিনে দিয়ে তেল করা হত) ভাঙাতে গেলো।কিন্তু সে আর ফিরে এলো না চারিদিকে লোক পাঠানো হল।কিন্তু তাকে কেউ খুঁজে পেলো না।সকলেই বুঝতে পারলো গোপাল ফিরবে না বলেই ফেরেনি।সে ওগুলি চুরি করার উদ্দেশ্য নিয়েই বেরিয়েছিল।কিন্তু দিন সাতেক পরে ঠিক সন্ধ্যার দিকে গোপালের বাবা তাকে সাথে নিয়ে রায় চৌধুরী বাড়িতে হাজির।
 একবার গোপালের বাবা রামকৃষ্ণ মজুমদার জমি সংক্রান্ত একটি মামলায় মারত্মকভাবে ফেঁসে যান।অমরেশবাবু ছিলেন আসামী পক্ষের উকিল।জেল ছিল নিশ্চিত।কিন্তু অনেক চেষ্টায় তিনি রামকৃষ্ণকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন।আর তারপর থেকেই এই গরীব মানুষটা অমরেশবাবুকে দেবতা জ্ঞানে মান্য করতো।গোপাল সেদিন সমস্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে মামার বাড়িতে গা ঢাকা দিয়েছিল।মামাবাড়ির লোকেরাও জানতো না যে সে এই কুকৃত্তী করেছে।যখন রায় চৌধুরী বাড়ি থেকে গোপালদের বাড়িতে তাকে খোঁজার জন্য লোক পাঠানো হয়েছিলো তারা তখনই সবকিছু জানতে পেরেছিল।আর তারপরই তার খোঁজ মেলে তার মামাবাড়িতে।গোপালকে তার বাবা মেরে প্রায় আধমরা করে ভ্যানে বসিয়ে অমরেশবাবুর সামনে হাজির করে।অমরেশবাবু গোপালের ওই অবস্থা দেখে রামকৃষ্ণকে চরম ভর্ৎসনা করে সেই মুহূর্তে গ্রামের ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ্য করার চেষ্টায় ব্রতী হন।সেখানে উপস্থিত সকলেই অবাক!যে ছেলেটি তার বাড়ি থেকে জিনিস চুরি করে চম্পট দিয়েছিল তাকে হাতের কাছে পেয়ে তাকে শাস্তি দেওয়ার থেকে সুস্থ্য করে তোলার জন্য বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।এই হলেন অমরেশবাবু।
  গোপাল তার বাবার সাথে নিজেদের বাড়িতে চলে যায়।কারণ অমরেশবাবুর ইচ্ছা থাকলেও তার স্ত্রী এবং মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি তাকে রাখতে সাহস আর পান কি করে?
 অমরেশবাবু যখন থেকে রোজগার করতে শুরু করেছেন ঠিক তখন থেকেই তিনি তার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম,এবং নিজ গ্রামের অজস্র অসহায় গরীব মানুষদের সাহায্য করেছেন যা অনেক ক্ষেত্রেই তার নিজ পরিবারও জানতে পারেনি।শুধু কেউ বিপদে পড়লে বিনা টাকায় কেস লড়াই নয় পারিবারিক সাহায্যের হাতও বাড়িতে দিতেন।তার মৃত্যুর পর সেই সব ছেলেমেয়েদের বাবা,মায়েরা হয়ত কেউ দাঁড়িয়েছে তাই মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে বা অর্থ সাহায্যের প্রয়োজনে তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছেন তখন তাদের মুখ থেকে বাড়ির সদস্যরা জানতে পেরেছেন।
 বাড়িতে প্রচুর সবজি,ফলমূলের চাষ হত।অনেক সময় গ্রামের গরীব মানুষগুলি চেয়ে নেওয়ার পরও চুরি করেছে।তাকে সেসব কথা জানালে তিনি বলতেন,
--- যা তাদের দেওয়া হয়েছে হয়ত তাতে তাদের প্রয়োজন মেটেনি।তাই আমাদের বাগান থেকে বা মাঠ থেকে কিছু জিনিষ তুলে নিয়েছে।তোমরা এটাকে চুরি বলছো কেন?ওরা তো গরীব মানুষ।আমাদের অনেক আছে।সামান্য পরিমাণ কেউ নিয়ে নিলে আমাদের তেমন কোন ক্ষতি হবে না।অথচ ওরা আনন্দিত মনে ওগুলি খেতে পারবে।তাই ওদের কিছু বোলো না।
 এহেন মানুষটা যদি একবার রেগে যেতেন তাহলে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিতেন। নটি মেয়ে এবং সকলের শেষে একটি মাত্র ছেলে। ছ'নম্বর মেয়েটির নাম ছিল রণিতা।অমরেশবাবু কোন গালিগালাজ পছন্দ করতেন না কোনদিনও।একবার তার দুই মেয়ে মিলে চরম ঝামেলা করতে শুরু করে নিজেদের জামাকাপড় নিয়ে।হঠাৎ রণিতা তার দিদি ইরাকে বলে বসে,
--- শয়তান একটা 
 অমরেশবাবুর কানে যেতেই তিনি।চেম্বার ছেড়ে ঘরে ঢুকে রণিতাকে বলেন,
--- বাজে কথা বললি কেন? দিদির কাছে ক্ষমা চেয়ে নে।
--- ও আমাকে আগে বলেছে।তারপর আমি বলেছি।
--- আমি ওকে বলতে শুনিনি।তোকে বলতে শুনেছি।ক্ষমা তোকে চাইতেই হবে।
--- ওতো আমার বড়।বেশি চালাক ।তোমার কানে যাতে না যায় সেই জন্যই ও আস্তে বলেছে।আমি তো ছোট।ওর মত অত বুদ্ধি আমার নেই।আমি বুঝতে পারিনি তোমার কানে গেলে তুমি চেম্বার ছেড়ে ঘরে আসবে।
 মেয়ের যুক্তি এবং বুদ্ধির কাছে হেরে গেলেও জোর করে তাকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়াতে পারেননি।কারণ রিনিতার কথাকে সমর্থন জানিয়েছিল তার আর এক দিদি।রিনিতা তাই দেখে বলেছিলো,
--- তুমি তো উকিল মানুষ সাক্ষী ছাড়া কোনকিছু বিশ্বাস করোনা ওই তো আমার পক্ষে দাদা সাক্ষী দিলো।
 (একদিদিকে কেন তারা দাদা বলতো এবার সেটাই বলছি)
 পরপর অনেকগুলি মেয়ে হওয়ার ফলে ভাই বা দাদা না থাকাতে ভাইফোঁটার দিনে তাদের মন খুব খারাপ থাকতো।একবার রিনিতা ভাইফোঁটার দিনে খুব কান্নাকাটি করার সময় দিদি মালতী তাকে বলেছিলো,
--- ভাই নেই বলে এত কান্নাকাটির কি আছে আমি তো তোর বড় দিদি।আজ থেকে আমায় তুই দাদা ডাকবি।আর আগামীবার ভাইফোঁটার দিনে আমায় ফোঁটা দিবি।
 সেই থেকে ছোটরা সকলেই মালতীকে দাদা বলেই ডাকতো।তারপর যতদিন না তাদের ভাই হয়েছে তারা ভাইফোঁটার দিনে মালতীকেই ফোঁটা দিতো।এবং এই ব্যাপারটিকে অমরেশবাবু ভীষণভাবে সমর্থন করতেন।এই দিনে তিনি তার বোনের বাড়ি ফোঁটা আনতে গেলেও বাড়িতে ভাইফোঁটার আয়োজন করেই বেরোতেন।
 খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন ভীষণ নিখুদ মানুষ।বাজারের সেরা জিনিসটিই তিনি কিনে আনতেন।কিন্তু নিজের এবং বাড়ির অন্য সকলের পোশাকআশাক নিয়ে তার কোন হেলদোল ছিলো না।একমাত্র পুজোর সময় পরিচিত দর্জিকে বাড়িতেই তলব করতেন।গোটা একটা ছিট-কাপড়ের থান নিজেই পছন্দ করে কিনে নিয়ে আসতেন।মেয়েরা সব উঠোনে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তো।দর্জি তার বিশাল লম্বা খাতায় সকলের জামার মাপ নিয়ে লিখে নিয়ে যেতেন। জামা তৈরি হয়ে গেলে দর্জি নিজেই এসে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যেতেন।পুজোর সময় সকলে একই ধাঁচের একই কাপড়ের জামা পরে ঠাকুর দেখে বেড়াতো।মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীরা টোন করতেও ছাড়তো না।তারা অমরেশবাবুর মেয়েদের ওই একই কাপড়ের জামা পরিহিত দেখে হাসাহাসি করে বলতো,
--- রায় চৌধুরী বাড়ির ইউনিফর্ম।
 কিন্তু সত্যি কথা বলতে তাঁর মেয়েরা তাঁর পছন্দ করা ওই একই কাপড়ের জামা পড়তে বেশ গর্ববোধ করতো।আবার পুজো প্যান্ডেলে একজন আর একজনকে খুঁজে না পেলে গর্বের সাথে অন্যদের কাছে জানতে চাইত
--- আমার মত এই একই জামা পড়া কাউকে দেখেছেন?
 পোশাকআশাকের প্রতি তাঁর যেমন কোন আগ্রহ ছিলো না ঠিক তদ্রুপ তাঁর মেয়েদেরও কোন আগ্রহ ছিলো না।প্রতিটা বোনের মধ্যে আন্তরিকতা,ভালোবাসা ছিলো ভীষণভাবে এবং যা একই ভাবে আজও তা সমানভাবে বিধ্যমান।সাজগোজ তিনি একদমই পছন্দ করতেন না।বিশেষত তার অপছন্দের তালিকায় ছিল লিপস্টিক পরা। তাঁর সমস্ত মেয়েরা সব সময় তার পছন্দ অপছন্দের ভীষণভাবে মূল্য দিত।প্রতিটা মেয়ের কাছেই ছিলো তাদের বাবুর কথায় শেষ কথা।মেয়েরা তাদের বাবুর কথাকে বেদবাক্য এ সম্মান জানাতো।মাকে তারা ভয় পেলেও 
তাদের কাছে তাদের বাবুই ছিলেন বেস্ট ফ্রেন্ড।সকলের মনের কথা বলার একজন খুব কাছের বন্ধু।

ক্রমশঃ