ভালোবাসার নীল আকাশ ( ৫ম পর্ব)
ময়ূর ঘুমিয়ে পড়ার পর ওর মা খুব তাড়াতাড়ি সামান্য কিছু রান্না করে ময়ূরের পাশে গিয়ে বসেন। ময়ূরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। কিন্তু উনি লক্ষ্য করেন ময়ূর ঘুমের মধ্যে বারবার কেঁপে উঠতে থাকে। মায়ের মন অজানা আশঙ্কায় মেয়ের বুকের পরে হাত রেখে ৩৩ কোটি দেবতার নাম স্মরণ করতে থাকেন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন তার মেয়ে যেন কোন বিপদ-আপদ আর না হয়।
সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। মা ঠাঁই বসে থাকেন মেয়ের পাশে। এক সময় মেয়ের বাবাও মলয়বাবু এসে খাটের একপাশে চুপচাপ বসে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউই খাওয়া দাওয়া করেন না। এইভাবে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেলের পথে ময়ূরের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙার পরে আতঙ্কিত অবস্থায় ময়ূরী এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। পরে বাবা-মাকে দেখে উঠে বসে মায়ের পায়ের উপরে শুয়ে পড়ে হঠাৎ হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে।মা বাবা তার এই কান্না দেখে দু'জনেই অবাক হয়ে যান এবং তাদের চোখও জলে ভিজে আসে।
এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পর ময়ূর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- মা চলো খেতে দেবে
-- হ্যাঁ চল তোর বাবাও খায়নি, তোর বাবাকেও খেতে দেবো।
ময়ূর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
-- বাবা তুমি এখনো খাওনি? বিকেল হয়ে গেল তো? বাবা মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বোলাতে বলেন,
-- শুধু আমি না তোর মা'ও এখনো খাইনি রে, কি করে খাই বলতো তুই যে সকালে এসে সেই দুটো রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লি আর আমরা পেট ভরে দুপুরবেলা কী করে খাই বলতে পারিস?চল মা আমরা তিনজনেই এখন গিয়ে খেয়ে নিই।
সবাই মিলে রান্না ঘরে চলে গেল। ময়ূর বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে, --বাবা আমরা খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম করে চলো আমরা থানায় যাই। কারণ দেরি করা ঠিক হবে না।
--আরে থানায় তো নিশ্চয়ই যাবো কিন্তু তার আগে তুই আমাদের সব কথাগুলো বল। আমাদেরও তো একটু বুঝতে হবে কি করে কি হলো?এই কটা দিন তুই কোথায় ছিলি? কারা তোকে তুলে নিয়ে গেছিল? সেসব কিছুই আমরা তো জানি না। কোন কিছুই না জেনে পুলিশের কাছে গিয়ে তুই যখন বলবি তখন গার্জিয়ান হিসেবে পুলিশ তো আমাদেরও কাছে কিছু জানতে চাইতেই পারে । আমরা যদি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারি আমাদের তো কথা শোনাবে। তাই আগে আমাদের কথাগুলো বল আমাদের কথাগুলো জানা দরকার।
ময়ূর খেতে খেতে যখন কথা শুরু করলো তখন কিছুটা বলার পর সে খাওয়া বন্ধ করে কাঁদতে শুরু করলো। তখন অন্নপূর্ণাদেবী স্বামীকে বললেন,
-- আগে ও খেয়ে নিক পরে না হয় আমরা সব কথা শুনবো।
মলয়বাবু স্ত্রীর কথাই সায় দিলেন। কিন্তু ময়ূর বিশেষ কিছু খেতে পারল না। মা-বাবার বারবার অনুরোধ সত্বেও সে আর খাবার মুখে তুলতে পারল না। উঠে গিয়ে সে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এসে পুণরায় তার কথা শুরু করল। সেই কলেজের ঘটনা থেকে সকালে বাড়িতে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা বাবা-মাকে জানালো সে ছেলেটির নামও বললো। কথা শুনতে শুনতে মলয়বাবু এবং তার স্ত্রী অন্নপূর্ণাদেবী খাবার আর মুখে তুলতে পারলেন না। তাদেরও চোখ থেকে জল পড়তে লাগলো। ময়ূরের কথা শুনতে শুনতে তারা স্বামী স্ত্রী দু'জনেই যেন পাথর হয়ে গেলেন।কথা শেষ হয়ে গেলে তারা যেমন চুপ করে বসে থাকলেন ময়ূরও সেখানে চুপচাপ বসে থাকলো। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পর একসময় অন্নপূর্ণাদেবী বললেন,
-- সবাই ঘরে চলো। কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে চলো আমরা তিনজন মিলেই থানায় যাই।যেহেতু থানায় আমরা সব কিছু জানিয়েছি সেইহেতু থানায় যেতে দেরি করলে থানার বড়বাবু কথা শোনাবেন। তাই আজই এখনই চলো। কিন্তু যেতে হবে খুব সাবধানে। বাড়ির সামনের থেকেই একটা উবের বুক করে চলো যাই। কারণ যেহেতু ওখান থেকে ও পালিয়ে এসেছে তাই ওরাও কিন্তু বসে থাকবে না, কোন ক্ষতি করে দিতে পারে। তাই আমাদেরও সতর্ক থাকতে হবে।
মলয়বাবু স্ত্রীর কথা সম্পূর্ণ সমর্থন করলেন।
কিছুক্ষণ বাদে তারা বাড়ির সামনের থেকে একটা উবের বুক করে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। সকলেরই মনের ভেতরে একটা ভয় কাজ করছিল আবার কোন বিপদ ঘনিয়ে না আসে। তারা থানায় পৌঁছে ছেলেটি আর তার বন্ধুদের নামে এফ. আই.আর করতে চায়। কিন্তু থানা থেকে বলে এফ.এই.আর না করে সাধারণ একটি ডাইরি করতে। ময়ূর এবং তার মা,বাবা রাজি হন না। তারা বারবার ইএফ. আই.আর করতে চান।
থানার বড়বাবু জানান মেয়েকে যখন পেয়েই গেছেন তখন এই নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করবেন না।
অবাক হয় সবাই। বুঝতে পারে নে*তাগি*রি থানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মলয়বাবু ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে ফিরে আসার তোড়জোড় শুরু করলে ময়ূর বেঁকে বসে। সে অফিসারদের চাপ দিতে থাকে এফ. আই.আর নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোনাই লাভ হয় না। নানান ধরণের ভয় দেখিয়ে একপ্রকার তাদের থানা থেকে বের করে দেয়া হয় সাধারণ এক ডাইরি করিয়ে।
ময়ূর দমে যাওয়ার পাত্র নয় সে ভাবতে থাকে কিভাবে কি করা যায়? হঠাৎ তার মনে পড়ে কয়েক বছর আগে অর্পিতা নামে একটি দিদি পড়তো তার থেকে দু'ক্লাস উচুতে। তার মুখেই শুনেছিল তার দাদা ওকালতি পাস করে ক্রিমিনাল কোর্টে প্র্যাকটিস করছে খুব নাম এখন তার। অল্প বয়সেই সে খুব নাম করে ফেলেছে।
অর্পিতাদির বাড়িটা চিনলেও ফোন নাম্বার সে জানতো না। বাবা-মা বারবার নিষেধ করেছে থানা থেকে যখন নিষেধ করেছে তখন এ ব্যাপারে আর না এগোনোই সমুচিন হবে। কিন্তু অর্পিতা সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার মেয়েই নয়।
দু'চার দিন ময়ূর বাড়ির থেকে না বেরোলেও আস্তে আস্তে সে বাড়ি থেকে বেরোতে শুরু করে বাবা-মার আপত্তি সত্ত্বেও। কয়েকদিনের মধ্যে সে অর্পিতার সাথে দেখা করে এবং তার দাদার সাথে কথা বলতে চায়। অর্পিতার দাদা ময়ূরের কাছে সব শুনে কেসটা হাতে নেয় কিন্তু কয়েকদিন বাদে কেসটা শুরু করবে বলে ময়ূরকে জানায় তার কারণ অর্পিতা দাদা অর্পণের বিয়ে তখন মাত্র ৭ দিন বাকি।
ময়ূর এই সম্পর্কে প্রথম অবস্থায় তার বাবা-মাকে কিছুই জানায় না। সে মনে করে অর্পিতার দাদার বিয়ের পর যখন কেসটা শুরু হবে তখনই সে তার বাবা-মাকে সবকিছু জানাবে। অর্পণবাবু কেসটা শুরু না করলেও সেই সম্পর্কে স্টাডি করতে শুরু করেন। তিনি খোঁজখবর নেন নানানজন এর কাছে, জানতে চান নানান কথা। নেতার কানে একসময় সেসব কথা পৌঁছে যায়।সে তড়িঘড়ি ছেলেকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। ময়ূর এবং তার বাবার কাছে নানান ধরনের হুমকি দিয়ে ফোন আসতে থাকে। ময়ূরের বাবা ঠিক তখনই জানতে পারেন ময়ূর এই ব্যাপারটা নিয়ে একেবারেই বসে নেই। তিনি প্রথম অবস্থায় মেয়ের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিষয়টা পুলিশের কথা মত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্বামী স্ত্রী দু'জনে মিলে ময়ূরকে অনেক বোঝান। জীবনের ঝুঁকি ছাড়াও আর্থিক দিক থেকেও তারা যে সচ্ছল নন এই কেস ধরতে গেলে প্রচুর অর্থের দরকার তাও তাঁরা তাদের মেয়েকে বারবার বলেন। আজকের সমাজে কোন নেতার বিরুদ্ধে কথা বলা মানে কারো জীবন চলে যাওয়া এটা মেয়েকে বোঝাতে তারা অক্ষম হন ।
কোন কিছুতেই কোন কাজ না হওয়ায় তারা শেষমেষ অর্পিতাদের বাড়িতে যান এবং অর্পণের সাথে এই সম্পর্কে কথা বলেন। অর্পণ তাদের অভয় দিলেও তারা কেসটা অর্পণকে না নেওয়ার জন্য হাতে পায়ে ধরতে থাকেন। কিন্তু অকুতোভয় অর্পণ তাদের উল্টে বুঝিয়ে ছাড়ে আমরা সবাই যদি সব সময় এদের ভয়ে জড়োসড়ো থাকি এবং প্রতিবাদ না করি তাহলে ওরা আমাদের পেয়ে বসবে। অর্পণকে রাজি করাতে না পেরে প্রায় অসহায়ের মতো সেই বাড়ি থেকে অন্নপূর্ণাদেবী ও মলয়বাবু বেরিয়ে আসেন।
সময় এগিয়ে যেতে থাকে। বিয়ে দোরগোড়ায় নেতার কানে সব কথাই চলে যায়। তিনি অর্পণকে নিজেই ফোন করে থ্রে*ট করেন এবং কেসটাকে না নেওয়ার জন্য অর্ডার করেন। এই কেস যদি অর্পণ নেয় তাহলে অর্পনের প্রা*ণনা*শেরও হুমকি দেন। কিন্তু অর্পন তার কোন কথায় কর্ণপাত করে না এবং কেসটা সে নিচ্ছে বলে জানিয়ে দেয়।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment