Wednesday, October 2, 2019

ভাবনারা কাঁদায়

#শতশব্দেরগল্প

 #ভাবনারা_কাঁদায়
     নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী।
 
       একবছর ঘুরে আবার সেই পনেরই  অক্টোবর।সেদিন সকাল থেকেই বাড়িতে সাজো সাজো রূপ।বাড়ির প্রতিটা সদস্য এই দিনটার জন্য মুখিয়ে থাকে।সারাবছর সীমান্তে দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করে,নিজের পরিবারের সদস্যদের ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সকলকে ছেড়ে বাড়ি থেকে কয়েকহাজার কিলোমিটার দূরে যে মানুষটা পড়ে থাকে সে যেদিন ঘরে ফিরবে সেদিনটা থেকেই পুজোর আনন্দ শুরু হয়ে যায়।পুজোর সময় বাড়িতে এসে একটা মাস সকলের সাথে কাটিয়ে সমীর ফিরে যায় আবার তার কর্মক্ষেত্রে।গতবছআর আসার আগেরদিন ফোনে লিপিকার সাথে কথা হয়েছে সকাল দশটা নাগাদ বেরোবে।সেদিন রাতের খবরে সকলে জানতে পারে ট্রেনে জঙ্গীহানার খবর।সেই তুমি আসলে কিন্তু সশরীরে নয় কফিন বন্ধি হয়ে। 

Wednesday, September 18, 2019

স্বাধীনচেতা

স্বাধীনচেতা মানুষ আমি।অন্যায়কে কখনোই প্রশ্রয় দিতে শিখিনি।নিজের অপমান মুখ বুজে চোখের জল ফেলে সহ্য করলেও আমার সামনে অন্যের অপমানে চুপ করে থাকতে পারিনা।কেউ বিপদে পড়লে আপন পর,লাভ ক্ষতির বিচার না করেই ঝাঁপিয়ে পড়ি।যার ফলে অনেকক্ষেত্রে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েও পড়ি।নানান সমালোচনার সম্মুখীনও হই।ছেলেবেলার থেকেই এইরূপ আমি।তখন কেউ কিছু বললে খুব কষ্ট পেতাম কিন্তু এখন আর পাইনা ;অভ্যাস হয়ে গেছে।তবে এখন হাসি পায় ---,সময় আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছে।রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের সম্পর্কে জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছে।নিঃস্বার্থ ভাবে কারও ভালো করতে গেলে তাদের কথা যে হজম করতেই হবে এটা জেনেই এখন অন্যের পাশে দাঁড়াই।দাঁড়াতেই হয় কারন আমি মানুষটাই যে এইরকম ...।যারা আমায় ভালোবাসে তারা অন্ধের মত ভালোবাসে আর যারা আমায় সহ্য করতে পারেনা আমায় দেখলে তারা উল্টোদিকে হাঁটে।এই বয়সে এসে আমার এগুলো গা সওয়া হয়ে গেছে।ওই যে ক'দিন ধরে ফেবুতে দেখছি ---'ইগনোরয় নম'---।

Sunday, September 15, 2019

বৃষ্টি ভেজা মন

বৃষ্টি ভেজা মন
     নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

  কানে হেড ফোন দিয়ে অলকা চোখ বুজে গান শুনছিলো আর বন্ধ চোখের দুচোখের কোল বেয়ে শ্রাবণের অবিরাম ধারার মত অশ্রুধারা বয়ে চলেছে।ছেলে এসে কান থেকে  হেডফোনটা খুলে দিয়ে মায়ের পাশে বসে বলে,'যে গান শুনলে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে সেই গান বারবার কেন শোনো?'তোমাকে কতদিন নিষেধ করেছি তুমি কান্নাকাটি করলে আমার যে খুব কষ্ট হয়।
অলকা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলে,'কাঁদিনি তো।এই দেখ আমি হাসছি।'
জোর করে মুখে হাসি এনে ছেলে অর্কের দিকে তাকায়।অর্ক মায়ের বুকের উপর মাথাটা রেখে বলে,
---আজ দু'বছর হয়ে গেছে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।কিন্তু বিশ্বাস করো মা আমি বাড়িতে থাকলেই প্রতিমুহূর্তেই যেন বাবার অস্তিত্ব টের পাই।এমন অনেকদিন হয়েছে বন্ধুদের সাথে বাইরে আড্ডা দিচ্ছি হঠাৎ যেন মনেহয় বাবা আমায় বলছেন,'মা একা বাড়িতে রয়েছেন বাড়ি যা।'আবার অনেক সময় কোন কাজ করবো মনস্থির করেছি পরক্ষণে মনেহয় বাবা যেন কাজটা করতে নিষেধ করছেন।কেন এরূপ মনেহয় মা?
---আসলে তুই তো খুব বাবাকে ভালোবাসতিস,ছেলেবেলায় বাবার খুব ন্যাওটা ছিলি,আমার একটাও কথা শুনতিস না ঠিকই কিন্তু তোর বাবার সবকথা শুনতিস।তোর মনে তোর বাবার আজও সেই জায়গাটা রয়ে গেছে।তাই চেতন অবচেতনে তুই যাই করিস না কেন তোর মনেহয় তোর বাবাই তোকে বলছে।
--হয়তো তাই হবে। 
        তিন ছেলের পরে এক মেয়ে।আদর করে মেয়ের নাম রাখা হয় অলকা।তিন দাদা আর মা, বাবার চোখেরমনি।মাধ্যমিকে ও উচ্চমাধ্যমিকে  ষ্টার মার্কস নিয়ে পাশ করে অঙ্কে অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়।কলেজেই পরিচয় হয় প্রবীরের সাথে।একই সাবজেক্ট।প্রবীরও পড়াশুনায় খুবই ভালো।পড়াশুনার ব্যপারে দু'জন দু'জনকে খুব সাহায্যও করে।যার যতই শরীর খারাপ হোকনা কেনো কলেজ কেউ কামাই করেনা।বাস স্টপেজে নেমে কিছুটা পথ হেঁটে কলেজে ঢুকতে হয়।একদিন সকাল থেকেই প্রচণ্ড বৃষ্টি।চারিদিকে গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেছে।মুষলধারে বজ্রপাতের সাথে দমকা হাওয়া।এক পা এগোনো যাচ্ছেনা।সামনে এগোতে গেলে হাওয়ার দাপটে  পিছনের দিকে পিছিয়ে যেতে হচ্ছে।বাতাসের সাথে বাতাসের ঘর্ষণে এমন একটা অদ্ভুত আওয়াজ হচ্ছে যেন মনেহয় কোন দুষ্টু ছেলে শীষ দিয়ে চলেছে।রাস্তায় যানবাহন নেই বললেই চলে।অলকা বাস স্টপেজের শেডের নীচে চেয়ারের হাতলটাকে শক্ত করে ধরে বসে।তার আশা প্রবীর আসবেই।
   কিছুক্ষণ পরে কাকভেজা হয়ে প্রবীর এসে উপস্থিত হয়।আস্তে আস্তে বৃষ্টি কিছুটা ধরে আসলে দুজনে কলেজ গেটে এসে দেখে সেদিন কলেজের গেটই খোলেনি।ভিজে চপচোপে হওয়া একটি কাগজ গেটে ঝুলিয়ে দেওয়া 'বৃষ্টির জন্য আজ কলেজ ছুটি'।দু'জনেই ভিজে একসার।এদিকে ওদিকে তাকিয়ে অর্ধেক ঝাঁপ ফেলা একটি চায়ের দোকানে গিয়ে ঢোকে।দোকানদারের আজ তেমন খদ্দের নেই।ওরা দোকানে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিলে তিনি চায়ের জল চাপিয়ে দেন।দু'জনের এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় কি করে তারা বাড়ি ফিরবে।অলকার তো বাসে করে বেশ খানিকটা যেতে হবে আর প্রবীরের মিনিট পনের হাঁটা পথ।
--তুই আমাদের বাড়িতে চল আলো।
---এই ভিজে জামাকাপড়ে?
--আরে সেই জন্যই তো বলছি।বোনের একটা জামা পরে চলে যাবি।চা টা খেয়ে চল আমরা হাঁটতে শুরু করি।
--কি পরিচয় দিবি বাড়িতে আমার?
--কেন বন্ধু।আর বোন তো সব জানে।
--তুই বোনকে আমাদের কথা বলেছিস?
--আরে না বলে উপায় আছে।ফোনে তোর সাথে কথা বলতে শুনে ফেলেছিলো।তারপর এমন চেপে ধরলো,মাকে বলে দেবে বললো তখন বলতেই হোল যে আমি অলকা নামে একটি মেয়েকে ভালোবাসি।
--কিন্তু কই ?তুই তো আমাকে কোনদিন বলিসনি আমায় ভালোবাসিস।
--সেতো তুই ও আমাকে বলিসনি।সবকথা কি আর মুখ ফুটে বলতে হয় রে?কিছু কিছু কথা পরস্পরকে বুঝে নিতে হয়।
কথা বলতে বলতে ওরা প্রবীরদের বাড়ির গেটের কাছে চলে আসলো।প্রবীরের বোন এসে দরজা খুলে দিয়ে অলকাকে দেখে বললো,
--তুমি নিশ্চয়ই অলকা?
প্রবীর ধমক দেয়।'এই অলকা কিরে অলকাদি বল।'
প্রবীরের বোন সুস্মিতা প্রবীরের কানে কানে বলে,'দাদা সময়মত বৌদি বলবো।এখন তো মাকে আমার বন্ধু বলে পরিচয় দিতে হবে।বন্ধুকে তো আর দিদি বলা যায়না।'
প্রবীর হাত তুলে বোনকে মারতে গেলো।সুস্মিতা হাসতে হাসতে অলকার হাত ধরে তাকে ঘরে নিয়ে গেলো।
সেদিন প্রবীরের মা অলকাকে না খাইয়ে ছাড়লেন না।সুস্মিতার একটা গোলাপী রঙ্গের সালোয়ার কামিজ পড়েছিলো অলকা।প্রবীর হা করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো।একসময় বোন নিজেই সুযোগ করে দেয় ওদের একাকী কথা বলার।সেদিনই প্রবীর অলকার গোলাপী ঠোঁটদুটো প্রথম ছুঁয়েছিলো।সে এক অদ্ভুত অনুভূতি।সমস্ত শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে কিন্তু সে অনুভূতি ব্যক্ত করার ক্ষমতা ঈশ্বর তাকে দেননি।পরবর্তীতে প্রবীর বহুবার অলকার ঠোঁটদুটিকে নানানভাবে নিজের ঠোঁট ও মুখের সাহায্যে স্পর্শ করেছে কিন্তু সেই প্রথম দিনের শিহরণ আজও যেন চোখ বন্ধ করলে অনুভূতিতে শরীর সারা দেয়।
     কলেজ জীবন শেষ করেই প্রবীর কিছুদিনের মধ্যেই সরকারী কলেজে চাকরী পেয়ে যায়।অলকা তখনও বেকার।চাকরীর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।এরই মধ্যে তার বাড়ি থেকে তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে।প্রথমে চাকরী না পেয়ে বিয়ে করবে না বলে কিছুদিন চালালেও বাবা,মায়ের তাকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কাছে হার মানতেই হয়।বড় বৌদিকে গিয়ে সব জানায়।বড়দা শুনেই রাজি হয়ে যান।এই বড়দাই একে একে অনান্য ভাইদের ও বাবা,মাকে রাজি করায়।বিয়ের ছ'মাস পরেই সেও একটি সরকারী স্কুলে চাকরী পেয়ে যায়।প্রবীরের বোনের সাথে ছোটদা অনিকেতের বিয়েটা অলকা নিজেই ঠিক করে।দু'বছরের মাথায় অলকার কোল জুরে অর্ণব ওরফে অর্ক আসে।সকালে উঠে সংসারের যাবতীয় কাজ সেরে অর্কের সারাদিনের খাবারের জোগাড় রেখে স্কুলে বেরিয়ে যাওয়া; অলকার বেরোনোর অনেক আগেই অবশ্য প্রবীর বেরিয়ে পড়ে।প্রবীরের কলেজটা একটু দূরে।অলকার স্কুলটাও দূরে ছিলো কিন্তু অর্ক পেটে থাকতে প্রবীর অনেক ছুটোছুটি করে বাড়ির কাছেই একটি স্কুলে বদলী করাতে সক্ষম হয়।বাড়ির থেকে বেরিয়েই অটোতে মিনিট দশেক।নিজের বাড়িতে নিজের মা ঠিক যতটা মেয়ের যত্ন সম্পর্কে সচেতন থাকতেন অলকা বৌ হয়ে আসার পর দেখেছে তার শ্বাশুড়ীমা ও ঠিক তেমনই।যেহেতু অর্কের দেখভালের সমস্ত দায়িত্ব তার শ্বাশুড়ীমায়ের তাই সে রান্নাবান্নার ব্যপারটা নিজেই করে।স্কুলের বেরোনোর মুহূর্তে কতবার যে রান্নাঘরে এসে বলেন,'বৌমা,তোমার দেরি হচ্ছে,বাকিটা আমি করে নেবো,টিফিনটা গুছিয়েছো?সেদিন তো ভুলে গেলে, সারাটাদিন না খেয়েই কাটিয়ে দিলে।দাও তো টিফিনবক্সটা আমি ব্যাগের উপর রেখে আসি -----।এইরূপ আরও কত কি।অলকা ভাবে সত্যি ভাগ্য করে শ্বাশুড়ী পেয়েছে।এমন শ্বাশুড়ী কপাল না করলে ভাগ্যে জোঠেনা।
   সবই ঠিকঠাক চলছিলো।কিন্তু অলকার এই সুখ দেখে বিধাতা পুরুষ মনেহয় অলক্ষ্যে হেসেছিলেন।অর্ক তখন সবে ক্লাস সেভেন।অর্কের ঠাকুমা একদিন বাথরুমে পরে গিয়ে কোমরে মারাত্মকভাবে আঘাত পান।সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতাল ভর্তি করানো হয়।বেশ কিছুদিন হাসপাতালে তাকে ট্রাকশান দিয়ে রাখা হয়।বয়সটা অতিরিক্ত হবার ফলে ডক্টর অপারেশন করতে ঠিক রাজি ছিলেননা।কিন্তু হাসপাতালে থাকাকালীন সময়েই ঘুমের মধ্যেই একটা মাইন অ্যাটাক হয়।কিছু আর করার ছিলোনা।অতিরিক্ত বয়স আর দুর্বল শরীর এই আক্রমন নিতে পারেনি।তিনি তার সুখের সংসার ছেড়ে চিরতরে চলে যান।
    শ্বাশুড়ীকে হারিয়ে অলকা ভীষণ ভেঙ্গে পরে।নিজের মা আর শ্বাশুড়ী মায়ের মধ্যে কখনোই কোন পার্থক্য সে করেনি কোনদিন।এই সময়ে তার মা এসে তাদের কাছে দিনপনের থাকেন।তিনিও বেশিদিন থাকতে পারেন না কারন বাড়িতে অসুস্থ্য বয়স্ক স্বামীর দেখভালের প্রয়োজনে তিনি পনেরদিন পরেই তার নিজের বাড়ি ফিরে যান।অলকা তার সংসার,চাকরী,ছেলে আর স্বামী নিয়ে হিমশিম খেতে খেতে এই জীবনযাত্রায় সে অভ্যস্ত হয়ে পরে।রাতে যখন খাটে শরীরটাকে এলিয়ে দেয় তখন মাঝে মাঝে প্রবীরের আদরটাও অসহ্য মনেহয়।শরীরের সাথে মনের যে অমোঘ সম্পর্ক তাকে তো আর অস্বীকার করা যায়না।ছুটির দিনগুলোতেও এক মুহূর্ত বসবার ফুসরৎ অলকা পায়না।সেদিন কাচাকুচি,ঘরদোর পরিষ্কার করা---সে যেন আরও হ্যাপা।অবশ্য প্রবীর সুযোগ পেলেই অলকার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
    ছেলে আগামীবার মাধ্যমিক দেবে।বিয়ের পর সেই একবার তারা দার্জিলিং গেছিলো আর এতগুলো বছরে তাদের আর বেরোনোর উদ্দেশে বাইরে পা রাখা হয়নি।এবার গ্রীষ্মের ছুটিতে তারা ঠিক করে তিনজনে মিলে গ্যাংটক যাবে।সেইমতো তোড়জোড় শুরু করে।কিছু কেনাকাটা করার জন্য এক রবিবার স্বামী, স্ত্রী দু'জনে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পরে।হঠাৎ করে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। অলকা পিছন দিক থেকে প্রবীরকে জোরে ঝাপটে ধরে বলে,'এই মনে আছে আমাদের কলেজ জীবনের বৃষ্টির দিনগুলোর কথা?'বৃষ্টির শব্দে প্রবীর ঠিক ভালোভাবে কথাটা শুনতে পায়না।সে একটু ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চায়,'কি বললে?'আর ঠিক তখনই তাদের বাইকের চাকাটা স্লিপ করে কাত হয়ে ঘষতাতে ঘষতাতে প্রবীরকে নিয়ে বেশ কিছুটা দূরে চলে যায়।অলকা বাইকটা কাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তায় পরে যায়।অল্পবিস্তর আঘাত লাগে।কিন্তু প্রবীরের মাথা থেকে হেলমেটটা খুলে যাওয়ার ফলে -----।স্পট ডেথ।সব স্বপ্নআশা এক নিমেষেই ভেঙ্গে চুরমার।সময়ের হাত ধরে এই শোক আস্তে আস্তে অলকা ও তার ছেলে কাটিয়ে উঠলেও আজও যখন বৃষ্টি নামে তখন অলকার প্রথম প্রেমের ছোঁয়া আর সারা জীবনের মত সেই প্রেমিককে হারানোর বেদনা দুইই  মিলেমিশে এক হয়ে চোখের কোন ভিজিয়ে দেয়। 

Saturday, August 31, 2019

জীবনের স্মৃতি

জীবনের স্মৃতি
         নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

কিছু মুহূর্ত আর কিছু শব্দ
পিছনে ফেলে এসেছি,
যেগুলো আজ শুধুই স্মৃতি।

সিনেমার ফ্লাশব্যাকের মত
মুহূর্তরা সামনে আসে,
শব্দগুলো আজও মনে দেয় দোলা,
আজ তারা জীবনের অথিতি।

ভাবনার সাথে বাস্তবের আজ মিল নেই
স্বপ্ন দেখতে আজ আর ভালো লাগেনা,
সমুদ্রের অহরহ ঢেউগুলির মত,
শব্দ আর মুহূর্তরা আঘাত হানে।

জীবন থেকে অনেকটা সময় চলে গেছে
সময়ের মূল্য তখন বুঝিনি,
হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলিকে প্রতিনিয়ত ফিরে পেতে চাই,
অব্যক্ত যন্ত্রণা আর শিশিরে ভেজা ভালোবাসা,
বয়ে চলেছি শুধু মনে মনে।

       30-8-19   12AM





Wednesday, August 21, 2019

চিরকুট

চিরকুট

ফুলের সুগন্ধে সবাই মোহিত,
কিছু তো গুণ আমারও আছে---
আমি কেন অনাদরিত?
ফুলের কাঁটা আঘাত করে,
তবুও ভালোবাসা সে পায়।
আমি উজাড় করে ভালোবাসি---
বিশ্বাসে ঠকি,অন্যের আঘাত নিয়ে বাঁচি,
কেন তবে কাছের মানুষ দূরে সরে যায়? 

Monday, August 19, 2019

জীবনতরী একতারেতেই বাঁধা

জীবনতরী একতারেতেই বাঁধা
  নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

     শহরের নামকরা বৃদ্ধাআশ্রম।এখানে বয়স্ক নারী পুরুষ একই ছাদের তলায় শুধু রুমগুলিই যা আলাদা।সুবিধা সর্বরকম।খাওয়াদাওয়া, নানান স্থানে তাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ;যারফলে অন্যান্য বৃদ্ধাআশ্রমগুলি থেকে এখানে খরচটা একটু বেশিই।এখনকার বয়স্ক বয়স্করা তাদের ছেলেমেয়েদের এতো বড় মানুষ তৈরী করেছেন যে তারা তাদের পিতামাতাকে বেশ আদরযত্ন পাওয়ার জন্য অর্থের কথা মোটেই ভাবেননি!
এখানে আশ্রিতদের ছেলেমেয়েরা সকলেই অর্থের বিনিময়ে সংসারে সুখ শান্তি কিনেছেন।খেয়ে না খেয়ে,নিজেদের শখআহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে নিজেদের সন্তানকে মোটা অংকের টাকা উপার্জনক্ষম করে বড় করেছেন কিন্তু এদের কাউকেই মানুষের মত মানুষ করতে পারেননি!
   চন্দ্রনাথ ব্যানার্জি।এই আশ্রমের প্রধান।বয়স মাত্র আটান্ন বৎসর।চাকরী জীবন থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন।চাকুরী করতেন বিশাল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর উচ্চপদে।সংসার তার জীবনে আর হয়নি।বলা ভালো জীবনে একজনকে  ভালোবেসে তাকে না পেয়ে আর কাউকেই সেই জায়গাটা দিতে পারেননি।
     গ্রামের স্কুল জীবন শেষ করে কলকাতায় কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে কলেজে যখন ভর্তি হয় চন্দ্রনাথ তখনও তার গ্রাম্য সরলতার কারনে অধিকাংশ সময় মানুষ চিনতে ভুল করেছে ও নানান কারনে অন্যের দ্বারা অপমানিত ও অসম্মাননিত হয়েছে।পড়াশুনায় তুখোড় চন্দ্রনাথ কলেজের প্রত্যেক অধ্যাপকের ছিলো প্রিয়পাত্র।কিন্তু হোষ্টেলের ছাত্রদের সাথে কখনোই তার সরলতা দিয়ে তাদের ছলচাতুরীকে জয় করতে পারেনি।একই রুমে ছিলো চারজন।অধিকাংশ দিনই তার বিছানার চাদর থাকতো মেঝেতে,বই থাকতো অন্যের টেবিলে,তার কলম সে খুঁজে পেতোনা।কিন্তু মুখ ফুটে কোনদিনই সে কাউকেই কিছু বলেনি।পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটাতে তারা ছিলো ওস্তাদ।একবার ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়ে বাবাকে সবকথা জানাতেই স্কুল শিক্ষক বাবা কলকাতায় তার এক বাল্যবন্ধুআর বাড়িতে তাকে পেয়িংগেষ্ট রাখেন।
   বাদল চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে অনুরাধা।রূপে গুণে জুড়ি মেলা ভার।তখন সবে মাধ্যমিক দিয়েছে।চন্দ্রনাথ তাকে দেখলেই কেমন জড়সড় হয়ে যেতো।অনুরাধা কিছু জিজ্ঞাসা করলে বেশিরভাগ সময় মাথা নাড়িয়ে বা হ্যাঁ না তেই উত্তর দিতো।দোতলা বাড়ির উপর তলাতে থাকতেন ব্যাঙ্ককর্মী বাদল চৌধুরী,তার স্ত্রী আর একমাত্র মেয়ে অনুরাধা।শুধু খাবার সময়েই বাদলবাবুর স্ত্রী মনোরমা একটি বেল বাজিয়ে চন্দ্রনাথকে ডাকতেন।মনোরমাদেবী চন্দ্রনাথকে খুবই ভালোবাসতেন।উনি নিজেও ছিলেন গ্রামের মেয়ে।চন্দ্রনাথের সরলতায় মনোরমাদেবী মুগ্ধ হয়েছিলেন।সময় পেলেই গ্রামের সবুজ ধানক্ষেত,আমবাগান,লিচু পেয়ারা বাগান নিয়ে পুত্রসম চন্দ্রের সাথে ঘণ্টার পর ঘন্টা গল্প করে চলতেন।মাঝে মাঝে অনুরাধা এসে হাজির হলে চন্দ্রনাথ তখন শ্রোতার ভূমিকা গ্রহণ করতো।অনুরাধাকে দেখলেই চন্দ্রনাথ কেমন খোলসের ভিতর নিজেকে গুটিয়ে নিতো।কিছুতেই সে অনুরাধার সামনে ফ্রী হতে পারতোনা।কিন্তু বাদলবাবু চন্দ্রকে আটকে তার স্ত্রীর এই গল্প করাটাকে কিছুতেই মানতে পারতেন না।তার অবশ্য অন্য কারন আছে।এখানে থেকে বাল্যবন্ধুর ছেলের পড়াশুনার ক্ষতি হোক তিনি তা কিছুতেই চাইতেননা।চন্দ্রনাথের বাবা যখন ফোন করে বন্ধুকে এই ব্যপারে সাহায্য করতে বলেন বন্ধু বাদলবাবু বলেন,
--আরে তোর ছেলে কি আমারও ছেলে নয়?তুই নিশ্চিন্ত মনে ওকে পাঠিয়ে দে আমার কাছেই ও থাকবে।আর শোন,টাকাপয়সার কথা একদম বলবিনা। গ্রামে যখন আমরা একসাথে থাকতাম তখন তোর আমার দু'বাড়িতেই আমাদের জন্য রান্না হোত।যেদিন যে বাড়ি ইচ্ছা হোত স্কুল থেকে ফিরে সেই বাড়িতেই খেতাম।কথাগুলো বলেই হা হা করে হাসতে থাকেন বাদলবাবু।
     চন্দ্রনাথের যখন লাষ্ট ইয়ার তখন ক্যাম্পাস থেকেই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরী হয়ে যায়।কলেজ থেকে ফেরার আগেই বাবাকে স্কুলে ফোন করে জানায়।অনুরাধাদের বাড়িতে ফিরেই সেই জামা কাপড় পরেই দৌড়ে উপরে উঠতে গিয়ে অনুরাধার সাথে একদম সামনাসামনি ধাক্কা।অনুরাধা তাল সামলাতে না পেরে পিছনের দেওয়ালের দিকে পড়ে যেতে গেলে চন্দ্রনাথ খপ করে অনুরাধার একটি হাত ধরে টান দেয়।পিছন ঘূরেই অনুরাধা একদম চন্দ্রনাথের বুকের উপর।ঘটনার আকস্মিকতায় দু'জনে কিছুটা সময় ওই ভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।কিছুক্ষণ পর নিজেদের মুক্ত করে চন্দ্র মাথা নীচু করে বেরিয়ে যেতে যায়।তখন তার বুকের মধ্যে ঠকঠক করে কাঁপছে।পা দুটো যেন অসার।অনুরাধার কথায় পিছন ফেরে--
---কিছু না বলেই চলে যাচ্ছেন যে?কি বলতে এসেছিলেন বললেন না তো?তবে মা,বাবা এখন বাড়িতে নেই।আমাকে বললে হবে?
---আচ্ছা আমি পড়ে আসবো।
--কিন্তু আমার যে একটা কথা বলার ছিলো।
চন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে পড়ে।মুখটা নীচুর দিকেই থাকে।
--এই দেখুন আপনার সাথে কথা বলছি আর আপনি মুখটা নীচু করেই আছেন। আমার মুখের দিকে তাকান।
চন্দ্র আস্তে আস্তে মুখ তুলে অনুরাধার দিকে তাকায়।
---আমার চোখে চোখ রেখে দেখুন তো আমি যা বলতে চাই তা আপনি বুঝতে পারেন কিনা।
চন্দ্রনাথ লাজুক হেসে বলে,'পারি।'
    পরীক্ষা শেষে দিনসাতেকের জন্য চন্দ্রনাথ গ্রামের বাড়িতে চলে যায়।যাওয়ার আগে অনুরাধার সাথে আলাদাভাবে কোন কথা আর হয়না।অনুরাধার তখনও গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হয়নি।বাদলবাবু ও তার স্ত্রী চন্দ্রনাথকে যাওয়ার সময় বারবার করে বলে দেন,অফিসে প্রথমদিন যাতে সে এই বাড়ি থেকেই যায়।সেও সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে আসে।গেটের বাইরে এসে ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখে অনুরাধা হাত নাড়ছে।অনুরাধা ইশারায় তাকে কিছু বলতে চাইছে।কিন্তু শতচেষ্টা করেও চন্দ্রনাথ অনুরাধার ইশারা বুঝতে পারেনা।
    বাড়িতে কয়েকটা দিন খুব আনন্দ,উল্লাসের মধ্যে কেটে যায়।কিন্তু এর ভিতরেও বারবার তার অনুরাধার কথা মনে হয়েছে।কলকাতা ফেরার আগেরদিন রাতে বাবা বললেন, 'এবার একটা ছোটখাটো ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে উঠে যেতে।বাল্যবন্ধু বাদল যা করেছেন তার ঋণ এ জীবনে শোধ হবার নয়।আর ঋণের বোঝা বাড়িয়ে কাজ নেই।যেভাবে হোক একটা ঘর ভাড়া করে উঠে যেও।'
   দু , একদিন অনুরাধাদের বাড়ির থেকে অফিস করে কলিগদের সহায়তায় একটা ছোট বাড়ি ভাড়া নিয়ে চন্দ্রনাথ সেখানে উঠে যায়।চলে যাওয়ার সময় একটু সুযোগ করে  অনুরাধাকে কথা দিয়ে যায় একটু গুছিয়ে নিয়েই বাবা,মাকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে।ছলছল চোখে অনুরাধা চন্দ্রনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে,অনেককিছু বলার ইচ্ছা থাকলেও কিছুই বলতে পারেনা।
    চন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর এই আশ্রমের নাম ' রাধানাথ আশ্রম'।প্রায় রোজই কেউ না কেউ এই আশ্রমের বাসিন্দা হন সম্পূর্ণ অনিচ্ছা সত্বে।যারা তাদের দিতে আসেন সকলের মুখেই থাকে হাসি আর যে বয়স্ক মানুষটা বাসিন্দা হতে আসেন তার চোখে থাকে অবিরাম জলধারা।এদের ছেলেমেয়েরা কেউ কেউ মাঝে মধ্যে কারও কারও সাথে দেখা করতে আসেন।আবার অনেকে মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর নিজ সন্তানের মুখ দেখতেই পাননা।এইসব সন্তানদের প্রভাব
প্রতিপত্তি আরও কয়েকধাপ উঁচুতে।কিন্তু টাকার কার্পণ্য তারা করেননা।ধনী ব্যক্তির বাড়িতে পুরনো আসবাবপত্র যেমন রাখেনা অধিকাংশ ধনী পরিবারে এইসব বয়স্ক মানুষগুলো ওই পুরনো আসবাবপত্রের মতই।
   একদিন দুপুর বারোটা।সাতাশ আঠাশ বছরের সুন্দর, সুপুরুষ একটি ছেলে একজন বয়স্ক মহিলার হাত ধরে অফিস রুমে প্রবেশ করে।আজ প্রায় দুদিন ধরে এই যুবকটির সাথে চন্দ্রনাথ বাবুর বার দশেক কথা হয়েছে।যুবকটি পরিচয় দেয় মহিলার মাসতুতো ভাই হিসাবে।চন্দ্রনাথবাবুর সামনে বসেই মহিলা প্রাথমিক টাকার চেকটা লিখে দেন।যুবকটি সমস্ত কাগজপত্র লিখে দিদির স্বাক্ষর করিয়ে সবকিছু চন্দ্রনাথ বাবুর হাতে তুলে দেয়।তিনি অন্য লোক মারফৎ মহিলাকে তারজন্য বরাদ্দ নিদৃষ্ট রুমে পাঠিয়ে দেন।বয়স্কমহিলা চন্দ্রনাথবাবুর দেওয়া লোকটিকে অনুসরণ করেন।যুবকটির কাছে তখন চন্দ্রবাবু মহিলার সম্পর্কে জানতে চান,
---কেন উনি নিজ ইচ্ছায় এই আশ্রমে এলেন?উনার কি কেউই নেই এই পৃথিবীতে?
---আপন বলতে যা বোঝায় সেই অর্থে উনার কেউ নেই।আমিও উনার নিজের কেউ নই।কোন একটি ঘটনার সূত্র ধরে বেশ কয়েকবছর উনার সাথে আমার পরিচয়।দিদি বিয়ে করেননি।একাই থাকতেন।এখন বয়স হয়েছে নানান রোগে ধরেছে।সম্ভবত বছর ত্রিশ আগে দিদির ক্যান্সার হয়েছিলো।তখন মাসিমা,মেসোমশাই বেঁচে ছিলেন।প্রায় ন'মাসের মত চেন্নাই গিয়ে থেকে চিকিৎসা করিয়ে আস্তে আস্তে দিদি সুস্থ্য হন।বর্তমানে ওই রোগ থেকে দিদি সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়েছেন।কিন্তু প্রচুর ওষুধ খেতে হয়।তাছাড়া আছে হাইপ্রেসার,সুগার, নার্ভের সমস্যা।এই আশ্রমটার কথা লোকমুখে অনেক শুনেছি।আমিই দিদিকে বললাম এখানে এসে থাকলে দিদি ভালো থাকবেন অনেকের মাঝে।অন্তত দুটো কথা তো বলতে পারবেন  সকলের সাথে।টাকাপয়সা দিদির যা আছে তাতে তার ভালোভাবেই চলে যাবে।আমি মাঝে মাঝে এসে দিদিকে দেখে যাবো।
    যুবকটি বেরিয়ে গেলে চন্দ্রনাথবাবু মহিলার চেকটি হাতে নিয়ে নামটা দেখে চমকে উঠেন।সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফর্মটি হাতে নিয়ে ঠিকানাটা দেখে নেন।কিন্তু কি আশ্চর্য তিনি তো অনুরাধাকে দেখে চিনতেই পারেননি।অবশ্য চিনবেনই বা কেমন করে?তিনযুগ আগের দেখা সেই কিশোরী অনুরাধাই যে তার মনের ক্যানভাসে রয়েছে।আর তাছাড়া তিনি তো ভালোভাবে তার মুখের দিকেও তাকিয়ে দেখেননি।সেই বহুকাল আগে যেদিন তিনি বাদলকাকুর বাড়ি থেকে জিনিসপত্র নিয়ে নিজের ভাড়া বাড়িতে চলে আসেন সেদিন অনুরাধা সামনে আসেনি।এমন কি যে কটাদিন তিনি ওই বাড়িতে থেকে অফিস করেছেন অনুরাধা কোন সুযোগই দেয়নি কথা বলার।খুব অভিমান হয়েছিলো তখন।সেই অভিমান নিয়েই প্রায় দু'মাস বাদে যখন আবার অনুরাধাদের বাড়িতে সে গেছিলো তখন বাড়িটা তালাবন্ধ ছিলো।তারপর বহুবার সে ওই বাড়িতে গেছে কিন্তু প্রতিবারই সে তালা দেওয়া দেখেছে।এর মাঝেই অফিস থেকে সুযোগ আসে আমেরিকা যাওয়ার পাঁচ বছরের জন্য।ব্যস,জীবন থেকেই হারিয়ে যায় অনুরাধা।শুধু হৃদয়ে থেকে যায় ভালোবাসাটুকু।
 
    বিকালে এই আশ্রমে চা খাওয়ার পর্বটা চলে সবুজে ঘেরা বিশাল এক বাগানে।সেখানে সিমেন্টে বাঁধানো সারিসারি বসার জায়গা।যারা সেখানে আসতে পারেননা তাদের অবশ্য যার যার ঘরেই চা দিয়ে আসা হয়।চন্দ্রনাথবাবু একবার বাগানে ঢু মেরে সোজা চলে আসেন অনুরাধার রুমে।অনুরাধা তখন জানলার কাছে দাঁড়িয়ে বিশাল আকাশটার দিকে তাকিয়ে হয়তো হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা খুঁজছে।চন্দ্রনাথ আস্তে আস্তে গিয়ে অনুরাধার পিছনে দাঁড়ান।অনুরাধা টের পেয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে বলে,
---আমি সকলের সাথে যাইনি কারন আমি জানতাম চন্দ্রদা তুমি আসবে।
---তুমি আমায় চিনতে পেরেছিলে?
---কেন চিনবো না?তোমার তো কোন পরিবর্তন হয়নি।
---আমি কিন্তু তোমায় চিনতে পারিনি।
ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি এনে অনুরাধা বলে,
---তুমি তো ঠিক সেই আগের মত লাজুকই থেকে গেছো!তুমি তো আমার মুখের দিকে একটিবারের জন্যও  তাকাওনি।তাকালে দেখতে পেতে আমি তোমার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।সেই মুহূর্তে পরিচয় দিইনি কারন বিমল ছিলো।বিমল খুব ভালো ছেলে। আমার একটা কঠিন অসুখ হয়েছিলো।বেশ কয়েকমাস আমরা চেন্নাই ছিলাম।সেই সময় ওর বাবাও চেন্নাই এ চিকিৎসা করাতে যেতো। ও তখন খুব ছোট। আমরা একটা বাড়িতে পাশপাশি দুটো ঘরে ভাড়া থাকতাম।সেই থেকে ওর সাথে একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।আমি জানতাম কাগজপত্র দেখা হলে তুমি আসবে।আমি ভাবতে পারিনি জানো এখানে এসে তোমার দেখা পাবো।সত্যি বলতে কি এ জীবনে তোমার সাথে আর দেখা হবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।পরীক্ষার পর তুমি যখন গ্রামের বাড়িতে চলে গেলে তার দুদিন পরেই সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা।ডাক্তারের কাছে গিয়ে নানান পরীক্ষানিরীক্ষায় ধরা পড়ে ব্রেস্ট ক্যান্সার।বাবা মোটেই সময় নষ্ট না করে আমায় নিয়ে চেন্নাই চলে এলেন।সাথে মা।এক নাগারে ন'মাস চেন্নাই।এদিকে বাবাও রিটায়ার করলেন।সারাজীবন ধরে সঞ্চিত অর্থ শেষ হয়ে গেলো।বাড়ির নীচের অংশটাও বিক্রি করে দিলেন।এতগুলো মাস পড়ে যখন কলকাতা ফিরে এলাম তখন বাবা আর্থিক দিক থেকে শূন্য।তারপর কখনও তিনমাস কখনো বা ছ'মাস পরে পরে চেকআপে পূনরায় চেন্নাই যেতে হয়।সে এক দুর্বিসহ পরিস্থিতি।এখন পুরোপুরি সুস্থ্য।আস্তে আস্তে মা,বাবা দু'জনেই আমায় ছেড়ে চলে গেলেন। অতো বড় বাড়িতে একা একা একদম ভালো লাগতো না।বিমলই এই আশ্রমটার কথা বললো।ভাগ্যিস ওর কথা শুনে রাজি হয়ে বাড়িটা বিক্রি করে এখানে চলে এসেছি তাই তো তোমার সাথে দেখা হোল।হাসতে থাকে অনুরাধা।এবার তোমার কথা বলো।
---অনেকবার গেছি তোমাদের খোঁজে ওই বাড়িতে।কিন্তু নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছি।অফিস থেকে বাইরে পাঠিয়ে দিলো।সেখান থেকে ফিরে বাবা,মাকে নিয়ে কলকাতাতেই থাকতে লাগলাম।দু'বছরের ব্যবধানে মা,বাবা দু'জনেই চলে গেলেন।গ্রামের বাড়িঘর,ধানীজমি,পুকুর সব বিক্রি করে কলকাতা থেকে একটু দূরে কোলাহলহীন এই নির্জনে আমি এই আশ্রম তৈরী করলাম সম্পূর্ণ নিজের টাকায়।বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনিই সংসার সামলেছেন।আমার তো কোন খরচই ছিলোনা।তাই সবকিছু দিয়ে আমার এই আশ্রম।এখানে প্রায় পঞ্চাশজনের মত মানুষ সামান্য অর্থের বিনিময়ে তাদের নিরলস শ্রম দিয়ে সংসার থেকে বিতাড়িত এই বয়স্ক মানুষগুলিকে সেবাযত্ন দিয়ে ভালো রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে।প্রতিবছর এঁদের সামান্য একটু আনন্দ দিতে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে থাকি।এঁরা প্রত্যেকেই কি উৎসাহ,উদ্দীপনা নিয়ে পুজোর আয়োজনে ব্যস্ত থাকেন।এঁদের এই আনন্দ দেখে খুশিতে আমার চোখে জল এসে যায়।আবার কেউ কেউ পুজোর কটাদিন সকলের অলক্ষ্যে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেন ।তখন হয়তো বাড়ির কথা মনে পরে । আমি এইসব নিয়ে বেশ আছি।
কিন্তু অনুরাধা,তোমার তো এই আশ্রমে থাকা হবেনা।
--মানে?আমাকে তুমি আশ্রমে জায়গা দেবেনা?
--এখান থেকে একটু দূরে আমার ছোট্ট একটা বাড়ি আছে।একাই থাকি।তুমি কি পারবে আমার কাছে থাকতে?
--তোমার বৌ,বাচ্চারা এখানে থাকেনা?
  এবার চন্দ্রনাথ হো হো করে হেসে উঠে বললেন,
---সে সুযোগ আর পেলাম কোথায়?যাকে বৌ করবো ভেবেছিলাম সে তো হঠাৎ করেই হারিয়ে গেলো।তাই আর ওপথ মাড়ায়নি।বলে আবারও হেসে উঠলেন।
  তাহলে তুমি রেডি হয়ে নাও,আমি হাতের কাজগুলো সেরে নিই।সন্ধ্যার আগেই আমরা রওনা দেবো।
    জীবন থেকে অনেকগুলো বছর হারিয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু বিধাতাপুরুষ যাদের জীবনতরী এক তারেতেই বেঁধে রেখেছেন শেষ বয়সে হলেও দেখা তো তাদের হবেই আর জীবনের বাকি পথটুকুও একসাথেই তারা হাঁটবে।




Tuesday, August 6, 2019

অচেনা ফোনকল

অচেনা ফোনকল
              নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

     গতকাল থেকেই কাবেরী ঠিক করে রেখেছিলো আজ দেবেশ অফিস বেরোলেই সে শপিং করতে বেরোবে।কিন্তু হঠাৎ করেই কলোমেঘে চারিদিকে ছেয়ে গেলো।একটু পরেই ঝমঝম করে বৃষ্টি।মন খারাপ নিয়েই জানলাগুলো বন্ধ করতে করতে ভাবলো যাকগে ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন।অনেকদিন কিছু লেখা হয়না আজ একটু পুরনো ডায়রীটা খুলে নিয়ে বসি , দেখি কিছু লেখা আসে কিনা।
   দেবেশের গল্প,কবিতা পড়ার প্রতি ভীষন ঝোঁক।বিশাল দোতলা বাড়ির উপরের হলঘরটিকে ছোটখাটো একটা লাইব্রেরী করে ফেলেছে।সময় পেলেই দেবেশ ও কাবেরী এই ঘরটিতেই এসে বসে।দুজনে দুটি বই মুখের সামনে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়।গল্প দু'জনের মধ্যে হয় ডিনার টেবিলে আর রাতে শুতে গিয়ে।এইভাবেই দুজনে অভ্যস্ত।
   ডায়রীটা খুলে নিয়ে বসে কাবেরী।বহু পুরনো লেখার মাঝে অন্যের লেখা তার ডায়রীর প্রথম পাতায় সুন্দর করে একটা আল্পনা আঁকা আর তার নীচে লেখা,'তোমার খাতার প্রথম পাতায় একে দিলাম এক আল্পনা,আমার ছবি কইবে কথা যখন আমি থাকবোনা।'লেখাটার দিকে তাকিয়ে কাবেরী ভীষন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।
কলেজের প্রথম দিন কাবেরী যখন কলেজে ঢোকে,আগেরদিন রাতে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় কিছু কিছু জায়গায় কলেজ চত্বরে জল থাকার ফলে পা পিছলে একদম ধপাস।সবাই যখন খুব হাসছে ঠিক তখনই একটি ছেলে এগিয়ে এসে কাবেরীর হাত ধরে টেনে তোলে।জানতে চায় কোথাও লেগেছে কিনা।সেই প্রথম আলাপ।অনিরুদ্ধ তখন তৃতীয় বর্ষ। তারপর একটু একটু করে বন্ধুত্ব।অনিরুদ্ধ খুব সুন্দর কবিতা লিখতো।বাংলায় অনার্স করছিলো।বিদ্রোহী কবির ' অভিশাপ' কবিতাটা কলেজ সোশ্যালে আবৃত্তি করে অনেকেরই চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিলো।এই কবিতার পরিপেক্ষিতে সে একটি কবিতা লিখেছিলো।একদিন একাএকা কলেজের বিশাল বটগাছটার নীচে বসে আছে দেখে কাবেরী এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো,' কি করছো রুদ্রদা?' রুদ্র হেসে পড়ে বললো,কটা লাইন লিখলাম।'বলে একটা কাগজ এগিয়ে দেয় তার দিকে।তারপর বলে,'কি শিরোনাম দিই বলো তো?'কাগজটা খুলে কাবেরী পড়তে শুরু করে'

আমায় কি পড়বে মনে?
যখন আমি থাকবো না-
হারিয়ে যাবো অচিন দেশে,
একটুও কি কাঁদবে না?
টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো,
চোখের সামনে ভাসবে,
সবই থাকবে আগের মত,
আমায় কি খুঁজবে?
রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমান,
সবই থাকবে পড়ে,
আমিই কাছে থাকবো নাগো,
যাবো অনেক দূরে-----।

       কাবেরীর ভাবনায় ছেদ পড়ে হঠাৎ ল্যান্ডলাইনের ক্রীং ক্রীং আওয়াজে।কাবেরী মনেমনে ভাবে এই সেই ফোন শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছুই শোনা যাবেনা।কিন্তু তবুও কি এক অমোঘ আকর্ষণে ফোনটা আসলেই সব কাজ ফেলে ছুটে চলে যায় কাবেরী।দৌড়ে গিয়ে ফোনটা ধরে।'হ্যালো হ্যালো' কয়েকবার বলার পরেও কোন সারাশব্দ অপর প্রান্ত থেকে পায়না।রিসিভারটা কান থেকে নামাতে যাবে হঠাৎ শোনে,'কেমন আছো?' 'ভালো আছি কিন্তু কে বলছেন বুঝতে পারছিনা'।কাবেরী বলে,'আপনি প্রায়ই ফোন করেন কিন্তু কোন কথা বলেননা কেন?' প্রতিদিনের মত একটি দীর্ঘশ্বাস কানে আসে কাবেরীর তারপরেই অপর প্রান্ত থেকে ফোনটা রেখে দেওয়ার শব্দ।দেবেশ বাড়িতে না থাকলেই বেশ  কিছুদিন ধরেই এই ফোনকলটা আসছে কিন্তু কিছুই বলেননা ভদ্রলোক।গলাটা খুব ভারী হলেও মনেহয় তার এ গলা যেন চেনা।কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারেনা ফোনের অপরপ্রান্তে যে  ছিলো সে কে?
   বৃষ্টিটা এতক্ষণে কমেছে।আজ আর বেরোনো হবেনা বুঝতে পেরে ঘরের ফার্নিচারগুলো একটু ঝাড়পোছ করতে শুরু করে।স্নানটা সকালেই সেরে নিয়েছিলো।এই কাজগুলি করতে গিয়ে আবারও তাকে একপোস্ত স্নান করতে হল । দুপুরে খেয়েদেয়ে শোবার ঘরে ঢুকে দেখে ডায়রীটা সেইভাবেই পড়ে আছে।ফোনের আওয়াজ শুনে সেই যে বেডরুম থেকে বেরিয়েছিলো তারপর আর তো এখানে আ পাশ করে বেরিয়ে যাওয়ার পড়ে প্রায় প্রতিদিনই সে কাবেরীর সাথে দেখা করতে কলেজগেটে এসে হাজির হত।কোনদিন কোন ফাঁকা জায়গায় বা কোন কফিবারে বসে দুজনে অনেকটা সময় গল্প,হাসি,ঠাট্টা,মান-অভিমানে কাছাকাছি  কাটিয়েছে।
   কাবেরীর বাবা ছিলেন একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার।হঠাৎ করেই তার ট্রান্সফার হয়ে যায়।সেই সময়ে মুঠো ফোনের ফোনের এতো দৌরত্বও ছিলোনা।কিছুদিন ধরেই অনিরুদ্ধ কাবেরীকে বলছিলো বীরভূমের একটি কলেজে তার চাকরীর কথা হচ্ছে সেখানে যেতে হবে।কিন্তু কবে যাবে এখনও ঠিক হয়নি।কদিন ধরেই সে কলেজে কাবেরীর সাথে দেখা করতে আসছেনা।এদিকে বাবার চাকরীর বদলী।অনিরুদ্ধ কাকু,কাকিমার কাছে মানুষ।তারা থাকেন গ্রামে।সে একটা মেসে থাকতো।কাবেরী অনেক খুঁজে সেই মেসেও গেছিলো কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারেনি।নিরুপায় হয়ে ফিরে এসেছে।তখন কাবেরীর থার্ড ইয়ার।এই অবস্থায় অন্য কোন কলেজে সে চেষ্টা করেও ভর্তি হতে পারবেনা মনে করে কাবেরী ও ওর মাকে রেখে কাবেরীর বাবা জামশেদপুর চলে যান।এদিকে অনিরুদ্ধর খবরের জন্য কাবেরী ভীষণ উতলা হয়ে পড়ে।   
    রুদ্রদার কথা ভাবতে ভাবতে আজও  কাবেরী একটা লাইনও লিখতে পারলোনা।কবিতা পড়া বা লেখার নেশা ধরিয়েছিলো অনিরুদ্ধই তাকে।আজ এতগুলো বছর বাদে ওই ডায়রীটাই তাকে ফেলে আসা অতীতে নিয়ে গেছে।অনার্স কমপ্লিট করার আগে থাকতেই অনিরুদ্ধ প্রচুর টিউশনি করতো।বলতে গেলে নিজের খরচ সে নিজেই চালাতো।কারন দরিদ্র কাকু,কাকিমার ক্ষমতা ছিলোনা তাকে কলকাতা রেখে পড়াশুনা করানোর।তাদের নিজেদের দুটি সন্তান রয়েছে।বাবা জম্মের আগেই মারা গেছেন আর অনিরুদ্ধর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন মা চিরতরে চলে গেছেন।কাকু,কাকিমা তার জন্য যথাসাধ্য করেছেন।তাদের অন্য দুই সন্তানের থেকে কখনোই তাকে আলাদা করে দেখেননি।কাকু,কাকিমার প্রতি অনিরুদ্ধর ছিলো অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।এসব কথা নানান কথাচ্ছলে অনিরুদ্ধ কাবেরীকে বলেছে।ভীষণ দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণ মানুষটা এইভাবে হঠাৎ কিছু না বলে কোথায় হারিয়ে গেলো কাবেরী ভেবে কোন কূল কিনারা পায়না।
  রাতে খাবার টেবিলে কাবেরী আজ দেবেশকে এই অদ্ভুত ফোনকলের কথাটা বলেই ফেলে।আজ তো প্রথম নয় এর আগেও বেশ কয়েকবার এরূপ কল এসছে।অপরপ্রান্ত থেকে শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছুই কাবেরী শুনতে পায়না।আজ তো তবুও 'কেমন আছো কথাটা জানতে চেয়েছে।'
---নিশ্চয় তোমার পরিচিত কোন লোক হবে।তা নাহলে 'কেমন আছো জানতে চাইবে কেন?
--এর আগেও বেশ কয়েকবার এই কলটা এসছে জানো?কিন্তু কিছুই বলেনা।আজ তো তবুও একটা কথা বলেছে।
---আরে ছাড়ো তো।খেয়েদেয়ে কাজ না থাকলে মানুষ তখন ওই আননোন নম্বরে ফোন করে টাইম পাস করে।
---কিন্তু ফোনটা তো তখনই আসে যখন তুমি বাড়ি থাকোনা।
---তাহলে আশেপাশের কেউ হবে হয়তো। তানাহলে সে জানবে কেমন করে আমি কখন আসছি বা কখন বেড়চ্ছি।এসব নিয়ে মাথা ঘামিও না।
দেবেশ ব্যাপারটাকে হালকা করার চেষ্টা করে।কিন্তু কাবেরীর মন থেকে খুঁতখুঁতানি যায়না।
    অনিরুদ্ধর খবর না পেয়ে পাগলের মত তার পরিচিত বন্ধু বান্ধব মহলে খুঁজে বেরিয়েছে কাবেরী।কিন্তু কেউই তার কোন সন্ধান দিতে পারেনি।একদিন অন্যমনস্কভাবে রাস্তা পার হতে গিয়ে কাবেরী মারাত্মকভাবে এ্যাকসিডেন্ট করে।দুটো চোখের মধ্যেই অদ্ভুতভাবে কাঁচ ঢুকে তাকে চিরতরে অন্ধ করে দেয়।খবর পেয়ে তার বাবা ছুটে আসেন।মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পায়।হাসপাতালে তিনদিন কোন জ্ঞানই ছিলোনা।তিনদিন পরে কাবেরী যখন চোখ খোলে তখন তার সামনে শুধু অন্ধকার!প্রচুর ছুটোছুটি, দৌড়াদৌড়ির পর ডক্টর জানালেন আই ব্যাঙ্কে যোগাযোগ করতে।একমাত্র চোখ প্রতিস্থাপন ছাড়া কাবেরীর দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব নয়।তখন শুরু হোল বাড়ির লোকের আই ব্যাঙ্কের সামনে হোত্যে দিয়ে পড়ে থাকা।দিন পনের বাদে দুটি চোখই পাওয়া গেলো।কাবেরী তার দৃষ্টি পূনরায় ফিরে পেলো।
  কাবেরী তার বাবার কাছে পরে জেনেছে একটি চব্বিশ পঁচিশ বছরের ছেলে মারাত্মকভাবে এ্যাকসিডেন্ট করে তিনমাস যাবত জ্ঞানহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলো।কোন আত্মীয়স্বজন কোনদিন তাকে দেখতে আসেনি।তিনমাস পরে যখন তার জ্ঞান আসে সে বুঝতে পারে তার দুটো পা ই কেটে বাদ দিতে হয়েছে।দিনরাত হাসপাতালের বেডে শুয়ে কান্নাকাটি করতো।তারপর একদিন একজন জুনিয়র ডাক্তারকে ডেকে সে তার শরীরের সমস্ত অঙ্গগুলি দানে অঙ্গীকার বদ্ধ হয়।সুস্থ্য হয়ে ক্রাচে ভর করে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায়।কিছুদিন পরে পুণরায় সেই হাসপাতালে এসেই চারতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।
   কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কাবেরী দেবেশের জন্য জলখাবার তৈরী করছিলো।ফোনের আওয়াজ শুনে হাতটা আঁচলে মুছে ফোনটা এসে ধরে।সেই ফোন।অপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া নেই।কাবেরী একটু বিরক্ত হয়েই আজ বলে,
---ফোন করে যখন কোন কথায় বলেননা তখন রোজ রোজ কেন ফোন করেন?কে আপনি?কি প্রয়োজনে ফোন করেন?আজ আপনাকে বলতেই হবে কেন রোজ রোজ আমায় ফোন করে এভাবে বিরক্ত করছেন?
 ---রোজই তো বলতে চাই কিন্তু বলতে পারিনা কবরী।(অনিরুদ্ধ এই নামেই কাবেরীকে ডাকতো।)
---কে?? কে আপনি ? ?
---সত্যিই কি চিনতে পারছো না কবরী?
---রুদ্রদা?কোথায় ছিলে এতদিন?তারমানে রোজ তুমিই ফোন করতে?তবে কথা বলতে না কেন?আমার অপারেশানের পর সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফেরার পর থেকেই তোমার ফোন আসতো।কিন্তু কোনদিনও তুমি কথা বলোনি?কেন রুদ্রদা কেন?কি অপরাধ করেছিলাম আমি?কাউকে কিচ্ছুটি না বলে কেন উধাও হয়ে গেলে?কান্নায় ভেঙ্গে পরে কাবেরী।
---বলবো বলেই তো ফোন করি।কিন্তু কোনদিনও আর বলা হয়ে ওঠেনা।আজ তোমায় সব বলবো । শোনো তবে ---
যেদিন তোমার সাথে আমার শেষ দেখা হোল সেদিন বাড়ি ফিরে দেখলাম কলেজের চাকরীটা আমার হয়ে গেছে। পরদিনই জয়েনিং।তোমাকে খবর দেওয়ার কোন সময়ই পাইনি।ভেবেছিলাম চাকরিতে জয়েন করে পরে এসে তোমায় চমকে দেবো।আমি চাকরিতে জয়েন করলাম।দিন পনের বাদে এক শনিবারে কলেজ শেষে বেরিয়ে কাকু,কাকিমার সাথে দেখা করে আমি কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।কিন্তু ভাগ্য আমার কোনদিনও সহায় ছিলোনা আমি জানতাম।কিন্তু চাকরীটা পেয়ে সে ধারণা আমার একটু একটু করে পরিবর্তন হচ্ছিলো।তো যা বলছিলাম---কলকাতা আসতে গিয়ে আমি মারাত্মকভাবে এ্যাকসিডেন্ট করি।পথচারীরাই আমাকে হাসপাতাল ভর্তি করে।তিনমাস অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম।জ্ঞান ফিরলে বুঝতে পারি আমি আর জীবনেও নিজের পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারবোনা।আমার জীবনের সমস্ত আশা, আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেলো বুঝতে পেরেই নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিলাম।এইভাবে বেঁচে থাকা মানে সারাটা জীবন অন্যের উপর নির্ভর করে চলা। এর পরের ঘটনা তো তোমার জানা।
  ফোনটা কেটে গেলো।কাবেরী কাঁদতে কাঁদতে বার কয়েক হ্যালো হ্যালো করলো কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে আজ সে আর কোন দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলোনা।কাঁদতে কাঁদতে নিজের অজান্তেই চোখদুটিতে হাত বুলাতে লাগলো।আর মনেমনে বলতে  লাগলো,'রুদ্রদা তোমার চোখ দিয়েই পৃথিবীটাকে নূতনভাবে দেখছি।ভুল বুঝেছিলাম তোমায়।ভেবেছিলাম তুমি আমায় ঠকিয়েছো।কিন্তু তুমি তো আমায় নূতন জীবন দান করেছো।এইভাবেই তুমি তোমার জীবনের নাবলা কথাগুলো আমায় জানিয়ে না গেলে আমি তো সারাজীবনই তোমায় ভুল বুঝেই থাকতাম।আমাকে ক্ষমা কোরো রুদ্রদা,আমায় ক্ষমা কোরো।'




Monday, July 22, 2019

অদ্ভুত অনুভূতি

অদ্ভুত অনুভূতি
   নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

    স্মৃতির জানলাটা তখনই খুলে যায় যখন নন্দিতা এসে তার ছোট্ট ব্যালকনিটাই বসে।এই জায়গাটা প্রত্যুষেরও খুব প্রিয় ছিলো।অজস্র ছোটবড় ফুলের টবে নানান জাতের ফুলের গন্ধের ভিতর নন্দিতা আজও প্রত্যুষের গায়ের গন্ধ পায়।সকালে দাঁত ব্রাশ করেই প্রত্যুষ পেপারটা নিয়ে এখানেই ঘন্টা দেড় দুয়েকের ব্যবধানে দুকাপ চা শেষ করতো।অফিস থেকে এসেও ফ্রেশ হয়ে সে এখানেই বসতো।সকালের দিকে নন্দিতার সময় পেতোনা।কিন্তু সন্ধ্যায় প্রত্যুষ ব্যালকনিতে গিয়ে বসলেই সেও চা,জলখাবার নিয়ে ওর পাশে গিয়ে বসতো।আর গল্প চলতো সেই ডিনারের পূর্ব পর্যন্ত।বেশ কয়েকবছর ধরে এটাই ছিলো ওদের জীবনের রুটিন।ছুটির দিনগুলিতে প্রত্যুষ ব্যস্ত থাকতো তার গাছপালা নিয়ে।আর নন্দিতা মাঝে মাঝে চা নিয়ে এসে হাসি মুখে স্বামীর পাশে দাঁড়াতো। প্রত্যুষ হেসে পড়ে বলতো,
--এই জন্যই তোমায় এতো ভালোবাসি দিতি।আমার কখন কি চাই সেটা না বলতেই কেমন বুঝে যাও।
--অনেক বেলা হল গো।এবার গিয়ে স্নান করে নাও।
--এই আর একটু।দেখো জিনিয়া গাছটাই কেমন কুঁড়ি ধরেছে।গাছের গোড়াটা একটু আলগা করে দিই।আরে এরা সকলেই আমার সন্তান।যত্ন না করলে সুন্দর ফুল দেবে কেন?
নন্দিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
--সে তুমি ঠিক বলেছো।গর্ভের সন্তানকে কত যত্ন করে মানুষ করলাম।না,একটু ভুল বললাম,মানুষ নয় বড় করলাম।সেই আমাদের কথা ভাবলো না---
--ভুল করছো গো--সন্তানকে বড় করার দায়িত্ব প্রত্যেকটা বাবা মায়ের।বাবা, মা কিন্তু সন্তানের কাছ থেকে কিছুই আশা করেনা।তারা ভালো থাক,সুখি থাক এটাই প্রত্যেক বাবামায়ের একমাত্র উদ্দেশ্য।হ্যাঁ বড় হয়ে তারা তাদের শিক্ষা,রুচি,মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে যদি নিজেকে নিয়ে সুখি হতে চায় আমার মতে সেখানে কথা না বলায় ভালো।যত কথা বাড়াবে অশান্তি তত বাড়বে।সন্তানের সুখই যখন কাম্য তাদেরকে তাদের মতই থাকতে দাও।
--তাইবলে বৃদ্ধ বয়সে তারা বাবামাকে দেখবে না?
--যদি নাই দেখে ক্ষতি কি?ঈশ্বরের কাছে সুস্থ্য সন্তান কামনা করেছিলাম তখন তো ঈশ্বরের কাছে এটা চেয়েছিলাম না যে বৃদ্ধ বয়সে সে যেন আমাদের দেখে।
--ওসব ভেবোনা।প্রতীক ভালো আছে,সুখে আছে এর চেয়ে আর কি চাওয়ার থাকতে পারে বলো?এই তো দুজনে বেশ আছি।আমি যখন থাকবোনা তখন তোমার কোন কষ্ট হবে নাগো।
--যত সব অলুক্ষুণে কথা।আজকাল মুখে তোমার কিছুই আটকায়না।
       দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো।হঠাৎ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত ঘুমের মাঝেই প্রত্যুষ একদিন তার দিতিকে ছেড়ে চলে গেলো।ছেলেকে ফোন করেছিলো নন্দিতা।সে ছুটি পাবেনা জানিয়ে দিয়েছে মাকে।সে হয়তো ছেলেকে জানাতোও না।কিন্তু আত্মীয়স্বজনের মন রাখতেই ফোনটা করতে সে বাধ্য হয়েছিলো।না,ছেলের কথাতে সে অবাক হয়নি।সে জানতো এতো স্বার্থপর ছেলে তার সে কখনোই বাবার মুখাগ্নী করতে আসবেনা।আগে মাঝেমধ্যে তাও ফোন করতো।কিন্তু বিয়ের পর থেকেই ছেলেটা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে।প্রত্যুষ বা নন্দিতা কখনোই পরের মেয়েকে দোষারোপ করেনা।নিজের ছেলেই যখন বাবামাকে ত্যাগ করেছে তখন পরের মেয়েকে দোষ দিয়ে লাভ কি?
    নিজের হাতে নন্দিতা তার স্বামীকে শেষবারের মত সাজিয়ে দেয়।সর্বক্ষণের সঙ্গী তার অবিবাহিত সেজদি।এই দিদিই তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে,বিয়ে দিয়েছে।বাবা তো সেই কবে ছেলেবেলায় মারা গেছেন।সেজদি ভালো চাকরী করতেন।বাবার মৃত্যুর পর সংসারের জোয়াল কাঁধে এসে পড়ায় সেজদির আর বিয়ের কথা মা উত্থাপনও করেননা।মা তিন দিদি,নন্দিতা, ভাই --সকলকে নিয়ে সে এক বিরাট সংসার।সেজদি একাই চাকুরে।বিপাকে পড়লে সকলেই কেমন স্বার্থপর হয়ে যায়।এই স্বার্থপরের তালিকায় অনেক সময় বাবামা ও থাকেন । চাকুরী করা মেয়ে সে যদি বিয়ে করে চলে যায় তখন সংসারটা ভেসে যাবে। তাই এক সন্তানের ত্যাগের বিনিময়ে অন্যদের সুখের ব্যবস্থা করা।একে একে বড়দি,মেজদি,ছোড়দি সকলের বিয়েই নন্দিতার সেজদি দেয়।সকলের ছোট ভাই আর নন্দিতা গ্রাজুয়েশন করে।দু'জনেই চাকরীর চেষ্টা করতে থাকে।কিন্তু এরই মধ্যে সেজদির অফিস সোশালে নন্দিতাকে দেখে সদ্য চাকরী পাওয়া তরুণ প্রত্যুষের খুব পছন্দ হয়ে যায়।সে সরাসরি এসে নন্দিতার সেজদির কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সেজদি নিরুপমা এতো ভালো পাত্র তার আদরের ছোটবোনের জন্য হাতছাড়া করেনা।মাস ছয়েকের মধ্যেই সে নন্দিতার বিয়ে দিয়ে দেয় প্রত্যুষের সঙ্গে।
   নন্দিতা খাটে শোয়া তার স্বামীকে আগলে বসে আছে মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।চোখের থেকে অবিরাম জল পড়ে চলেছে।অনেকেই চেষ্টা করেছে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কিন্তু পারেনি।পাড়ার ছেলেরা এসে বললো,
---এবার বডি নিয়ে যাবো।বৌদিকে তোমরা ঘরে নিয়ে যাও।
  খুব আস্তে আস্তে নন্দিতা ছেলেটির মুখের দিকে তাকালো তারপর অতি ধীরভাবে বললো,
--বডি বোলনা ওকে তোমরা।আমার কানে ভীষন বাজছে কথাটা।ওকে তো তোমরা প্রত্যুষদা বলতে।সেটাই বলো।
  নন্দিতার সেজদি এগিয়ে এসে জোর করে তাকে ঘরে নিয়ে আসে।বাড়ি ফাঁকা হয়ে যায়।কিন্তু সেজদি থেকে যায় নন্দিতার সাথে।কিন্তু কতদিন?মায়ের বয়স নব্বই বছর।ভাই বিয়ে করেছে।তারও সন্তান আছে।তার উপর নির্ভর করে মাকে তো দিনের পর দিন ফেলে রাখা যায়না?তাছাড়া এই বয়সে ধকল নিতে পারবেননা বলে তার ছোট জামাই এর দুর্ঘটনাটা লুকিয়ে যাওয়া হয়েছে।নন্দিতা অবশ্য অনেকবারই দিদিকে বলেছে বাড়ি চলে যাওয়ার কথা।
   একসময় সেজদিও বাড়ি চলে যায়।বিশাল দোতলা বাড়িতে নন্দিতা একা।কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তেই সে প্রত্যুষের উপস্থিতি টের পায়।সেদিন যখন প্রত্যুষকে নিয়ে কাঁচঢাকা গাড়িতে সকলে বেরিয়ে যায় সেজদি ওকে সাথে করে উপরে নিয়ে আসে।নিজের শোয়ার খাটে বসে নন্দিতার নাকে একটা কফ সিরাপের গন্ধ আসে।ঠান্ডা লাগলে বা কখনো কাশি হলে প্রত্যুষ এই সিরাপটা খেতো।নন্দিতা তখন আস্তে আস্তে দিদিকে বলে,
--দিদি,প্রত্যুষ কিন্তু আমার সাথে উপরে উঠে এসছে।ওর সিরাপটার গন্ধ বেরোচ্ছে।সেজদি ওকে জড়িয়ে ধরে বলে,
---কেন পাগলামী করছিস সোনা?যে চলে যায় সে চিরতরেই চলে যায়।
---আমি তো সে কথা অস্বীকার করছিনা দিদি।কিন্তু কেন জানি মনেহচ্ছে প্রত্যুষ আমায় ছেড়ে যায়নি।ও তো জানে আমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারবোনা।
সেই শুরু।প্রত্যুষ থাকতে হয়তো কোন জিনিস নন্দিতা  খুঁজে পাচ্ছেনা তখন ওর সাথেই প্রত্যুষ ও খুঁজতে শুরু করে দিতো।সে রান্নাঘরের সাঁড়াশি থেকে শুরু করে আলমারীর ভিতরের কাপড়,সায়া,ব্লাউজ পর্যন্ত।ঠিক খুঁজে বের করে হাসতে হাসতে ওর হাতের কাছে এনে দিতো।ও চলে যাওয়ার পরেও মাঝে মাঝে কোন জিনিস খুঁজে না পেলে হঠাৎ করেই সেটি চোখের সামনে দেখতে পেয়েছে।প্রত্যুষ চা খেতে খুব ভালোবাসতো।আজকাল এই নেশাটা নন্দিতাকেও পেয়ে বসেছে।
  ভূত নন্দিতা কোনদিনও বিশ্বাস করেনা।এই অনুভূতিগুলি যখন তার হয় তখন সে ভয় যে পায় তাও কিন্তু না।কাজের মেয়ে জয়িতা মাঝে মাঝে তাকে বলেছে,
---বৌদি তুমি তোমার শোবার ঘরে না থাকলে আমার ওই ঘর মুছতে গেলে কেমন ভয় ভয় করে।দাদা মনেহয় ওই ঘরেই থাকে জানো?
জয়িতাকে জোরে এক তাড়া দিয়ে ওঠে নন্দিতা।তার অনুভূতিটাকে সে অন্যকারও সাথেই শেয়ার করতে চায়না।থাকুক না তার প্রত্যুষ সশরীরে না হোক অশরীরেই তার কাছে।
   এমন অনেক কথা থাকে এমন অনেক কষ্ট ব্যথা থাকে যা সারাজীবনেও কারও সাথে ভাগ করা যায়না।এমন অনেক অনুভূতি যা নিজের মনেও হয়তো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়না।নন্দিতার জীবনে এ অনুভূতির কোন ব্যাখ্যা নিজেকেই নিজে দিতে পারেনা।বিশাল বাড়িতে এই অদ্ভুত অনুভূতিটুকুই প্রত্যুষকে হারিয়ে তার বেঁচে থাকার রসদ হয়ে উঠেছে।

Friday, July 19, 2019

আমায় কি পড়বে মনে

আমায় কি পড়বে মনে?
যখন আমি থাকবো না-
হারিয়ে যাবো অচিন দেশে,
একটুও কি কাঁদবে না?
টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো,
চোখের সামনে ভাসবে,
সবই থাকবে আগের মত,
আমায় কি খুঁজবে?
রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমান,
সবই থাকবে পড়ে,
আমিই কাছে থাকবো নাগো,
যাবো অনেক দূরে-----।

                        মানবী

Wednesday, July 17, 2019

শহুরে কন্যা

শহুরে কন্যা
      নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

    জিনিয়ার শ্বশুরবাড়ি বলতে গেলে গ্রামেই।বড় বড় শহরের কাছেপিঠের গ্রামগুলোকে আজকের দিনে ঠিক গ্রাম বলা যায়না।এখন সর্বত্রই পাকা রাস্তা,ইলেকট্রিক,পঞ্চায়েতের জল,ছোট বড় অজস্র দোকান।কিন্তু কয়েক বছর আগেও এটা জিনিয়ার কাছে অজপাড়াগাঁ ছিলো।সময়ের সাথে সাথে নানান ঝক্কি ঝামেলা,মান-অভিমান সবকিছু পিছনে ফেলে এই অজপাড়াগাঁ ই জিনিয়ার কাছে এখন খোদ কলকাতা শহর থেকেও বেশি প্রিয় হয়ে উঠেছে।
    ধনী পরিবারের বাবা,মায়ের একমাত্র সন্তান জিনিয়া।আহামরি সুন্দরী না হলেও কেউ তাকে কুৎসিত বলবেনা।ভীষন আদুরে,একগুঁয়ে আর জেদী।যখন যা চেয়েছে তখনই তাই পাওয়াতে হয়তো তাকে একগুঁয়ে আর জেদীতে পরিণত করেছে।কোচিং সেন্টারে যাতায়াতের পথে পরিচয় অর্পণের সাথে।তখন জিনিয়া সবে দ্বাদশ শ্রেণীতে উঠেছে। অর্পণের চেহারা পুরো নায়কোচিত।তাকে দেখলে মনেহয় বিশাল বড়লোক ঘরের ধনীর দুলাল।অর্পণ তাকে জানায় সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।জিনিয়া অর্পণের প্রেমে পড়ে যায়।শুরু হয় কোচিং ক্লাসের নাম করে অর্পণের বাইকে করে ঘোরাঘুরি।জিনিয়া অর্পণদের বাড়ি যেতে চায়।আজকাল করে অর্পণ বিষয়টা এড়িয়েই চলে।দিনের পর দিন স্কুল ও কোচিং ক্লাস কামাই করে অর্পণের সাথে ঘুরতে থাকার ফলস্বরূপ জিনিয়া দ্বাদশশ্রেণীর টেষ্ট পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনা।বাবা,মা বাড়িতে এই নিয়ে প্রচণ্ড অশান্তি শুরু করেন।অর্পণকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বারবার চাপ দিতে থাকায় অর্পণ একদিন বাধ্য হয়ে  তাকে নিয়ে একটি ঝাঁ চকচকে তিনতলা  বাড়ি দেখিয়ে বলে এটা তাদের বাড়ি।কিন্তু ভিতরে নিয়ে যেতে না পারার কারন হিসাবে জানায় বাড়িতে মা,বাবা বোন কেউ নেই।অন্য একদিন তাকে নিয়ে আসবে।সরল বিশ্বাসে জিনিয়া মেনে নেয়।
   জিনিয়ার মায়ের সন্দেহ হয় মেয়ের আচার আচরণ আর বাড়িতে থাকলেই সর্বক্ষণ কানে ফোন গুঁজে ঘুরে বেড়ানো দেখে।তিনি বুঝতে পারেন মেয়ে কোন ভুলের মধ্যে পা দিয়েছে।একদিন তিনি জিনিয়াকে চেপে ধরেন।বহু বাক বিতন্ডা, ঝগড়াঝাটির পর জিনিয়া স্বীকার করে অর্পণ নামে একটি ছেলেকে সে ভালাবাসে।জিনিয়ার মা বুদ্ধিমতী মহিলা।মাথা ঠান্ডা রেখে অর্পণ সম্পর্কে তিনি মেয়ের কাছ থেকে সব খোঁজখবর নেন।তিনি মেয়েকে জানান,
--আমি কাল অর্পণদের বাড়িতে গিয়ে কথা বলবো।কিন্তু তোকেও কথা দিতে হবে আমি তার সম্পর্কে সবকিছু না জানা পর্যন্ত তুই বাড়ি থেকে বেরোবি না।কেন জানিনা আমার মনে হচ্ছে অর্পণ যা তোকে জানিয়েছে তা সত্যি নয়।তোর বাবা যেন এসব কোনকথা না জানেন।এসব জানতে পারলে তিনি খুব কষ্ট পাবেন।তুই আমাদের একটি মাত্র সন্তান।কোনদিন তোকে আমরা কোন কষ্ট দিইনি।যখনই যা চেয়েছিস তখনই তাই দিয়েছি।এখন তোর বয়স সতের।তোকেও পড়াশুনা করতে হবে আবার অর্পণকেও ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটা চাকরী জোগাড় করতে হবে।আবেগের বশে জীবনটাকে তো নষ্ট করা যায়না।আগে মানুষ হ তারপর নাহয় ওই ছেলের সাথেই তোকে বিয়ে দেবো।
  চুপ করে জিনিয়া ওর মায়ের কথাগুলো শোনে।তারপর আস্তে আস্তে বলে,
--মা ও খুব ভালো ছেলে আমায় খুব ভালাবাসে।
--আমাকে একটু সময় দাও।আমি একটু খোঁজখবর আনি।
  পরদিন স্বামীকে না জানিয়ে বিশেষ কাজ আছে বলে কলেজ জীবনের বন্ধু ইন্সপেক্টর রোহিত পালের সাথে মিসেস চৌধুরী দেখা করেন।সবকিছু তাকে খুলে বলেন মিসেস চৌধুরী।কিছুদিন ধরেই খবরের কাগজ খুললেই মেয়ে পাচার চক্রের খবর দেখা যাচ্ছে।পুলিশ প্রশাসনের কাল ঘাম ছুট যাচ্ছে তাদের হদিস পেতে।এখনও কোন ক্লু তারা পাননি।মেয়ের মুখ থেকে সব কথা যখন জানতে পারেন তখন একটা কথাতে তার খটকা লাগে,'বারবার বলা স্বর্তেও অর্পণ আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়না।বাইরে থেকে বাড়িটা দেখায়'।
  ইন্সপেক্টর রোহিত একজন কনস্টেবল সাথে দেন তার কলেজ জীবনের বন্ধু লীলার সাথে।রোহিত কথা দেন প্রাথমিকভাবে লীলা সব খবর আনুক বাকিটা তিনি দেখছেন।
মিসেস চৌধুরী কনস্টেবলকে বাইরে রেখে মেয়ের বলা অনুযায়ী তিনতলা বাড়ির মালিক দ্বৈপায়ন  সেনের বাড়ি সটান উঠে যান।সেখানে গিয়ে জানতে পারেন অর্পণ নামে তাদের কোন সন্তান নেই।মিসেস চৌধুরী বুঝতে পারেন তিনি যা সন্ধেহ করেছিলেন সেটাই ঠিক আর এইটুকুই তার কাছে যথেষ্ঠ ছিলো। তিনি নেমে আসেন।ইতিমধ্যে কনস্টেবল দু একজনের কাছ থেকে অর্পণ নামে একটি ছেলের বাড়ির সন্ধান পান তবে সেটা বস্তিতে।কয়েক মাস হল মা ও বোনকে সাথে নিয়ে এখানে আছে।তবে ছেলেটির সাথে দেখা হয়না।ছেলেটি যাতে ওইদিনই থানায় দেখা করে সে কথা তার মা বোনকে কনস্টেবল জানিয়ে আসে।
  মিসেস চৌধুরী থানা হয়ে বাড়িতে ফিরে মেয়েকে কোথাও দেখতে পাননা।দারোয়ানের কাছ থেকে জানতে পারেন একটি ছেলে বাড়ির বাইরে রাস্তার ওপারে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো দিদিমনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে তার বাইকে করে উঠে চলে যায়।কিংকর্তব্যবিমূঢ় মিসেস চৌধুরী বুঝতে পারেন তার মেয়ের জীবনে কি অশনিসঙ্কেত নেমে এসেছে।একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে স্বামীকে অফিসে ফোন করে থানায় আসতে বলেন।
জিনিয়া নিখোঁজ।ফোনের সুইচ ওফ।পুলিশ বিকেলের মধ্যে অর্পণের বাসস্থান বস্তি রেট করে।ততক্ষণে তার ঘরে তালা পড়ে গেছে।অনুসন্ধান করে তারা যেটুকু জানতে পারে মাস ছয়েক আগে অর্পণ তার বোন ও মাকে সঙ্গে করে বস্তিতে এসে ওঠে।ভাড়া নিয়ে কখনোই কোন গন্ডগোল করেনি।সারাদিন সে একটা বাইকে করে ঘুরে বেড়াত।অনেক রাতে ঘরে ফিরতো।মা,বোন ঘরেই থাকতো।কারও সাথে খুব একটা কথাবার্তা বলতোনা।বাইকটা খুব দামী ছিলো।জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলো একটা ওষুধের কোম্পানীতে চাকরী করে সেখান থেকে লোন নিয়ে এটা কিনেছে।
  শুরু হোল থানা,পুলিশ আর প্রতি মুহূর্তে ফোন।জিনিয়ার বাবা খুবই শান্ত স্বভাবের মানুষ।একটুতেই নার্ভাস হয়ে যান।এই ঘটনার পর তিনি আরও চুপচাপ হয়ে যান।মিসেস চৌধুরী একাই ছুটোছুটি করতে থাকেন।নানান সোর্স জোগাড় করে তিনি পুলিশের উপর মহল পর্যন্ত পৌঁছে যান।প্রশাসন নড়েচড়ে বসে।দশদিনের মাথায় মিসেস চৌধুরীর মোবাইলে একটি ফোন আসে, 'যদি মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে চান থানা পুলিশ করবেননা'।মিসেস চৌধুরী তৎক্ষণাৎ থানায় যোগাযোগ করেন।ওই ফোনের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে দুর্গাপুরের 'অম্বোরীশ' হোটেল থেকে ফোন এসছে।সেখানকার পুলিশের সাহায্য নিয়ে সাদা পোশাকের কিছু মহিলা পুলিশ ওই হোটেলে গিয়ে ওঠেন।আর বাইরে থাকে সাদা পোশাকে অন্য পুলিশেরা।হোটেলে মালিককে পুরো বিষয়টা জানানো হয়।তিনি আশ্বাস দেন সর্বরকম সাহায্য তিনি পুলিশকে করবেন।
   প্রতিটা রুমেই ভীষনভাবে কড়া নজরদারি রাখা হয়।কোন রুমে বাইরে থেকে তালা দেওয়া দেখলেই ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে হোটেল মালিকের সাহায্যে সে রুমে ঢুকে তল্লাশি চালানো হয়।দুদিন এভাবেই কাটে।তৃতীয়দিন সন্ধ্যাবেলায় একজন অসুস্থ্য একটি মেয়েকে নিয়ে তড়িঘড়ি হোটেল থেকে ডাক্তারখানার উদ্দেশে হোটেল ছেড়ে বেরোতে গেলে সাদা পোশাকের মহিলা পুলিশেরা এসে জানতে চান কি হয়েছে?লোকটি তাদের জানায় তিনি একাই সামলে নিতে পারবেন।ততক্ষণে সেখানে বাইরের সাদা পোশাকের পুলিশও হাজির।মেয়েটির মুখের সাথে তাদের পকেটে থাকা জিনিয়ার ছবির মিল পেয়ে লোকটিকে তারা অ্যারেস্ট করেন।জিনিয়া তখন ঠক ঠক করে কাঁপছে।পুলিশবাহিনী তাকে আশ্বস্ত করে যে তার কোন ভয় নেই।বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ি তখনই স্টার্ট দেয়।ভিতরে চার,পাঁচজন বসা।পুলিশের তৎপরতায় তারাও ধরা পড়ে।
   প্রশাসনের কর্মদক্ষতার কারনে তারা জিনিয়া সহ আরও যে তিনজন মেয়েকে একই ফাঁদে ফেলে অপহরণ করেছিলো তাদের কাউকেই ভিনরাজ্যে পাচার করতে পারেনি।দুটি হোটেল মিলিয়ে তারা এই চারটি মেয়েকে রেখেছিলো।তাদের বলে রেখেছিলো যদি তারা মুখ খোলে সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মেরে ফেলবে।অল্পবয়সী মেয়েগুলো ভয় পেয়ে চুপসে গেছিলো।ধরা পড়ে পাচার চক্রের মূল পান্ডা যাকে অর্পণ তার মা বলে পরিচয় দিয়েছিলো।অর্পণের মত এরূপ অল্পবয়সী সুন্দর দেখতে গরীবঘরের ছেলেগুলোকে পয়সার লোভ দেখিয়ে এই কাজে লাগায় অসীমা দলুই।
   জিনিয়াকে একরাত থানায় কাটাতে হয় যদিও মেয়ের বয়স কম বলে উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি এনে জিনিয়ার মা মেয়ের সাথে থানাতেই থাকেন।পরদিন অনেক হ্যাপা সামলে মেয়েকে নিয়ে মিসেস চৌধুরী বাড়িতে ফেরেন।
   অপহরণের কুড়িদিনের মাথায় মেয়ে বাড়ি ফিরে আসে।শারীরিক ও মানষিক নানান নির্যাতনের পর জিনিয়া একেবারেই চুপচাপ হয়ে যায়।তার বাবা,মা এতটাই স্বাভাবিক যেন কিছুই হয়নি।জিনিয়ার বাবা বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র যেতে চাইলেও তার মা জিদ ধরে ওই বাড়ি বিক্রি করতে দেননি।তিনি বলেন,
---কয়েক বছর পর এসব আর কেউ মনেও রাখবে না।এতো কষ্ট করে এ বাড়ি করেছি আমি কিছুতেই তা বিক্রি করতে দেবোনা।ওর কপালে যা ছিলো সেটাই হয়েছে।বাঁচবো মাথা উঁচু করে।ভবিষ্যৎ এ আর কখনো ভুলের মধ্যে ও পা দেবেনা।আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।
    কিন্তু জিনিয়া প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়ে।সে একবার আত্মহত্যা করারও চেষ্টা করে।কিন্তু ওর মা সর্বদা ওর পাশে থেকে ওকে বুঝিয়ে স্বাভাবিক জীবনে আনতে সফল হন।পরের বছর উচ্চমধ্যমিক পরীক্ষাটা ও প্রাইভেটে দেয়।ভালোভাবেই পাশ করে। কলেজে ভর্তি হয়।গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে।
  পরিবারিক এক বিয়ের অনুষ্ঠানে মা,বাবার সাথে জিনিয়া শিলিগুড়ি যায়।সেখানে তাকে দেখে এক ভদ্রমহিলা তার ব্যাঙ্কে চাকুরীরত ছেলের জন্য পছন্দ করেন।জিনিয়ার মা রাজি হন।কিন্তু বাবা বেঁকে বসেন।তিনি ছেলের বাড়িতে সবকিছু জানাতে বলেন। কিন্তু জিনিয়ার মা কিছুতেই স্বামীর কথায় রাজি হননা।
--এই যে তোমার ভাইপোর বিয়ে হল ওই মেয়েটির অতীত কি আছে তা কি আমরা কেউ জানি?অতীতে কি ঘটেছে সেটা জেনে তা ধুয়ে কি ওরা জল খাবে?
--কিন্তু তবুও এতোবড় ঘটনা লুকিয়ে বিয়ে দেওয়া ঠিক হবেনা।পরে যদি জানতে পারে তাহলে ওর সাজানো সংসারটা ভেঙ্গেচুরে তছনছ হয়ে যাবে।
--যদি কখনও এ সমস্যা আসে তখনকার কথা তখনই ভাবা যাবে।আমরা জিনিকে শিলিগুড়ি নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেবো।সারাজীবন সংসার নিয়ে তুমি মাথা ঘামাওনি আজও তোমায় বলছি তোমার এই ভালো মানুষের স্বভাবের দাম কেউ দেবেনা।আমাদের যা অর্থ সম্পত্তি তা ওই মেয়েই পাবে।টাকা আর সম্পত্তিতে সবকিছু চাপা পরে যাবে।সে এখানে বছরে হয়তো একবার আসবে।কোন অসুবিধা হবেনা দেখো।বিয়ের আগে অনেক মেয়ের জীবনেই অনেককিছু ঘটে থাকে।বিয়ের সময় সব কি তার বাপের বাড়ির লোকজন ছেলের বাড়িতে জানায়?একটা সত্যি ঘটনা লুকিয়ে গেলে যদি আমার মেয়ে সুখি হয় তাহলে মা হয়ে আমি সেটা করতেই পারি।সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার এই অন্যায় কাজকে ঈশ্বর ক্ষমা করে দেবেন। তুমি শুধু মুখটা বন্ধ রেখো।
  জিনিয়ার বিয়ে হয়ে গেলো শিলিগুড়ি জেঠুর বাড়ি থেকে।কলকাতা শহরের মেয়ে বিয়ে হল বলতে গেলে একটু গ্রামেই।নামেই অবশ্য গ্রাম।শহরের মত সর্বসুবিধাযুক্ত।প্রচুর জমিজমা,পুকুর, দু দুখানা গাড়ি।প্রথম প্রথম অতো বড় বাড়ি আর সন্ধ্যা নামলেই বাড়ির আম,কাঁঠালের বাগানের দিকে তাকালে অন্ধকারে জিনিয়ার বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠতো।এখন অবশ্য সেই ভয় আর ওর করেনা।দিনের বেলা চারিদিকের সবুজের সমারোহে তার মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। পাকা সিমেন্ট করা বিশাল বড় উঠোনে জমজ দুই মেয়েকে নিয়ে বিকাল থেকে বসে থাকা ওদের বাবা না ফেরা পর্যন্ত।একটা সত্যি ঘটনাকে চেপে এই জীবন কাটাতে গিয়ে মাঝে মাঝেই জিনিয়া হাফিঁয়ে ওঠে।অন্ধকার ঘরে বসে কখনো সখনো চোখের জল ফেলে নিজের কষ্টকে লাঘব করতে চায়।আজকে তার সুখের জীবনে ওই অভিশপ্ত অতীত মাঝে মাঝেই সামনে এসে দাঁড়ায়।ভয় পায় সে।মনেমনে ভাবে তার স্বামীকে সে ঠকাচ্ছে।কিন্তু কিছুতেই পারেনা তার সেই কালো অতীতকে সামনে আনতে।হয়তো কোনদিনও পারবেওনা।


#সত্য_ঘটনার_উপর_আধারিত






Friday, July 12, 2019

এক অচেনার সঙ্গে পাড়ি

এক অচেনার সঙ্গে পাড়ি
    নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

    বাবা,মা আদর করে নাম রেখেছিলেন শ্যামলী।না গায়ের রং তার শ্যামলা ছিলোনা।সে ছিলো কালো কুচকুচে।তার এই গায়ের রংএর জন্য স্কুল,কলেজে কম কথা শুনতে হয়নি।বন্ধু বলতে ঠিক যা বোঝায় কোনদিনও শ্যামলীর সে অর্থে কেউ ছিলোনা।কোমর অবধি ঘন কালো চুল,পড়াশুনায় তুখোড়।প্রতি ক্লাসেই প্রথম হয়ে ওঠাটা কেউ আটকাতে পারেনি।শিক্ষক,শিক্ষিকাদের প্রিয় ছাত্রী হলেও ক্লাসমেটদের কাছে এই ব্যপারটা খুব হিংসানীয় ছিলো।যদি কখনো সে ক্লাসে না আসতে পারার কারনে  নোটস এর ব্যপারে কোন ক্লাসমেটের কাছে সাহায্য চেয়েছে কেউই তাকে কোনদিন  সাহায্য করেনি।শ্যামলী কিন্তু যখন যে পড়াশুনার ব্যপারে সাহায্য চেয়েছে তাকে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
  গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগে থেকেই চাকরীর চেষ্টা চালিয়ে গেছে।পরবর্তীতে সে ব্যাঙ্কে কেরানীর একটি চাকরী জুটিয়েও নেয়।কারন সে জানতো তার যে গায়ের রং কোনদিনও কোন ছেলে তাকে পছন্দ করবেনা।জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে গেলে চাকরী একটি তাকে জোগাড় করতেই হবে।তার পরিশ্রমের ফলও সে পায়।প্রথম প্রথম বাবা,মায়ের জন্য তাকে ছেলে পক্ষর সামনে বসতে হয়েছে।কিন্তু প্রত্যেকেরই সেই এক কথা,'পড়ে খবর দেবো'- খবর আর কেউ কোনদিন দেয়না।এখন সে পরিষ্কার বাবা,  মাকে জানিয়ে দিয়েছে বিয়ে সে করবেনা।
  অফিস আর বাড়ি।অবসর সময়ে মাকে কাজে সাহায্য করা আর গল্পের বই পড়া।বেশ কেটে যাচ্ছে দিনগুলি।একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে শ্যামলী দেখে এক ভদ্রলোক রাস্তার উপর পড়ে গিয়ে খুব হাপাচ্ছে।পথচারীরা একটু উঁকি দিয়ে দেখেই যে যার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।শ্যামলী কিছু মানুষের সাহায্যে একটি ট্যক্সি ডেকে ভদ্রলোককে নিয়ে হাসপাতাল আসে।ভদ্রলোকের কাছ থেকে ফোন নিয়ে তার বাড়ির কন্টাক্ট জেনে বাড়িতে খবর দেয়।কিছুক্ষণের মধ্যে ভদ্রলোকের বোন-ভগ্নিপতি এসে উপস্থিত হন।সে বাড়িতে চলে আসে।
  পরদিন অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে সে ওই ভদ্রলোককে দেখতে যায়। ততক্ষণে তার বোন সেখানে পৌঁছে গেছে দাদার কাছে।ভদ্রলোকের বেডের কাছে দাঁড়িয়ে জানতে চায়,'কেমন আছেন আজ?'
   ভদ্রলোকের বোনের কাছ থেকেই জানতে পারে হঠাৎ করেই  বুকে একটা ব্যথা অনুভূত হয় আর সাথে সাথে শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় রাস্তা উপর তিনি বসে পড়েন।থাকেন আসানসোল।বোন শ্রেয়ার বাড়ি কলকাতা।সেখানেই এসেছিলেন।কিছু ব্যক্তিগত কাজে বেরিয়ে হঠাৎ এই বিপত্তি।শ্রেয়ার সাথে ব্যক্তিগত আলাপে জানতে পারে শ্যামলী তার দাদার বয়স বিয়াল্লিশ বছর।এখনও বিয়ে করেনি।মাকে নিয়ে আসানসোলেই থাকে।বিয়ে করতে চায়না যদি বৌ এসে মাকে না দেখে।ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর মা অনেক কষ্ট করে দুই ভাই, বোনকে মানুষ করেছেন।বাবা একটা সাধারণ প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করতেন। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বাবা মারা যান।তখন দাদার বয়স সাত আর আমার পাঁচ।মা সারাদিন ধরে কয়েকটা বাড়িতে রান্না করতেন। এইভাবেই দিন চলতো তাদের । এখন দাদা আসানসোলে একটা স্কুলের হেড মাষ্টার।
  শ্যামলী ভাবে এতো স্বল্প পরিচয়ে শ্রেয়া কি অবলীলায় তার পরিবারিক গল্প বলে চলেছে তার সাথে।খুব ভালো লাগে শ্রেয়াকে তার।ভিজিটিং আওয়াজ শেষ হওয়ার পর প্রায় ঘন্টা দুয়েক দুজনে বসে গল্প করে চা কিছু টিফিন করে দুজন দুজনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
  শ্রেয়ার দাদা শতদলও সুস্থ্য হয়ে বোনের বাড়ি ফিরে যায়।শ্যামলী রোজই নিয়ম করে সন্ধ্যায় শ্রেয়ার কাছে ফোন করে তার দাদার খবর নিয়েছে।আর রোজ অনেক রাতে ফোন করে দুজনে গল্প করে সেই থেকে।খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায় পরস্পরের সাথে।
  শতদল আসানসোল ফিরে যায়।দিন গড়িয়ে যেতে থাকে।শ্রেয়া ও শ্যামলী পরস্পরের খুব ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে।উভয়ে উভয়ের বাড়িতেও এসেছে।খুব মিশুকে মেয়ে শ্রেয়া।খুব সহজেই সবাইকে আপন করে নেয়।একদিন অফিস ছুটির দিনে শ্যামলী দুপুরে খেয়েদেয়ে সবে একটু বিশ্রাম নেওয়ার তোড়জোড় করছে হঠাৎ শ্রেয়ার ফোন,
---তুমি বাড়িতে আছো?
--হ্যাঁ কেন বলো তো ?
--আমি আসছি এসে সামনাসামনি সব বলবো।
ঘন্টা খানেকের মধ্যে শ্রেয়া ও তার স্বামী এসে উপস্থিত।
--ভীষন দরকারী একটা কথা আছে তোমার সাথে।
--হ্যাঁ বলো ---
--না, সকলের সামনে না, আগে তোমার কাছে বলবো তারপর সেরূপ হলে পরে  মাসিমা,মেশোমশাইকে বলবো।চলো তোমার ঘরে চলো।
  শ্যামলী কিছুই বুঝতে পারছেনা।সে শ্রেয়াকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে আসে। শ্রেয়া বলতে শুরু করে,
--মায়ের শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালোনা।বলতে গেলে ডক্টর জবাব দিয়েই দিয়েছেন।দাদার এতোবছর বয়সেও আমরা কোনদিন তার বিয়ে দিয়ে উঠতে পারিনি।কিন্তু মায়ের এই মৃত্যুশয্যায় মা দাদার হাত ধরে তার বৌ দেখে যেতে চেয়েছেন।দাদা মাকে না করতে পারেনি।আমার দাদা রাজি হয়েছে।
--বাহ!এতো বেশ ভালো কথা।কিন্তু আমায় এসব বলছো কেন?
--কারন তুমিই পারো এই সমস্যা থেকে আমাদের উদ্ধার করতে---1
--মানে ---?
--আমার দাদা খুব ভালো মানুষ জানো
নিজের দাদা বলে বলছিনা---
--আরে দাঁড়াও দাঁড়াও , আমাকে একটু পরিষ্কার করে বলো তো কি বলতে চাইছো?
--তোমাকে দাদা বিয়ে করতে চায়---
শ্যামলী শুনেও যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেনা।সুপুরুষ বলতে যা বোঝায় শ্রেয়ার দাদা ঠিক তাই।তিনি বিয়ে করতে চান কিনা ----। আত্মীয়স্বজন মহলে সে তো কালিন্দীর বলেই পরিচিত।
--তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে শ্রেয়া।আমার মত এইরূপ কুৎসিত একটি মেয়েকে---তোমার দাদা কত সুন্দর দেখতে তিনি কেন আমায় বিয়ে করতে ....
শ্যামলীর কথা শেষ হয়না শ্রেয়া বলে ওঠে,
--দাদা নিজে মুখে ফোনে কাল আমায় একথা বলেছে।প্লিজ তুমি রাজি হয়ে যাও --।
--তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে শ্রেয়া।
--কিচ্ছু ভুল হচ্ছেনা।জানো দাদা কাল ফোনে আমায় বলেছে মানুষের মনটাই হচ্ছে আসল।চেহারা সেখানে গৌণ।চেহারা বাহ্যিক মনকে আকৃষ্ট করে ঠিকই কিন্তু সংসার করতে গেলে দরকার একটি সুন্দর মনের।আর শ্যামলীর সেটা আছে।এই বয়সে এসে বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে শ্যামলীর মত একটি সুন্দর মনের মানুষকেই বিয়ে করবো।
   বিয়ে হয়ে গেলো শ্যামলী ও শতদলের।অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শ্যামলী আসানসোল বদলী হয়ে যায়।একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের হাত ধরে সাঁইত্রিশ বছর বয়সে শ্যামলী তার নূতন জীবনে দুরুদুরু বুক নিয়ে বাড়ি থেকে এতোটা দূরত্বে আসার সময় অনেক আশঙ্কা নিয়েই পা বাড়িয়েছিলো।একমাত্র ভরসা ছিলো শ্রেয়া।কিন্তু নূতন জীবনে প্রবেশ করে শতদলের মত স্বামী পেয়ে অনেক সময় খুশীতেই তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নির্গত হয়েছে।একদিন শতদল দেখতে পেয়ে জানতে চেয়েছিলো,
--কাঁদছ কেন তুমি?আমি কি তোমায় কোন কষ্ট দিয়েছি?
কান্না যেন তখন দ্বিগুণ বেগে ধাবিত হয়েছে।শতদলকে জড়িয়ে ধরে বলেছে,
--এতো ভালো কেন তুমি?আমি তো কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি আমার বিয়ে হবে।আর এমন দেবতার মত স্বামী পাবো।আমার গায়ের রং নিয়ে ছেলেবেলা থেকে নানান কটূক্তি শুনতে শুনতে জীবনের সাঁইত্রিশটা বছর পার করেছি।বাবা মা ছাড়া অন্তর থেকে কেউ কোনদিন ভালোবাসেনি এটা আমি সবসময় বুঝতাম।
--তারা তোমার বাহ্যিক রূপটা দেখেছে।মানুষের অন্তরটা দেখতে গেলে ঠিক তার মতই আর একটি মন চায়।আমি প্রথমদিনই তোমার অন্তরটা দেখতে পেয়েছিলাম।মা যদি আমার বিয়ের জন্য জিদ না ধরতেন এই বয়সে মনেহয় কলকাতা গিয়ে  তোমাকে প্রেম নিবেদন করতে হত।
বলে শতদল হাসতে থাকে।শ্যামলী আরও নিবিড়ভাবে শতদলকে জড়িয়ে ধরে। 

Saturday, July 6, 2019

দাম্পত্য এক রসময় মাঠ

#আমার_লেখনীতে
   দাম্পত্য এক রসময় মাঠ

--সকাল থেকে যে বলছি একটু বাজার যাও তা বসে বসেই শুনে যাচ্ছ?উঠার কোন নামই নেই --
  পেপারটা থেকে মুখ সরিয়ে অর্ণববাবু কটাক্ষ দৃষ্টিতে স্ত্রী মনোরমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
--তুমি আজ একটু ডাল , ভাত করে চালিয়ে দাও , আজ অফিসে একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে।
---বাজার যেতে বললেই ওই এক কথা ডাল,ভাত করো নুতবা চালে ডালে চালিয়ে দাও।বলি রোজ রোজ ওই ডাল খেতে খেতে যে মুখে অরুচি ধরে গেছে।তুমি কি ভাবো গো তোমার একারই বয়স হয়েছে আমার হয়নি?
 অর্ণববাবু মুখে কুলুপ এঁটে স্নানে চলে গেলেন।রমাদেবী মুখে একটা টেপ রেকর্ডার চালিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে দুই গ্যস জ্বালিয়ে ভাত ও ডাল চাপিয়ে দিয়ে একটু আলুর দম করার জন্য আলু নিয়ে কাটতে বসলেন।তারও বয়স হয়েছে হাঁটুতে ব্যথা, ডাক্তার নীচুতে বসতে একদম নিষেধ করেছেন কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে কিছুই কাটতে পারেননা।তাই কষ্ট হলেও তিনি নীচুতেই বসেন।কাজের মেয়ে সরলা সাতদিনে চারদিন আসে তো তিনদিন আসেনা।তবুও রেখেছেন ছেড়ে দিলে পাবেন কোথায়?সবথেকে বড় কথা সরলাকে ছাড়িয়ে দিলে মেয়ের কানে গেলে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ছাড়বে।
অর্ণববাবু স্নান করে ঘরে যেতে গিয়ে দেখেন রমাদেবী নীচুতে বসে আলু কাটছেন।
--তোমাকে ডাক্তার কতবার বলেছে তুমি নীচুতে বসবেনা এতে তোমার হাঁটুতে আরও বেশি কষ্ট হবে কেন কথা শোনানো বলো তো?
--থাক আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবেনা,তুমি তো বলে খালাস ডাল, ভাত করো।অফিস যাওয়ার সময় শুধু ওই ডাল,ভাত কি খাওয়া যায়।তুমি পারোনা আমি বুঝি কিন্তু আমিও বা কি করি বলো তো?
অর্ণববাবু ও রমাদেবীর বিবাহিত জীবন আজ পঁয়ত্রিশ বছরের।একমাত্র মেয়ে অনুষ্কা বছর পাঁচেক আগে বিয়ে হয়েছে।মাস ছয়েক বাকি অর্ণববাবুর রিটায়ারমেণ্টের।মেয়ে মাঝে মাঝে দুবছরের নাতিকে নিয়ে আসে।কিন্তু জামাই ওই বছরে একদিন।জামাইষষ্ঠীতে।ব্যবসায়ী মানুষ ভীষন ব্যস্ত একদম সময় পায়না।
  সকালের আলুরদম আর দোকানের তৈরী হাতে গড়া রুটি যা প্রতিদিন অর্ণববাবু অফিস থেকে ফেরার পথে নিয়েই ফেরেন।খেতে খেতে দু'জনে গল্প করছিলেন।হঠাৎ অর্ণববাবু বললেন,
-- আর তো মাত্র ছ'মাস বাকি রিটায়ারমেণ্টের।টাকাপয়সা মোটামুটি ভালোই পাবো।চলো দু'জনে মিলে একটু তীর্থ করে আসি।
---তা কোথায় যাবে বলে ভেবেছো?
---কেদার বদ্রীনাথ।
রমাদেবী যেন আঁতকে উঠলেন..
---ওমা --ওখানে তো ঠান্ডা শুনেছি।তোমার তো আবার ঠান্ডার ধাত।একটুতেই ঠান্ডা লেগে যায়।তখন তো দু'মিনিট অন্তর তোমায় ফোঁসফোঁস (ইনহেলার , এটাকে রমাদেবী ফোঁসফোঁস বলেন তার কারণ এটা অর্ণববাবু যখন মুখে প্রেস করেন তখন ফোঁস করে একটা আওয়াজ হয়) নিতে হয়।সারারাত কাশতে থাকো।নিজেও ঘুমাতে পারো না আমাকেও ঘুমাতে দাওনা।
-- হ্যাঁ তাই তো আমি তোমাকে রাতে ঘুমাতে দিইনা! আর নিজে যখন হাঁটুর ব্যথায় , কোমর ব্যথায় সারারাত যন্ত্রণায় ছটফট করো তখন আমার ঘুমের ব্যাঘাত হয়না?কোনদিন শান্তিতে একটু ঘুমাতে পারি?
--রাত অনেক হোল।বলি এখানে বসে আমার সাথে ঝগড়া করেই কি রাত শেষ করবে নাকি?কাল তো আবার অফিস আছে।বাজার যেতে হবে বলে দিলাম কিন্তু ---
---হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে ।জীবনে কোনদিন একটু শান্তি পেলামনা।
---আমাকেও যেন কত শান্তিতে রেখেছো-
 এখন দয়া করে শুয়ে পরো।বেশি রাত জাগলে শরীর খারাপ করলে তো আমি ছাড়া  গতি নেই ---
অর্ণববাবু কথা না বাড়িয়ে গিয়ে শুয়ে পড়লেন।রমাদেবীও রাতের টুকটাক কাজ সেরে স্বামীর পাশে শুয়ে পড়েন।অনেক রাতে রমাদেবীর কাতরানোর আওয়াজে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়।মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চান
--কি গো হাঁটুতে যন্ত্রণা হচ্ছে?
উত্তর পেয়ে আস্তে আস্তে উঠে লাইট জ্বালিয়ে ব্যথার বামটা নিয়ে গিয়ে স্ত্রীর হাঁটুতে অনেকক্ষণ ধরে মালিশ করেন।কিছুক্ষণ পর ব্যথা একটু কমাতেই রমাদেবী ঘুমিয়ে পড়লে পা টিপে টিপে উঠে বামটা রেখে লাইট ওফ করে স্ত্রীর পাশে এসে শুয়ে একসময় নিজেও ঘুমিয়ে পড়েন।
   সকালে রমাদেবী ঘুম থেকে উঠে দেখেন আগেই তার স্বামী উঠে পড়ে চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছেন।স্ত্রীকে দেখতে পেয়ে হেসে পড়ে জানতে চান,
--কি গো কেমন আছো এখন?  ঘুমাচ্ছ দেখে আর ডাকিনি তোমায়।নিস্পাপ শিশুর মত অকাতরে ঘুমাচ্ছিলে।তুমি মুখ ধুয়ে নাও আমি চা করে আসছি।চা খেয়েই বাজার যাবো।
--আরে আমি তো উঠে গেছি।আমি চা করছি।তুমি বরং যাও পেপারটা বারান্দা থেকে তুলে চোখ বুলাতে লাগো।
--আচ্ছা তবে তাই যাই।
  চা করে রমাদেবী ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসেন।
--বলি বাজারের ব্যাগটা দাও গো।আজ তো সত্যিই বাজার না গেলে হবেনা।রান্নাঘর থেকে বাজারের ব্যাগটা হাতে করে নিয়ে এসে আব্দারের সুরে স্বামীকে বললেন,
--চলো দুজনেই বাজার যাই।
--না না তোমাকে যেতে হবেনা।কাল রাতে অত কষ্ট পেয়েছো ব্যথায়।আজ আবার এতোটা পথ হেঁটে বাজার যাবে, এসে রান্না করে অফিসের ভাত দেবে , খুব কষ্ট হবে গো তোমার।
--না কষ্ট হবেনা।আর হলে তুমি আছো তো।বাম লাগিয়ে দিও।চলো দু' জনে কথা বলতে বলতে বাজারটা করে নিয়ে আসি।অর্ণববাবু আর আপত্তি করেননা।
---বেশ তবে তাই চলো।দুজনেই যাই।
  বেরিয়ে গেলেন দুজনে ঘরে তালা লাগিয়ে।বাজার শেষে বাজারের ভিতরেই দুজনের সাথে একপ্রস্ত জোর ঝামেলা হয়ে গেলো একবার।বাজারের ব্যাগ দু'জনেই টানবেন।কেউ ছাড়ার পাত্র নয়।পরস্পরের একই কথা, 'তোমার কষ্ট হবে আমাকে দাও---' একেই বলে বোধহয় দাম্পত্য----

Friday, July 5, 2019

আর নয় ষষ্ঠী


আর নয় ষষ্ঠী
       নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

   সকালবেলা মাকে রান্নাঘরে অনেকবার চোখ মুছতে দেখেছে লিপি।বাবা সকাল থেকে পেপার মুখে গুম হয়ে বসে।আজ বাবা জলখাবারও খাননি।রান্নাঘরে সকালের দিকে টুকটাক সাহায্য করেছে লিপি তার মাকে।ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে সেই বিভীষিকাময় দিনটির কথা।কিন্তু চেষ্টা করলেই কি ভুলে থাকা যায়।এই চার বছরে একমুহূর্তের জন্যও কি লিপি ভুলতে পেরেছে সেই দিনটির কথা?
   চার বছর বাদে লিপিদের বাড়িতে আবার জামাইষষ্ঠী হচ্ছে।আজও ঠিক সেই চার বছর আগের দিনটির মত আকাশ কালো মেঘে আচ্ছন্ন।কিছুক্ষণের মধ্যেই নামবে মুষলধারে বৃষ্টি।সেদিনের সেই ঘটনার পর এ বাড়িতে আর জামাইষষ্ঠী হয়নি।বড়দি জানিয়েই দিয়েছে সে আর ষষ্ঠীতে আসবেনা।লিপিকা মেজ । আর ছোট লতিকা। চারমাস আগে বিয়ে হয়েছে সকলের আদরের ছোটবোন লতিকা ওরফে  লতির।লতি বলেছিলো,'মা জামাইষষ্ঠী  যখন উঠিয়ে দিয়েছো নূতন করে আর শুরু করতে হবেনা।মা ও রাজি ছিলেন।কিন্তু বাধ সাদলো লিপি।সে মাকে বললো,
---তা কি করে হয়?নূতন জামাই।তার কথা নাহয় বাদ ই দিলাম। ওদের বাড়ি থেকেই বা কি ভাববে?না মা তুমি এবার থেকে পূণরায় জামাইষষ্ঠী চালু কর। মায়ের অমত থাকলেও লিপিকার জেদের কাছে তাকে হার মানতেই হোল।
   চার বছর আগে এমনই এক ষষ্ঠীর দিনে লিপিকা ও রাহুল মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে বাইক নিয়ে ষষ্ঠী নিতে হাজির।কাকভেজা ভিজে যখন দুজনে এসে ঘরে ঢোকে লিপিকার মা চিৎকার করতে থাকেন লিপি ও রাহুলের জামাকাপড় পাল্টানোর জন্য।কিন্তু দুজনের যেন কোন হেলদোল নেই।দুজনেই ওই ভিজে চপচপে জামাকাপড় পরে মেঝেতেই বসে চা খেতে শুরু করে।লিপির মা এসে জোর তাগাদা দেন পোশাক পাল্টে নেওয়ার জন্য।তখন রাহুল মাকে বলে,
--মা,বৃষ্টির মধ্যে ছাদে উঠে কটা ছবি তুলেই জামাকাপড় পাল্টে নেবো।
--কিন্তু বাবা পুরনো বাড়ি।দুদিন ধরে সমানে বৃষ্টি হচ্ছে।ছাদের গাঁথুনীর নানান জায়গায় ফাটল।তোমরা বরং ছবি তুলতে হলে উঠোনে গিয়ে তোলো।
রাহুল হেসে বলে ওঠে,
--মা আমরা বাচ্চা নয়।ঠিক নিজেদের সামলে নিতে পারবো।আপনি একটুও ভাববেন না।মিনিট পনের মধ্যে আমরা নেমে আসছি।
 বৃষ্টিতে ভিজে ছবি তুলতে দুজনেই ছাদে চলে গেলো।তারা একটার পর একটা ছবি তুলেই চলেছে।ক্যামেরা যাতে না ভেজে যখন যে ছবি তুলছে তখন তার মাথায় ছাতাটা থাকছে।রাহুলের হাতে ক্যামেরা আর মাথায় ছাতা।লিপিকে পোজ দিতে বলে পিছন হাঁটছে।লিপি দু দুবার সাবধানে করেছে।সঙ্গে সঙ্গে রাহুলের উত্তর এসেছে
---আরে বাবা আমার তো বোধবুদ্ধি আছে না কি?তুমি একটু এ্যানগেলে দাঁড়াও....হ্যাঁ তোমার সামনের দিকে তাকাও ...আরে হাঁটার মত করে পজিশনটা দা....আ ..আ ...আ ...
লিপি পিছন ঘুরেই দেখে ছাদের প্যারাপিট দেওয়ালের একাংশ ভেঙ্গে রাহুল নীচে পড়ে .....চারিদিকে রক্তে ভিজে যাচ্ছে ...দৌড়ে নিচুতে চিৎকার করতে করতে নেমে আসে ....হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ।
  জামাইষষ্ঠীর আসন পাতা।সামনে উপকরণ সুন্দর করে সাজানো ...প্রদীপটা সকলের অলক্ষ্যে কখন যেন নিভে গেছে ....শববাহী গাড়ি হাজির...শ্বশুরবাড়ি থেকে পূণরায় চন্দনের ফোঁটা আর গলায় রজনীগন্ধার মালা পরে রাহুল রওনা দিলো চিরদিনের মত।সারা পৃথিবীতে রাহুল ছিলো একাই।তার কোন আত্মীয়স্বজন ছিলোনা।ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো অফিস কলিগ লিপিকাকে।যেখান থেকে সে জীবনের নূতন ইনিংস শুরু করেছিলো আজ সেখান থেকেই তার জীবনের শেষ ইনিংসটা খেলে গেলো।
    তারপর এ বাড়িতে আর ষষ্ঠী হয়নি।দিদি সেই থেকে ষষ্ঠীতে আসা বন্ধ করেছে। আজও আসেনি।ভীষন জোরে বৃষ্টি শুরু হল।বৃষ্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই লতি ও বিভাস এসে পৌঁছেছে।মা এবার ওদের ষষ্ঠী দেবেন।লিপি সকলের অলক্ষ্যে আস্তে আস্তে ছাদে উঠে গেলো।না,সে নিজের ইচ্ছাতে আসেনি।কেউ যেন তাকে ঠেলে নিয়ে এসেছে।ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে।লিপি ছাদে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়ানো।কোনদিকে তার যেন কোন খেয়াল নেই।নিজ মনেই ভিজে চলেছে।হঠাৎ একটি আলোর ঝলকানিতে সামনে তাকিয়ে দেখে ....'কে কে ও ...হ্যাঁ হ্যাঁ রাহুল তো ...ওই তো সেই হাতে ক্যামেরা ...লাল টি শার্ট আর কালো জিন্স পরা ...হাসছে খুব হাসছে ...একি এতো রক্ত কেন ছাদে ...এতো রক্ত কোথা দিয়ে আসলো ...রাহুল ...কোথায় গেলো ..রা ...হু...ল।
  যখন লিপির জ্ঞান ফিরলো তখন বাড়ির সকলে তাকে ঘিরে আছে।মা আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
--এই বাড়িতে আজ থেকে আর কখনো জামাইষষ্ঠী হবেনা।

Monday, July 1, 2019

একলা থাকা


#একলা_থাকা
         নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী
সব সম্পর্ক চিরজীবনের নয়
মাঝ পথেই কত সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়,
তবুও বারবার পিছন ফিরে তাকাই
হারানো দিনগুলি ফিরে পেতে চাই।
হয়না বলা অনেক কথা
জমা হয় বুকে গভীর ব্যথা,
শুরুতেই যা হয়ে যায় শেষ
আজীবন শুধু থাকে তার রেশ।
হৃদয়ে হয় কত রক্তক্ষরণ
সহস্রবার ক্ষতবিক্ষত,
জীবন মানেই একলা থাকা
কষ্ট নিয়েই বেঁচে থাকা।

Thursday, June 27, 2019

পরাজিত

পরাজিত
   নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

  ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছেন।রোগীর কাছে এইসময় একজন মাত্র থাকতে পারবেন।সকাল থেকে মা ই ছিলেন।রাতে অপরাজিতা নিজে এসে মাকে মামার সাথে মামাবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে জোর করে।অবাক হয় এই মহিলাকে দেখে অপরাজিতা।কোনদিন স্বামী সুখ কি জিনিস তা তিনি জানেননা।অথচ শুনেছে মায়ের কাছে মা নাকি ভালোবেসেই বাবাকে বিয়ে করেছিলেন।জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই অপরাজিতা দেখে আসছে বাবা কোনদিনও মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করেননা।প্রতিবাদ করতে গেলে অপরাজিতাও বাবার কুকথার হাত থেকে রেহাই পায়নি।আর বাবার অনুপস্থিতিতে মা সবসময়ই বাবার পক্ষ নিয়ে বলে গেছেন, ' মানুষটা এরকম ছিলোনা রে ..'কিন্তু অপরাজিতা কোনোদিনও মায়ের প্রতি এই মানুষটার কোন সহানুভূতি দেখেনি।তাই মানুষটাকেও কোনদিন সম্মান তো দূরহস্ত বিন্দুমাত্র ভালবাসতেও পারেনি।
   আজ বাবার মৃত্যুশয্যার শিয়রে বসে অনেক কথায় তার মনে পড়ছে।খুব ছেলেবেলার একটা ঘটনা।আবছা আবছা মনে আছে।মায়ের সাথে সেদিন মামাবাড়ি গেছিলো।ফিরতে একটু রাত হয়ে যায়।বাড়ি ফিরে বারবার ডাকার পরেও বাবা এসে দরজা খোলেননি।শেষে মা পাশের ফ্লাটের কাকুকে ডেকে এনে বাবাকে ডেকে তোলেন।সেদিন বাবা মাকে মারতে মারতে বাথরুমের ভিতর আটকে রেখেছিলেন কয়েক ঘন্টা।আর মেয়েকে বলেছিলেন,
--যদি তুই বাথরুমের দরজা খুলে দিস তাহলে তোকেও মেরে বাথরুমে আটকে রাখবো।
এইরূপ ছোটখাটো অনেক ঘটনা।আর একদিনের ঘটনা অপরাজিতার মনকে খুব কষ্ট দেয় মামা আর মাসি এসেছিলো বাড়িতে বেড়াতে।সেদিন মা গিয়ে বাবাকে বলেছিলেন একটু মিষ্টি নিয়ে আসতে।বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু যতক্ষণ মামা , মাসি ছিলেন বাড়িতে তিনি ফেরেননি।অনেক রাত্রে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘুম থেকে জেগে দেখে বাবা মাকে মেঝেতে ফেলে ভীষনভাবে মারছে।খাট থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে অপরাজিতা।সঙ্গে সঙ্গে বাবা তাকে বাহু ধরে টেনে তুলে এক ধাক্কা মারে ।দেওয়ালের গায়ে পড়ে সে গিয়ে জ্ঞান হারায়।
   বাবা মাঝে মাঝে ড্রিংক করে বাড়িতে আসতেন।কিন্তু কোনদিন এই অবস্থাতে সে বাবাকে চিৎকার,চেঁচামেচি করতে শোনেনি।কোন মহিলার সাথেও কোনরকম সম্পর্ক আছে বলেও বড় হয়েও শোনেনি।তবে তিনি যে কেন এরূপ ব্যবহার করতেন মায়ের সাথে আজ পর্যন্ত তা অজ্ঞাতই থেকে গেছে।একটা প্রাইভেট ফার্মে বাবা চাকরী করতেন।মোটামুটি চলে যেত সংসার । মায়ের কোনদিনও কোন চাহিদা সে দেখেনি।মা অন্ধের মত ভালোবাসতেন বাবাকে।আর বাবা----
চিন্তায় ছেদ পড়ে নার্সের ডাকে।
---এবার আপনি বাইরে যান।সকালে ডেকে নেবো।
কোন কথা না বলে একবার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে অপরাজিতা বাইরে বেরিয়ে আসে।বুকের ভিতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে।কিন্তু এই লোকটাকে সেতো কোনদিন ভালবাসতে পারেনি।তবে কেন তার আজ এতো কষ্ট হচ্ছে?মনেহচ্ছে কান্না দলা পাকিয়ে তার গলার কাছে আটকে আছে।জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এই অত্যাচারী মানুষটাকে সে এড়িয়েই চলেছে। তবে কেন আজ তার সেই মানুষটার জন্যই গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে।নিজের অজান্তেই অঝোর ধারায় চোখ থেকে জল পড়ে যাচ্ছে।হঠাৎ কাঁধে মায়ের স্পর্শে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে মা ও মামা দাঁড়িয়ে। মামা বললেন,
--তোর মা কিছুতেই বাড়ি গেলোনা।এখান থেকে কিছু খাইয়ে নিয়ে আসলাম।
অপরাজিতা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলোনা।মাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো।হঠাৎ করেই যেন সুমিতা শক্ত হয়ে গেছেন।আস্তে আস্তে মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলেন,
--কাঁদিস না মা।এই দেখ না আমি কেমন শক্ত হয়ে গেছি।মানুষটা সত্যিই খুব ভালো ছিলো।আমাদের বিয়ের পরে তুই আসার আগে একবার আমি আর তোর বাবা বাইকে মারত্মকভাবে এ্যাকসিডেন্ট করেছিলাম।পরদিন আমাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিলেও তোর বাবার তিনদিন কোন জ্ঞান ছিলোনা।মাথায় খুব আঘাত পেয়েছিলো।তিনমাস হাসপাতালে ছিলো।তখনই ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন উনার সাথে কোন ব্যপারে মতের অমিল হলে উনি উনার মেজাজ ধরে রাখতে পারবেননা।অনেক চেষ্টা করেছি যাতে তোর বাবা মেজাজ হারিয়ে না ফেলে কখনো।চুপচাপ অত্যাচার সহ্য করে গেছি।কিন্তু তবুও দেখ মানুষটাকে বাঁচাতে পারলামনা।সেই এ্যাকসিডেন্ট এরই রেশ হয়তো।ব্রেনস্ট্রোক ।
   অপরাজিতা কাঁদতে কাঁদতেই মাকে বলবো,
---এতদিন কেন বলনি মা?এটা তো বাবার রোগ ছিলো।কিন্তু আমি যে বাবাকে কোনোদিনও ভালবাসতে পারিনি।তবুও আজ আমার বাবার জন্য ভীষণ কষ্ট হচেছ।
-- সেটাই তো স্বাভাবিক রে ! সে যে তোর বাবা।নিজেকে শক্ত কর।এইসময় আর কান্নাকাটি করে তার যাওয়ার পথটা পিছিল করে দিসনা।
  ঘোষণা শুনে মা,মেয়ে দৌড়ে উপরে ওঠে।কান্নায় ভেঙ্গে পরে অপরাজিতা।আর সুমিতা যেন পাথর হয়ে গেছেন।কুড়ি বছর ধরে যুদ্ধ শেষে আজ সে সম্পূর্ণ পরাজিত।

নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী