Wednesday, February 18, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (৪র্থ পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ (৪র্থ পর্ব)

ভোরের আলো ধীরে ধীরে আকাশ ছুঁয়ে উঠছে। শীতল হাওয়ায় রাতের উত্তাপ যেন মুছে গেছে, কিন্তু অনলের ভেতরের অস্থিরতা এখনও টাটকা।
ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে সে নিচের উঠোনের দিকে তাকালো। প্যান্ডেলের আলো নিভে এসেছে। কয়েকজন আত্মীয় মাদুরে আধশোয়া। রাতের ঘটনাগুলো যেন স্বপ্নের মতো।
পেছন থেকে খুব আস্তে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—
— “চা।”
অনল ঘুরে দাঁড়াল। বিনীতা। সাধারণ শাড়ি পরে এসেছে, মাথায় আর ভারী অলংকার নেই। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।
অনল কাপটা নিল।
— “তুমি বিশ্রাম করোনি?”
— “ঘুম আসেনি,” বিনীতা হালকা হেসে বলল।
— “আপনি যাচ্ছেন?”
অনল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
— “হ্যাঁ। এটাই ঠিক।”
বিনীতা মাথা নাড়ল। কোনো অনুরোধ নেই, কোনো আবেগের নাটক নেই।
— “আপনাকে ধন্যবাদ,” সে বলল।
— “কাল রাতটা… আপনি না থাকলে হয়তো আমার দাদা আর মায়ের মাথা নত হয়ে যেত।”
অনল একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল—
— “আমাকে ধন্যবাদ দিও না। আমি শুধু একটা পরিস্থিতি সামলেছি।”
বিনীতা সরাসরি তাকাল।
— “সবাই পারে না।”
নিচ থেকে বিজয়ের ডাক শোনা গেল—
— “অনল! গাড়ি তৈরি।”
 অনল বিনীতার দিকে তাকিয়ে বলল,
--- গাড়ি রেডি কিন্তু তুমি তো এখনো রেডি হওনি 
 বিনীতা অবাক হয়ে অনলের দিকে তাকালো -
-- কাল তো বিজয়ের সাথে কথা হল আমি, তুমি, বিজয় একসাথেই বেরোবো। কালকের ওই ঘটনার পর আজ আমি একা বেরিয়ে গেলে প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনের মধ্যে পুণরায় গুঞ্জন শুরু হবে। তোমায় বিজয় কিছু বলেনি? 
 বিনীতা চুপ করে আছে দেখে অনল চা'টা খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে নেমে এলো। বিজয়কে দেখতে পেয়ে বলল,
-- কাল তো আমাদের অন্যরকম কথা হল। তোরা তো রেডি হোসনি এখনো? 
-- আসলে এখনো কথাগুলো মা আর বিনু কাউকেই বলা হয়ে ওঠেনি। কী করে বলবো ভাবছি।আচ্ছা ঠিক আছে আমি দেখছি 
 বিনীতা তখন সিঁড়ি দিয়ে নামছে। তাকে দেখতে পেয়েই বিজয় বললো,
-- বিনু একটু মায়ের ঘরে আয় তো কথা আছে।
 অনলের দিকে তাকিয়ে তাকেও বলে,
-- তুইও আয়। সকলের সামনেই কথাটা বলি।
 বিজয়ের মা শান্তিদেবী গতকালের পর থেকে একদম চুপচাপ হয়ে গেছেন। কোন কথাই কারো সাথে বলছেন না। মেয়ের জীবনের উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে তা তিনি কোনদিন স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। বিজয় তাকে সবকিছু না বললেও তিনি তার ছেলের ঘরের বাইরে থেকে ছেলে আর তার বন্ধুর সব কথাই শুনেছেন। ছেলের এই সিদ্ধান্তকে তিনি সমর্থন করতে কিছুতেই পারছেন না। ধরে বেঁধে মেয়ের মাথায় কাউকে দিয়ে সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে তাকে লগ্নভ্রস্তা হতে রক্ষা করতে গিয়ে একটা অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার থেকে চাকরিরত মেয়েটি আজীবন তার কাছে থাকলেই বা ক্ষতি কী হত ? তিনি কিছুতেই বিজয়ের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু এখন তার কিছু করারও নেই। বিয়েটা তো হয়েই গেছে।
 সকলের এসে শান্তিদেবীর ঘরে ঢুকলো। সবাইকে একসাথে দেখতে পেয়ে তিনি শোয়া অবস্থা থেকে খাটের উপর উঠে বসলেন।
-- কিছু বলবে তোমরা আমাকে? সবকিছু জেনে বুঝেও তিনি না বোঝার ভান করে বললেন,
-- বিয়েটা যখন হয়ে গেছে তখন বাসিবিয়ের কিছু নিয়মকানুন থাকে সেগুলো সামান্য একটু মানে যেটুকু না করলে নয় -- করে নিলে হত না? দুয়েকজন হলেও বাড়িতে লোকজন রয়ে গেছে এই কারণেই বলছিলাম।
 বিজয়,অনল চুপ থাকলেও বিনীতা বললো,
-- না মা আর কোন রিচুয়ালের দরকার নেই। লোকের কথাই কী যায় আসে?
 শান্তিদেবী অসহায়ের মত মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। তার চোখ ভর্তি জল।
অবস্থা বুঝে অনল বললো,
-- সবে তো সকাল এখন। আর না খাইয়েই বিজয় আমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছিল। কী কী রিচুয়াল আছে আপনারা ব্যবস্থা করুন। কোন কিছুই বাদ দেওয়ার দরকার নেই। আমরা বিকেলের দিকেই বেরোব। কী বলিস বিজয়?
 অনলের কথা শুনে সব অবাক হয়ে গেলো। এরপর বিজয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
-- কী বলার জন্য এখানে এসেছিস সেটা মাসিমা, তোর বোনকে বল। 
 বিজয় কিভাবে কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না দেখে অনল বললো 
-- ঠিক আছে আমিই বলছি। 
 মাসিমা, আমি আমার বন্ধুর বোনের বিয়েতে এসে পরিস্থিতির চাপে পড়ে তাকে বিয়ে করে ফেলেছি। এই মুহুর্তে বাড়িতে বউ নিয়ে ফিরলে মা,বাবা মেনে নাও নিতে পারেন। আমার একটা বিবাহযোগ্যা বোন রয়েছে বাড়িতে। সবে চাকরি পেয়েছি। আমি আপনার মেয়েকে সম্পুর্ণ সম্মান দিয়েই নিয়ে যাবো সেদিন যেদিন আমি আমার মা,বাবাকে সম্পূর্ণ ঘটনাটা নির্ভয়ে বলতে পারবো। আর আপনার মেয়ে যদি চায় সে এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাবে তাতেও আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু এই মূহুর্তে আমি ওকে সাথে করে নিয়ে যেতে পারবো না।
 কারো মুখেই কোন কথা নেই। বিজয় মনেমনে ভাবছে যে ছেলের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এতটা পরিবর্তন হতে পারে সে ছেলে যেভাবেই হোক তার মা,বাবাকে রাজি করিয়ে তার আদরের বোনটাকে সুখী করতে পারবে। 
 আর বিনীতা? জীবনে যার আত্মসম্মান বোধ সবচেয়ে বেশি, মাথা উঁচু করেই বাঁচা যার একমাত্র লক্ষ্য তার জীবনে হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয় থেকে যে মানুষটা রক্ষা করেছে পুণরায় তার কাছে সে হাত পেতে কিছুতেই দাঁড়াবে না। যেটুকু ঋণ জমা হল তার উপর আর ঋণের বোঝা সে কিছুতেই বাড়াবে না।
  অনলের কথা শেষ হলে শান্তিদেবী বললেন,
-- কোথা দিয়ে কী ঘটে গেলো আমি বুঝতেই পারলাম না। বিজয়কেও আমি দোষ দিচ্ছি না। তবে ছেলের বাড়িতে ওই অঘটন ঘটার পর ও যদি একবার আমার সাথে আলোচনা করে তোমার সাথে কথা বলতো আমি কিছুতেই এইভাবে মেয়েটার বিয়েতে রাজি হতাম না। মেয়ে আমার লগ্নভ্রষ্টা হয়েই নাহয় আমার কাছে থাকতো। ক'দিন পরেই চাকরিতে জয়েন করবে। কিন্তু এই মিথ্যে বিয়ে দিয়ে লাভ তো কিছু হল না। তোমার জীবনেও তো কিছু স্বপ্ন আছে ,তোমার পরিবারের একটা মতামতের ব্যাপার আছে। তোমার মা,বাবার তোমার বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন আছে। হ্যাঁ আমি জানি বিজুর মাথা তখন কাজ করছিল না। বোনকে লগ্নভ্রষ্টা হতে বাঁচাতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এসবের কোন দরকার ছিল না। 
 শান্তিদেবীর কথা শুনে উপস্থিত তিনজনেই অবাক হয়ে গেলো। কারো মুখেই কোন কথা নেই। 
 এরপর বাসি বিয়ের সামান্য রিচুয়াল মেনে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে তিনজনেই একসাথে রওনা হয়ে গেলো। বেরোনোর আগে বিনীতা মায়ের কাছে গিয়ে বলল,
-- আমার জন্য একদম ভাববে না মা। আমি শিলিগুড়িতে পৌঁছেই কাকু,কাকীমাকে সব সত্যিটা জানিয়ে দেবো। আমি যেমন শক্ত আছি তুমিও ঠিক সেইরকম শক্ত থাকবে। পাড়াপ্রতিবেশীর আত্মীয়স্বজনের কাছে বৌভাতের ব্যাপারটা কিভাবে ম্যানেজ করবে দাদার কাছে জেনে নিও।
 বেরিয়ে গেলো তিনজনে একটা গাড়ি করে। স্টেশনে এসে বোনকে ট্রেনে বসিয়ে বিজয় ওদের একটু কথা বলার সুযোগ দিয়ে জলের বোতল কিনবে বলে সরে গেলো। অনল বিনীতার কাছে গিয়ে 
 শেষবারের মতো বিনীতার দিকে তাকাল।
— “মনে রেখো, এটা কোনো বন্ধন নয়।”
বিনীতা শান্ত গলায় বলল—
— “বন্ধন যদি হয়, সেটা মনেই হয়। কাগজে কিংবা লোকদেখানো নয়।”
 এই কথাটা অনলের ভেতরে কোথাও গেঁথে গেল।
 
অনল অনুভব করল—এই মেয়েটা দয়া চায় না, আশ্রয় চায় না। সে শুধু সম্মান চায়।
— “আমি আসব,” অনল ধীরে বলল।
-- আপনার এই উপকার সারাজীবন মনে রাখবো। তবে একটা কথা খুব ভাবছি জানেন,
-- কী কথা?
-- মায়ের বলা কথাগুলো। মা কিন্তু খুব বাস্তব কথা বলেছেন। আমার কপালের দোষে বিয়ের দিনে এই অঘটনটা ঘটলো। কী এমন ক্ষতি হত গতকালই বিয়েটা না হলে? সারাটা জীবন ধরে একটা মিথ্যেকে আগলে রাখার কোন দরকার ছিল না। দাদার মাথা কাজ করেনি সেই সময়। পরবর্তী অধ্যায়গুলো দাদা মোটেই ভাবেনি। আর কিরকম কপাল দেখুন কত বছর বাদে সেদিন আপনার সাথে দাদার দেখা হল। ভবিতব্য বলে একটা কথা আছে। হয়ত এটাই আমার কপালে লেখা ছিল। তারপর হাসতে হাসতে বলল,
-- আমার কপালের সাথে আপনার কপালটাও কেমন মিশে গেলো।
 কথাটা বলতে গিয়ে বিনীতার গলাটা ধরে এলো। অনেক কষ্টে নিজের চোখের জলটাকে অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত করলো। 
 অনল মানিব্যাগ বের করে একটা কাগজের টুকরো বিনীতার হাতে দিয়ে বলল,
-- আমার নম্বর। মনেহলে ফোন করতে পারো। এখন একটা কল করে দাও তাহলে তোমার নম্বরটা পেয়ে যাবো।
 বিনীতা একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে বলল,
-- দেবো।
 গাড়ি হুইসেল দিলো। বিজয় গাড়িতে উঠে পড়লো। হয়ত কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু গাড়ির এই হুইসেলের সাথে সাথে মাত্র গতকাল পরিচয় হওয়া দু'টি  হৃদয়ের বুকের ভিতরে অজান্তেই যেন মোচড় দিয়ে উঠলো
যা দু'জনের কাছেই কাম্য ছিল না কিন্তু ঘটনাটা ঘটলো।

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment