Tuesday, October 5, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (দ্বিতীয় পর্ব)

 জীবনের প্রতি বাঁকে (দ্বিতীয় অধ্যায়)
   প্রতিটা মানুষের জীবনই এক একটা মস্তবড় উপন্যাস।কেউ যদি তার লেখনী ক্ষমতা দ্বারা তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি ভাষাক্ষরে লিপিবদ্ধ করেন তাহলে প্রত্যেকেই এক একটি উপন্যাসের জন্ম দিতে পারেন।অমরেশ রায় চৌধুরীকে কেন্দ্র করে শুধু তার জীবন নয়,তার ছেলেমেয়ে,স্ত্রী,বাবা,মা এবং পারিপার্শ্বিক নানান ঘটনায় এ গল্পের মূল উপজীব্য বিষয়।
  সায়নী গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পর বাড়ির সকলের অমতে অমরেশবাবু তার মেজমেয়েকে নিয়ে শহরে ঘরভাড়া করে মেয়েকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন।তখনকার দিনে মাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজেই ভর্তি হতে হত।কিন্তু সায়নীর মন থেকে মনোতোষের শেষদিনের বলা কথাগুলি মাঝে মাঝেই মনে পরে।
  অমরেশবাবুর প্রতিটা মেয়েই যতই আদর যত্নের মধ্যে মানুষ হোকনা কেন তাদের মা এবং ঠাম্মা তাদের প্রত্যেকেই সংসারের উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন।তাই মেয়েকে নিয়ে তিনি যখন ঘরভাড়া করে শহরে থাকতে শুরু করলেন বাবা,মেয়ের রান্না,খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে কোনোই অসুবিধা ভোগ করতে হলনা।কলেজ এবং পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে সায়নী তার বাবুর যত্নটাও ঠিকভাবেই সম্পন্ন করতো। ঠিকে কাজের একজন মহিলা অবশ্য থাকতো।
  সায়নী যখন কলেজে অমরেশবাবুর সেজমেয়েটি তখন ক্লাস টেন। ভারতী তার দিদির মত অতটা ডানপিঠে না ঠিকই কিন্তু দুষ্টুর শিরোমণি।পড়াশুনায় খুব একটা ভালো না হলেও কখনো ফেল করে একই ক্লাসে সে দুবার থাকেনি।সংসারের কাজকর্ম জানা থাকলেও সে প্রতি মুহূর্তেই সেগুলিকে এড়িয়ে একটু পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতেই পছন্দ করতো।স্কুল ছুটি থাকলে তাকে বাড়িতে কেউ আর খুঁজে পেতো না।পাড়ার ধোপা বাড়ি ,নাপিত বাড়ি,দত্ত বাড়ি --- ঘুরে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার কাজ।তবে কোন বাড়িতে ভাত খাওয়া ঠাকুমার ছিল বারণ।তখনকার দিনে ব্রাহ্মণ বাড়ির মানুষেরা অন্য জাতের হাতের অন্ন খাওয়া মানেই ছিলো জাত যাওয়া।অমরেশবাবুর বাবার মৃত্যুর পর নিষ্ঠাবান বিধবা রঙ্গিনীবালা রান্নায় হলুদ পর্যন্ত ব্যবহার করতেন না।কারণ ওটা ছিলো রঙ্গিন।বাড়ির মেয়েরাও ঠাকুমার কথা অমান্য করতো না।কিন্তু অন্য খাবার খাওয়ায় কোন আপত্তি ছিলনা রঙ্গিনীবালার।
  ভারতী মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন। এমনই সময় একদিন বৃষ্টির মধ্যে সারা পারা ঘুরে বেড়ানোর কারণে রাতে প্রচণ্ড কাপুনি দিয়ে জ্বর এলো।শ্বাশুড়ী,বউ মিলে যেটুকু ডাক্তারী বিদ্যা তাদের জানা ছিল তারা তা প্রয়োগ করেও কিছু করতে পারলেন না।সকালবেলা বছর মাইনের বীরেন মান্নাকে শহরে পাঠালেন তার বাবুকে খবর দেওয়ার জন্য।বীরেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘণ্টা দুয়েক বাদে বাড়িতে একজন ডক্টর এসে হাজির হলেন।নাম বললেন নিমাই দাস।তিনি আরও জানালেন সকাল আটটা নাগাদ একজন বৃদ্ধা তার চেম্বারে এসে তাকে জানান অমরেশবাবুর মেয়ের শরীর খুব খারাপ।আমি যেন সেই মুহূর্তেই তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাই।কলকাতা থেকে গ্রামের বাড়ির দূরত্ব ষোলো কিলোমিটার।ট্রেনে বারো কিলোমিটার।ট্রেন থেকে নামার পর আরো চার কিলোমিটার।যা সাধারণত হেঁটেই লোকে যাতায়াত করে।আবার অনেকে রিক্সাতে করেও আসা যাওয়া করে।তবে সংখ্যায় খুবই কম।কিন্তু ট্রেন থেকে নেমে তিনি দেখেন একজন মধ্য বয়স্ক ভদ্রলোক সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাকে নিয়ে আসার জন্য।সরাসরি তাকে গিয়ে প্রশ্ন করেন,
--- আপনি পিলজঙ্গ গ্রামে যাবেন তো?অমরেশবাবুর মেয়ের চিকিৎসার ব্যাপারে?
 নিমাইবাবু তার সাইকেলে করে সেই বাড়ির গেটের অর্থাৎ আড়কাঠার কাছে নেমে হেঁটে উঠানে এসে দাঁড়ান।যে ভদ্রলোক তাকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি রাস্তা থেকেই 'কাজ আছে'- বলে চলে যান।নিমাইবাবু উঠানে দাঁড়িয়েই ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ পান।তিনি তখন মনেমনে ভাবেন হয়ত এত পরিশ্রম করে এসেও চিকিৎসার কোন সুযোগই তিনি পেলেন না।তিনি হতভম্বের মত ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন।ভারতীর পরের বোন মালতী তাকে দেখতে পেয়ে ঘরের ভিতরে নিয়ে যায়।যখন তিনি অত দূর থেকে রোগী দেখতে এসেছিলেন তখন কিন্তু তিনি জানতেন না রোগীর কি রোগ হয়েছে।কিন্তু আসবার সময় কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধের সাথে একটা ইনজেকশন ও তার ব্যাগে রেখেছিলেন।সেই সময়ে নিউমোনিয়া রোগটা চারিদিকে প্রায় ছেয়ে গেছিলো।তিনি ভারতীকে ইনজেকশন দিয়ে যখন সেখানে অপেক্ষা করছেন তার চোখ মেলে তাকানোর জন্য সেই সময়ে অমরেশবাবু তার বন্ধু ডক্টর সুশীল দেকে নিয়ে রিক্সা করে বাড়িতে আসেন।তারা এসে নিমাইবাবুকে দেখে অবাক হয়ে যান।নিমাইবাবুর কাছে তার এখানে আসার বিবরণ সবিস্তারে জেনেও কেউই বুঝে উঠতে পারলেন না কে সেই বৃদ্ধা যে অত সকালে তাকে তার চেম্বারে গিয়ে খবর দিলো।শুধু তাই নয় কে তাকে স্টেশন সিংগাতি থেকে এ পর্যন্ত সাইকেলে বসিয়ে নিয়ে আসলো।সবই বাড়ির লোকের কাছে কেমন ধোঁয়াশা মনে হতে লাগলো।আর এই নিমাইবাবুকে দেখে ডক্টর সুশীলবাবু ও অমরেশবাবুর আরও অবাক হওয়ার কারণ যেটা তা হল নিমাইবাবু কোন পাশ করা ডাক্তার নয়।তিনি একদম ছোট থেকে ডাক্তার সুশীলবাবুর কাছে কম্পাউন্ডার হিসাবে কাজ করেছেন। কথায় বলে ' হাতে কর্মে শিক্ষায় হল বড় শিক্ষা।তারজন্য পুঁথি পড়বার দরকার পরেনা।' তিনি ডাক্তার দে র কাছে থেকে থেকে নিজের মেধা শক্তির গুনে কোন রোগের কি ওষুধ তা ভালোভাবেই জানতেন।পরিস্থিতি তখন এমন দাঁড়িয়েছিল রাতবিরেতে কেউ অসুস্থ্য হলে যাদের ডাক্তার দে কে ভিজিট দেওয়ার ক্ষমতা থাকতো না বা তিনি যেতে অস্বীকার করতেন তখন তারা নিমাইবাবুর শরণাপন্ন হত এবং রোগী সুস্থ্যও হয়ে উঠতো।কিন্তু এ খবর যখন ডাক্তার দে র কানে পৌঁছায় তখন তিনি নিমাইবাবুর সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করেন। যার ফলস্বরূপ তিনি ডক্টর সুশীল দে কে পরিত্যাগ করেন। নিমাইবাবুর এই ঘটনা জানতে পেরে একজন স্বর্ণকার তার দোকানের এক কোণে এক চিলতে জায়গা দেন সে যাতে সেখানে বসে রোগী দেখতে পারে।তার কারণও হচ্ছে এই স্বর্ণকারের বৃদ্ধা মা যখন মরণাপন্ন ছিলেন আর সুশীলবাবু ছিলেন শহরের বাইরে তখন নিমাইবাবুই তার মায়ের চিকিৎসা করে সুস্থ্য করে তুলেছিলেন।সেই কৃতজ্ঞতা বশত তিনি তাকে নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন তার দোকানের এককোনে বসবার জন্য।
সুতরাং নিমাইবাবুকে এ বাড়ির অধিকাংশ লোকেই চিনত।তাকে দেখে অমরেশবাবু খুশি হলেও ডক্টর সুশীলবাবু মোটেই খুশি হতে পারেননি।তিনি বলেই বসলেন একাকী যখন অমরেশবাবুকে পেলেন,
--- বড় ডাক্তার এসে গেছে তাহলে তো এখানে আমার কোন কাজ নেই।আমি তাহলে চলি।
 অমরেশবাবু বুঝতে পারলেন তার বন্ধুটি বেশ বেজার হয়েছেন।তিনি হাসি মুখে তাকে পুকুরের মাছ দিয়ে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বেরোনোর জন্য অনুরোধ জানান।এদিকে মালতী দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে তার বাবাকে ডাকতে শুরু করলো,
--- বাবু,বাবু তুমি কোথায়?তাড়াতাড়ি এদিকে এসো।


ক্রমশঃ 
 

No comments:

Post a Comment