ভালোবাসার নীল আকাশ (পর্ব ৫৯)
দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর—সবকিছুই এগিয়ে চলে। কারও জীবনে নিয়ে আসে আনন্দ, কারও জীবনে দুঃখ; ভালো-মন্দের মিশেলেই কেটে যায় সময়ের পথচলা।
সময় কখনও স্তব্ধ হয় না। কারও অপেক্ষায় থেমে থাকে না, কারও কষ্টে পিছিয়ে যায় না। ঘড়ির কাঁটার মতোই তার অবিরাম টিকটিক শব্দ—এক মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্তে, এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে নিয়ে চলে আমাদের জীবনকে।
জীবনের প্রতিটি ধাপও এগিয়ে চলে ঠিক সেই ঘড়ির কাঁটার মতো। কখনও পথ মসৃণ, কখনও কাঁটায় ভরা; কখনও হাসি, কখনও চোখের জল। হয়তো অনেকের জীবনের তাল, লয় আর ছন্দ মেলে না সেই টিকটিক শব্দের সঙ্গে। কেউ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়, আবার কেউ পিছনে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি আঁকড়ে কিছুটা পথ হাঁটে।
তবুও জীবন থেমে থাকে না।
সময় তার নিজের নিয়মে এগিয়ে যায়, আর তার সঙ্গে আমরাও—কখনও স্বপ্ন নিয়ে, কখনও আক্ষেপ নিয়ে, কখনও কিছু হারানোর বেদনা নিয়ে, আবার কখনও নতুন করে বাঁচার আশায়।
কারণ জীবন মানেই এগিয়ে চলা।
আর সময়ের সেই টিকটিক শব্দ আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়—যা চলে গেছে, তা আর ফিরে আসবে না; সামনে যে সময়টুকু আছে, সেটুকুই আমাদের জীবন উপন্যাসের নতুন গল্প লেখার সুযোগ।
বিনীতা আজ তিন বছর ধরে বদলির চেষ্টা করেও বদলি হতে পারেনি কলকাতায়। একের পর এক আবেদন, ছুটাছুটি,আশ্বাস কোনোটাতেই কোন কাজ হচ্ছে না। কলকাতায় বদলি হওয়ার সম্ভবনা এখন তার জীবনে সুদূর পরাহত।
স্কুল ছুটি পড়লেই সে কলকাতা চলে আসে। কয়েকটা দিন অনলের কাছাকাছি থাকাটা তার জীবনে এখন অনেক পাওয়া।
অনলও তাকে কাছে পাওয়ার সুযোগ মোটেই হাতছাড়া করতে চায় না। যে সময়ে বিনীতা আসতে পারে না সে সপ্তাহে কিংবা সেই সময়ে অনল শুক্রবার অফিস করে রাতের ট্রেন ধরে ভোরে এসে শিলিগুড়ি পৌঁছে রবিবার রাতে ট্রেনে উঠে সোমবার ওই পথেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে অফিস।
দূরত্বটা কমছে না, অথচ দুজনেই নিজেদের মতো করে সেই দূরত্ব পেরিয়ে একে অপরের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে চলেছে।
রেগেমেগে বহুবার অনল বলেছে চাকরি ছেড়ে দিতে। কিন্তু বিনীতা কিছুতেই রাজি নয়।
-- চাকরিটা ছেড়ে দাও বিনীতা। আর কতদিন এভাবে চলবে? তুমি ওখানে, আমি এখানে- এভাবে একটা সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাওয়া যায়?”
বিনীতা প্রতিবারই চুপ করে থেকেছে। তারপর শান্ত গলায় একই উত্তর দিয়েছে
--চাকরি ছেড়ে দেওয়া এত সহজ নয় অনল। আমার নিজের একটা পরিচয় আছে, নিজের একটা দায়িত্ব আছে। শুধু তোমার কথায় একমাত্র সর্ব সময়ের জন্য তোমায় কাছে পাবো এই অজুহাতে সেটা ছেড়ে দিতে পারি না। অনেক কষ্ট ,ত্যাগ স্বীকার করে মা আমাদের দুই ভাইবোনকে মানুষ করেছেন যাতে আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারি। এইভাবে চাকরি ছেড়ে দিয়ে মায়ের সেই ত্যাগকে আমি অসম্মান করতে পারি না।
অনল রেগে যায়। অভিমান করে। কখনও কথা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটিই আবার রাতের ট্রেনে চেপে বসে বিনীতার কাছে যাওয়ার জন্য।
আগে শিলিগুড়িতে বিনীতা থাকত কামিনীদেবীর বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে। কিন্তু এখন সে আর সেখানে থাকে না। শহরের এক নিরিবিলি গলিতে ছোট্ট একটা এক কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। খুব বেশি কিছু নেই সেখানে—একটা ছোট খাট, একটা আলমারি, কয়েকটা বই আর জানালার পাশে রাখা দু-একটি টবের গাছ।
ছোট্ট ঘরটাই এখন তার নিজের পৃথিবী।
ফ্ল্যাটটা ভাড়া নেওয়ার একমাত্র কারণ হল অনলের মাঝেমধ্যে তার কাছে আসা। পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকলে তো আর সেখানে এসে অনল থাকতে পারে না।
প্রথমবার অনল বিনিতাকে চমকে দেওয়ার জন্য হঠাৎ এসে হাজির হয়েছিল। সেদিন সে এক কাণ্ড। অনলই যে বিনীতার স্বামী সেটা বিশ্বাস করাতে কামিনীদেবী তাকে বিয়ের ছবি পর্যন্ত দেখাতে হয়েছিল। তারপর দু'রাত তারা হোটেলেই থাকে কারণ কামিনীদেবীর বাড়িতে আলাদা আর কোন রুম ছিল না।
কামিনীদেবীর বাড়িতেই হঠাৎ একদিন কৌশিকীকে দেখে বিনীতা অবাক হয়ে যায়। বিনীতা ওকে স্পষ্ট দেখতে পেলেও কৌশিকী ঠিক দেখতে পায়নি।
-- আরে কৌশিকী তুমি এখানে?
বিনীতার গলা শুনে কৌশিকী ফিরে তাকালো। প্রথমে অবাক তারপর মুখে হালকা হাসি ছড়িয়ে জানতে চাইলো
-- ওমা তুমি এখানে থাকো?
-- হ্যাগো সেই প্রথম থেকেই তো এখানেই আছি।
-- কিন্তু তোমার তো শিলিগুড়িতেই বাড়ি। তুমি এখানে কী করছো?
-- আসলে এখানে আমার বোন থাকে।
-- তোমার বোন? দেখো কাণ্ড! কী নাম ওর?
-- নন্দিনী।
-- নন্দিনী তোমার বোন? সত্যিই নন্দিনী খুব ভালো মেয়ে। মাসিমা তো এখন আগের মত সবকিছু দেখাশুনা করতে পারেন না। নন্দিনী একাই একশ। খুব বুদ্ধিমতী আর সব বিষয়ে তীক্ষ্ণ নজর। কারো কোনো অসুবিধা হওয়ার উপায় নেই।
-- হ্যাঁ নন্দিনী এমনিতে খুব ভালো মেয়ে।
কৌশিকীর গলায় কথাটা স্বাভাবিক শোনালেও মুখের অভিব্যক্তিতে যেন কোথাও একটা অদৃশ্য দ্বিধা রয়ে গেল।
বিনীতা সেটা খেয়াল করল না।
সে হাসতে হাসতে বলল
-- তুমি এখানে আসলে অবশ্যই কিন্তু আমার সাথে দেখা করে যাবে।
-- যাবো। কিন্তু তুমি তো আমাদের বাড়ি গেলে না।
-- সে সুযোগ তো আসছে না। এবার অনল আসলে ওকে সাথে নিয়েই তোমাদের বাড়িতে যাবো কথা দিলাম।
কৌশিকী বিনীতার কথা শুনে কিছুটা সময় চুপ করে গেলো।
বিনীতার মুখে তখন স্বাভাবিক হাসি। কিন্তু ‘অনল’ নামটা কৌশিকীর কানে যেতেই তার মুখের হাসিটা যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না সে।
বিনীতা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
— কী হলো? হঠাৎ চুপ করে গেলে যে?
কৌশিকী দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
-- না কিছু না। অনল আসছে কবে?
-- ঠিক জানি না। তবে খুব তাড়াতাড়িই আসবে বলেছে।
কৌশিকী আবার চুপ করে গেল।
বিনীতার চোখ এড়িয়ে সে একবার কামিনীদেবীর ঘরের দিকে তাকাল। তারপর নিচু গলায় বলল,
-- বিনীতা, তুমি অনলকে নিয়ে আমাদের বাড়ি যাওয়ার আগে অবশ্যই আগে কিন্তু আমায় ফোন করবে। হুট করে গেলাম আর চট করে চলে আসলাম সেটি কিন্তু হবে না। যে বেলায় যাবে সেই বেলাতে খেয়েদেয়ে তারপর আসবে।
বিনীতা হাসতে লাগলো।
-- আচ্ছা বাবা আচ্ছা। আসলে তোমার ভাষাতে বলতে গেলে অনল শুক্রবারে হুট করে আসে আর রবিবার চট করে চলে যায়।
দু'জনেই হাসতে থাকে। হাসতে হাসতেই কৌশিকী বলে,
-- তুমি ট্রান্সফার নিচ্ছ না কেন? তাহলে তো আর বিরহ সহ্য করতে হয় না।
-- আর বলো না। সেই বিয়ের পর থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিছুতেই পারছি না। শুধু আশ্বাসের উপরে আছি আজ তিনবছর ধরে।
-- ওমা সেকি?
-- ভালো লাগে না জানো। এই সবাইকে ছেড়ে একাএকা চাকরি বাঁচাতে এখানে পড়ে আছি। অনল প্রায়ই বলে,"চাকরি ছেড়ে দাও।"
তুমিই বলো এই বাজারে চাকরি ছেড়ে দেওয়া যায়? মানুষ কষ্ট করে পড়াশুনা করে শুধুমাত্র একটা চাকরির জন্য।
কৌশিকী চুপ করে বিনীতার কথাগুলি শুনছিল। আর নিজের মনে নিজের জীবনের কথা ভাবছিল। মানুষের ভাগ্য মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় তা কেউ কখনো বলতে পারে না। এই যে বারবার কৌশিকীর সাথে বিনীতার দেখা হচ্ছে - ঈশ্বর কী চাইছেন সেটা বোঝা মুস্কিল। কৌশিকী কখনোই চায়নি তার কোন ছায়া অনল কিংবা বিনীতার জীবনে পড়ুক। কিন্তু কিছুতেই যেন অনল আর বিনীতার চৌহদ্দি থেকে কৌশিকী বেরোতে পারছে না।
মানুষের স্বাভাবিক কার্টেসি থেকেই শুধুমাত্র বিনীতাকে সে তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি সে আমন্ত্রণকে স্বাগত জানিয়ে অনলকে সাথে নিয়ে তার বাড়িতে বিনীতা যেতে চাইবে আর কৌশিকী সে আমন্ত্রনকে নিমন্ত্রণে টেনে নিয়ে যাবে।
কী হচ্ছে এসব কৌশিকীর সাথে? ঈশ্বর কী খেলা খেলতে চাইছেন তার সাথে? সেতো কোনদিন আর অনলের মুখোমুখি হবে না বলেই ঠিক করে রেখেছিল।
ক্রমশ