Sunday, October 17, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (পঞ্চম পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে ( পঞ্চম পর্ব)
  চৌধুরী গিন্নী বেশ ভালোভাবেই মনোতোষকে চিনতেন।তিনি জানতে চাইলেন,
--- মনোতোষ কোথায়?তুমি তো মনোতোষ নও।
বরযাত্রীদের ভিতর থেকে একজন উত্তর দিলো,
--- আছে আছে।আপনারা যে এত তাড়াতাড়ি চলে আসবেন বরণ করতে আমরা বুঝতে পারিনি।
--- এর মানেটা কি?বিয়ে তো ঠিক হয়েছে মনোতোষের সাথে।তুমি কোথা থেকে আসলে?
 --- আসলে কি হয়েছে জানেন?মনোতোষ তো সকাল থেকে না খেয়ে আছে।ওই সেজেগুজে রিক্সায় করে আসছিল।খালিপেটে ও খেঁজুরের রস খেতে ভালোবাসে।হঠাৎ দেখে একটা খেঁজুর গাছে রসের ঠিলেটা ভর্তি হয়ে পড়ে যাচ্ছে।অমনি রিক্সা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে গাছে উঠে ঠিলে থেকে রস খেতে শুরু করলো।তাই টোপরটা আমায় মাথায় পরিয়ে দিয়ে গেছে।আপনাদের পুকুরেই হাতমুখ ধুচ্ছে।এখনি এসে পড়বে।
 গল্প শুনে সকলে তো তাজ্জব।শান্তিদেবী মনেমনে ভাবলেন এ কোন বাঁদরের সাথে তার সায়নীর বিয়ে ঠিক হল।মেয়েটা কি সুখী হবে? এ ছেলের তো গুণের শেষ নেই।একে মানিয়ে গুছিয়ে নিয়ে কিভাবে তাদের সানু সংসার করবে?
 ইতিমধ্যে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে বর হাজির হলেন।ধুতি ছেড়া,পাঞ্জাবিতে নোংরা লাগানো।এসেই খপাত করে রিক্সায় উঠে বসে বন্ধুর মাথা থেকে টোপরটা খুলে নিয়ে নিজেই টোপরটা মাথায় পরে নিল।অন্যেরা হাসাহাসি করতে লাগলেও শান্তিদেবীর রাগে তখন সর্বশরীর জ্বলছে।তিনি মুখ ভার করে মনোতোষকে বরণ করে এসে আলমারির ভিতর থেকে তার স্বামীর একটা নূতন ধুতি বের করে এক মেয়ের হাতে দিয়ে বলেন,
--- এটা পরে নিতে বল।ওই ছেড়া ধুতি পরে তো আর বিয়ে করতে বসতে পারবে না।
 এ কথা বলে তিনি রাগে গজগজ করতে লাগলেন।কিন্তু মনোতোষ নির্বিকার।সে কোন অন্যায় করেছে বলে তার মনেই হয়না।
  বেশ ভালোভাবেই বিয়ে মিটে গেলো। বর কর্তা হয়ে যিনি এসেছিলেন তিনি ছিলেন মনোতোষের কাকা।ওই গ্রামেই তিনি থাকেন।তিনি মনোতোষকে ডেকে বলেছিলেন,
--- এই মেয়েকে বিয়ে করবি বলে অনেক খেল দেখিয়েছিস।তারপর আজকে আবার যা তুই করলি তার কোন ক্ষমা নেই।আর যদি কোন গোল তুই বাঁধিয়েছিস তাহলে কিন্তু আমার থেকে খারাপ কেউ হবেনা।এই পরিবারটা অত্যন্ত ভদ্র তাই তুই আজ এই অন্যায় করার পড়েও মুখ বুঝে বর বরণ করেছেন এরা।এইরূপ যদি আমার বাড়িতে ঘটতো বিয়ে করা ঘুচিয়ে দিয়ে মেরে তক্তা বানিয়ে দিতাম।
 মনোতোষ মাথা নিচু করে মিনমিন করে বললো
--- ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে।আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।
--- ঠিক আছে।তবে দোহাই তোমার বংশের মুখে আর চুনকালি দিও না।নির্বিঘ্নে বিয়েটা হয়ে যেতে দাও।
 তারপর সেদিন মনোতোষ আর কোন কান্ড ঘটায়নি।কিন্তু অমরেশবাবু তার মেঝমেয়ের বিয়ে দিয়ে খুবই ভেঙ্গে পড়েন।দিন সাতেক তিনি গ্রামের বাড়িতেই থেকে যান আর ঠিক তারই মধ্যে গ্রামের কুখ্যাত ডাকাত খালু খা ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে।এই কালু খার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি ডাকাতির কেস চলছে।আর প্রতিটা কেসেই একই গ্রামে থাকার ফলে আসামী পক্ষের উকিল অমরেশবাবু।শেষবার তাকে ছাড়ানোর সময় সে অমরেশবাবুকে কথা দিয়েছিল জীবনে আর কখনো চুরি,ডাকাতি করবে না।কিন্তু পুনরায় ডাকাতির কেসে সে ফেঁসে যাওয়ায় অমরেশবাবু যান প্রচণ্ড খচে।যারফলে তিনি কালু খার বাড়ির লোকদের বলে দেন তার হয়ে আর কেস তিনি লড়বেন না।বাড়ির লোক ফিরে যায়।কিছু পড়ে তার বৃদ্ধা মা আসেন দেখা করতে অমরেশবাবুর সাথে।তিনি এসে তাকে জানান,
--- তিনদিন ধরে বাড়িতে কোন ভাত,রুটির সংস্থান নেই।সেইভাবেই চলছিলো।কিন্তু হঠাৎ করে আট বছরের নাতিটা অসুস্থ্য হয়ে পড়ায় ডাক্তার দেখানোর দরকার হয়ে পরে।আর এই কারণেই ----
--- তাই বলে চুরি,ডাকাতি করবে?আমার কাছে তো আসতে পারতো।আমি বারবার ওর হয়ে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য করতে পারবো না।
--- বাবু এবারের মত উদ্ধার করে দেন।আর কোনদিন এসব ও আর যাতে না করে সে ব্যবস্থা আমি করবো।
 অমরেশবাবু জীবনে যত কেস লড়েছেন তার অধিকাংশই জিতেছেন।হেরে গেছেন খুব কম।কিন্তু কালুর এবারের কেসটাই তিনি হেরে যান।সেদিন ছিল শনিবার।তাই অফিস করে তিনি গ্রামের বাড়িতে আসেন।স্বভাবতই কেসে হেরে গিয়ে তার মনমেজাজ ভালো ছিলনা।শান্তিদেবী যখন তাকে চা করে এনে দেন তখন মুখে দিয়েই তিনি চিৎকার করে ওঠেন বাজে চা হয়েছে বলে।
 তার স্ত্রী অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।কারণ আজ পর্যন্ত তার স্বামীর এরূপ আচরণ তিনি দেখেননি।অনেকক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ করার পর হঠাৎ তার মনে পড়ে কালুর কিসের তারিখ ছিলো আজ।তিনি সরাসরি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
--- তুমি কালুর কেসটাই হেরে গেছো তাই না?
 দুর্ব্যবহারের কারণটা স্ত্রী জেনে যাওয়ায় তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
--- ছেলেটার পাঁচ বছর শশ্রম হাজতবাস হয়ে গেলো।কিছুই করতে পারলাম না।ও ঢুকেছিলো ওই বাড়িতে চুরি করতে কিন্তু বাড়ির লোক জেগে যাওয়ায় শুরু করে ডাকাতি করতে।শুধু কি তাই বাড়ির গৃহকর্তা তাকে বাধা দিতে গেলে তাকে দা এর কোপ বসিয়ে দেয়।সে বেচারার কতগুলো সেলাই পড়েছে।এত কিছুর পরে তাকে কি আর বাঁচানো যায়?তুমি একটু ওর পরিবারটা দেখো।আমি তো সোমবার চলে যাবো। চাল,ডাল যা লাগে সব দিও।আর বাড়ির টুকটাক কাজের জন্য নিত্য একটু বেশি টাকা দিয়ে ওর বউটাকে কাজে লাগাও।
--- কিন্তু সেসব তো রতন দত্তের বউ যুথিকা দেখে।ওর সংসারের অবস্থা তো আরো খারাপ।কত লোককে তুমি এইভাবে দেখবে বলো তো?গ্রামের অধিকাংশ লোকের অভাব।এইভাবে এক একজন করে তুমি যদি তোমার নিজের বাড়িতে কাজে বহাল করো তাহলে কি করে হবে?
--- কিন্তু তাই বলে পরিবারগুলো না খেতে পেরে মরে যাক তাতো দেখতে পারবো না।
--- অন্য কোন একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে।এমন কোন উপায় যাতে ওদের দুপয়সা রোজগার হয়।
--- কি করা যায় বলো তো?
--- ভেবে কিছু তো একটা বের করতেই হবে।
  পরবর্তীতে তিনি দু,চারটি সেলাই মেশিন কিনে একজন শিক্ষক নিযুক্ত করে এদের জামা কাপড়ের কাটিং শিখিয়ে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করেছিলেন।
  এতদসত্বেও অমরেশবাবু মানুষটি কিন্তু ঠিক সংসারী ছিলেন না।সংসারের কোন ব্যাপারেই তিনি মাথা ঘামাতেন না।সংসার সম্পর্কে উদাসীন এই মানুষটিই আবার অন্যের সংসারের হালহকিকতের খবর রাখতেন আর সাধ্যমত তাদের পাশে দাঁড়াতেন।অন্দরমহলের সমস্ত কিছু দেখাশুনা করতেন তার স্ত্রী।মেয়েদের শাসন করা থেকে শুরু করে তাদের লেখাপড়ার সমস্ত দায়িত্ব ছিল শান্তিলতাদেবীর।সত্যি কথা বলতে তখনকার দিনের ছেলেমেয়েরাও এত অবাধ্য ছিলনা।সন্ধ্যা হলেই বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে এক হ্যারিকেনের আলোতে সকলে মিলে জোরে জোরে যে পড়া চলতো সেখানে থাকতো একটা অদ্ভুত ভালোবাসার মেলবন্ধন।মায়ের নির্দেশ ছিলো সকলে জোরে জোরে পড়বে যাতে তিনি রান্নাঘর থেকেই শুনতে পান।ছোটরা কিছু না পারলে বড়দের সেগুলি দেখিয়ে দেওয়া,ছোটরা ভুল করলে বড়দের শাসন করা আর ছোটদের সেগুলি মেনে নেওয়া - তখনকার দিনে এগুলিই ছিল অধিকাংশ পরিবারের শিক্ষা।

ক্রমশঃ 
    


Friday, October 15, 2021

অন্য দেবদাস

অন্য দেবদাস

  "পুজোর মধ্যে ঘটেছিলো ঘটনাটা - শুরুতেও ছিল পুজো আর হয়ত শেষেও সেই পুজোয় থাকলো।আর কোনদিন দেবুদার সাথে দেখা হবে কিনা জানিনা।তাই আজ আমি ঠিক করেই এসেছি একবার তার সাথে দেখা করবো আজ।ছেলের বয়স এখন আমার আঠারো বছর।তার জেদাজেদিতেই এবার পুজোয় বাপের বাড়িতে আসা।বিয়ে হয়ে সেই যে চলে গেছিলাম বাবার পরে রাগ করে আর কোনদিন বাড়িতে আসিনি।কানাডা থেকেই বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম।মা,ভাই হয়ত ভেবেছিল আমি এই সংবাদ পেয়ে বাড়িতে আসবো।কিন্তু এখানে আমার পরিবারের প্রতি যে শুধু রাগ কাজ করেছে তা কিন্তু নয়।বাড়িতে আসলেই দেবুদার সাথে আমার দেখা হবে আমি জানতাম।কোন মুখে আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবো?তার কাছে তো বটেই নিজের কাছেও যে নিজে ছোট হয়ে গেছি।আজ কুড়ি বছর ধরে মনের মধ্যে অপরাধবোধ,পাপবোধ কাজ করে চলেছে।"
  কুড়ি বছর আগে পাড়ার ক্লাবে অষ্টমীর সন্ধ্যায় যে জলসার আয়োজন করা হয়েছিলো সেখানে শ্রীলেখা একটি আগমনী গান গেয়েছিল।আর সেবারের পুজোয় সেক্রেটারি ছিল দেবদুলাল চ্যাটার্জী।একই পাড়া।মুখ চেনা মানুষটির সাথে সেদিন অনেক কথা হয়েছিল।পাড়ার লোকেরা দেবদুলাল ওরফে দেবুকে সবাই খুব ভালোবাসতো তার মিষ্টি স্বভাবের জন্য।শ্রীলেখার সাথে সেদিনের পুজোতে গান গাওয়ার সূত্র ধরে আস্তে আস্তে কাছে আসা।দেবদুলাল পাগলের মত ভালোবাসত শ্রীলেখাকে এটা শ্রী ভালোভাবেই বুঝেছিল।
  শ্রীলেখাদের বাড়িতে এ খবর পৌঁছাতেই আগুন জ্বলে উঠলো।কারণ একটাই দেবদুলালের বোন অবাঙালী একটি ছেলেকে ভালোবেসে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে।তাই ওই পরিবারটাই খারাপ হয়ে গেছে শ্রীদের বাড়িতে।সুতরাং নিজ পরিবারের সম্মান বাঁচাতে সেই চিরাচরিত প্রথা!জোর করে মেয়েকে অন্যখানে বিয়ে দেওয়া,ঘরে আটকে রাখা বাবা,মা ছাড়া বাড়ির বাইরে না বেরোতে দেওয়া।
  শ্রীলেখার বিয়ে হয়ে গেলো কানাডা নিবাসী ছেলের সাথে। বিয়ের কথা জানতে পেরে অকুতোভয় দেবদুলাল শ্রীদের বাড়িতে এসেছিলো।কিন্তু তার গায়েই শুধু হাত তোলা হয়নি।পুলিশের ভয়টা তাকে নয় তার বাবাকে রাস্তায় ধরে দেখানো হয়েছিলো।বিয়ের দিন বাড়িতে কিছু পুলিশ পোষ্টিং ছিল।
শ্রী এতক্ষণ ধরে কথাগুলো বলছিলো তার ছেলেবেলার এক বন্ধুকে। তারও কলকাতার বাইরে বিয়ে হয়েছে শ্রীর বিয়ের আগেই।প্রতিবছর একমাত্র পুজোতেই মুর্শিদাবাদ থেকে আলোকা বাপের বাড়িতে আসে।সে এসব কিছুই জানতো না।তারা কথা বলতে শুরু করার পর খেয়াল করলো প্যান্ডেল থেকে বহু দূরে একজন পাগল বসে আছে।আলোকা তাকে বললো,
--- দেবুদা বহুবছর পাগল হয়ে গেছে তুই জানিস?
--- সে কি? আমি তো কিছুই জানিনা।তুই একটু আমার সাথে যাবি দেবুদার বাড়িতে।আজ আমি মনেমনে ঠিক করেই প্যান্ডেলে এসেছি দেবুদার সাথে একটু দেখা করবো।
--- তার বাড়িতে যেতে হবে না।ওই দেখ দেবুদা দোকানের সিড়িতে বসে আছে।
শ্রীলেখা তাকিয়ে দেখে উঠে দাঁড়ায় তার দিকে এগিয়ে যেতে।কিন্তু তখনই সামনে দেখে ছেলে আর স্বামীকে।তারা কোথায় যাচ্ছে জানতে চাওয়ায় বলে,
--- অনেক বছর আগে এই রকম এক পুজোর সময় একজন মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিলো।এখন সে পুরো উন্মাদ।যাচ্ছি তার সাথে দেখা করতে।তোমরাও আসতে পারো আমার সাথে।
 শ্রী এগিয়ে যায়।সাথে অলোকা।কাছে গিয়ে ডাক দেয়,
--- দেবুদা
 ঘোলাটে চোখে দেবদুলাল শ্রীর মুখের দিকে তাকায়।
--- আস্তে কথা বলো।আমার মন বলছে ও আশেপাশেই কোথাও আছে।আমার সাথে দেখা করতে নিশ্চয়ই আসবে।
--- কে সে দেবুদা?
--- তুমি চেনো না।সবাই জানে তো।সবাই বলে আমি নাকি দেবদাস।ভালোবেসে পাগল হয়েছি।
শ্রীর দুচোখ বেয়ে জল পড়ছে। কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
--- দেবুদা আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখো আমি শ্রীলেখা।
 দেবু তর্জনী দিয়ে নিজের ঠোঁটের উপর হাত রেখে বললো,
--- যাই প্যান্ডেলের কাছে।শ্রী এসে গেছে -- 
 দেবদুলাল সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো।পিছন থেকে শ্রী কয়েকবার দেবুদা, দেবুদা বলে ডাক দিল।কিন্তু কোন সাড়া না দিয়েই সে এগিয়ে যেতে লাগলো।শ্রীর স্বামী,সন্তানকে ক্রস করে যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন তার ছেলে আকাশ বাবাকে বলে,
--- দেখো বাবা ওই পাগলটা মায়ের বন্ধু।মা না একটা যা তা ।
 শ্রী সেখানে বসেই দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ রেখে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো।


Thursday, October 14, 2021

নীরবে এসেছিল প্রেম

নীরবে এসেছিল প্রেম

  "অঞ্জলী দেওয়ার সময় ঘটেছিলো ঘটনাটা"- সবাই উৎসুক হয়ে নবনীতার দিকে তাকিয়ে আছি।ও তখন মনেহয় স্কুল লাইফে আমাদের দশম শ্রেণীর ক্লাসরুমে ফিরে গেছে।তাই কয়েক মিনিট আমাদের শুধু ফ্যালফ্যাল করে ওর বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হল।তারপর চোখ খুলে বললো,
--- তোরা সেখানে সকলেই ছিলি কিন্তু সেদিন সুনীলের সেই কান্ড কেউ দেখতে পারিসনি।কারণ সকলেই অঞ্জলীর মন্ত্র বলেছিলি চোখ বন্ধ করে।আমারও চোখ বন্ধ ছিল।কিন্তু --
   নবনীতা আবারও চুপ।আর আমরা চেয়ারগুলো সামান্য টেনে নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।বহুবছর বাদে আজ আমরা আবার সবাই একসাথে।আমরা সকলে এসেছি আজ একটা হোটেলে খাবোদাবো আর চুটিয়ে আড্ডা দেবো।ফেসবুকের সৌজন্যে প্রায় বছর দশেক বাদে আমাদের দেখা।আমরা ফোনেই কনফারেন্স করে ঠিক করে নিয়েছিলাম সকলের জীবনে ঘটে যাওয়া এমন কোন ঘটনা আজ শেয়ার করবো যা নিজে ছাড়া আর কেউই জানেনা।প্রায় সকলেই তার জীবনের প্রথম প্রেম থেকে প্রথম পরশ মন খুলে বলেছে। কারো কারো জীবনের প্রথম প্রেম স্বার্থকতা পেয়েছে বিয়ে করে।আবার কেউ তার ভালোবাসার মানুষটাকে কাছে পায়নি।বিয়ে হয়েছে অন্য কারো সাথে।সুখী হয়েও মনের কোন এক গোপন গভীর কোনে তাকে আজও সযত্নে লালন করে চলেছে।কেউবা ভালোবেসে বিয়ে করেও সুখী হতে পারেনি।বিয়ের পরপরই মানুষটার ভিতরের কালো দিকটা বেরিয়ে পড়েছে।খুব কাছের দশ বন্ধুর জীবন দশ রকমভাবে এগিয়ে চলেছে।অনেকদিন পর মন খুলে সকলে সকলের মনের কথাগুলি বলতে পেরে অনেকটাই হালকা হয়েছে।সবার শেষে পালা ছিল নবনীতার।
 নবনীতা আবারও শুরু করলো,
-- আমি তো চোখ বন্ধ করে মন্ত্র উচ্চারণ করে চলেছি হঠাৎ আমি টের পেলাম আমার জোর করা হাতের মধ্যে কেউ একটা ছোট কাগজের টুকরো গুঁজে দিলো।বুকটা ধরাস করে উঠেছিল তখন।হঠাৎ করেই কাঁপতে শুরু করি।এদিকওদিক তাকিয়ে এমন কাউকে দেখতে পেলাম না যাকে এই কাজের নায়ক ভাবতে পারি।খুব তাড়াতাড়ি কাগজের টুকরোটা তুলে ব্লাউজের ভিতর লুকিয়ে ফেলি।কোন রকমে অঞ্জলী শেষ করে তোদের সকলের সাথে প্রসাদ খেয়ে বাথরুমে গিয়ে ঢুকি কাগজের টুকরোটা পড়বার জন্য।
বুঝতেই পারছিস জীবনের প্রথম প্রেমপত্র।বুকটা কেমন যেন উথালপাথাল করছে।
 সুস্মিতার আর দেরি সহ্য হয়না।সে নবনীতার কথার মাঝখানেই বলে বসে,
--- আরে আমরা সকলেই জানি এগুলো।তুই আসল কথাটা বল। কাগজটাতে কি লেখা ছিল?
--- সেটাই তো বলছি।কোনদিন তো একথা কাউকেই বলতে পারিনি।আজ তোদের সব বলবো বলেই তো আমি এমন একটা প্রস্তাব রেখেছিলাম তোদের কাছে যে সব্বাইকে বলতে হবে তার জীবনের এমন কোন ঘটনা যা সে নিজে ছাড়া আর কেউ জানেনা।যাকগে তারপর শোন। আস্তে আস্তে কাগজটা খুলে পড়তে লাগলাম --
 নিতা,
  আমি তোমায় খুব ভালোবাসি।আমি অনেকদিন ধরে তোমায় কথাটা বলবো ভাবছি কিন্তু সুযোগ হয়নি।তাই আজ তোমার স্কুলেই চলে এলাম।এটা অবশ্য আমারও স্কুল।আমি সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়ে গেছি।আমি তোমার পড়াশুনা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি আছি। কাল সন্ধ্যায় আমার ট্রেন।মোবাইল নম্বর দিলাম।তোমার মতামত জানিও আজই।তুমি ফোন না করলে বুঝবো আমাকে তুমি পছন্দ করো না।
 নিচুতে সুনীলের নাম লেখা।
অপরূপা বলে উঠলো,
-- এই কোন সুনীল রে ?সেই আমরা সবাই যাকে উত্তম কুমার বলতাম?
--- হ্যাঁ।
 তখন আমি বললাম, "তারপর গেছিলি তুই?"নবনিতা উদাস হয়ে বললো,
--- আমরা তো সকলেই সুনীলকে পছন্দ করতাম সেই সিক্স,সেভেন থেকেই।তখন ওর চেহারার প্রতি ছিলো আমাদের আকর্ষণ।সেই আকর্ষণ থেকেই কিন্তু প্রত্যেকেই ওর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলাম বড় হয়ে।ভাবলাম বাড়িতে গিয়ে মায়ের ফোন থেকে সুযোগ বুঝে ফোনটা করবো।কাগজটা আবার যথাস্থানে রেখে বাড়ি গেলাম।আমার দূর্ভাগ্য এমনই বাড়িতে পৌঁছে শুনি বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে সবাই হাসপাতালে।কোন রকমে ঘরে ঢুকে একটা সালোয়ার কামিজ পরেই মাসীর সাথে হাসপাতাল পৌঁছালাম।তখন আমার মনেই ছিলনা ওই কাগজের টুকরোটার কথা।বাবা ভেন্টিলেশনে চলে গেলেন সেদিন।সাতদিন ছিলেন ভেন্টিলেশনে।তারপর সব শেষ।
 সব কাজ মিটে যাওয়ার পর ওই নম্বরে বহুবার ফোন করেছি।সব সময়ই শুনেছি সুইচ অফ।আজও আছে নম্বরটা আমার কাছে।এখন শুনি নম্বরটার কোন অস্তিত্ব নেই।মাঝে মাঝেই মোবাইলে সুনীল নয় সুনিলা বলে সেভ করে রাখা নম্বরটাই নিজের অজান্তেই কল হয়ে যায়।সঠিক নামে সেভ করতে পারিনি ভয়ে।
 নবনীতা চুপ করে গেলো।আমরাও চুপ করে দেখতে লাগলাম নবনীতার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে।শুধু নবনীতা নয় আমাদের সকলের অন্তর ভেদ করে দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়তে লাগলো।

জীবনের প্রতি বাঁকে (চতুর্থ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (চতুর্থ পর্ব)

 অমরেন্দ্রনাথ মুখার্জী পড়লেন মহাফাপরে।তিনি তার শ্যালককে বেশ ভালোভাবেই চেনেন।নরম স্বভাবের মানুষ হলেও বেআইনি কিছু দেখলেই তার মাথাটি গরম হয়ে ওঠে।শ্যালক  এই বাঁচাল ছেলেটিকে যে কিছুতেই নিজের জামাই করবেন না,এটা তিনি ভালোভাবেই বুঝে ফেলেছেন।আর মনোতোষ যে ছেলের সাথে তার মেয়ের বিয়ের কথা বলছে তার সম্মন্ধে কিছু না জেনেই বা তিনি রাজি হন কিভাবে?আর ওদিকে তার শ্যালকটি চিৎকার,চেঁচামেচি করেই চলেছেন।মনোতোষের বাবা মা ছেলের এই কান্ড দেখে পুরো চুপসে গেছেন।তাদের মুখে কোন কথা নেই।
 অমরেন্দ্রনাথবাবু অনেক সাহস সঞ্চয় করে তার শ্যালকের কাছে এগিয়ে গিয়ে হাতদুটি ধরে বললেন,
--- শোনো ভাই আমার একটা অনুরোধ রাখো।ছেলেটিকে সেই ছোটবেলা থেকেই তো আমরা জানি।ওর চরিত্রের তো কোন খুদ নেই।কিন্তু ও একটু ডাকাবুকো স্বভাবের ছেলে।সত্যি কথাটা মুখের উপর বলতে বিন্দুমাত্র ভয় পায়না।বলি কি ভাই তুমি সায়নীর জন্যই ওকে আশীর্বাদ করে যাও।দেখো সেন্ট্রাল গভর্মেন্ট এর ভালো  চাকরি করে ,দেখতে শুনতেও ভালো। দোষ তো ওই একটাই শেষ মুহূর্তে এসে শুভ কাজে বাগড়া দিলো।এটা ক্ষমা করে দেওয়া যায়।
--- কি বলছো তুমি অমরদা?এত ঔদ্ধত্য যে ছেলের সে কখনোই ভালো হতে পারে না।আমি কিছুতেই জেনেশুনে মেয়েকে জলে ভাসিয়ে দিতে পারবো না।
  এরপর ওখানে আর যারা উপস্থিত ছিলেন তারা সকলে মিলে অমরেশবাবুকে বুঝাতে শুরু করলেন।অবশেষে তিনি রাজি হলেন।তার বাহুতে এক ভরির একটা সোনার পদক ছিল তিনি তাই দিয়েই মনোতোষকে আশীর্বাদ করে আসলেন এই শর্তে যে তিনি তাকে সোনার বোতাম দেবেন তখন ওই পদক তাকে ফেরৎ দিয়ে দিতে হবে।তবে এ কথাও তিনি তাকে জানিয়ে আসলেন যদি কোনদিন মনতোষের কারণে তার সানুর চোখ থেকে জল পড়ে তাহলে আজকের কথা স্মরণ করে তিনি তাকে পুলিশে দেবেন।
  মনতোষের খোঁজ দেওয়া ছেলের খবর নিয়ে বা অন্য কোন ভালো পাত্রের সন্ধান পেয়ে যাতে ওই তারিখেই তার বোনের মেয়েটিরও বিয়ে হয় সে ব্যবস্থা তিনি করবেন সে কথা তার ভগ্নিপতিকে দিয়ে আসেন।
 বাড়িতে ফিরে আসতে আসতে তিনি অনেক কথায় ভাবছিলেন।কি করে তিনি মেয়ে সায়নী ও পরিবারের সকলের সামনে কথাটা বলবেন।মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড় না করিয়ে তিনি বিয়ে দেবেন না বলেছিলেন।এখন তিনিই কিনা হঠাৎ করেই মেয়ের বিয়ে ঠিক করে আসলেন।বাড়িতে পৌঁছেই তো একটা প্রবল ঝড়ের সম্মুখীন হতে হবে।নানান কথা ভাবতে ভাবতে তিনি যখন নিজ বাড়ি পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যা হয় হয়। তাঁর মা তখন তুলসীতলায় সন্ধ্যাবাতি দেখাচ্ছেন। আস্তে আস্তে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।রঙ্গিনীবালা তাঁর ছেলে ক্ষেতোকে (তিনি তাঁকে এই নামেই ডাকতেন)ভালো ভাবেই চিনতেন।ছোট থেকে সে কোন অন্যায় করলেই মায়ের গা ঘেঁষে ঘোরাফেরা করতো।কিন্তু এই বয়সে এসে সে এমন কি কান্ড করেছে যা আগেই মায়ের কাছে স্বীকার করতে এসেছে।তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন।
  অনেক চেঁচামেচি,সায়নীর কান্নাকাটি ঝামেলার পর সায়নী যখন জানতে পারে যে মনোতোষের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে তখন সে চুপ করে।আর ওদিকে খোঁজ খবর নিয়ে মনোতোষের বলা ছেলের সাথেই ওই তারিখেই বিয়ে ঠিক হয় তাঁর বোনের মেয়ের।খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায় সে অত্যন্ত ভদ্র ছেলে।মামাবাড়িতে মানুষ।এখন তার দণ্ডকারন্য পোষ্টিং।বিয়ে করে সে বউকে ওখানেই নিয়ে যাবে।
 অমরেশবাবু পুনরায় চলে এলেন শহরে।তার মুহুরী অমৃতলাল পালের সাথে সব সময়ই মেয়ের বিয়ে সংক্রান্ত লিষ্ট আর আলোচনা করেই চলেছেন।ওদিকে বাড়িতে বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে প্যান্ডেলের ব্যবস্থা শুরু হয়েছে।বাড়িতে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচজন লেবার কাজ করেই চলেছেন।আর তখনকার দিনে বাড়িতে লেবার কাজ করা মানেই দুবেলা তাদের পেটপুরে খেতে দিতে হত।শ্বাশুড়ী,বউয়ের দম ফেলার সময় নেই।পাশের দরিদ্র দত্ত বাড়ির বিধবা রতন দত্তের বউ সব সময়ের জন্য রায় চৌধুরী বাড়িতে ফাইফরমায়েস খেটে চলেছে।প্রথম বর্ষে পড়তে পড়তেই সায়নীর পড়া গেলো বন্ধ হয়ে।তার বিয়ে এগিয়ে এলো।
 বিয়ের দিন সকালে ছজন জেলে নিয়ে তিন পুকুর থেকে বড় বড় রুই,কাতলা ধরা হয়।মাছ বাজার থেকে কিনে আনতে হয়না।বড় মেয়েটির সময়ও তাই হয়েছে।বড় মেয়েটি কিন্তু তার মেজো বোনের বিয়েতে আসতে পারেনি।কারণ বড় জামাইয়ের পোষ্টিং ছিল ত্রিপুরা শহরের এক আদিবাসী এলাকায়।তার প্রথম সন্তানটি তখন খুবই ছোট।আর অসুস্থ্যও বটে।তাকে নিয়ে প্লেনে ওঠা মানে নিজের হাতের মুঠোয় তার জীবনটিকে নিয়ে ওঠা।এই একটা কারণে বাড়ির সকলের ছিল মন খারাপ।
দুপুরের দিকে হলুদ নিয়ে জনাদশেক উপস্থিত।তারা এই যে এলো আর ছেলের বাড়ি ফিরে গেলনা।কারণ বিয়েটা হচ্ছিলো গ্রামের বাড়ি থেকেই।আর ছেলে তো এখন থাকে শহরে।তাই পথের ধকল তারা আর নেবে না বলে ওই দশজন লোক দুপুর থেকেই তাদের ভুরিভোজ সারতে লাগলো।তাতে অবশ্য রায় চৌধুরী পরিবারের কিছুই যায় আসে না।কারণ তাদের অর্থের কোনো অভাবই ছিলনা।
 সব জায়গাতেই ভালোমন্দ কিছু মানুষ থাকে।বরযাত্রী আসা মানুষদের মধ্যেও তার ব্যতিক্রম ছিলনা।কিছু দুষ্টু মানুষজন বিয়েবাড়িতে থেকে যাওয়ার কারণে নানান ধরনের কুকীর্তি করতেও বিরত থাকতো না।স্বভাবতই মেয়ের বাড়ির লোকজন তটস্থ থাকতো কখন কি বিপদ বাঁধিয়ে ফেলে তারা।হলুদ নিয়ে আসা কিছু অল্পবয়সী ছেলেগুলি যে ছিল তারা প্রত্যেকেই এক একটা বাদর।বাড়িতে অল্পবয়সী মেয়ে অনেকগুলো।তাছাড়া তাদের বন্ধুরা সব।এই ছেলেগুলো তাদের প্রচন্ডভাবে বিরক্ত করতে লাগলো।অমরেশবাবুর কাছে এক মেয়ে গিয়ে নালিশ করাতে তিনি গেলেন প্রচন্ড ক্ষেপে।তাকে সামাল দিলেন তার স্ত্রী শান্তিলতাদেবী।তিনি শান্তভাবে তাকে বোঝালেন এই ব্যাপারটা ম্যানেজ তিনিই করবেন।নিজের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে তিনি হলুদ নিয়ে আসা অতিথিদের কাছে গিয়ে তাদের মধ্যে সব থেকে বয়স্ক মানুষটিকে সমস্যার কথা জানান।আর তাতেই কাজ হয়।তিনি তার সাথে আসা ছেলেদের সাবধান করে দেন।তারা সে কথা শোনে পরবর্তীতে আর কোন অসুবিধা হয়না।
 যাহোক বিয়েবাড়ির হৈ হট্টগোল চলার মাঝে ঠিক সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে বর এসে হাজির।তখনকার দিনে এত গাড়ির রমরমা ছিলনা।তাই রিক্সাতেই বর আসে বিয়ে করতে।সাথে লোকজন স্টেশন থেকে নেমে চার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে।সে রাতে বিয়ের পর সকল বরযাত্রীরাই কনের বাড়িতে থেকে যেতেন।পরেরদিন সকাল,দুপুরের ভোজ সেরে তবে তারা বর কনের সাথেই বাড়ি ফিরতেন।

 বর আসাতে ঘরের বউ,ঝিরা গেটের কাছে ছুটে যায় তাকে বরণ করতে।মনোতোষ গ্রামের ছেলে হওয়ার কারণে তাকে অনেকেই চিনতো।কিন্তু রিক্সায় যে বসে আছে সেতো মনোতোষ নয়।

ক্রমশঃ 
  

Thursday, October 7, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (তৃতীয় পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (তৃতীয় পর্ব)
   (আমার এ উপন্যাসটি আত্মজীবনী বলতে পারেন।এটা সম্পূর্ণ আমার পরিবারের ঘটনা।যা আমার জন্মের অনেক আগে থাকতেই ঘটেছে।সমস্ত ঘটনায় সত্যি।অমরেশবাবু আমার জন্মদাতা।একজন মহান মানুষের কথা সন্তান হিসাবে লিখে যাওয়া শ্রেয় বলে মনে করলাম।এই অধ্যায়ে যে মনীষীর কথা আমি লিখলাম এমন অনেক ঘটনায় আমি আপনাদের জানাবো যা আমার বাবুর জীবনে ঘটেছিলো।ভালো লাগলে জানাবেন উৎসাহ পাবো।)

   মানুষের সাংসারিক জীবনটা যতই সুখের হোকনা কেন;অভাব,দুঃখ না থাকলেও ঘাত-প্রতিঘাত কিন্তু থেকেই যায়।
 সে যাত্রায় ভারতী এক অলৌকিক শক্তি বলে নিমাইবাবুর আগমনের ফলে সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে উঠে।পরিবারের সকলেই ঈশ্বর বিশ্বাসী,নানান পূজা-পার্বণ রঙ্গিনীবালা দেবীর কারণে লেগেই আছে।অমরেশবাবু কিন্তু কোন ঘটনায় যুক্তিতর্কের বাইরে বিশ্বাস করতেন না।এই ঘটনায় তিনি পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছিলেন।তার কাছে ওই বৃদ্ধা বা সাইকেল আরোহীর কোন ব্যাখ্যায় ছিল না।আজীবন তিনি এই ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে গেছেন।
 এরপর নিমাইবাবু রায় চৌধুরী পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে শুধুমাত্র নিমাইদা বলেই পরিবারের খুব কাছের একজন হয়ে উঠেছিলেন।
 রোজ সকালে সাত্রাগাছি থেকে ট্রেন ধরে অমরেশবাবু ধর্মতলা ব্যাংকসাল কোর্টে আসতেন। এমনই একদিন তার অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায়।শেষ ট্রেনের আশায় তিনি শিয়ালদা স্টেশনে অপেক্ষা করতে করতে চা খাওয়ার জন্য তিনি একটি চায়ের স্টলে আসেন।চায়ের অর্ডার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।হঠাৎ সেখানে টুপি মাথায় দিয়ে সাহেবী পোশাকে এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ান।স্টল মালিক তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার হাতে অমরেশবাবুর জন্য তৈরি করা চা টা তাঁর হাতে ধরিয়ে দেন।অমরেশবাবু স্বভাবতই একটু বিরক্ত হন।স্টল মালিক ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তার দিকে হাত তুলে তাকে কিছু একটা ইঙ্গিত করেন যা তিনি বুঝতে পারেন না।তিনি সাহেবের মুখের দিকে ভালোভাবে তাকান।চমকে ওঠেন! এ কাকে দেখছেন তিনি!এত সেই ব্যক্তি - যার ভয়ে সমগ্র ইংরেজ রাজত্ব কম্পমান!তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে সাহেবের দিকে একটু এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে যাবেন ঠিক এই মুহূর্তে বয়ামের উপর চায়ের পয়সাটা রেখে তড়িৎ গতিতে সাহেব সেখান থেকে বেরিয়ে যান।কিন্তু পরমুহুর্তে সেখানে ইংরেজ সেপাইয়ে সেপাইয়ে ছয় লাফ।
 --- এখানে সাহেবী পোশাক পরা কাউকে দেখেছেন যিনি মাথায় একটি ক্যাপ পরে ছিলেন?
 একজন প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন অমরেশবাবুর দিকে।ততক্ষণে যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে অমরেশবাবুর।তিনি সরাসরি অস্বীকার করলেন যে সেখানে কোন সাহেব আসেননি।তারপর তারা স্টল মালিক এবং আশেপাশে যারা ছিলেন সকলকেই নানান প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে হতাশ হয়ে ফিরে যান।স্টল মালিক ইশারায় অমরেশবাবুকে ওখান থেকে দ্রুত চলে যাওয়ার জন্য বলেন।
 সেদিনের ওই ক্যাপ পরা সাহেব গোছের যে ভদ্রলোকটি ছিলেন তিনি আর কেউ নন স্বয়ং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস।যিনি শিয়ালদহ স্টেশনে এলে একমাত্র ওই দোকান থেকেই চা খেতেন।এরপর বহুবার অমরেশবাবু তাকে একটু চোখের দেখা দেখার জন্য ইচ্ছাকৃত ওই স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন কিন্তু তাঁর দেখা আর কোনদিনও পাননি।তবে বেশ কয়েকমাস পরে ওই স্টলটি তিনি বন্ধই দেখেছেন।আশেপাশে অনেক জানতে চেয়েও তিনি কোন সদুত্তর পাননি।তার জীবনে স্বচক্ষে নেতাজীকে দেখা ছিল এক গর্বের বিষয়।যা তিনি সুযোগ পেলেই অন্যের সাথে গর্বভরে গল্প করেছেন।
   সায়নী তখন কলেজে পড়ছে।অমরেশবাবুর পিসতুতো বোনের মেয়ের বিয়ে ঠিক হল।বোনের বাড়িতে কথা হল অমরেশবাবু গিয়ে আশীর্বাদ করবেন।কারণ সম্পর্কে তিনি মামা আর যেহেতু তাঁর পরিবার ছিলো খুলনা জেলা।এই জেলার মানুষের একটা ধারণা প্রচলিত আছে যেকোন শুভকাজ মামার দ্বারা শুরু হলে তা সেই ছেলে বা মেয়ের পক্ষে সেটা খুব সুখের হয়।মেয়েটির নিজের মামা ছিলেন না তাই তারা অমরেশবাবুকেই এই কাজের দায়িত্ব দেয়।তিনি সানন্দে সেই দায়িত্ব পালন করার জন্য সেখানে নিদিষ্ট দিনে হাজিরা দেন।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল তিনি যখন ছেলের বাড়িতে আশীর্বাদের জন্য উপস্থিত হলেন তখন দেখলেন এ পরিবারের প্রতিটা সদস্যকেই তিনি চেনেন।তাদের মূল বাড়ি ওই পিলজঙ্গ গ্রামেই।যাকে তিনি আশীর্বাদ করতে গেছেন সে চাকরি পাওয়ার পর তার মা,বাবাকে গ্রামের একান্নবর্তী পরিবার থেকে এনে শহরে সামান্য একটু জমি কিনে সেখানে বাড়ি করে রয়েছে।যদিও ছেলে চাকরি করে দন্ডকারন্য।তারজন্য অবশ্য তাদের গ্রামের বাড়ির নিজেদের অংশটা শরিকের কাছেই কমদামে বিক্রি করে দিয়ে আসতে হয়েছে।অমরেশবাবুর বোন সুবলাদেবীর স্বামীও তার সাথে ছিলেন।তাদের বাড়িও ওই পিলজঙ্গ গ্রামের পরেই আর একটি গ্রাম বেতাগা য় ছিল।আশীর্বাদ শুরু হল।ছেলের মাথায় হাত ছোঁয়াতে গেলে ছেলে অমরেশবাবুর হাত চেপে ধরলেন।
--- কি হল বাবা তুমি হাত ধরলে কেন?
মনোতোষ সরাসরি অমরেশবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
--- আমার এখন মনেহচ্ছে এই বিয়েটা করা ঠিক হবে না।
--- এটা কি ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি?
--- আসলে কাকু,আমি আপনার মেয়ে সায়নীকে ভালোবাসি।আপনাদের বাড়িতে বাবা,মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেছিলেন।আপনি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিলেন 'দণ্ডকারন্য সীতার বনবাস হয়েছিলো।তাই আপনি আপনার ঘরের লক্ষিকে ওখানে বিয়ে দেবেন না।এবার ছুটিতে বাড়ি আসার পরে আমার বাবা,মা ও নাছোড়বান্দা আমার বিয়ে দিয়ে তবে ওখানে পাঠাবেন।আমার আপত্তি শর্তেও তারা এই মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক করলেন।আমিও নিরুপায় ছিলাম।কিন্তু আজ যখন আপনাকে এখানে দেখলাম তখনই মনেমনে ঠিক করে নিয়েছিলাম আশীর্বাদ পর্ব শুরু হলেই আমি আপনাকে জানাবো।আপনি যদি রাজি থাকেন তবে আমায় আশীর্বাদ করুন।আর তানাহলে এ বিয়ে হবে না।
অমরেশবাবু আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।এবং পরিস্কার সকলকে জানিয়ে দিলেন,"এত ঔদ্ধত্যসম্পন্ন ছেলের সাথে কোন মেয়ের বিয়েই হবে না।এই ছেলের বিরুদ্ধে আমি মানহানির কেস করবো"
শোলগোল হৈ হট্টগোলের মধ্যে কেউ আর কারো কোন কথা শোনে না। অমরেশবাবুর ভগ্নিপতির মাথায় তখন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে।তার মেয়ের বিয়ের আয়োজন তখন প্রায় শেষের পথে।সব জায়গায় টাকা বায়না দেওয়া হয়ে গেছে।আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে মুখে চুনকালি পড়বে।মনোতোষ তখন তার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তাকে আলাদাভাবে বাইরে ডেকে নিয়ে গেলো কিছু কথা বলতে চায় বলে।
--- দেখুন মেসোমশাই আমি জানি আমি যা করছি সেটা ঠিক নয়।বাবা মায়ের জেদের কাছে নতি স্বীকার করে মনেমনে ভেবেই নিয়েছিলাম আপনার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে হলে জীবন দুটোই নষ্ট হবে।কারণ আমি সেই স্কুল লাইফ থেকেই সায়নীকে ভালোবাসি।কিন্তু অমরেশবাবু যেহেতু তার মেয়ের বিয়ে আমার সাথে দিতে রাজি হননি তাই বাবাকেও আমি আর বুঝাতে পারিনি।তিনি এই ঘটনায় প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করেন।আপনি চিন্তা করবেন না।ওই তারিখেই আপনার মেয়ের বিয়ে হবে একই পোষ্টে চাকরি করা ছেলের সাথে। তারও দণ্ডকারন্য এ পোষ্টিং।আপনি শুধু কাকুকে একটু রাজি করান।



ক্রমশঃ 

Tuesday, October 5, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (দ্বিতীয় পর্ব)

 জীবনের প্রতি বাঁকে (দ্বিতীয় অধ্যায়)
   প্রতিটা মানুষের জীবনই এক একটা মস্তবড় উপন্যাস।কেউ যদি তার লেখনী ক্ষমতা দ্বারা তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি ভাষাক্ষরে লিপিবদ্ধ করেন তাহলে প্রত্যেকেই এক একটি উপন্যাসের জন্ম দিতে পারেন।অমরেশ রায় চৌধুরীকে কেন্দ্র করে শুধু তার জীবন নয়,তার ছেলেমেয়ে,স্ত্রী,বাবা,মা এবং পারিপার্শ্বিক নানান ঘটনায় এ গল্পের মূল উপজীব্য বিষয়।
  সায়নী গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পর বাড়ির সকলের অমতে অমরেশবাবু তার মেজমেয়েকে নিয়ে শহরে ঘরভাড়া করে মেয়েকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন।তখনকার দিনে মাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজেই ভর্তি হতে হত।কিন্তু সায়নীর মন থেকে মনোতোষের শেষদিনের বলা কথাগুলি মাঝে মাঝেই মনে পরে।
  অমরেশবাবুর প্রতিটা মেয়েই যতই আদর যত্নের মধ্যে মানুষ হোকনা কেন তাদের মা এবং ঠাম্মা তাদের প্রত্যেকেই সংসারের উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন।তাই মেয়েকে নিয়ে তিনি যখন ঘরভাড়া করে শহরে থাকতে শুরু করলেন বাবা,মেয়ের রান্না,খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে কোনোই অসুবিধা ভোগ করতে হলনা।কলেজ এবং পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে সায়নী তার বাবুর যত্নটাও ঠিকভাবেই সম্পন্ন করতো। ঠিকে কাজের একজন মহিলা অবশ্য থাকতো।
  সায়নী যখন কলেজে অমরেশবাবুর সেজমেয়েটি তখন ক্লাস টেন। ভারতী তার দিদির মত অতটা ডানপিঠে না ঠিকই কিন্তু দুষ্টুর শিরোমণি।পড়াশুনায় খুব একটা ভালো না হলেও কখনো ফেল করে একই ক্লাসে সে দুবার থাকেনি।সংসারের কাজকর্ম জানা থাকলেও সে প্রতি মুহূর্তেই সেগুলিকে এড়িয়ে একটু পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতেই পছন্দ করতো।স্কুল ছুটি থাকলে তাকে বাড়িতে কেউ আর খুঁজে পেতো না।পাড়ার ধোপা বাড়ি ,নাপিত বাড়ি,দত্ত বাড়ি --- ঘুরে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার কাজ।তবে কোন বাড়িতে ভাত খাওয়া ঠাকুমার ছিল বারণ।তখনকার দিনে ব্রাহ্মণ বাড়ির মানুষেরা অন্য জাতের হাতের অন্ন খাওয়া মানেই ছিলো জাত যাওয়া।অমরেশবাবুর বাবার মৃত্যুর পর নিষ্ঠাবান বিধবা রঙ্গিনীবালা রান্নায় হলুদ পর্যন্ত ব্যবহার করতেন না।কারণ ওটা ছিলো রঙ্গিন।বাড়ির মেয়েরাও ঠাকুমার কথা অমান্য করতো না।কিন্তু অন্য খাবার খাওয়ায় কোন আপত্তি ছিলনা রঙ্গিনীবালার।
  ভারতী মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন। এমনই সময় একদিন বৃষ্টির মধ্যে সারা পারা ঘুরে বেড়ানোর কারণে রাতে প্রচণ্ড কাপুনি দিয়ে জ্বর এলো।শ্বাশুড়ী,বউ মিলে যেটুকু ডাক্তারী বিদ্যা তাদের জানা ছিল তারা তা প্রয়োগ করেও কিছু করতে পারলেন না।সকালবেলা বছর মাইনের বীরেন মান্নাকে শহরে পাঠালেন তার বাবুকে খবর দেওয়ার জন্য।বীরেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘণ্টা দুয়েক বাদে বাড়িতে একজন ডক্টর এসে হাজির হলেন।নাম বললেন নিমাই দাস।তিনি আরও জানালেন সকাল আটটা নাগাদ একজন বৃদ্ধা তার চেম্বারে এসে তাকে জানান অমরেশবাবুর মেয়ের শরীর খুব খারাপ।আমি যেন সেই মুহূর্তেই তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাই।কলকাতা থেকে গ্রামের বাড়ির দূরত্ব ষোলো কিলোমিটার।ট্রেনে বারো কিলোমিটার।ট্রেন থেকে নামার পর আরো চার কিলোমিটার।যা সাধারণত হেঁটেই লোকে যাতায়াত করে।আবার অনেকে রিক্সাতে করেও আসা যাওয়া করে।তবে সংখ্যায় খুবই কম।কিন্তু ট্রেন থেকে নেমে তিনি দেখেন একজন মধ্য বয়স্ক ভদ্রলোক সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাকে নিয়ে আসার জন্য।সরাসরি তাকে গিয়ে প্রশ্ন করেন,
--- আপনি পিলজঙ্গ গ্রামে যাবেন তো?অমরেশবাবুর মেয়ের চিকিৎসার ব্যাপারে?
 নিমাইবাবু তার সাইকেলে করে সেই বাড়ির গেটের অর্থাৎ আড়কাঠার কাছে নেমে হেঁটে উঠানে এসে দাঁড়ান।যে ভদ্রলোক তাকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি রাস্তা থেকেই 'কাজ আছে'- বলে চলে যান।নিমাইবাবু উঠানে দাঁড়িয়েই ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ পান।তিনি তখন মনেমনে ভাবেন হয়ত এত পরিশ্রম করে এসেও চিকিৎসার কোন সুযোগই তিনি পেলেন না।তিনি হতভম্বের মত ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন।ভারতীর পরের বোন মালতী তাকে দেখতে পেয়ে ঘরের ভিতরে নিয়ে যায়।যখন তিনি অত দূর থেকে রোগী দেখতে এসেছিলেন তখন কিন্তু তিনি জানতেন না রোগীর কি রোগ হয়েছে।কিন্তু আসবার সময় কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধের সাথে একটা ইনজেকশন ও তার ব্যাগে রেখেছিলেন।সেই সময়ে নিউমোনিয়া রোগটা চারিদিকে প্রায় ছেয়ে গেছিলো।তিনি ভারতীকে ইনজেকশন দিয়ে যখন সেখানে অপেক্ষা করছেন তার চোখ মেলে তাকানোর জন্য সেই সময়ে অমরেশবাবু তার বন্ধু ডক্টর সুশীল দেকে নিয়ে রিক্সা করে বাড়িতে আসেন।তারা এসে নিমাইবাবুকে দেখে অবাক হয়ে যান।নিমাইবাবুর কাছে তার এখানে আসার বিবরণ সবিস্তারে জেনেও কেউই বুঝে উঠতে পারলেন না কে সেই বৃদ্ধা যে অত সকালে তাকে তার চেম্বারে গিয়ে খবর দিলো।শুধু তাই নয় কে তাকে স্টেশন সিংগাতি থেকে এ পর্যন্ত সাইকেলে বসিয়ে নিয়ে আসলো।সবই বাড়ির লোকের কাছে কেমন ধোঁয়াশা মনে হতে লাগলো।আর এই নিমাইবাবুকে দেখে ডক্টর সুশীলবাবু ও অমরেশবাবুর আরও অবাক হওয়ার কারণ যেটা তা হল নিমাইবাবু কোন পাশ করা ডাক্তার নয়।তিনি একদম ছোট থেকে ডাক্তার সুশীলবাবুর কাছে কম্পাউন্ডার হিসাবে কাজ করেছেন। কথায় বলে ' হাতে কর্মে শিক্ষায় হল বড় শিক্ষা।তারজন্য পুঁথি পড়বার দরকার পরেনা।' তিনি ডাক্তার দে র কাছে থেকে থেকে নিজের মেধা শক্তির গুনে কোন রোগের কি ওষুধ তা ভালোভাবেই জানতেন।পরিস্থিতি তখন এমন দাঁড়িয়েছিল রাতবিরেতে কেউ অসুস্থ্য হলে যাদের ডাক্তার দে কে ভিজিট দেওয়ার ক্ষমতা থাকতো না বা তিনি যেতে অস্বীকার করতেন তখন তারা নিমাইবাবুর শরণাপন্ন হত এবং রোগী সুস্থ্যও হয়ে উঠতো।কিন্তু এ খবর যখন ডাক্তার দে র কানে পৌঁছায় তখন তিনি নিমাইবাবুর সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করেন। যার ফলস্বরূপ তিনি ডক্টর সুশীল দে কে পরিত্যাগ করেন। নিমাইবাবুর এই ঘটনা জানতে পেরে একজন স্বর্ণকার তার দোকানের এক কোণে এক চিলতে জায়গা দেন সে যাতে সেখানে বসে রোগী দেখতে পারে।তার কারণও হচ্ছে এই স্বর্ণকারের বৃদ্ধা মা যখন মরণাপন্ন ছিলেন আর সুশীলবাবু ছিলেন শহরের বাইরে তখন নিমাইবাবুই তার মায়ের চিকিৎসা করে সুস্থ্য করে তুলেছিলেন।সেই কৃতজ্ঞতা বশত তিনি তাকে নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন তার দোকানের এককোনে বসবার জন্য।
সুতরাং নিমাইবাবুকে এ বাড়ির অধিকাংশ লোকেই চিনত।তাকে দেখে অমরেশবাবু খুশি হলেও ডক্টর সুশীলবাবু মোটেই খুশি হতে পারেননি।তিনি বলেই বসলেন একাকী যখন অমরেশবাবুকে পেলেন,
--- বড় ডাক্তার এসে গেছে তাহলে তো এখানে আমার কোন কাজ নেই।আমি তাহলে চলি।
 অমরেশবাবু বুঝতে পারলেন তার বন্ধুটি বেশ বেজার হয়েছেন।তিনি হাসি মুখে তাকে পুকুরের মাছ দিয়ে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বেরোনোর জন্য অনুরোধ জানান।এদিকে মালতী দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে তার বাবাকে ডাকতে শুরু করলো,
--- বাবু,বাবু তুমি কোথায়?তাড়াতাড়ি এদিকে এসো।


ক্রমশঃ 
 

Saturday, October 2, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (প্রথম পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (প্রথম অধ্যায়)
  বর্ষণক্লান্ত ধরণী বসন্তে এসে শান্তির নিশ্বাস ফেলে।বর্ষার আরম্ভ হতেই মধু বসন্তের জন্য মানুষ পাগল হয়ে ওঠে। অবশেষে বহুদিন পরে শেষটায় ফাগুন এসে সাক্ষাৎলাভ
হয় বসন্তের।কাননে কান্তারের,বৃক্ষে বৃক্ষে নতুন পত্র,নতুন পুষ্প,নতুন মাধুর্য।বসন্ত প্রকৃতি মানুষের হৃদয় মনকে আলিঙ্গন করে চঞ্চল উদ্দামতায়- হৃদয়ে জাগায় পুলক শিহরণ।
  প্রকৃতির নিয়মে বসন্ত আসে একমাত্র প্রকৃতিতেই।কিন্তু
 মানুষের জীবনে বসন্ত আসার জন্য দিনক্ষণ,নিয়মকানুনের কোন দরকার পড়ে না।যে কোন সময়,যে কোন বয়সেই মনের বসন্তের ঠিকানা মেলে।
  কিছুদিন ধরেই মনোতোষ সায়নীকে বেশ লক্ষ্য করছে এটা একমাত্র সায়নী ছাড়া স্কুলের বাকি ছেলেমেয়েদের নজর এড়ায়নি।ডাকাবুকো স্বভাবের সুন্দরী সায়নীকে বলতে গেলে সকলেই একটু ভয় পেয়েই চলে।তবে তার খুব কাছের কয়েকজন সহপাঠী তাকে স্কুল চত্বরে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা জানাতে বিন্দুমাত্র ভুল করে না।সায়নীর মধ্যে একটা বিশেষ গুন হল যে কারো বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়া।গ্রামের অবস্থাপন্ন ঘরের সুন্দরী মেয়ে হওয়ার কারণেই হোক আর ক্লাসে ফাষ্ট গার্ল হওয়ার কারণেই হোক স্কুলের শিক্ষক,শিক্ষিকা সহপাঠী সকলেই তাকে খুব ভালোবাসে।
  অমরেশ রায় চৌধুরীর প্রচুর জমিজমা।জমিদারী বংশ বলে কথা!ছেলের আশায় পরপর ন'টি মেয়ে।অর্থের কোন অভাব নেই তাই বছর বছর বাড়িতে মেম্বার সংখ্যা বেড়ে যাওয়াতে তার বা তার পরিবারের কোন চিন্তাও নেই।তখনকার দিনে অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিত তাদের পরিবার কিন্তু অমরেশবাবু তার মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে কোন চিন্তা ভাবনায় করতেন না।স্ত্রী এবং তাঁর মা যখন মেয়েদের বিয়ের কথা বলতেন তার একটাই উত্তর ছিলো," আমি আমার মেয়েদের লেখাপড়া শেষ না করিয়ে বিয়ে দেবো না।কোথায় কার হাতে গিয়ে পড়বে,তার পরিবার কেমন হবে; ভাতের থালা সামনে নিয়ে চোখের জল ফেলবে -- এসব আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না।তারজন্য আমার মেয়েদের আমি সাবলম্বী করে তবেই বিয়ে দেবো।"অনেকে আবার ব্যঙ্গ করে অনেক সময় বলতেন,' অমরেশবাবুর মেয়েগুলি সব দুধভাত খাওয়া বাচ্চা।ওরা কোনদিনও উনার কাছে বড় হবেনা।"
 আজ থেকে বেশ কয়েক যুগ আগে অমরেশবাবুর এহেন কথাবার্তায় পাড়ার অনেকেই আড়ালে-আবডালে তার সমালোচনা করলেও তিনি কোনদিনও সে সব ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ করেননি।আর যেহেতু তার অর্থের কোন অভাব ছিলোনা এবং তিনি ছিলেন একজন পরোপকারী মানুষ;বিপদে-আপদে যে যখন তার কাছে ছুটে এসেছে তিনি তাদের কখনোই খালি হাতে ফেরাননি।তাছাড়াও আরও একটি কারণ ছিল - কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একজন উকিল।অধিকাংশ সময়ে গ্রামের লোকেরা জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে নানান ঝামেলায় ফেঁসে যেতেন।তিনি সেই সব মানুষের কেস লড়তেন সম্পূর্ণ বিনা অর্থে।সপ্তাহের পাঁচদিন তিনি শহরে ঘরভাড়া করে একাই থাকতেন।সপ্তাহান্তে শনিবার কোর্ট করে তিনি তার গ্রামের বাড়িতে যেতেন।তার স্ত্রী,মা এবং বাবা ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো নিয়ে গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন।অমরেশবাবুর রোজগারে যে সংসার চলতো তা কিন্তু মোটেই নয়।প্রচুর জমিজমা থাকার ফলে সংসার চালানোর যাবতীয় উপার্জন ওইসব জমিজমার থেকেই পেয়ে যেতেন।তিন তিনটে পুকুর,বছর মাইনের কাজের লোক।জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরেও কিন্তু তার পরিবারটি জমিদারী চালেই চলতো।
 কিন্তু তখনকার দিনে দশ,থেকে এগারো বছর বয়স হলেই গ্রামের লোকেরা অর্থাৎ মেয়ের বাবা,মা তাদের বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দিতেন।তিনি তাঁর বাবাকে যুক্তি,তর্ক দিয়ে বুঝাতে সক্ষম হলেও মায়ের সাথে পেরে না উঠতে পেরে এগারো বছর বয়সেই বড় মেয়েটির বিয়ে দিতে বাধ্য হন একজন স্কুল শিক্ষকের সাথে।বয়সের পার্থক্য চৌদ্দ বছরের।
  সায়নী তার মেজ মেয়ে।মনোতোষ মাধ্যমিক পাশ করে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে বেশ ভালো চাকরি পেয়ে বাইরে চলে যায়।কিন্তু কর্মক্ষেত্রে চলে যাওয়ার আগে একদিন সে সায়নীর সাথে দেখা করে।সায়নীকে সে তার মনের কথা জানায়। সায়নী সে বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।
--- যদি তোমার আপত্তি না থাকে আমার বাড়ির থেকে তোমাদের বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে আসবে।
বন্ধুদের মাধ্যমে মনোতোষের মনের খবর সায়নী আগেই পেয়ে গেছিলো।তার উপর একদিন টিফিন পিরিয়ডে ফুটবল খেলতে গিয়ে মনোতোষ যখন পায়ে ব্যথা পেয়েছিলো সেদিন তার ব্যথা সারানোর জন্য সকলের সাথে সায়নীই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো।দুজনের চোখাচোখি হলেও সায়নী সে ব্যাপারটাকে কোন পাত্তাই দিয়েছিল না।কিন্তু আজ সরাসরি মনোতোষ যখন রাস্তায় তাকে একা পেয়ে প্রস্তাব দেয় তখন ক্ষণিকের জন্য হলেও তার কিশোরী মনে অদ্ভুত এক ভালোলাগা কাজ করে।পরমুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
--- কিসের আপত্তি আর কিসের প্রস্তাব দুটোর একটাও বুঝলাম না।
--- সত্যিই কি তুমি কিছু বুঝতে পারছো না?
 সায়নী সরাসরি মনোতোষের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
--- না,সত্যিই আমি বুঝতে পারছি না।
--- বুঝতে পারছো না নাকি সরাসরি আমার কাছ থেকে জানতে চাইছো?
--- ভনিতা না করে সরাসরি বললেই তো হয়।ওহ্ আচ্ছা আচ্ছা তুমি চাকরি পেয়ে গেছো সেটাই বলতে এসেছো?
 সায়নী কথাটা বলে মনেমনে হাসতে লাগল।বেশ মজা লাগছে তার।এই কিশোরীবেলায় প্রথম প্রেমের কথাটা সে মনোতোষের মুখ থেকেই শুনতে চাইছে।মনোতোষ ব্যাপারটা বুঝতে পারলেও সায়নীর সাথে কথা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেও ভনিতা করেই চলেছে।পরিস্থিতি 'সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি'-।এটা নিয়েই কথা বলতে বলতে তারা হাঁটতে থাকে।সায়নী তার বাড়ির কাছে ততক্ষণে চলে এসেছে। বড় রাস্তা থেকে অনেকটা হেঁটেই নিজেদের জমির উপর দিয়ে বেশ খানিকটা হেঁটেই তাদের বাড়ি আসতে হয়।গ্রামের বাড়িগুলো যে রকম হয় আর কি?বড় আড়কাঠাটি সরাতে সরাতে সায়নী মনতোষের দিকে ফিরে বললো,
--- সত্যি কথা বলার সৎসাহস নেই তোমার।যদি কোনদিন সরাসরি তোমার মনের কথাটা বলতে পারো সেদিনই আমার সামনে এসে দাঁড়িও।
মনোতোষ কিছুটা সায়নীর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো,
--- বলতে আমি এখনি পারি।তাহলে শোনো ---
 ঠিক এই সময়ে সায়নী তাকিয়ে দেখে পাড়াতুতো এক কাকা তাদের বাড়িতে ঢোকার জন্য পা বাড়িয়েছেন।সায়নী মনতোষকে কিছু বলার সুযোগ আর না দিয়েই তার দিকে একটু তাকিয়ে ওই কাকার সাথে কথা বলতে বলতেই বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।মনোতোষ সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেও তার নিজ পথ ধরে তবে নিশ্চিন্ত মনেই যে সায়নী তাকে প্রত্যাখ্যান করেনি।
 সায়নী মনতোষের সামনে থেকে চলে এলো ঠিকই কিন্তু প্রথম ভালোলাগার পরশটা তার মনে রয়েই গেলো।মনোতোষ তার হৃদয়ে অসময়েই বসন্তের লাল আবিরে রঞ্জিত করে তার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
 সায়নী সেবার ছিল মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।সারা সপ্তাহে নিজে না পারা বিষয়গুলি জমিয়ে রাখতো তার বাবুর জন্য।প্রত্যেক ছেলেমেয়েই অমরেশবাবুকে বাবা না বলে বাবু বলেই ডাকতো।আর অমরেশবাবু তার মেয়েদের মা বলে এমনভাবে ডাকতেন যে তার ডাক শুনে মনে হোত প্রতিটা মেয়েই যেন তার গর্ভধারিনী।

ক্রমশঃ 
    

Friday, September 24, 2021

দায়িত্ব

অপেক্ষার প্রহর

"স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে তফাৎটা বোঝার আগেই সবকিছু বদলে গেলো"- বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে।সৃজনী কথাগুলো বলেই জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।তখনো তার চোখের থেকে অঝোর ধারায় জল পরে চলেছে।প্রচন্ড হাওয়ায় বৃষ্টির ছাঁট এসে তার চোখেমুখে লাগছে।বৃষ্টির জল আর চোখের জল মিলেমিশে একাকার তখন।রণজিৎ আস্তে করে উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিলো।সম্বিত ফিরে পেয়ে সৃজনী আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে নিলো।বেশ কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব।
  বাংলায় এম এ করা সৃজনী বাবা,মায়ের পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করে।নিশীথ রেলের উচ্চপদস্থ কর্মচারী।পাগলের মত ভালোবাসে নিশীথ সৃজনীকে।সংসারে শ্বাশুড়ী ছাড়া আর কেউ নেই।তিনিও তার বৌমাটিকে নিজ কন্যার মতই দেখেন।মাঝে মাঝে সৃজনীর মনে হত এ সবকিছু যেন স্বপ্ন।জীবনে এত সুখ সে কোনদিন কল্পনাও করেনি।
  কিন্তু সৃজনীর জীবনে এ সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।বিয়ের ছমাসের মাথায় অফিস থেকে ফেরার পথে বাইক অ্যাকসিডেন্ট করে নিশীথ চলে যায় সৃজনীর জীবন থেকে।বাবা,মায়ের একমাত্র সন্তান সে।এই আকস্মিক ঘটনায় বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়।তিনিও নিশীথ চলে যাওয়ার দুদিনের মধ্যে চলে যান।ওদিকের জামাই ও স্বামীর মৃত্যুর পর মায়ের পাগল হয়ে ওঠার জোগাড় আর এদিকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শ্বাশুড়ী মা বিছানা নিয়েছেন।খাওয়া,ঘুম সব বন্ধ।কোন দিকে যাবে সৃজনী?
 শ্বাশুড়ী বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেন না।তাই মাকে হাতে, পায়ে ধরে তার কাছে নিয়ে আসা।নিশীথ চলে যাওয়ার পর চিৎকার করে কেঁদে নিজে হালকা হওয়ার সময়টুকুও সে পায়নি।
 স্বামী ও বাবার কাজ মিটে যাওয়ার পরই তাদের অফিসে ছুটাছুটি।পেনশন মায়ের নামে করা আর নিশীথের অফিসে নিজের একটা চাকরি।তানাহলে ওই বৃদ্ধা মানুষটিকে নিয়ে বেঁচে থাকায় যে দায় হয়ে পড়বে।
 রেলে জয়েন করার কিছুদিন পর থেকেই সে লক্ষ্য করে সহকর্মী রণজিৎ নানান চলছুতোই তার কাছাকাছি থাকতেই যেন ভালোবাসে।কিন্তু জীবনে এতো বড় আঘাতের পর নূতন করে তার আর স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করে না।সে ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে থাকে নানানভাবে।
 হঠাৎ করেই রণজিৎ বদলী হয়ে যায়।চলে যাওয়ার আগে বারবার সৃজনীকে অনুরোধ করে তাকে একান্তে দশটা মিনিট সময় দেওয়ার জন্য।কিন্তু কিছুতেই সৃজনী রাজি হয় না।
 এক ছুটির সন্ধ্যায় অপরিচিত এক মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা ও এক ভদ্রলোক এসে হাজির সৃজনীর বাড়িতে অর্থাৎ তার শ্বশুরবাড়িতে।তার শ্বাশুড়ী এখন কিছুটা স্বাভাবিক কিন্তু কথাবার্তা আগের মত আর বলেন না।এই তিন বছরে সৃজনীর মা নিজেকে অনেকটাই সামলে নিয়েছেন।আর মানুষের শোকের একমাত্র ওষুধ তো সময়।জীবন স্তব্ধ হলেও ঘড়ির কাটা তো স্তব্ধ হয় না।স্তব্ধ হওয়া জীবনও আস্তে আস্তে তার গতি ফিরে পায় সময়ের সাথে।
 ভদ্রলোক,ভদ্রমহিলা দুজন রঞ্জিতের বাবা ও মা।তারা ছেলের বিয়ের সম্মন্ধ নিয়ে এসেছেন।সানন্দে শ্বাশুড়ী মা এ বিয়েতে মত দেন।কিন্তু তাদের সামনে বেঁকে বসে সৃজনী।সৃজনীর মা সেদিন ওখানে ছিলেন না।তিনি কয়েকদিনের জন্য দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে গেছিলেন।তারা সৃজনীর শ্বাশুড়ীকে তার নিজের মা ই ভাবেন।শেষমেষ তাদের জোরাজুরিতে সৃজনী বলে আগে সে রঞ্জিতের সাথে কথা বলতে চায়।কিছু কথা তাকে জানানো দরকার।তারা তাদের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে যান।
 সৃজনী যখন রঞ্জিতের সাথে দেখা করতে আসে তখন সন্ধ্যা হয় হয়।অফিস থেকে বেরিয়ে সে সোজা চলে আসে।আকাশ তখন ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে।রণজিৎ কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছে।
 পুরো ঘটনা শোনার পর রণজিৎ বলে,
--- জীবনের একটা স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে বলে  স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেবে - সেভাবে জীবন চলে না।
সব জানি,সব বুঝি।আমার আরও সময় চাই।জানিনা কোনদিন আমি আমার জীবনে যা ঘটে গেছে তা মেনে নিতে পারবো কিনা।যদি কোনদিন মানতে পারি তাহলে তোমার কাছেই প্রথম ছুটে আসবো।আজ চলি।
  সৃজনী উঠে দাঁড়ায়।রঞ্জিতের মা চা, জলখাবার নিয়ে এসেছিলেন সৃজনী তাকে প্রণাম করে বলে,
-- আজ নয় মাসিমা।যদি সুযোগ হয় অন্য কোনদিন এসে পেট ভরে খেয়ে যাবো।
 রণজিৎ সৃজনীর পিছন পিছন কিছুটা হেঁটে আসা।তারপর বলে,
--- আমি কিন্তু অপেক্ষা করবো।
 সৃজনী পিছন ফিরে তাকায়।কিছুক্ষণ কি যেন ভাবে।তারপর কোন কথা না বলেই সামনের দিকে এগিয়ে যায়।


ভূতুড়ে কান্ড

"ভুতুড়ে কান্ড" ( নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী ) ^^^^^^^^^^^^^^^^^

  বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে কলেজে পড়াকালীন সময়ে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যহীন ভাবেই বেড়িয়ে পড়লাম | সবাই মিলে প্রথমে আসলাম হুগলি | সেখানে আমার এক কাকার বাড়ি আছে | বাড়িটা একটু ভিতরের দিকে | পাঁচজন যেয়ে সেখানে উপস্থিত হলাম | নানান ধরণের গল্প ,গুজব হতে হতে আমার খুড়তুতো ভাই বললো ওখানেই একটি রাজবাড়ী আছে ; যেখানে শুধুমাত্র ভুতেরই বাস | অনেকেই নাকি নানান ভাবে তাদের অস্তিত্ব টের পেয়েছেন | সকলেরই বয়স কম , প্রত্যেকেই নিজেদের অসীম সাহসী ভাবি | ঠিক করলাম সকালেই ওই রাজবাড়িতে যাবো | উঠতে উঠতে একটু বেলায় হয়ে গেলো | কাকিমা বললেন স্নান , খাওয়া ,দাওয়া করে যাতে আমরা বেড়োই | এ সব সারতে সারতে আমাদের প্রায় বারোটা বেজে গেলো | খুড়তুতো ভাইটি আমাদের সাথে গেলো না , পথনির্দেশটা দিয়ে দিলো | অনেকটা পথ পেড়িয়ে আমরা এসে রাজবাড়ীর সিংহদুয়ারে পৌঁছলাম | বিশাল লোহার গেট | খুব বড়ও তালের মতো এক তালা ঝুলছে | ঢোকার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না , এমনকি আশেপাশেও কাউকেই দেখতে তেমন পাওয়া যাচ্ছে না | খুব মন খারাপ নিয়ে ওখানে দাঁড়িয়েই সকলে নানান পোজে ছবি তুলতে লাগলাম | হঠ্যাৎ আমাদের সকলকে অবাক করে দিয়ে বেশ মোটা কালো মতো একজন লোক সেখানে এসে হাজির হলেন | ভিতরে ঢোকার চাবি কোথায় পাবো তার কাছে জানতে ছায়ায় তিনি অত্যন্ত মিহি শুরে আমাদের বললেন ,"ওটা আমার কাছেই থাকে |" খুশিতে ডগমগ সব গেটটা খুলে দিতে বললাম | গেট খুলতে খুলতেই উনি আমাদের সতর্ক করে দিলেন যাতে পুরো রাজবাড়ী আমরা বাইরে থেকেই দেখি এবং সন্ধ্যার আগেই যেনো ওই রাজবাড়ী ছেড়ে বেড়িয়ে আসি | পরে রাতে এসে উনি তালা দিয়ে যাবেন | আমরা সম্মত হয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম | রাজবাড়ীর ভিতরে কিছু কিছু জায়গা আগাছায় পূর্ণ | আবার অবাক করে দেওয়ার মতো কিছু জায়গা দেখলে মনেহয় সেখানে যেন নিত্য লোকের আনাগোনা | বিশেষত যে সব জায়গা গুলিতে বসবার মতো ব্যবস্থা রয়েছে | মনের আনন্দে সকলে সবকিছু ঘুরে দেখছি | হঠ্যাৎ খেয়াল হলো আবার ছবি তোলার | মোবাইল ফোনের তখনও চল হয়নি | ছবি তোলার জন্য আমার দামী ক্যামেরা ইয়াসিকা | পোজ নিয়ে সকলে দাঁড়িয়ে পড়লো | আমি ক্যামেরার পিছনে | কিন্তু একি ? চোখের সামনে যে মানুষগুলিকে দেখতে পাচ্ছি ,ক্যামেরার লেন্সে তাদের দেখতে পাচ্ছি না কেন ? শুধুই কালো আর কালো | সাধের ক্যামেরা আমার নষ্ট হয়ে গেছে ভেবে নিয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো | নষ্ট ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে আবার ঘুরতে লাগলাম | এত বড় রাজবাড়ী যেন শেষই হয়নি ঘোরা | সন্ধ্যা হয় হয় ; এমন সময় ওই লোকের কথা মনে পড়লো | বেড়িয়ে আসতে হবে | পুরোটা ঘুরে দেখা হোলোনা বলে মনটা সকলের খুব খারাপ হয়ে গেলো | আমরা বাইরে বেড়োনোর জন্য পিছন ঘুরে হাটতে লাগলাম | কিন্তু কোথায় বাইরে বেড়োনোর পথ ? যে পথ দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম সে পথই তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না | হঠ্যাৎ কানে এলো ঘুঙঘুর এর আওয়াজ | অতি বড় সাহসী আমি -আমার বুকের মধ্যেও ধুকধুকানি শুরু হোলো | হঠাৎ করেই আমাদের সামনে একজন মহিলা এসে উপস্থিত হলেন | তিনি বললেন ,"আপনারা এত দেরি করলেন কেন ? ঢোকার আগে আমার স্বামী তো আপনাদের বলেই দিলো সন্ধ্যার আগেই এখান থেকে বেড়িয়ে যেতে | আমার পিছন পিছন তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আসুন |মহিলার সহায়তায় আমরা রাজ্ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসলাম | চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার |কিছুদূর এগিয়ে তারই মাঝে দেখতে পেলাম একটি ছোট চায়ের দোকান | সেখানে কিছু লোক বসে চা খাচ্ছে ; ওই মানুষগুলির মধ্যে যে আমাদের গেটের তালা খুলে দিয়েছিলেন তিনিও আছেন |আমরা সকলে যেয়ে চায়ের দোকানে চায়ের অর্ডারটা দিয়ে বাইরে বেঞ্চে বসে দাড়োয়ান ভদ্রলোককে বললাম ,"আপনার স্ত্রী যদি ওই সময় আমাদের কাছে না আসতেন আমরা তো বেড়োতেই পারতাম না | কিন্তু সন্ধ্যার সময় ওখান থেকে ঘুঙঘুরের আওয়াজ কোথা থেকে আসছিলো ?"হঠ্যাৎ চা বিক্রেতা আমাদের দিকে তাঁকিয়ে বললেন ,"আপনারা রাজবাড়িতে গেছিলেন ? আর একটাও কথা ওর কাছে জিজ্ঞেস করবেন না | আপনারা এদিকে উঠে আসুন |" যার সাথে এতক্ষন কথা বলছিলাম মুহূর্তে দেখি সে উধাও | দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম ,"এত তাড়াতাড়ি ভদ্রলোক উঠে কোথায় চলে গেলেন ?" " উনাকে শুধু আপনারাই দেখতে পারছিলেন এখানে আমরা কেউই তাকে দেখতে পাইনি | উনি মানুষ না | তবে কখনোই কারও ক্ষতি করেন না | কেউ রাজবাড়ী দেখতে আসলে উনি গেট খুলে দেন ; রাত হয়ে গেলে উনার স্ত্রী বাইরে বেড়োনোর পথ দেখিয়েও দেন | দুজনেই ছিলেন রাজার বিশ্বস্ত কর্মচারী | বেঁচে থাকতে তারা যে কাজ করেছেন মরে যেয়ে ভুত হয়েও একই কাজ করে চলেছেন | আর ওই যে ঘুঙঘুরের আওয়াজের কথা বললেন না - সন্ধ্যা হলেই ওখানে মাহফিল বসে | রাজপ্রাসাদের ভিতরে নানান প্রকারের আলোর রোশনাই, অনেক দূর থেকে সে আলো দেখা গেলেও কাছে গেলে তা ক্রমশ কমতে থাকে | অদ্ভুত একটা গা ছম্ছমে ভাব আসে | যারা দাঁড়োয়ানকে বা তার স্ত্রীকে একবার দেখেছে পরে তারা আর কখনোই তাকে দেখতে পায় না | কেউ সেখানে গেলে সেদিন দাঁড়োয়ান এখানে আসবেই |" আমরা সকলে হা করে কথাগুলি শুনছিলাম | হঠ্যাৎ আমার বন্ধু বিজন বলে উঠলো , তার মানে আমরা পুরোদিনটা ভুতের সাথেই কাটালাম ?" "হ্যা আপনারা রাজপ্রাসাদের কোনো কামরায় ঢোকেননি বলে বেঁচে এসেছেন ; যদি কোনো কামরায় ঢোকার চেষ্টা করতেন তাহলে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারতেন না | ওরা কিন্তু আপনাদের সাথে সাথেই ছিলেন | ওখানে কেউ ছবি তুলতে গেলে কোনো ছবি উঠে না ,কারণ ওরা সাথে থাকে | 

অদ্ভুত ব্যাপার হলো সারাদিন আমরা ভুতের সাথে থেকেও কেউ কোনো ভয় পেলাম না | খুশি হলাম এই ভেবে যাক বাবা ! ক্যামেরাটা তাহলে নষ্ট হয়নি | ভুতের ছবি না উঠুক মানুষের ছবি তো উঠবে !!
""""""

নন্দা 24.9.16

Thursday, September 23, 2021

অপেক্ষার প্রহর

অপেক্ষার প্রহর

"স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে তফাৎটা বোঝার আগেই সবকিছু বদলে গেলো"- বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে।সৃজনী কথাগুলো বলেই জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।তখনো তার চোখের থেকে অঝোর ধারায় জল পরে চলেছে।প্রচন্ড হাওয়ায় বৃষ্টির ছাঁট এসে তার চোখেমুখে লাগছে।বৃষ্টির জল আর চোখের জল মিলেমিশে একাকার তখন।রণজিৎ আস্তে করে উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিলো।সম্বিত ফিরে পেয়ে সৃজনী আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে নিলো।বেশ কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব।
  বাংলায় এম এ করা সৃজনী বাবা,মায়ের পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করে।নিশীথ রেলের উচ্চপদস্থ কর্মচারী।পাগলের মত ভালোবাসে নিশীথ সৃজনীকে।সংসারে শ্বাশুড়ী ছাড়া আর কেউ নেই।তিনিও তার বৌমাটিকে নিজ কন্যার মতই দেখেন।মাঝে মাঝে সৃজনীর মনে হত এ সবকিছু যেন স্বপ্ন।জীবনে এত সুখ সে কোনদিন কল্পনাও করেনি।
  কিন্তু সৃজনীর জীবনে এ সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।বিয়ের ছমাসের মাথায় অফিস থেকে ফেরার পথে বাইক অ্যাকসিডেন্ট করে নিশীথ চলে যায় সৃজনীর জীবন থেকে।বাবা,মায়ের একমাত্র সন্তান সে।এই আকস্মিক ঘটনায় বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়।তিনিও নিশীথ চলে যাওয়ার দুদিনের মধ্যে চলে যান।ওদিকের জামাই ও স্বামীর মৃত্যুর পর মায়ের পাগল হয়ে ওঠার জোগাড় আর এদিকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শ্বাশুড়ী মা বিছানা নিয়েছেন।খাওয়া,ঘুম সব বন্ধ।কোন দিকে যাবে সৃজনী?
 শ্বাশুড়ী বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেন না।তাই মাকে হাতে, পায়ে ধরে তার কাছে নিয়ে আসা।নিশীথ চলে যাওয়ার পর চিৎকার করে কেঁদে নিজে হালকা হওয়ার সময়টুকুও সে পায়নি।
 স্বামী ও বাবার কাজ মিটে যাওয়ার পরই তাদের অফিসে ছুটাছুটি।পেনশন মায়ের নামে করা আর নিশীথের অফিসে নিজের একটা চাকরি।তানাহলে ওই বৃদ্ধা মানুষটিকে নিয়ে বেঁচে থাকায় যে দায় হয়ে পড়বে।
 রেলে জয়েন করার কিছুদিন পর থেকেই সে লক্ষ্য করে সহকর্মী রণজিৎ নানান চলছুতোই তার কাছাকাছি থাকতেই যেন ভালোবাসে।কিন্তু জীবনে এতো বড় আঘাতের পর নূতন করে তার আর স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করে না।সে ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে থাকে নানানভাবে।
 হঠাৎ করেই রণজিৎ বদলী হয়ে যায়।চলে যাওয়ার আগে বারবার সৃজনীকে অনুরোধ করে তাকে একান্তে দশটা মিনিট সময় দেওয়ার জন্য।কিন্তু কিছুতেই সৃজনী রাজি হয় না।
 এক ছুটির সন্ধ্যায় অপরিচিত এক মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা ও এক ভদ্রলোক এসে হাজির সৃজনীর বাড়িতে অর্থাৎ তার শ্বশুরবাড়িতে।তার শ্বাশুড়ী এখন কিছুটা স্বাভাবিক কিন্তু কথাবার্তা আগের মত আর বলেন না।এই তিন বছরে সৃজনীর মা নিজেকে অনেকটাই সামলে নিয়েছেন।আর মানুষের শোকের একমাত্র ওষুধ তো সময়।জীবন স্তব্ধ হলেও ঘড়ির কাটা তো স্তব্ধ হয় না।স্তব্ধ হওয়া জীবনও আস্তে আস্তে তার গতি ফিরে পায় সময়ের সাথে।
 ভদ্রলোক,ভদ্রমহিলা দুজন রঞ্জিতের বাবা ও মা।তারা ছেলের বিয়ের সম্মন্ধ নিয়ে এসেছেন।সানন্দে শ্বাশুড়ী মা এ বিয়েতে মত দেন।কিন্তু তাদের সামনে বেঁকে বসে সৃজনী।সৃজনীর মা সেদিন ওখানে ছিলেন না।তিনি কয়েকদিনের জন্য দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে গেছিলেন।তারা সৃজনীর শ্বাশুড়ীকে তার নিজের মা ই ভাবেন।শেষমেষ তাদের জোরাজুরিতে সৃজনী বলে আগে সে রঞ্জিতের সাথে কথা বলতে চায়।কিছু কথা তাকে জানানো দরকার।তারা তাদের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে যান।
 সৃজনী যখন রঞ্জিতের সাথে দেখা করতে আসে তখন সন্ধ্যা হয় হয়।অফিস থেকে বেরিয়ে সে সোজা চলে আসে।আকাশ তখন ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে।রণজিৎ কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছে।
 পুরো ঘটনা শোনার পর রণজিৎ বলে,
--- জীবনের একটা স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে বলে  স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেবে - সেভাবে জীবন চলে না।
সব জানি,সব বুঝি।আমার আরও সময় চাই।জানিনা কোনদিন আমি আমার জীবনে যা ঘটে গেছে তা মেনে নিতে পারবো কিনা।যদি কোনদিন মানতে পারি তাহলে তোমার কাছেই প্রথম ছুটে আসবো।আজ চলি।
  সৃজনী উঠে দাঁড়ায়।রঞ্জিতের মা চা, জলখাবার নিয়ে এসেছিলেন সৃজনী তাকে প্রণাম করে বলে,
-- আজ নয় মাসিমা।যদি সুযোগ হয় অন্য কোনদিন এসে পেট ভরে খেয়ে যাবো।
 রণজিৎ সৃজনীর পিছন পিছন কিছুটা হেঁটে আসা।তারপর বলে,
--- আমি কিন্তু অপেক্ষা করবো।
 সৃজনী পিছন ফিরে তাকায়।কিছুক্ষণ কি যেন ভাবে।তারপর কোন কথা না বলেই সামনের দিকে এগিয়ে যায়।


Monday, September 20, 2021

একটু জলের আশায়

একটু জলের আশায়

 " এই বাড়িতে যতবারই এসেছি ততবারই গা ছমছম করা একটা অস্বস্তি বোধ করেছি --- "।কথাটা বলে দেবিকা নিজে বসে থাকা চেয়ারটা টেনে নিয়ে অমিতের আরো কাছে এগিয়ে গেলো।এটা দেখতে পেয়ে অমিত হেসে দিয়ে বললো,
--- এই দিনের বেলাতেও তোমার হাবভাব দেখে মনেহচ্ছে তোমার এখনো গা ছমছম করছে।
--- হ্যাঁ করছে তো। এ বাড়িতে ঢুকলেই আমার মনেহয় কেউ যেন আমার সাথে সাথেই আছে।দিদিমা যখন আমার নামে বাড়িটা উইল করলেন আমি বলেছিলাম তুমি বাড়িটা বিক্রি করে টাকাটা ফিক্সড করে দাও।আমি যখন দেশে ফিরবো তখন কিছুতেই ওই বাড়িতে আমি থাকবো না।আসলে দিদিমার তো আমি ছাড়া আর কেউ ছিলোনা।বাবা,মায়ের অ্যাক্সিডেন্টের পর আমার দাদু আমায় দার্জিলিং পাঠিয়ে দিলেন।ওখানকার পড়াশুনার পাট চুকিয়ে যখন ফিরে এলাম কলকাতায় তখন আবার উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিলেন ব্রিটেন।মা একমাত্র মেয়ে ছিলেন দিদিমার।দাদুকে ছেলেবেলায় দেখেছি তবে মনে নেই।মায়ের সাথে যখন দিদিমার কাছে আসতাম তখন ছিলাম খুব ছোট।আর মা সাথে সাথেই থাকতেন।তাই তখনকার ফিলিংসটা আমার ঠিক মনে নেই।একটু বড় হওয়ার পরে যতবার দিদিমার সাথে দেখা করতে এসেছি ততবারই এই অদ্ভুত ফিলিংসটা আমার হয়েছে।
--- যদিও আমি এসব বিশ্বাস করিনা কিন্তু তুমি যখন বলছো অবিশ্বাসও করছি না।আসলে ছোটবেলা থেকেই এই ভূত-প্রেত ব্যাপারটা আমার বিশ্বাস হয় না।তবুও যখন বলছো বিষয়টা নিয়ে আমি আমার এক দূরসম্পর্কের ঠাকুমার সাথে আলোচনা করবো।আমাদের গ্রামের বাড়ির কাছেই ওনার বাড়ি।তোমায় নিয়েই একদিন যাবো ওখানে।শুনেছি উনি নাকি আত্মার অস্তিত্ব টের পান এবং আত্মার সাথে কথাও বলেন।
 অমিত ব্যানার্জী।দেবিকার প্রেমিক।দুজনে একসাথেই ব্রিটেন থেকে ফিরেছে।আগামী মাসেই বিয়ে।বিদেশেই আলাপ।দেবিকার দাদু আজও বেঁচে।তিনি এ বিয়েতে সানন্দে মত দিয়েছেন।কারণ অমিত তার নাতনীর জন্য উপযুক্ত পাত্র।
 দেবিকা পুরো বাড়িটা অমিতকে ঘুরিয়ে দেখায়।কলকাতা শহরে এত বড় বাড়ি সচরচর দেখা যায় না।বাড়িটা ঘুরে দেখতে দেখতে অমিত বলে ওঠে,
--- তোমার এই গা ছমছমে ব্যাপারটা না থাকলে আমরা এই বাড়িতেই আমাদের নূতন জীবন শুরু করতে পারতাম একটু ঘষামাজা করে।
--- বাড়িটা তো আমারও খুব প্রিয়।যদি তাই হয় তো খুব ভালো হয়।কিন্তু তার আগে চলো তোমার ওই ঠাকুমার কাছে একবার যাই।দেখি এই ব্যাপারটার কোন সুরাহা করা যায় কিনা। জানো অমিত বড় হয়ে যতবার এখানে এসেছি প্রতিবারই আমি দিদিমাকে এ কথাটা বলতাম।কিন্তু দিদিমা কোন উত্তর না দিয়ে শুধু চোখ ভরা জল নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।দেখে মনেহত তিনি যেন এ রহস্যের মূল কারণটা জানতেন।শেষবার অন্যমনস্ক হয়ে বলেছিলেন, 'মায়া'।তারপর বহুবার জানতে চাওয়ার পরও কোন উত্তর দেননি।চোখ বন্ধ করে শুধু শুয়েই ছিলেন আর চোখ থেকে সমানে জল পড়ে গেছে।উনাকে দেখাশুনা করার জন্য যে দুজন মহিলা ছিলেন তারা দিদিমার ঘরে না থাকলে মাঝে মধ্যে তাদের মনে হয়েছে যে দিদিমা কারো সাথে কথা বলছেন।এসে জানতে চাইলে কখনোই স্বীকার করতেন না।বলতেন নাকি 'তোরা ভুল 'শুনেছিস''।
  অমিত দেবিকাকে সাথে নিয়ে গ্রামের বাড়ি থেকে তার সেই ঠাকুমাকে নিয়ে আসে।বাড়িতে পা দিয়েই বৃদ্ধা বলে ওঠেন,"কেন পড়ে আছো তুমি এখানে?"অমিত আর দেবিকা দুজনেই কিছু বলতে যায় --- কিন্তু তিনি হাতের ইশারায় তাদের চুপ করতে বলেন।তিনি কি উত্তর পান সেই অশরীরীর কাছ থেকে তা তারা জানতে পারে না ঠিকই কিন্তু বৃদ্ধা তখন বলেন," ঠিক আছে তোমার কথামত কাজ হবে।কিন্তু তোমায় কথা দিতে হবে এই বাড়ি তোমার পরিত্যাগ করতে হবে।"
  অমিত,দেবিকা তার ঠিক পরদিন জোগাড়-যন্ত্র করে বৃদ্ধার কথামত বাবা,মায়ের শ্রাদ্ধের আয়োজন করে।কাজ শেষে বাগানের এক বড় আমগাছের একটা মোটা ডাল হঠাৎ করেই ভেঙ্গে পড়ে।বৃদ্ধা হেসে পড়ে বলেন, " যাক আত্মা এবার মুক্তি পেলো।এতকাল ধরে মেয়ের হাতের একটু জল পাওয়ার জন্য এই বাড়িটা জুড়েই সে ছিলো।তোমার দিদিমা সে কথা জানতেন।কিন্তু তিনি তোমায় এ কাজের কথা কোনদিন বলেননি তার কারণ তিনি চাননি তার মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে যাক।আর এই কারণেই এ বাড়ি ছেড়ে তোমার দিদিমা কোথাও যেতেন না। হ্যাঁ তোমার বাবার আত্মা মুক্তি পেয়ে গেছিলো কিন্তু তোমার মায়ের আত্মা এই বাড়িটা ঘিরেই ছিলো।শুধু তোমার হাতের একটু জল পাওয়ার আশায়।

#আজকের_ব্লগিং_সূত্র

মাতৃহারা

 মাতৃহারা

"জীবনের অনেকটা সময় হেলায় নষ্ট করেছি।ঠিক নষ্ট বলা যায় না এটাকে।পরিবারের বড় হওয়ার খেসারত দিয়েছি।অথচ আমি এটা না করলেই পারতাম।এই পরিবারের প্রতি আমার তো কোন দায় ছিলো না।ছেলেবেলায় কবে মাকে হারিয়েছি আমার মনে নেই।মা বলে যাকে ডাকতাম তিনি কোনদিনও আমাকে ভালোবাসেনি।বুঝতে পারতাম না আমার ভাই,বোনদের ভালো জামাকাপড়,ভালো খাবার আর আমার খাবার আমার জামাকাপড় এরূপ কেন?ছোট বয়স থেকেই আমার শোবার জন্য আলাদা একটা ঘর।রাতে যখন লোডশেডিং হয়ে যেত প্রথম প্রথম উঠে মা,বাবার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কত ডাকতাম,কাঁদতাম।কিন্তু কোনদিন মা দরজা খুলে বেরিয়ে এসে আমায় বুকের ভিতর নিয়ে শোয়নি।বাবা মাঝে মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে আমায় বুকে তুলে নিলেও মায়ের তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে আমায় কোল থেকে নামিয়ে তার নির্দিষ্ট স্থানটিতে চলে যেতেন।আর মা দরাম করে দরজাটা বন্ধ করে দিতেন।
   পরে যখন একটু বুঝতে শিখেছি তখন জানতে পারি উনি আমার সৎমা।হঠাৎ করেই আমার মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আবার বিয়ে করেন।বিয়ের আগে আমার সৎমায়ের বাপের বাড়িতে আমাকে সন্তান হিসাবে মেনে নিতে হবে কথা হলেও তিনি কোনদিনও আমায় মেনে নিতে পারেননি।বাবা আমায় যেটুকু আদর করা বা কিছু কিনে দেওয়া সবই করতেন মায়ের অনুপস্থিতিতে। 
 স্থানীয় একটি সরকারি স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করি।বয়স যখন বারো কি তেরো তখন থেকেই নিজে টুকটাক কাজ করতে শুরু করলাম।দুটো পয়সা আসতো তাতে।নিজের প্রয়োজনটা মিটে যেত।ফ্রী স্কুল,ফ্রীতে বইপত্র পাওয়া ঘষেমেজে মাধ্যমিকটা পাশ করলাম।কপাল এমনই ঠিক তখনই বাবার একটা মস্তবড় অ্যাকসিডেন্ট হল।দুদিন হাপাতালে থেকে তিনি বিদায় নিলেন।ছোট ছোট দুটো ভাইবোনের মুখের দিকে তাকিয়ে বড্ড মায়া হল।শত হোক সেই জন্মের পর থেকে ওদের দেখলেও কোনদিন ওদের প্রতি কোন ভালোবাসা অনুভব করিনি।কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক মায়ায় জড়িয়ে গেলাম।কাছে টেনে নিলাম ওদের।নিজের ভিতর থেকেই কে যেন বলে উঠলো 'ওদের খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করার দায়িত্ব তোকেই নিতে হবে।' পড়াশুনা আর এগোতে পারলাম না।কাজ খুঁজতে শুরু করলাম।একটা মাধ্যমিক পাশ করা ছেলেকে কে কাজ দেবে?তবুও পাড়ার একজনের সুপারিশে একটা বইয়ের প্রেসে কাজ পেলাম। বারো ঘণ্টা ডিউটি করে যখন ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতাম তখন ঐ ছোট্ট ভাইবোনদুটির নিষ্পাপ মুখদুটি দেখে আমার সমস্ত কষ্ট দূর হয়ে যেত।বাবার মৃত্যুর পর থেকেই মায়ের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলাম।আর সেটা হল আগে মা যখন আমায় খেতে দিতেন তখন মুখে যেন খই ফুটতো আর থালাটা এমনভাবে সামনে ছুড়ে দিতেন যেন কোন বিষধর প্রাণীর সামনে খাবার দিচ্ছেন।কিন্তু আমার পরিশ্রমে যখন সংসার চলতে শুরু করলো তখন এগুলো আর হত না তবে মা কিছুতেই যেন আমার কাছে ফ্রী হতে পারতেন না।তাকে দেখে বুঝতে পারতাম তিনি অপরাধ বোধে ভুগছেন।সেই হিসাবে আমিও কোনদিন তার কাছে ফ্রী হতে পারিনি ।শুধু কর্তব্যকর্মটাই করে গেছি।
  বোনকে মাধ্যমিক পাশ করিয়ে বিয়ে দিয়েছি।ছোট ভাইটার পড়াশুনা এখনো চলছে।দিনের অধিকাংশ সময়ই তো বাইরেই থাকতাম।আগে বাড়িতে যখন ফিরতাম মনের ভিতর রাগের একটা আগুন জ্বলতো।কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে বাড়ি ফিরে কেমন যেন একটা শুন্যতা অনুভব করতাম।ভাইবোন দুটিকে নিয়েই থাকতাম।কাজে বেরোনোর আগে আর রাতের খাবারটা মা সামনে দিয়েই চলে যেতেন।এইভাবেই চলছিলো।বোনের বিয়ের পরেই মায়ের এক কঠিন অসুখ ধরা পড়লো।আমার মাথায় যেন বাজ ভেঙ্গে পড়লো।আমি তখন দিশেহারা!একদিন কাজের থেকে বাড়িতে ফিরে আসার পর নিজের সেই ছোট্ট ঘরটায় বসে আছি।মা এক কাপ চা নিয়ে এসে আমার সামনে রেখে দাঁড়িয়ে থাকলেন।আমি খুব অবাক হলাম।মুখটা না তুলেই জানতে চাইলাম,'কিছু বলবে?' তিনি আমার খাটে ঠিক আমার পাশটিতে বসে হঠাৎ আমার হাতদুটি ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন।ক্ষমা চাইলেন তারপর আস্তে আস্তে উঠে চলে গেলেন।আমি চুপচাপ ওখানেই বসে থাকলাম।     অনেকক্ষণ পর ভাই এসে খবর দিল মায়ের শরীর খুব খারাপ হয়েছে।দুজনে মিলে মাকে নিয়ে যখন হাসপাতাল পৌঁছালাম ডাক্তার বললেন হার্ট অ্যাটাক।এমনিতেই মায়ের দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছিলো।আগামী সপ্তাহ থেকে ডায়ালিসিস করার কথা ছিল।তারমধ্যেই এই ঘটনা।"এই পর্যন্ত বলে অনিরুদ্ধ মুখ নিচু করে থাকলো।তার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা বয়ে চলেছে।পাশে বসে থাকা আর এক শ্মশানবন্ধু অনিরুদ্ধের কাঁধে হাত রেখে শান্তনার সুরে বলেন,
--- মানুষ তার ভাগ্য নিয়েই জন্মায়।কিছু কিছু মানুষ পৃথিবীতে শুধু দিতেই আসে।বিনিময়ে তারা কিছুই পায় না।তুমিও তাদের মত একজন।তবে শেষ সময়ে তিনি যে তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন সেটাই যথেষ্ঠ।আজ আমিও মাতৃহারা হলাম।তোমার সাথে তো তোমার ভাই আছে।আমি সম্পূর্ণ একা।
  মায়ের দাহকাজ সম্পন্ন হলে দুইভাই মিলে গঙ্গায় অস্তি বিসর্জন দিয়ে ধরা পরে বাড়ি ফিরলো।এই প্রথম অনিরুদ্ধ তার মায়ের ঘরে পা রাখলো।ঘরের এদিক ওদিক তাকিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে সে যেন মায়ের গায়ের গন্ধ পেতে চাইছে;যা সে পেতে চেয়েছিলো সেই ছোট্টবেলা থেকে।
 
             শেষ

Saturday, September 4, 2021

দেবমুনী

 দেবমুনী

  "উফফ!কি তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি।যেন মনের ভিতরের সবটুকু পড়ে নিচ্ছে এক লহমায়"!!পাহাড়ের ঢালু, এবরো-খেবড়ো রাস্তা পেরিয়ে আমরা যখন তার কাছে যাচ্ছিলাম দুপাশের খাদ দেখে বারবার মনে হচ্ছিলো হঠাৎ যদি গাড়িটা খাদের মধ্যে পড়ে যায় মৃত্যু নির্ঘাৎ।কিন্তু অদ্ভুত একটা অনুভূতি কাজ করছিলো।শিলিগুড়ি নামার পর প্রায় তিনঘন্টা ওই গাড়ির মধ্যে দম বন্ধ করে বসে থাকলেও মাঝে মাঝেই বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া কোন মানুষকে ফিরে পাওয়ার এক অদম্য আনন্দ ঘিরে ধরছিলো আমায়।অথচ আমি কিন্তু কিছুই জানতাম না আগে থাকতে। কার সাথে দেখা করতে চলেছি।তবুও মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ধারণা কাজ করছিল।
  দেবলীনা,দেবমাল্যকে নিয়ে সুখের সংসার দীপায়ন ও সাগরিকা ব্যানার্জীর।দীপায়ন একজন একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার।পিতৃ প্রদত্ত সম্পত্তির উপর প্রাসাদোপম এক অট্টালিকা।স্বামী,স্ত্রী দুজনেই মাটির মানুষ।তাদের আচার আচরণে প্রতিবেশীরা কখনোই মনে করে না যে তারা এত বিত্তশালী।আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই তারা প্রতিবেশীদের সাথে নানান অনুষ্ঠানে যোগদান করা,অষ্টমীতে পাত পেতে মায়ের মন্ডবে বসে খাওয়া সবই করতেন।নেশা বলতে ছেলে,মেয়ে,স্ত্রীকে নিয়ে প্রতিবছর পাহাড় অঞ্চলে ভ্রমণ।প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে তিনি সকলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন।
  কতবার যে তিনি দার্জিলিং গেছেন তার হিসাব হয়তো তিনি নিজেও জানেন না।আবারও তিনি দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন পুরো পরিবার সহ। এতবার দার্জিলিং যাওয়ার সুবাদে বহু মানুষের সাথেই তার পরিচয় থেকে অনেকে খুব কাছের মানুষ হয়ে গেছে।তাদেরই মধ্যে একজন ড্রাইভার রমেশ।একদম বাঁধাধরা।তারা দার্জিলিংয়ের যেখানেই যাবে না কেন রমেশেরই গাড়িতে যাবে। ইয়ং রমেশ পাহাড়িয়া অঞ্চলে গাড়ি চালায় দুর্দান্ত।পাহাড়ের ঢালু জমি বেয়ে কি অনায়াসে রমেশ গাড়ি নিয়ে নিচে নেমে যায়।দীপায়নবাবুর মেয়ের বয়স দশ বছর আর ছেলে দেবমাল্য পাঁচ বছর।গাড়ির ভিতর বসেই তারা আনন্দে চিৎকার চেঁচামেচি করতে শুরু করে। দীপায়নবাবু রমেশের পাশে বসে মাঝে মাঝে তার পিঠটা একটু চাপড়ে দিয়ে বলেন," এই রকম ঢালু রাস্তায় আমাকেও একটু গাড়ি চালানো শিখিয়ে দিস রমেশ।" রমেশ হাসতে থাকে।পরিস্কার বাংলায় বলে," দাদা রিটায়ার করে চলে আসবেন দার্জিলিং।ছোট্ট একটা বাংলো কিনে বৌদিকে নিয়ে পাহাড়বাসী হয়ে যাবেন।আমরা খুব মজায় থাকবো তখন।গল্প করতে করতেই দক্ষ হাতে রমেশ এগিয়ে চলে তাদের গন্তব্যের দিকে।
 কিন্তু জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যখন অযাচিতভাবে এমন কিছুর সম্মুখীন হতে হয় তখন কোন অভিজ্ঞতায় আর কাজ করে না।পাহাড়িয়া অঞ্চল।যখন তখন বৃষ্টি শুরু হয়।বৃষ্টির ভিতর থেকেই রমেশ গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে।কিন্তু হঠাৎ করেই গাড়ির সামনে উপর থেকে একটি বড় পাথর গড়িয়ে পড়ে।পাথরে ধাক্কা খেয়ে গাড়ি হুমড়ি খেয়ে নীচে পরে যায়।সেখানে কিছু বসতি থাকায় সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু মানুষজন উদ্ধারকাজ শুরু করে।গাড়ি গিয়ে বেশ কয়েকটা গাছের গোড়ায় আটকে যায়।সকলেই গাড়ির ভিতর থাকলেও দেবমাল্যকে খুঁজে পাওয়া যায় না।মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগায় সাগরিকা সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান।রমেশ,দেবলীনা আর দীপায়নবাবু অল্পবিস্তর আঘাত পেলেও সুস্থ্য হয়ে ওঠেন ডাক্তারদের অক্লান্ত পরিশ্রমে।সুখের সংসার ভেঙেচুরে তছনচ হয়ে যায়।মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসে তিনি এক যন্ত্রমানবে পরিণত হন।অফিস,বাড়ি আর সব সময় চুপচাপ থাকা।তারপর তিনি আর কখনোই মেয়েকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হননি।দেবলীনা বড় হয়েছে তারপর থেকে তার মামাবাড়িতে।অবশ্য তাকে মানুষ করতে, বিয়ে দিতে অর্থের কার্পণ্য তিনি করেননি।
  দেবলীনার বিয়ের তিন বছর পর স্বামীর অনেক জোরাজুরিতে স্বামী সহ সে এখন দার্জিলিংয়ের পথে।ওই ঘটনার পর আর দার্জিলিং যাওয়া হয়নি বাপ,মেয়ের।দুবছর হল বাবাও চলে গেছেন।গাড়ির মধ্যেই ড্রাইভারের সাথে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারে একজন সাধুর কথা।যিনি নাকি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়েই বলে দিতে পারেন তার অতীত,বর্তমান এবং ভবিৎসত। দার্জিলিং যাওয়ার পথে সেবক কালী মন্দিরের কাছাকাছি তিনি থাকেন একটি নির্জন এলাকায়।দেবলীনার বায়নাতে গাড়ি ছুটলো সাধুর কুটিরের দিকে।
  দুর্গম পথ অতিক্রান্ত করে যখন স্বামী,স্ত্রী সেই সাধুর কুটিরের কাছে পৌঁছালো তখন প্রায় দুপুর।দু,একজন শিষ্যের সহয়তায় দেবলীনা ও তার স্বামী সাধুর সম্মুখীন হল।সাধু দেবলীনার দিকে চোখ তুলে তাকালেন।দেবলীনা দেখতে পেলো তার চোখদুটি যেন অস্তগামী সূর্যের লাল আভার মত পরিবর্তিত হতে হতে তা জলে পূর্ণ হয়ে গেলো।সে চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকা দেবলীনার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হল না।সে চোখ নামিয়ে নিলো।সাধুর মুখ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসলো "দিদি" শব্দ।দেবলীনা তড়িৎ গতিতে সাধুর মুখের দিকে তাকালো।
 ভাই,বোনের এই মিলন দৃশ্যে সাক্ষী থাকলো দেবলীনার স্বামী আর পাহাড় পর্বত,ঝর্না,গাছপালা ।সেদিন সেই অ্যাক্সিডেন্টের পর একটি গাছের দুটি বড় শাখার মধ্যে ওই পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশুটি অক্ষত অবস্থায় আটকে ছিল।পরদিন ভোরে শিশুটির কান্না শুনে তাকে উদ্ধার করেন কিছু পাহাড়বাসী।দেবমাল্য দিদির সাথে আর ফেরেনি।তার একটাই বক্তব্য ছিল ঈশ্বর চেয়েছিলেন তিনি তার সাধনায় তাকে পেতে।তিনি তা পেরেছেন।হয়ত তার পথটা ভিন্ন ছিলো কিন্তু উর্দেশ্য তার সফল হয়েছে।
  
 

Wednesday, September 1, 2021

আওয়াজ উঠুক

প্রতিবাদ

 অনেকক্ষণ ধরে কথা বলার পর পঞ্চাশোর্ধ নন্দিনী হাঁপাতে থাকেন। হাঁপাতে হাঁপাতেই তিনি ঘরের এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজতে থাকেন।তা দেখে বুঝতে পারে তার পাশে বসে থাকা অঙ্কিতা।সে এগিয়ে গিয়ে একটা জলের বোতল নন্দিনীর সামনে ধরে।নন্দিনী বোতলটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে তার অর্ধেকের বেশি জল পান করে ফেলেন। তার মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে অঙ্কিতা আর ভাবতে থাকে যে কথাগুলো নন্দিনী বলছেন তার একটি বর্ণও তো মিথ্যা নয়।আমাদের সমাজ নানানভাবে নানান দিক থেকে মেয়েদের উপর সেই পুরুষতান্ত্রিক শাসনই ফলিয়ে এসেছে আজও আসছে।এতদিন তো সত্যিই এ কথাগুলো মাথায় আসেনি।সে তাকিয়ে দেখে নন্দিনীর চোখ থেকে টপটপ করে জল পরছে।কিছুটা সময় নিয়ে নন্দিনী আবার বলতে শুরু করেন।
  তখন আমার বয়স চৌদ্দ কি পনের।বাবা একটা অ্যাকসিডেন্ট করে শয্য্যাশায়ী।আমাদের পাড়াটা ছিলো বেশ ধনী পাড়া।তার মধ্যে আমরাই ছিলাম মধ্যবিত্ত।পাড়ার নানান বাড়িতে পুজানুষ্ঠানে এমন কি পাড়ার ক্লাবের দুর্গাপূজা,কালীপূজা থেকে শুরু করে বিয়ে,অন্নপ্রাশন এমন কি পৈতাতেও আমার মাকে কাজের জন্য নিয়ে যেত। হ্যাঁ এরজন্য তারা মাকে পারিশ্রমিকও দিত।প্রথম প্রথম বাবার আপত্তি ছিল মায়ের এইসব কাজে যাওয়ার।কিন্তু বাবার অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে তিনি এসব নিয়ে আর মাথা ঘামাতেন না।আমিও মায়ের সাথে যেতাম।কিন্তু এমন অনেক কাজ আছে যেগুলো মা বলতেন 'তুই ধরিস না' -।বুঝতে পারতাম না আমি সেই সব কাজ করতে পারবো না কেন?কিন্তু মায়ের কথা শুনে আমিও কিছু কিছু কাজ থেকে বিরত থাকতাম।মা খুব নিষ্ঠাভরে সেই সব কাজ করতেন।আমার মায়ের রান্নার হাত ছিল খুবই ভালো।তিনি রান্না করতেও খুব ভালোবাসতেন।তখনকার দিনে ব্রাহ্মণ ছাড়া ঠাকুরের ভোগ রান্না হত না কারো বাড়িতে।এখন তো সেই ব্যাপারটা অন্তত উঠে গেছে।যে যার বাড়িতে নিজে রান্না করে তার গৃহদেবতাকে অন্নভোগ নিবেদন করে।এরই মধ্যে দিদির বিয়ে ঠিক হয়।মা একা হাতে সব কাজ সামলান।এখানেও সেই একই ব্যাপার।আমাকে অনেক কাজই করতে দেওয়া হয় না।কেন করতে পারবো না মাকে জিজ্ঞাসা করাতে মা বললেন,'বিয়ে না হলে এইসব কাজ করা যায় না'।মেনে নিলাম তখন সরল বিশ্বাসে।এখনকার দিনের ছেলেমেয়েদের মত আমরা তো এতটা ফরোয়ার্ড ছিলাম না;তাই অনেক প্রশ্ন মাথার মধ্যে আসলেও সব জানতে চাইতে সাহস পেতাম না।এইভাবেই চলছিলো সবকিছু।মা এইসব কাজ করে যা পেতেন তাই দিয়েই কোনরকমে আমাদের তিনজনের চলে যেত।দিদির বিয়েতে সেভাবে কিছু আয়োজন না করলেও বাবার সঞ্চয়ের সব টাকায় খরচ হয়ে গেলো।ইতিমধ্যে আমিও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলাম।হঠাৎ করেই বাবা একদিন ঘুমের মধ্যেই মারা গেলেন।
  মায়ের ওইসব কাজগুলি বন্ধ হয়ে গেলো।কিন্তু বিশ্বাস করো অঙ্কিতা আমি তখনো বুঝতে পারিনি লোকের বাড়ির আনন্দানুস্থানে মাকে আগের মত কেন আর ডাকে না।আমরা তখন কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েদের মত ছিলাম না।আমরা যতই বড় হই না কেন কোন ব্যাপারেই নাক গলাতাম না।মায়ের কাছে জানতে চাইলাম কেন কাজগুলি চলে গেলো?মা বললেন 'বিধবা মহিলারা কোন শুভ কাজে অংশ নিতে পারে না।' 
 তাহলে ভাবো অঙ্কিতা কুমারী মেয়েরা শুভকাজে অংশ নিতে পারবে না কারণ তার পাশে একজন পুরুষ শয্যাসঙ্গী নেই।বিধবার ক্ষেত্রেও তাই।তারমানে আমাদের সমাজ বলতে চেয়েছে নিত্য একজন পুরুষের কাছে শুতে না পারলে মেয়েরা শুভ নয় বলেই তারা শুভ কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।আবার যদি কোন বিধবা মহিলা পুনরায় বিয়ে করেন তিনি শুদ্ধ হয়ে গেলেন।সব শুভ কাজে তিনি অধিকার পেয়ে গেলেন।সমাজের এটা কোন ধরণের নিয়ম?এখানেও আমাদের বাঙ্গালী সমাজ নারীকে সেই অন্ধকারেই রাখতে চেয়েছে। কোনো মা তার সন্তানের শুভ কাজের সময় বাঙ্গালী সমাজের আচার আচরণগুলো তখনই করতে পারবেন যদি তিনি সধবা হন।আর যদি তার স্বামী মারা যায় তিনি সন্তানের শুভ কাজেও অংশ নিতে পারবেন না।আরে কবে কে মায়ের থেকে সন্তানের মঙ্গল কামনা বেশি করেছে?বিধবা হয়েছেন বলে তিনি সন্তানের শুভ কাজে অংশ নিলে তার সন্তানের মঙ্গল কি অমঙ্গল হবে --- সেটা আমাদের সমাজ ঠিক করে দেবে?সমাজ আমাদের কি দেয়? কারা সমাজের এই নিয়মগুলি বানিয়েছেন?পুরুষের নিত্য শয্যাসঙ্গী হতে না পারলেই নারীরা অশুচি?তাহলে বেশ্যারা কেন ব্রাত্য?তারা নিত্য নূতন শয্যাসঙ্গী পাল্টায় বলে?যারা শাঁখা,সিঁদুর পরে পরপুরুষের সাথে পালিয়ে যাচ্ছে তাদের কিন্তু এসব কাজে কোন বাঁধা নেই।সমাজ এদের কোন দোষ দেয় না কোন শুভ কাজে কারণ তাদের রাতের শয্যাসঙ্গী শুধু পাল্টেছে কিন্তু মরে যায়নি!পাশে একজন পুরুষ থাকা নিয়ে কথা!আমার প্রতিবাদ এসব মহিলাদের বিরুদ্ধে নয়,প্রতিবাদ আমার সমাজের বিরুদ্ধে।স্ত্রী আচার বা মহিলা আচার কেন কুমারী বা বিধবারা করতে পারবেন না তার বিরুদ্ধে।এই সমাজ আমি মানি না।আর মানি না বলেই আমি আমার মত কিছু মহিলাদের নিয়ে এই আন্দোলনে নেমেছি।এর জন্য প্রাণ সংশয় হয়েছে অনেকবার কিন্তু আমি দমিনী।আজকের যুগে শহরে অনেক শিক্ষিত বাড়িতেই এসব আর মানে না।কিন্তু গ্রাম বা মফস্বল শহরে এখনো কেউই এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।আজ আমি এসেছিলাম কলকাতায় এক সাংবাদিকের কাছে।আমাদের মফস্বল শহরে এক বাড়িতে বিধবা মা তার মেয়ের বিয়ে দেবেন।তার আর কেউ নেই।তিনি আমার পরামর্শ অনুযায়ী মেয়ের বিয়ের যাবতীয় কাজ নিজেই করবেন ঠিক করেছেন।ওখানকার কোন সাংবাদিকই রাজি হয়নি খবরটা ছাপাতে।কারণ ওখানকার নেতারা চাননি।তাই এক সোর্স মারফত একজন আমাকে কলকাতা পাঠান ওনার সাথে কথা বলতে।কিন্তু ওরা যে আমায় ফলো করতে করতে এতদূর ধাওয়া করবে আমি বুঝতেই পারিনি।হয়ত মেরেই ফেলতো যদি না তুমি সেখানে হাজির হতে।
 অঙ্কিতা একজন সমাজ সেবিকা।বয়স চল্লিশের উপরে।একাই থাকেন।একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরী করেন।প্রতিবাদী চরিত্র।অন্যায় দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন।আজ দুপুরে তিনি যখন নিজেই ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরছিলেন তখন দেখতে পান একজন মহিলাকে কিছু মানুষ ঘিরে বেশ উচ্চস্বরে বাকবিতণ্ডায় ওই স্থান সরগরম করে রেখেছেন।পথ চলতি কিছু দর্শক সেখানে থাকলেও কেউই মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে দুটি কথা বলেননি।অঙ্কিতা গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে তাদের ভিতর থেকে নন্দিনীকে উদ্ধার করে এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে সামান্য কিছু শোনার পরই তাকে সাথে করে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে আসে।সব শোনার পর নন্দিনীকে কথা দেন তার এই যুদ্ধে তার সাথে সে আজীবন থাকবে।সমাজের কালো দিকগুলো উন্মোচন করতে এইভাবে এক একজন করে মানুষকে দলে টানার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। বাঙ্গালী সমাজ আজও যে সেই পুরনো ধ্যান,ধারণা নিয়ে এগিয়ে চলেছে তার যে কোন যুক্তি নেই এগুলো প্রতিটি মানুষের বোঝার সময় এসে গেছে।

   #সমাজের_একটি_কালো_দিক_উন্মোচনের_চেষ্টা_মাত্র
#মনমত_কারো_না_হলে_অযথা_কুমন্তব্য_থেকে_বিরত_থাকবেন।

Thursday, August 26, 2021

প্রশ্ন

প্রশ্ন

   জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই সনু ওরফে সায়ন শুনে আসছে এ বাড়ির ঠাম্মা আছেন কিন্তু কোথায় আছেন তা সে জানে না।তার মা তাকে বলেছেন,"এ বাড়ির ঠাম্মা এমন একটা বাড়িতে থাকেন যেখানে আরও অনেক ঠাম্মারা থাকেন।" কিন্তু সে বাড়ির নামটা এত বড় সনু কিছুতেই সেই নামটা মনে রাখতে পারে না।সে কিছুতেই ভেবে পায় না তার ঠাম্মা তো তাদের সাথেই থাকেন তাহলে মা যে বাড়িতে কাজ করে সে বাড়িতে এতগুলি ঘর থাকার পড়েও নীলা দিদিমনির ঠাম্মা কেন অন্য কোথাও থাকে।
  নীলা ব্যারিস্টার অজয় নন্দীর একমাত্র মেয়ে।সনুর প্রায় সমবয়সী।সনু যখন খুব ছোট ছিল তখন মায়ের সাথে মাঝে মাঝেই নীলা দিদিমনির সাথে খেলার জন্য ওই বাড়িতে যেত।ব্যারিস্টার অজয় নন্দী এবং তার সুন্দরী স্ত্রী অদৃজা সনুর এই বাড়িতে আসাটাকে মোটেই পছন্দ করতেন না।বিশেষত নীলার সাথে খেলাটা।তাই একদিন বাসন্তিকে জানিয়ে দেন যাতে সে সনুকে নিয়ে কাজে না আসে।তারপর থেকে আর কোনদিনও সনু এ বাড়িতে আসেনি।
  এখন সনুর বয়স বারো বছর।সে সবকিছুই বুঝতে পারে।গতকাল অনেক রাতে মায়ের কাছে ফোন এসেছিল তাই মা খুব ভোরে বেরিয়ে গেছে।এখন রাত নটা বাজে।মা যাওয়ার সময় সে ঘুমাচ্ছিল বাবার কাছে।বাবা কাজে বেরোনোর সময় ঠাকুমার সাথে বাবার কথায় সনু জানতে পেরেছে নীলা দিদিমনির ঠাম্মা মারা গেছেন।
 আগেরদিন রাত তিনটের সময় বৃদ্ধাশ্রম সুখনীড় থেকে খবর আসে ব্যারিস্টার অজয় নন্দীর কাছে তার মা মনীষাদেবী মারা গেছেন।সারাদিনের ধকলের পর রাতে বিশ্রামের সময়ে এরূপ একটা খবর পেয়ে অজয়বাবু আশ্রমে জানিয়ে দেন তিনি সকালে শ্মশানে পৌঁছাবেন।তারা যেন যা করণীয় সেই মুহূর্তে করে নেয়।তিনি গিয়ে যা টাকা দেওয়ার দিয়ে দেবেন।
  পরদিন সকালে অজয়বাবু যখন শশ্মানে পৌঁছলেন তখন তার দাহকার্য সম্পন্ন হয়ে গেছে।তিনি আশ্রম কতৃপক্ষকে মোটা অংকের টাকা ধরিয়ে গঙ্গা স্নান করে ধরা পড়ে বাড়ি ফিরলেন।
 নীলা খুবই কান্নাকাটি করছিলো ঠাম্মাকে একবার দেখতে যাবে বলে।কিন্তু নীলাকে স্বামী,স্ত্রী না নিয়েই দুজনে শশ্মানে গেছিলেন।নীলা ছিল বাসন্তীর কাছে।তারা বাড়িতে ফিরলে বাসন্তী তার বাড়িতে ফিরে আসে।অদৃজা যাওয়ার সময় বাসন্তীকে বলেই গেছিলো সে যেন রান্নাঘর পরিষ্কার,পরিচ্ছন্ন করে রাখে।এসে তো সেই সেদ্ধিভাত খেতে হবে।
 নীলার বয়স তখন তেরোবছর।দুপুরে খেতে বসে সে দেখে মা,বাবা ফেরার সময় হোটেল থেকে খাবার নিয়েই ফিরেছেন।অথচ কয়েক মাস আগেই সে দেখেছে তার দিদিমা যখন মারা গেছিলেন মামা সেদিন শুধু ফল খেয়েই ছিলেন।পরেরদিন থেকে নিজের হাতে রান্না করে শুধু ভাত খেয়েছিলেন।সে ভাতগুলো দেখতে কেমন কাদার মত।খেতে বসে হোটেলের খাবার দেখে আজ আর তার কোন আনন্দ হলনা।সে মায়ের মুখের দিকে তাঁকিয়ে জানতে চাইলো,
--- বাবা আজ মামার মত সেই ভাত খাবে না?
 অজয়বাবু কটাক্ষ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাঁকিয়ে নিজের মনে খেয়ে উঠে গেলেন। অদৃজা মেয়ের মনের কথা বুঝতে তাকে কাছে টেনে নিয়ে বললো,
--- তোমার বাপী তো ওই ভাত খেতে পারে না তাই এইগুলো খেয়েছে তুমি একথা কিন্তু কাউকেই বলবে না।
 তারপর সে নিজে বাসনগুলো মেজে নেয় যাতে বাসন্তী এসে কিছু বুঝতে না পারে।
  ছলছল চোখে সে মায়ের মুখের দিকে তাঁকিয়ে থাকলো।
 সনুর মা আজ সনুকে বলেছে নীলার ঠাকুমার শ্রাদ্ধে ওকে নিয়ে যাবে।বেশ ভালোমন্দ খেতেও পারবে।সনুর আজ খুবই আনন্দ।আজ অনেকদিন পর নীলা দিদিমণির সাথে তার দেখা হবে।মায়ের সাথে সে বাড়িতে পৌঁছে সেখান থেকে অন্য একটা ভাড়া করা অনুষ্ঠান বাড়িতে পৌঁছে তার তো চক্ষু চড়কগাছ।এত আয়োজন!দলে দলে লোক আসছে।কেউ কেউ বসে খাচ্ছে আবার অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেরা নিয়ে খাচ্ছে। কত রকমের খাবার।সনু কিছুতেই ভেবে পারছে না যে বিশাল বাড়িতে ঠাম্মার একটু থাকার জায়গা হয়নি তার মৃত্যুর পর এত মানুষকে ডেকে খাওয়ানোর কি দরকার?সবাই বিয়েবাড়িতে আসার মত সেজেগুজে এসেছে। কত হাসছে গল্প করছে।আসার পর থেকেই সে নীলা দিদিমনিকে খুঁজে চলেছে।কিন্তু কোথাও তাকে সে দেখতে পাচ্ছে না।ম্যাডামকে জিজ্ঞাসা করতেও সাহস পাচ্ছে না।
 অনেক খোঁজার পর একটা ঘরে সে তার নীলা দিদিমনিকে খুঁজে পায়।দু,চারটে লোকের মাঝে সে চুপটি করে বসে ছিল।সনুকে দেখতে পেয়ে সে সেখান থেকে উঠে সনুকে নিয়ে কথা বলতে বলতে বাইরে একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে বসে।
--- দিদিমণি,তোমাদের বাড়িতে আজ এত্ত লোক।তোমার মনটা এত খারাপ কেন?
--- আমার ঠাকুমার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে।কিন্তু বাপি,মামণি কেউই সেটা বুঝছে না।ওরা কত হেসে হেসে সকলের সাথে কথা বলছেন। জানো সনু,ঠাকুমার সাথে ওরা কেউ কোনদিন এইভাবে কথা বলতো না।সব সময় ঠাকুমাকে উল্টোপাল্টা কথা বলতো।ঠাকুমা শুধু কাঁদতো।আমি তো তখন খুব ছোট ছিলাম একটু একটু মনে আছে।একদিন বাপী,মামণি দুজনে মিলে ঠাকুমাকে নিয়ে গিয়ে কোথায় যেন রেখে আসলো।আমি খুব কান্নাকাটি করলে একটু সময়ের জন্য আমায় নিয়ে যেত।আর তখন ঠাকুমা আমায় জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতো।
--- কিন্তু আজকে তো ওনার শ্রাদ্ধ।আমি বুঝতে পারছি না সবাই এত সেজেগুজে এসেছে কেন? হাতে সকলের মিষ্টির প্যাকেট।আবার গিফটও এনেছে অনেকে।শুধু ফুলের মালাটা ছবিতে দিচ্ছে বাকি সব তো ম্যাডামের হাতেই দিচ্ছে।এগুলো তো বিয়ে বাড়ীতে হয় দেখেছি।আমি অবশ্য এরকম কোন শ্রাদ্ধ বাড়িতে কোনদিন যাইনি। কারো মনে কোন দুঃখ নেই।সবাই কেমন মজা করছে।
--- আমারও এগুলো দেখতে ভালো লাগছে না।আজকে আমার এসব দেখে মনে হচ্ছে যেন ঠাকুমা মরে যাওয়াতে সকলের খুব আনন্দ হয়েছে।আর আমায় ঠাকুমা বলেছিলেন
'আনন্দ অনুষ্ঠানে সকলে মিষ্টি নিয়ে আসে।' কিন্তু আজ তো শোকের দিন সবাই তবে কেন এত বড় বড় মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আসছে?অনেকে আবার আমাদের জন্য কত দামী দামী জামাকাপড়ও নিয়ে আসছে।কেন করে মানুষ এগুলো তুমি জানো?
--- আমিও তো এটাই ভাবছি।কি জানি আমরা তো ছোট তাই হয়তো নিয়মকানুনগুলো ঠিক জানিনা।তবে এগুলো দেখতে আমারও ভালো লাগছে না।যখন বড় হবো তখন এইসব নিয়মের মানে হয়ত বুঝতে পারবো।চলো এখন আমরা ভিতরে যাই।ম্যাডাম তোমাকে আমার সাথে দেখলে আবার বকবে তোমায়।
  দুটো অবোধ শিশুর মনে যে প্রশ্নের উদয় হোল আমাদের সমাজ কবে খুঁজবে সেই প্রশ্নের উত্তর? 
 
    শেষ