ভাগ্য বিধাতা
অনেকদিন পর এক পরিচিত কণ্ঠস্বরে বিদিশা কিছুটা হকচকিয়ে যায়। আজ বহুযুগ হয়ে গেল কোন পূর্ব পরিচিত কণ্ঠস্বর তার কানে এসে পৌঁছায়নি। কয়েকদিন আগেই বিদিশার চোখে ছানি অপারেশন হয়েছে।যদিও সে ঘরেই রয়েছে তবুও তার চোখে রয়েছে রোদ চশমা। ঘরের দরজা জানালা খোলা থাকলেও রয়েছে মোটা পর্দা ঝোলানো। কারণ ডাক্তার বলে দিয়েছেন রোদে যাওয়া যাবে না। অন্তত দশটা দিন ঘরেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে। আর এই আশ্রমের অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এতটাই যত্নে রাখা হয় যে ডাক্তারের কথা অমান্য করার সাধ্য কারও নেই।
বিদিশা খাটের উপর থেকে নেমে আস্তে আস্তে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। সানগ্লাসের ভিতর থেকে খুব ভালো দেখা না গেলেও বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া সাদা চুলের মানুষটাকে দূরে পিছন দিক থেকে হলেও দেখতে পেয়ে বিদিশার চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হয়নি।
বিদিশা হঠাৎ করেই ফিরে যায় বেশ কয়েক যুগ আগে।মা,বাবা পছন্দ করে বড়লোকের একমাত্র ছেলে উজানের সাথে তার বিয়ে দিয়েছিলেন। বিদিশার বিয়ের পর পাড়ার লোকে বিদিশার ভাগ্য যে খুব ভালো তা নিয়ে বহুদিন আলোচনা করেছে। জামাই তো নয় যেন কার্তিক ঠাকুর। যেমন সুন্দর দেখতে উজানকে ঠিক তেমনি ছিল তার সুমিষ্ট ব্যবহার। কিন্তু বিয়ের কয়েক দিন পরেই বিদেশা বুঝতে পারে উজানের এই ব্যবহার শুধুমাত্র বাইরের মানুষের সামনে। তার চেহারা বাইরেটা যতটা সুন্দর ভেতরটা ঠিক ততটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। কোন মানুষকেই সে মানুষ বলে মনে করে না।
পরপর দু'বার মাতৃত্বের সাধ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বিদিশা। যখনই বিদিশা প্রেগন্যান্ট হয়েছে টাকার জোরে আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে যখনি দেখতে পেয়েছে কন্যার সন্তান আসতে চলেছে উজান নার্সিংহোমে প্রচুর টাকার বিনিময়ে বিদিশার অ্যা*বারসন করিয়ে নিয়েছে। তৃতীয়বার যখন বিদিশা পুণরায় প্রেগন্যান্ট হয় তখন তাকে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়ার জন্য উজানের যে চিৎকার চেঁচামেচি তাতে বিদিশা রাজি হয় না। এর ফলে বিদিশার সাথে উজানের চরম ঝামেলা শুরু হয় এবং সেই ঝামেলায় এমনভাবে উজান ধাক্কা মারে বিদিশা গিয়ে চেয়ারের কোণায় ধাক্কা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। উজান তাকে নিয়ে নার্সিংহোম যায়। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে আসার পর বিদিশা উজানের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। একটা যন্ত্র চালিত পুতুলের মত সারাটাদিন কাজ করা আর রাতে উজানের শয্যাসঙ্গী হওয়া ছাড়া বিদিশা নিজেকে অন্য সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। আস্তে আস্তে সংসারের কাজকর্ম করাও বন্ধ করে দেয়। সবকিছুই চলতে থাকে কাজের লোকের উপর নির্ভর করে।
এই ঘটনার এক বছরের মধ্যেও যখন বিদিশা পুণরায় প্রেগন্যান্ট হতে পারে না তখন জোর করে উজান তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায়।
ডাক্তার উজানকে জানিয়ে দেন বিদিশা আর কখনোই মা হতে পারবে না কারণ বারবার বাচ্চা নষ্ট করার ফল এটা।
বিদিশার মা,বাবা অনেক আগেই তাকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে যায়নি। এবার উজান জোর করে বিদিশাকে তার বাপের বাড়িতে দিয়ে আসে। আস্তে আস্তে বিদিশা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। তার মা-বাবা চেষ্টা করতে থাকেন বিদিশাকে সুস্থ করতে। বেশ কয়েক বছর পরে বিদিশা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। সে উজানের কাছে ফিরে আসার চেষ্টা করে। উজানের পাড়ায় খবর নিয়ে জানতে পারে উজান বিয়ে করেছে তার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে এবং স্বামী-স্ত্রী সেই সন্তানকে খুব সুখেই আছে।
দিন গড়িয়ে যেতে থাকে। দু'বছরের ব্যবধানে বিদিশার বাবা-মা দু'জনেই মারা যান। বিদিশা একা হয়ে পড়ে। বিদিশা যেহেতু তার বাবা মার একমাত্র সন্তান তাই স্বাভাবিক নিয়মেই তাদের বাড়িঘর, বিষয়সম্পত্তি, টাকা পয়সা সবকিছুর বিদিশা পায়। কিন্তু একাএকা থাকতে থাকতে তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সে সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে এসে ওঠে একটি বৃদ্ধাশ্রমে।
এখানে এসে সে আস্তে আস্তে পুরনো কষ্টটা ভুলে যেতে থাকে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জীবন থেকে তার আর কিছুই চাওয়া কিংবা পাওয়ার নেই। সকলে মিলেমিশে এখানে দিনগুলি বেশ ভালই কাটছিল। সুন্দর থাকা খাওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করা সবকিছুই নিয়ম মেনে চলে। সকলের সাথে সকলের খুব ভালো সম্পর্কও ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের ছানি পড়া অতি স্বাভাবিক। এই বৃদ্ধাশ্রমে যখন যে অসুস্থ হয় তার প্রোপার ট্রিটমেন্ট সময় মতোই হয়। সেই মতোই বিদিশার চোখের ছানি দু'দিন আগে অপরেশন হয়।
।কিন্তু হঠাৎ এখানে উজানকে দেখতে পেয়ে বিদিশা বেশ অবাক হয় । এখানে বেশ কয়েক বছর থাকার ফলে অনেকের সাথেই পরিচয় হয়েছে। উজানকে দেখার দিন সাতেক পরে সে অফিস রুমে গিয়ে উজান সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে তার ছেলে বিয়ের পর তার বাবাকে বাড়িতে ঠাঁই দেয়নি। তাকে দেখে গেছে বৃদ্ধাশ্রমে। তার স্ত্রী মারা গেছেন, মাস তিনেক আগে। উজানের গলায় একটি টিউমার হয়েছিল। সেই টিউমার দুইবার অপসারণ করতে হয়। এর ফলে নানান জটিলতার সৃষ্টি হয়। এখন আর উজান আগের মত কথা বলতে পারে না। কথা বলে কিন্তু খুব আস্তে আস্তে। মুখের কাছে কান নিয়ে তার কথা শুনতে হয়। সবকিছু শুনে নিজের অজান্তেই বিদিশার মনটা খারাপ হয়ে যায়।
বেশ কয়েকদিন পর বিদিশা একজন কর্মচারীকে সাথে নিয়ে উজানের ঘরে যায়। উজান ফ্যাল ফ্যাল করে বিদিশার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়তে থাকে। বিদিশা বুঝতে পারে উজান তাকে চিনতে পেরেছে। সে হাতজোড় করে বিদিশার কাছে ক্ষমা চায়। উজান আস্তে আস্তে বিদিশাকে অনেক কথাই বলে। কিন্তু বিদিশার কান অব্দি সে কথা পৌছায় না। বিদিশা খুব একটা চেষ্টাও করে না ওই কথা শুনবার। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিজের অবাধ্য চোখদুটিকে আঁচলের সাহায্যে পরিষ্কার করে নেয়। কিন্তু বেরিয়ে আসবার সময় সে উজানের দিকে যখন তাকিয়ে পড়ে তখন সে বুঝতে পারে উজান ইশারায় তাকে আবারো আসতে বলল।
২-৩-২৬
No comments:
Post a Comment